প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৮
insia isha chowdhury
নাফিম শিকদারের উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ শুনে আরিফুল মির্জা মৃদু হেসে বললেন,
“আরে বন্ধু, এত চিন্তা করছিস কেন? কাল রাত থেকে অন্তত একশোর বেশি ফোন দিয়েছিস। তোর মেয়ে কি এখন আর শুধু তোর একার? সূচনা এখন আমারও মেয়ে। তবুও যাতে তুই একটু নিশ্চিন্ত হতে পারিস, তাই বলছি তোর মেয়ে খুব ভালো আছে।”
কথাগুলো শুনেও নাফিম শিকদারের মনের অস্থিরতা যেন একটুও কমলো না। সূচনারা দুই ভাইবোনের মধ্যে সূচনাই ছোট। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল বাবার চোখের মণি। নাফিম শিকদার নিজের সমস্ত আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা ঢেলে মেয়েকে বড় করেছেন। এমনও হয়েছে, সূচনা কোথাও বেড়াতে গিয়েছে কিন্তু এক রাতের জন্য কারো বাসায় থাকা হয়নি। আর আজ? আজ তার আদরের ছোট্ট মেয়েটা অন্যের বাড়িতে, নিজের নতুন সংসারে।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন শূন্য হয়ে উঠলো তার। ধীরে ধীরে এসে সোফায় বসলেন তিনি। সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিলেন। তারপর চোখে থাকা চিকন ফ্রেমের চশমাটা খুলে ক্লান্ত গলায় বললেন,
“আমার মেয়ে ভালো থাকলেই হলো।”
আরিফুল মির্জা এবার গম্ভীর আশ্বস্ত কণ্ঠে বললেন,
“আমরা সবাই তোর মেয়েকে খুব ভালো রাখবো। তুই নিশ্চিন্ত থাক।”
ফোনটা রেখে দিতেই নাফিম শিকদার পেছন থেকে রোকসানা খাতুনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন,
“এতই যখন মেয়ের জন্য ছটফট করছো, তাহলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলে কেন?”
কথাটার ভেতরে ছিল হালকা অভিমান। নাফিম শিকদার মুখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখলেন, রোকসানা খাতুন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে খাবারের ট্রে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ।
নাফিম শিকদার মৃদু হেসে বললেন,
“দেখলে না, আমার আম্মুটা নিজের বিয়ে নিয়ে কত খুশি ছিল? আর তাছাড়া প্রণয়কে জামাই বানানোর আগে আমি যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েছি। ছেলে হিসেবে সে খারাপ না, বরং অনেক ভালো। কিন্তু বাবা হয়ে কি এতটুকু চিন্তাও করবো না? আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটাকে প্রণয় ভালো রাখুক। তাই বারবার খোঁজ নিচ্ছি যে আমার মেয়ে কেমন আছে।”
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়েই তার কণ্ঠটা কেমন ভারী হয়ে এলো। রোকসানা খাতুন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ট্রেটা টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তোমার মেয়েকে নিয়ে তো কিছু বলাই যায় না। কতবার বলেছি, সামনে বিয়ে, সংসার করতে হবে। কিছু কাজকর্ম শিখে রাখ। কিন্তু সে কি কখনো আমার কথা শুনেছে?”
কথা গুলো বলতে বলতেই তার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো।
“এখন আমারও ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। না জানি মেয়েটা ও বাড়িতে কি করছে?”
মেয়েকে নিয়ে এতো অভিযোগ করলেও, রোকসানার কথাগুলোর আড়ালে স্পষ্ট ছিল একরাশ মায়া আর অস্থিরতা। নাফিম শিকদার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
“একটু আগে আরিফুলের সাথে কথা হলো। বলল, সূচনা ভালো আছে।”
রোকসানা খাতুন চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“তবুও মনটা কেমন আনচান করছে। মেয়েকে যতক্ষণ না নিজের চোখে দেখবো, ততক্ষণ শান্তি লাগবে না।”
এরপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
“আপনি এবার খাবারটা খেয়ে নিন। কত বেজে গেছে, এখনো সকালের নাস্তা করেননি।”
নাফিম শিকদার আর কিছু বললেন না। শুধু নিঃশব্দে খাবার খেতে শুরু করলেন।
সূচনা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ধীর পায়ে রুমে ঢুকতেই টের পেল ফোনটা একটানা ভাইব্রেট করছে। বিছানার উপর রাখা ফোনটার স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটা নাম— রাফি। নামটা দেখেই সূচনার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ফোনটা তখনও বেজে চলেছে, যেন ওপাশের মানুষটা মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছে তার কণ্ঠ শোনার জন্য।
কিন্তু সূচনা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নির্বিকার মুখে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে সাইলেন্ট করে দিল। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা উল্টো করে টেবিলের উপর রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরের হালকা বাতাসে পর্দা উড়ছে, সূচনা হাত দিয়ে পর্দা গুলো সারাতেই দমকা হাওয়ায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। কপালে এবং চোখে মুখে আসা চুলগুলো বাঁ হাত দিয়ে
কানের পিছনে সে গুঁজে নিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল প্রণয়। তাকে দেখামাত্র সূচনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
প্রণয় একবার সূচনার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, বিষয়টা সে খুব সিরিয়াসভাবেই বলছে। তাই স্বাভাবিক কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করল,
“হ্যাঁ, বলো। কী কথা?”
সূচনার চোখদুটো এবার আরও স্থির হয়ে উঠল। সে ধীর গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি কি তামজিদকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন?”
প্রশ্নটা শুনেই প্রণয়ের ভেতরে অকারণ বিরক্তি দপ করে জ্বলে উঠল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“তো কী বলব? আমার বউয়ের গায়ে গা লাগিয়ে ঘুরবে, আবার চুমুও খাবে! পুঁচকে একটা ছেলে, আবার আমার বউয়ের গলা ধরে এই কথাও বলা হয়ে গেছে কত সাহস!”
তবে মুখে সেসব কিছুই প্রকাশ করল না সে। কিছু বলার আগেই সূচনা আবার বলে উঠল,
“এখনো পর্যন্ত আমি তামজিদের সাথে ঠিকমতো মজাই করতে পারলাম না, অথচ আপনি ভেবে নিলেন আমি ওকে নষ্ট করে ফেলবো?
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“মানে?”
সূচনা একটু থেমে শান্ত স্বরে বলল,
“আমার ভাইয়েরও একটা ছেলে আছে। ওর নাম রোহিত। আমি সারাদিন ওর সাথে খেলতাম, মজা করতাম। আমার সাথে থাকতে থাকতে ও একদম আমার মতো হয়ে গিয়েছিল। আর তখনই সবাই বলতে শুরু করল, আমি নাকি রোহিতকে নষ্ট করে দিয়েছি।”
প্রণয় এবার কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সবাই এমন বলত কেন?”
সূচনা হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“কারণ ও পড়াশোনার চেয়ে আমার সাথে দুষ্টুমি করতেই বেশি পছন্দ করত। তাই সবাই খুব সহজেই ধরে নিয়েছিল, সব দোষ আমার। আমি নাকি ওকে নষ্ট করে ফেলেছি।”
কথাগুলো বলার সময় সূচনার কণ্ঠে চাপা কষ্ট স্পষ্ট ফুটে উঠল। তারপর সে সরাসরি প্রণয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর আপনিও তো ব্যতিক্রম নন। আপনিও ভেবেছেন আমি তামজিদকে নষ্ট করে দেব।”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
“আমি কি একবারও বলেছি তুমি তামজিদকে নষ্ট করে দেবে?”
সূচনার ঠোঁটে এবার ম্লান হাসি ফুটল।
“কিন্তু আপনি ওকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এর মানে তো এটাই দাঁড়ায় যে আপনি ভয় পাচ্ছেন, আমি তামজিদকে নষ্ট করে দেব।”
কথাগুলো বলেই সূচনা মন খারাপ করে চেয়ারে বসে পাশে থাকা টেবিলের উপর কনুই রেখে চিবুক ঠেকাল। মুখটা গোমড়া হয়ে গেছে তার।
সূচনার এমন মন খারাপ মুখটা দেখে প্রণয়ের বিরক্তিটা খানিকটা নরম হয়ে এল। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“তুমি পুটুর সাথে খেলতেই পারো, কিন্তু…”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকাল।
“কিন্তু কী?”
প্রণয় এবার একটু অস্বস্তি নিয়েই বলল,
“কিন্তু তুমি ওকে বেশি আদর করতে পারবে না। আর ওকেও তোমার এত কাছে আসতে দেবে না।”
কথাটা শুনে সূচনা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
“এটার মানে কী? রোহিত তো আমার সাথে ঘুমাতো আর তামজিদ শুধুমাত্র ছয় বছরের একটা বাচ্চা। আর আমি ওকে আদর করতে পারব না?”
প্রণয় হতভম্ব মুখেই জবাব দিল,
“কিহহ তুমি রোহিতের সাথে ঘুমাতে? আর তামজিদ যতই বাচ্চা হোক তুমি ওকে আদর করবে না।”
সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনি কি সিরিয়াস? একটা ছোট বাচ্চাকে আদর করাতেও সমস্যা?”
প্রণয় মুখ ঘুরিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
“সমস্যা বাচ্চাতে না। সমস্যা হলো ও এইসব আমার বিরক্তিকর লাগছে কি জন্য লাগছে আমি নিজেও জানিনা।”
“কী? কি বললেন আপনি?”
“কিছু না। আমি যা বলেছি, তাই। দূরত্ব বজায় রাখবে। আর কখনো তুমি রোহিতের সাথে ঘুমাবে না।”
প্রণয়ের গম্ভীর মুখ দেখে সূচনা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সূচনা কিছু একটা মনে করে হাতের আঙুলের আরমোড়া ভেঙে বলল,
“স্যার আপনি কি জেলাস ফিল করছেন?”
প্রণয় তৎক্ষণাৎ হেসে ফেলল। তারপর ভ্রু উঁচু করে বলল,
“তোমার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? আমি আর জেলাস? প্রশ্নই আসে না।”
সূচনা এবার সরু চোখে তাকিয়ে রইল প্রণয়ের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তা জীবনে প্রেম করেছেন যে জেলাস ফিল করবেন?”
কথাটা শুনে প্রণয়ের ঠোঁটের হাসিটা কেমন মিলিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে ফোনটা বিছানার উপর রেখে সোজা সূচনার দিকে এগিয়ে এলো। তারপর গিয়ে সূচনার এক বাহু শক্ত করে ধরল। মুহূর্তের মাঝেই তাদের দূরত্ব অনেকটাই কমে গেল।
প্রণয়ের এতটা কাছে আসায় সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করে উঠল। অস্বস্তি হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তবুও সে একচুলও সরে দাঁড়াতে পারল না। বরং প্রণয়ের চোখের গভীরতায় আটকে গেল।
প্রণয় এবার ধীরে ধীরে নিজের মুখটা সূচনার কানের কাছে নিয়ে গেল। সূচনা মুখটা ঘুরিয়ে নিল।
কিন্তু প্রণয়ের উষ্ণ নিঃশ্বাস সূচনার গলায় গিয়ে লাগতেই সূচনার পুরো শরীর শিরশির করে উঠল। প্রণয় যখন ঠোঁট নাড়িয়ে কথা বলতে যাচ্ছিল, তখন তার অধর আলতোভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছিল সূচনার কান। সেই ক্ষীণ স্পর্শেই সূচনা যেন বিদ্যুতের ঝটকা অনুভব করল।
প্রণয় ফিসফিস করে বলল,
“আমার কথা ছাড়ো। আগে তুমি বলো, তুমি কখনো প্রেম করোনি?”
হঠাৎ করে প্রণয়ের এত কাছাকাছি আসা আর এমন প্রশ্ন শুনে সূচনার বুকটা ধপ করে উঠল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সাহস হচ্ছিল না প্রণয়ের চোখের দিকে তাকানোর। সূচনাকে চুপ থাকতে দেখে প্রণয় এবার সামান্য সরে এসে তার বাহু ধরে নিচু স্বরে বলল,
“চুপ করে আছো কেন? নাকি সত্যিই কেউ ছিল?”
কথাটা শুনে সূচনা তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না। কেউ ছিল না।”
উত্তরটা শুনে প্রণয়ের মুখে অদ্ভুত এক স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। যদিও সে সেটা লুকানোর যথেষ্ট চেষ্টা করল। সূচোনা সেটা খেয়াল করেই ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“না মানে… আসলে আমি কখনো প্রেম করিনি, তবে…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই প্রণয় আচমকা সূচনার কোমরে দু’হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। হঠাৎ এমন টানে সূচনার দুই হাত গিয়ে ঠেকল প্রণয়ের বুকের উপর। সূচনা পরপর কয়েক পলক ফেলে প্রনয়ের দিকে তাকালো। কিন্তু প্রণয় বেশ গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
এবং পর্যবেক্ষণ করছে। তা বুঝতে পেরেই সূচনা অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে নিল। প্রণয় কোমর থেকে এক হাত উঠিয়ে সূচনার চোয়াল ধরে মাথাটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে এক ভ্রু বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করে বলল,
“তবে কী?”
সূচোনা এবার মিষ্টি হেসে বলল,
“তবে আমার প্রেমের প্রস্তাব পেতে বেশি ভালো লাগতো।”
কথাটা বলেই সে হালকা করে হাসল। আর সেই হাসি দেখেই প্রণয় বুঝে গেল, তার পুঁচকে বউটা ইচ্ছে করেই তাকে জ্বালাচ্ছে। তবে প্রণয়ও কিছু কম নয়। তাই সেও মুচকি হেসে বলল,
“ও আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না আমার কী ভালো লাগতো?”
সূচনা ভান করা আগ্রহ নিয়ে বলল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৭
“হ্যাঁ বলুন।”
প্রণয় এবার খুব যত্ন করে সূচনার চোখে-মুখে এলোমেলো হয়ে থাকা বেবি হেয়ারগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“তোমার যেমন প্রেমের প্রস্তাব পেতে ভালো লাগতো… আমারও ঠিক তেমন বিয়ের প্রস্তাব পেতে ভালো লাগতো। Same same but different.”
