আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৫০+৫১+৫২
ফারজানা মনি
আবির একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। মেঘকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল।
আবিরের বুকে মাথা রেখেও অন্ধকারে মেঘ তাকিয়ে আছে। তার দু চোখে কিছুতেই ঘুম আসছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে কিছু যেন ঠিক নেই। মনটা বারবার কূ ডাকছে। তখন আবিরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অনেক কিছুই তো বলল মেঘ। কিন্তু এখন সে নিজেকে বোঝাতেই অক্ষম।
দু চোখের পাতা আজ কিছুতেই এক হচ্ছে না। কেন জানি মেঘের বারবার মনে হচ্ছে এই রাত ই কি আবির ভাইয়ের সাথে আমার শেষ রাত। কথা টা ভাবতেই যেন সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠলো।
দীর্ঘ একটা চিন্তিত আধার রাতের পর ধরণীতে আবারো দেখা দিল সোনালী রুদ্র উজ্জ্বল সকাল। আবির আর মেঘের জীবনেও কি আধার কাটিয়ে উজ্জল রোদের সোনালী আলো দেখা দিবে?
এখন শুধু এটাই দেখার পালা;;;;;
মেঘের অসুস্থতার কথা শুনে, সকাল সকাল মেঘের রুমে হাজির হলো বন্যা আর মিম। দুজনে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে টোকা দিল।
দরজা খোলা আছে, ভেতরে এসো। ভেতর থেকে আবিরের শব্দ পেয়ে মীম আগে রুমে ঢুকলো। পিছু পিছু বন্যাও এসে দাঁড়ালো মিমের পাশে।
আবির ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। মূলত সে রাকিব ও রাসেলকে অফিসের কিছু জরুরী ডিটেইলস ইমেইল করছিল। আজ আবির অফিসে যাবে না। তাই সে রাকিব ও রাসেলকে সব কাজ সামলে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে।
মেঘ পাশেই চুপচাপ শুয়ে আছে।
মেঘ সকাল থেকেই নিচে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। কিন্তু আবিরের ধমকের কারণে নিচে যেতে পারছে না। আবিরের একটাই কথা “রেস্ট নাও”
আবির বন্যা ও মিমকে দেখে রুম থেকে বের হয়ে গেল। এবার যেন বন্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এতক্ষণ যাবৎ আবিরকে দেখে বন্যা ভেতরে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল। এ বাড়িতে এসেছে বন্যার প্রায় সাত মাস হলো। কিন্তু এখনো আবিরের সামনে বন্যা মিম আদির মতো মিশতে পারে না। যতই হোক বড় ভাসুর তো…
মেঘ, বন্যা ও মিমকে দেখে উঠে বসতে চাইলো। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বন্যা আটকে দিল। বলল: শুয়ে থাক.. মোটেও উঠবি না..
বন্যার ধমকের সুরে শাসন শুনে মেঘ কিছুটা ভেবা চ্যাকা খেয়ে গেল। তারপর রসিয়ে রসিয়ে বলল: এই বন্যা.. আমাকে মোটেও অর্ডার করবি না… তুই কি ভুলে গেছিস আমি তোর বড় জা হই… বলেই মেঘ মিটিমিটিয়ে হাসলো।
হুম.. তুই আমার বড় জা .. কিন্তু এই মুহূর্তে তুই আমার ছোট্ট ননদ আর আমি তোর বড় ভাবি। তাই বলছি চুপচাপ শুয়ে পড়। বলেই মেঘের গায়ে কাঁথাটা দিয়ে দিল। মিম পাশ থেকে ঠোট টিপে হাসছে।
আর হাসবে নাইবা কেন??? মেঘকে কাবু করার মতো বন্যা একটা শক্ত ও সঠিক যুক্তি দেখিয়েছে।
মেঘ পরলো বিপাকে। নিজের কথার জালে নিজেই পেচিয়ে গেছে। তাই নিজের মুখটাকে এখন বন্ধ রাখাটাই উত্তম বলে মনে করলো মেঘ।
বন্যা : কেমন আছিস এখন?
মেঘ: আমি তো পুরোই সুস্থ আছি। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিনা রাতে কেন এমন হলো?
বন্যা: দোয়া করি সুস্থ থাক.. মেঘ… এখন থেকে তোর নিজের যত্নটা আরো একটু বাড়াতে হবে।
মেঘ: তুইও এবার শুরু করলি আবির ভাইয়ের মতো।
বন্যা মেঘের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল: আবির ভাই তোকে খুব ভালোবাসে মেঘ। তুই নিজেও সেটা ভালোভাবে জানিস। তাও কেন চিন্তা দিস ভাইয়াকে?
মেঘ এবার মাথাটা বন্যার কোলে নিয়ে শুয়ে পড়লো। বন্যার হাতটা মেঘের হাতে নিয়ে মেঘ বলল: বেবি জানিস.. এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী মনে হয় আমি… যার আবির ভাইয়ের মতো একটা হ্যান্ডবেন্ড আছে, তোর মত একটা বেষ্টু আছে আর খান বাড়ির মত একটা সুখী পরিবার আছে।
বন্যা মেঘের মাথায় হাত রাখলো। দুই বান্ধবী ই একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে দিল।
মিম পাশে দাঁড়িয়ে দুই বান্ধবীর মুক্ত ঝরা হাসি দেখছে। কি অমায়িক সেই হাসি।
মিমের প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। বর্তমান জামানায় এমন নিঃস্বার্থ বান্ধবী পাওয়া আকাশের চাঁদ পাওয়ার নেয়। মিম অপলক দৃষ্টিতে দুই বান্ধবীর অকৃত্রিম হাসি দেখছে।
তখন ই ঘরে এলো হালিমা খান। হাতে তার নাস্তার প্লেট। মূলত মেঘকে নাস্তা খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ডক্টরের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। আবির তার পরিচিত এক বন্ধুর সাহায্যে মধ্যরাতেই ডক্টরের সিরিয়াল নিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর মেঘকে সেখানেই নিয়ে যাওয়া হবে।
ইতিমধ্যে আবির ও নিচে এসে নাস্তা করে নিয়েছে। মালিহা খান কে জানালো, সে অফিসে যাবে না এবং মেঘকে নিয়ে আবির ই ডক্টরের কাছে যাবে।
মালিহা খান এতে সম্মতি জানালো। তানভির সাথে যেতে চাইলে, আবির জানালো সে একাই পারবে।
ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১ টা… মেঘ আর আবির কিছুক্ষণ আগেই নার্সিংহোমে এসেছে। ডক্টর কে সকল কিছু খুলে বলার পর, ডক্টর কিছু টেস্ট করাতে দিল।
এখন আবির আর মেঘ ডক্টরের চেম্বার এর বাহিরে সেই রিপোর্টের অপেক্ষা ই বসে আছে।
দুজন খুবই চিন্তিত.. কিন্তু মেঘের থেকেও আবিরকে আজ একটু বেশি ই এলোমেলো দেখাচ্ছে। মেঘ একবার আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আবার নিচে ফ্লোরের দিকে তাকালো। মনে অসংখ্য প্রশ্ন.. কি হয়েছে? কেন হয়েছে? কবে হয়েছে? কিভাবে হয়েছে?
কি করলে সমাধান হবে এই সমস্যার?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ আবিরের চিন্তিত মুখটা ভেসে উঠলো। মেঘ সঙ্গে সঙ্গেই পাশে বসে থাকা আবিরের দিকে তাকালো। চুপচাপ নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। হয়তো গভীর কিছু ভাবছে।
মেঘ এবার নিজেকে একটু সামলে আবিরের দিকে ফিরে বসলো। মেঘের নাড়াচাড়া বুঝতে পেরে আবিরও মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ আবিরের দুই হাত মুঠোবন্দি করে বলল: আহিয়ার আব্বু.. প্লিজ আপনি টেনশন করবেন না। আমার কিছুই হয়নি। আমি সুস্থ হয়ে যাবো ইনশাল্লাহ দেইখেন । আর আমাদের বেবিরও কিছু হবে না। আমরা হতে দিব না…
আবির মেঘের কথা শুনে, একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এই মুহূর্তে আবিরের চোখ দুটো যেন মেঘের সারামুখেই বিচরণ করছে। “মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে, এইতো সেদিনই থাপ্পর দিয়েছিলাম বলে আমার সাথে কথা বলেনি। কিন্তু আজ সেই মেয়ে কিনা আমাকে বুঝদারের মত বোঝাচ্ছে” আবিরের এসব ভাবনার মধ্যেই একটা নার্স এসে বলল আপনাদের রিপোর্ট এসে পড়েছে। আপনারা প্লিজ ম্যামের চেম্বারে যান। আমি রিপোর্টটা সেখানে পৌঁছে দেওয়া ব্যবস্থা করছি।
আবির ছোট করে উত্তর দিল: হুম।
সঙ্গে সঙ্গেই মহিলা নার্সটি জায়গাটি ত্যাগ করল। আবির মেঘের হাত ধরে কাঁপা কাঁপা পায়ে ডক্টরের চেম্বারের দিকে গেল।
আবির: আসবো?
ডক্টর: হুম আসুন।
ডক্টরের সামনে এসে দাঁড়াতেই ডঃ ওদের দুজনকে বসতে বলল। আবির আর মেঘ পাশাপাশি দুইটা চেয়ারে বসে পড়লো। দুইজনের চেহারায় ই চিন্তার ছাপ দেখে ডক্টর এবার বলা শুরু করল।
ডঃ: মিস্টার খান… প্লিজ এতটা টেনশন করবেন না। মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যত সমস্যা সৃষ্টি করেছেন, তার সমাধান ও সৃষ্টি করেছেন।
আবির এবার মাথা তুলে ডক্টরের দিকে তাকালো। আস্তে আস্তে বলল: ডক্টর কি হয়েছে মেঘের? সিরিয়াস কিছু?
আবিরের আগ্রহ উদ্দীপনা দেখে ডক্টর কিছুটা মুচকি হাসলো। মেঘ আর আবির সে দিকেই তাকিয়ে আছে।
ডঃ: দেখুন মিস্টার খান.. আপনার ওয়াইফের সমস্যাটা অতি জটিল আবার অতি সহজ।
আবির খানিকটা ভ্রু কুঁচকে ডক্টরের মুখে পানে তাকালো।
ডঃ: আপনার স্ত্রীর “প্লাসেন্টা প্রিভিয়া” দেখা দিয়েছে। ডক্টরের পরামর্শ অনুযায়ী চললে এই রূগকে ধ্বংস করে, বাচ্চার ফুটফুকে আদল দেখার সৌভাগ্য হবে। কিন্তু কেউ যদি ডক্টরের পরামর্শ অবহেলা করে, তাহলে মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আপনার স্ত্রীকে রুটিন মাফিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করান। বাকি আর কয়েকটা মাস সম্পূর্ণ বেড রেস্টে রাখুন।
ডক্টরের কথার মাঝে মেঘ হঠাৎ ফূরণ কেটে বলল: ডক্টর… প্লাসেন্টা প্রিভিয়া কি?
ডক্টর আবারো খানিকটা হাসলেন। বলল: মিসেস খান.. আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে অনেক প্রেগন্যান্ট মাদারের ই প্লাসেন্টা প্রিভিয়া নামক রোগের সম্মুখীন হতে হয়। “প্লাসেন্টা প্রিভিয়া ” যাকে বাংলায় বলে গর্ভ ফুল নিচে থাকা। গর্ভধারণের পর নারীর দেহের গর্ভফুলের সৃষ্টি হয় যেটা জরায়ুর দেয়ালে লেগে থাকে। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয়ার্ধে যোনি থেকে রক্তপাত এই অসুবিধার উপসর্গের অন্তর্ভুক্ত। এই সময়ে উজ্জ্বল লাল রঙের রক্তপাত ঘটে। কিন্তু শারীরিক কোন ব্যথা বা অসস্তি নাও হতে পারে। কিন্তু এটা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
ডক্টরের দীর্ঘ কথা শোনা শেষ করে এবার আবির প্রশ্ন করলো: ডঃ এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি?
ডঃ: এই সমস্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা ওষুধ হল সম্পূর্ণ বেড রেস্ট। যদি কোন রোগির ওয়াশরুম ঘরের বাহিরে হয়। তাহলে তার ওয়াশরুম ঘরে ব্যবস্থা করে দিতে হবে । যাতে তাকে ওয়াশরুমের জন্য হলেও বাইরে না যেতে হয়। হাঁটাচলা একেবারেই করা যাবে না। ভাড়ি কোন বস্তু তোলা যাবে না। আর হ্যাঁ… স্বামী স্ত্রীর মিলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এই সময়ে। অবশ্যই এসব শর্ত মেইনটেইন করতে হবে। তাছাড়া আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি সেটা নিয়মমাফিক খেতে হবে।
আবির: ওকে..
আবির মেঘকে নিয়ে বাড়িতে এলো। এসে আম্মু বড় আম্মু ও কাকিয়াকে দায়িত্ব দিল মেঘকে যেন খাট থেকে একটু ও না নামতে দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণ আগে গাড়ি থেকে নেমে মেঘকে কোলে করে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এসেছে আবির। সোফাতে বসিয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছে চুপচাপ বসে থাকতে। আবির মালিহা খানকে ডেকে বলল: আম্মু.. নিচের একটা রুম আমাদের জন্য খালি করে দাও। আমরা এখন থেকে নিচেই থাকবো।
মালিহা খান: ঠিক আছে, বাবা। আমি সব গুছিয়ে দিচ্ছি এখনি।
মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে মালিহা খানের দিকে তাকিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল: বড় আম্মু.. তোমার ছেলেকে একটু বোঝাও না প্লিজ। আমার তেমন কিছুই হয়নি যার জন্য রুম পাল্টাতে হবে। আমি ঠিক আছি ,সুস্থ আছি। তাছাড়া ডক্টর তো বলেছে, রেস্টে থাকলেই আর কোন ভয় নেই।
আবির এবার রাগী রাগী চোখে মেঘের পানে তাকালো। মনে মনে বলছে, এই মেয়ে বলে কি? ওর টেনসনে গতকাল সারা রাত আমি ঘুমাইনি। চিন্তায় চিন্তায় আমার পাগল পাগল অবস্থা। মেঘ কেন আমার মনের অবস্থা কখনো বুঝতে চায়
না.. ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আবির।
রাগে চোখ মুখ লাল করে মেঘের পানে তাকিয়ে বলল : তুই চুপ কর.. তোর থেকে আমি কিছু জানতে চেয়েছি?
মেঘ সহ সকলেই হতবম্ভ দৃষ্টিতে আবিরের রাগান্বিত মুখের পানে তাকিয়ে আছে।
রাগে চোখ দুটো রক্ত লাল হয়ে আছে।
মেঘ এবার চুপ হয়ে গেল। বুঝতে পেরেছে আবির অনেক রেগে গেছে। কারণ খুব বেশি রাগ না হলে, আবির কখনোই সকলের সামনে মেঘকে তুই করে কথা বলত না। যদিও বিয়ের আগে সব সময় তুই ই বলতো। কিন্তু বিয়ের পর থেকে রুমের বাইরে কখনোই আবির মেঘকে তুই করে কথা বলে না। মেঘের কথা শুনে অতিরিক্ত রাগে মেজাজের কন্ট্রোল হারিয়েছে আবির।
তখনই মেঘ আবিরের শব্দ পেয়ে দোতলার সিঁড়িতে এসেছে বন্যা। আস্তে আস্তে নিচে এসে মেঘের পাশে বসলো। মালিহা খান ,হালিমা খান ও আকলিমা খান আবিরের কাছে এসে আবিরকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
মেঘ হতবিহল চোখে আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভেবেই পাচ্ছে না যে কি এমন বলেছে যার জন্য এত রেগে গেছে আবির।
মালিহা খান: আবির বাবা শান্ত হ.. মেঘ হয়তো কথাটা না বুঝেই বলে ফেলেছে।
ওকে বুঝিয়ে বল , অবশ্যই বুঝবে।
আবির রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল: হুম .. তোমাদের মেয়ে কোন কথাটা বুঝে বলে। ও সবই তো না বুঝেই বলে। ওকি বুঝতে পারছে না ওর উপরে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ। নাকি বুঝেও আমাকে টেনশন দিতে চায়। উপরের রুমে দুই দিন একটানা থাকার পরই ওর আবার ইচ্ছে হবে নিচে এসে সবার সাথে কথা বলার। তখন ও আবার এই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে আসবে। আমি কি অফিস রেখে সারাক্ষণ ওকে পাহারা দিব। কিন্তু ও যদি নিচে থাকে, তাহলে একেক সময় একেক জন ওর খেয়াল রাখতে পারবে। মেঘ নিজেও গল্প করার জন্য সবাইকে নিচে পাবে। সামান্য জিনিসটুকু মেঘ কেন বুঝতে পারে না বলতো?
সবাই আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রাগী রাগী ভাবে বলা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল। আবির কে দেখে মনে হচ্ছে মনের এতগুলো কথা বলার পরে ওর রাগটা যেন কিছুটা পড়ে এসেছে।
আবির ধপাস করে সোফায় বসে পড়লো। দুহাতে নিজের মাথা টা চেপে ধরে বলল: আমি মেঘকে নিয়ে আর এত টেনশন নিতে পারছি না আম্মু.. টেনশনে আমার মাথা ছিড়ে যাচ্ছে। যেখানে আমি ওকে সুস্থ রাখতে এত টেনশন করছি। সেখানে ও বারবার এক ঘেয়ামি করছে।
এবার মেঘ উঠে এসে আবিরের পাশে বসলো. মেঘ হেটে এসে আবিরের পাশে বসায় আবিরের রাগটা যেন তরতর করে বাড়ছে। তখনই আবির তার নিজের হাতের উপর একটা শীতল স্পর্শ পেল। হুম.. আবিরের ভাবনা ই ঠিক মেঘ পাশে বসে তার হাতটাকে মেঘের হাতে মুঠোবন্দি করেছে।
টলমল চোখ নিয়ে আবিরের পানে তাকিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল: প্লিজ আপনি রাগ করবেন না। আপনার মত এত কিছু ভাবনা চিন্তা আমার মাথায় আসেনা। আমরা আজ থেকে দুইজন নিচতলায় ই থাকবো। মেঘের শান্ত কন্ঠ শুনে আবিরের মস্তিষ্ক যেন সতেজতা ফিরে পেল।
তৎক্ষণাৎ বোধ হলো: একি.. রাগের কন্ঠে একটু বেশিই বলে ফেলেছি। এতটা না বললেও হয়তবা পারতাম। সঙ্গে সঙ্গেই মেঘের দিকে তাকালো।
মেঘের হাত দুটো নিজের হাতে চেপে ধরে বলল: স্পেরো.. প্লিজ কষ্ট পাস না.. আমি এত কিছু বলতে চাইনি। রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।
মেঘ আবিরের পানে তাকিয়ে দুচোখের এতক্ষণে জমে থাকা টলমলে জল গুলো মুহূর্তে ই ছেড়ে দিল। যা গাল বেয়ে ঝরে পড়ছে আবিরের উরুতে।
আবির অশান্তভাবে মেঘের চোখ দুটো মুছতে মুছতে বলল: প্লিজ আর কান্না করিস না। কাঁদলে তোর মাথা ব্যথা হবে। আবিরের অসহায় মুখ দেখে মেঘ কান্নার মাঝেই হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল।
বলল: আবির ভাই… আই এম সরি.. আমি কোন কিছু না ভেবেই জেদ করেছিলাম ওপরে থাকার জন্য। কিন্তু আমার জন্য আপনার সিদ্ধান্তটাই বেস্ট।
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৪৭+৪৮+৪৯
আবির এবার মেঘের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিসিয়ে বলল: এই আমি কি তোর এখনো ভাই হই? মেঘ তোকে নিয়ে আমি আর পারিনা.. তুই কি আমাকে তোর বাচ্চার মামা বানানোর প্লান করছিস ?
আবিরের কথা শুনে মেঘ কিছুটা ভরকে গেল। তারপর আবারও ফিক করে হেসে দিল। মেঘের মুখে হাসি দেখে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা পর আবিরও একটু হাসলো।
ওদের হাসি দেখে, এতক্ষণ যারা ওদের ঝগড়া ,মনোমালিন্য দেখছিল। তারাও হাসলো।
