শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৬
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাত তখন ঘড়ির কাটাই প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই।
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ হয়ে আছে । দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকার শব্দ ভেসে আসছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ছাদের একপাশে টাঙানো fairy light গুলো আস্তে আস্তে দুলছে।
আদরের আশ্রয় থেকে সবাই অনেক আগেই ফিরে এসেছে।ক্লান্ত হয়ে সবাই যে যার রুমে ঘুমিয়ে পড়েছে।কিন্তু ইনায়ার চোখে ঘুম নেই।
কারণ— ইউভি এখনও রুমে আসে নাই।
একটা message পর্যন্ত করে নাই তাকে।
ইনায়া বিছানার উপর বসে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে।কখনো inbox খুলছে… কখনো বিরক্ত হয়ে ফোনটা পাশে ছুঁড়ে ফেলছে।
মনে মনে রাগে গজগজ করতে বললো
— “আমি এই মানুষটার চিন্তায় মরে যাচ্ছি… আর বালের শেহজাদা কোথায় গায়েব হয়ে আছে!”
হঠাৎ কী মনে করে ইনায়া উঠে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বের হলো।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ।ড্রয়িংরুম… বারান্দা… উঠান…
এক এক করে সব জায়গায় খুঁজেও ইউভির দেখা মিলল না।শেষে বিরক্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এলো সে। আর ছাদে উঠেই যা দেখল—
সেটা একদমই আশা করে নাই ইনায়া।
ছাদের এক কোণায় একটা মাদুর পাতা।
তার উপর আধশোয়া হয়ে আছে ইউভি।
এক হাত মাথার নিচে দিয়ে অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখছে ।
কালো সার্ট পরে একদম নিশ্চিন্ত মনে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে সে।
মনে হচ্ছে এ পৃথিবীতে কোনো চিন্তাই নাই মানুষটার মধ্যে ।
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড থ হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর রাগে দাঁত কিঁচিয়ে মনের মধ্যে বলল—
— “আমি এই মানুষটার চিন্তায় মরে যাচ্ছি… আর বালের শেহজাদা কিনা মনের সুখে সিগারেট গিলতেছে! বাহ!
হঠাৎ ইনায়া জোরে বলে উঠল
— “যে ঠোঁটে ঠোঁট রাখার অধিকার আমি রাখি…
সে ঠোঁটে সিগারেট ছোঁয়া নিষিদ্ধ, শেহজাদা ইউভি চৌধুরী…
ইউভি পেছনে না ঘুরেই হালকা হেসে বলল—
ঠিক আছে… মেনে নিলাম। তবে আমারও একটা শর্ত আছে।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল—
— “কি?”
ইউভি এবার ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত লাগছে
তারপর নিচু গলায় বলল—
— “যেদিন তুই নিজে ইচ্ছায় আমার ঠোঁটে তোর ঠোঁট ছুঁইবি সেদিন থেকে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিবো।
কথাটা শুনে ইনায়ার বুকটা কেমন ধক করে উঠল।
পরের মুহূর্তেই আর এক সেকেন্ড দেরি করল না সে।
দ্রুত হেঁটে এসে একদম ইউভির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ইউভির কোলের উপর বসে দুই হাতে তার শার্ট মুঠো করে ধরে এক ঝটকায় ইনায়ার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ইউভির ঠোঁটে।
ইউভি প্রথম কয়েক সেকেন্ড পুরো স্থির হয়ে গেল।
মনে হচ্ছিল সে নিজেও ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না।
কিন্তু তারপরই তার দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইনায়াকে। আর ইনায়া যখন ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিতে গেল।ঠিক তখনই ইউভি তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
তারপর গভীরভাবে চুমুতে ডুবিয়ে দিল তাকে।
ইনায়া কেঁপে উঠল। এক হাত দিয়ে ইউভির shoulder শক্ত করে চেপে ধরল।
ব্যথায় ছোট্ট করে কুঁকড়ে উঠলেও আজ যেন ইউভির কোনো দিকেই খেয়াল নেই।
মনে হচ্ছে— বহুদিনের জমে থাকা সব ভালোবাসা, অভিমান, ভয়… সবকিছু এক মুহূর্তে উজাড় করে দিচ্ছে সে।
চারপাশে তখন শুধু রাতের ঠান্ডা বাতাস…
আর দুইটা অস্থির হৃদয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে । ইউভির ঠোঁট তখনও ছুঁয়ে আছে ইনায়ার কপালে।
দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের গায়ে মিশে যাচ্ছে।
হালকা ঠান্ডা বাতাসে ইনায়ার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে লাগছে ইউভির মুখে।
হঠাৎ ইউভি খুব আস্তে নিচু গলায় বলল—
— “তুই কি সুস্থ হয়েছিস, আদর?”
ইনায়া চোখ নামিয়ে ছোট্ট করে উত্তর দিল—
— “হুম…”
এই ছোট্ট উত্তরটার পর যেন আর কিছু শোনার প্রয়োজন মনে হলো না ইউভির।
আকাশভরা চাঁদ আর অসংখ্য তারা তখন নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। দূরে কোথাও রাতজাগা পাখির ডাক ভেসে আসছে। চারপাশের ঠান্ডা বাতাসটাও যেন ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছে দুজনের নিঃশ্বাসে।
ইউভি খুব ধীরে ইনায়ার মুখটা দুই হাতে ধরে তাকাল তার দিকে।
চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে অবাস্তব সুন্দর লাগছে।
লজ্জায় কাঁপা কাঁপা চোখ দুটো এলোমেলো চুল… আর ঠোঁটজুড়ে হালকা কাঁপুনি দেখে
ইউভির বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।
ধীরে ধীরে সে ইনায়াকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। এতটাই কাছে— দুজনের মাঝখানে আর কোনো দূরত্ব রইল না।
ইনায়া কাঁপা হাতে ইউভির গলা জড়িয়ে ধরল।
মাথাটা আস্তে করে রাখল তার বুকে।
ইউভি নিচু হয়ে ইনায়ার কপালে… চোখে… গালে একের পর এক ধীর, যত্নভরা চুমু এঁকে দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে— বহুদিন ধরে আগলে রাখা কোনো প্রিয় জিনিসকে ছুঁয়ে দেখছে সে।
চারপাশে তখন শুধু রাতের নরম নীরবতা।
চাঁদের আলোয় দুজনের ছায়া মিশে গেছে একসাথে। ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আর ইউভি খুব যত্ন করে তাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে নিজের সব সুখ শান্তি খুঁজে নিতে লাগল
যেন পৃথিবীর সব শান্তি এই এক মানুষটার মাঝেই লুকিয়ে আছে।
ইউভি খুব ধীরে ইনায়াকে নিজের কোল থেকে নামিয়ে মাদুরের উপর শুইয়ে দিল।
মাদুরের চারপাশে ছড়িয়ে আছে রাতের ঠান্ডা বাতাস আর জোছনার নরম আলো।
উপরে গোল চাঁদটা যেন পুরো আকাশ ভরে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। ইনায়া চুপচাপ শুয়ে আছে।
নিঃশ্বাসগুলো কেমন অস্থির হয়ে আছে এখনও।
ইউভি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে তার খোপা করা চুলগুলোর দিকে হাত বাড়াল।
খুব যত্ন করে একটা একটা করে pin খুলে দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই ঘন কালো চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল মাদুরের উপর।
হালকা বাতাসে চুলগুলো উড়তে শুরু করতেই ইউভির চোখদুটো কেমন নরম হয়ে গেল।
সে খুব আস্তে আঙুল চালালো ইনায়ার চুলের ভেতর।
তারপর নিচু গলায় বলল—
— “তুই জানিস, আদর…
তোর চুলগুলো আমার ভীষণ প্রিয়।”
ইনায়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল ইউভির দিকে।
ইউভি হালকা হেসে আবার বলল—
— “ছোটবেলা থেকে দূর থেইকা এই চুলগুলোর যত্ন নিছি আমি।
একটুও কাটতে দেই নাই তোকে… মনে আছে?”
ইনায়ার চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল।কারণ এখন সে বুঝতে পারছে এই মানুষটার ভালোবাসা শুধু আজকের না। বহু বছরের জমে থাকা এক অদ্ভুত যত্ন… এক নীরব পাগলামি।
ইউভি খুব ধীরে ইনায়ার কানের পাশের চুলগুলো সরিয়ে দিল।ইউভি খুব ধীরে ইনায়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর চোখে… গালে… থুতনিতে একের পর এক নরম চুমু এঁকে দিতে লাগল।
প্রতিটা ছোঁয়ায় যেন অদ্ভুত এক যত্ন মিশে আছে।
বহুদিনের জমে থাকা ভালোবাসা… অভিমান… পাগলামি।
ইনায়া কাঁপছিল।
ইনায়ার আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরেছিল ইউভির শার্ট। ইউভির ছোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে আরও গভীর হতে লাগল। ধিরে ধিরে ইউভির নিঃশ্বাস গরম হয়ে লাগচ্ছে ইনায়ার ত্বকে।
আর ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ।চাঁদের আলোয় ইউভির চোখদুটো অদ্ভুত নরম লাগচ্ছে ।
মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সে শুধু ইনায়াকেই দেখছে। একটা সময় ইনায়াও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। লজ্জায় চোখ বন্ধ করেও ধীরে ধীরে সাড়া দিল ইউভির সব অস্থিরতায়।
আর ইউভি তখন তাকে আরও যত্ন করে নিজের ভালোবাসার আদরে আগলে নিল।
যেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয় তার এখনও কাটে নাই।
ইউভি খুব যত্ন করে দুজনের এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা শার্ট গুলো তুলে নিল।
তারপর আস্তে করে একটা শার্ট গুলো ভাঁজ করে ইনায়ার মাথার নিচে বিছিয়ে দিল…
যাতে তার আদরটাকে একটুও কষ্ট না পেতে হয়।
চারপাশে তখন শুধু রাতের নীরবতা।
আকাশভরা চাঁদের আলোয় ইনায়ার ভেজা চোখদুটো আরও চকচক করছে।
কিছু সময় পর ইউভির অস্থির ভালোবাসা সহ্য করতে না পেরে ইনায়া হালকা ধুকরে কেঁদে উঠল।
আর সেই কান্নার শব্দ শুনেই ইউভি যেন হঠাৎ নিজের জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো।
— “Oh shit…”
বলেই দ্রুত ইনায়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল সে। চোখেমুখে স্পষ্ট ভয় আর অপরাধবোধ।
ইউভি বারবার ইনায়ার কপালে চুমু দিয়ে বলল—
— “Sorry, আদর… আমি বুঝতে পারিনি…”
তার গলাটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে।
ইনায়াকে শান্ত করার জন্য খুব আস্তে আবার বলল “আজ কি তোর শেহজাদা তোকে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলছে, আদর…?
ইনায়া নিজের কষ্টটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল।
কারণ সে জানে—
এই মানুষটা তার সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারে না। তাই কাঁপা গলায় ছোট্ট করে বলল—
— “না… ইউভি ভাইয়া…”
ইউভি কিছু বলল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ চারপাশে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ পাশে রাখা অ্যালোভেরার গাছটা চোখে পড়তেই দ্রুত একটা ডাল ছিঁড়ে আনল সে।
তারপর খুব সাবধানে ভেতরের ঠান্ডা জেল বের করে ইনায়ার ব্যথাসুলোভ জায়গাগুলোই আলতো করে লাগাতে লাগল।ইনায়া নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে ইউভির দিকে।
মনে হচ্ছে এই মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা সে আজ নতুন করে দেখছে।
জেল লাগানো শেষ করে ইউভি নিচু হয়ে ইনায়ার গলার কাছে খুব হালকা করে ঠোঁট ছোঁয়াল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
— “ভালো লাগছে এখন…?”
ইনায়া আস্তে করে মাথা নাড়ল।
ইউভি কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল—
— “মুখে যাই বলি না কেন, আদর…
তোকে আমি এইভাবে কষ্ট দিতে চাইনি।
ইউভির হাত তখনও কাঁপছে হালকা।
অ্যালোভেরা জেলটা খুব যত্ন করে ইনায়ার কোমল ত্বকে লাগিয়ে দিচ্ছে সে।মুখে অপরাধবোধ… চোখে অদ্ভুত মায়া ইউভির।
ইনায়া এখন ও চুপচাপ ইউভির দিকে তাকিয়ে আছে।চাঁদের আলোয় মানুষটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। এই মানুষটাই একটু আগে তাকে নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছিল।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ইউভির গাল ছুঁয়ে দিল।
তারপর ছোট্ট করে বলল—
— “আমি কষ্ট পাইনি, শেহজাদা…”
ইউভি কিছু বলল না।
শুধু ইনায়ার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে এনে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। ইনায়া চোখ বন্ধ করে ইউভির বুকের উপর মাথা রাখল।
ইউভির হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে শুনতে তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
ইউভি নিচু হয়ে কানের কাছে খুব আস্তে করে বললো।আজ থেকে তোর সব কষ্ট… সব ভয়… সব দায়িত্ব আমার, আদর।”
ইনায়া উত্তর দিল না।
শুধু আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইউভি কে ।
তারপর ধীরে ধীরে পাশে রাখা সাদা শার্ট টা তুলে নিল।চাঁদের আলোয় ইনায়ার লজ্জায় লাল হয়ে থাকা মুখটা দেখে ইউভির ঠোঁটের কোণে আবার ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
সে একদম সাবধানে কোমলভাবে শার্ট টা ঠিক করে পরিয়ে দিতে লাগল।
মনে হচ্ছিল ভালোবাসা দিয়েই যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে আগলে রাখছে মেয়েটাকে।
ইনায়া পুরো সময়টা চুপচাপ তাকিয়ে ছিল ইউভির দিকে।
তারপর হঠাৎ ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
— “আমি জানতাম আমার শেহজাদা অসভ্য…
কিন্তু এতটা অসভ্য হবে ভাবি নাই।”
ইউভি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।
নিচু হয়ে ইনায়ার নাকের ডগায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল “আমাকে এখনও চিনতে পারিস নাই, আদর…
আমি যে বড্ড অসভ্য।
ইনায়া সাথে সাথে লজ্জায় ইউভির বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
আর ইউভি মুচকি হেসে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল নিজের বেয়াদপ বউটাকে।
ফজরের আজানের শব্দ চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছিল।
ইউভি ইনায়াকে আলতো করে বলল।“আদর, রুমে যেতে হবে।”
ইনায়া মাথা নিচু করে নরম গলায় বলল— — “হুম।”
কিন্তু ইউভি কিছু একটা বুঝে গেল।
হঠাৎই সে ইনায়াকে কোলে তুলে নিল।
ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
ইউভি ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে লাগল।হাঁটতে হাঁটতে বলল— — “আর আমার চিন্তা কীসের? আমার বউটা তো এখন বড় হয়ে গেছে।
ইনায়া এবার রেগে গিয়ে তার দিকে তাকাল— — “চুপ করবেন! এই কথা আর মুখে আনবেন না… অসভ্য!
ইউভি হালকা হাসল। তারপর ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল আমার আদর তো সব দিক থেকেই মিষ্টি… দেখতেও মিষ্টি রাগ করলেও, খেতে ও মিষ্টি।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে চিৎকার করে উঠল— — “আমি কিন্তু বড় মা-কে ডাক দেবো!”
— “ওহ তাই? ইউভি মজা করে বললো তোর বড় মা আমাকে কী করবে? বরং আমি বলবো একটু ভালোবাসতে গিয়ে তোমার মেয়ে কে ব্যাথা দিয়ে ফেলছি মা।
ইনায়া আর কিছু বলতে পারল না, লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে রইল।
ইউভি ইনায়ার জন্য কিছু ওষুধ এনে বলল। “এইটা খেয়ে নে, বিয়াদব বউ ।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল। “কিসের ওষুধ?”
ইউভি শান্তভাবে বলল “তুই বুঝবি না। আরেকটা মিসিং আছে, কাল এনে দেবো।
তারপর ইনায়ার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে ইউভি ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
আর ইনায়া চুপচাপ কম্বলের ভেতর ঢুকে গেল।
আজ চৌধুরী পরিবারের সবাই আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
কিন্তু ইউভি আর রেদোয়ান একটু আগে বের হবে।
ইউভি রাতিব চৌধুরী ও রবিউল চৌধুরীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলছিল, আর রেদোয়ান লিখন চৌধুরীর সাথে আলাদা করে কথা বলছিল।
কিছু সময় পর কথা শেষ হলে সবাই একে একে বিদায় নিতে শুরু করল।
ইউভি হঠাৎ কী যেন মনে করে নিজের রুমের দিকে গেল।
ভেতরে গিয়ে দেখে—
ইনায়া ঘুমিয়ে আছে।
ইউভি কোনো কিছু না ভেবেই হঠাৎ করে ইনায়াকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল।।ইনায়া ঘুম ভেঙে চমকে উঠল। ইউভি তাকে আরও শক্ত করে ধরে নিচু গলায় বলল— — “আদর, সাবধানে থাকিস। নিজের যত্ন নিস।
তারপর পকেট থেকে একটা ওষুধ বের করে বলল“এইটা খেয়ে নিস।”
ইনায়া চোখ কচলে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে আপনার?
ইউভি শান্তভাবে বলল কিছু না। লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাসায় চলে যাবি আমি চলে যাচ্ছি।
আমি চলে যাচ্ছি কথা টা শোনার সাথে সাথে
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল“কোথায় যাবেন?”
— “ঢাকা।”
ইউভি একটু থেমে বললোএকটা কথা বলব তোকে। যদি শোনিস—
আমি তোকে তোর খুশির জন্য কিছু মিথ্যা কথা বলেছিলাম। প্লিজ… কখনো আমাকে ভুল বুঝিস না।
ইনায়া সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল।ইউভি ভাইয়া, আমি আপনাকে চিনি। আপনি এমন কাজ কখনো করবেন না।।আপনার কাছে শুধু একটা অনুরোধ।আপনি ভালো করেই জানেন আপনি আমার সব থেকে বড় দুর্বলতা আমার দুর্বল জায়গায় আঘাত দেবেন না, প্লিজ।”
কথাটা শুনে ইউভি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎ ইনায়াকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। ইনায়ার মনে হলো—
এই আলিঙ্গনটা যেন আগের সব আলিঙ্গনের মতো না…
এটা একটু আলাদা, একটু গভীর… একটু ভারী।
ইউভি আস্তে করে চোখ বন্ধ করে বলল— — “নিজের যত্ন নিস, আদর। এই বলে আর এক মূহুর্তে ও দাড়ালো না ইউভি।
সবাই ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগোতে লাগল। গ্রামটার বাতাস যেন আজ একটু ভারী লাগছে।চলে যাওয়ার কষ্টে ভিজে আছে চারপাশ।
লিখন চৌধুরী সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো চারপাশটা দেখে নিলেন। চোখে অদ্ভুত একটা নরমতা।মুস্তাক চৌধুরী আর জামেলা চৌধুরীর চোখের পানি থামছেই না।
জামেলা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে বললেন— — “এতদিন পরে সবাই একসাথে হয়েছিলে আবার কবে এমন হবে।
একজন একজন করে সবাই জামেলা চৌধুরী কে। শান্তনা দিতে লাগল।
লিখন চৌধুরী আস্তে করে বললেন আমরা কোরবানির ঈদে আবার গ্রামে আসবো, চাচা। আপনাদের দেখতে আসবো।
মুস্তাক চৌধুরী চোখ মুছতে মুছতে বললেন—শুধু ইউভি আর রেদোয়ান মাঝেমধ্যে আসে… তোমরা তো কেউই আসো না রে বাবা…”
কথাটা শুনে চারপাশ একটু নীরব হয়ে গেল।
তখনই নুসরাত চৌধুরী হালকা হেসে বললেন “না চাচা, এখন থেকে আমরা আসবো… ইনশাআল্লাহ।”
একটু দূরে তুলি আর তারিন ইনায়া আর পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
তুলি কাঁপা গলায় বলল “আপু… আমাদের ভুলে যেও না।”
পিয়াসা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চোখে পানি এসে গেল।
“কখনো না আমরা আসবো তো কিছুদিন পরপরই আসবো।”
ইনায়া মাথা নেড়ে বলল।“এই গ্রামটার প্রেমে পড়ে গেছি আমরা খুব দ্রুত আসবো
সবাই একে একে গাড়িতে উঠতে লাগল।
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৫
চারপাশে বিদায়ের একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
লিখন চৌধুরী শেষবারের মতো বললেন।“চলো সবাই
গাড়িগুলো ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
গ্রামের মাটির রাস্তা, গাছপালা, আর ছোট ছোট স্মৃতিগুলো পেছনে পড়ে থাকল।
