obsession vs love part 21
নিরুর কল্পনারাজ্য
তিয়াকে নিয়ে সোজা প্যান্থ হাউজে এসেছে রুশ মাফিয়া লিডার তথা মোস্ট ওয়ান্টেড রুশ ক্রিমিনালোর ডান হাত নিকোলাস। তিয়া তখনও জ্ঞানে নেই। নইলে পেন্থ হাউজের অমন রূপ দেখে নির্ঘাত ভয় পেতো। প্যান্থ হাউজের সামনে অহরহ গার্ডস যাদের হাতে রাইফেল। সাথে পোষা হিঃস্র কুকুর। বাহির থেকে পেন্থ হাউজের দৃশ্য ভয়াবহ রকমের নিস্তব্ধ। যেখানে সাধারণ মানুষ ভিন্ন রঙে তাদের বাড়ি সাজায় সেখানে এই পুরুষ তার মতোই কলাো জগতের কালো রম দিয়ে আচ্ছন্ন করেছে তার সম্পূর্ণ আস্তানা। মার্বেল পাথরের টাইলসের সুবিন্যস্ত কারুকার্য তো রয়েছেই। তিয়াকে কোলে করে নিয়ে তার বিলাশবহুল কার হতে নামলো নিকোলাস। তার আগমনে সমস্ত পেন্থ হাউজের গার্ডসদের পজিশন লম্বা সারিতে পরিবর্তিত হলো। নিকোলাস তীক্ষ্ণ চোয়ালে তিয়াকে সাথে নিয়ে আরম্ভ করলো। সকলে অবশ্য কানাঘুষা করার সুযোগ না পেলেও প্রত্যেক মানবের মনে একটি প্রশ্ন অবশ্যই উদিত হয়েছে,
— এমকের ডান হাত–সবচেয়ে বড় শক্তি নিকোলাস জেইন একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে? আদৌ এটা কোনো সত্য ঘটনা তো?
নিকোলাস তিয়ার নরম তনুখানি তার সোফায় রাখলো। তাকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও সামনের সোফায় রাখলো। পেছন হতে উদিত সূর্যের তেজস্বী কিরণে নিকোলাসের দীর্ঘদেহী অবয়ব অদ্ভুত রকমের এক শিহরণ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। নিকোলাস কঠোর দৃষ্টে অজ্ঞাত সেই রমণীর পানে দৃষ্টি রেখে ক্ষীণরেখায় মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করলো। সঙ্গে সঙ্গেই প্রখর মস্তিষ্ক তার শণাক্ত করে ফেললো এই নারীটির পরিচয়। মির্জা বাড়ির মেয়ে তিয়া! নিকোলাসের ঠোঁটে অস্ফুটে হাসি ফোটে। পরক্ষণেই তা গয়েব হয়ে যায় তার কঠিন ব্যক্তিত্বের প্রতাপে। সোফায় গা ছড়িয়ে বসে বাহবা দিয়ে সেই অজ্ঞান হয়ে থাকা রমণীটিকে উদ্দেশ্য করল বলে,
— ইম্প্রেসিভ!
ততক্ষণে তার পাশে গার্ডসব এসে দাঁড়িয়েছে। একজন কে আঙুলের ইশারা করতেই কালো পোশাকে আবৃত একজন গার্ড গিয়ে তিয়ার মুখে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিলো। মূহুর্তেই হুমড়ি খেয়ে উঠলো তিয়া। আচানক এমন জ্ঞান ফেরায় হম্বিতম্বি করে পূর্বের স্মৃতিচারণ মস্তিষ্কে রেখেছে বললো,
— মারবেন না, আমাকে মারবেন না প্লিজ! আমি কিচ্ছু দেখিনি..সত্যি…
নিকোলাস কুঁচকানো ভ্রুতে তাকিয়ে তাকিয়ে কান্ডসব দেখলো তিয়ার। মেয়েটা যে বড্ড ভীত হয়েছে তা বুঝলো। বিরক্ত হলো সাথে। সেই বিরক্তির রেশ ধরেই হুংকার ছুঁড়লো সে,
— স্টপ দিজ!
সাথে সাথেই তিয়া নিশ্চুপ হয়ে গেলো। চোখ গেলো সামনে থাকা পুরুষটির পানে। সুঠাম দেহী; নীল চোখের গভীরতায় তিয়ার মনে পড়ে যায়–কিছুদিন আগেই সে এই পুরুষের ওপর প্রথম দেখায় ক্রাশ খেয়েছিলো। তিয়ার মস্তিষ্কে এই কঠোর মুহূর্তেও একটি উক্তি মস্তিষ্কে হানা দিলো,
— আমার কোনো লাভ লস নেই; আমার জীবনটাই লস!
এবার বাস্তবে ফিরে সে আশেপাশে তাকাতেই চকিতে ভীত হয়। আশপাশ সম্পূর্ণ কলাো রঙে আবৃত এমনকি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডগুলোও। কেবল তার পরনেই ডার্ক রেড কালারের কাপড়। যেনো মনে হচ্ছে–এই অন্ধকার জগতের একমাত্র দীপ্তি সে! নিকোলাসের পানে আবারও নজর যেতেই ঢোক গিলে। বলে,
— আমাকে যেতে দিন প্লিজ! আমি সত্যিই কিছু দেখিনি।
নিকোলাস এক ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
— দেখোনি?
তিয়া দুপাশে মাথা নাড়ে। নিকোলাস এবার আয়েশী ভঙ্গিতে বসে। ভাবুক হয়ে বলে,
— নাও হোয়াট শ্যুড আই ডু? চোখদুটো উপড়ে ফেলি?
— না প্লিজ। এমন করবেন না। আমি কাওকে কিছু বলবোনা। ইনফ্যাক্ট আমি সব ভুলেই গিয়েছি…
— আহ! বড্ড কথা বলো তুমি মেয়ে।
তিয়া মাথা নিচু করে বসে রইলো। নিকোলাস দাঁড়িয়ে গেলো। তিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— কাম!
তিয়া অবুঝের ন্যায় শুরুতে চেয়ে থাকলো। পরক্ষণেই তাকে যে নিকোলাসকে অনুসরণ করতে বলা হলো তা বুঝে গেলো। নিকোলাসের পিছু সে পেন্থ হাউজের বেজমেন্টে গেলো। বেজমেন্টে যেতেই তার হাড় হীম হয়ে এলো। একটা লোহার শেকরে পিঞ্জরায় হিঃস্র এক সিংহ অশোভন ভাবে এক মাংসপিন্ড ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
— গো দেয়ার!
তিয়া চমকিতে তাকালো। ‘গো দেয়ার?’ মানেটা কী? ও কী ওই খাঁচায় যাবে? চোখ বড় বড় করে তাকালো। মুহূর্তেই তার চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। আকুতি করে বললো,
— আমি তো বলছিই আমি কিচ্ছু দেখিনি। তাও কেনো আমাকে এতো নিষ্ঠুর মৃত্যু দেওয়া হবে?
অথচ নিকোলাস নির্বিকার। তিয়া আকুতি করতেই থাকে। এক পর্যায়ে সে নিকোলাসের সাপের ট্যাটুওয়ালা সেই হাতখানা ধরে ফেলে। মিনতি করে বলে,
— প্লিজ যেতে দিন না। দয়া করে দিন।
নিকোলাস হতবাক দৃষ্টিতে তাকালো তিয়ার পানে। জীবনে প্রথম কোনো নারী নিকোলাসকে স্পর্শ করেছে। বিরক্ত হয়ে ভীষণ রুক্ষভাবে নিকোলাস তিয়ার হাত ধরে চার্লির খাঁচায় তাকে বন্দি করে দিলো। অতঃপর ফরমাল প্যান্টের দু’পকেটে হাত ঢুকিয়ে তামাশা দেখতে আরম্ভ করলো। তিয়ার অস্তিত্ব টের পেতেই চার্লি মুখ তুলে চায়লো। মূলত এমকের পোষা সিংহ চার্লির দায়িত্ব নিকোলাসের ঘাড়ে। চার্লি তিয়াকে পেয়ে যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। এক পা, দু’পায় করে এগোতে আসম্ভ করলো বিশাল গর্জন তুলে। তিয়া ভয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেছে। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হবার যোগাড়। সিংহটি যখনই তিয়ার ওপর আক্রমণ করবে তিয়া জীবনের শেষ মুহূর্তে নিকোলাসের নীল নেত্রে নজর নিবিষ্ট করলো। করুণ চোখের চাহুনিতে নিকোলাসের চোখ পড়তেই হুট করেই তার কপালের সকল ভাঁজ গায়েব হয়ে গেলো। আচমকা হুংকারে ফেটে পড়লো,
— স্টপ চার্লি!
সবে তিয়াকে টুকরো টুকরো করে ছেঁড়ার জন্য তিয়ার ওপর ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তবে হঠাৎ এলার্টে সে সাবধান হলো। পোষা প্রাণীটির বোধহয় এমন সময়ে মুনিবের নিকট হতে এমন নিষেধাজ্ঞা আশা করেনি। এখনো অব্দি কখনো এমন হয়নি কিনা। নিকোলাস বাহির হতে খাঁচার হুক খুলে দিতেই তিয়া হুমড়ি খেয়ে বেড়িয়ে পড়লো। হাটু ভেঙে নিচে পড়ে গেলো। বড় বড় দমে শ্বাস নেওয়া আরম্ভ করলো। সবশেষে মুখ উঁচিয়ে একবার নিকোলাসের পানে তাকিয়ে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় যে তাকে অবলোকন করছে। নিকোলাস এক লহমা সময় দিয়ে ফের চিরচারিত গম্ভীর সুরে তাকে ওয়ার্ন করলো,
— যদি কাওকে কিছু বলার চেষ্টা করেছো তো তোমার এর চেয়েও করুণ অবস্থা হবে।
— বলবনা, কাওকে বলবোনা আমি।
নিকোলাস এবার ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বলে,
— নাও ইউ হ্যাভ লাস্ট ফাইভ মিনিটস। ইফ ইউ ওয়ান্ট টু স্কেইপ ফ্রম মি দ্যান রান এন্ড গেট আউট ফ্রম মাই ওয়ার্ল্ড। বাহিরে তোমার জন্য গাড়ির অপেক্ষা করছে।
তিয়া মুহূর্ত বিলম্ব না করেই ছুট লাগালো। এতো জোরে যেনো কোনো রেইসে অংশ নিয়েছে সে। তাকে এভাবে দৌড়াতে দেখে নিকোলাস নিজমনেই বিড়বিড় করে,
— শ্যুড আই ক্যাচ হার?
তবে সে এমন কিছুই করেনা। তিয়ার যাওয়া দেখে যায় কেবল নির্বিকার কন্ঠে।
অফিসে আজ প্রথম এসেছে বিধায় ঝিলিককে কেও চিনে উঠতে পারলোনা। সবারই মনে হলো ঝিলিকও হয়তো অন্যান্যদের ন্যায় নতুন কোনে এমপ্লয় হবে। ঝিলিক খুঁজে খুঁজে তার ডেস্কে গিয়ে বসলো। সামনেই নতুন কম্পিউটার। ডেস্কটাও দারুণ পরিচ্ছন্ন সাথে ডেকোরেটোড। পছন্দ হলো ঝিলিকের। নিজের ডেস্ক নিয়ে যখন ভাবনায় মশগুল ঝিলিক তখনই একজন এসে তার ডেস্কে আচমকা বহু ফাইল এনে ফেললো। ঝিলিক ভড়কে গেলো শুরুতে অতঃপর সামনে প্রচন্ড এটিটিউড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখলো। আপাতত নতুন এমপ্লয় ভেবে হয়তো তাকে বুলি করতে এসেছে সে। ঝিলিক তুখোড় মস্তিষ্ক তা বুঝে গেলো। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে তার কথাগুলো শুনতে আরম্ভ করলো,
— এই মেয়ে, এই ফাইলগুলো চেক করে আমাকে একঘন্টার মধ্যে দিবে।
— পারবোনা!
ঝিলিকের সোজাসাপ্টা উত্তর। রুমাইশা নামক মেয়েটি অবাক হয়ে বলে,
— হোয়াট? আমার মুখে মুখে তর্ক? নতুন হয়েও এত সাহস যে তুমি আমার মতো সিনিয়রের সাথে তুমি বেয়াদবি করছো?
— মেইবি ইউ আর দ্যা সিনিয়র বাট আ’ম ইউর বস!
মেয়েটি বুঝলোনা ঝিলিকের ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা কথাগুলো। পাশ থেকে আরেকজন ডেস্কমেইট তাকে বাঁচাতে চায়। বলে,
— চিফ, ও মেবি আমাদের এখানে নতুন। আ’ল টিচ হার এভ্রিথিং। দিন, আমি করে দিচ্ছি সব।
ঝিলিক তা হতে দেয়না। আটকে দেয় তাকে। বলে,
— যার কাজ সে-ই করবে!
রাগে ঝিলিককে থাপ্পড় মারার আগেই সেখানে আইয়ুশ এসে হাজির হয়। বাজখাঁই গলায় বলে,
— এমপ্লয়িজ, ইজ এভ্রিথিং কমপ্লিট?
রুমাইশা চমকে তাকায় আইয়ুশের পানে। আমতা আমতা করে বলে,
— স্যার, দেখুন না। এই মেয়েটা আমার সাথে অসভ্যতামো করেছে!
আইয়ুশ ভাঁজকৃত কপালে তাকালো রুমাইশের পেছনে থাকা ঝিলিকের পানে। মুহূর্তেই ঠোঁটের মাঝে রসিকতার হাসি ফুঁটে উঠলো। ঝিলিক ভাবে যে–আইয়ুশ বোধহয় তাকে সেইভ করার পরিবর্তে উল্টে গ্যাড়াকলে ফেলবে।
হুট করে সেখানে শাহাদাদ মির্জা আসেন। ওসমান মির্জা এবং শাহমীদ মির্জা কোনো কাজে অফিসে নেই। তিনি এসেই ঝিলিককে দেখে হেসে সেদিকে এগিয়ে যান। রুমাইশা সাথে বাকি এমপ্লয়গুলো দাঁড়িয়ে যায়। শাহদাদ মির্জা এগিয়ে গিয়ে ঝিলিকের সাথে হাত মেলায়,
— হাই ইয়াং লেইডি!
— গুড মর্নিং, বাবা!
এই এক ডাকেই যেনো সবখানে কানাঘুঁষা শুরু হলো। বিশেষ করে রুমাইশা অবাকতার শিয়রে গিয়ে পৌঁছুলো। রুমাইশার অবস্থা বোঝার জন্য ঝিলিক হাসিমুকে ঘাড় কাঁত করে তাকালো তার পানে। ভীষণ সমবেদনাদায়ক মুখভঙ্গি প্রকাশ করলো। রুমাইশা রাগ এবং ভয়ে জরাজীর্ণ হয়ে রইলো। ঝিলিক বক্র হেসে তাকে ব্যঙ্গ করলো,
— আসসালামু আলাইকুম, সিনিয়র ম্যামসাহেবা!
পাশে থাকা আহানা নামক সেই মেয়ে কলিগটি ঠোঁট চেপে হাসি আরম্ভ করলো। স্বয়ং কোম্পানির মালিকের মেয়েকে সে কতবড় অসম্মান করেছে তা বুঝতেই তার ঘাম ঝড়া শুরু হয়। শাহদাদ মির্জাকে ঝিলিক বলে,
— বাবা, তুমি কী বেরিয়ে যাচ্ছো?
— ইয়েস মাই প্রিন্সেস, শুধু তোমাকে দেখতে এলাম।
— ওকল দ্যান, গো এহেড।
— ওকে মাই ডটার। স্টেই সেইফ।
অতঃপর আইয়ুশের পানে তাকিয়ে বলে যায়,
— আইয়ুশ, দেখে রেখো!
আইয়ুশ হাসে কেবল। ঝিলিককেও যেতে যেতে বলে যান তিনি,
— কোনো প্রয়োজন হলেই বাবাকে কল করো আম্মু, কেমন?
ঝিলিক সায় জানায় কেবল। আইয়ুশ অবশ্য ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে না। ও চলে যায়। আবারও ফোনের স্ক্রিনে গিয়ে আপাতত ঝিলিকের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করে। যা-ই হোক, ঝিলিক বড্ড জেদী মেয়ে! মির্জা পরিবারের সবচেয়ে আদুরে সন্তান কিনা!
ঝিলিক এবার রুমাইশাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— নেক্সট টাইম থেকে কারও সাথে এমন হলে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কী হবে?
—জ্ব..জ্বী ম্যাম! আ’ম এক্সট্রেইমলি স্যরি ম্যাম।
নতমস্তকে কাঁপতে কাঁপতে বলে রুমাইশা। পরিবর্তে ঝিলিক শীতল কন্ঠে বলে,
— নাও গে টু ইউর ওয়ার্ক!
রুমাইশা যেতেই ঝিলিক বিড়বিড় করে,
— হাহ! কোথা থেকে যে আসে এসব।
— সোওও, কুল গার্লি!
পাশ হতে আহানা তাকে চিয়ার আপ করলো। ঝিলিক নিজের চেয়ারে বসে পড়লো। মেয়েটি হয়তো বয়সে বড় হবে তার। আহানা তাকে শুধালো,
— তা মির্জা গ্রুপের ভিপি এর মেয়ের হঠাৎ কোম্পানি জয়েন করার কারণ কী?
— বিরাট বড় চক্রান্ত!
হাসতে হাসতে বললো ঝিলিক। আহানা কিছু না বুঝেই হাসলো। বললো,
— ভালো করেছো। রুমাইশা ম্যাম অলওয়েজ সিনিয়র হওয়ার এডভান্টেজ নেন।
— কমপ্লেইন করেননি?
— না ওনার ভয়ে কেও মুখ খোলেননা।
— এখন থেকে আর কারও প্রবলেম হবেনা।
অতঃপর কী মনে করে আবার বলে,
— আচ্ছা, মির্জা গ্রুপে যারা নিউলি শিফট হয় তাদের স্যালারি কত?
— উমম, আমি যখন নতুন ছিলাম তখন তো পাঁচ লাখ ছিলো। এখন হয়তো সাত লাখ হবে!
ঝিলিক যেনো তব্দা খেলো। অবশ্যই এটা তার কাছে অধিক নয়। মাসে এর থেকেও বেশি তার খরচ হয়। তবে নিউ এমপ্লয়িদের যে এতো বেশি স্যালারি হয় জানা ছিলোনা তার। আহানা ফের বলে,
— তোমার হয়তো জানার কথা, আমাদের কোম্পানিতে স্যালারি কাউন্ট করা হয় পনেরোদিন হিসেব করে। অর্থাৎ পনেরোদিন পর পর স্যালারি।
ঝিলিক আবারও অবাক হলো। বললো,
— তার মানে মাসে আমি ১৪ লাখ ইনকাম করবো?
— ইয়েস!
ঝিলিকের মন-দিল খুশি হয়ে গেলো। শীঘ্রই ভেবে ফেললো এই টাকা দিয়ে সে তার সন্তানের জন্য কিছু কিনবে। মাতৃমন এটা ভেবেই লাফিয়ে উঠলো।
সন্ধ্যা সাতটায় অফিস আওয়ার শেষ হয়। ঝিলিক যেহেতু বর্তমানে দূর্বল সাথে প্র্যাগনেন্ট সেই হিসেব করে আইয়ুশ বারংবার ঝিলিকের টু-ডু লিস্ট চেক করে তারপর তাকে কাজ দিতে দিচ্ছে। ম্যানেজার অতিষ্ঠ তাতে।
তাদের চেকিং এর কিছুক্ষণের মাঝেই সেখানে একটি পুরুষ এসে হাজির হলো। আইয়ুশ তাকে দেখে ঘড়ির পানে তাকালো। বললো,
— পার্ফেক্ট টাইমিং!
অতঃপর ম্যানেজারের পানে তাকিয়ে তাকে বললো,
— ম্যানেজার, আজ থেকে ও আমার নতুন পিএ৷ ওকে সকল দায়িত্ব বুঝিয়ে দিবেন ঠিকমতো। ইজ ইট ক্লিয়ার?
— ইয়েস স্যার।
লম্বা-চওড়া সুঠাম দেহী পুরুষটি দেখতে বড্ড প্রফেশনাল ধাঁচের। নাম তার কৌশিক, আফিম শাহ কৌশিক! আইয়ুশ তাকে জিজ্ঞেস করে,
— সিভিতে তোমার নামটা যেনো কী ছিলো….
আইয়ুশের শেষকরার পূর্বমূহুর্তেই কৌশিক জবাব দেয় কাঠকাঠ কন্ঠে,
— আফিম শাহ কৌশিক!
— হুমম…আফিম ওরফে একে!
আইয়ুশ আফিমের পানে তাকিয়ে মুচকি হাসে। তার দেখাদেখি কৌশিকও হেসে ওপর-নিচ মাথা নাড়ে!অতঃপর ম্যানেজারের সাথে কৌশিককে নিয়ে যাওয়া হয় তার কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
অফিস আওয়ার শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। অফিস আওয়ার শেষ হতেই ঝিলিক বেরোনোর জন্য পা বাড়ায়। অফিসের সকলেই তখন প্রায় চলে গিয়েছে। এমনকি আইয়ুশও নেই। ঝিলিক নিচে গেলেও তাকে আবারও ফিরে আসতে হয় অফিসে। তার ফোনটা সে ফেলে গিয়েছে কিনা। ঝিলিক ফিরতি লিফট বেয়ে আবারও অফিসে আসে। তখন আশপাশটা সম্পূর্ণ শুনশান। ঝিলিক নিজের ডেস্কেই ফোনখানা পেলো। পেয়েই হাসি ফুটলো মুখে। তবে ফিরে আসার সময়ই বাধলো এক বিপত্তি। হুট করে অফিসের সম্পূর্ণ ইলেক্ট্রিসিটি অফ হয়ে গেলো। হুট করে পুরো অফিসে সে একা হয়ে পড়লো। দু’এক মিনিট বাদেই জেনারেটর আসবে ভেবে ফোনের ফ্লাশ লাইট অন করার আগেই হাতে অচেনা কারও স্পর্শে সে কেঁপে উঠলো। তখনই জেনারটর অন হয়ে গেলো। ঝিলিক তড়িতে আশেপাশে তাকালো। উঁহু! কোথাও কেও নেই। কোথাও না! ঝিলিক ঘাবড়ালো। তবে অফিসে কী কোনো ঘাতক লুকিয়ে? ভয়ে ভয়ে সে নিজের হাতের পানে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। একটা চিরকুট। ঝিলিক তা দেখেই মুঠোবন্দি করে ফেলে হাত। এখন চিরকুটটা দেখা অনুচিত হবে ভেবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো সে। অতঃপর দৃঢ় পায়ে বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। নিচে এসে সে যখন চিরকুটটা দেখবে নাকি দেখবেনা সে চিন্তায় বিভের তখনই সে দেখতে পেলো সামনে দুটো গাড়ি। সাথে তার অতি পরিচিত দু’জন দাঁড়িয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে! তার ভ্রু আপনাআপনি কুঁচকে গেলো। তাদের দেখেই শুধালো,
— তোমরা এখানে কী করছো?
সায়ন মুচকি হেসে এগিয়ে যায় তার পানে। বলে,
— আইয়ুশের সাথে একটা কাজ ছিলো তাই আরকি। তা তুমি এতক্ষণ এখানে?
— একটু লেইট হয়ে গিয়েছিলো তাই আরকি।
আইয়ুশ ঝিলিকের পানে তাকিয়ে বলে,
— গাড়িতে গিয়ে ওঠো।
— গাড়িতে?
ঝিলিক নির্বিকারে বলে।
— হ্যাঁ গাড়িতে। এই শরীরে বাইক চালানোর পারমিশন কে দিয়েছে তোমাকে? মেঝো আব্বু আমাকে তোমার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে। সো, ফাস্ট গাড়িতে গিয়ে বসো।
ঝিলিক হাসে। হাসতে হাসতে পা বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। ব্যঙ্গ করে বলে,
— ইন ইউর ড্রিমস!
বলেই ঝিলিক চলে যায় বাইক নিয়ে। আইয়ুশ তার দিকে তাকিয়ে থাকে রুক্ষ চেহারায়। তা দেখে সায়ন কুটকুটে হাসে। আফসোসের সুর তুলে বলে,
— উফফ! কোথায় যেনো কার হৃদয় ভাঙছে…..
হাসতে হাসতেই গাড়িতে উঠে বসলো। আইয়ুশ একবার ওর দিকে তাকিয়ে নিজেও গাড়িতে উঠে বসলো। সামনে ঝিলিকের বাইক এবং সাথে পেছনে সায়ন আর আইয়ুশ! তিনটি যান্ত্রিক গাড়ি একে অপরের কাছাকাছি। এভাবেই তারা পৌঁছালো মির্জা বাড়িতে পৌঁছালো তিনজনই। ড্রয়িংরুমে তখন ছোটদের আড্ডার আসর। তাদের তিনজনকে ঢুকতে দেখে নির্ঝর এগিয়ে এলো ঝিলিকের পানে। বললো,
— আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছেনা যে তুই বাইকও রাইড করতে পারিস। এখন চাবি দে, প্রিন্সেস!
ঝিলিক কিছু বলার আগেই তোতা বলে,
— মির্জা বাড়ির মেয়ে বলে কথা! মা থাকলে নির্ঘাত বকা খেতে তুমি ভাইয়ু। ঝিলিকও অফিস জয়েন করলো অথচ তোমার কামব্যাক এখনো হলোনা।
বলেই হাসা আরম্ভ করলো। নির্ঝর একবার কোণা চোখে তাকিয়ে শাসায়। ঝিলিক তিয়া আর ঐশীকে আসরে দেখতে না পেয়ে শুধায়,
— তিয়া আপু আর ঐশী আপু কোথায় ছোট ভাইয়ু?
নির্ঝর তোতার থেকে চোখ সরিয়ে ঝিলিকের করা প্রশ্নের উত্তর দিলো,
— তিয়া তো রুমে। কী জানি কী হয়েছে। আজ নাকি ক্লাস বাঙ্ক করেছে। বাড়ি এসে কাওকে কিছু না বলে রুমেই বসে আছে। আর ঐশী মেবি ওর রুমে।
ঝিলিক মাথা নেড়ে ওপরের যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। আইয়ুশও পিছু পিছু ওপরে ওঠে। নির্ঝর আর তোতা আবারও তাদের গল্পে মশগুল হয়। ঝিলিক করিডোর বেয়ে যাওয়ার সময় আইয়ুশের ডাকে থমকায়,
— ঝিলিক!
ঝিলিক কঠোর আদলে ঘাড় ফেরাতেই আইয়ুশ ও কঠিন আদলেই বলে,
— কিছু না!
ঝিলিক নিজের রুমে চলে আসে। রুমে ঢোকা মাত্রই প্যান্টের পকেট থেকে চিরকুটটা নিয়ে খুলে ফেলে তা। কম্পিত হস্তে চিরকুটে আবছা লেখাগুলো পড়তে আরম্ভ করে,
— মরুভূমির বালুচরে হারিয়ে গিয়ে এক ফোঁটা জল ভেবে ছুটছো যার পেছনে তা কী আসলেই তৃষ্ণা নিবারণকারী জল নাকি কোনো মরিচিকা?
শেষ! আর কিছুই নয়। কেবল এটুকুই। ঝিলিকের মস্তিষ্ক হুট করে ভেঙে পড়লো। এসবের মানে কী? কী হচ্ছে এসব তার সাথে?
“কিছু সম্পর্কের কখনো কোনো পরিণতি হয়না;
না-তো হয় পরিপূর্ণ আর না-তো রয় অপরিপূর্ণ!
এই পরিপূর্ণ-অপরিপূর্ণের খেলায় কেবল আমাদের দুঃখ বাড়ে!
কী এমন হতো– যদি যে যাকে চায় সে তাকে পেতো?”
নিজ কক্ষের বেলকনি উদাসীনতায় বসে বিষন্ন ডায়েরির পাতায় নিজের অব্যক্ত অনুভূতি জমা করছে ঐশী। আজ মালিহা বেগম তাকে বিয়ের কথা বলেছে। তবে কী কখনোই তার কল্পপুরুষকে একবার ভালোবাসার কথা জানানো হবেনা? কথাখানা মস্তিষ্কে আসতেই বিষন্নতায় হাসলো সে। বিড়বিড়িয়ে ধিক্কার জানালো নিজেকেই,
obsession vs love part 20
— বললেই কী আমাকে স্থান দিবে তার পাঁজরে?
দিবে না তো! বোকা আমিই তাকে অজান্তে নিজে ভেতর লালন করছি; আমি তার জল্পনাতেও নেই।
ফের ভাবলো,
— তবু কী একবার বলা উচিত হবেনা? হবে তো তাইনা?
দোটনায় ভুগতে লাগলো নারীমন তার।
