Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৮
সাইয়্যারা খান

প্লেন যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ল্যান্ড করলো তখন গভীর রাত। সেই শুরুতে পৌষ একটু এদিক ওদিক এরপর থেকে একদম ফুরফুরে। ট্রানজিট না থাকায় চৌদ্দ ঘন্টার এক দীর্ঘ জার্নি হয়েছে তাদের। ইতিমধ্যে তৌসিফের বারোটা বাজাতে পৌষ মোটেও কমতি রাখে নি। মরার উপর খাঁড়া হিসেবে তুহিন তো সাথেই ছিলো। তৌসিফ পৌষকে ধীরে ধীরে ডাকলো,
“হানি, উই হ্যাব টু গো। ওয়েক আপ।”
পৌষ একটু নড়লো চড়লো। কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছে। মাথাটা ব্যথা করছে এখন৷ তৌসিফের ডাকে তাকালো চোখ মেলে। তৌসিফ দেখলো ওর ফুলে উঠা চোখ৷ হাত বাড়িয়ে দুই আঙুল দিয়ে কপাল চেপে দিতে দিতে বললো,

“বাসায় যেয়ে ঘুম দিবে। এসো, আমি ধরছি।”
“ধরা লাগবে না৷ আমি পারব।”
“আমি জানি তো। আমার তোতাপাখি সব পারে।”
“হুঁউ।”
তুহিন নিজের সিট ছেড়ে গা ছাড়া দিয়ে উঠেছে। তৌসিফ তাদের জিনিসপত্র দেখে দেখে তুলছে ব্যাগে। পৌষ থম ধরে বসে রইলো কিছুক্ষণ। শরীরটা ভালো লাগছে না। সাফোকেট লাগছে হঠাৎ। তৌসিফ ওর মতিগতি বুঝার আগেই তুহিন হুরতার করে এগিয়ে এলো। এসেই পৌষের ব্যাগপত্র নিজের কাঁধে নিয়ে পৌষকেও উঠতে বাধ্য করলো। তৌসিফকে কোন বিশেষ দাম দিলো না সে। তৌসিফ ব্যাগপত্র নামিয়ে ধমক দিলো তুহিনকে,
“তুই ওকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”
তুহিনের কাঁধে পৌষের হ্যান্ড ব্যাগ। ভীষণ তাড়া দিচ্ছে সে পৌষকে নামার জন্য। তৌসিফের ধমক খেয়ে ঘুরে তাকালো তুহিন। চোখ তুলে কপালে তুলে উত্তরে বললো,

“প্লেন ল্যান্ড করেছে তো। নামতে হবে না?”
“হ্যাঁ তো?”
“তো কি?”
“ওকে নিয়ে এত তাড়া কিসের তোর?”
“আশ্চর্য! তুমি তো ব্যাগপত্র নিচ্ছো। আমি ওকে নিয়ে যাই৷ তুমি আসো।”
পৌষ একটু অবস্থা বুঝলো। তুহিনের দিকে ফিরে বললো,
“আপনি দাঁড়ান। উনি তো নামাতে পারবে না এতকিছু।”
“পারবে। তুমি এসো।”
পৌষ যখন তবুও নড়লো না তখনই ধমক দিলো তুহিন। রেগে গেলো হঠাৎ,
“বলেছি না সাথে আসতে? জামাই ছাড়া বুঝো না কিছু!”
পৌষ আশ্চর্য হয়ে বললো,
“আপনি বকছেন কেন আমাকে?”
“আসতে বলেছি।”
পৌষও এবারে রেগে গেলো,

“যাব না৷ আপনি যান৷ আমার জামাই রেখে কেন যাব আমি?”
“তো জামাইকে গলায় ঝুলিয়ে রাখবে এখন? লজ্জা রে না মুখে মুখে জামাই জামাই করো?”
“একশবার করব। হাজারবার করব।”
“তুহিন!”
ব্যাগ নামিয়ে কোমড় সোজা করে দাঁড়িয়েই ধমক দিলো তৌসিফ। তুহিন দমলো না। পৌষের হাত টেনে ধরলো। টানতে টানতে বললো,
“ফুপাতো বোনের বাচ্চা, আসতে বলেছি।”
তুহিন বেপরোয়া, মানে না সহজে। তৌসিফ ভেবেছিলো সবাই নামার পর ধীরেসুস্থে নামবে। তুহিনের যেন তরই সইছে না অগত্যা তৌসিফও নামলো। এয়ারপোর্টে এসেই তৌসিফ আগে কফি কর্ণারে ঢুকলো। পৌষের জন্য কফি নিতেই দেখলো তুহিন পৌষকে নিয়ে আইসক্রিমের ওদিকে যাচ্ছে। তৌসিফ যেন অধৈর্য হয়ে উঠলো। এভাবে হলে ও হানিমুন করবে কিভাবে? এ কেমন যন্ত্রণা? এভাবে চললে তৌসিফ তাহলে কেন এসেছে বউ নিয়ে? গটগট পায়ে ওদের কাছাকাছি এলো। তুহিনের সামনে দাঁড়িয়ে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলো। তুহিন বুঝেও বুঝলো না৷ জেনেও না জানার ভান ধরলো। তৌসিফ কফিটা এগিয়ে দিলো পৌষের দিকে। তুহিন সেটা দেখেও রাগ দেখালো,

“আমার জন্য নিলে না?”
“পে করা। রাখা আছে। নিয়ে আয়৷”
তুহিন চলে গেলো কফি শপে। তৌসিফ এক হাতে পৌষের কোমড় আঁকড়ে ধরলো। একদম শক্তপোক্ত ভাবে ধরে রাখলো যাতে তুহিন এসে আবার ঝামেলা না পাকায়। তুহিন আসা মাত্রই দেখলো পৌষ আর তৌসিফ এক মগ থেকেই কফি পান করছে। এগিয়ে এসে মুখের উপর বড় ভাইকে বলে উঠলো,
“ধৈর্য ধরো। মাত্র এলে। হানিমুনে বহুত সময় পড়ে আছে।”
“ধৈর্য! চরম পরীক্ষা নিচ্ছিস। দেখে নিব তোকে আমি।”
“দেখতেই পারো। আমার মতো হ্যান্ডসাম কমই দেখা যায় আজকাল।”
“হুইলা বান্দর দেখা যায়।”
পৌষ ফোড়ন কাটলো। তুহিন রাগলো না৷ পৌষের ব্যাগ কাঁধে নিয়েই সামনে যেতে যেতে বললো,
“স্বজাতি বলে কথা৷”
পৌষ কটমট করে তাকালো তৌসিফের দিকে। খেঁকালো,

“দেখলেন! দেখলেন আপনি! আপনার ভাই আমাকে বান্দর বললো।”
“আমি বিচার করব হানি। তুমি শুধু মাথাটা ঠান্ডা রাখো।”
তৌসিফ বউ ঠান্ডা রাখার পুরো চেষ্টায় তখন। একদম সেই সময়ে তুহিন আবার ফিরে এলো। একটা মাফলার এগিয়ে দিলো পৌষের দিকে। বললো,
“এখানে অনেক ঠান্ডা।”
তৌসিফ পৌষের গলায় পেঁচিয়ে দিলো মাফলারটা৷ তায়েফার বাসা থেকে তার ছেলে আর স্বামী এসেছে মামাদের নিতে। ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তুহিন ভাগ্নেকে দেখেই হাত নাড়লো। বাইশ বছরের ছেলেটা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো তুহিনকে। ডেকে উঠলো বেশ আবেগী হয়ে,
“মামা।”

তুহিন উঁচু করে তুললো ওকে। নামিয়ে দিতেই ইহান ওকে আবারও জড়িয়ে ধরলো। পেছন থেকে তৌসিফকে দেখলো ও। সাথে পৌষকে দেখেই নম্রভাবে এগিয়ে এলো। পৌষকে এবারে ছাড়লো তৌসিফ। ইহানের দিকে দুহাত প্রসারিত করা মাত্র ইহান ঝাপ্টে ধরলো ওকে। বেশ লম্বা চওড়া দেখতে ও। সুদর্শন যথেষ্ট। তৌসিফ ভাগ্নেকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো। মাথার সাইডে চুমু খেয়ে বললো,
“ইরা আসে নি?”
“ও তোমাদের জন্য রুম গোছাচ্ছে। হানিমুনে এসেছো তো, ভাইব মিলতে হবে না?”
কথাটা ফিসফিস করে কানে বললো ইহান৷ বাচ্চাগুলোর জন্ম, বেড়ে উঠা এই সিডনি শহরে। আদব কায়দা যথেষ্ট জানা আছে কিন্তু ফ্রী মাইন্ডের অনেকটা৷ তৌসিফ আড়ালে হাসলো। ইহান পৌষকে দেখেই সালাম দিলো,
“ভালো আছেন মেঝ মামি?”
“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি ভালো?”

“আপনাদের দেখে তো আমি একদম ফিট হয়ে গেলাম মেঝমামি৷ চলুন চলুন, আব্বু গাড়িতে অপেক্ষা করছে।”
তৌসিফ বউ, ভাই নিয়ে এগিয়ে গেলো। ইহান বারে-বারে দুই মামার ঘাড়ে ঢলে পড়ছে। গাড়িতে মিস্টার কিবরিয়া বসা৷ তৌসিফ আর তুহিন দুলাভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করলো। গাড়ি চললো এয়ারপোর্টে থেকে পূর্বদিকে। পয়েন্ট পাইপারে তাদের বাস। তায়েফার স্বামী এখানকার বিশিষ্ট একজন ব্যাবসায়ী। সেই আমলেই তায়েফাকে পা থেকে মাথা ডায়মন্ড পড়িয়ে নিয়ে এসেছিলো বিয়ে করে। এলাকাবাসী দেখেছিলো সেই বিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে।
গাড়িতে চুপ রইলো না কেউ। প্রচুর কথা বলে এরা৷ এদের এতসব আলোচনায় পৌষ চুপ করে গেলো তবে সেটা অল্প সময়ের জন্য অতঃপর পুণরায় সে নিজেও যোগ দিলো।
সমুদ্রের একদম ধারে হওয়াতে আবহাওয়া খুবই শীতল। তায়েফাদের এপার্টমেন্টে আসতেই তায়েফা ছুটে আসে। ভাইদের রেখে পৌষকে জড়িয়ে ধরে আগে। পৌষ ওর থেকে উষ্ণ আদর পেলো। তায়েফা কাঁদছে। মিস্টার কিবরিয়া বউকে থামালেন। তাড়া দিলেন ঠান্ডায় ওদের ভেতরে নিতে। ইরা ইহান থেকে দুই বছরের ছোট। পিঠাপিঠি দুই ভাই-বোন। ইরা মামাদের যথেষ্ট আদরের। তুহিন ওর জন্য আনা গিফট গুলো সবার আগে বুঝিয়ে দিলো ওকে৷ ইরা সরাসরি জিজ্ঞেস করলো,

“হানিমুন তো মেঝ মামার, তুমি কেন বউ সহ এলে না ছোট মামা?”
“আমি পাহারা দিতে এসেছি।”
তৌসিফ আড় চোখে দেখলো ছোট ভাইকে। রাত তখন প্রায় দুটো। তায়েফা খেতে তাড়া দিলো। ফ্রেশ হয়ে সবাই আড্ডা দিতে দিতে প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। পৌষের সময় লাগে নি ওদের সাথে মিশতে। ইরা ইশারা দিলো ইহানকে। ইহান গলা ঝাড়লো। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“মেঝমামা, চলো আমার সাথে। তোমাকে রুমে দিয়ে আসি।”
তৌসিফ কপাল কুঁচকালো। পৌষ ওর বাহুতে লেপ্টে সামান্য, ঠান্ডা এখানে যদিও হিটার চলছে। তৌসিফ মানা করলো না৷ পৌষকে নিয়ে উঠে গেলো। ইহান পেছন পেছন এসে বললো,
“যেই কোন প্রয়োজনে এক ডাক দিবে মেঝমামা৷ আ’ম অন ডিউটি ফর টু নাইট।”
ইরাও মামাকে লাক উইশ করলো। তৌসিফ তেমন গুরুত্বপূর্ণ দিলো না৷ পৌষকে নিয়ে রুমে ঢুকে অবাক হলো। পুরো রুম মৃদু আলোয় সজ্জিত। সেই আলোতেই ফুটে উঠেছে ঘরটা৷ ফুল দিয়ে বিছানা থেকে শুরু করে চারপাশ সাজানো। ঘ্রাণে ম-ম করছে ঘরটা। পৌষ তৌসিফকে ছেড়ে দিয়ে এদিক ওদিক হাঁটলো। দেখলো চারপাশ। দেখেই তৌসিফের দিকে ঘুরে বললো,

“ওরা কি বাসর সাজালো?”
“তাই তো দেখছি।”
“ওরা জানে না আপনি পুরাতন হয়ে গিয়েছেন?”
তৌসিফ তেঁতে উঠলো। তার যৌবন নিয়ে তার বউ প্রশ্ন তুলেছে! বিষয়টা তো ছোট না৷ এগিয়ে এসেই পৌষকে টেনে ধরলো। চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি পুরাতন?”
“রাগার কি আছে? মিথ্যা নাকি?”
“নতুনত্ব দেখাব?”
“বাকি আছে দেখার?”
“আই ক্যান মেইক ইট বেটার ফর ইয়্যু হানি।”
“লেটস সি মাই হাবিডাবি।”
তৌসিফ তৎপর হতে নিলেই পৌষ থামিয়ে দিলো। বললো,
“একটু ওয়াশরুমে যাব।”
“ইয়াহ, শিওর।”
পৌষ সরে গিয়ে নিজের ব্যাগ খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলো সহজ গলায়,
“নাইটি পরব?”

তৌসিফ ছটফট করে উঠলো। ও বারবার নিজের এক ব্যাগের দিকে যাচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। একবার হাত দিচ্ছে তো আবার গুটিয়ে ফেলছে। পৌষ ওকে দেখলো। একটু অবাক হয়েই বললো,
“আপনি ঘামছেন নাকি? খারাপ লাগছে?”
“তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি ব্যাগ ঠিক করছি।”
পৌষ মানলোই না৷ ও তো স্পষ্ট দেখছে তৌসিফকে অসুস্থ দেখাচ্ছে। এগিয়ে এসে কপালে হাত দিয়ে দেখলো একটু। পরপর চিন্তিত হয়ে বললো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৭

“এই আপনার কি হলো হঠাৎ? ঠান্ডাটা বেশি লাগছে? দেখি দেখি।”
তৌসিফকে নিয়ে বিছানায় বসলো পৌষ। তৌসিফ বসে থাকলো না৷ ও ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলো। পৌষকে নিয়ে শুয়েই পড়েছে ইতিমধ্যে। পৌষ শুধু তৌসিফের পরিবর্তন দেখলো। এই না কেমন কেমন করছিলো? এই তো ব্যাটা সুস্থ। একদম সুস্থ। এখন কেমন ফাইজলামি করছে। পৌষ হেসে ফেললো তৌসিফের কাজে। নিজ থেকে এগিয়ে এলো ওর দিকে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৯