Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

বৈশাখ মাসের বর্ষনমুখর এক সকাল । সারা রাত ধরে অঝোরে বৃষ্টি নেমে ছিলো । শেষ রাতের দিকেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থাকলেও দিনের আলো ফুটতেই ঝকঝকে সব। তবে সূর্যের আলো খুব একটা গাঢ় নয়। দিনে বৃষ্টি হবে কি-না সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।
চন্দ্রকাননের সবাই বাকি দিনগুলোর মতো আজও সকাল সকাল উঠে পরেছে। ঈদের লম্বা ছুটি শেষে রিশা, রোশনি আর রাফির স্কুল খুলছে আজ থেকে। বাড়ির গিন্নি দের সকাল সকাল ছোটাছুটি তাই আর একটু বেশি। রাইসুল দেওয়ান টেবিলে বসতেই খবর পেলেন কাল বেশ রাত করে ঈশানের ফেরার কথা । এত লম্বা জার্নি করে ছেলেটা নিশ্চয়ই এতো সকালে উঠবে না ! হয়েছেও তাই । বাদ বাকি সবাই উঠে একে একে এসে বসছে ডাইনিং টেবিলে।
রাহেলা আর রিক্তা খাবার দিয়ে দিচ্ছেন সকলকে । রাইসুল সাহেব স্ত্রী কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

—’ তোমার ছেলের সাথে তো দেখা হবার উপায় নেই। বলবে মা ওকে একবার আশ্রমে যেতে বলেছে । তিতির কে সাথে নিয়ে । আজ বিকেলের দিকে গেলেই ভালো হয়। ওখানে দু-একদিন ঘুরে আসুক । মা’র ভালো লাগবে।’
স্বামীর কথায় মাথা নাড়লো রাহেলা । শাশুড়ী তাকে ফোন দিয়েছে । তাদের অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম গুলোতে ভবন নির্মানের কাজ চলছে । বৃদ্ধা নিজে তদারকি করছেন সে সকলের । রাইসুল দেওয়ান রা তিন ভাই প্রতিদিন কেউ না কেউ নিয়ম করে গিয়ে সব দেখে আসেন । তিতির কে দেখতে বড্ড উতলা হয়েছে বৃদ্ধা । ঈশান ফিরলে জরুরি ভাবে ওখানে চলে যেতে বলেছেন।

ঘড়িতে সময় সকাল আটটা পার হয়েছে । গোটা বাড়ির হৈ চৈ মৃদুভাবে কানে আসছে ঈশানেরও। গত রাতে ফ্রেশ হয়ে ঘুমুতে ঘুমুতে রাত দু’টো পার হয়ে গিয়েছিলো। বিছানায় উদোম শরীরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ঈশান। পিঠের মাঝামাঝি অবধি কমফোর্টার টেনে দেওয়া। দু হাত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে মাথার দিককার বালিশটাকে। বাড়িতে এসে বোধহয় এতদিন পর একটু শান্তির ঘুম দিচ্ছিলো। তা এ বাড়ির কারোর বোধহয় পছন্দ হচ্ছে না। ঈশানের ঘুম পাতলা হয়ে আসে দ্রুতই। স্পষ্ট কানে বাজে তার ছোট চাচি মুক্তা কিছু একটা নিয়ে রামধমক দিচ্ছে রিশা কে। রাফি সঙ্গে সঙ্গে চেঁচাচ্ছে তার শার্টের বোতাম আটকে দেওয়ার জন্য। বাকিদেরও আওয়াজ তো আছেই। মোট কথা সকাল সকাল মাথা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ঈশান বিরক্ত মুখে নিভু নিভু চোখে তাকায়। এতো শব্দ তার ঘরে আসার উৎস্য খুঁজতে। পেয়েও যায়। তার বেডরুমের দরজা বেশ হাট করে খোলা। রুমের মালকিন যে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলেই নিচে চলে গিয়েছে। আর সে কারণেই বাড়ির সবার কন্ঠস্বর হুড়মুড়িয়ে তার ঘরে ঢুকছে তা বেশ বুঝতে পারলো। এসব অভ্যস্ত সে। কর্মব্যাস্ততার দিনগুলোতে এমনই হয় এ বাড়িতে। কিন্তু যতদিন তার ঘরের মালিকানা তার নিজের ছিলো ততদিন সেসব হৈ হল্লা তার ঘরে ঢুকতে পারতো না। এখন মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে, পরিবর্তন হয়েছে জীবনধারা।

ঈশান নিজের নাকমুখ ঘষে তুলতুলে বালিশে। বা হাত বাড়িয়ে বেড সাইট টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখে। বেলা হয়েছে। সবাই অফিসে যাবে, পিচ্চিদের স্কুলও আজ থেকেই খুলছে। তিতির ঘরে নেই। মেয়েটার বেশ ভোর ভোর ঘুম থেকে ওঠার স্বভাব। এটা অবশ্য ঈশানের খুব একটা পছন্দ নয়। ঈশান চায় সে ঘুম থেকে না জাগা পর্যন্ত তিতির যেনো বেডেই থাকে। এই যেমন স্পষ্ট মনে আছে রাতে ঈশান ঘুমিয়েছে তিতিরের বুকে মুখ গুজে, ওর উদর আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। অথচ সকাল সকাল নিজে সরে গিয়ে একটা কোলবালিশ ধরিয়ে দিয়ে মেয়েটা ভেগেছে।
এরইমধ্যে শুনতে পেলো নূপুরের শব্দ। নিঃসন্দেহে তিতির আসছে। ঈশান আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে শুলো। তিতিরই ঢুকলো। হাতে কফির মগ। চোখমুখ ফুলো ফুলো। বোঝা গেলো সে মহারানীও বেশিক্ষণ আগে ওঠেনি ঘুম থেকে। শরীরে হালকা রঙের একটা থ্রি পিস জড়ানো। বুকের ওপরে সুতির ওড়নাটা ছড়িয়ে রাখা। ঈশানকে জেগে থাকতে একনজর দেখে চোখ সরিয়ে নিলো তিতির। টেবিলে কফি টা রেখে মিহি কন্ঠে বললো,

—’ কফি টা।’
—’ তোকে কি বলেছিলাম?’
—’কি বলেছিলেন? ‘
—’ আমি ওঠার আগেই ঘর থেকে উধাও হতে নিষেধ করিনি?’
তিতির মুখটা অসহায় দেখায়। শান্ত গলায় বলে,
—’ তা কি হয়? এতো বেলা অবধি ঘুমানো যায়? আমি কখনো এত বেলা অবধি ঘুমাই? তাছাড়া বাড়ির সবাই কি বলবে! ‘
ঈশান কপালের ওপর এসে পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আঙুলে ঠেলে পিছন দিকে দিলো। সোজা হয়ে বসে বিছানার হেলবোর্ডে হেলান দিয়ে বসলো। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ কি ভাববে? বিবাহিত দম্পতি বেলা অবধি ঘুমাচ্ছে। এটাতে অবাক হওয়ার কি?’
তিতির লাজুক মুখ সরিয়ে হাত বাড়িয়ে কমফোর্টার ভাজ করতে হাত লাগালো। ঈশান বিছানা ছাড়লো। কফিতে চুমুক দিতে দিতে এগিয়ে গিয়ে জানালাগুলো খুলে দিলো। বাইরে এখন বৃষ্টি নেই। তিতির ঝটপট গুছিয়ে ফেললো বিছানাটা । টানটান করে ফেললো চাদর । বাথরুমের সামনে পরে থাকা গতরাতের ঈশানের পরনে থাকা ভেজা কাপড়গুলো তুলে রাখলো ময়লা কাপড়ের ঝুড়িতে। ঈশান লক্ষ করে তিতির ওর দিকে তাকাচ্ছে না। তাকালেও কেমন আড়চোখে। চোরের মতোন। লুকেনো দৃষ্টি যাকে বলে আরকি। তার কারণ খোঁজার প্রয়োজন পরলো না। কারণটা ঈশানের জানা। সে এই মূহুর্তে উদাম সরিয়ে দাড়িয়ে আছে। তিতির আলমারি থেকে পাতলা একটা টিশার্ট বের করে বাড়িয়ে ধরলো ঈশানের দিকে। কফিতে চুমুক দিয়ে ভ্রু জোড়া উচুলো ঈশান।

—’ কি?’
—’ পরে নিন।’
—’শাওয়ার তো নেবোই। ‘
তিতির আলগোছে টিশার্ট টা ঈশানের হাতে গুঁজে সরে এলো সেখান থেকে। দ্রুত হাতে গুছিয়ে ফেললো এলোমেলো ঘরটাকে। ঈশানের ব্যাগপত্র,স্যুটকেস সব জায়গা মতো গুছিয়ে রেখে দিলো। ঈশান আড়চোখে দেখে হাসলো। পাকা গিন্নি লাগছে একদম। মেয়েটা এখনো তার নগ্ন,খোলামেলা শরীরে অভ্যাস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। তাকে ওভাবে দেখলেই হাঁসফাঁস করে ওঠে। রাতেও যতদিন ঈশান ওর বুকে মুখ গুজে শুয়েছে, ততদিনই খেয়াল করেছে তিতিরের বুকের বিদ্রোহ।

দুপুরের দিকে একপাক অফিসে গিয়েছিলো ঈশান।
কিছু ফাইলপত্র বাবা চাচাকে দিয়ে আসতে। রাইসুল দেওয়ান বেশ খেপে আছে ছেলের ওপর। অফিসের কোনো কাজে ঈশান ঢাকা যায়নি। হুট করে তাকে না জানিয়েই চলে গিয়েছিলো সেদিন। আবার রাহেলা আর তিতিরকে জানিয়েছে অফিসের কাজে নাকি! মিথ্যা বলার কারন না জানা অবধি রাগ পরবে না তার। অপরদিকে ঈশানও একই রকম জেদি। সে কিছুতেই জানাবে না সে কেনো না বলো, ঠিক কি কারণে গিয়েছিলো।
তিতির নিশির ঘরেই ছিলো। দুপুরের খাবার খেয়ে বোনের সাথে আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়েছে সেখানেই। দিন গড়িয়ে বিকেলও পার হচ্ছে তাও সে নারীর ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষনই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

—’ ভাই সাহেব আমি আপনার কথা অনেক শুনেছি আপনার বন্ধুর কাছে। সারাক্ষণ বলতো। ওর ব্যাবসাটা যখন ডুবতে বসেছিলো কি সাপোর্টটাই না করেছিলেন আপনি। আমি তো জানতামই না আপনিই সেই ব্যাক্তি। ওর সেই বন্ধু রাসু। আজ দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেলেছি।’
বসার ঘরের সোফায় বসা তাহমিদ কায়েস আর তার মা। সাথে অবশ্য এলাকার পরিচিত এক ঘটক সাহেবও আছেন। তবে তিনি বেশ কাচুমাচু মুখে বসা। দেওয়ানদের বাড়ির মেয়েদের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে আসার বুকের পাটা তার থাকলে তবে তো! তবে এই মহিলা তাকে একপ্রকার বগল দাবা করে নিয়ে এসেছেন। তবে যতটা ভীত হয়ে ছিলেন এখানে এসে দেওয়ানদের আতিথিয়েতা দেখে ভয়টা কমে গিয়েছে এরইমধ্যে। মহিলা বেশ আটঘাট বেঁধে বাড়ি এসে হাজির হয়েছে। রাইসুল দেওয়ান এর সাথে আগেই যোগাযোগ টা সেরে রেখেছেন । কথা বলতে গিয়ে মহিলা নিশ্চিত হয়েছেন রাইসুল দেওয়ান তার প্রয়াত স্বামীর কলেজ জীবনের বন্ধু এবং একই সঙ্গে এককালের ব্যাবসার সাহায্যকারী।
রাইসুল সাহেব একগাল হাসলেন। রাহেলা ততক্ষণে চা নাস্তার আয়োজন করে ফেলেছেন। সেও এসে বসেছে স্বামীর পাশে। ঘটকমশাই কে দেখে বুঝতে বাকি নেই বাড়ির কোনো এক মেয়ের জন্য এসেছে এরা! তবে কার জন্য সেটা এখনো অবধি বুঝে উঠতে পারিনি।

—’ তা বাবা, তুমি যে এখানে গতমাসে জয়েন করেছো সেটা তো জানিই। কিন্তু একদম জানতাম না তুমিই নজরুল এর ছেলে।’
তাহমিদ বিনয়ের সাথে মাথা ঝাকালো। নরম স্বরে বললো,
—’ আমি নিজেই জানতাম না আংকেল। জানলে অবশ্যই আরও আগেই যোগাযোগ করতাম।’
এক এক করে নানা কথাই উঠলো দু পরিবার এর মধ্যে। তাহমিদের বাবা মারা যাওয়া, তার আগের জীবন, পরের অবস্থা। বর্তমান সহ সকল কিছু নিয়েই গল্প জমে উঠেছে এরই মধ্যে। রাসেদ সাহেব এবং রহিয়ান সাহেবও ফিরেছেন সবেই। তারাও যোগ দিয়েছেন ভাইয়ের সাথে।

—’ ভাইজান, আপনাদের ছেলেমেয়েদের তো দেখছি না।’
রাইসুল সাহেব ওদিকে রাফিকে ইশারা করে বললো ঈশানকে ডাকতে। নয়ন এখনো ফেরেনি। তাছাড়া মেয়েদের বাইরের মানুষের সামনে হুটহাট ডেকে আনার মানেই হয়না।
দিনের আলো নিভছে রয়েসয়ে। ঈশান টেবিল চেয়ারে বসা। নিস্তব্ধ ঘরে তার ল্যাপটপের খুটখাট আওয়াজ শুধু। আজ অসময়ে হঠাৎ বাবা চাচাদের কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো। এসময় বাড়ি ফেরে না কেউ-ই। অথচ নিচ থেকে ভারি কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।
রাফির ডাকে ঈশান ভারি পায়ে এসে দাড়ালো ড্রয়িং রুমে। ছেলেকে বসতে ইশারা করলেন তিনি। পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ঈশান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদিকে সোফায় বসা পুরুষ মানুষ টার দিকে। এই সেই তাহমিদ কায়েস! কয়েকদিন আগে তমাদের কলেজের ইফতার পার্টি শেষে যে ছেলে টা তিতির তমা কে বাড়ি পৌছে দিতে আহ্লাদ করছিলো। তাছাড়া নিয়াজদের বাড়িতে তিতিরের খোঁজ করতে রেগুলার যায়! ঈশানের ধারনা ছিলো নিয়াজ মজা করে বলছে কথাগুলো। কিন্তু এ বান্দা তো ঠিক মা’কে নিয়ে হাজির হয়ে গেছে তার বউয়ের হাত চাইতে! পাগল বন্ধুগুলোর কথার গুরত্ব না দিয়ে শালা আরেক ভুল করেছে।
ঈশান খুব একটা কথা বলে না। তাহমিদের মা ননস্টপ বলে যাচ্ছে। এখনো অবধি মূল কথায় এসে পৌছায়নি। ঈশান ছোট্ট করে মেসেজ করে নিশিকে। কোনোভাবেই তিতিরকে নিচে না নামতে দিতে বলে রাখে।
মহিলা আর বেশিক্ষণ সময় নিলেন না। ইনিয়ে বিনিয়ে বলেই ফেললেন যা বলতে এসেছেন। গলা কাশি দিয়ে পরিষ্কার করে রাইসুল সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বললো,

—’ আসল কথাটা তাহলে বলেই ফেলি ভাইজান। বিষয়টা নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে আসবো এটা প্রায় পনেরোদিন হলো পরিকল্পনা করে যাচ্ছিলাম। যদি বলেন কেনো আসিনি। তাহলে বলবো কিভাবে বলবো বিষয়টা বুঝতে পারছিলাম না।।’
রাইসুল দেওয়ান একবার আড়চোখে স্ত্রী আর ভাইদের দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্জল কন্ঠে বললো,
—’ এতো ভাবাবার কি আছে ভাবি? যা বলবেন নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন।’
—’আপনার বাড়ির মেয়েকে আমার ছেলের জন্য পছন্দ করেছি আমি। কি যে পুতুলের মতো মুখটা।’
এতক্ষণ আন্দাজ করলেও তাহমিদের মায়ের কথায় খানিকটা থমকালোই সকলে। তার একটা কারণ অবশ্যই আছে। বিবাহযোগ্য মেয়েতো তিনটা। তিতিরের বিয়ের কথাও এলাকায় অজানা। তাছাড়া নিশি সবার বড়,নূরিও যথেষ্ট বড় হয়েছে।
—’ আমার মেয়ে তো ভাবি তিনটা। কার জন্য… ‘
—’ জানি তো ভাইজান। সব খবরাখবর নিয়েই এসেছি আমরা। আপনাদের বিবাহ যোগ্য কন্যা তিনজন। আমরা অবশ্য একটু ডিঙিয়েই হাত চাইবো। মানে বড় দুজনকে জানাশোনা নেই আমার। আমার ছেলে প্রথম দেখেছে আপনাদের ছোট মেয়েকে। মানে আপনার বোনের মেয়েটাকে। ওর নাম তিতির তো? ওর হাত চাইতে এসেছি।’
এতক্ষণ আগ্রহ নিয়ে বসে থাকা দেওয়ান বাড়ির সকলের মাথায় বজ্রপাত হলো যেনো। হতবিহ্বল হয়ে গেলো উপস্থিত সকলেই। ভয়ার্ত মুখে তাকালো ঈশানের দিকে৷ ঈশান বসা তাহমিদের মুখোমুখি। এবং এই মূহুর্তে সকলের তীব্র ধারনা ছিলো কিছু একটা ঘটবে। দক্ষ যজ্ঞ না বাঁধলে হয়। তবে তেমন কিছু ঘটলো না। ঈশানের ভাবলেশহীন চেহারা দেখে অবাক হলো সবাই। আরও খানিকটা অবাক করে দিয়ে তাহমিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

—’ কততম বিসিএস?’
—’ সাতচল্লিশ তম।’
–’বাংলায় অনার্স মাস্টার? ‘
—’জ্বী। ‘
—’ সাহিত্যপ্রেমী বুঝি?’
—’ছোট থেকেই।’
—’ভেরি গুড। তা এখানেই সেটেল হওয়ার চিন্তা আছে? নাকি ঢাকাতে?’
—’ পরিবার পরিজন সবাই ঢাকাতেই। এখানে সম্ভব নয় আরকি ‘
—’আন্ডারস্টুড।’
ঈশানের এতো শান্ত ব্যবহার কিসের পূর্বাভাস বুঝে উঠতে পারছে না কেউ। তবে এসবের মধ্যে বিরক্ত হচ্ছেন সয়ং রাইসুল দেওয়ান। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে নিজের ছেলের সাথে। একটা সময় বাড়ির মেয়ে ছিলো,এখন সে হিসেবের অগ্রগতি সরুপ দেওয়ান বাড়ির বড় ছলের বউ। বড় বউ এ বাড়ির। অথচ তার জন্য নাকি বিয়ের সম্বন্ধ আসে! আসবে নাই বা কেনো। তার অতি বুদ্ধিমান ছেলে তো জনসম্মুখে ব্যাচেলর সেজে থাকতে চায়। কতবার বলা হলো পাঁচ গ্রাম জানিয়ে বিয়েটা সারা হোক। দেওয়ার বাড়ির ছেলেমেয়ের বিয়ে। লুকিয়ে ছাপিয়ে হবে মানে! তা নয়। কোথাকার কোন সমস্যার জের ধরে বিয়ের মতো বিষয় চাপিয়ে রাখতে হবে।
ঈশান বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এটাসেটা জিজ্ঞেস করছে। তাহমিদও সাচ্ছ্যন্দে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। পাত্রীর বড় ভাই বলে কথা। রিশা, রোশনি,রাফি এককোনায় দাঁড়িয়ে ছিলো । রাফি একছুটে গেলো নিশির রুমের দিকে। তাদের বার্বির আবার বিয়ে হবে। মজার ব্যাপার না?
রাইসুল সাহেব স্ত্রীর কানের কাছে মুখ এগিয়ে বিরক্ত স্বরে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

—’তোমার ছেলে পাগল হয়েছে রাহেলা। নিজের বউয়ের বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আর তার সাথে কি-না এতো মাখোমাখো গপ্প ছুড়েছে? ও কি ভুলে গেছে –তিতির ওর বোন নেই, বউ এখন। ‘
রাহেলা ঠোঁট টিপে বসে থাকে। জা’য়েদের দিকে তাকায় অসহায় চোখে। তারাও মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হা করে গিলছে সবটা। বিয়ের প্রস্তাবে খানিক থমকালেও সেটা তেমন কিছু মনে হয়নি তাদের। তবে ঈশানের এই ভাবলেশহীনতা! মাথায় ঢুকতে চাচ্ছে না যেনো।
নিশি, নূরি কাচুমাচু করতে করতে এসে দাড়িয়েছে দোতলার করিডরে। পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে দুজন। ওদের পাশে আগ্রহচোখে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে রিশা রা তিনজন। রিশা, রোশনির বিষয়টা বোঝার বয়স হলেও ছোট্ট রাফি সে-সবের উর্ধ্বে। সে তো খুশির চোটে তিতিরকে ডেকে তুলতে মরিয়া হয়ে আছে। তবে নিশি তাকে টেনেটুনে এনে দাড় করিয়ে রেখেছে।
রাইসুল সাহেব গুটিকয়েক বার গলা খাঁকারি দিলেন। ছেলের মনোযোগ কাঁড়তে চাইলেন নিজের দিকে। তবে তা হলো না। ঈশান মনে মনে বাবার ওপর জেদ নিয়ে বেশ মন দিয়ে আলাপ করছে তাহমিদ এর সাথে। তাহমিদের মা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে সেদিকে। তার দৃঢ় ধারনা মেয়ের ভাইয়ের পছন্দ হয়েছে তার ছেলেকে। পছন্দ না হয়ে যাবেই কোথায়। তার ছেলে তো লাখে একটা!

—’ ভাইজান, আপনার আপত্তি না থাকলে তিতির মা কে একটা বার দেখতে চাই৷ সত্যি বলতে আমি সামনাসামনি দেখিনি এখনো ‘
—’একি! মেয়ে কানা,খোঁড়া কিনা সেটা না জেনেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন আন্টি ? ‘
ঈশানের কথার বাঁকা টান মহিলা সম্ভবত ধরতে পারলো না। একগাল হেসে বললেন,
—’এলাকায় তোমার বোনের রুপ, গুনের প্রশংসা সকলেরই মুখে মুখে ৷ তাছাড়া তোমার বন্ধুর মাও তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ।’
ঈশান চমৎকার হাসলো মহিলার কথা শুনে। সে আরও কিছু বলবে তার আগেই মাঝে কথা বললো রাইসুল সাহেব। ছেলের এতো নির্বিকার রুপ অসহ্য ঠেকছে তার কাছে। ছেলেকে কয়েকবার চোখের ইশারায় মনোভাব বোঝার চেষ্টা করলো। তবে ঈশান ভুলেও তাকচ্ছে না তার দিকোে।
—’ আসলে ভাবি, সত্যি বলতে আমার বড় আরও দুটো মেয়ে আছে। তাছাড়া আমার মা বেঁচে আছেন। নাতিনাতনি দের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত সেই নেন। তিনি আপাতত বাড়িতে নেই। আমি কথা এগোতে পারছি না।’
মহিলা হাসিমুখে জবাব দিলো,

—’ কোনো সমস্যা নেই। আমরা অপেক্ষা করবো।’
রাইসুল দেওয়ান অগ্নি দৃষ্টি দিলো ছেলের দিকে। ছেলের মতিগতি বোঝা দুষ্কর।
—’ আপনাদের ছেলো সত্যিই লাখে একটা। তিতির মায়ের সাথে সত্যিই মানাবে। রাজ যোটক। আমি আমার মায়ের সাথে বিশেষ ভাবে কথা বলবো। এরকম ছেলে আর কোথায় পাবো!‘
ঈশান ভ্রু কুচকে তাকালো বাবার দিকে। তার বাবা যে তার ওপর ক্ষেপে তার বউয়ের বিয়ের তোরজোর শুরু করতে চাচ্ছে তা বুঝতে বাকি নেই তার। অবশ্য রেগে সেও সমপরিমাণ আছে। বিয়ের কথা তো এতক্ষণে হচ্ছে। এদের আদর আপ্যায়ন করো বাড়িডে তো তিনিই এনেছেন। ছেলের বউয়ের জন্য যে শশুর ঘটা করে সম্বন্ধ নিয়ে আসতে পারে। সেই বাপকে আর কি বলা যায়!
আরও ঘন্টাখানেক চললো আলাপ আলচনা। মহিলা একদম আটঘাট বেঁধে নেমেছেন। তবে দীর্ঘ আলাপের পর খানিক হলেও মহিলা দমলো হয়তোবা। জোর দিয়ে জানালো ছেলেকে যদি বিয়ে করান এই মেয়েকেই নেবেন তারা । এতো সহজে হার মানবে না। তিতিরের জন্য এমন ছেলে পাতাল ফুঁড়েও খুজে বের করা যাবে না।
তাহমিদ তার মা’কে নিয়ে বিদায় হওয়া মাত্র রাইসুল দেওয়ান তেড়ে এলেন ছেলের দিকে। তেতে ওঠা গলায় বললেন,

—’বেয়াদব ছেলে । হচ্ছে টা কি এসব? সমস্যা কি তোমার? ‘
ঈশান বসা ছেড়ে উঠে দাড়ালো । তার মুখ স্বাভাবিক এখনো । স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,
—’সেটা তো আমি জিজ্ঞেস করবো। ঘটক বাড়ি আসার সাহস পাচ্ছে কি করে তুমি অনুমতি না দিলে?’
—’ আমি কি করে জানতাম তারা বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসছেম। তাও আবার তিতিরের জন্য। তুমি জানাতে দিচ্ছো না কেনো? সবাইকে জানিয়ে দিলেই তো কেউ এমুখো হওয়ার সাহস করে না।’
—’ আমার সময় মতো আমি ঠিক জানাবো।’
—’ সে সময় কবে হবে? এতোদিনেও কারণ জানালে না–কেনো বিয়ের কথা পাবলিক করতে চাও না তুমি। মানতো পারোনি আমার মেয়েকে? সেটা হলেও বলো। আজ যা ব্যাবহার দেখলাম তোমার। তুমি তো হাসতে হাসতে নিজের বউয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে চাও।’

—’ তুমি শশুড় হয়ে ছেলের বউয়ের সম্বন্ধ টেনে নিয়ে আসতে পারলে, তোমার ছেলে হিসেবে এতটুকু সৌজন্যতা দেখানো তো উচিত বলো?’
রাইসুল সাহেব দ্বিগুণ চটে গেলেন। ঘুরেফিরে তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু হেয়ালি। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
—’ত্যাড়ামি আমার সাথে আর করবে না। তোমার জীবন নিয়ে যা ইচ্ছে করেছো । আমার কলিজার টুকরো দিয়েছি তোমাকে । আমার বোনের আমানত। হৃদয়ে আগলে বড় করেছি। সেটা নিজের কাছে যত্নে রাখতে পারলে বলো। না পারলে সেটাও বলো । আমি ওকে অন্যত্র পাত্রস্থ করবো। ভালো ঘরে । যে সম্মান, পরিচিত, স্বীকৃতি দেবে সমাজে। ভালোবাসবে সবসময়। সেটা প্রকাশে কার্পণ্য করবো না। বলো যদি সেটাই চাও। জানাজানি হয়নি যেহেতু। আর নাই জানুক কেউ। ‘
ঈশানের মুখ এতক্ষণে কঠিন হলো । শক্ত হয়ে গেলো চোয়াল । রাহেলা ছুটে এলেন স্বামীর কাছে। বাহুমূলে ঝাকিয়ে হতাশ কন্ঠে বললেন,
—’ কি যা তা বলছো রাগের মাথায়। ঈশান তো বলেছে ওর কারণ আছো না জানানোর। কি কারণ সেটাও বলেছে। মা আসুক এবার। আমরা ওদের বিয়েটা ধুমধামে দেবো। তাই বলে এসব বলবে?’
ঈশানের রক্তিম মুখের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো রাসেদ সাহেব । ভাই -ভাতিজাকে চেনো। কেউ কারোর থেকে কম যায়না । হুলস্থুল কিছু বাড়াবাড়ি হওয়ার আগে সরানো দরকার দুজনকেই।

বাড়িতে একদফা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেলো অথচ যাকে ঘিরে এতো ঘটনা সে ঘুম থেকে উঠলো সন্ধ্যা সাতটার দিকে । নিশি পাশেই বসে ভার্সিটির এসাইনমেন্ট করছিলো। তিতির আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই ঘরে ঢুকলো রাফি। নিশির জন্য পকোড়া নিয়ে এসেছে নিচ থেকে। তিতিরকে জাগতে দেখে গড়গড় করে বলে ফেললো,
—’তোমার বিয়ে বার্বি?’
সদ্য ঘুম থেকে ওঠা তিতির মুখ তুলে ইশারা করলো। রাফি সদ্য কি বললো সেটা বুঝতে পারেনি সে, সেটা বোঝালো।
নিশি ঠোঁট টিপে হাসছে। পকোড়া তে কামড় বসাতে বসাতে বাঁকা কন্ঠে বললো,
—’ তোর বিয়ের কথা হচ্ছে আরকি। রাফি সেটাই বলছে।’
—’হ্যা?’
রাফি হাত নেড়ে মহা উৎসাহের সাথে জবাব দিলো,
—’ছেলে খুব ভালো। সবাই রাজি। বড় ভাইয়ার সাথে খুব মিল হয়ে গেছে ভাইয়টার। কিন্তু বার্বি। আমার একটা প্রশ্ন আছে।’

—’কি?’
—’ একদিন বড় ভাইয়া কাউকে ফোনে বলছিলো তুনি নাকি তার জিনিস। তাহলে অন্য কাউকে কেনো দিয়ে দেবে বড় ভাইয়া? তুমি তার বউ না? রিশা আপু তো বললো বউয়ের বিয়ে দেওয়া যায়না। কিন্তু ওদিকে যে বড় বাবা বললো বিয়ে দেবে তোমার।’
তিতিরের এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো সে বুঝি টাইম ট্র্যাভেল করছে। দু হাতে চোখজোড়া ডলে বড় বড় করে তাকানোর চেষ্টা করলো নিশির দিকে। তার বিয়ের কথা হচ্ছে মানে কি!
নিশি শব্দ করে হেসে ফেললো তিতিরের বোকা বোকা মুখের ধরন দেখে। বোনের হাত ধরে টেনে নামালো বিছানা থেকে।
—’ফ্রেশ হশে আয়। ঘুম চোখে কি বলছি, বুঝবি কি করে? ‘
ফ্রেশ হয়ে এসে পকোড়া চিবুতে চিবুতে বিকেলে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার বর্ণনা শুনলো তিতির। হাসবে, কাঁদবে নাকি রাগ করবে বুঝে এলো না তার।

জানালার সামনে ঈশানের স্টাডি টেবিলটা। সেখানে বসে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টায় আছে সে। তিতিরটার ওপর রেগে বোম হয়ে আছে। নিজের ঘর রেখে ঘুমিয়েছে অন্য ঘরে যেয়ে। ঈশান গিয়ে নিয়েও আসতে পারছে না। তার ওপর বিকেলের ঘটনাটায় টোটালি ডিসটার্ব সে। রাত করে শাওয়ার নিয়েছে। গরম একদম নেই। বরং বৃষ্টির কারণে বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া। তবুও দড়দড় করে ঘামছে সে। চুলগুলো এখনো জবজবে ভেজা। মুছেইনি যেনো। উদাম শরীরে পানি চিকচিক করেছে। খোলা জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করছে শীতল বাতাস। আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ। আলোয় ঝলমল করছে বাইরেটা।
এমন সময় শব্দ করে দরজা লাগানোর শব্দ পাওয়া গেলো। খুউব পরিচিত মেয়েলি ঘ্রানটা। সাথে নূপুরের রুনুঝুনু শব্দ তো আছেই। ঈশান ঘুরেও তাকালো না। মাথাটা দপদপ করছে। তিতির চেয়ার টেনে ঈশানকে ঘেষে বসলো।
ঈশান ল্যাপটপে হাত চালাচ্ছে। কিবোর্ড এর খুটখাট আওয়াজ গোটা ঘরজুড়ে। দিব্যি টের পেলো একজোড়া চোখ তার দিকেই অপলকভাবে তাকিয়ে। এই দৃষ্টিতে মরণ দেখতে পায় সে নিজের। এলোমেলো হয় সব। গম্ভীর কন্ঠে বললো,

—’ তোর দৃষ্টি হৃদয় ছিদ্র করে ফেলে। কাজে ব্যাস্ত এখন। তাকাবি না ওভাবে ঘনঘন। কনসেনট্রেট করতে পারছি না কাজে।’
তিতির খেয়াল করলো এলোমেলো ফোল্ডার রে ঢুকে অযথা চাপাচাপি করছে কিবোর্ডে। আহামরি কাজ চোখে পরলো না তার।
—’ আমার বিয়ের কথা বললেন কেনো তখন?’
ঈশানের খারাপ মেজাজ আরও খারাপ হলো। এরই মধ্যে সে খবর ম্যাডামের কানেও গিয়েছে। না তাকিয়েই জবাব দিলো,
—’ সম্বন্ধ এসেছে তোর বিয়ের। ছেলে বিসিএস ক্যাডার। সরকারি কলেজের বাংলার টিচার। সাহিত্য জানে,রোমান্টিক হবে টবে। তোর বড় মামা কাছে ছবি। দেখে আয়। পছন্দ হলে বলিস এসে। ‘
তিতিরের মুখ অন্ধকার হলো। সবসময় হেয়ালি। নিশির কাছেও শুনে এলো কি হেসেখেলেই না গল্প করেছে পাত্রপক্ষের সাথে। যেনো বিয়ে দিতে একপায়ে খাড়া। তিতির চেচিয়ে উঠলো। বাজখাঁই কন্ঠে বললো,

—’ বাসর টা করে এসে বলবো । অসহ্য লোক। মাথা খারাপ একটা লোক আপনি। বদ্ধ উন্মাদের সাথে আমার বিয়ে দিয়েছে সবাই । আসছে বউয়ের বিয়ে দিতে।’
ঈশান নিজের চেয়ার টা ঘুরিয়ে নিলো তিতিরের দিকে। ঘুরতেই তিতির খেয়াল করলো ঈশানের উদাম আধভেজা শরীর। টপটপ করে পানি পরছে এখনো চুল থেকে। এ সময় শাওয়ার নিয়েছে লোকটা ৷ ঈশান কিছু বলবে তার আগেই গজগজ করতে করতে উঠে বারান্দার দিকে গেলো তিতির। তোয়ালে এনে মুছে দিলো মাথা টা। উদাম পিঠ মুছে দিয়ে বিছানার ওপর থেকে শার্ট ছুড়ে মারলো ঈশানের দিকে। ঈশান পরলো না বরং গম্ভীর মুখে বললো,
—’ ঢেকেঢুকে চলাফেরা করবি এখন থেকে। রুপ জনগনকে দেখানোর কি আছে? আমি ছাড়া এতো সাজগোছ করে কাকে দেখাবি? কোনো মানে নেই। পাপ এমনিই কম করিসনি। পরপুরুষ কে নিজের রুপ দেখিয়ে পাপের ভাগ আর বাড়াবি না।’
তিতির ডান ভ্রু উচিয়ে বললো,
—’জেলাস?’
—’হওয়া উচিত নয়? ‘
তিতির নিজের মুখে আসা হাসিটুকু আলগোছে গিলে নিলো। ঠান্ডা স্বরে বললো,

—’ বউ তো শুধু ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য। পরিচয় দেবেন না সমাজে। বিয়ে করেছেন সেটা জানাবেন না। নিজের ডিমান্ড ধরে রাখতে ব্যাচলর পরিচয় দেবেন। বউয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আসবে না তাহলে?’
ঈশান স্থির চোখে তাকিয়ে রয় তিতিরের দিকে। তার বাপের মতো হাব ভাব মেয়েটার। ওই এক বিষয় নিয়ে খোটা দিয়ে তাক জ্বালাতে পোড়াতে ব্যাস্ত। আর কয়েকটা দিন। তারপরই তো জানাবে সকলকে। এই কয়টা দিন এদের সহ্য হচ্ছে না। পাত্রের লাইন লাগিয়ে দিয়েছে। এই গাধা মেয়েটাও অভিযোগ করছে একই রকম। ঈশান জোরে জোরে শ্বাস ফেললো। অসহায় স্বরে বললো,
—’ তোকে বিয়ে করাটা লস । বুঝলি? নিজে বাসর করতে পারলাম না। এদিকে তোর আশিকরা পিছু ছাড়েনা। পথঘাট অবধি ঠিক ছিলো। বান্দারা তো সোজা বাড়ি অবধি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে আসছে। ‘
তিতিরের হাসি পেলো ঈশানের বলার ভঙ্গিতে। নিজেও বাঁকা গলায় বললো,
—’ মোটেই লস না। সুন্দরী বউ যেহেতু। ভেবে দেখেছেন! একবার আমার সব আশিকদের হারিয়ে একটাবার কষ্ট করে বাসরটা করে ফেললে। পরবর্তীতে আপনার বাচ্চারা কত সুন্দর হবে?’
ঈশান ঠোট বাকিয়ে হেলান দিয়ে বসলো রকিং চেয়ারটায়। বাসরই করতে পারলো না এতদিনে। তার বাপটা আবার আরেক জায়গায় বউয়ের বিয়ে দিতে ছেলে টেনে নিয়ে আসছে। সেখানে আবার বাসর সেরে রাতারাতি বাচ্চা! হাহ্।

—’ সে মক্কা বহুত দূর জানেমান। আমার এই ফাটা কপাল নিয়ে বাসর না সেরেই বাচ্চার স্বপ্ন আমি আপাতত দেখতে পারছি না। ক্ষমা করবেন। ‘
তিতির পাশ থেকে কোলবালিশ টেনে কোলের ওপর নিলো। জানালার দিকে বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিচেল গলায় বললো,
—’ তাহলে আর কি! দেওয়ান সাহেব এতো সহজেই ফেড আপ? বাপ ডাক শোনার বদলে না হয় মামা ডাক শুনলেন। এটাও বড়ই মধুর ডাক কিন্তু। ‘
গরম তেলে পানি পরলে যেমন ছ্যাত করে ওঠে ঈশানের অবস্থা তেমন হলো এই মূহুর্তে। তিতিরের হেয়ালির কথায় মাথা ঘুরে উঠলো। বলে কি! শেষমেশ মামা! তিতিরের বাচ্চা মামা ডাকবে তাকে? এও মানতে হবে এ জীবনে৷ তা হতে দেবে সে? আশ্চর্য কথা এদের। ঈশান জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,

—’ আসতাগফিরুল্লাহ। আল্লাহ তোকে হেদায়েত দান করুক। জলদি সব বদ চিন্তা থেকে তোকে দূরে করুক। অত্যাচারি নারী থেকে স্বামী সোহাগি করুক। বিবাহিত জীবন পরবর্তী ফরজ কাজটা দ্রুত সেরে ফেলার মতো মনের জোর দান করুক। সবশেষে আমাকে তোর বাচ্চার মামা নয়, বাপ হওয়ার তৌফিক দান করুক। ‘
তিতির রক্তিম মুখে হা করে শুনছিলো ঈশানের পাগলের প্রলাপগুলো। ঈশান চট করে তার দিকে ফিরলো। ওকে ওভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধমকে উঠলো,
—’আমিন বল,অত্যাচারী।’
তিতির হতভম্ব। ঈশান এত উল্টাপাল্টা কথাগুলো কেমন গড়গড়িয়ে বলে গেলো। হাসবে নাকি লজ্জা পাবে টের পাচ্ছে না সে। ঈশান তিতিতের হাত টেনে ধরলো শক্ত করে। ভারি আওয়াজে বললো,
—’ আমি বাদে বাইরের কোনো পুরুষের সামনে নিজের চেহারা দেখাবি না। ওই রুপ,ওই সৌন্দর্য এক আমি ছাড়া আর কোনো পুরুষ দেখবে,প্রশংসা করবে। স্বামী হয়ে আমি সেটা সহ্য করতে পারবো না। বিয়ের স্বীকৃতির বিষয়টা তো? আর ক’টাদিন সময় দে। প্রবলেম গুলো সলভ হলেই আমি জনসম্মুখে সিলমোহর করে তোকে নিজের বলে জানান দেবো। শুধু কোনো পরিস্থিতিতে ভুল বুঝবি না কেমন?’
তিতির আলতো মাথা নাড়লো। মিনমিন করে বললো,

—’ কাল নানুআপুর কাছে যেতে বলছে বড় মামনী। নানুআপু নাকি আমাদের যেতে বলছেন?’
মাথা নাড়লো ঈশান। মা তাকেও জানিয়েছে। এমনকি তার দিদা খানিক আগে তাকেও ফোন করে জানিয়েছে। কাল দুপুরের পরপর রওনা দিয়ে দেবে।
—’ কাল যাবো। লাঞ্চের পর। আমি অফিস থেকে ফিরলেই।’
—’ থাকবো কী কয়েকদিন? ‘
—’ দু-তিন দিন সর্বোচ্চ। অত দূরের পথ। ঘনঘন জার্নিতে শরীর খারাপ করবে তোর।কাল যাবো। মাঝে একদিন। পরের দিন সন্ধ্যার দিকে ফিরবো।’

—’ ঈশান আর তিতিরের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে কি-না সেটার জবাব চাই আমার। দু’দিনের মধ্যে সেটা জানাবে আমাকে তুমি।’
গাট হয়ে বিছানায় বসা নূরি। কানে ধরে রাখা ফোন। সেটার অপর পাশের মানুষ টা সয়ং ইয়াজ মির্জা। মেয়েটার হাত থরথর করে কাঁপছে।
হালকা গলায় কোমোমতে উচ্চারণ করতে পারলো কয়েকটা শব্দ।
—’ ছিহ্ সেটা কি করে হয়। ভাই বোন ওরা আমার। আমি ওদের এতো প্রাইভেট কথা কি করে জিজ্ঞেস করবো। আর সেটা তুমিই বা… ‘
ধমকে ওঠে ইয়াজ। গম্ভীর কন্ঠস্বর আরও বিশ্রি শোনায়।
—’ তোমার বোনটাকে আমার চাই নূরি। আই ওয়ান্ট হার। সবভাবে ওকে চাই আমি। ফিজিকালি,মেন্টালি সবভাবে। ও আমার হবে। আর আমার জিনিস তোমার ভাই ছুঁয়েছে কি-না সেটা জানবো না?’
—’ তিতির আমার ছোট বোন ইয়াজ।’
—’ তো? অ্যাম অ্যাডিকটেড উইথ হার। চাই ওকে আমি। নিজের জিনিস অন্য কেউ আগেই এঁটো করে ফেলেছে কি-না সেটা জানতো হবে না? অবশ্য আমি কাছে টানলো সেটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগবে।’
—’ ত-তুমি অন্য কোনো মেয়ের সাথে… ‘
অশ্লিল হাসলো ইয়াজ। গা শিরশির করে ওঠে নূরির এই হাসিতে।

—’ বহুবার। অভিজ্ঞতা ভুল করে না জান। তবে তোমার বোনটাকে সব ভাবে মানতে রাজি আমি। ওরকম জিনিস নিজের করতে একটু আধতু ছাড় চলে।’
আজকাল ইয়াজের এসব কথা বা কাজে কষ্ট হয়না নূরির। ভালোবাসা মরে গেছে কি? হলেও হতে পারে। ভালোবাসার থেকে ঘৃনার পাল্লা অনেক ভারি হয়ে গিয়েছে। তার হাত পা বাধা। লোকটা তার ভাই বোনের ওপর নিজের ঘৃণিত নজর দিচ্ছে তবুও কিচ্ছু করতে পারছে না সে। লোকটাকে সাহায্য করে যেতে হচ্ছে। না হলে যে অনর্থ ঘটবে। কানে এসে বারি খেলো সেদিন রাতে ইয়াজের বলা সেই কথাগুলো। থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো গোটা শরীর।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৬

—’ দু’দিন সময় জান। অবশ্য ওটা না জানলেও আমার চলবে। তবুও জানতে চাই। বিস্তারিত। সবই।’
নূরি চোখবুঝে থাকে। বন্ধ চোখের কার্নিশ গড়িয়ে অঝোরে ঝরে পরে নোনাজল। ঈশান বারবার বলেছিলো অন্ধের মতো কাউকে ভালো না বাসতে। নিজের ওপর ঘৃনা হয় আজকাল। মরে যেতে ইচ্ছে হয় এমন একটা মানুষ কে ভালোবাসার অপরাধে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৮