Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩
তন্ময়ী তিতিক্ষা

“আযরান কাকে বিয়ে করতে চায় ছোটমা?”
অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আর্শি। আযরান বিয়ে করতে চাচ্ছে শুনে যেন আকাশ থেকেই পড়ল। দিনা হায়দার রাগী দৃষ্টিতে তাকালেন। রেগে বলে উঠল,
“আমি এতো জানি? যে আমাকে জিজ্ঞাস করছিলাম। শুনলাম কাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে৷ এই নিয়ে ভাইজানের সাথে ঝগড়া করে ঢাকা চলে গেছে। আজাইরা আলাপ বাদ দিয়ে নাস্তা বানা। সবাইকে খালি পেটে রাখবি নাকি।”
দিনা বেড়িয়ে গেল। মনটা বড্ড উশখুশ করছে আর্শির। কেন তাকে কিছু বলে গেল না আযরান? আর এখনই বিয়ে করতে চাচ্ছে কেন? ওর বিয়ের বয়স হয়েছে? ভ্রুঁ কুঁচকে গেল আর্শির। আযরান আর্শির থেকে একবছরের ছোট। তবে আর্শির একক্লাস গ্যাপ যাওয়ার কারনে সে আর আযরান একসাথে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে। ছোট থাকতে তার আর আযরানের খুব একটা সখ্যতা ছিল না। আর্শিই যেন ছিল আযরানের জাত শত্রু।

তারপর তারা যখন ক্লাস টেনে পড়তো। হুট করে আযরানের গা কাঁপিয়ে জ্বর আসল। সে কি সাংঘাতিক জ্বর। ছেলেটা জ্বরের জন্য দাঁড়াতেও পারছিল না। তখন আর্শিই তাকে কষ্ট করে বাড়ি নিয়ে এসেছে। তারপর থেকেই ছেলেটা কেমন তার বন্ধু হয়ে গেল। এতবছরেও সেই বন্ধুত্বে সামান্য ফাটলটুকুও ধরেনি। ভাবনার মাঝেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুঁটে উঠল আর্শির। ইশশ! সময় কত দ্রুত চলে যায়। আগের স্কুলের দিন গুলো খুব মিস করে সে। দু’চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্শি। খাবারের বাটিটা হাতে নিয়ে অগ্রসর হলো ডায়নিং টেবিলে দিকে। হুট করে কারো সাথে ধাক্কা লাগতেই খাবারের থালাটা ঠাস করে মেঝেতে আঁছড়ে পড়ল। নিমিষেই আঁতকে উঠল আর্শি। ঠিক তখনই কর্ণে এসে বারি খেল আয়রার কন্ঠস্বর,
“কি করলি আপু তুই এটা? আমার ড্রেসটা দিলি তো নষ্ট করে। এখন আমি কলেজে যাবো কি করে?”
আর্শি চমকাল। সামনে ফিরতেই নজরে এলো রাগান্বিত আয়রাকে। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে এলো আর্শির । হাত পা কেমন অবশ হয়ে আসছে। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া নাস্তা আর আয়রার ড্রেসে লেগে থাকা তরকারির দাগের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল ।

“আমি..আমি ইচ্ছে করে করিনি আয়রা। হঠাৎ ধাক্কা লেগে গেল…”
কাঁপা কণ্ঠে বলল আর্শি। আয়রা ততক্ষণে প্রায় চিৎকার করে উঠেছে। গলা ফাঁপিয়ে বলে উঠল,
“ইচ্ছে করে করিসনি মানে? চোখে দেখে হাঁটতে পারিস না? আমার নতুন ড্রেসটা শেষ করে দিলি।”
আয়রার চিৎকার শুনে কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্নাঘরের দিক থেকে তড়িঘড়ি করে এসে হাজির হলো দিনা হায়দার। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। ধুক করে উঠল আর্শির বুকটা। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দিনা হায়দার বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
“কি হয়েছে আবার? সকাল সকাল কি নাটক শুরু করেছিস?”
আয়রা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“দেখো না মা! আপু এসে ধাক্কা মেরে আমার ড্রেসটা নষ্ট করে দিল।”
আর্শি অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। দিনা হায়দারের দৃষ্টি একবার আয়রার ড্রেসে পড়ল, তারপর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা খাবারের দিকে। মুহূর্তেই মুখটা শক্ত হয়ে গেল তার। আর্শি ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল ছোটমার দিকে। কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল,

“ছোটমা…আমি ইচ্ছে করে…”
আচমকা জোরালো থাপ্পড় এসে পড়ল আর্শির গালে। ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় পড়ে যেতে যেতে কোনো মতে সামলে দাঁড়াল আর্শি। অশ্রুসিক্ত চক্ষে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। গালটা লাল হয়ে উঠেছে। টনটন করছে জায়গাটা। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল অন্তরটা। দিনা হায়দার গর্জে উঠলেন,
“তোর কারণে এই বাড়িতে একদিনও শান্তি নেই। সবকিছু নষ্ট করে দেওয়াই যেন তোর কাজ।”
অশ্রুতে টলমল করছে আর্শি নেত্রপল্লব। দিনা হায়দার থামলেন না। পুনরায় গর্জে উঠে বলল,
“খাওয়া দাওয়া ছাড়া আর কিছুই বুঝিস না। হাতি হয়ে যাচ্ছিস দিন দিন, তার ওপর আবার এমন অপদার্থ।”
কথাগুলো যেন তীরের মতো এসে বিঁধছিল আর্শির বুকে। কষ্টে বুক ভারী হয়ে আসছে বারংবার। তবুও চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল আর্শি। চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পরছে। আয়রা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। এবার ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
“মা, আমার এখন কি হবে? আমি তো এই ড্রেসটাই পরে কলেজে যাওয়ার কথা ছিল।”
দিনা হায়দার বিরক্ত হলেন। গমগমে কন্ঠে বলল,
“তুই গিয়ে আরেকটা ড্রেস পরে নে। আর এই মেয়েটাকে নিয়ে মাথা ঘামাস না।”
তারপর আর্শির দিকে আঙুল তুলে বললেন,
“আর তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা!এগুলো পরিষ্কার কর। সকাল সকাল সব নষ্ট করে দিলি।”
আর্শি কিছু বলল না। মাথা নিচু করে বসে পড়ল মেঝেতে। কাঁপা হাতে খাবারগুলো তুলতে লাগল এক এক করে। চোখ থেকে টুপটাপ করে অশ্রু পড়ছে মেঝেতে। বুকের যন্ত্রণায় শরীরটা ভেঙে আসছে। বক্ষস্থলে অজস্র ব্যথার ছড়াছড়ি। হুট করে ফুঁপিয়ে উঠল আর্শি। মুখে হাত চেপে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা করল। পরক্ষণেই ঝাপসা চোখে তাকিয়ে নিজের কাজে মনোযোগী হলো৷ নাহলে হয়তো আরও কটুবাক্য হজম করতে হবে।

সূর্যের আলো ছড়িয়ে পুরো কক্ষজুঁড়ে। বাইরে একজোড়া চড়ুইয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে আর্শি। বাইরে অসংখ্য মানুষের আনাগোনা। নিজের মাঝেই ভাবনায় ব্যস্ত আর্শি। ঢাকায় ফিরে যেতে পারলেই বোধহয় ভালো হতো। এখানে থাকলে নিশ্চয়ই সে দমবদ্ধ হয়ে মারা যাবে। কিছুক্ষণ পূর্বে বড়মা রাও চলে গেছে। কতদিনই বা থাকবে তারা? আর্শিরা চট্টগ্রাম থাকলেও বড়মাদের বাড়ি ঢাকায়। আর সেখানেই থাকে তারা। চক্ষুদ্বয় বুঁজে একবার শ্বাস টেনে আবার মুক্ত করে দেয় আর্শি।
কিছুক্ষণ এভাবেই বসে রইল আর্শি। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকস্মিক বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এক অদ্ভুত শূন্যতা যেন চারপাশে ভর করেছে তার। এই বাড়িটা, এই মানুষগুলো সবকিছুই যেন তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে। আর্শি পাশে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নিল। কল লগে যেতেই প্রথমে ভেসে উঠল একটা নাম।
“নোমান!”

কল দিবে কি? যদি রেগে যায়? এইটাইমে তো আবার নোমান ব্যস্ত থাকে। একটু ইতস্তত করল আর্শি। তবুও শেষমেশ টিকতে না পেরে কল বাটনে চাপ দিল। রিং পড়ছে। হুট করে অপাশ থেকে কল কেটে দিল। এটা তো হওয়ারই ছিল। মোবাইলটা কানের কাছে ধরে নিরবে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল আর্শি। অদ্ভুত একটা কষ্ট এসে ভর করল বুকের ভেতর। ঠোঁট দুটো কাঁপল সামান্য। সে পুনরায় কল দেওয়ার কথা ভাবল। পরক্ষণেই কি ভেবে থেমে গেল। মনে হলো নোমান হয়তো বিরক্ত হবে। আর্শির মুখশ্রী আরও খানিকটা মলিন হয়ে গেল। মৃদুস্বরে নিজের কাছেই বলল,
“তুমি তো বলেছিলে নোমান…সবসময় আমার পাশে থাকবে তাহলে কেন এখন তোমাকে পাশে পাইনা?”
দৃষ্টি অনুভূতি শূণ্য আর্শির। দেহের অভ্যন্তরে হৃদপিন্ড নামক স্থানে বিষাদের ছড়াছড়ি। সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই হুট করে কিছু একটা মনে পড়ল তার। নিমিষেই স্ক্রিনে আরেকটা নাম খুঁজে বের করল।
“আযরান”

এবার আর কোনো দ্বিধা কাজ করল না। চট করে কল লাগাল আযরান নামক ব্যাক্তির নাম্বারে। একবার রিং পড়তেই সাথে সাথে রিসিভ হয়ে গেল। অবাক হলো আর্শি। এত দ্রুত রিসিভ হয়ে যাবে সে আশা করেনি। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পুরুষালি গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“কি ব্যাপার?”
“এত তাড়াতাড়ি রিসিভ করে ফেললি?”
“হুহ! ফোন হাতে ছিল।”
চুপ মেরে গেল আর্শি। ওপাশ থেকে মানুষটাও চুপ। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দটুকু ভেসে আসছে। হুট করে মৃদুস্বরে আর্শি বলে উঠল,
“তুই..ঢাকায় পৌঁছেছিস?”
“হুম।”
“এত তাড়াতাড়ি চলে গেলি কেন?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ভেসে এলো আযরানের শান্ত কণ্ঠ,
“ঝামেলা ছিল।”
আর্শি ঠোঁট কামড়ে ধরল। একটু ইতস্তত করে বলল,

“তুই…আমাকে না নিয়েই চলে গেলি।”
ওপাশ থেকে এবার সামান্য হাসির শব্দ ভেসে এলো। যেন ওপর পাশের মানুষটা খুব মজা পেয়েছে। আর্শির কপাল কুঁচকে গেল। ভ্রুঁ যুগলও কিঞ্চিৎ বাঁকা হলো। ছেলেটা হাসছে কেন? সে কি হাসার মতো কিছু বলেছে?
“তুই কি আমার সাথে আসতে চাইতিস?”
আর্শি থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব শান্তস্বরে বলল,
“হুম… চাইতাম।”
ওপাশে আবার কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আযরান হঠাৎই বলে উঠল,
“তাহলে চলে আয়। আমার কাছে..”
কথাটা শুনে আর্শি যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পল্ক ঝাপটিয়ে বুঝার চেষ্টা করল কয়েকবার। তারপর মিনমিন করে বলে উঠল,

“তুই কি বললি?”
“মাথামোটা বলেছি ঢাকায় চলে আয়।”
নির্লিপ্ত কন্ঠের জবাবে চুপ মেরে গেল আর্শি। বললেই কি আর যাওয়া সম্ভব? ছোটমা এত সহজে তাকে যেতে দিবে? উঁহু দিবে না। সূক্ষ্ম একটা শ্বাস ফেলল। হুট করে মনে পড়তেই মৃদুস্বরে বলে উঠল,
“শুনেছি তুই নাকি বিয়ে করতে চাইছিস?”
ওপাশ থেকে সাথে সাথেই উত্তর এলো না। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর আযরান বলল,
“কে বলল তোকে?”
“ছোটমা।”
এবার আর্শি প্রশ্ন করে বসল “কাকে?”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২

অপাশের মানুষটা হাসল। কেমন যেন অদ্ভুত হাসি। হুট করে ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“তোর এত আগ্রহ কেন?”
ভ্রুঁ কুঁচকায় আর্শি। এই ছেলে বলে কি? তার আগ্রহ থাকবে না? যতই হোক একটা মাত্র বন্ধু বলে কথা। কিছুটা নাক ফুলে উঠল তার। অভিমানও হলো সামান্য। নাক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“তো আমার আগ্রহ থাকবে না তো কার থাকবে?”
“আমার বউয়ের থাকবে।”

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৪