এই অবেলায় পর্ব ৩৭
সুমনা সাথী
নবনী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই কেমন যেন অচেনা। অদ্ভুত ঠেকতে লাগল তার কাছে। দিব্যর আচরণে একটা অস্বাভাবিকতা ছিল কিন্তু সেটা যে এতটা কুৎসিত রূপ নেবে তা নবনীর দুঃস্বপ্নেও ছিল না। একটু আগেই দিয়াকে খাওয়াতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে নবনী। অভিমানী মেয়েটা মুখ ফুলিয়ে এককোণে বসে আছে। কিছুতেই খাবে না। কারও সাথে একটা কথাও বলবে না। ইহান আর ইভানও কম চেষ্টা করেনি কিন্তু দিয়ার মনের মেঘ কাটাতে পারেনি কেউ। ছোট্ট মেয়েটার এই অবুঝ জেদ ভাঙাতে এই মুহূর্তে দিব্যকে বড্ড প্রয়োজন ছিল। সে ছাড়া আর কারও সাধ্য নেই দিয়ার মুখে হাসি ফোটানোর। একরাশ হতাশা আর ক্লান্তি নিয়ে নবনী যখন শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। তখনো তার মনে এক চিলতে আশা ছিল। কিন্তু ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই একটা তীব্র কদর্য গালি আছড়ে পড়ল নবনীর কানে। নবনীর পা জোড়া আপনা-আপনি দরজার মুখে আটকে গেল। মনে হলো মাথার ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ঝিমঝিম করে উঠছে। পায়ের তলার মাটিটা আচমকা সরে গেছে। ঘরের ভেতরের আলো-আঁধারিতে নবনী দেখল। তার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ফোনে কারও সাথে কথা বলছে দিব্য। তার চেনা সেই কণ্ঠস্বর এখন অদ্ভুত রকমের কর্কশ, বিষাক্ত। ফোনের ওপাশের মানুষটার উদ্দেশে দিব্য আবারও চেঁচিয়ে উঠল,
“মাদারবোর্ড! মীরজাফর শালা! তুই আমাকে আগে কেন বলিসনি? এই লোকটার মেয়ের জন্য পুতুল আনার কথা ছিল?”
ফোনের ওপাশে অসীমের মেজাজ তখন তুঙ্গে চড়েছে। ইচ্ছে করছিল ওপাশ থেকে ধেয়ে আসা নোংরা গালিগুলো সুদে-আসলে ফেরত দিতে। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের রাগ চেপে গলার স্বর নরম করে বলল,
“এটা তো তার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি কীভাবে জানব?”
“তোর কী মনে হয়? আমি এখানে সারাজীবন থাকার জন্য এসেছি? এখন আমি নিজের সব কাজ ফেলে রেখে ওর মেয়ের রাগ ভাঙাব? মেয়ের জন্য পুতুল কিনতে যাব? আর ওর ওই বউটা! মাগি মানুষ। বলে কিনা তার শপিং করিয়ে দিলেই হবে না! তো কী দেব? চুমু? আমি আসল জিনিসটাই খুঁজে পাচ্ছি না। আলমারি, ওয়ারড্রোব। সব ঘেঁটে দেখে নিয়েছি। আমি কিন্তু রাতে এখানে থাকছি না। কথাটা ওই টাক মাথাটাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিস। ওর সাথে কথা বলার মতো মুড আমার নেই।”
প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সিসার মতো নবনীর কানে এসে বিঁধতে লাগল। পায়ের তলার মাটিটা যেন তীব্রবেগে দুলে উঠল। নিজের কানের ওপর এক চরম অবিশ্বাস জন্মাল তার। কী হচ্ছে চারিপাশে? এসবের মানেই বা কী? তার চেনা। ভরসার মানুষটার মুখ থেকে এমন কদর্য ভাষা? মস্তিষ্ক আচমকা এই তীব্র মানসিক চাপ আর নিতে পারল না। চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসার আগেই সে নিজেকে সামলে নিল। কোনোমতে বুক চিরে একটা অস্ফুট ডাক বের হয়ে এল,
“শুনছেন?”
ডাকটা শোনামাত্র চট করে ঘুরে তাকাল লোকটা। নবনীকে দেখেই তার চোখের পলক যেন থমকে গেল। তবে পরক্ষণেই খুব চাতুর্যের সাথে মুখে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল সে। নবনী ধীর পায়ে ঘরের ভেতর পা বাড়াল। পা বাড়াতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ঘরের অবস্থা একেবারে নাজেহাল! আলমারি, ওয়ারড্রোব সব হাঁ হাঁ করছে। কাপড়া-চোপড়, জিনিসপত্র সব এলোমেলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে। খুব মরিয়া হয়ে গভীর কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়েছে এখানে। নবনীর মনে হলো সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। সবকিছুই এক গোলকধাঁধা বা ভ্রম বলে মনে হচ্ছে তার। তবুও নিজের ভেতরের ঝড়টাকে আড়াল করে। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কিছু খুঁজছিলেন?”
লোকটা একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,
“হ্যাঁ, একটা খুব দরকারি ফাইল। আমি কি তোমাকে কখনো এটা রাখতে দিয়েছিলাম? আমার ঠিক মনে পড়ছে না। খুব জরুরি তো। তাই…!”
নবনী শুকনো ঢোক গিলল। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। সে ধীরস্থির গলায় বলল,
“আপনি আমাকে তো অফিসের বিষয়ে কখনো কিছুই বলেন না। ফাইল হয়তো আপনি নিজেই কোথাও রেখেছেন। ওসব এখন ছাড়ুন। এক মিনিট।”
কথাটা বলেই নবনী তড়িৎ পায়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে দিব্যর একটা হাফ হাতার টি-শার্ট বের করে এনে লোকটার হাতের ওপর রাখল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি এখনো বাইরের পোশাকটা বদলাননি। দ্রুত যান। ফ্রেশ হয়ে নিন। পরে বাকি সব কাজ হবে। ততক্ষণে নাহয় আমিই ফাইলটা খুঁজে দেখছি।”
লোকটা বোধহয় আর কোনো অজুহাত খুঁজে পেল না। একপ্রকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও শার্টটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল সে। দরজাটা বন্ধ হতেই নবনী ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল। দুই হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরল নিজের মাথাটা। মনে হলো মাথার ভেতরটা ঝাঁ ঝাঁ করছে। হাজারটা মৌমাছি যেন একসাথে ভনভন শব্দে ডানা ঝাপটাচ্ছে। হচ্ছেটা কী আসলে? এ মানুষটা যদি দিব্য না হয়। তবে কে? কিন্তু হুবহু দেখতে একটা মানুষ এভাবে বদলে কীভাবে যেতে পারে? এই অবিকল চেহারা। এই কণ্ঠস্বর। সব কীভাবে সম্ভব? আর যদি সে দিব্য নাই হবে। তবে আসল দিব্য কোথায়? কীভাবে এই লোকটা তার ঘরে এসে জায়গা নিল? ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিয়ে হুট করে ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে গেল। লোকটা ভেতরে এতটুকুও সময় নেয়নি। নবনী তীক্ষ্ণ নজরে খেয়াল করল। তার চুলগুলো শুকনো। সে গোসল করেনি। শুধু জামাটা বদলে বের হয়ে এসেছে। অথচ বাইরের থেকে ঘরে ফিরলেই আগে গোসল করাটা ছিল দিব্যর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আপনি কি প্যান্ট নিতে এলেন? আমাকে ডেকে বললেই তো হতো। স্যরি, তাড়াহুড়োয় আমি শুধু জামাটাই দিয়েছিলাম।”
অপর পক্ষ থেকে জবাব এল অত্যন্ত গম্ভীর ও নিরুত্তাপ গলায়,
“দরকার নেই। আমার এখন গোসল করার কোনো ইচ্ছে নেই।”
কথাটা শুনে নবনীর মনের সন্দেহ এবার শতগুণ বেড়ে গেল। সে আর বসে থাকতে পারল না। একটু এগিয়ে গিয়ে লোকটার একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। লোকটা গোসল না করলেও। নবনী তাকে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে যে সুযোগটা চেয়েছিল। তা সে পেয়ে গেছে। নবনী মাথা সামান্য নিচু করে। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সন্ধানী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল লোকটার ডান হাতটা। যেখানে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পোড়া দাগ থাকার কথা। কিন্তু মুহূর্তেই নবনী যেন বোকা বনে গেল। তীব্র এক আশাহত বিস্ময়ে তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। নেই! সেখানে কোনো পোড়া দাগ নেই! এবার যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ল নবনী। তার চেনা জগৎটা এক লহমায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। এক তীব্র দিশেহারা বোধ আর আতঙ্ক গ্রাস করল তাকে। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে আসছে। আমতা আমতা করে কোনোমতে কাঁপানো গলায় বলল,
“আপনি… আপনি একটু খাবার টেবিলে আসুন। আম্মা আপনাকে কী যেন একটা জরুরি কথা বলবেন। এখনই ডেকেছেন।”
লোকটা নিজের ভেতরের তীব্র বিরক্তিটুকু দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে সামলে নিল। নবনীর পিছু পিছু সে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে এল। পাশের ড্রয়িং রুমে অলেখা আর মাজহা পাশাপাশি বসে নিচু স্বরে কথা বলছেন। অলেখা স্বামীর নামে একনাগাড়ে নালিশ করে চলেছে জায়ের কাছে। কথায় কথায় উঠে আসছে কলরবের প্রসঙ্গ। তাদের পাশেই কায়েফ বসে আছে অত্যন্ত বিমর্ষ মুখে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাকে জোর করেই এখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মিলু আপনমনে টিভি দেখছে। কুহু টিভির ঠিক মুখোমুখি বসে থাকলেও তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে হাতের ফোনের স্ক্রিনে। নবনী ড্রয়িং রুমের দিকে আর না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে গেল। লোকটা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসতেই নবনী রান্নাঘরের ভেতর থেকে ডাকল,
“একটু এদিকে আসুন তো।”
অগত্যা লোকটাকে চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতেই হলো। রান্নাঘরে নবনী অযথাই একটা হাঁড়িতে পানি দিয়ে চুলায় বসিয়েছে। ইচ্ছা করেই দুটো ডিম ছেড়ে দিল ফুটন্ত পানির ভেতর। লোকটা নবনীর একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তার তীক্ষ্ণ, ধূর্ত চোখ দুটো অবিরাম নবনীকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এই মুহূর্তে মেয়েটাকে তার বিন্দুমাত্র সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছা করছে কষে দুটো চড় বসিয়ে দিতে। সে এখানে যে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে। তা শেষ করে দ্রুত পার পাওয়ার কথা ছিল তার। অথচ এই মেয়েটা বারবার তার কাজে বাগড়া দিয়ে চলেছে। নবনীর দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। কথা বলতে গিয়ে গলাটা আটকে যাচ্ছে বারবার। আতঙ্কে আর উত্তেজনায় তার শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। চোখের সামনের এই মানুষটার অবয়ব হুবহু এক। নিখুঁত মিল। দুনিয়াতে একই চেহারার দুজন মানুষ তো হতেই পারে! নবনী নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
“আপনি দিয়ার জন্য পুতুল আনতে ভুলে গেলেন। ভালো কথা। কিন্তু আমার আবদারটার কথা তো অন্তত মনে রাখা উচিত ছিল, তাই না?”
লোকটা কেমন যেন একটা চাতুর্যভরা হাসি হাসল। কণ্ঠস্বরে কৃত্রিম কোমলতা ঢেলে বলল,
“আচ্ছা, স্যরি জান। বলো তোমার কী চাই? কালকেই তোমার সব জিনিস এনে দেব।”
নবনী কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। তার বুকের ভেতরটা তীব্র গতিতে ধকধক করছে। লোকটার এই অপরিচিত, নোংরা দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে তার প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছিল। সে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে গেল। এ আর যাই হোক। দিব্য তালুকদার নয়। হতেই পারে না! কিন্তু এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত? সে কীভাবে এই বিপদ থেকে বাঁচবে? নবনীকে চুপ থাকতে দেখে লোকটা অধৈর্য গলায় বলল,
“তোমার আর কিছু বলার আছে? আমার না এখন একদম খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি বরং ঘরে যাই? ফাইলটা খুঁজে আমাকে আবার একটু বাইরে বের হতে হবে। অফিসে একটা খুব জরুরি কাজ পড়ে গেছে।”
নবনী চকিতে চোখ তুলে বলল, “এত রাতে কাজ? কিসের কাজ?”
“তোমাকে বললে তুমি বুঝবে না। আসছি আমি।”
লোকটা ঘুরে চলে যেতে চাইল। ঠিক তখনই নবনী চট করে লোকটার একটা হাত খপ করে ধরে ফেলল। ছোঁয়াটা লাগামাত্র নবনীর সর্বাঙ্গ এক তীব্র ঘৃণায় শিরশির করে উঠল। লোকটা ভ্রু কুঁচকে পেছন ফিরে তাকাতেই নবনী মুখে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। অত্যন্ত কোমল গলায় বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন এভাবে? বউয়ের কাছাকাছি থাকতে কি একটুও ইচ্ছে করে না? কতদিন পর বাড়ি ফিরলেন। কোথায় বউয়ের পেছন পেছন ঘুরবেন। তা না খালি কাজ আর কাজ!”
নবনীর এই আকস্মিক রূপ পরিবর্তন দেখে লোকটা একটু অবাক হলো। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা কুৎসিত হাসি। তার সেই অদ্ভুত, লোলুপ চাউনি দেখে নবনীর গা গুলিয়ে উঠল। আচমকাই লোকটা নিজের একটা শক্ত হাত বাড়িয়ে নবনীর কোমর জড়িয়ে ধরল। তাকে টেনে নিজের আরও কাছে নিয়ে এল। স্পর্শটা পাওয়ামাত্র নবনী থরথর করে কেঁপে উঠল। তার সর্বাঙ্গে যেন এক তীব্র অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠল। লোকটা তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বললে তো আমি সারাজীবন এভাবেই থাকতে রাজি। সোনা…!”
নবনী মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তীব্র অস্বস্তি আর আতঙ্কে সে রীতিমতো কাঁপছে। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল চুলার পাশে রাখা সবজির ঝুড়িটার ওপর। সেখানে চকচক করছে একটা ধারালো ছুরি। নবনী আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। লোকটার বাহুবন্ধনে থাকার ভান করেই সে ডান হাতটা বাড়িয়ে অত্যন্ত সাবধানে ছুরিটা হাতে তুলে নিল। পরের মুহূর্তেই। চোখের পলক ফেলার আগেই সে পুরো শক্তি দিয়ে ছুরিটা চেপে ধরল লোকটার শ্বাসনালী বরাবর সোজা গলায়! হঠাৎ এই অভাবনীয় কাজে লোকটার চোখমুখের সমস্ত রং এক লহমায় উবে গেল। তার দেহের সমস্ত পেশী শক্ত হয়ে থমকে গেল সে। এমন একটা পাল্টা আঘাত সে দূরতম দুঃস্বপ্নেও আশা করেনি। নবনী ছুরির হাতলটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল,
“কে আপনি? উনি কোথায়?”
লোকটার মুখভঙ্গি মুহূর্তে পালটে গেল। আশাতীত এই আঘাতের পর সে নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। এতটুকুও ভয় না পেয়ে সে আবারও কুটিল হাসি হাসল। তার চোখ জোড়া এক অদ্ভুত হিংস্র আলোয় চকচক করে উঠল। যেন অত্যন্ত আহত হয়েছে। এমন ভান করে অবলীলায় বলল,
“এসব কী জান? মজা করছো আমার সাথে? আয় হায় গুরু! আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব।”
নবনী নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে ছুরির হাতলটা আরও চেপে ধরল। ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ আর আতঙ্ক উগড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠল,
“আমি জিজ্ঞেস করেছি কোথায় উনি? কোথায় দিব্য তালুকদার? কে আপনি? কেন এসেছেন এখানে?”
নবনীর চিৎকার রান্নাঘর ছাড়িয়ে ড্রয়িং রুমে আছড়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে অলেখা, মাজহা, কুহু, কায়েফ সবাই হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে হাজির হলো। দরজার মুখে এসে যা দেখল। তাতে প্রত্যেকের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। নবনী স্বয়ং দিব্যর গলায় ধারালো ছুরি ধরে দাঁড়িয়ে আছে! এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে অলেখা প্রথমে আতঙ্কে ও বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“নবনী! এটা তুমি কী করছ হ্যাঁ? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? সরাও ওটা! দিব্যর লেগে যাবে তো! এটা কি খেলার জিনিস?”
লোকটা পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিতে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। মুহূর্তের মধ্যে সে তার মুখভঙ্গি করুণ আর নিরীহ করে ফেলল। কণ্ঠে একরাশ অসহায়তা ঢেলে দিয়ে অলেখার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেটাই তো আম্মু! নবনী, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? একটা সামান্য বিষয় নিয়ে তুমি আমার গলায় ছুরি ধরছ? আর ইউ ক্রেজি?”
নবনী ক্ষোভে ফেটে পড়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল, “একদম নাটক করবেন না! যেটা জিজ্ঞেস করেছি সোজা সেটার জবাব দিন। কোথায় দিব্য তালুকদার? কী করেছেন উনার সাথে? কেন করছেন এমন জঘন্য নাটক? কী চাই আপনার?”
কুহু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অস্ফুট স্বরে বলল, “ভাবি, তুমি এসব কী বলছ? ভাইয়া কোথায় মানে? ভাইয়া তো তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, তাই না?”
“না কুহু, এটা তোমার ভাইয়া নয়! এই লোকটা কে আমি জানি না। কেন এসেছে এখানে। ওকে জিজ্ঞেস করো!”
লোকটা আবারও নির্দোষ গলায় বলল, “নবনী, তোমার এমন কেন মনে হচ্ছে এটা আমি না? এসব কী আবোলতাবোল বলছ তুমি?”
অলেখা চরম বিরক্ত আর হতাশ হয়ে বললেন, “সেটাই তো! আচ্ছা নবনী। তোমার মাথায় কি কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? ও দিব্য না। একথা কীভাবে তোমার মনে হলো?”
নবনী বলল, “আমি ঠিকই বলছি আম্মা। উনি দিয়াকে কখনো ‘মা’ বলে ডাকেন না। সবসময় ‘মাম্মা’ বলেন। আর পৃথিবী উল্টে যেতে পারে কিন্তু দিব্য তালুকদার তার মেয়েকে দেওয়া কথা ভুলে যাবে? এটা কখনোই সম্ভব না। মেয়ে কাঁদবে আর উনি স্বাভাবিক থাকবে। এটাও সম্ভব না৷ কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রমাণ…।”
নবনী একঝটকায় লোকটার হাতটা সামনে তুলে ধরে বলল,
“কিছুদিন আগের সেই আগুনে উনার হাতটা পুড়ে গিয়েছিল। সেই পোড়া দাগটা উনার হাতে এখনো স্পষ্ট থাকার কথা। কিন্তু এই লোকটার হাতটা দেখুন। একদম মসৃণ! কোনো দাগ নেই! আপনারা নিজের চোখে চেক করুন। এই লোকটা কোনোভাবেই দিব্য হতে পারেন না!
আচমকা পেটের ওপর একটা শীতল, শক্ত ধাতব স্পর্শ অনুভব করতেই শিউরে উঠল নবনী। শাড়ির পাতলা সুতো ভেদ করে সেই শীতল ছোঁয়াটা সরাসরি গিয়ে ঠেকেছে তার উদরে। চোখ নামিয়ে সেদিকে তাকাতেই নবনীর বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। লোকটার এক হাতে রিভলভার। অত্যন্ত নিখুঁত নিশানা করে সে ধরে আছে নবনীর পেট বরাবর। নবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে লোকটার ঠোঁটের কোণে এবার ফুটে উঠল এক পৈশাচিক ও হিংস্র হাসি। অবলীলায় স্বীকারোক্তি দিয়ে বলল,
“ইন্টেলিজেন্ট! আই অ্যাম ইমপ্রেসড। ঠিক ধরেছিস। আমি ওই মালটা নই। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যাব৷ ভাবতেই পারিনি। আমার ইতিহাসে এটাই প্রথম। আয় হায় গুরু! আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব!”
কথাটা শেষ করেই এক বীভৎস অট্টহাসিতে মেতে উঠল লোকটা। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অলেখা, মাজহা, কুহু আর কায়েফ যেন এক পলকে পাথর হয়ে গেল। তাদের শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেছে। অবশ হয়ে গেছে সমস্ত বোধবুদ্ধি। চোখের সামনে এ কোন কাকে দেখছে তারা! লোকটা নবনীর পেট থেকে অস্ত্রের নলটা একচুলও সরাল না। ছুরি ধরে থাকা নবনীর হাতটা এবার থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। সেই কম্পন ছড়িয়ে পড়েছে তার সারা শরীরে। এর আগে কখনো স্বচক্ষে আসল বন্দুক দেখেনি সে। কাঁপা গলায় বলল,
“কে আপনি? আমি আবারও জিজ্ঞেস করছি। কে আপনি?”
লোকটার বিকট হাসিটা আচমকাই থেমে গেল। মুখ জুড়ে নেমে এল এক শীতলতা। নির্লিপ্ততা। সে চোখের মণি জোড়া শক্ত করে বলল,
“ছুরি নামা! নয়তো দেখছিস তো এটা? এই ছুরি দিয়ে আমাকে শেষ করার আগে তুই সোজা জান্নাতে চলে যাবি। আর খবরদার! দরজায় যারা দাঁড়িয়ে আছিস। একটাও এখান থেকে নড়বি না। নড়লেই এই মেয়েটাকে সোজা পরপারে চালান করে দেব। আমার কিন্তু সিস্টেমে সমস্যা আছে। মাথা গরম হলে আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখি না।”
কিন্তু নবনী দমল না। ছুরির হাতল আরও শক্ত করে ধরে বলল,
“আমি ওপরে গেলেও আপনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে তারপর যাব। চিন্তা করবেন না। এখন সোজা বলুন। কে আপনি?”
লোকটা ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, “ওহ, পাখি! আমার পরিচয় জানার জন্য এত উতলা? নিজের বরের চেয়ে কি আমাকে বেশি ভালো লেগে গেল নাকি? কিন্তু দুঃখিত বেবি৷ আমি ইনটেক জিনিসের প্রতি আগ্রহী। অন্য কারও মুখ দেওয়া পানির বোতলের পানিই আমি খাই না। আর তুই তো…! নাহ, হবে না। তবে তোর এই এটিটিউড লেভেল জাস্ট ওয়াও! আই লাইক ইট।”
নোংরা কথাগুলো নবনী চোখমুখ কুঁচকে সহ্য করল। কায়েফ চিৎকার করে উঠল,
“এই! ছাড়ো উনাকে! কে তুমি? আর তুমি যদি আমার ভাইয়া না হও। তাহলে আমাদের ভাইয়া কোথায়?”
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “আমি নকীব নওরোজ। কোনো রাস্তার সস্তা গুন্ডা-বদমাইশ না যে তোরা এই ছুরি-কাঁচি দেখিয়ে আমার সাথে টক্কর দিবি। নির্বোধের দল! এখন আমার কথা কান খুলে মন দিয়ে শোন। আমি প্রশ্ন করা একদম পছন্দ করি না। এরপর থেকে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবি না। বেশি প্রশ্ন করলে আমার মেজাজটা চট করে খারাপ হয়ে যায়।”
নকীব একটু থামল। তার চোখের মণি জোড়া কুটিল এক আলোয় চকচক করে উঠল। পরমুহূর্তেই দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আমি এখানে তোদের হাতের রান্না বিরিয়ানি খেতে আসিনি। কাজে এসেছি। মুখ বুজে নিজের কাজটা মিটিয়ে সোজা কেটে পড়তাম। খামোখা বাড়াবাড়ি করে তোরা নিজেদের কবর নিজেরা খুঁড়লি। তোদের ওই মালটা। মানে দিব্য তালুকদার এখন আমার কাছে বন্দী। তাই একদম ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করবি না। তোদের ভালোর জন্যই বলছি। চুপচাপ আমাকে আমার কাজটা করতে দে।”
নবীর উদরে চেপে থাকা সেই রিভলভারের নলটা একটু শিথিল হতেই সে সমস্ত শক্তি দিয়ে নকীবকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল। নকীব যেন একটু মজাই পেল। সে পিছলে গিয়ে হাতের বন্দুকটা আঙুলের ডগায় লাটিমের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“একটা কথা তোরা সবাই কান খুলে স্পষ্ট শুনে নে। এখানে যে কজন দাঁড়িয়ে আছিস। তোরা ছাড়া এই বাড়ির আর কোনো মানুষ যেন বিন্দুমাত্র টের না পায় যে আমি আসল দিব্য তালুকদার নই। তোরা যা জেনেছিস। তা এই মুহূর্তেই ভুলে যা। আমি তোদের জান নিতে আসিনি। অকারণে মানুষ খুন করা নকীব নওরোজের স্বভাব না। আমাকে শান্তির সাথে আমার কাজটা করতে দে। কাজ শেষ হলে আমি নিজে থেকেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। অবশ্য তোদের হাতে এই মুহূর্তে অন্য কোনো বিকল্পও খোলা নেই। যদি বেশি তড়পানোর বা চালাকি করার চেষ্টা করিস। তবে তোদের ওই দিব্য তালুকদারকে সোজা পরপারে পাঠিয়ে দেব। গট ইট?”
কথাটা শেষ করেই নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেলতে দুলতে। শিস কাটতে কাটতে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল লোকটা। সে চোখের আড়াল হতেই নবনীর টানটান হয়ে থাকা শরীরটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। তীব্র মানসিক চাপ আর আতঙ্কে তার পুরো শরীরটা দুলে উঠল। ভারসাম্য হারিয়ে সে যখন প্রায় মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দেয়ালটা আঁকড়ে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল সে। কায়েফ দ্রুত এগিয়ে এসে এক গ্লাস পানি নবনীর দিকে বাড়িয়ে দিল। জিজ্ঞেস করল,
“ভাবি, ঠিক আছেন আপনি?”
নবনী কাঁপতে থাকা হাত দুটো দিয়ে কোনোমতে পানির গ্লাসটা নিল। মুখের ভেতরের শুষ্কতা দূর করতে এক চুমুক পানি গিলে সে মৃদু মাথা নাড়ল। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি তখনো দরজার দিকে স্থির। পেছন থেকে ততক্ষণে কান্নার রোল উঠেছে। অলেখা আর নিজের ভেতরের ভয়টাকে চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ছেলের এই আকস্মিক বিপদ আর চোখের সামনে এমন একজন৷ তাঁর বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে।
গভীর নিস্তব্ধ রাত। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। জনমানবহীন রাস্তার পাশে একলা জেগে জ্বলছে একটা ল্যাম্পপোস্ট। সেই হলদেটে আলোর নিচে নিথর হয়ে পড়ে আছে র*ক্তাক্ত, থেঁ*তলে যাওয়া একটা মানবদেহ। পাশে পড়ে থাকা বাইকটার অবস্থাও বি*ধ্বস্ত, ভগ্ন। চুইয়ে পড়া তাজা র*ক্তে ল্যাম্পপোস্টের নিচের কালো পিচ রাস্তাটা যেন ভেসে যাচ্ছে। কলরব বারবার শুকনো ঢোক গিলার চেষ্টা করল। কিন্তু অবাধ্য গলাটা তপ্ত মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। সে তার অর্ধনিমীলিত চোখের পাতা দুটো প্রচণ্ড কষ্টে মেলে শেষবারের মতো দেখার চেষ্টা করল তাকে পিষে দিয়ে যাওয়া ঘাতক ট্রাকটার দিকে। লাল পেছনের আলোটা দুলতে দুলতে কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত তারা যত দ্রুত সম্ভব এই মৃ*ত্যুকূপ থেকে কেটে পড়েছে। ধরা পড়লে সমস্যা।এত তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে যে। ঘাতক চালক হয়তো ধরেই নিয়েছে এই বাইক চালক আর বেঁচে নেই।
কলরব আর পারল না নিজের চোখের পাতা ধরে রাখতে। মাথা থেকে তার হেলমেটটা কখন যেন ছিটকে বহু দূরে চলে গেছে। মাথার কোনো একটা অংশ বোধহয় ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। অদ্ভুত ব্যাপার। কলরব এখন আর কোনো শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে না। এক অবশ অসাড়তা গ্রাস করছে তার সর্বাঙ্গ। সে শুধু বুঝতে পারছে। তার চোখের সামনের চেনা জগৎটা ধীরে ধীরে এক অন্তহীন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। সে কি তবে মরে যাচ্ছে? জীবনের এই মোড়ে এসে, এভাবে? আচ্ছা শেষবারের মতো কি আর কারও মুখটা দেখা হবে না? তাকে যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ভুল বুঝে গেল। তাদের সেই ভুল ভাঙানোর সুযোগটা কি আর কোনোদিন আসবে না? একরাশ ঘৃণা আর অপবাদ মাথায় নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হবে? এটা কেমন নিয়তি। কেমন মৃ ত্যু! মৃ*ত্যুর এই হিমশীতল পরশ গায়ে লাগতেই কলরব তীব্রভাবে উপলব্ধি করল। সে ম রতে চায় না। সে বাঁচতে চায়! কিন্তু এই ফাঁকা রাস্তায় কোনো জীবের দেখা মিলছে না। তবে কি সে এভাবেই শেষ হয়ে যাবে। এক অজানা আতঙ্কে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ভীষণভাবে বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করল। শরীরটাকে একটু নাড়াতে চাইল। কিন্তু পারল না। শরীরটা বড্ড ভারী ঠেকছে। যেন টনকানি ওজনের কিছু চেপে বসেছে তার ওপর। চেতনার শেষ বিন্দুটা মিলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে কলরবের চোখের সামনে তার মা অলেখার মুখটা ভেসে উঠল। মায়ের সেই স্নেহমাখা মুখটার দিকে চেয়ে সে ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক করে অত্যন্ত অস্ফুট স্বরে ডাকল,
“আম্মু… ও আম… আম্মু…!”
উঁহু, কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভাঙল না। তবে পরক্ষণেই কলরবের এক অদ্ভুত বিভ্রম হলো। তার মনে হলো অলেখা যেন দূর থেকে হেঁটে তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। ওই তো, মা এসে তার রক্তাক্ত মাথার কাছে বসলেন। পরম মমতায় মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক যেমনটা ছোটবেলায় দিতেন। যেন ফিসফিস করে বলছেন। অনেক হয়েছে। এবার ঘুমো তো সোনা। কলরব শান্ত ছেলের মতো চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। ঠিক তখনই আরও একটা চেনা, মায়াবী হাসিমুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এই মেয়েটার জীবনের সবচেয়ে বড়ো কান্নার কারণ তো ছিল সে নিজেই! আজ অবিন্যস্ত স্মৃতির পাতায় মেয়েটি হাসছে। হাসবেই তো। আর বোধহয় তাকে এই পাষণ্ডের জন্য কাঁদতে হবে না। তার জীবনের সমস্ত কান্নার কারণটা যে আজ চিরতরে মুছে যাচ্ছে। তাকে কেনো দেখছে সে। ওর বুজে এলো না। কলরব শেষ একটা আপ্রাণ চেষ্টা করল জোর করে চোখ দুটো মেলার। কিন্তু লাভ হলো না। এক সময় চারপাশের সমস্ত শব্দ, স্মৃতি আর আকুতি একাকার হয়ে গেল।পুরোপুরি জ্ঞানশূন্য হয়ে এক অতল অন্ধকারের কোলে ঢলে পড়ল সে।
এক বালতি হিমশীতল পানির তীব্র ঝাপটা মুখে এসে আছড়ে পড়তেই ধড়ফড় করে সজ্ঞানে ফিরল অসীম। চোখের পাতা দুটো মেলতেই এক প্রবল অস্বস্তি আর আতঙ্কে তার বুকটা কেঁপে উঠল। অবাধ্য হাত-পাগুলো নাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো। ধীরে ধীরে চোখের ঝাপসা ভাবটা কেটে গেলে চারপাশের অবয়ব দেখে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। একটা সম্পূর্ণ বন্ধ। স্যাঁতসেঁতে ফাঁকা ঘর। একটা শক্ত কাঠের চেয়ারের সাথে তার পুরো শরীরটা শক্ত দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।পুরো ঘরে আর কোনো আসবাবপত্রের চিহ্ন নেই। এমনকি বাইরের আলো-বাতাস আসার মতো একটা জানালা পর্যন্ত নেই। শুধু মাথার ওপরে একটা ঝুলন্ত ল্যাম্প থেকে তীব্র হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ছে। অসীমের বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠল। ভয়ে, শঙ্কায় তার গলাটা মুহূর্তেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কোথায় আছে সে? যতটুকু মনে পড়ে। রাতে তো সে নিজের বাড়িতেই ছিল। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল। তবে কি এটা কোনো দুঃস্বপ্ন? নাহ, গায়ের ভেজা কাপড়ের কনকনে ঠান্ডা আর এই বন্ধ ঘরের ভ্যাপসা গন্ধ জানান দিচ্ছে। এটা কোনো স্বপ্ন নয়। নির্মম বাস্তব। ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে কোনো ভারী বস্তু টেনে আনার একটা কর্কশ শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের দেয়ালে। অসীম চকিতে তাকাল সেদিকে। দরজার অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ঝাপসা মানব-অবয়ব ধীরে ধীরে আলোর নিচে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। আগন্তুকের চেহারাটা চোখের সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হতেই অসীমের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। মুখের সমস্ত রক্ত চুষে নিয়ে মুখাবয়ব আরও ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। এটা কীভাবে সম্ভব? সে কি আসলেই ঠিক দেখছে। নাকি চোখের ভুল? আগন্তুক একটা কাঠের চেয়ার টেনে এনে ঠিক অসীমের মুখোমুখি দূরত্বে রাখল এবং অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে সেটায় বসল। অসীম তীব্র আতঙ্কে তোতলাতে তোতলাতে কোনোমতে বলল,
“তু… তুমি কে? স্যার! দিব্য স্যার?”
পরের মুহূর্তেই চোখের পলক ফেলার আগেই একটা প্রচণ্ড লাথি এসে আছড়ে পড়ল অসীমের চেয়ারে। ছিটকে গিয়ে চেয়ারসহ মেঝেতে উপুড় হয়ে আছড়ে পড়ল অসীম। বন্ধ মুখ চিরে তার একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। ঘরের ভেতরে দ্রুত পায়ে প্রবেশ করল কাব্য। সাথে আরও তিনজন পেশীবহুল লোক। তাদের মধ্যে একজন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেঝে থেকে টেনে পুনরায় সোজা করে বসিয়ে দিল অসীমকে। চেয়ারে সোজা হতেই সামনে বসা দিব্যর চোখের ওপর চোখ পড়ল অসীমের। সেই চোখের তীব্র হিংস্র আর শীতল চাহনি দেখে অসীমের আত্মা যেন খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হলো। প্রচণ্ড ক্রোধে ফুঁসছে দিব্য। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ইয়েস, আই অ্যাম। কী ভেবেছিলে অসীম? সারাজীবন আমাকে ওভাবে খাঁচায় আটকে রাখবে? এত সহজ? আমি দিব্য তালুকদার। অন্য কেউ না। দুনিয়ার আর কেউ আমাকে না চিনুক। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে তো তোর অন্তত স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত ছিল, তাই না?”
অসীম তীব্র এক বিস্ময়ের চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয়ে বিমূঢ়ের মতো বসে রইল। কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল,
“কিন… কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব স্যার?”
দিব্য নিজের শরীরটা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে অসীমের কলারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“কীভাবে পারলি হ্যাঁ? এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করতে তোর একটুও বুক কাঁপল না? কী দিইনি তোকে আমি? চাকরি, টাকা, সামাজিক সম্মান। সব তো দিয়েছিলাম। তাও পেছন থেকে ছুরিটা মারলি! কেন, হ্যাঁ? আমাকে দেখে খুব অবাক হচ্ছিস? তোর কী মনে হয়। আমি এতটাই গাধা? তুই ছাড়া ওই ডিলের গোপন তথ্য আর কার জানা ছিল? ওটা যে তুই-ই বাজারে ফাঁস করেছিস। এটা বোঝার জন্য আমার খুব বেশি মাথা খাটানোর প্রয়োজন ছিল না। তাও আমি তোকে বিশ্বাস করে ওই ফাঁদে পা দিতে গিয়েছিলাম? একমুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিলো। তুই হয়তো বড়জোর খবরটা বেশি টাকায় বিক্রি করেছিস। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতি করবি না। কিন্তু না! তুই প্রমাণ করলি। তুই একটা দুধকলা দিয়ে পোষা বিষাক্ত সাপ!”
অসীম নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আচমকাই হাউমাউ করে শব্দ করে কেঁদে উঠল। তার এই আকস্মিক কান্নায় ঘরের ভেতরের থমথমে ভাবটা আরও ঘনীভূত হলো। আসলে, অসীমের সাথে আসার আগেই দিব্য। কাব্যকে পুরো বিষয়টার আভাস দিয়ে রেখেছিল। দিব্য খুব ভালো করেই জানত। একটা বড়সড় বিপদ আসতে পারে। সেই কারণেই সে আগে থেকে, অসীমের সম্পূর্ণ অগোচরে নিজস্ব বিশ্বস্ত লোক ঠিক করে রেখেছিল। ওদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল শত্রুদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে পুরো চক্রটাকে হাতেনাতে ধরা। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী। দিব্যকে আটকে রাখা পর্যন্ত ওরা দূর থেকে নিবিড় নজর রাখছিল। আর ও বাড়ির ছদ্মবেশী রূপধারী চলে যেতেই। সুযোগ বুঝে দিব্যকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আনে। অসীমের এই কান্না দেখে কাব্য চরম বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে এগিয়ে এল। অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,
“মেয়েদের মতো ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিস কেন শালা? এখন যদি নিজের চামড়া বাঁচাতে চাস। তবে সোজা সত্যি করে বলআমাদের বাড়িতে দিব্য ভাই সেজে এই মুহূর্তে যে লুকিয়ে আছে। সেই আসল কুলাঙ্গারটা কে?”
অসীমের কান্নার বেগ যেন এক ধাক্কায় থমকে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় বলল,
“স্যার, খোদার কসম। বিশ্বাস করুন। আমি নিজের ইচ্ছায় এই কাজ করিনি। আমার মাকে ওরা কিডন্যাপ করে আটকে রেখেছিল। আপনি তো ভালো করেই জানেন স্যার। এই দুনিয়ায় ওই একটা মাত্র মা ছাড়া আমার আর আপন বলতে কেউ নেই। কালকে আপনাকে ওদের হাতে তুলে দেওয়ার পরেই কেবল ওরা আমার মাকে ছেড়েছে। আমি নিরুপায় ছিলাম স্যার। ইচ্ছা করে আপনার ক্ষতি করতে চাইনি।”
দিব্য গর্জে উঠল, “থাম তোর এই নাটক! আমি এখানে তোর এই ন্যাকামো আর অজুহাত শুনতে আসিনি। সত্যিটা জানতে চাইছি। তোর এই বানানো গল্প আমি একবিন্দুও বিশ্বাস করব ভেবেছিস?”
অসীম মরিয়া হয়ে বলল, “একদম সত্যি বলছি স্যার। আর… আর হ্যাঁ। আপনার প্রতি আমার সামান্য একটু ক্ষোভও জমা ছিল। সেই দুর্বলতা থেকেই এই ভুলটা হয়ে গেছে স্যার। প্লিজ আমাকে এবারের মতো মাফ করে দিন। জীবনে আর কখনো এমন হবে না।”
“ওসব কথা ছাড়। ওই লোকটা কে? হুবহু আমার মতো দেখতে হলো কী করে? ও কি কোনো সিলিকন মাস্ক পরেছে? নাকি প্লাস্টিক সার্জারি করেছে? ওর ওই বিশেষ ফাইলটা চাই, তাই না? কিন্তু ও সেটা পাবে না। কোনোদিন পাওয়া সম্ভব না। উল্টো ও সোজা জেলে পচবে৷ আর সাথে তুইও যাবি। তোদের একটাকেও আমি ছাড়ব না! ও আমার অবুঝ মেয়ের দিকে কুৎসিত নজর দিয়েছে। আমার মেয়ের গায়ে হাত বাড়িয়েছে। আমি ওর হাত কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব।”
অসীম বলতে লাগল, “ওরা দীর্ঘ সময় ধরে আপনার সম্পর্কে সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করেছে স্যার। আপনার হাঁটা-চলা, কথা বলা, অতীত ইতিহাস। সব খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। ওদের যেকোনো মূল্যে ওই গোপন ফর্মুলাটা চাই-ই চাই। আর… নবনী…!”
“ম্যাডাম!”
দিব্য অত্যন্ত কঠোর গলায় অসীমের ভুল শুধরে দিল। অসীমের বুকের ভেতর তীব্র রাগ ও ক্ষোভের এক ঝলক বয়ে গেল। তবুও এই মরণফাঁদে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে সামলে নিল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। সে বিরাট এক ঝামেলায় ফেঁসে গেছে। এই থেকে এখন দিব্য তালুকদার ছাড়া তাকে আর কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। অসীম নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল,
“ম্যাডাম… ম্যাডাম ওই লোকটাকে চিনে ফেলেছেন। উনি ধরে ফেলেছেন যে ওটা আপনি নন। আর ও পুরো বাড়ি তোলপাড় করেও ওই ফাইলটা খুঁজে পায়নি। এই কারণে ও এখন ভয়ঙ্কর রেগে আছে। আপনার পুরো পরিবার এখন চরম ঝুঁকিতে আছে স্যার। লোকটা একটা আস্ত সাইকোপ্যাথ। ভীষণ ডেঞ্জারাস! নিজের স্বার্থের জন্য ও যেকোনো সীমা পার করতে পারে।”
দিব্যর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, “নাম কী ওর?”
“নকীব নওরোজ।”
দিব্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে কাব্য অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত ও ত্রস্ত গলায় বলে উঠল,
“দিব্য, আমাকে এখনই এখান থেকে বের হতে হবে। মাত্রই হাসপাতাল থেকে একটা জরুরি কল এসেছে। কাল মাঝরাতের দিকে নাকি স্থানীয় একটা হাসপাতালে এক বাইক এক্সিডেন্ট করা রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ আগে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওকে আমাদের হাসপাতালে ট্রান্সফার করা হয়েছে। অবস্থা অত্যন্ত সিরিয়াস। লাইফ অ্যান্ড ডেথ সিচুয়েশন। আর… আর সেই বাইক চালকটা অন্য কেউ না। ওটা কলরব!”
চওড়া করিডোর ধরে তড়িৎ পায়ে হেঁটে আসছিল নকীব। অবিকল সেই চেনা অবয়ব। একই রকম চালচলন। দূর থেকে দেখে ছোট্ট দিয়া বিন্দুমাত্র তফাত করতে পারলো না। সে সমস্ত মান-অভিমান ভুলে একছুটে গিয়ে আবারও লোকটার সামনে পথ আগলে দাঁড়াল। নকীব তার স্বভাবসুলভ বিরক্ত চোখ দুটো নামিয়ে তাকাল নিচে। দিয়া তখন দুই হাত নিজের কোমরে গুঁজে। ফর্সা মুখটা বেলুনের মতো ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অত্যন্ত ক্ষোভ নিয়ে আধো-আধো গলায় বলল,
“পাপ্পা, দিয়া এংরি!”
নকীব একপলক ড্রয়িং রুমের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“তো আমি কী করব?”
“তুমি স্যরি বলবে না? তুমি তো সবসময় ভুল করলে স্যরি বলো। তাহলে এখন কেন দুষ্টুদের মতো করছ?”
“দেখো, আমার জরুরি কাজ আছে। সরো এখান থেকে।”
নকীবের কণ্ঠে একাধারে রুক্ষতা আর অধৈর্য। পাপ্পার এমন অচেনা আর কর্কশ ব্যবহারে এবার সত্যিই ঠোঁট ভেঙে কান্না চলে এলো দিয়ার। ফর্সা, তুলতুলে মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা অশ্রু। নকীব একজন পেশাদার অপরাধী। মায়া-দয়ার ধার সে ধারে না। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ফুটফুটে জ্যান্ত পুতুলটার কান্না সে কেমন যেন চাইলেও উপেক্ষা করতে পারল না। এক অদ্ভুত মোহে পড়ে সে করিডোরের মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসল দিয়ার মুখোমুখি। নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব কোমল আর স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
“আচ্ছা বাবা, স্যরি। আর কী করলে দিয়া আর এংরি হবে না। বলো তো?”
পাপ্পাকে নরম হতে দেখে দিয়ার কান্নাটা চট করে থেমে গেল। তবে ডাগর ডাগর চোখ দুটো তখনো পানিতে ছলছল করছে। সে অত্যন্ত আদুরে গলায় আবদার করল,
“কান ধরো। দুই কান।”
নকীবের কপালে এবার চরম বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে, নকীব নওরোজ। সে এখন এইটুকু একটা বাচ্চার সামনে কান ধরে ওঠবস করবে? নকীবকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে দিয়া নিজেই নিজের দুটো কান হাত দিয়ে চেপে ধরে দেখিয়ে দিল,
“এইভাবে। উফফ! তুমি দেখছি সব ভুলে গেছো পাপ্পা!”
নকীব নিরুপায় হয়ে ওর দেখানো অনুকরণেই নিজের দুই কান স্পর্শ করল। অপরাধ জগতের সেই নিষ্ঠুর ঠোঁটে এক চিলতে অসহায়তা ফুটিয়ে বলল,
“এভাবে?”
দিয়া খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বোঝাল। হ্যাঁ, একদম এভাবে। নকীব কিছুক্ষণ নিস্পৃহ চোখে চুপচাপ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। গোলগাল গড়ন, নিষ্পাপ একখানা মুখ। মেয়েটা আসলেই একটা পুতুল। এত মায়া আর এত আদুরে কথা বলার ধরন যে। যেকোনো পাথরের মতো মানুষকেও এক নিমেষে বশীভূত করে ফেলার ক্ষমতা রাখে ও। নকীব যখন নিজের এই অভূতপূর্ব মানসিক পরিবর্তন নিয়ে ভাবছিল। ঠিক তখনই দিয়া আচমকা দুই হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার গলা। তারপর টুপটাপ করে তার দুগালে নিজের নরম ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করে দিল। খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
“আই লাভ ইউ, পাপ্পা!”
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার ছোঁয়ায় আকস্মিক নকীব থমকালো। তার নিজের অজান্তেই, অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে ঠোঁটের কোণ দুটো প্রসারিত হয়ে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল।
“দিয়া!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক তীব্র আতঙ্কময় কণ্ঠস্বরে ডাকল নবনী। করিডোরের ওপাশে দিয়াকে ওই লোকটার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নবনীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছিল। সে প্রায় ছুটে এসে দিয়াকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে নিজের কোলে তুলে নিল। মায়ের এই হঠাৎ রুক্ষ আর অদ্ভুত আচরণে দিয়া বেশ অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নকীব নবনীর এই ছটফটানি দেখে সিটকে হাসল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত বিদ্রূপের সুরে বলল,
“সারারাত কোথায় ছিলেন আপনি, পাখিটা? বরের শোকে নিশ্চয়ই চোখের পাতা এক করতে পারেননি?”
নবনী কোনো জবাব দিল না। সে তীব্র ঘৃণা আর তীক্ষ্ণ চোখ নিয়ে লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কালকের চেয়ে আজকে যেন তার গায়ের রঙটা একটু বেশিই উজ্জ্বল লাগছে। গায়ের পোশাক-আশাক হুবহু দিব্যর আলমারি থেকে নেওয়া হলেও। এই মানুষটাকে কোনোভাবেই দিব্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। বাড়ির অন্য কেউ হয়তো পোশাক আর চেহারার এই নিখুঁত মায়াজালে বিভ্রান্ত হতে পারে কিন্তু নবনীর মন ভুল করছে না। এরই মধ্যে সকাল সকাল কলরবের সেই ভয়াবহ বাইক এক্সিডেন্টের খবরটা এই বাড়িতেও এসে পৌঁছে গেছে। পুরো পরিবার যখন শোকে আর আতঙ্কে স্তব্ধ। তখনো এই লোকটা নির্বিকার। বজায় রেখেছে তার নিয়ম। নবনী নিজের ভয়ের দেয়ালটা ভেঙে লোকটার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে অত্যন্ত শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি বাড়ির কাউকে হাসপাতালে যেতে দিচ্ছেন না কেন? কলরবের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবুও কেন সবাইকে এই ঘরের চার দেয়ালে বন্দী করে রেখেছেন?”
“সমস্যা আছে গুরু।”
নকীব অত্যন্ত অবলীলায় কথাটা ছুড়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রয়িং রুম থেকে পাগলের মতো ছুটে এলেন অলেখা। তাঁর চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে। নকীবের সামনে এসে দুই হাত জোড় করে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“একটু দয়া করো বাবা! তুমি কে, কী পরিচয় তোমার আমি তার কিচ্ছু জানি না। কিন্তু তুমিও তো নিশ্চয়ই কোনো মায়ের সন্তান! আমার এক ছেলেকে তোমরা কোথায় আটকে রেখেছ। তার কোনো খবর আমি জানি না। আর এদিকে আমার ছোট ছেলেটা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে! তুমি নাকি মেইন দরজায় তালা মেরে রেখেছ? কাউকে বের হতে দিচ্ছ না! আমাকে আমার কলরবের কাছে যেতে দাও বাবা। আল্লাহর দোহাই লাগে!”
নকীবের মুখে এক ফোঁটা মায়ার রেখা ফুটল না। বরং চরম বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে সে বলল,
“আপনার ওই ছোট ছেলের সাথে দেখা করার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে। তাকে কোথায় কবর দেবেন। এখন সেই জায়গা খোঁজা শুরু করুন। কারণ যা শুনলাম। ও আর বড়জোর এক ঘণ্টার বেশি টিকবে না।”
“এমন অলক্ষুণে কথা বলো না বাবা! তোমার মতোই আমারও একটা বড় ছেলে ছিল। বেঁচে থাকলে ঠিক তোমার মতোই দেখতে হতো। তুমি তো আমার নিজের ছেলের মতোই! মায়ের এই একটা মাত্র কথা রাখো বাবা আমাকে যেতে দাও!”
নকীবের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেল না। নবনীর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। আচমকাই তার মনে পড়ে গেল দিব্যর সেই হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাইয়ের কথা। নবনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝেছে এর কাছে কেঁদে কোনো লাভ নেই। নিজেকে শক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। নকীবের চোখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“উনার কাছে এভাবে ভিক্ষা চেয়ে কোনো লাভ নেই আম্মু। আপনি তো আপনার কাঙ্ক্ষিত সেই গোপন ফাইল বা ফর্মুলাটা এখনো পাননি, তাই না? যদি বলি। সেটা আমি আপনাকে নিজের হাতে দেব? তাহলে আপনি কী করবেন?”
নকীবের ধূর্ত চোখ জোড়া চকচক করে উঠল। কিন্তু সে এত সহজে বিশ্বাস করার পাত্র নয়। সে চকিতে তাকাল নবনীর কোলে থাকা ছোট্ট দিয়ার দিকে। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে বড় বড় চোখে সবার এই অদ্ভুত কান্নাকাটি আর চিৎকার দেখছিল। হুট করেই নকীব তার রিভলভারটা বের করল। এক ঝটকায় সেটার নল ঠেকিয়ে দিল দিয়ার কপাল বরাবর! তার পুরো মুখাবয়বে তখন এক ভয়ঙ্কর, পৈশাচিক ধূর্ততা খেলে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে। হিসহিসিয়ে সে বলল,
“আমার সাথে চালবাজি করার চেষ্টা করছিস তুই? কোথায় আছে ওই ফাইল? এখনই বের করে দিবি আমাকে! নয়তো আজ এই ঘরের ভেতর তোদের সব কয়টার লাশ পড়বে!”
নবনী অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “দেবো। আপনাকে জিনিসটা আমি নিশ্চয়ই দেব। তবে মনে রাখবেন। আমাকে যদি আপনি মেরে ফেলেন। তবে ওই ফর্মুলার কোনো চিহ্নও এই দুনিয়াতে আর কেউ খুঁজে পাবে না। আমার একটা শর্ত আছে। আমার স্বামীর খোঁজ চাই। এখনই উনার সাথে আমার কথা বলিয়ে দিন। যদি আমি নিজে নিশ্চিত হতে পারি যে উনি জীবিত এবং সুস্থ আছেন। তবেই আপনাকে আপনার জিনিস বুঝিয়ে দেব। নয়তো আপনি চাইলে আমাকে এখনই গুলি করে মেরে ফেলতে পারেন।”
বন্দুকের সেই ঠান্ডা নলের ছোঁয়ায় দিয়া প্রথমে ভয়ের চোটে মায়ের বুকের ভেতর একটু কুঁকড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই খেলনা মনে করে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। আদুরে গলায় বলল,
“পাপ্পা! তুমি দিয়ার সাথে চোর-পুলিশ খেলছ? ইউ নো, দিয়া কিন্তু খুব ব্রেভ গার্ল! এই বন্দুকটা কি তুমি নতুন কিনেছ? আমার জন্য কিনেছ পাপ্পা? ওয়াও!”
দিয়ার অবুঝ কথা শুনে নকীব ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। একটা মৃদু হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“খেলবে তুমি এটা দিয়ে?”
এই অবেলায় পর্ব ৩৬
নবনী বলল, “আম্মাকে এখন হাসপাতালে যেতে দিন। আর আপনাকে যা বলেছি ঝটপট করুন।”
নকীব দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “ওকে!”
পরক্ষণেই সে ফোন করলো কাউকে। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে যা শুনলো তাতে তার সমস্ত শরীরের রক্ত যেন টগবগ করে উঠলো।
