Home অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৪

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৪

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৪
Sathi

“আদনানের সঙ্গে জেহেফিল রওনা দিয়েছে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। জেহেফিলের কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। গাড়ির ভেতরের ভারী নীরবতা। গাড়ির এক কোণায় আদনান গুটিসুটি মে*রে বসে আছে। জেহেফিল এত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে যে, আদনানের মনে হচ্ছে তার ক*লিজাটা বুঝি গলায় এসে আটকে গেছে।
” জেহেফিল এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, অন্য হাতে মোবাইলে লোকেশন দেখছে। ঠোঁ*টের কোণে তীক্ষ্ণ, ভ*য়ং*কর এক হাসি ঝুলে আছে। সেই হাসি দেখলে যে কারও বু*কের ভেতর কাঁপন ধরবে। বর্তমানে আদনানের তাই হচ্ছে। ভীষণ মায়া হয় সেতুর জন্য তার।

” সেতু, মিতু আর মেঘ নাস্তা করে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে বসে আছে বাসার সবার অপেক্ষায়। বসে বসে সেতু বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে মেঘ তাকে এক প্যাকেট চিপস দিয়েছে, যা সে পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে খাচ্ছে।
__ মেঘ, আর কতক্ষণ লাগবে? ইশ, আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারতাম।
” সেতুর কথায় ভাইবোন দু’জনের মনে হলো যেন আকাশ থেকে পড়েছে। চোখ বড় বড় করে তারা একসঙ্গে বলে উঠল।
__ সিরিয়াসলি?
” দুইজনকে এমন চিৎকার দিতে দেখে মায়া চোখ ফিটফিট করে তাকায়। কিছু বলার আগেই মেঘ নিজেই বলে ওঠে।
__ কালকে সারারাত নাক ডেকে ঘুমালি, এখন আবার ঘুমের কথা বলছিস?
__ সারারাত না ভাইয়া, সারাদিনটাও বলো। আমরা উঠার এক ঘণ্টা পর ওকে ডেকেছি। তাও নাকি ঘুম হয়নি! আমার তো শুনেই ঘুম আসছে।
” বলে মিতু ঘুমানোর অভিনয় করে। মেঘকে চিমটি দিতেই সেও ঘুমানোর ভান ধরে। তাদের কাণ্ড দেখে সেতু চিৎকার দিতে যাবে, ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন দাঁড়িয়ে যায়।
” মেঘ উঠতেই মোবাইলে কল আসে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে সেতুর বাবা কল করেছে। তাড়াতাড়ি রিসিভ করে কানে দিতেই শুনতে পায়।

__ মেঘ, আমরা বাগানে আছি। তোমরা এসো।
” মেঘ ‘আচ্ছা’ বলে কল কেটে দেয়। তারপর সেতু আর তার লাগেজের দিকে ইশারা করে দুইজনকে হাঁটতে বলে।
” তার ইশারা পেয়ে খুশিতে সেতু লাফাতে লাফাতে বাইরে আসে। বাগানে এসে মা-বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মেঘের মা-বাবাকে সালাম দেয়। তাদের সঙ্গে হালকা পাতলা কথা বলে গাড়িতে উঠে যায়, মেঘ আসতেই।মেঘের পরিবার এক গাড়িতে, আর সেতুর পরিবার আরেক গাড়িতে। তবে সেতু, মেঘ আর মিতু এক গাড়িতেই উঠেছে। গাড়িতে উঠেই কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনতে থাকে সেতু। তার যেন আর কিছুতেই মন নেই।
” মেঘ গাড়ি চালানোর ফাঁকে মুখ ফিরিয়ে সেতুর দিকে তাকায়। মেয়েটা নিজের মতো চুপচাপ আছে দেখে আর বিরক্ত করে না। মনে মনে ভাবে, গ্রামে পৌঁছালে তখন দেখা যাবে। ঠোঁ*টের কোণে চাপা হাসি এনে সামনে তাকিয়ে তী*ক্ষ্ণ গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে সে।

” কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে গাড়ি থামায় মেঘ। পাশে তাকিয়ে দেখে সেতু ঘুমিয়ে গেছে। মিতুকে ইশারা করে নামতে বলে। তারপর নিজে আলতো হাতে সেতুকে ডাকে।
__ সেতু?
__ উম্…
__ তাড়াতাড়ি ওঠো, এসে গেছি আমরা।
__ কী! এসে গেছি? দাদুর বাড়ি? কই কই?
” চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠতেই দেখে মেঘ গোল গোল চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষের হৈচৈ শুনে সেতু গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। পরমুহূর্তেই বিরক্ত মুখে বুঝতে পারে এটা তো স্টেশন! বিড়বিড় করতে করতে গাড়ি থেকে নেমে আসে।

” সেতুর পিছু পিছু মেঘও নামে। টুকটাক সব কাজ সেরে তারা ট্রেনের দিকে হাঁটতে থাকে।
” যেতে যেতে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায় সেতু। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে। কেন যেন মনে হলো একটু আগে কাউকে দেখেছে। কিন্তু দুই সেকেন্ডের মাঝেই মানুষটা কোথায় মিলিয়ে গেল। হঠাৎ অদ্ভুত এক ভয় জেঁকে ধরে তাকে। বু*কের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে থাকে। নিজে থেকেই মেঘের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটতে শুরু করে।
” মেঘ একটু অবাক হয় সেতুর কাণ্ড দেখে। সেতুর ভ*য়ার্ত মুখ দেখে কেমন যেন সন্দেহ হয় তার। নিজেও আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে, কিন্তু সব স্বাভাবিকই লাগে। কিছু না বলে সেতুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে ট্রেনে উঠে নিজেদের সিট খুঁজে বসে যায়।মেঘ ইচ্ছা করেই সেতুর পাশের সিট নিয়েছে। তাই দু’জনে পাশাপাশি বসে। মিতুর সিট একটু দূরে পড়েছে।
” সেতু ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। পরমুহূর্তে পিছনে তাকাতেই বু*ক কেঁপে ওঠে। এত গরমের মাঝেও দুইজন লোক হুডি আর মাস্ক পরে বসে আছে। কেমন অ*দ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার। মনে হচ্ছে চোখ দুটো খুব পরিচিত। অকারণে বু*কের ভেতর ভ*য় জমে উঠছে।
” মেঘের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে।

__ আমার একটু ওয়াশরুম পেয়েছে। আমি ওয়াশরুমে যাবো।
__ ওকে, চল।
__ তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমি পারবো। বসো এখানে।
” মেঘ উঠতে গেলে সেতু থামিয়ে দেয়। দূরে মিতুর দিকে তাকিয়ে দেখে সে দিব্যি মা-বাবার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। তাই আর কিছু না বলে নিজেই একা চলে আসে।
” ওয়াশরুমে আসতেই দেখে এখানে কেউ নেই। কেমন শুনশান পরিবেশ। অথচ বাইরে পুরো স্টেশন মানুষে আর চি*ৎকার-চেঁ*চামেচি*তে ভরা। সেতু ধীরে ধীরে চারপাশে তাকায়। কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। ভয়ে ভয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসে।
” বেসিনে এসে হাত-মুখ ধুয়ে আয়নায় তাকাতেই চমকে ওঠে।
__ আপনি!
” চিৎকার দিতে যাবে, ঠিক তখনই সেই মাস্ক পরা লোকটা তার মুখ চেপে ধরে একটা কাপড় চেপে দেয়। সেতু বিস্ফারিত চোখে লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড যেতেই চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসে।

” সেতুকে জ্ঞান হারাতে দেখে লোকটা বাঁকা হাসে। তারপর তাকে কোলে তুলে নেয়। ঘড়িতে সময় দেখে বুঝতে পারে ট্রেন ছাড়তে এখনও পনেরো মিনিট বাকি। সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে পেরে নিজেই নিজেকে বাহবা দেয়। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাউকে ছোট্ট একটা টেক্সট পাঠায়।
” বিকেল ৪টা।”
” সেতু ফিটফিট করে চোখ খুলতেই সবকিছু কেমন ঝাপসা অন্ধকার লাগে। মা*থাটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে। পি*ঠের নিচে শ*ক্ত কিছু অনুভব করে। দু’হাতে চোখ কচলে উপরে তাকাতেই জেহেফিলের লা*ল টকটকে চোখ দুটো দেখতে পায়। সেই চোখে হিং*স্রতা ভ*য়ং*কর রাগ। ভয়ে সেতু সিটকে দূরে সরে যায়।সঙ্গে সঙ্গে জেহেফিলের কোল থেকে সোজা ফ্লোরে পড়ে যায় সে। জেহেফিল তাকে ধরেও না, বরং রা*গি চোখে তাকিয়ে থাকে।
” সেতু ভ*য়ে ঢো’ক গিলে আশেপাশে তাকায়। দেখে জেহেফিলের পুরো পরিবার সেখানে বসে আছে। সঙ্গে এক লম্বা দাড়িওয়ালা মুরুব্বি, সম্ভবত হুজুর। সেতুর মাথায় যেন কিছুই ঢোকে না। তাহলে কি সেই মাস্ক পরা লোকটা জেহেফিলই ছিল?

__ দেখা শেষ সব? এখন ওঠো, ফটাফট কবুল বলো।
” বলেই হাত ঝাঁ”কি মে*রে জেহেফিল সেতুকে ফ্লোর থেকে টেনে আবার সোফায় বসায়। সেখানে উপস্থিত কেউই কিছু বলার সাহস পায় না। জেহেফিলের রাগ দেখে সবাই ভ*য়ে আছে।
” সেতু অসহায় চোখে চারপাশে তাকায়।। নিজের আপন কাউকে না দেখে বু*কের ভেতরটা মো*চড় দিয়ে ওঠে। ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে কান্না শুরু করে।
__ আমি বিয়ে করবো না।
” সেতুর কাঁপা কাঁপা গলায় বলা কথাটায় অসহায়ত্ব মিশে ছিল। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। বিপরীত জেহেফিল নি*র্দয় ভাবে বলে।
__ তোমার বাপসহ করবে।
__ তাহলে আমার বাপকে করুন, আমাকে ছেড়ে দেন।
__ তোমার বাপকে দিয়ে আমার কাজ নেই।

” কথাটা বলেই জেহেফিল সেতুকে টেনে একদম নিজের গা ঘেঁ*ষে বসায়। চাইলেও দূরে সরতে পারে না সেতু। ভ*য়ে তার পুরো শ*রী*র কাঁপছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
” জেহেফিল যে ভালো মানুষ নয়, সেটা সবাই জানে। সেখানে তাকে এত বড় ধোঁ*কা দিয়ে বিয়ের ফাঁ*দে ফেলেছে। এটা ভাবতেই বু*কের ভেতর আ*তঙ্কে পুরো শ*রী*র জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে।
” ভাবনার মাঝেই কানের কাছে জেহেফিলের ফিসফিস করে বলা কথা শুনে সেতুর শি*রদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যায়।
__ বিয়ে করবে, নাকি নিজের মা-বাবার ম*রা মুখ দেখবে?
__ মানে…?
__ খুব সোজা। তারা ট্রেনে আছে। সেখানে আমার লোক আছে। আমি শুধু বলবো, আর তোমার বাপের খুলি উ*ড়ে যাবে।
” বলেই জেহেফিল মোবাইলে একটা ভিডিও দেখায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সেতুর বাবার মাথায় ব*ন্দুক তাক করে রেখেছে পিছনে বসা এক যাত্রী। ভিডিওর দৃশ্যটা দেখেই সেতুর বু*কের ভেতরটা যেন ছিঁ*ড়ে যায়।
” ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতে যেতে সামলে নেয় সে। চোখ দিয়ে অ*নবরত পানি পড়ছে। মনে হচ্ছে দম ব*ন্ধ হয়ে আসছে তার।

__ হুশ, এখন বলো, বিয়ে করবে নাকি নিজের পরিবারের মৃ*ত্যু দেখবে?
” জেহেফিলের ভয়ংকর শান্ত স্বর। সেই শান্ত স্বরটাই যেন আরও বেশি আ*তঙ্ক বাড়িয়ে দেই সেতুকে।সেতু কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ায়। নিজের চেয়ে পরিবারকে বাঁ*চানোর আকুতি বেশি।বু*কের ভেতরটা শূন্য হয়ে আসে। কাদতে কাদতে বলে।
__ করবো…আমি বিয়ে করবো…
__ গুড গার্ল। কাজি সাহেব, বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৩

” অনুমতি পেয়ে কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। সেখানে তাকা সবাই চুপচাপ, শুধু সেতুর ফুঁ*পিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেতুর এই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা স্বপ্ন, কেউ যদি একবার এসে তাকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁ*চিয়ে নিত! কিন্তু বাস্তব বড় নি*ষ্ঠুর। এখানে তার কান্না শোনার মতো কেউ নেই।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ১৫