Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৩৫

এই অবেলায় পর্ব ৩৫

এই অবেলায় পর্ব ৩৫
সুমনা সাথী

সোনার রবি পূর্ব আকাশে তার রক্তিম আভা ছড়াতে ব্যস্ত। চারিপাশ পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত। প্রকৃতির চোখে আর তন্দ্রার লেশমাত্র নেই। ব্যস্ত শহরের মানুষেরাও নেমে পড়েছে যার যার প্রতিদিনের নিত্যকর্মে। নবনীর চোখের পাতা দুটো আলতো করে খুলে গেল। একটু নড়েচড়ে উঠতেই সে টের পেল। গলার কাছে কার যেন তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। চোখ মেলে উৎসের সন্ধান করতেই ঘুমন্ত দিব্যর মুখটা নজরে এলো। শক্ত বাহুডোরে নবনীকে জড়িয়ে ধরে আছে। গত কয়েকদিনে এই জড়িয়ে থাকাটা দিব্যর একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যদিও বরাবরই সে নবনীর আগে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আজ ব্যতিক্রম দেখে নবনী খানিকটা অদ্ভুত চোখে তাকালো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন আনচান করে উঠল ওর।

আলতো হাতে দিব্যর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। অতঃপর বিছানা ছেড়ে ওঠার উপক্রম করতেই আচমকা আঁচলে একটা টান পড়ল। নবনী সবিস্ময়ে পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখল। ছোট্ট দিয়ার একটা হাত ওর শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে নবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি প্রসারিত হলো। ঝুঁকে গিয়ে ঘুমন্ত দিয়ার নরম গালে একটা চুমু খেল।গতকালের জার্নির ধকল শরীরটার ওপর এখনো ভর করে আছে। তাই আলসেমি কাটাতে নবনী গোসলে ঢুকে পড়ল। সতেজতা নিয়ে সে গোসল সেরে বের হলো। চারপাশটা তখনো ভোরের মায়ায় জড়ানো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো শুকাতে ব্যস্ত নবনী। ঠিক তখনই দিব্যর ঘুম ভাঙল। বিছানায় উঠে বসে সে ঘুম-জড়ানো চোখে তাকালো আয়নার দিকে।।কালো আর সাদার এক অপূর্ব সংমিশ্রণের একটা সুতি শাড়ি জড়িয়েছে নবনী। শাড়িটায় তাকে এতটাই স্নিগ্ধ আর মোহময় লাগছে যে মনে হচ্ছে। শাড়িটা যেন কেবল ওর জন্যই বোনা হয়েছিল। আয়নার প্রতিফলনে নবনী খেয়াল করল দিব্য জেগে উঠেছে। কিন্তু লজ্জায় ও নিজে থেকে কিছু বলতে পারল না। দিব্যর মাথায় তখন কী যেন একটা খেলা করে গেল। সে বিছানা ছেড়ে আলমারির দিকে এগোতে এগোতে বলল,

“গুড মর্নিং। দিয়ার মাম্মা।”
আচমকা এমন সম্বোধনে নবনী সামান্য চমকে উঠল। গালে লাজুক আভা মেখে খুব নিচু গলায় জবাব দিল,
“গুড মর্নিং।”
দিব্যকে এখন বেশ স্বাভাবিকই লাগছে। নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে আবার নিজের কাজে মনোনিবেশ করল। কিন্তু সেই স্বস্তিটুকু দীর্ঘস্থায়ী হলো না। দিব্য ধীর পায়ে নবনীর একদম কাছাকাছি এগিয়ে এল। যখন সে নবনীর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো তখন ওর টনক নড়ল। হাতের হেয়ার ড্রায়ারটা অলক্ষ্যেই থমকে গেল। আচমকা দিব্যর বলিষ্ঠ দুটো হাত শাড়ির পাতলা আবরণ ভেদ করে নবনীর উদর স্পর্শ করতেই সে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। আকস্মিক সেই ছোঁয়ায় হাত থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা প্রায় ছিটকেই পড়ে গেল মেঝেতে। কানের লতিতে দিব্যর উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ার সাথে সাথে ভেসে এল এক নিচু কণ্ঠস্বর,

“চোখ খোলো নবনী। আয়নার দিকে তাকাও। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপাতত আমি রোমান্স করার মুডে নেই।”
নবনী শুকনো ঢোক গিলল। ওর কান দুটো যেন লজ্জায় ঝাঁঝাঁ করে উঠল। গাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল রক্তিম আভা। কাঁপা কাঁপা চোখের পাপড়ি মেলে অবশেষে আয়নার পানে তাকালো। সাথে সাথেই আয়নার প্রতিবিম্বে চোখাচোখি হলো দুজনের। দিব্যর পুরুষালী। গভীর চোখজোড়ায় তখন এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি। সেই তীব্র দৃষ্টি যেন নবনীর ভেতরটা ভেদ করে যাচ্ছে। লজ্জায় থিতু হতে না পেরে নবনী চোখ সরিয়ে নিচের দিকে তাকাল। দিব্য ওর মেলে রাখা আঁচলটা টেনে তুলে কাঁধে বসিয়ে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“এবার দেখো তো। জিনিসটা তোমার পছন্দ হয়েছে কি না?”
নবনীর দৃষ্টি এবার নিজের কোমর বরাবর স্থির হলো। সেখানে ঝিলমিল করছে এক অপূর্ব কোমরবন্ধনী। খাঁটি সোনার তৈরি জিনিসটা খুব বেশি চিকনও নয় আবার অতিরিক্ত মোটাও নয়। নিখুঁত গড়নের নকশাটা দেখতে সত্যিই চমৎকার। নবনী সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে সেদিকে চেয়ে রইল।।ওর নীরবতা দেখে দিব্য খানিকটা নিরাশ হওয়ার ভান করে বলল,

“কী হলো, পছন্দ হয়নি? আমি তো অনেক সময় নিয়ে নিজের পছন্দেই আনলাম। আর আমার পছন্দ বরাবরই সুন্দর।”
নবনী বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু! এটা কখন আনলেন?”
দিব্য আলতো করে নিজের থুতনিটা নবনীর কাঁধে ঠেকালো। এক হাত দিয়ে কোমরের সেই অলংকারটা ছুঁয়ে দিল সে। সেই স্পর্শে নবনীর সর্বাঙ্গে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। নিশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে এল ওর। ঠিক তখনই কানের খুব কাছে প্রতিধ্বনিত হলো দিব্যর গভীর কণ্ঠস্বর,
“সেদিন যখন তুমি আমার সাথে সিরিয়াস ভঙ্গিতে ঝগড়া করে মুখ ফুলিয়ে বসে রইলে। আমি বাড়ি থেকে বের হলাম। তখন থেকেই মাথায় এটা ঘুরছিল। ভাবছিলাম আমার অভিমানী দিয়ার মাম্মার রাগ কীভাবে ভাঙানো যায়। সে তো সহজে রাগ করে না। তাই রাগ ভাঙানোর এমন সুবর্ণ সুযোগ তো বারবার পাওয়া যাবে না। এই সুযোগ আমি কেন মিস করব বলো? তার ওপর আমার বউ শাড়ি পরতে বড্ড ভালোবাসে। আর শাড়ির সাথে এই জিনিসটা খুব ভালো যায়। তারপর…!”

নবনী অস্ফুট গলায় জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”
“ভেবেছিলাম বাসায় ফিরে রাতে উপহারটার সাথে একটু আদর দিয়ে পুরো ব্যাপারটা পুষিয়ে দেব। কিন্তু কপালে থাকলে তো! ফিরে দেখি আমার তেজস্বী বউ বাচ্চা গুটিয়ে সোজা বাপের বাড়ি চলে গেছে। এটা সবসময় পরে থেকো। আশা করি কোনো অসুবিধা হবে না।”
নবনীর অবস্থা তখন পাথরের মূর্তির মতো। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে আছড়ে পড়ছে যে মনে হচ্ছে। এই বুঝি তা বাইরে চলে আসবে। প্রচণ্ড লজ্জায় ওর হাসফাস অবস্থা। তীব্র ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তেই লোকটার চোখের আড়াল হয়ে কোথাও পালিয়ে যেতে। কিন্তু আয়নার প্রতিবিম্বে লোকটা যেভাবে তাকিয়ে আছে। তাতে নবনী চোখ তোলার ন্যূনতম সাহসটুকুও পাচ্ছে না। লজ্জার পাশাপাশি এক তীব্র অপরাধবোধও কাজ করছে মনের ভেতর। কিন্তু এতে নবনীরই বা কী দোষ ছিল? সে চাইলেও এই মুহূর্তে দিব্যকে গুছিয়ে কিছু বলতে পারছে না। কেবল কম্পিত গলায় বলল,

“আই অ্যাম স্যরি। আসলে…!”
দিব্য ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আশ্বস্ত করল, “ইট’স নরমাল নবনী। রিল্যাক্স। এত ছোটখাটো বিষয়ে বারবার স্যরি কেন বলছ?”
নবনী নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি আজকে বের হবেন?”
“হুম, ওই নয়টা নাগাদ।”
“ফিরবেন কবে?”
“সর্বোচ্চ দুদিন লাগতে পারে। এর বেশি নয়।”
“আচ্ছা।”
“তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। আমি আম্মুর সাথে কথা বলে দিয়েছি।”
নবনী কৌতূহলী হয়ে তাকাল, “কী বলেছেন?”
“তোমার পড়াশোনার ব্যাপারে। বাকি কথা আমি ফিরে এসে নাহয় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বলব?”
নবনীর মনের সংশয় কাটল না। সে নিচু স্বরে শুধাল,

“উনি… উনি কি মেনে নিয়েছেন?”
এই পর্যায়ে দিব্য কিছুটা বিব্রতবোধ করল। সে অলেখাকে সত্যিটাই বলেছে। কিন্তু তিনি আদৌ মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছেন কি না। তা বোঝা যায়নি। পুরোটা সময় তিনি অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা নিয়ে চুপচাপ ছিলেন। এরপর অবশ্য দিব্যর আর বিস্তারিত জিজ্ঞেস করার ফুরসত মেলেনি। তাই নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু আড়াল করতে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“এই প্রথমবার দিয়াকে ছেড়ে আমি কোথাও যাচ্ছি। গত তিন বছরে ওকে ছেড়ে একটা রাতও আমি কোথাও কাটাইনি। এর জন্য কাজে অনেক সময় অনেক অসুবিধাও পোহাতে হয়েছে জানো? তবে এবার আমি নিশ্চিন্ত যে ও ওর মাম্মার কাছে আছে। কিন্তু আমি যে কয়দিন থাকব না ততদিন দিয়াকে স্কুলে পাঠানোর দরকার নেই। তোমরা দুজনেই বাড়িতে থেকো ঠিক আছে? আশা করি আমি ফিরে আসার পর সব ঝামেলা মিটে যাবে। নয়তো টেনশনে থাকবো আমি।”

নবনী মৃদু মাথা নাড়ল। তারপর হুট করেই এক অজানা আশঙ্কায় দিব্যর হাতটা ছুঁয়ে বলল,
“শুনুন! একটু তাড়াতাড়ি চলে আসবেন।”
দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মনকাড়া হাসি ফুটে উঠল। নবনীর চোখের দিকে চেয়ে গভীর গলায় বলল,
“তুমি যদি এভাবে আবদার করে বলো। তবে তো আমি আর যেতেই পারব না।”
নবনীর ঠোঁটের কোণ গলে এক চিলতে হাসি বেরিয়ে এলো। দিব্য মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তোমার হাসিটা খুব সুন্দর। তাহলে এত কম হাসো কেন?”
“কেন? আপনার হাসি বুঝি সুন্দর নয়?”
দিব্য মৃদু মাথা নেড়ে বোঝালো। আসলেই সুন্দর নয়। নবনী মুখ বাঁকাল।
“সব ফালতু কথা!”
“সিরিয়াসলি বলছি। আচ্ছা তোমার কি ভালো লাগে?”
নবনী বুঝতে না পেরে শুধাল, “কী?”
“আমাকে! তোমার কি আমাকে সত্যিই ভালো লাগে?”

এবার যেন চরম বিপাকে পড়ল নবনী। এই প্রশ্নের উত্তর কি এভাবে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব? কথায় বলে। মেয়েদের বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না। আর এই লোকটাকে এতভাবে ইশারায় বোঝানোর পরেও সে কিনা এভাবে সরাসরি জানতে চাইছে! নবনী মরে গেলেও বোধহয় এই স্বীকারোক্তি মুখে আনতে পারবে না। অন্তত এখন তো কখনোই নয়। নবনীকে চুপ থাকতে দেখে দিব্য এবার তাড়া দিল,
“জলদি বলো। ফাস্ট! হাতে একদম সময় কম।”
“ইশ! দেখছেন কত দেরি হয়ে যাচ্ছে? আপনি যান তো। চটপট ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি নিচে গিয়ে আপনার ব্রেকফাস্ট রেডি করছি।”
নবনী কৃত্রিম ব্যস্ততা দেখিয়ে ওর বাঁধন থেকে সরতে চাইল। কিন্তু লাভ হলো না। এক চুলও নড়তে পারল না সে। এবার তার নিজের ওপরই বেশ বিরক্তি লাগল। নিজেকে ওর মনে হলো ডাঙায় আটকে থাকা ছটফটে একটা মাছ। যে কিনা ছটফট করে পানিতে ফিরে যেতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। দিব্যর ভেতরে ভেতরে ভীষণ হাসি পাচ্ছিল। তবুও বাইরের গাম্ভীর্যটুকু ধরে রেখে বলল,

“হ্যাঁ, তারপর বলো? প্রসঙ্গ ঘোরাচ্ছ কেন?”
নবনী মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হুট করে বলে উঠল,
“দিয়া! তুমি উঠে গেছ মাম্মা?”
দিয়ার নাম শুনতেই দিব্য চমকে উঠল। সে চট করে নবনীকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আর সেই সুবর্ণ সুযোগে নবনী এক ছুটে দরজার কাছে পৌঁছে গেল। দিব্য তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে হালকা হেসে বলল,
“এটা কিন্তু স্পষ্ট চিটিং নবনী! একটা ছোট কথার উত্তর দিতে এতকিছু?”
নবনীকে আর ঘরে দেখা গেল না। তবে দরজার ওপাশ থেকে ওর খিলখিল হাসির শব্দের সাথে ভেসে এল চপল উত্তর,
“আপনি ফিরে আসুন। তখন নাহয় বলব!”
দিব্য একা একাই হাসল। তারপর মেঝেতে পড়ে থাকা হেয়ার ড্রয়ারটা কুড়িয়ে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল। অতঃপর শিস দিতে দিতে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে।

রান্নাঘরে ঢুকে নবনী দেখলো চারপাশটা একদম শুনশান। কেউ নেই। সে আর দেরি না করে চটপট দিব্যর জন্য কফি বসিয়ে দিল। ফ্রিজ থেকে পাউরুটি বের করল। ঠিক তখনই মৌনিতা রান্নাঘরে প্রবেশ করল। তার সাথে মিলুও এসেছে। নবনীকে সকাল সকাল রান্নাঘরে ব্যস্ত দেখে মৌনিতা অবাক হয়ে বলল,
“একী নবনী। তুমি সকাল সকাল রান্নাঘরে যে? অবশ্য ব্রেকফাস্ট যার বানানোর কথা। সে তো বাড়ি ছেড়ে চলেই গেছে। কী এক অদ্ভুত অবস্থা বলো তো!”
নবনী চুলার আঁচটা কিছুটা কমিয়ে দিয়ে বলল, “আসলে উনি একটু বাইরে যাচ্ছেন। অফিসের জরুরি কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হবেন। তাই ওনার জন্য একটু নাস্তা রেডি করছি।”
মৌনিতা মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা ভাইয়ার কি কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে? নিযানার সাথে আসলে কী নিয়ে এত বড় ঝগড়া হলো। তুমি কিছু জানো?”

মৌনিতা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হয়তো ওই ইরাকে নিয়েই কোনো সমস্যা হয়েছে। ভাইয়াটা আসলেই বড্ড ছেলেমানুষ। এই ব্যাপারে আমি কিন্তু নিযানার কোনো ভুল দেখছি না।”
“নিযানার ভুল কেন থাকবে? কারো কোনো দোষ নেই। সব দোষ তো আমার ছেলেরই! সে তো তখন নাচতে নাচতে গিয়ে বিয়ে করেছিল ওই মেয়েটাকে। আর এই বাড়ির বউদের তো আজকাল অভ্যাসই হয়ে গেছে। পান থেকে চুন খসলেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দেওয়া!”
কথাগুলো বলতে বলতে রান্নাঘরে এসে প্রবেশ করলেন অলেখা। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে মৌনিতা চমকে উঠল। সাথে বেশ লজ্জিত হলো। তবে সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত আর আড়ষ্ট বোধ করল নবনী। অলেখার শেষ বাক্যটি যে তীরের মতো তাকেই বিঁধেছে। সেটা বুঝতে আর কারও বাকি রইল না। রান্নাঘরের থমথমে ভাবটা কাটাতে মৌনিতা আমতা আমতা করে বলল,

“চাচিআম্মা, তুমি এসেছ? তোমাকে এক কাপ চা করে দেব?”
অলেখা মৌনিতার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি মৌনিতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেই চায়ের পাত্র টেনে নিয়ে চুলায় বসালেন। এমন আচরণে মৌনিতার মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। সে অত্যন্ত অসহায় আর অপরাধী চোখে নবনীর দিকে তাকাল। নবনী নিজের ভেতরের কষ্টটা চেপে রেখে চোখের ইশারায় মৌনিতাকে আশ্বস্ত করল। যদিও অলেখার এই অবহেলা আর বাঁকা কথা নবনীর বুকের ভেতরটা ভীষণভাবে মুচড়ে দিচ্ছিল। এরই মধ্যে অলেখা নিজের চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে অত্যন্ত গম্ভীর আর শীতল গলায় প্রশ্ন করলেন,
“তা নবনী। শুনলাম তুমি নাকি আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে চাও?”
অলেখার আকস্মিক প্রশ্নে নবনী ভীষণ আড়ষ্ট বোধ করল। নিচু গলায় জবাব দিল,
“জি, আম্মা।”

অলেখা চায়ের কাপে শেষবার চামচটা নেড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নবনীর দিকে তাকালেন।
“বিয়ের আগে কি তোমাকে এই পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি? নিযানার বিষয় আলাদা। তাকে আমি এই বাড়ির বউয়ের কাতারেই ধরি না। তোমার শ্বশুরের প্রশ্রয়ের কারণে সে এ বাড়িতে টিকে আছে। যদিও আর কতদিন থাকবে তা জানি না। কিন্তু তোমাকে তো আমি মন থেকে এই বাড়ির বড় বউ বলে মেনেছিলাম। যথেষ্ট ভালোবাসাও দিয়েছি। তোমার তো অন্তত এটা মনে রাখা উচিত ছিল যে তোমার একটা মেয়ে আছে। সেই দিক থেকে বিচার করলে তুমি এক বাচ্চার মা। তাই সংসারে তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্যটাও অনেক বেশি।”
অলেখার এমন সরাসরি আর কঠোর কথায় নবনী যেন মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলল। কী বলা উচিত আর কীভাবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া দরকার। তা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। পাশে দাঁড়িয়ে মৌনিতা নবনীর এই অসহায় অবস্থাটা খুব ভালো করেই টের পেল। অলেখাকে আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রাগী মনে হচ্ছে। সাধারণত তিনি এত কঠোর ভাষায় কথা বলেন না। তবুও নিজের ভয়টুকু একপাশে ঠেলে মৌনিতা আমতা আমতা করে বলল,

“চাচি, আজকাল তো বাচ্চা হওয়ার পরেও অনেকেই নতুন করে পড়াশোনা করে। মানিয়ে নেয়…!”
মৌনিতার কথা শেষ হওয়ার আগেই অলেখা চরম অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠের ঝাঁঝ যেন আরও এককাঠি বেড়ে গেল,
“তুমি এ কথা বলছ মৌনিতা? তাহলে এক কাজ করো। তুমিও বরং গিয়ে আবার কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে যাও! আমরা তো বাড়িতে আছিই। সংসার সামলানোর বয়স তো এখন আমাদেরই। তাই না?”
মৌনিতা আহত গলায় বলল, “আমি… আমি ঠিক তা বলতে চাইনি চাচিআম্মা।”
“তুমি কী বলতে চেয়েছ তা তো আমি জানি না মৌনিতা। তবে এই সাজানো সংসারটা যে এবার পুরোপুরি উচ্ছন্নে যাবে এতটুকু আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি। তুমি নিজে কেন কথা বলছ না নবনী? তোমার কি ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও অবশিষ্ট নেই? বাড়িতে এমনিতেই নানারকম ঝগড়াঝাঁটি আর অশান্তি লেগেই আছে। এর মধ্যে তুমি কারো পরোয়া না করে একা একা রাতের বেলা ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে? অন্তত আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজনটুকুও মনে করলে না?”
নবনী চট করে উনার দিকে তাকাল। নিজের অপরাধ অনুধাবন করে সে অপরাধী মুখে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল,
“আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত আম্মা। আসলে তখন আমার মাথাটা একদম ঠিক ছিল না।”
নবনীর মুখে দুঃখপ্রকাশের কথা শুনে অলেখার ভেতরের কঠোরতা কিছুটা নরম হলো। তবে গম্ভীর ভাবটা কাটল না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“মাথা ঠিক ছিল না বললেই কি একটা কথা হলো? নবনী, তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী আর শক্ত স্বভাবের মেয়ে। একটা কথা আজ কান খুলে শুনে রাখো। যেকোনো পরিস্থিতিই আসুক না কেন। কোনো অবস্থাতেই স্বামীর বাড়ি থেকে এভাবে রাগ করে বেরিয়ে যাবে না। এটা তো তোমার নিজেরই বাড়ি। তুমি কেন অন্যের ওপর রাগ করে নিজের অধিকার ছেড়ে চলে যাবে? এই বড় বাড়িতে কতগুলো ঘর আছে! খুব বেশি অভিমান হলে প্রয়োজন হলে অন্য একটা ঘরে গিয়ে একরাত একা থাকবে। পরের দিন ঠান্ডা মাথায় সব মিটিয়ে নিলেই হলো। আশা করি আমার কথার মূল ভাবটা তুমি বুঝতে পেরেছ। না বুঝলে বোঝার চেষ্টা করো। নয়তো ক্ষতি তোমার।”
নবনী শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনিতার মুখটা ততক্ষণে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে। মৌনিতার এই সরলতা দেখে অলেখা মনে মনে হাসলেন। এই নরম মনের মেয়েটাকে তিনি অসম্ভব স্নেহ করেন। নিজের লাভ-ক্ষতির কোনো হিসাবই কোনোদিন মেলাতে শিখল না ও। অলেখা অবশ্য বাইরে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখেই বললেন,

“মৌনিতা, আজকে সকালের নাস্তায় একটু ভুনা খিচুড়ি করো তো। আমার কেন যেন খুব খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করছে। তুমি নিজেই রান্নাটা করো।”
মৌনিতার থমথমে মুখটা নিমেষেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে বলল,
“আমি এখনই চাল-ডাল ধুয়ে বসাচ্ছি চাচিআম্মা! ভাইয়াও তো খিচুড়ি আর মাংস খেতে বড্ড পছন্দ করত…!”
কথাটার শেষাংশে এসে মৌনিতার কণ্ঠটা হুট করেই ভীষণ আহত শোনাল। মৌনিতার মুখে কলরবের কথা শুনে অলেখার বুকটাও এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল। যদিও তিনি খবর পেয়েছেন যে কলরব আপাতত বন্ধুর সাথে আছে। তবুও একজন মায়ের অবাধ্য মন তো! সবসময় একটা অজানা চিন্তা আর আশঙ্কা যেন তাড়া করে ফেরে তাকে। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রান্নাঘর থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন।

দিব্য যখন গোসল সেরে বাথরুম থেকে বের হলো। দিয়া তখন সবেমাত্র বিছানায় উঠে বসেছে। এক ছোট্ট হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে সে ঘুম-জড়ানো চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছিল। দিব্য হাতের তোয়ালেটা একপাশে রেখে দ্রুত পায়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেল। দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ওর নরম গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“গুড মর্নিং, প্রিন্সেস।”
দিয়া পাপ্পার কোলে আসতেই খিলখিল করে হেসে উঠল। আদুরে গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে বলল,
“গুড মর্নিং পাপ্পা! ইউ লুকিং আ হিরো।”
মেয়ের মুখে এমন পাকা পাকা কথা শুনে দিব্য বড় বড় চোখ করে তাকাল। কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে বলল,
“তাই নাকি? দিয়ার তো তাহলে বড্ড মজা! দিয়ার পাপ্পা একটা আস্ত হিরো।”
দিয়া খুব তৃপ্তি নিয়ে দ্রুত মাথা নাড়ল। দিব্য এবার মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এবার আমি তোমাকে কিছু ইম্পর্টেন্ট কথা বলব।ওকে? খুব মন দিয়ে শোনো। পাপ্পা একটা জরুরি কাজে একটু দূরে যাচ্ছে। ফিরতে হয়তো একটু লেট হবে। এই কয়টা দিন তুমি তোমার মাম্মার কাছে থাকবে। আমার দিয়া তো এমনিতেই খুব গুড গার্ল। একদম দুষ্টুমি করে না। তাও এই কয়দিন দিয়া আরও লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবে কেমন?”
দিয়া দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, “ওকে, দিয়া তাই করবে।”

দিব্য আবারও মেয়ের গালে একটা স্নেহের পরশ এঁকে দিল,
“আর হ্যাঁ, মাম্মার খেয়াল রাখবে কিন্তু। ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে। তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসবে তো?”
“হ্যাঁ, খুব তাড়াতাড়ি চলে আসব।”
“আমার জন্য একটা বড় ডল নিয়ে আসবে পাপ্পা?”
দিব্য হেসে ফেলল, “আমার মায়ের একটা ডল চাই? ওকে। পাপ্পা অবশ্যই নিয়ে আসবে।”
দরজার ওপাশ থেকে প্রশ্ন ভেসে এলো, “কী নিয়ে আসার কথা হচ্ছে শুনি?”
হাতে নাস্তার প্লেট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল নবনী। তার সজাগ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল খুনসুটিতে মত্ত বাপ-মেয়ের দিকে। নবনীকে দেখেই দিয়া বেশ গম্ভীর চালচলন করে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“মাম্মা, পাপ্পা তো কাজে চলে যাবে। তুমি কিন্তু এই কয়দিন কোনো দুষ্টুমি কোরো না। ঠিক আছে? একদম লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো কেমন?”

নবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সেই সাথে হেসে ফেলল দিব্যও। নবনী এগিয়ে গিয়ে দিব্যর কোল থেকে দিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিল। ওর নরম গালে চুমু খেয়ে বলল,
“ওকে বাবা। দিয়া যখন আছে তখন মাম্মা আর একদম দুষ্টুমি করবে না। আর মাম্মা যদি কোনো ভুল করে। দিয়া তাহলে মাম্মাকে শাসন করে দেবে কেমন? এবার আপনি নাস্তাটা করে নিন।”
দিব্য বিছানার একপাশে বসল। নবনী দিয়াকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ভালো করে হাত-মুখ ধুইয়ে। ব্রাশ করিয়ে দিল। সেই ফাঁকে দিব্যর সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। সে এখন যাওয়ার জন্য প্রায় তৈরি। একটা ছোট স্যুটকেসে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত। নবনী দিয়াকে বিছানায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে দিব্যর গোছগাছের কাজে কিছুটা সাহায্য করতে লাগল। দিব্য আলমারি থেকে তার ফরমাল কোটটা হাতে তুলে নিয়ে হাতঘড়িতে সময় দেখল।
“আমি তাহলে এবার বের হলাম। তোমরা দুজন সাবধানে থেকো। দিয়া মাম্মা, পাপ্পাকে একটু আদর দিয়ে দাও তো।”
দিয়া সানন্দে বিছানার ওপর দিয়ে এগিয়ে এসে দিব্যর গালে আর কপালে টুকটুক করে কয়েকটা চুমু খেল। দিব্য মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে পরম আদরে কিছুক্ষণ ধরে রাখল। অতঃপর ওকে আবার নবনীর কোলে ফিরিয়ে দিল। এবার দিব্য কিছুটা ঝুঁকে এসে নবনীর ললাটে তার উষ্ণ ঠোঁট দুটো ছোঁয়ালো। এক অজানা আবেশে নবনীর চোখের পাতা দুটো বুজে এল। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন একটা ওলটপালট করা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ওর। দিব্য কি তবে নবনীর ভেতরের সেই অস্থিরতাটুকু টের পেয়ে গেল? হয়তো পেল। আর তাই তো এই আলতো স্পর্শে এক নীরব সান্ত্বনা দিয়ে গেল সে। দিব্য খানিকটা সরে আসতেই নবনী বুজে থাকা চোখ মেলে তাকাল। খুব নিচু কণ্ঠে বলল,

“খুব সাবধানে যাবেন।”
দিব্যর ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসিটা ফুটে উঠল। “আল্লাহ হাফেজ মিসেস তালুকদার। বাই মাম্মা!”
দিয়া হাসিমুখে হাত নেড়ে পাপ্পাকে বিদায় জানাল। দিব্য স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নবনী দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় অশ্রুর এক পাতলা আবরণে চারপাশটা ঝাপসা হয়ে এল আর সেই ঝাপসা দৃষ্টি সীমানার ওপারে মিলিয়ে গেল দিব্যর অবয়ব।

এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না,
শুধু সুখ চলে যায়।
এমনি মায়ার ছলনা।
এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়।
তাই কেঁদে কাটে নিশি, তাই দহে প্রাণ,
তাই মান অভিমান,
তাই এত হায় হায়।
নেপথ্যে বাজতে থাকা রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিটি তালের সাথে তাল মিলিয়ে এক অপূর্ব ছন্দময় আবেশে শরীর দুলিয়ে নেচে চলেছে এক রমণী। পরনে তার সাদা স্কার্ট আর কালো টি-শার্ট। দু-পায়ে বাঁধা ঘুঙুরগুলো প্রতিটি পদক্ষেপে ঝনঝন শব্দে নূপুরের নিক্বণ তুলছে। পিঠময় ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো নাচের গতিতে অবাধ্য ঢেউয়ের মতো উড়ছে চারিপাশে। অতি নিপুণ আর দক্ষ কায়দায় সে শরীরী মুদ্রায় ফুটিয়ে তুলছে গানের অন্তর্দাহ। মনের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অব্যক্ত যন্ত্রণা আর ভার বোধহয় আজ সে এই নাচের মাধ্যমেই ধুলোয় লুটিয়ে দিতে চাইছে। কুহু দরজার গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ আগে। সে যেন এক জাদুমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। নিযানার এই রূপ, এই নিখুঁত নৃত্যশৈলী তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে সে অত্যন্ত কম্পিত গলায় ডাকল,

“নিযানা!”
চেনা কণ্ঠের আকুল ডাকে নিযানার নাচের ছন্দে আকস্মিক ছেদ পড়ল। সে নিজের ঘূর্ণন থামিয়ে দরজার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। ক্লান্ত মুখের অবয়বে এক মুহুর্তে চমৎকার, স্নিগ্ধ একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল সে। বেশ সহজ গলায় বলল,
“তুই এসেছিস কুহু? আমি এতক্ষণ তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ভেতরে আয়।”
কুহু ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এল। মাঝারি আকারের ঘরটা একদম ফাঁকা। আসবাবের কোনো বাহুল্য নেই। এটা মূলত নিযানার একান্ত নিজস্ব নাচের ঘর। যেখানে সে নিজের মনের সাথে কথা বলে। অনেক ছোটবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক নৃত্য শিখেছিল সে। আজ যেন সেই পুরনো অভ্যাসটাই তার একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছে। ঘরের এক কোণে রাখা একটা সোফার সামনে একটা ছোট টেবিল। নিযানা টেবিল থেকে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে তৃষ্ণার্ত গলায় খানিকটা পানি খেল। অতঃপর বোতলটা নামিয়ে রেখে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। প্রবল শারীরিক পরিশ্রমে তার বুকটা তখনো ওঠানামা করছে। চোখে-মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। কুহুর দিকে তাকিয়ে সে ক্লান্ত হেসেই বলল,
“আয় না। ওভাবে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বস এখানে।”
কুহু আর দ্বিধা না করে ওর পাশে গিয়ে বসল। উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,
“তোর ফোন, ল্যাপটপ যা যা আনতে বলেছিলি। সব নিয়ে এসেছি। কিন্তু নিযানা! তুই কি আর সত্যিই ওই বাড়িতে ফিরে যাবি না?”

নিযানা উত্তর দিতে এক মুহূর্তও সময় নিল না। ঠোঁটের কোণে হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেই অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি আর কোনোদিন ওই বাড়িতে ফিরব না। যেখানে ফিরিয়ে নেওয়ার নূন্যতম তাগিদ বা ব্যাকুলতাটুকু নেই। সেখানে জোর করে অধিকার ফলাতে যাব কেন বলতে পারিস? তোর ভাই আমাকে বড্ড সস্তা ভেবে ফেলেছে। যে মানুষটা আমার বুকে মাথা রেখে কান্না করে শান্ত হতো। পরক্ষণেই সে আমার সেই বুকেই সবচেয়ে ধারালো ছুরিটা বসিয়ে দিল!”
কুহুকে থমথমে মুখে অপরাধীর মতো চেয়ে থাকতে দেখে আবার একটু হাসল নিযানা। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। কৌতুকের সুরে বলল,
“কী রে, নিজের আপন ভাইয়ের নামে এতসব আজেবাজে কথা বলছি বলে খারাপ লাগছে তোর?”
কুহু মাথা নিচু করে অত্যন্ত ভারী গলায় বলল, “আব্বু কাল রাতে ভাইয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। যতক্ষণ না তুই ওই বাড়িতে পা রাখবি। ততক্ষণ ভাইয়াও ও বাড়িতে ফিরতে পারবে না।”
নিযানা চমকাল না। তবে সামান্য একটু অবাক হলো বটে। পরক্ষণেই নিজের মুখের ভাব সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করে নির্লিপ্ত গলায় বলল,

“তাহলে তোর আব্বুকে বলিস। ছেলেকে যেন সে আজীবন ওই বাড়ির বাইরেই রেখে দেয়।”
“নিযানা, প্লিজ এমন করিস না। ভাইয়া কাল রাতেও বলছিল। পুরো ব্যাপারটা নাকি একটা মস্ত বড় ভুল বোঝাবুঝি। তার কোনো ভুল নেই।”
“তোর ভাই ঘরে নিজের বিবাহিতা বউকে বসিয়ে রেখে প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে গোপনে দেখা করে বেড়ায়। এটাও ভুল বোঝাবুঝি? এটা শুধু ভুল? অন্যায় নয়?”
কথাটা বলতে গিয়ে নিযানার এতক্ষণের শক্ত করে ধরে রাখা বাঁধটা যেন কোথাও একটা আলগা হয়ে গেল। এই প্রথম ওর কণ্ঠস্বরটা যন্ত্রণায় সামান্য কেঁপে উঠল। চোখের কোণটা এক মুহূর্তের জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“তোর ভাই বরাবরই এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন। তবুও আমি নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম ওর সাথে মানিয়ে নিতে। বল, করিনি? অতীতে আমি কেমন ছিলাম আর বিয়ের পর ওর জন্য কী হয়ে গেছি! নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময়টুকু পর্যন্ত আমার ছিল না। যে মেয়ে রঙ বেরঙের নানান ডিজাইনে নখ রাঙাতে ভালোবাসত। সে শুধু এই সংসারটা টিকিয়ে রাখবে বলে নিজের হাতের সমস্ত নেলপলিশ অব্দি তুলে ফেলেছিল। আমি রান্না করেছি। পড়াশোনা বাদ দিয়ে ইউটিউবে একের পর এক রান্নার টিউটোরিয়াল দেখেগেছি। আর বিনিময়ে এতদিনে কলরব শুধু ভুলই করে গেছে। প্রতিনিয়ত আমাকে অপমান করে গেছে। আমি নিজের বাবা-মায়ের ওপর অভিমান করে ওর করা সব অন্যায় মুখ বুঁজে সয়ে গেছি। এই অব্দি তাও মানা যায়। কিন্তু ও এখনো অন্য এক নারীকে মনে মনে পুষে রাখে। হয়তো আমার অগোচরে তাকে স্পর্শও করে! আমাদের এই পবিত্র সম্পর্কের কোনো মূল্যই ওর কাছে নেই।”
কুহু এবার আক্ষরিক অর্থেই পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। নিযানা ভেতরের এত বড় ঝড়টা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে শান্ত গলায় বলে গেল। ওর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও গড়িয়ে পড়ল না। আসলে কাঁদতে কাঁদতে চোখের সব জল বুঝি ওর অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। আর কতই বা কাঁদবে একটা মানুষ? কুহুর বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল বোধহয়। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নিযানার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আই অ্যাম সো স্যরি বেবি! আমি সত্যি এর কিছুই জানতাম না। আমি তোদের মাঝখানের দূরত্বটা দেখছিলাম ঠিকই কিন্তু ভাইয়া যে এতটা নিচ হয়ে আড়ালে এসব করবে। তা আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
নিযানা আলতো করে একটু হাসল। কুহুর চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“দূর বোকা! তুই কাঁদছিস কেন?”
“সবাই মিলে তোর জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দিল। আর আমি কাঁদব না?”
নিযানা কুহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“বিশ্বাস কর। আমার এখন আর বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না। ওই রকম একটা দমবন্ধ করা অসুস্থ সম্পর্কের বোঝা সারাজীবন বয়ে বেড়ানোর চেয়ে। গায়ে একটা ‘ডিভোর্সি’ তকমা লাগিয়ে নেওয়া অনেক ভালো। কাল রাতে মাম্মা আমার ঘরে এসেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল। তার নাকি মনে হচ্ছে সে নিজের মেয়েকে আর চিনতেই পারছে না। সে আমার সাথে যা যা করেছে। সে সবের জন্য মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। বলল, এখনো নাকি সময় আছে সবকিছু শুধরে নেওয়ার। তাই আম্মু নিজে থেকেই চায়। আমি যেন আর কোনোদিন ওই নরকে ফিরে না যাই। এই নিয়ে হয়তো আব্বুর সাথেও ওনার তুমুল ঝগড়া হয়েছে। আব্বু সব দোষ আম্মুর ওপর চাপাতে চেয়েছে। তাই আম্মু এখন সবটা নিজের মতো করে ঠিক করতে চায়। এখন অবশ্য কার কী যায় আসে তাতে!”

কুহু নিযানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মুখ দিয়ে বলাটা যত সহজ। বাস্তবে কি এসব এত সহজ রে? আমি জানি, ভেতরে ভেতরে তোর কতটা কষ্ট হচ্ছে।”
নিযানা কিছুক্ষণ নিস্পৃহ চোখে জানালার বাইরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমিও ভেবেছিলাম আমার খুব কষ্ট হবে। কিন্তু আশ্চর্য দেখ। এখন আর কিছুই ফিল হচ্ছে না! প্রথম প্রথম তোর ভাইয়ের জন্য খুব মায়া হতো। আর এখন ওর কথা ভাবলেই ভেতর থেকে একটা তীব্র ঘৃণা উথলে ওঠে। আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি কুহু। এবার আমি নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করব। এইচএসসি পরীক্ষাটা শেষ করেই আমি এই দেশ ছেড়ে চলে যাব। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে কুহু নিজের হাতের মুঠোয় রাখা মোবাইল ফোনের রানিং কলটা অত্যন্ত সন্তর্পণে কেটে দিল। নিযানা যেন বিন্দুমাত্র টের না পায়। সেভাবেই সে কাজটা সারল। কিন্তু এতক্ষণ যে মেয়েটি পাথরের মতো শক্ত হয়ে সমস্ত কথা বলে যাচ্ছিল। আচমকাই তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। নিযানা হুট করেই কুহুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এতক্ষণের জমানো কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। কান্নার তোড়ে কাঁপতে কাঁপতে সে কেবল একটা কথাই বারবার বলতে লাগল,

“কলরব কেন আমাকে এভাবে ঠকাল রে? ও আমাকে ভালো না-ই বাসতে পারত কিন্তু একটা মানুষ হিসেবে তো ন্যূনতম সম্মানটুকু করতে পারত! আমি তো ওর অতীতের সবটা জেনে। ওর সব খামতি মেনেই ওকে আপন করেছিলাম। ও কেন পারল না আমার প্রতি একটুখানি সৎ থাকতে?এতটুকু তো করতেই পারতো৷”
ওপাশে কলটা কেটে যাওয়ার পর। কলরব নিজের হাতের ফোনটা ধরে বহুক্ষণ নিথর হয়ে বসে রইল। আজ সকাল থেকেই সে নিযানার ফোনে হন্যে হয়ে কল করে যাচ্ছিল কিন্তু কোনোভাবেই ওকে পাচ্ছিল না। নিরুপায় হয়ে সে কুহুকে কল করে এবং কুহুকে অনুরোধ করে। সে যেন ফোনটা চালু রেখেই নিযানার সাথে কথা বলে। কলরব শুধু শুনতে চেয়েছিল নিযানা ঠিক কী বলতে চায়। ওর মনে কী চলছে। ও ভেবেছিল নিযানার ক্ষোভের কথাগুলো শুনে সে নিজে গিয়ে ওর সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নেবে। কিন্তু নিযানার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি ধারালো শব্দ শোনার পর। কলরবের মনে হলো সে যেন আসলেই এক মস্ত বড় অপরাধী। নিজের আয়নার সামনে দাঁড়ানো অবয়বটাকে তার বড্ড নোংরা আর কুৎসিত মনে হতে লাগল। অতীতে কলরব নিজের মুখে বহুবার নিজেকে ‘খারাপ ছেলে’ বলে দাবি করেছে কিন্তু তখন কখনো তার মনে কোনো অনুশোচনা জাগেনি। নিজেকে কখনো এতটা ছোট মনে হয়নি। কিন্তু আজ হচ্ছে। এক তীব্র অপরাধবোধে নিজের অস্তিত্বটাই যেন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে তার। বিগত কয়েকদিনে নিযানার সাথে করা নিজের প্রতিটা রূঢ় আচরণ। প্রতিটা অবহেলা আর অপমানের স্মৃতি এক এক করে কলরবের চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। সে সত্যিই কি এক মস্ত বড় অন্যায় করে ফেলেছে? কলরব তখনো বিছানার এককোণে পাথরের মতো থমথমে মুখ করে বসে ছিল। ওর এই অস্বাভাবিক স্তব্ধতা দেখে পাশে থাকা অনন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। ওঁর কাঁধে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে কিছুটা চিন্তিত গলায় শুধালো,

“কী রে কলরব? কোন দুনিয়ায় হারিয়ে গেলি হুট করে? কার ফোন এসেছিল?”
কলরবের এতক্ষণে সংবিত ফিরল। তবে অনন্তকে সে কিছু না বলে হুট করেই এড়িয়ে গেল। মনের ভেতর জমে থাকা তীব্র উত্তেজনা নিয়ে সে পুনরায় কুহুকে কল করল। ওপাশে কুহুর ফোনের স্ক্রিনে ‘ভাইয়া’ নামটা ভেসে উঠতেই নিযানা পলকের মধ্যে চুপ হয়ে গেল। ওর কান্নার বেগ যেন এক মুহুর্তেই স্তব্ধতায় রূপ নিল। কুহু কাঁপতে থাকা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কলরবের চড়া ও অস্থির কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ফোনটা ওকে দে।”
কুহু একবার নিযানার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দ্বিধামিশ্রিত গলায় বলল,
“ও… ও তোমার সাথে কোনো কথা বলতে চায় না ভাইয়া।”
কলরব জেদী গলায় বলল, “ওর চাওয়া-না চাওয়া দিয়ে আমার কিচ্ছু যায় আসে না! আমি কথা বলতে চাই। তুই এক্ষুণি ফোনটা ওকে দে। ও নিজের মনে কী ভেবেছে টা কী?’
কুহু নিরুপায় হয়ে নিযানার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তোর সাথে কথা বলতে চাইছে। বলবি একটা বার?”
নিযানা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “আমার সাথে তো তার বলার বা শোনার কিছুই বাকি নেই কুহু। তুই ফোনটা কেটে রেখে দে। বিগত দুটো দিন যখন একটা বারও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি আজ হঠাৎ কিসের এত দরকার উথলে উঠল?”

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কুহু আর কোনো উপায় না পেয়ে ফোনটা লাউড স্পিকারে দিয়ে দিল। সাথে সাথেই ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো কলরবের তেজী, রাগান্বিত গলা।
“চড়িয়ে একদম গাল লাল করে দেব তোর! বেশি বাড়াবাড়ি করলে তুলে একটা আছাড় দেব তখন সব পাকনামি এক মিনিটে ভালো হয়ে যাবে। বেয়াদব কোথাকার! এই, তুই নিজেকে কী ভাবিস বল তো? তোকে আমি ডিভোর্স দিতে চাই। ঠিক আছে। কিন্তু তোর এত বড় সাহস হয় কী করে যে তুই আমার চরিত্রে আঙুল তুলিস? আমি প রকীয়া করি? এই নোংরা অপবাদ তুই দিলি আমাকে? তোকে নিজের জীবনে জড়ানোর আগেও আমি অন্য কাউকে ছুঁইনি আর তোকে ছোঁয়ার পরেও না! তুই এতটা জ ঘন্য একটা মিথ্যে দোষারোপ আমার ওপর চাপিয়ে আমাকে ডিভোর্স দিতে চাস?”

স্বামী-স্ত্রীর এই চরম তিক্ত ঝগড়ার মাঝে নিজেকে বড্ড অপ্রস্তুত আর অনধিকার প্রবেশকারী মনে হলো কুহুর। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সমীচীন মনে করল না। নিযানার হাতে ফোনটা জোর করে ধরিয়ে দিয়ে সে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিযানা ফোনটা শক্ত করে মুঠোয় পুরে নিল। এতক্ষণের স্তব্ধতা ভেঙে তার কণ্ঠ থেকেও এবার আগুন ঝরতে লাগল। ঝাঁঝালো গলায় সে চেঁচিয়ে বলল,
“একদম চিৎকার করে আমার সাথে কথা বলবে না বলে দিচ্ছি! তুই আমাকে বে য়াদব বলছিস? তুই নিজে একটা আস্ত অ ভদ্র, অ শালীন মানুষ! এখন এসে নিজের দোষ ঢাকতে। নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিস?”
ওপাশে কলরব আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে গেল। নিযানার মুখ থেকে ‘তুই’ সম্বোধন শুনে সে এতটাই স্তম্ভিত হলো যে। এক মুহূর্তের জন্য ফোনটা কান থেকে সরিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই বিস্ময় আর ক্ষোভে চিৎকার করে বলল,

“তুই… তুই আমাকে তুই-তুকারি করছিস? বেয়াদব কোথাকার! তোর ন্যূনতম ভদ্রতাবোধও কি ধুলোয় মিশে গেছে? তুই আমার সাথে এই ভাষায় কীভাবে কথা বলছিস?”
নিযানা রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোমার থেকেই তো শিখেছি! বেশ করেছি বলেছি। একশো বার বলব। আমাকে আর বোকা বানাতে এসো না। তোমার ওই চালাকি আমি ধরে ফেলেছি।”
“তুই আদতে একটা আস্ত নির্বোধ আর বোকা! তোকে নতুন করে বোকা বানানোর কোনো প্রয়োজন আমার নেই। তুই আজকেই এই মুহূর্তে বাড়ি ফেরত আসবি। কুহুর সাথেই আসবি।”
কলরবের এই কথায় নিযানার ভেতরের রাগের আগুনকে যেন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। সে তীব্র কটাক্ষের সুরে বলল,
“নিজের বোধবুদ্ধি কি পুরোপুরি খুইয়ে বসে আছ? নাকি মাথায় অন্য কোনো সমস্যা হয়েছে? আমি তোমার ওই নরকে ফিরে যাব? একটা আস্ত চরিত্রহীন মানুষ তুমি! আমি অনেক সহ্য করেছি তোমাকে আর একটা দিনও নয়। জাহান্নামে যাও তুমি! আমার শুধু ডিভোর্স লাগবে। ভালোয় ভালোয় সই করে দিয়ে দিও।”

কলরব হাসল, “ডিভোর্স লাগবে তাই না? দেব না! এভাবে তো তোকে আমি একদমই ডিভোর্স দেব না। কি করে নিবি? যে অন্যায় আমি কোনোদিন করিনি তার দোষ আমি নিজের ঘাড়ে কেন মেনে নেব? তুই আমাকে চরিত্রহীন বলছিস? তোর কাছে কোনো প্রমাণ আছে এর? কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তুই এত বড় কথা বলছিস?”
“প্রমাণ করার দায় হয়তো বাইরের লোকের কাছে থাকে কিন্তু আমি তো নিজের চোখ দিয়ে জানি তুই কতটা জঘন্য আর নিচ! এত কিছুর পরেও তোর মতো মানুষের এখনো এভাবে গলাবাজি করতে লজ্জা করে না?”
কলরব গর্জে উঠল, “খবরদার নিযানা! যদি আর একটা বারও মুখ দিয়ে তুই-তুকারি করেছিস তবে কিন্তু আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না! এটা কোন ধরনের ব্যবহার হ্যাঁ? তোর কি মাথা খারাপ হয়েগেছে?”
“কী করবে শুনি? তুমি নিজেও তো আমাকে এতক্ষণ ধরে তুই-তুকারি করছো! সবসময় করো। মিনিমাম রেসপেক্ট করো না। আমি এইভাবেই আজকের পর কথা বলবো। কি করবে শুনি?”
“আমি কী করতে পারি সেটা তোকে পরে বুঝিয়ে দেব। আপাতত কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা বাড়ি ফেরত আয়।”
“কক্ষনো না! আমি আর ওই বাড়িতে পা-ও রাখব না। দেখি তুমি কী করতে পারো!”

“খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি!”
“হলে হবে। আমার কিচ্ছু যায় আসে না!”
নিযানা আর নতুন কোনো বাক্য ব্যয় করার সুযোগই পেল না। ওপাশ থেকে ঝটকা মেরে লাইনটা কেটে দিল কলরব। রাগের চরম মাথায় পৌঁছে নিযানা হাতের ফোনটা মেঝেতে আছাড় মারতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। কারণ ওটা ওর নিজের নয়। কুহুর ফোন। তীব্র আক্রোশে সে ফোনটা সোফার এক কোণায় ছুঁড়ে মারল। তারপর দুই হাতের তালু দিয়ে নিজের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। ছেলেটা কতটা অহংকারী, কতটা বেয়াদব! নিজের করা অন্যায়ের জন্য ন্যূনতম কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা তো নেই-ই। উল্টো সিংহভাগ গলাবাজি করে গেল। ওপাশে কলটা কেটেই কলরব নিজের ফোনটা সজাগ আছাড়ে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্ত আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেল। কলরবের এমন উগ্র রূপ দেখে। পরমুহূর্তেই গর্জে উঠল,
“শালা! তোর না নিজের ভুল স্বীকার করে ওর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল? তুই ক্ষমা চাওয়া তো দূর। উল্টো ওর সাথে এভাবে ঝগড়া করলি? আমার সত্যি এখন ইচ্ছে করছে তোকে নিজের হাতে খু ন করে দিতে!”
কলরব এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

“বেশ করেছি। একশো বার করবো! ও কোনো ভালো কথার যোগ্যই না। ওই মেয়ের সাথে শান্তভাবে কথা বলতে গেলেই মাথা গরম হয়ে যায়। ঝগড়া লেগে যায়। ও আমাকে এত বড় বড় কথা বলল? আমাকে চরিত্রহীনের অপবাদ দিল? কীভাবে মুখ দিয়ে এই কথা বলতে পারল ও? আমি তো বিয়ের পর ইরার মুখটাও একটা বারের বেশি দেখিনি! আর ও? ও নিজে তো কায়েফের কাঁধে মাথা রেখে বসেছিল! ওর শার্ট গায়ে জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছিল। আমি কি তখন কিছু বলেছি? আমি তো…!”
বলতে বলতে হুট করেই কলরব থেমে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্তর চরম বিস্ময় আর থমথমে চাউনির দিকে তাকাতেই ওর মুখের কথা যেন গলায় আটকে গেল। রাগের মাথায় আবেগের তোড়ে সে নিজের অজান্তেই কিসব বলে যাচ্ছে! অনন্ত অবিশ্বাস্য চোখে ওর দিকে তাকিয়ে তীব্র কণ্ঠে শুধাল,

“কী বললি তুই? কীসব উল্টোপাল্টা বকছিস তুই?”
কলরব ভীষণ অপ্রস্তুত আর বিব্রতবোধ করল। খাট থেকে নেমে হনহন করে ঘরের বাইরে চলে যেতে নিলেই অনন্ত পেছন থেকে কড়া গলায় ডাকল,
“কই যাচ্ছিস তুই এখন?”
দরজার ওপাশ থেকে কলরবের ক্ষুব্ধ উত্তর ভেসে এলো,
“জাহান্নামে যাচ্ছি!”

দিব্য অনেকটা যাত্রা শেষে হোটেলে পৌঁছেই দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল। অসীমও সাথে এসেছে সাথে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ করেই ওরা রওনা হলো শহরের উপকণ্ঠে নির্মাণাধীন একটি বিশাল বহুতল ভবনের দিকে। এখানে মূলত একটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি এবং সেই সাথে একটি বৃহৎ ওষুধ তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হবে। বিশাল এই প্রজেক্টের কাজ পুরোদমে চলমান ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই শ্রমিকরা নাকি কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আজ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে। দাবিদাওয়া পূরণ না হলে তারা আর কাজ করবে না। ভেতরের জটিলতা ঠিক কোথায়। তা খতিয়ে দেখতেই দিব্য আর অসীম এখন ভবনের একটি দীর্ঘ সুনসান করিডোর ধরে হেঁটে চলেছে। ভবনের ওপরের তলায় মিস্ত্রি আর শ্রমিকদের সর্দাররা থাকে। তাদের সাথেই সরাসরি কথা বলতে হবে আজ। হাঁটতে হাঁটতে দিব্য হুট করে প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা অসীম। শুনলাম তোমার বিয়েটা নাকি আপাতত হচ্ছে না?”
অসীম কিছুটা অবাক হলেও স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,
“জি স্যার। সামান্য একটা পারিবারিক বিষয় নিয়ে একটু ঝামেলা চলছে। আশা করি কেটে যাবে।”

দিব্য শুধু আলতো করে মাথা নাড়ল। অসীম মনে মনে বেশ বিস্মিত হলো। কারণ দিব্য সাধারণত তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়ে কোনোদিন আগ বাড়িয়ে কোনো কৌতূহল দেখায় না। আজ ওঁর এই সহজ আচরণ অসীমকে বেশ অবাক করল। কিন্তু সেই বিস্ময় কাটবার আগেই আচমকা এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। করিডোরের অন্ধকার কোণ থেকে ঝড়ের বেগে কেউ একজন দিব্যর পাশ ঘেঁষে হেঁটে চলে গেল। লোকটার অবয়ব ভালো করে বোঝার আগেই দিব্য অনুভব করল। তার বাম কাঁধে তীব্র সূঁচ ফোটার মতো কিছু একটা সজোরে বিঁধে গেছে। হাত দিয়ে চট করে জায়গাটা চেপে ধরে মুখ দিয়ে একটি অবদমিত ‘উফ’ সূচক যন্ত্রণার শব্দ বেরিয়ে এলো ওর। পরমুহূর্তেই যেন এক প্রলয় ঘটে গেল। দিব্যর মনে হলো তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা তীব্রভাবে দুলে উঠেছে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা। একদম অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। ওর বলিষ্ঠ শরীরটা ভারসাম্য হারাচ্ছে দেখে অসীম আতঙ্কে ছুটে এসে ওকে ধরে ফেলল,

এই অবেলায় পর্ব ৩৪

“কী হয়েছে স্যার? আপনার কী হয়েছে?”
দিব্য নিজের শেষ শক্তিতে ভর করে কিছু একটা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করল। অবশ হয়ে আসা ডান হাতের আঙুলটা কোনোমতে উঁচিয়ে অসীমের পেছনের দিকে ইশারা করল সে। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। অস্পষ্ট আর জড়ানো গলায় সে কেবল বিড়বিড় করে বলতে পারল,
“এখান থেকে চলে যাও অসীম… ফাস্ট!”
কথাটা শেষ হওয়ার পরমুহূর্তেই দিব্যর অবশ দেহটা ভারী এক পাথরের মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। চোখের সামনে নিকষ কালো অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

এই অবেলায় পর্ব ৩৬