Tell me who I am 2 part 21 (2)
আয়সা ইসলাম মনি
ফারহানের বুকের বাঁ-পাশে থাকা হৃৎপিণ্ডটা ধক করে উঠল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে ডায়েরির ১৪২ নম্বর পৃষ্ঠা উল্টালো। বাঁকানো হাতের লেখাটা দেখামাত্রই তার চোখের অশ্রুগ্রন্থিগুলো ভেঙে তরল লাভার মতো ঝরে পড়তে চাইল। কিন্তু ফারহান এবার আর কাঁদল না; নিজের ভেতরের হাহাকার আর তীব্র দহনকে সে অলৌকিক মানসিক শক্তিতে অবদমিত করে নিল। অনেকক্ষণ সেই কালির অক্ষরের ওপর নিজের হিমশীতল হাতটা আলতো করে বুলিয়ে নিতেই তার থুতনিটা সামান্য কেঁপে উঠল। ইচ্ছে হলো মুখের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের এই পলিমার ও সিলিকনের তৈরি অক্সিজেন মাস্ক আর এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউবগুলো এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলে, হাতের ক্যানুলা উপড়ে র*ক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিয়ে তারান্নুমের দিকে ছুটে যেতে, কিন্তু অবশ শরীর এখনো সম্পূর্ণ সায় দিল না। সে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল—অন্তত ততটা শান্ত, যতটুকু হলে খু*নিদের নির্মম মৃ*ত্যুদণ্ড নিজের চোখে উপভোগ করা যায়।
সে চিঠিটা মনে মনে পড়তে শুরু করল,
“আমার বদখত হবু জামাই ডিয়ার ফারহান জান্স,
আজকে আমাদের এক বছরের পূর্ণতা পাইলো। ভাবলাম আপনার লাইগা কিছু একটা মনের মাধুরী মিশাইয়া লিখি। যদি কোনোদিন এই ডায়েরি আপনার হাতে পড়ে, খবরদার! ভুলেও সামনের দিকের পেইজগুলা উল্টাইবেন না। কারান ভাইরে নিয়া যে পরিমাণে ইমোশনাল পা’গলামি ওইখানে লিখে রাখছি, আপনি পড়লে জেলাসিতে বিয়ার আগেই আমারে তালাক দিয়া বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দিবেন!”
লেখাটা পড়ে অত্যন্ত ক্ষীণ, সাধারণের চোখে দেখার মতোও না, এমন একটা বিষণ্ন হাসি ফুটল ফারহানের ওষ্ঠাধরে। সে পরের লাইনে দৃষ্টি বোলাল, “হাসতাছেন তো এখন? জানি তো আপনি হাসবেন। অথচ এই আপনিই আমার লাইফে হুট কইরা আইসা একেবারে পার্মানেন্ট মেহমান হইয়া জাঁকায়া বসলেন। আপনি মানুষটা বড়োই অদ্ভুত, খাটাশ টাইপের, অথচ বড্ড বেশি আপন। আমি আমার এই উথাল-পাথাল জীবনে কোনোদিনও ভাবি নাই, কারান ভাইরে এত জলদি সাইডে ফালাইয়া দিয়া আপনার মতোন একটা বজ্জাতরে জান দিয়া ভালোবাসা শুরু করব। এইটা মনে হয় আপনার ওই রোমিওগিরিরই ক্রেডিট। আমারে না ছুঁইয়াও, এক নজর সামনাসামনি না দেইখাও এমন মায়া বাড়াইছেন যে আপনারে মনপ্রাণ সঁপিয়া দিতে আমি বাধ্য হইছি। এখন ওইখান থেইকা আপনারে উচ্ছেদ করার সাধ্যি কারোর নাই। আচ্ছা, আপনি কি কোনো ব্ল্যাক ম্যাজিক জানেন, মিস্টার?
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাসটার নাম সম্ভবত আপনি। আপনারে ভালোবাসাটা আমার কাছে পুরান শহরের মতন—যত হারাই, তত বেশি নিজের লাগে।
আমি না একটা চরম ইন্টারেস্টিং কথা ভাবছি! ধরেন, আমরা যখন বুড়া-বুড়ি হব, চামড়া কুঁচকায়ে যাইব, তারপর এইরকম কোনো একটা এনিভার্সারির দিনই আমাদের দুইজনার একসাথে ম’রণ হইলো! তাইলে আমাদের পোলাপানদের কত বড়ো সুবিধা হইব জানেন? একসাথেই বাপ-মায়ের ম্যারেজ এনিভার্সারি আর ডেথ অ্যানিভার্সারি মিলাইয়া এক্কেরে গ্র্যান্ড মেজবানি খাওয়াইতে পারবো। মাইনষের দুইবারের খাওয়া-দাওয়ার খরচটাও এক চান্সে বাঁচবো। হা হা হা! (এখানে কলম দিয়ে আঁকা কিছু চওড়া হাসির ইমোজি)
আরেকটা স্পেশাল কড়া ওয়ার্নিং, বিয়ার পর যদি অন্য কোনো মাইয়ার দিকে ফ্লার্ট করার উদ্দেশ্যে ওই চোখ দুইটা কুঁচকাইয়া ঢ্যাঁকঢ্যাঁইকা তাকাইছেন, তাইলে আপনার জানাজায় আমি নিজে ফ্রন্ট লাইনে দাঁড়াইয়া কাঁদমু! আর আমাদের পোলাপানদের সামনে আমারে ভুলেও যদি ‘গোবরচারিণী’ বইলা টিজ করছেন, তাইলে আপনার একদিন কী আমার যে কয়দিন লাগে—রান্নার ফুটন্ত গরম খুন্তির বারি একটাও মিস হইবো না! সব আপনার ওই জিম করা হ্যান্ডু পিঠের ওপর পটাপট পড়বো। আমারে দেখতে খুবই ভদ্দরলোক মনে হয় না? আমারে দেখতে ডানা কাটা পরি আর সহজ-সরল মনে হইলেও মারামারিতে কিন্তু আমি ওস্তাদ জাঁদরেল!
ছোটোবেলায় তালহা ভাই একবার অতিরিক্ত পণ্ডিতি করতে আসছিল, এক ঘুসিতে ওর নাক ফাটাইয়া দিছিলাম! পরে বেচারা নাকে তুলা গুঁইজা আম্মার কাছে গিয়া কোঁকাতে কোঁকাতে বিচার দিছিল। এই তারান্নুমের সাথে ফাইট কইরা আজ পর্যন্ত এই তল্লাটের কেউ জিত্তে পারে নাই, আপনিও পারবেন না! সো, বি কেয়ারফুল উইথ ইওর ব্যাকবোন, ডিয়ার।
এইবার তাইলে একটু সিরিয়াস কথা বলি, হুহ! আমার না লাইফের একটা মস্ত বড়ো উইশ আছে—সারাটা জীবন আমি জাস্ট আপনার শক্ত হাতখান ধইরা পার কইরা দিতে চাই। থাকবেন তো আমার ছায়া হইয়া? না থাকলেও থাকতে হইবো, দরকার হইলে আপনার ঘাড় ধইরা শিকল দিয়া নিজের সাথে আজীবনের লাইগা বাইন্ধা রাখুম। এমন একখান বিলিতি মডার্ন আর ড্যাশিং জামাই কপাল ঠুইক্যা পাইছি, অরে কি আর সহজে ছাড়ন যায়? অত বোকা আমি তারান্নুম না!
আমি জানি, আপনি যখন ওই সাদা রঙের পাঞ্জাবিটা পইরা আমার সামনে আইসা দাঁড়াইবেন, আপনারে পুরা হলিউডের ক্লাসিক হিরোদের মতোন লাগবো। এমনিতেও তো আপনি আমার পার্সোনাল সুপারহিরো! সেই কখন থেইকা একদম রাজকুমারীর মতোন সাজুগুজু কইরা বইসা আছি। কখন আসবেন, ওহে অসভ্য পুরুষ? আসেন এইবার, মুড়ো ঝাঁটাটা কিন্তু দরজার পিছেই লুকাইয়া রাখছি!
আমার বড্ড ইচ্ছা, আপনার মুখ থেইকা সামনাসামনি একটা রাজকীয় প্রপোজাল পাওয়ার। আপনি একদম ব্রিটিশ লর্ডদের মতোন এক হাঁটু গেড়ে মাটির ওপর বইসা, চোখে এক মহাসমুদ্র প্রেম নিয়া, আর হাতে একটা টকটকে লাল গোলাপ ধইরা আমার দিকে চাইয়া বলবেন, ‘ভালোবাসি, কুইন।’ আর আমি আপনার দেওয়া ওই রোমান্টিক গোলাপের পাপড়িগুলা ছিঁড়্যা গাভীর খাঁটি দুধের ছানা দিয়া রসগোল্লা বানাইয়া এক নিমেষে টপাটপ খাইয়া হজম কইরা ফেলব! হো হো হো!
আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু বেশিমাত্রায় হিসাবি মেয়ে।
আপনারে যে বিয়া করতে রাজি হইছি, এর পেছনে একটা বহুত বড়ো সাইকোলজিক্যাল কারণ হইলো আপনার ওই ছয় ফুটের লম্বা চওড়া সলিড বডিটা। আমার যে পরিমাণের চণ্ডী রাগ, বাসার দামি ফার্নিচার ভাঙলে তো নিজেরই লস; তাই মনে মনে ঠিক করছি, রাগ চড়লে ফার্নিচারের বারোটা না বাজাইয়া, ফ্রিতে আপনার ওই শক্ত পিঠেই দু-চারটা ধমাধম কিল-ঘুসি আর থাপ্পড় বসায়া দিমু! টাকাও বাঁচল, মনের ঝালও মিটল!
এইরে… এসব পড়ে আবার ভাবতাছেন নাকি আমার মার খেয়ে আপনি অকালে মইরা যাবেন? অত সোজা না! মইরা গিয়া আমারে এই অল্প বয়সে বিধবা বানানোর পারমিশন আপনারে কোন কোটকাচারি দিছে? আপনারে মর’তে হইলেও আগে আমার রিটেন পারমিশন নিয়া ম’রতে হইবো, তার আগে এক পা নড়িছেন কি, ল্যাং মাইরা ঠ্যাং খোঁড়া কইরা আপনার নিজের হাতেই ধরাইয়া দিমু!
আরেকটা কথা, আমার হাতের রান্নার যদি কোনোদিন একটাও ভুল ধরছেন, তবে তরকারির সাথে ডিরেক্ট ইঁদুর মারার বিষ মিশায়া খাওয়াইয়া দিমু! লবণের বদলে যদি তরকারিতে চিনিও ঢাইলা দেই, আপনি এক গাল হাইসা বলবেন, ‘আহা! কী চমৎকার ইউনিক রেসিপি আমার জানের!’ এইটুকুই আপনার থেইকা আমার ডিমান্ড। আসল কথা কী জানেন? আমি আপনার শরীরের সাধারণ হৃৎপিণ্ড হইয়া বাঁচতে চাই না, আমি হইতে চাই আপনার ব্লাড প্রেসার; যাতে আপনার মৃ’ত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার অস্তিত্বের প্রতিটা স্পন্দনে শুধু এই তারান্নুমের দাপট আর রাজত্ব আজীবন বহাল থাকে!
উফফ! অনেক ফালতু আর আজেবাজে কথা বইলা ফেললাম, অথচ আসল মনের কথাটাই তো এখনো বলাই হইলো না। জানিনা কেন হুট কইরা বুকটা ধড়ফড় করতাছে, লজ্জায় হাত দুইটা কেমন যেন কাঁপতাছে…”
এখানে তারান্নুম পেনসিল দিয়ে চিবুকে হাত দেওয়া কয়েকটি লজ্জাবতী ইমোজির স্কেচ এঁকে রেখেছে।
ডায়েরির এই পাতার একেবারে শেষ লাইনে এসে তারান্নুম যেন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যটি সঁপে দিয়েছে,
“ধুর! আর লুকাইয়া লাভ নাই, ডিরেক্ট বইলাই ফেলাই—
আমিইইই… আমি আপনারে এই মহাবিশ্বের চাইতেও অনেক অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি, ফারহান খান।”
ডায়েরির এই লাইনটির ওপর ফারহানের চওড়া হাতের তর্জনীটা এসে স্থির হয়ে রইল। দীর্ঘক্ষণ কেবিনের ভেতর আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। তারান্নুমের গভীর প্রেমটা আজ ফারহানের বুকে সীসার মতো ভারী হয়ে বিঁধছে, নিশ্বাস আটকে আসতে চাইছে। সে নিজের অবশ ঠোঁট দুটোকে জান লড়িয়ে সামান্য নাড়াল। মাস্কের প্লাস্টিকের দেয়ালে বাষ্প জমে কুয়াশার আস্তরণ তৈরি হলো। ফারহান ওর চোখের পাতা দুটো শক্ত করে বুজল। আর ঠিক তখনই ওর চোখের কোণ ঘেঁষে এক ফোঁটা ঘন, তপ্ত অশ্রু টুপ করে ঝরে পড়ল ডায়েরির পাতায় ঠিক সেই ‘ভালোবাসি’ শব্দটার ওপর, যেখানে তারান্নুমের ল্যাপটপ-প্রিন্ট-এর মতো নিখুঁত, বাঁকানো হাতের কালির দাগটা কিছুটা লেপ্টে গেল।
ফারহানের মনে হলো, তার অবরুদ্ধ, পাথর হয়ে যাওয়া বুকটা হালকা হয়ে এসেছে। মৃ’ত্যুর ওপার থেকে হলেও তার কুইন, তার জীবনের একমাত্র আরাধনা তারান্নুম যে তাকে নিজের একমাত্র পুরুষ হিসেবে এভাবে অকপটে স্বীকার করে গেছে—এই পরম প্রাপ্তিই তার জ্বলতে থাকা আত্মাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও সান্ত্বনা দিল। ফারহান আর কোনোদিকে চোখ ফেরাতে পারল না; সে কেবল সম্মোহনী চোখে ওই একটিমাত্র শব্দ ‘ভালোবাসি’-র ওপর নিজের ভেজা, চাতক দৃষ্টি স্থির করে রাখল।
কিছুক্ষণ পর পরবর্তী পৃষ্ঠা উলটিয়ে ডায়েরির অন্তিম অধ্যায়ে অবগাহন করল,
“আমি আপনারে এতটাই অন্ধের মতোন ভালোবাসি যে, ঠিক করছি আমি যদি কোনো কারণে অকালে মইরা ভূত-টুত হইয়া যাই, তবে পরকালেও আপনার পিছু ছাড়ুম না! সোজা আপনার ওই চারকোনা বেডের ঠিক পাশের জানলায় সারা রাত পা উপরের দিকে আর মাথা নিচের দিকে দিয়া উল্টা হইয়া ঝুইলা থাকব! আপনি কি তখন ভয় পাইয়া চিল্লাইয়া খাট থেইকা পইড়া যাবেন? একদম না! আপনি বরং গায়ের কম্বলটা আলতো করে সরাইয়া বলবেন, ‘বাইরে অনেক কুয়াশা আর শীত, কুইন। ভেতরে এসো।’
আজ কেন জানি আমার এই ওলটপালট মনের ভেতর একসমুদ্র কথা জমে আছে। আপনারে যদি একবার সামনাসামনি পাই, বকবকানি দিয়া আপনার দুই কান ঝালাপালা কইরা দিব! একটা অদ্ভুত ফিলোসফিক্যাল কথা ভাবলাম, ফারহান—জীবনের গোলকধাঁধায় যদি কোনোদিন মাঝপথে আপনি আমারে হঠাৎ হারাইয়া ফেলেন? যদিও তার একটা চমৎকার সমাধানও ভাবছি। যদি সত্যিই হারাইয়া ফেলেন, তবে মেঘমুক্ত রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল আর জ্বলজ্বলে তারাটার দিকে তাকাইয়া হাইসা একটা চরম সুইট আর রোমান্টিক গালি দিয়েন! আমি আকাশের ওপার থেইকা ঠিক বুঝতে পারব, আমার বজ্জাত, অসভ্য জামাইটা আমারে বড্ড বেশি মিস করতেছে। আপনি কি ভাবছিলেন, চুমুর কথা বলব? ইশশ! কত শখ ব্যাটার! আর আপনি যদি আমার আগে ম’রেন? ওইটা ভাইবা এক ফোঁটাও লাভ নাই! আপনি মইরা ভূত হইলেও এই তারান্নুমের খপ্পর থেইকা রেহাই পাইবেন না, ফারহান খান! আপনি ইহকালেও আমার, আর পরকালের ওই অনন্ত জীবনেও একমাত্র আমারই রেজিস্টার্ড সম্পত্তি!”
ফারহানের ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে সার্থকতার হাসি ফুটে উঠল। সে পরের অনুচ্ছেদে চোখ বুলালো, যেখানে তারান্নুমের লেখনী চপলতা পেরিয়ে গভীর, দার্শনিক রূপ ধারণ করেছে,
“এই দুনিয়ার সব সাধারণ মানুষের কাছে ভালোবাসা মানে হইলো একে অপরের চোখের দিকে ব্যাকুল হইয়া তাকাইয়া থাকা। কিন্তু আমার ডিকশনারিতে ভালোবাসা মানে হইলো—দুইজনে শক্ত কইরা হাত ধইরা, সামনের একই কুয়াশাচ্ছন্ন, ঝাপসা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকাইয়া একসাথে হাসিমুখে পা বাড়ানো। আমি হয়ত শাহজাহানের মতোন আপনার লাইগা মার্বেল পাথরের তাজমহল বানাইতে পারব না; কিন্তু কথা দিচ্ছি, পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যখন আপনার চারপাশটা ঘিরে ধরবে, আপনার দম বন্ধ হইয়া আসবে, আমি তখন একটা ছোট্ট জোনাকি পোকা হইয়া আপনার ঠিক পাশে গিয়া বসে থাকবো। খুব সামান্য, টিমটিমে আলো দেব, কিন্তু ছেড়ে যাব না।
জানেন ফারহান, মাঝেমধ্যে আমার এই অবুঝ বুকের ভেতরটা খুব বেশি ভয়ে কাঁপন দিয়া ওঠে। যদি কোনোদিন আমাদের নিয়তির মাঝে অনেকগুলা পাহাড় সমান দুর্ভেদ্য দূরত্ব তৈরি হয়? যদি সামাজিক কোনো ট্র্যাজেডিতে আমরা একে অপরের চিরকালের মতন অচেনা হইয়া যাই? তখন না হয় আপনি মনের ভুলে শুধু এই ডায়েরির পুরোনো পাতাটা একবার নিজের হাত দিয়া ছুঁইয়া দেখবেন। এখানে হয়ত সময়ের নিয়মে আমার হাতের এই সস্তা জেল পেনসিলের লেখা ঝাপসা হইয়া যাইবে; কিন্তু আপনার প্রতি আমার এই অবাধ্য, বিদ্রোহী টানটুকু ঠিক আগের মতোনই জীবন্ত আর তাজা থাকবে। কারান ভাই আমার জীবনের প্রথম প্রেম হইতে পারে, কিন্তু আপনি আমার জীবনের শেষ গন্তব্য। আর মানুষ যখন নিজের পারফেক্ট গন্তব্যে পৌঁছাইয়া যায়, তখন সে পেছনের ওই এবড়োখেবড়ো রাস্তার দিকে আর ভুলেও ফিরে তাকায় না। আমি আপনার শুষ্ক জীবনে শুধু কয়েকটা লাইনের কোনো সুন্দর, ক্ষণস্থায়ী কবিতা হইতে আসি নাই; আমি আসছি আপনার ম’রণঘাতী অভ্যাসে পরিণত হইতে। মানুষ সুন্দর কবিতা হয়ত সময়ের সাথে সাথে ভুলে যায়, কিন্তু নিজের মজ্জাগত চিরকালের অভ্যাস কোনোদিনও ছাড়তে পারে না।
আচ্ছা ধরেন, যদি সত্যিই কোনো এক কালবৈশাখি ঝড়ে আমি হুট কইরা মা’রা যাই, তাইলে কি আমাদের এই স্বর্গীয় ভালোবাসা এক নিমেষে শেষ হইয়া যাইবে? উঁহুঁ, নেভার! আমার মৃ’ত্যুর পরেই আপনার সাথে আমার আসল সংসার শুরু হইবে। আপনি যখন গভীর রাতে একা এক বুক শূন্যতা নিয়া বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়াইবেন, তখন যে হালকা, হিমশীতল বাতাসটা হুট কইরা আইসা আপনার সিল্কি চুলগুলা ছুঁইয়া অগোছালো কইরা যাইবে, ওইটাই আমি!
মাঝরাতে কোনো কারণ ছাড়াই হুট কইরা যে এক ফোঁটা লোনা জল অকারণে আপনার চোখের কোণ থেইকা টপ কইরা খসে পড়বে, ওইটাও আমি! আমি সারাটা জীবন আপনার চোখের সেই পবিত্র জলটা হইতে চাই, যা চোখের পাতা থেইকা গড়াইয়া পড়ার সময় আপনার ওই শুষ্ক ঠোঁট দুইটারে ছুঁইয়া নাইমা যাইবে। অন্তত মৃ’ত্যুর পরেও আপনার পুরুষালি স্পর্শ পাওয়ার এইটুকুন বিলাসিতা তো আমার সাজে!
আর যদি কোনোদিন আপনার বড্ড বেশি ইচ্ছে করে আমার এই মায়াবী মুখটা সামনাসামনি এক নজর দেখার, তবে সোজা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়া দাঁড়াইবেন, আর নিজের ঠোঁটের কোণের ওই চেনা হাসিটার দিকে গভীর চোখে তাকাইবেন। ওই হাসির কোণে যে উজ্জ্বলতা আর তৃপ্তি দেখতে পাইবেন, ওইটাই আমি! কারণ আমরা দুইজনে আলাদা কোনো মাংসপিণ্ডের সত্তা নই; আমরা একটা অসমাপ্ত মহাকাব্যের দুটো অবাধ্য পঙ্ক্তি, যা এই বাস্তববাদী দুনিয়ায় কোনোদিন পূর্ণতা না পাইলেও মহাকালের পাতায় চিরকালের জন্য অমর হইয়া থাকবে।
ধুর! কী সব উদ্ভট আর ছাইপাঁশ কথাবার্তা বইলা যাইতেছি সেই কখন থেইকা বলুন তো? আসলে আমার এই এক মস্ত বড়ো রোগ, সারাক্ষণ তিলরে তাল বানাইয়া অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা করা! ভবিষ্যতে কী হইবে না হইবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই, অথচ আমি এখনই মইরা ভূত হইয়া জানলায় ঝুইলা থাকার প্ল্যান পর্যন্ত ফেঁদে বইসা আছি! সত্যি, আমার মাথাটার একটা স্ক্রু বোধহয় আসলেই ঢিলা। আসলে আমি খুব ভয় পাই। মাঝে মাঝে বড্ড বেশি একা লাগে। জীবনটা তো খুব অনিশ্চিত, কখন কার হাত ছুইটা যায় কেউ জানে না। এই যে আমরা এক বছর ধইরা এক নজর সামনাসামনি না দেইখাও এতটা পথ চইলা আসলাম, এই ব্যাপারটা আমার ভাবলেই অবাক লাগে।
আচ্ছা ফারহান, বিয়ার পর আমাদের সংসারটা কেমন হইব ভাবছেন কখনো? আমি কিন্তু সব প্ল্যান গুছাইয়া রাখছি। আমাদের চার দেয়ালের ছোট্ট একটা ছিমছাম সংসার হইব। খুব বেশি জাঁকজমক না, একদম সাধারণ আর স্নিগ্ধ। আর সেই ঘরের সামনের দেয়ালে আমাদের দুইজনের বড়ো একখান বাঁধাই করা ছবি থাকব। ধরেন, কোনো এক মেঘলা অলস দুপুরে আপনি অফিস ফেরত ক্লান্ত হইয়া সোফায় গা এলাইয়া দেবেন, আর আমি এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত আইনা আপনারে দিব। আপনি খেতে খেতে আমারে দেখবেন, আর আমি আঁচল দিয়া আপনার ঘাম মুইছা দিব। কিংবা ধরেন, মাঝরাতে যখন পুরা শহর ঘুমে নিঝুম, তখন আমাদের ছোট্ট ঘরটায় টিমটিমে জিরো ওয়াটের নীল আলো জ্বলব। আর মশারির ভেতর আপনার ওই চওড়া বুকে মুখ লুকাইয়া আমি আপনার হার্টবিট গুনব, আপনি তখন এক হাত দিয়া আমার চুলগুলা বিলি কাইটা দেবেন। আর অন্যপাশে আমাদের পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া থাকা বাচ্চার গায়ের ওই অদ্ভুত মিষ্টি, পবিত্র গন্ধটা আমরা দুইজনে একসাথে বুক ভইরা টাইনা নেব।
অথবা ধরেন, কোনো এক অলস বৃষ্টির দিনে আমাদের ঘরের এক কোণে একটা ভাঙা ক্যাসেট প্লেয়ারে খুব মৃদু আওয়াজে কোনো পুরোনো দিনের গান বাজব, আর আপনি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াইয়া একমনে আপনার অফিসের টাইটা বাঁধবেন। আমি তখন আপনার ওই চওড়া পিঠটায় মাথা ঠেকাইয়া মনে মনে আল্লাহরে বলব, ‘ধন্যবাদ, এই মানুষটারে শুধুমাত্র আমার ভাগ্যেই লিখে রাখার জন্য।’
আরেকটা ব্যাপার, ছুটির দিনগুলায় কিন্তু আমারে দিয়া রান্নাবান্না করাইতে পারবেন না, মিস্টার! ওইদিন রান্নাঘরের দায়িত্ব আপনার। আপনি কপালে ওল্ড-স্কুল বাবুর্চিদের মতোন একটা কাপড় বাইন্ধা হাতা-খুন্তি নিয়া যুদ্ধ করবেন, আর আমি দরজায় হেলান দিয়া খিলখিল কইরা হাসমু। মাঝে মাঝে আপনার ওই জিম করা চওড়া পিঠে ধপাস কইরা একটা কিল বসাইয়া দিয়া দৌড় দিমু, আপনিও খুন্তি হাতে আমার পিছে পিছে চোর-পুলিশ খেলবেন।
আমি জানি, আমি বড্ড বেশি একগুঁয়ে। কোনো কোনো দিন হয়ত চরম অভিমান কইরা আমি রান্নাঘরের কোণে মুখ ভারী কইরা বসে থাকব, আর আপনি তখন পেছন থেইকা আইসা আলতো কইরা জড়িয়ে ধইরা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলবেন, ‘ক্ষমা করে দাও না, কুইন।’
ব্যাস! আপনার ওই এক লাইনের ডায়ালগেই সাতখু’নের মাফ!
শুনেছি, সময়ের সাথে সাথে নাকি সব ভালোবাসার রং চটে যায়, মানুষ নাকি চেনা মানুষরেও একসময় সহ্য করতে পারে না। অথচ আমার কাছে ভালোবাসা মানে, প্রতিদিন ওই একই মানুষের প্রেমে নতুন কইরা পড়ার একটা জেদ। বয়স বাড়লে যখন আমাদের চুলগুলো পাইকা যাইব, সেইদিনও যেন কোনো এক গোধূলি বেলায় বারান্দার ইজিচেয়ারে বইসা আপনার ওই কাঁপা কাঁপা শক্ত হাতটা আমি আমার হাতের মুঠোয় রাখতে পারি। বা কখনো চাদর গায়ে মুখোমুখি বইসা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা যেন একে অপরের চোখের দিকে তাকাইয়া ঠিক এই প্রথম বছরের মতনই হাসতে পারি।
আমার কাছে এই মহাবিশ্বের সব আলো একদিকে, আর আপনার ওই শান্ত চোখের এক চিলতে চাতক দৃষ্টি একদিকে—আমি ওইখানেই আমার পুরাটা জীবন পার কইরা দিতে রাজি।
হঠাৎ আপনার জন্য আমার কবিগুরুর বিখ্যাত কিছু লাইনের কথা বড্ড মনে পড়ল:
আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব।
আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাব।
ভরাব না ভূষণভারে, সাজাব না ফুলের হারে,
প্রেমকে আমার মালা করে গলায় তোমার দোলাব।
প্রেম শান্তিরূপেও আসবে, অশান্তিরূপেও আসবে;
সুখ হয়েও আসবে, দুঃখ হয়েও আসবে;
সে যে-কোনো বেশেই আসুক, তার সেই চেনা মুখের দিকে চেয়ে যেন শেষ নিশ্বাস ছাড়ার আগেও বুক ফুলিয়ে বলতে পারি—তোমাকে চিনেছি, বন্ধু তোমাকে চিনেছি।
ইতি,
আপনার জীবনের চিরকালের মস্ত বড়ো হেডেক, ‘গোবরচারিণী”—
তারান্নুম তাজিন সোহা।”
আইসিইউ-এর শ্বেতশুভ্র নিয়ন আলোয় তারান্নুমের ডায়েরির অন্তিম লাইনের নিচে থাকা নিখুঁত স্বাক্ষরটি দেখার পর ফারহানের হৃদ্যন্ত্রের গতি থমকে যাওয়ার উপক্রম হলো। ডায়েরির প্রতিটি অক্ষরের অন্তরালে ফারহান যেন স্পষ্ট দেখতে পেল তার হবু বউয়ের সেই চপল, হরিণী চোখের শেষ মায়াবী চাহনি। সে তার শরীরের সমস্ত অবশিষ্ট নিউরোলজিক্যাল এনার্জি এক জায়গায় এনে, নিজের মুখের ওপর লাগানো অক্সিজেন মাস্কটা শক্ত টানে সরিয়ে দিল। অমনি বাতাসে ভেসে থাকা আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের সেই তীক্ষ্ণ, ক্ষারীয় গন্ধটা সরাসরি ওর ফুসফুসের অ্যালভিওলাইয়ে আঘাত করল।
ফারহানের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু হাসপাতালের এই ডেথ-বেডে শুয়ে থাকা একটা যুবকের সেই হাসির চেয়ে করুণ দৃশ্য বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না। ডায়েরিটা বুকের পাঁজরের শক্ত খাঁচায়, ঠিক যেখানে তার ক্ষ’তবিক্ষ’ত হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করছে, সেখানে সজোরে চেপে ধরল সে। মনে হলো, তারান্নুমের শরীরের জেসমিনের সুবাস এখনো এই ভিন্টেজ কাগজের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে অবিকল মিশে আছে।
অবাধ্য স্মৃতিগুলো ওকে এক লহমায় নস্টালজিয়ার অতল গহিনে ডুবিয়ে দিল। তারান্নুমের সেই আধো-আধো চঞ্চল হাসি, ওর অধিকারবোধ আর মিষ্টি শাসনের সুর—সবই এখন নিঃসঙ্গ বিষাদ হয়ে ফারহানের বুকে ফিরে ফিরে আসছে। ও শূন্য কেবিনের দেওয়ালে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি অভ্যাসের কথা বলেছিলে না, তারা? তোমাকে হারানোর এই প্রতি সেকেন্ডের র*ক্তক্ষরণ আর তিলে তিলে মৃ*ত্যুই এখন ফারহান খানের একমাত্র মজ্জাগত অভ্যাস। না পাওয়াও তো এক ধরনের পরম পাওয়া। এই যে তোমাকে এই জীবনে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারলাম না, অথচ আমার প্রতিটা নিশ্বাসে সারাজীবন শুধু তোমাকেই পেতে চাইব, এ কি ভালোবাসা নয়? আপনি তো ফাঁকি দিয়ে ওপারে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেলেন; কিন্তু আমাকে কেন জ্যান্ত লা’শের মতো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি একা ফেলে রাখলেন, কুইন?”
জানালার ওপারে তখন ঘুটঘুটে, নিকষ কালো অন্ধকার পুরো ঢাকাকে গ্রাস করে নিয়েছে। ফারহান এর মধ্যে ঘোরের বশে বেশ কয়েকবার এই একই চিঠি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে লাগল। কেন যে তারান্নুম তার জন্য আরো কিছু পৃষ্ঠা লিখে গেল না! আরো কিছু বানান ভুলে ভরা, অগোছালো কথাই না হয় লিখত!
আরও এক ঘণ্টা পার হলো। হাসপাতালের দেয়াল ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নয়টা। হঠাৎ করেই ফারহানের চোখের মণি দুটো এক বিন্দুতে স্থির হয়ে গেল। কান্নার সেই আর্দ্রতা মুহূর্তে বাষ্পীভূত হয়ে সেখানে এখন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির তীব্র লেলিহান শিখা জেগে উঠল। সে তার ডান হাতটা ধীরে ধীরে মুঠো করল; ক্যানুলা ভেদ করে কিছুটা র*ক্ত চামড়ার ওপরে চলে এলো, প্রচণ্ড চাপে তার হাতের হাড়ের জয়েন্টগুলো মটমট করে শব্দ তুলল।
সে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে আওড়ালো, “মানুষ হারায়, সম্পর্ক হারায়, মানুষের তৈরি অভ্যাসও একদিন ম’রে যায়; কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক থেকে কোনোদিন বিলীন হয় না তীব্র মেমোরি আর সাইকোটিক অবসেশন। অথচ আই হ্যাভেন্ট লস্ট অ্যানিথিং… আই জাস্ট লস্ট মাই ওয়ার্ল্ড, আই লস্ট ইউ। কিন্তু যারা তোমাকে আমার বুক থেকে নৃশংসভাবে কেড়ে নিয়েছে, আমি এই পৃথিবীর বুক থেকে ওদের প্রতিটা অভ্যাস, প্রতিটা স্মৃতি, প্রতিটা মায়া… এমনকি ওদের পুরো অস্তিত্বটাই পার্মানেন্টলি ডিলিট করে দেব।”
আসলে ফারহান খান নামক সেই আবেগপ্রবণ, ছটফটে ছেলেটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে মা’রা গেছে ঠিক সেই মিলি-সেকেন্ডেই, যখন ভেন্টিলেটরের নিচে তারান্নুমের হৃৎস্পন্দন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের এই সাদা শয্যায় এখন যে দানবটার পুনর্জন্ম নিল, সে এক নির্মম, হিংস্র ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’। তারান্নুমের গায়ের প্রতিটি সূক্ষ্ম র’ক্তবিন্দু আর আঁচড়ের হিসাব সে এবার ওদের ধমনি চিরে কড়ায়-গন্ডায় বুঝে নেবে। এমন নৃশংস ধ্বংসলীলা ওই অপরাধীদের ওপর নামিয়ে আনবে যে, খোদ মৃ*ত্যুর দেবতা যমদূতও সেই প্রতিশোধের দৃশ্য দেখে শিউরে উঠবে।
অন্দরমহলের নিভৃত কক্ষে আম্বিয়ার সামনে গিয়ে কারান ল্যাপটপের সেই ভিডিয়ো ফাইলটা ওপেন করল। ডিজিটাল স্ক্রিনের নীলচে আলোয় ঘরের ভেতরের কুৎসিত নরপশুদের অবয়ব দেখামাত্রই আম্বিয়া এক লহমায় চিনে ফেললেন। বয়সের ভারে যে পিঠ কিছুটা নুয়ে পড়েছিল, রাগের ও প্রতিশোধের তীব্রতায় তা মুহূর্তেই টানটান হয়ে উঠল। তার চামড়া কুঁচকে যাওয়া বয়স্ক হাতটাও আক্রোশে মুঠো হয়ে এলো। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বললেন, “যা সন্দেহ করছিলাম, ঠিক তাই হইল।”
এরপর তিনি আর একটা সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে দৃঢ় পদক্ষেপে রান্নাঘরের অন্ধকার কোণের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে বের করে আনলেন মাছ কাটার সেই বহু পুরোনো, ভারী লোহার তৈরি ধারালো বঁটিটা।
কারান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তার দাদির এই ইস্পাত-কঠিন পদক্ষেপগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। আম্বিয়ার চিরপরিচিত শান্ত, গম্ভীর চাহনি এখন আগ্নেয়গিরির ফুটন্ত লাভার মতো তপ্ত ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। তিনি যখন সেই ধারালো বঁটিটা হাতে শক্ত করে ধরে, উঠান পেরিয়ে সদর দরজার বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে এক পা এক পা করে হেঁটে গেলেন, তখন কারান নিজের পরনের কালো ওভারসাইজড হুডির টুপিটা চোখের ওপর টেনে নিল।
কারানের ঠোঁটের কোণে ক্রূর, পৈশাচিক হাসির রেখা ফুটে উঠল। হুডির পকেটে হাত রেখে ও মাথাটা সামান্য কাত করল। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে এরপর ঠোঁট গোল করে ধীর লয়ের শিস বাজাতে বাজাতে সে সামনে এগোলো। একটুপরই শিসের সুরটা মাঝপথে কেটে দিয়ে আপনমনে ফিসফিস করে বলল, “শিকড়টা বি’ষাক্ত না হলে কি আর ডালপালায় এত বি’ষ থাকে? একজন ঠান্ডা মাথার পারফেক্ট শিকারি হওয়ার এই সাইকোপ্যাথিক বীজটা তাহলে আমি গর্ভ থেকেই নিজের ডিএনএ-তে বয়ে আনছি!”
পুষ্পানগরের শেষ সীমানায় লোকালয় ফুরিয়ে যেখানে বিল আর জঙ্গল শুরু হয়েছে, ঠিক সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত চালকলটি। ব্রিটিশ আমলের এই খাঁ খাঁ চত্বরটিকে বাইরে থেকে ভুতুড়ে মনে হলেও, ভেতরকার প্রকোষ্ঠে তখন পুরোদস্তুর নরক গুলজার চলছে। গুদামের কোণে বসানো সস্তা ডেক্সটার জেনারেটরের একঘেয়ে ঘর্ঘর আওয়াজ স্পিকারের কানফাটানো চটুল হিন্দি গানে ঢাকা পড়ে গেছে। ভেতরের বাতাস ততক্ষণে তামাক, গাঁজা আর দেশি মদের ঝাঁঝালো গন্ধে আচ্ছন্ন। মেঝের একপাশে তাসের আড্ডা, চারপাশে ছড়ানো মদের বোতল, আর ঠিক মাঝখানে এক ভাড়াটে নর্তকীর পায়ের ঘুঙুরের ঝংকারে গোটা গুদামটা উন্মাদনার আসরে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী চেয়ারম্যান আবদুল শামসুজ্জামান নিজের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলগা করে একটা মস্ত বড়ো চামড়ার সোফায় অত্যন্ত আয়েশ করে আধশোয়া হয়ে আছেন। ওনার সামনে কাঠের টেবিলে স্তূপীকৃত ১০০০ টাকার নতুন নোটের বান্ডিল রাখা। তার পাশে গ্লাস ভর্তি বিলাতি স্কচ হুইস্কি। পানের কড়া রসে রাঙানো নোংরা ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে সে বলল, “এইবার তাইলে একখান জবরদস্ত কামের কাম করছি। বর্ডারের ওইপার থেইকা হুন্ডির এই কোটি কোটি টাকা যখন সরাসরি পকেটে আইসা ঢুকে, তখন কলিজাটা এক্কেরে বরফের মতন ঠান্ডা হইয়া যায়। কি কন, ওসি সাহেব?”
তার ঠিক পাশে বসা থানার ওয়ান-ইন-চার্জ প্রদীপ কুমার দাঁত বের করে কুৎসিত চাটুকারিতার হাসি হাসলেন। তার অফিশিয়াল খাকি ইউনিফর্মের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে বসে আছেন তিনি। ওনার পাশে রাখা একটা খয়েরি রঙের চামড়ার ব্যাগে থরে থরে সাজানো ঘুস ও মাসোহারা বাবদ পাওয়া শোষণের সেই নোটের বান্ডিল। তিনি মোটা চুরুটে এক গভীর টান দিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “পুলিশের চাকরিটা তো জাস্ট একটা এক্সটার্নাল স্টিকার, শামসুজ্জামান সাহেব! আসল গেম তো বর্ডারের ওপারেই খেলা হয়। টাকার গন্ধ একবার যে নাকে নিয়েছে, তার নেশা কাটে কি আর সহজে? তখন ওসব আইন-কানুন ফাইলবন্দি হয়ে টেবিলের নিচেই পড়ে থাকে।”
ঠিক তখনই মদের নেশায় চুর হয়ে থাকা শৌভিক মাঝখানে নাচতে থাকা সেই অসহায় মেয়েটির হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে টেনে নিয়ে ওকে কোলে বসালো। তীব্র আকস্মিকতায় মেয়েটির পায়ের ঘুঙুরগুলো ঝনঝন করে উঠল। নর্তকীর ফরসা, সুকোমল চিবুকটা নিজের নোংরা, খসখসে আর ঘামে ভেজা হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরল সে। আঙুলের অতিরিক্ত চাপে মেয়েটির চোয়ালের চামড়া লালচে হয়ে উঠল; সে তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও এই সশস্ত্র অপরাধীদের ডেরা থেকে পালানোর ন্যূনতম সাহস পেল না।
শৌভিক তার মুখের ওপর চুরুটের নিকোটিনযুক্ত বি’ষাক্ত ধোঁয়া ছেড়ে অসভ্যের মতো বিকৃত হাসি হাসল। ওর মুখ থেকে নির্গত তীব্র অ্যালকোহলের উৎকট গন্ধে মেয়েটি খুকখুক কাশি দিল। শৌভিক তখন মেয়েটির কানের লতির কাছে নিজের নোংরা মুখটা নিয়ে কর্কশ ও কামুক সুরে বলল, “এত নড়িস ক্যা, মা*গী? ডরাস? আজ তো তোর কপাল খুলছে রে, জানু! এই যে সামনে কড়কড়ে নোটের পাহাড় দেখছিস, এইটা দিয়া তোরে এক রাতের জন্য কিন্যা নিছি। আজ নাচের তালে যদি একটুও কমতি দেখি, তবে ওই ধলেশ্বরী নদীর চরে তোরে জ্যান্ত পুঁতে আসতে আমার চ্যালাদের দুই মিনিটও লাগবে না। তাই নাটক কম মা’রাইয়া এখন তোর জলওয়া দেখা, জানেমান!
ওয় মুন্নিইই… হে মুন্নি!
মুন্নি বদনাম হুই, ডার্লিং তেরে লিয়ে…
হায় হায় মেরে লিয়ে!”
মেয়েটাকে লাটিমের মতো নিজের অক্ষের ওপর ঘুরিয়ে আবার নাচের দিকে নিয়ে গেল সে। মেয়েটির দু-চোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, কাজলের কালি লেপ্টে গিয়ে গাল দুটো কালচে দেখাচ্ছে। এদিকে শৌভিক নিজের পকেট থেকে ৫০০ টাকার নতুন কড়কড়ে নোটের বান্ডিল বের করে বাতাসে ছুঁড়তে লাগল। নোটগুলো বাতাসে উড়তে উড়তে মেঝেতে ছড়ানো মদের বোতলের ওপর গিয়ে পড়তে লাগল।
নাচের সেই তালে তাল মিলিয়ে শৌভিক নিজেও ওর সাথে শরীর দুলিয়ে নাচতে থাকল। ওর অবাধ্য হাত দুটো মেয়েটির কাঁধ, পিঠ আর কোমরের স্পর্শকাতর অংশে অত্যন্ত নোংরা ও পাশবিক কায়দায় বিচরণ করতে লাগল। মেয়েটি তীব্র ঘৃণায় আর ভয়ে নিজের শরীরটাকে সংকুচিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু শৌভিকের সেই লোহার মতো শক্ত, মত্ত আঙুলগুলোর বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার কোনো উপায় ওর জানা ছিল না। আসরের বাকি জা’নোয়ারগুলো তখন টেবিল চাপড়ে, গ্লাসে গ্লাস ঠুকে শৌভিকের কুৎসিত উল্লাসকে আরও বেশি উপভোগ করছিল।
হাসি-তামাশা, অ’শ্লী’ল ইশারা আর টেবিল চাপড়ানোর পাশবিক উল্লাসে যখন পুরো চালকল মুখরিত, ঠিক তখনই আকস্মিক ও অলৌকিকভাবে জেনারেটরের সেই তীব্র যান্ত্রিক আওয়াজটা এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল স্পিকারের কানফাটানো গান। মিউজিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শৌভিক মদের বোতলটা টেবিলে আছাড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল, “ওই, মা*দা’রচো*দরা! লাইন কাটল ক্যান? কোন হালার পুত জেনারেটর বন্ধ করছে, জলদি গিয়া চেক কর!”
ঠিক সেই মুহূর্তে চালকলের সদর দরজার মুখে একটা দীর্ঘ, ভারী ছায়া এসে পড়ল। চালকলের ভাঙা মরচে পড়া টিনের চালের ফাঁক দিয়ে আসা রুপালি জোছনার আলোয় দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দীর্ঘদেহী পুরুষ অবয়বকে। মুখটা হুডির কালো কাপড়ে ঢাকা থাকায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে লীন, কিন্তু তার সেই একক উপস্থিতিতেই পুরো হলের ভেতরের তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে গেল।
হঠাৎ করেই গুদামের ছাদ থেকে ঝুলতে থাকা একমাত্র জিরো-ওয়াটের বাল্বটা দুই-একবার টিপটিপ করে চিরতরে নিভে গেল। পুরো ঘর এখন নিকষ কালো, ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। সেই অন্ধকারের বুকে কেবল শামসুজ্জামানের চুরুটের অগ্রভাগের লাল আগুনটা এক বিন্দু বিষাক্ত আলোর মতো জ্বলছিল। অকস্মাৎ বনের হিমশীতল হাওয়া ঘরের দরজা-জানালা ভেদ করে ভেতরের নরপশুদের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল।
শামসুজ্জামান আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে নিজের মেটাল টর্চটা জ্বালাতে গেলেন, কিন্তু দেখলেন তার টর্চটা ইতোমধ্যে সেখান থেকে উধাও। তিনি কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠলেন, “কে রে? কোন কু*ত্তারবাচ্চা আসছিস? জানিস এইটা কার আড্ডাখানা?”
নিকষ কালো অন্ধকারের গহিন থেকে একটা বরফশীতল, ভারী এবং প্রচণ্ড গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “আপনার আড্ডাখানাটা বড্ড বেশি কোলাহলপূর্ণ ছিল, মিস্টার আবদুল শামসুজ্জামান। তাই ভাবলাম, চারপাশটা একটু কবরস্থানের মতো নিস্তব্ধ করে দিলে আপনার জীবনের শেষ ঘুমটা অন্তত শান্তিতে হবে।”
মাপা পদক্ষেপে আলোর পরিধিতে এসে দাঁড়াল কারান চৌধুরি। অথচ তাকে ছাপিয়ে ঘরের ভেতরে থাকা প্রতিটা অপরাধীর চোখ গিয়ে আটকে গেল তার ডান হাতে থাকা জেনুইন ট্যাকটিক্যাল কুঠারটার দিকে। চাঁদের রুপালি আলো কুঠারের নিখুঁত, ধারালো ইস্পাতের ফলায় লেগে প্রতিফলিত হয়ে সরাসরি শামসুজ্জামানের চোখের রেটিনায় গিয়ে আঘাত করল।
কারান বাম হাতটা হুডির পকেটে পুরে তার সিগনেচার মেটাল লাইটারটা বের করল। খট করে একটা শব্দ হলো, তারপরই জ্বলে উঠল হলুদাভ আগুন। সেই আগুনের কাঁপা কাঁপা আলোটা শামসুজ্জামানের ঘর্মাক্ত, আতঙ্কিত মুখের ওপর পড়ল। কারান শামসুজ্জামানের পাশেই সোফার ওপর এক পা তুলে, তার একদম মুখোমুখি ঝুঁকে এল। তার চোখ দুটো ঠান্ডা, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। খুব শান্ত স্বরে সে পুনরায় বলল, “ভয় পাচ্ছেন, শামসুজ্জামান সাহেব? রিল্যাক্স। আজরাইল আজ ছুটিতে, তাই আমি নিজেই তার ওভারটাইম ডিউটিটা করতে চলে এলাম। আপনি শুধু কাইন্ডলি বলুন, এই পরিত্যক্ত চালকলের কোন কোনাটা নিজের র*ক্তে রাঙাতে বেশি পছন্দ করবেন?”
শামসুজ্জামান তার কোমরের হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করতে যাবে, ঠিক তখনই তার নজরে পড়ল কারানের ঠিক পেছনে, ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা সাদা সুতির শাড়ি পরিহিত এক বয়োবৃদ্ধ নারী—আম্বিয়া জমাদ্দার। ওনার ডান হাতে শক্ত মুঠোয় ধরা ছিল সেই ঐতিহ্যবাহী মাছ কাটার ভারী লোহার বঁটিটা, যা চাঁদের আলোয় খাঁটি রুপোর মতো ঝিকমিক করে উঠছিল।
Tell me who I am 2 part 21
হাতের বটিটা বাতাসে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে, আম্বিয়া ইস্পাত-কঠিন পায়ে শামসুজ্জামানের দিকে এগিয়ে গেলেন। সরাসরি তার চোখের মণি দুটোর দিকে তাকিয়ে, পাথরের মতো শক্ত গলায় বললেন, “মাইনষের বাচ্চা মনে কইরা তোরে একদিন দয়া দেখাইছিলাম রে বাপ, আইজ বুঝলাম তুই আদতে একটা পশুই রইয়া গেলি। আর পশুর গরম র*ক্ত দিয়া ঘর ধোয়া তো আমগো বংশের পুরোনো স্বভাব!”
