অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৫
ফাহিমা ইসলাম
রোজকার নিয়মে দিবাকর তার দীপ্তিময় আলোকরশ্মিতে ভরিয়ে দিয়েছে গোটা ধরণী। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত করে তুলছে, প্রতিটি কোণা। জানালার ফাঁক দিয়ে পর্দার বেড়াজ্বাল পেরিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে জানান দিচ্ছে তার আগমন। গভীর নিদ্রা মগ্ন তূর্ণা নড়েচড়ে উঠলো, অসুস্থতার কারণে শরীর নুইয়ে এসেছে। নেত্রজোড়া মেলে তাকানো দুষ্কর হয়ে দাড়িয়েছে। তারপরও কোনোরকমে উঠে বসার চেষ্টা করলে, টান পরলো। পাশে তাকাতেই দু’টো ঘুমন্ত সিক্ত মুখশ্রী নজরে এলো। তার জামার একপাশ শক্ত করে মুঠিবদ্ধ করে, ঠোঁট ফুলিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন রোদেলা। মনে হচ্ছে তার হাতে থাকা কাপড়ের টুকরোটা ছেড়ে দিলেই সে পালাবে। অপরদিকে একই ভাবে একহাতের সাহায্য তার বাহু আঁকড়ে ধরে আছে রৌদ্রিক। দু’দিন যাবত ভীষণ জ্বরে ভুগছিলো সে। এই কয়েকদিন তার যাবতীয় দেখাশোনা নিজ হাতে করেছে রৌদ্রিক। একমুহূর্তের জন্যও কাছ ছাড়া হয়নি, ঠিক তেমন ভাবেই বিড়াল ছানার মত তার সঙ্গে লেপ্টে ছিলো রোদেলা। বাবার মত সেও একটু পর পর মাথায় হাত দিয়ে জ্বর মেপে দেখছিলো। যেনো কত বড় ডাক্তার সে! আর তার আদুরো আধো বুলি আওড়িয়ে বলছি সে ঠিক হয়ে যাবে। জ্বর পালিয়ে যাবে।।
অথচ এই মানুষগুলোর আসার আগে কতরাত কাতরাতে কাতরাতে কেটেছে তার! র’ক্তাক্ত শরীর নিয়ে কত রাত কাটিয়েছে। অথচ একটি বারের জন্যও কেউ দেখতে আসেনি, দাদি নামক মানুষ থাকলেও বয়স্ক মানুষ কতটা করবে তারজন্য? অসুস্থ হয়ে পরে থাকলেও, সামান্য মানবিকতার তাড়নায়ও দেখতে আসেনি অথচ এখন তার অসুস্থে তার পাশে বটগাছের মত ছায়া হয়ে আছে দু’টি মানুষ। যত্ন নিয়ে তাকে সাড়িয়ে তুলছে। তার মতো ভাঙা মানুষকে জোড়া লাগিয়েছে। সমাজে তাদের মত প্রতিবন্ধী মানুষদের জায়গা নিম্নস্তরেই! এদের মানুষ বলে গণ্য করে কেউ। কেউই ইচ্ছে করে ক্রটি নিয়ে জন্মায় না। এটা উপরওয়ালার একটা পরীক্ষা মানবজাতির উপর। অথচ নির্বোধ মানবজাতি কতটাই না নির্মমভাবে অত্যাচার করে, তাদের মত মানুষের উপর। সমাজ বরাবরই অন্যের প্রতি নিষ্ঠুরতার করে যায়, অপর পাশের মানুষটা নির্বোধ হলেও তারও একটা মন আছে সেটা উপলব্ধি কখনোই করে না! প্রতিবন্ধকতা কোনো পাপ নয়, যে মানুষ এটা এতটা ঘৃণিত চোখে দেখে।
তারাও আল্লাহর আর এক নিয়ামত, যা আল্লাহ স্বয়ং নিজ হাতে যত্ন নিয়ে তৈরি করেন। পৃথিবীর প্রতিটা জিনিসই আল্লাহ নিজ হাতে গড়েছে, সে উদ্দেশ্যবিহীন একটাও সৃষ্টি করেনি। আর যারা আল্লাহ এই সৃষ্টিকে বার বার আঘাত করতে চায় তারা কতটাই না নির্বোধ, তাদের জন্য অপেক্ষা করা শাস্তিগুলোর কথা একবারও ভাবে না। পৃথিবীতে যেমন মন্দ লোক রয়েছে; তেমনি ভালো লোকও রয়েছে। আর রৌদ্রিক সেই লোক যাকে তিনি হয়তো তূর্ণার সুখময় জীবনের জন্য তৈরি করেছে। তাদের দু’জনের শুরুর পথচলা ভিন্ন হলেও, তারা এখন একসঙ্গে। আল্লাহ প্রতিটি কাজেই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। কারো জীবনে সুখ বয়ে আনা আবার কারো জীবনে দুঃখের অঢেল ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেওয়া। তিনি পরীক্ষা নিয়ে থাকেন আমাদের সবরের। তূর্ণার সবরের ফল এই মানুষ দু’টি। যারা কিনা বিনা স্বার্থে তাকে আগলে রাখছে প্রতিনিয়তই। তার সুস্থতা পুরোপুরি হওয়া কোনোদিনও সম্ভব নয়, কারণ যে নিয়ামত দিয়ে আল্লাহ তাকে এই ধরণীতে প্রেরণ করেছেন, সেটা কি করে এই মানবজীব ঠিক করবে? তবে সে যতটুকু সুস্থ এতে সে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবে তার এই মানুষ দু’টি র সঙ্গে। আগের মত এতটাও অবুঝ নয়, সংসারের কাজ বুঝতে শিখেছে জবা সিকদার,রুমা সিকদার, রোমানা সিকদারের কাছ থেকে। স্বামীর ভালো লাগা, খারাপ লাগা সবকিছুই বুঝতে শিখেছে সে।
রোদেলা তার নারি ছেঁড়া ধন না হলেও তার আত্মার সঙ্গে মিশে গেছে বাচ্চাটা। জন্ম দিলেই কি মা হওয়ায় যায়? না যায় না, কই সে তো জন্ম না দিয়েও দিব্যি অনুভব করতে পারে রোদেলাকে। সব সৎ মা এক হয় না, যেমনটা তার মা নয়। কত রাত কেঁদেছে মায়ের একটু গন্ধ পাওয়ার জন্য, অসহায়ের মত অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়েছিল সাহেলা খাতুনের দিকে। কই সে তো নেয়নি টেনে তাকে বুকে, ভরসা দেয়নি সে তার মা না হয়েও মা। কারণ পৃথিবীর সবাই সবার মত করে ভালোবাসে জানে না, আগলে রাখতে জানে না। কেউ কেউ জানে কিভাবে এই পৃথিবীর বুকে নিজ হাতে কারো জীবন ন’রকে বানাতে। তার কোনো আক্ষেপ নেই তার স্বামীর আগেও বিয়ে হয়েছিল, আক্ষেপ নেই রোদেলা রৌদ্রক আর প্রীয়তির সন্তান হওয়ায়। আক্ষেপ শুধু একটাই রোদেলাকে নিজ গর্ভে ধারণ করতে না পারায়। যদি কোনো ভাবে রোদেলাকে নিজ গর্ভ থেকে আবারও জন্ম দিতে তাহলে সে, রোদেলাকে আবারও জন্ম দিতো।
কেউ প্রশ্ন করতে পারতো না রোদেলা তার নয়, তার গর্ভের নয়! তেজস্বী হয়ে উঠেছে নিজের স্বামী-সন্তানকে নিয়ে। হাহাকার চলে যখন কেউ বলে রোদেলা তার গর্ভের জন্ম নেওয়া সন্তান নয়। তার জানা নেই কিভাবে গর্ভে বাচ্চা ধারণ করে। কিন্তু সে খুব করে রোদেলাকে অনুভব করে, এই ছোট্ট পুতুলটা তার! হ্যাঁ তার, শুধুই তার। সে মা! রোদেলার মা, তার পুতুলের মা। প্রথম যখন কোলে নিয়েছিল, তার মধ্যে বয়ে গিয়েছি এক কম্পন। তারপর একে একে প্রতিটা মুহূর্ত,প্রতিদিন, প্রতিটা মাস সে অনুভব করে রোদেলাকে। তাহলে কি করে সে মা নয় রোদেলার। তার গায়েও র’ক্ত বইছে রোদেলার গায়েও, তাহলে! তাহলে সে তো রোদেলার। ভাবতে ভাবতে টুপ করে গাল বেয়ে অশ্রুবরি গড়িয়ে পরলো। রোদেলার ছোট্ট হাতখানি টেনে নিয়ে অসংখ্য চুমুতে ভড়িয়ে দিলো। হাত বাড়িয়ে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো ঘুমন্ত রোদেলাও হয়তো মায়ের উষ্ণ আলিঙ্গনের ছোঁয়া পেতেই মিশে যায় তূর্ণার বক্ষস্থলে। গভীর নিদ্রামগ্ন থাকা অবস্থাতেও আরও শক্ত করে তূর্ণার কাপড় খিঁচিয়ে ধরলো।
রৌদ্রিকের খানিকটা তন্দ্রামগ্ন হলো। সারারাত জেগে থাকার ফলে নামাজ শেষে কান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেওয়া মাত্রই গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়ে গেছে। কিছু সময় পর রৌদ্রিক চোখ মেলে তাকাতেই তূর্ণার অশ্রুসিক্ত চোখ বুঁজে থাকতে দেখতে পায়। হাত বাড়িয়ে কাপলে হাত রেখে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করতেই,বুঝলো জ্বর নেমে গেছে। তূর্ণা অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়া মেলে তাকালো রৌদ্রিকের পানে। তূর্ণাকে হঠাৎ কাঁদতে দেখে রৌদ্রিকের ভ্রুজোড়া কুঁচকিয়ে আসে।
“ কি হয়েছে? বেশি খারাপ লাগছে?”
তূর্ণা কোনো জবাব দিলো না।রৌদ্রিক বেশি প্রশ্ন করলো না, উঠে পরলো বিছানা থেকে। তূর্ণা দূর্বল শরীরটা নিয়ে রোদেলার সঙ্গে অনেকটা সময় ঘুমিয়ে নিলো। রৌদ্রিক বিরক্ত করলো না কাউকেই, তার সঙ্গে রোদেলাও অনেকটা রাত জেগেছে। তোতাপাখির মত খালি বলেই গেছে মা কবে ঠিক হবে, তাকে কোলে নিয়ে সারা বাগান কখন ঘুরবে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সারাক্ষণ তূর্ণার পাশে ছিলো।
“ আপনার চা!”
গম্ভীর ভাবে এগিয়ে দিলো তূর্যের দিকে চাটা রূপা। বেলকনিতে বইয়ের মাঝে মগ্ন ছিলো তূর্য। রূপার উপস্থিতিতে তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো না, হাত বাড়িয়ে শুধু চা’টা নিলো। রূপা দাঁত কিরমিরিয়ে কয়েক পলক তূর্যের দিকে তাকিয়ে থেকে সেখান থেকে রাগে গিজগিজ করতে চলে যায়। রূপা যেতেই তূর্য বাঁকা হাসলো, আবারও তার মাঝে একই গাম্ভীর্য দেখা দিলো। বইয়ের সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলো।
ড্রইংরুমে এসে রাগে গিজগিজ করতে করতে বসে সোফায় বসে পরলো সে। নিজের সাজসজ্জার দিকে তাকাতেই রাগ লাগলো! কেনো সাজতে গেলো সে? কোন আশায় সেজেছিলো সে? তার বর কি তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সে, যে সাজবে আর তার বর তার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকবে। সেবার এসে আর সংসার ছেড়ে যায়নি রূপা। কারণও আছে বটে, শ্বাশুড়-শ্বাশুড়ি থাকাকালীন লক্ষ্য করেছে তাদের পাশের ফ্ল্যাটে দু’টো অবিবাহিত মেয়ে থাকে। রোজ সকালে তূর্য বের হলেই মেয়ে দু’টো বের হয়। একবার নয় বেশ কয়েকদিন লক্ষ্য করার পর, না চাইতেও অজানা কারণে ঈষায় তার বুক জ্বালাপোড়া করছিলো। ইচ্ছে করছিলো মেয়ে দু’টোর চুল ছিঁ’ড়ে ফেলতে। সে তার বরের দিকে তারপর থেকে ভালো করে নজর দেওয়ার পর বুঝলো তার বরটা দারুণ সুদর্শন! খাঁড়া নাক, শক্ত চোয়াল সঙ্গে চাপদাড়ি। তারউপর ধূসর নেত্রজোড়া লোকটাকে কেমন আকর্ষণীয় করে তুলেছে। লুক থেকে ব্যক্তিত্ব সবকিছুই যেকোনো মেয়ের নজর কারতে বাধ্য। তার অনুপস্থিতিতে এই মেয়েগুলো কি বিচ্ছিরি ভাবেই না তার বরকে চোখ দিয়ে গিলে খেয়েছে। ভাবতেই আবারও রক্ত মাথায় উঠে গেলো তার! না এইসব নেওয়া যাচ্ছে না। তূর্যের বাবা-মা বাড়িতে ফিরে গেছে আরও দুই সপ্তাহ হয়েছে। বাড়িতে সে আর তূর্য ছাড়া কেউ নেই। মোট তিনটা বেডরুম, তূর্যের বাবা-মা থাকায় এক কক্ষে থাকলেও একসঙ্গে, একই বিছানায় ঘুমায়নি তারা। তূর্য ডিভানে ঘুমিয়েছে তার সে বিছানায়। এখন তো সে পাশের ঘরে ঘুমায়। এক বাসায় থেকেও মনে হয়, কারো সঙ্গে নেই সে। লোকটা কেমন চুপচাপ স্বভাবের। এইযো আজকে ছুটির দিন, কই বউকে নিয়ে সময়টা কাটাবে। তা না করে নিজের মত করে সময় কাটাতে ব্যস্ত তূর্য। যেনো সে ছাড়া আর কারো উপস্থিতি নেই এখানে, রূপা মুখ ভেংচালো। না এই গুরুগম্ভীর লোকের সঙ্গে সংসার করবে কিভাবে? ভাবতে ভাবতে মেজাজ সপ্তম আসমানে পৌঁছালো৷
“ কালকে রেডি থাকবেন, সন্ধ্যার পর নিতে আসবো।”
হঠাৎ তূর্যের গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই কেঁপে উঠলো রূপা। যেভাবে এসেছিলো, ঠিক বলেই সেভাবে ফিরে গিয়েছে সে। সেটা দেখে আরও রাগ লাগলো রূপা। তাই এবার রাগে গিজগিজ করতে করতে চিৎকার করে বলে-
“ যাবো না কোথাও। অর্ডার দিচ্ছেন আমায়? আমি রূপা কারো কথার গোলাম নই।”
“ কারো গোলাম হতে হবে না, তবে আমার হন। কারণ আমি ‘কারো’ নই আ’ম ইয়্যুর হাসবেন্ড। অন্ড ইউ হ্যাভ টু অবেয় মি!”
ভিতর থেকে তীক্ষ্ণ,গাম্ভীর্যের ঠাসা ভরা উত্তর ফিরে এলো। রূপার রাগটা যেনো বেড়েই গেলো, বর হওয়ার কোনো কাজ করেনি৷ অথচ কথাগুলো কি ভয়ংকর! ভয়ংকর! বলে এই লোক।
দিবাকর বিদায় নিয়ে রাত্রি নেমেছে নিঃশব্দে৷ চারিদিকে অন্ধকারের মাঝে নিস্তব্ধতা একখানা চাঁদের ফাঁলি জ্বলজ্বল করছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরলো তূর্ণা। সে সেজেছে, রৌদ্রিকের বউ সেজেছে। তার বিয়েতে তার মধ্যে বঁধুর কোনো সাজসজ্জা ছিলনা। তার বুঝ ছিলনা এতটা কিভাবে বউ সাজতে হয়। তবে আজলে সেজেছে শুধুই তার বরের জন্য। গায়ে জড়ানো শুভ্র রঙের একখানা শাড়ি, ডাগর, ডার আঁখিজোড়ায় গাঢ় করে কাজল টেনে দিয়েছে৷ অধরভাজে লাল রঙের প্রসাধনী উপস্থিতি। অলংকার হিসেবে রৌদ্রিকের দেওয়া গয়নাগুলো। যা আজকে তাকে আরও রাঙিয়ে তুলেছে, ইরার কাছ থেকে জেনেছে সে স্বামী-স্ত্রী কিভাবে পূর্ণরূপে আবদ্ধ হয়। ভাবতেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরলো তূর্ণা! সামান্য চু’মুতে সে তাকাতে পারেনি। সেই লোকটার গম্ভীর স্পর্শে কিভাবে নিজেকে আড়াল করবে সে? মাথায় বিয়ের লাল দোপাট্টাটা টেনে নিলো। তাতেই যেনো মনে হলো, সে আবারও বঁধু রূপে সেজেছে।
কারো উপস্থিতি টের পেতেই চমকে তাকালো তূর্ণা! রৌদ্রিক এসেছে, সেও একই ভাবে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার দৃষ্টিতে আজকের বিস্ময় ধরা দিলো তূর্ণার নিকট। লজ্জায় তূর্ণা মাথা নামিয়ে নিলো! রৌদ্রিক ক্ষীণ হেসে এগিয়ে এলো, তূর্ণা স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
“ বউ সেজেছো সে?”
বরাবরের মত শান্ত শোনালো তার কণ্ঠ। তূর্ণা তাকাতে পারলো না চোখ তুলে। রৌদ্রিক হাসলো তূর্ণার লজ্জামাখা মুখশ্রী দেখে। আজকে মেয়েটা একদমই বাচ্চা লাগছে না, বরং কেমন বড় বড় লাগছে। পূর্ণ নারী মনে হচ্ছে। রৌদ্রিক চমকালো খানিকটা।
“ তূর্ণা!”
“ হুম” কি যেনো মেশানো ছিল রৌদ্রিকের কণ্ঠে । সেটা উপেক্ষা করার সাধ্য হলো না তূর্ণার।
“ বউ সেজেছো? রৌদ্রিকের বউ?”
তূর্ণা জবাব দিতে পারলো না। কি বলবে, কথা গুলিয়ে ফেলছে সে। এই মানুষটার জন্য প্রতিদিন সে প্রাণভরে হাসে! প্রাণভরে বাঁচতে শিখেছে। মানুষটাকে আল্লাহ যেনো দেবদূত হিসেবে পাঠিয়েছে। তার সকল কষ্টের বিনিময়ে রৌদ্রিকে দিয়েছে জীবনে। এই মানুষটা তার জীবনে না এলে এতকিছু কি পেতো সে?
“ এইযে আমিটাকে সারাজীবন আগলে রাখবেন তো বর? আপনি ছাড়া আমায় কেউ ভালোবাসেনি, কেউ ভালো রাখেনি। এইভাবেই আমাকে আগলে রাখবেন তো?”
তূর্ণার কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পরা অশ্রুবিন্দু অতি যত্নসহকারে নিজের হাত দ্বারা মুছে নিলো রৌদ্রিক। মৃদু হওয়ায় মেয়েটার কেশরাশিগুলো, অশ্রুজলের সঙ্গে মিশে লেপ্টে আছে, শুভ্র রাঙা ত্বকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। রৌদ্রিক সেটা কানের পিছনে ছড়িয়ে গুজিয়ে দিলো।
“ বলেছিলাম কি, যতবার তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। ততোবার আমি তোমাকে খুঁজে এনে নিজের কাছে ফিরিয়ে দিবো। তুমি আমার জীবনে দ্বিতীয় নারী হলেও তোমার প্রতিটা নিশ্বাসেরও যত্ন আমি নিবো! তুমি আমার তূর্ণা! তোমায় আমি তোমার সব রূপেই আগলে রাখবো। মৃত্যুর আগ অব্দি! তোমার ভালো লাগার হাজারটা কারণ দিবো। রোজ কোকিল হয়ে আমার আঙ্গিনায় আমায় মাতিয়ে রাখো।” আমার #অবেলার_প্রণয়ভেলা হয়ে থাকো।”
তূর্ণা কেঁদে ফেললো! রৌদ্রিকের বুকে ঝাপিয়ে পরলো, ফুঁপিয়ে উঠলো। রৌদ্রিক তূর্ণার দেহটাকে সামলে নিলো। কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে-
” আমি আপনাকে পূর্ণ রূপে চাই বর! আমায় আপনার করে নিন। আমার ভালো লাগা,ভালোবাসা সব আপনাকে ঘিরে। আমি সংসার করতে চাই বর! আপনাকে, পুতুলকে নিয়ে নতুন রূপে বাঁচতে চাই। আমাকে আপনার করে নিন।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৪
তূর্ণা নিজেও জানে না সে কি বলছে। তার জানা নেই এতকিছু, শুধু এতটুকুই চেয়ে গেলো সে রৌদ্রিকে নিজের করে পেতে চায়। পূর্ণ রূপে পেয়ে চায়, রৌদ্রিক কি ফেরালো তাকে আবারও? না,রৌদ্রিক আজকে আর তূর্ণাকে ফেরালো না। বরং অগোছালো মেয়েটাকে যত্ন করে নিজের মাঝে আঁকড়ে ধরে, নিয়ে গেলো যন্ত্রণাময় সুখের ঠিকানায়।
