কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৮
তন্ময়ী তিতিক্ষা
নির্বাক, নির্বিকতায় কয়েকমূহুর্ত কাটিয়ে দিল আর্শি। আযরানের কথায় একদম জমে গেছে মেয়েটা। বুকের ভেতরটাও কেমন অস্থির হয়ে আছে। চোখ বড় বড় করে তাকাল আর্শি। আযরানের মুখের দিকে তাকালো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চাইল। আমতা আমতা করে বলে উঠল,
“কি…কি বললি?”
আযরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, যেন বিষয়টা একদম স্বাভাবিক। অপরদিকে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছে আর্শি। অপেক্ষায় আছে আযরানের মুখ থেকে কিছু শোনার। আযরান এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো। কিছুটা ধমকের স্বরে বলে উঠল,
“আমাদের মানে তোর। এত সহজ জিনিসও বুঝিস না মাথামোটা? তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড। আমি মানেই তুই, তুই মানেই আমি। আলাদা করে বলার কি আছে?”
আর্শি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে স্বস্তি, লজ্জা। নিমিষেই আর্শি তব্দা খেয়ে গেল। আযরান চাইল আর্শির পানে। অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টি। পুনরায় বলে উঠল
“তোর বিয়ে মানে আমার মাথাব্যথা। শপিং-টপিং সব ঠিকঠাক না হলে পরে আবার কান্নাকাটি করবি। ‘আযরান এটা ভালো না, ওটা ভালো না’। তাই আগে থেকেই সব দেখে নিচ্ছি।”
অতিশয় বিস্ময়ে হতবাক আর্শি। শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে গেল শীতল স্রোত। পুলকিত হলো মন। দু’চোখে অদ্ভুত মুগ্ধতা ফু্ঁটে উঠল। ছেলেটা না বলতেই সব বুঝে যায় কি করে? তার তো এইসবের কথা মাথায়ই আসেনি। আর না কোনো প্রয়োজন আছে। নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো আর্শি। ইতস্তত করে বলে উঠল,
“আমার এইসবের প্রয়োজন নেই আযরান। আমার শাড়ি আছে। কালকে ওটাই পড়বো।”
“আল্লাহ তাই! তুই না বললে আমি তো জানতামই না।”
গালে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল আযরান। ভরকে গেল আর্শি। হতবাক হতেও ভুলে গেল যেন। আযরানের মতো গম্ভীর ছেলের থেকে এমন কিছু সে কখনোই আশা করেনি। মূহুর্তে কপালে সূক্ষ্ণ ভাঁজ ফেলে ভ্রুঁ কুঁচকালো সে। হাতে থাকা কাঁধ ব্যাগ দিয়ে বারি বসিয়ে দিলো আযরানের কাঁধে। নাক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“তুই আস্তো এক শয়তান। শুধু ভালো মানুষের মুখোস পড়ে থাকিস।”
ব্যাগটা করে আঁকড়ে ধরল আযরান। আর্শি কিঞ্চিৎ ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। আযরানের দৃষ্টি আর্শিতেই স্থির। আকস্মিক কিছু না বলে ব্যাগে প্রচন্ড জোরে টান দিল আযরান। আর্শি ঝুঁকে পড়ল। কেঁপে উঠল মেয়েটা। আযরান আর তার দূরত্ব সামান্য। আর্শির পুরো মুখশ্রীতে একবার চক্ষুদ্বয় বুলাল আযরান। পরক্ষণেই ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“ঠিক বলেছিস মুটি। আমি একদমই ভালো মানুষ নই। যেদিন আমার মুখোস খুলে যাবে। তুই স্বয়ং আমাকে ঘৃণা করবি। তবে সেই ঘৃণা পেতে আমি একদম প্রস্তুত।”
আর্শি যেন জমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠল। চোখেমুখে অস্থিরতা স্পষ্ট। আযরান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। হুট করে হো হো করে হেসে উঠতেই আর্শি চমকে উঠল। হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইল আযরানের পানে। পেট চেপে হাসি থামালো আযরান। বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে বলে উঠল,
“তুই আসলেই একটা মাথামোটা আর্শি। বলদী! কি পরিমাণ ঘাবড়ে গেছিস। ”
আর্শি স্বস্থির নিশ্বাস ফেলল। সে সত্যিই খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলো। আযরানই একমাত্র ব্যাক্তি যারে আর্শি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারে। এমন কিছু হলে আর্শি আসলেই মানতে পারবে না।
মল এর সামনে এসে সিএনজি থামতেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো আর্শি। চারপাশে মানুষের ভিড়। অথচ এই ভিড়ের মাঝেই নিজেকে কেমন বেমানান লাগছে তার। সকলের পরনে দামী পোশাক৷ নিজের দিকে একবার তাকালো আর্শি। একটা কমদামী পুরোনো থ্রি পিস পরা। যেটার রং টাও অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। মুখটা মলিন হয়ে এলো আর্শি। ঠিক তখনই শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করল আযরানের গম্ভীর কন্ঠস্বর,
“নামবি না? নাকি এখানেই বিয়ের প্ল্যান করছিস?”
“আমি যাবো না আযরান। আমার কিছু লাগবে না। আমায় হোস্টেলে দিয়ে আয়।”
আযরান কোনো কথা বললো না। এগিয়ে এসে আর্শির হাতটা মুঠোয় পুরে নিল। আর্শিকে বের করে সামনে এগোতে লাগল কোনো বাক্য ব্যয় না করে। আর্শির বার বার বাঁধা দিতেই আযরানের পদযুগল থেমে গেল। ফিরে চাইল আর্শির পানে। একহাত পকেটে গুঁজে অপর হাতে আর্শির হাত মুঠোয় শক্ত করে চেপে বলে উঠল,
“থাপ্পড় খেতে চাস তুই? না খেতে চাইলে চল।”
“আমি যাবো না।”
“তুই জানিস তোর এই আলুর বস্তার মতো শরীরটা আমি নিমিষেই উঠিয়ে নিতে পারি? না গেলে উঠিয়ে নিয়ে যাবো বলে দিলাম।”
চোখ কপালে ঠেকল আর্শির। আযরানের কথায় কি বলবে ভেবে পেল না। তবে কিছুটা রাগ হলো তার। রেগেই বলে উঠল,
“তুই একটা ফালতু ছেলে। অসভ্য! ছাড়! আমি যাবো না।”
হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল আর্শি। এতে আরও শক্ত করে হাত মুঠোয় পুরে নিলো ছেলেটা। জোর করে টানতে টানতে নিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল,
“চুপচাপ চল। কিছু বললে মাথায় তুলে আছাড় মারবো তোকে।”
আর্শির নাক ফুলে উঠল নিমিষেই। আর কোনো কথা বললো না। মুখশ্রী অন্ধকার করে চলতে শুরু করল আযরানের পিছু পিছু।
বিশাল বড় শপিংমল। আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবকিছু অবলোকন করে চলেছে আর্শি। আযরানের ফোন আশায় সে একটু পাশেই গিয়েছে। আর্শিকে বলে গেছে অপেক্ষা করতে। এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে দেখে চলেছে আর্শি। এত বড় মলে সে আগে কখনো আসেনি। শুধু টিভিতে দেখেছিলো। আর্শির চোখ ধাঁধিয়ে আসতে চাইছে। দেখতে দেখতে হুট করে একটু পিছাতেই কারো সাথে ধাক্কা লাগলো আর্শির।
“উফফ! এক্সকিউজ মি!”
কোনো মেয়ের তীক্ষ্ণ গলায় বলা কথাটা শুনতেই আর্শি ঘাবড়ে গেল। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল একটা মেয়েকে। বেশভূষায় বুঝা যাচ্ছে বড়লোক বাড়িরই হয়তো। আর্শি ভরকে গেল। আঁতকে উঠে বলল,
“সরি… আমি খেয়াল করিনি।”
মেয়েটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলালো। তার পরপরই নাক ছিটকালো যেন নোংরা কিছু দেখেছে। পরক্ষণেই ভ্রুঁ কুঁচকে বলে উঠল,
“এইসব লো ক্লাস মানুষদের এখানে ঢুকতে দেয় কে? কাজ নেই শুধু মানুষকে ধাক্কা দিতে আসে।”
আর্শি কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
“সরি..আমি সত্যিই ইচ্ছে করে ধাক্কা দেইনি।”
“ইচ্ছে করে করবে কিভাবে? নিজের সাইজটা তো আগে বুঝতে হবে। এত মোটা হলে মানুষের সাথে ধাক্কা তো লাগবেই। কজ..জায়গা তো সব নিজেই দখল করে রাখছো।”
আর্শির বুকটা ধক করে উঠল। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল মুহূর্তেই। চক্ষুদ্বয়ও ভিজে উঠল। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। চারপাশের মানুষজনের কৌতূহলী দৃষ্টি যেন তাকে আরও ছোট করে দিচ্ছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল আর্শি। মেয়েটার পাশেই একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে হয়তো তার স্বামী। সে কিছু বলতেই মেয়েটা পুনরায় বলে উঠল,
“ঠিক বলেছো। এইসব মিডেল ক্লাস ক্ষ্যাত মেয়ে।”
এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল আর্শির চক্ষুকোণ বেয়ে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে তার। মুখ দিয়ে একটা শব্দও যেন বের হতে চাইছে না। মেয়েটা পুনরায় বিরক্তির স্বরে বলে উঠল,
“এদের জন্যই শপিং করাটাই বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে। কোথা থেকে যে আসে….”
“কোথা থেকে আসে সেটা জানতে খুব ইচ্ছা করছে?”
আকস্মিক কারো গম্ভীর কন্ঠস্বর কর্ণপাত হতেই সকলে সেদিকে চাইল। আর্শি অশ্রুসিক্ত ঝাপসা চোখে আযরানকে দেখতে পেল। এতেই যেন স্বস্তি ফিরে পেল মেয়েটা। আযরান আর্শির দিকেই তাকিয়ে। আঁখিদ্বয় অস্বাভাবিক ঠান্ডা। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। আযরান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। চারপাশের কৌতূহলী দৃষ্টি, ফিসফাস সবকিছু যেন তার কাছে গুরুত্বহীন। তার দৃষ্টি শুধু স্থির আর্শির ওপর। আর্শির ভেজা চোখ, কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে তাকিয়েই আর্শির সামনে এসে থামল। আযরান কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে যেন অদ্ভুত এক তীব্রতা। আর্শি ছলছল নজরে তাকাল। অসহায় সেই দৃষ্টি। চোখ দিয়েই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে তাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা। আযরান এবার শান্তস্বরে বলে উঠল,
“চুপচাপ সহ্য করলি কেন?”
আর্শি কেঁপে উঠল। মাথা নিচ করে ফেলল সাথে সাথে। ঠোঁট নড়ল সামান্য। আযরান আরও একটু ঝুঁকে এলো। স্বরটা এবার খানিকটা কঠিন,
“কথা বল। তোর মুখে কি তালা ঝুলছে?”
আর্শি অস্ফুটস্বরে বলল,
“আমি..ঝামেলা করতে চাইনি..”
একটা তীক্ষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল আযরান। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিলো যেন। হুট করে নেত্রপল্লব মেলে শীতল কন্ঠে বলে উঠল,
“তোর কিছু বলা উচিত ছিলো….?”
কথাটা বলে একমূহুর্তও দেরি করল না। সজোরে ঘুষি বসিয়ে দিল মেয়েটার হাসবেন্ডের মুখশ্রীতে। হঠাৎ আঘাতে লোকটা কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল। নিমিষেই চারপাশে হৈচৈ পড়ে গেল। আর্শি চমকাল। স্বশব্দে বলে উঠল,
“আযরান! কি করছিস এসব।”
মেয়েটা চিৎকার করে উঠল,
“Are you crazy?
আযরান কাউকে পাত্তা দিলো না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল লোকটার সামনে। মাটিতে পড়ে ব্যথা কতরাচ্ছে লোকটা। আশেপাশের মানুষও এগিয়ে আসছে না। যেন তামাশা দেখাই তাদের আসল কাজ। আযরান লোকটার কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“কাপুরুষ! নিজের স্ত্রীকে সামলাতে পারিস না? আবার পাশে দাঁড়িয়ে অন্য কাউকে অপমান করানো দেখিস?”
লোকটা আযরানকে পাল্টা আঘাত করতে চাইলে হাত মুছড়ে ধরল আযরান। মুহুর্তে ব্যথা মৃদু চিৎকার করে উঠল লোকটা। আযরান পুনরায় হুমকির সাথে বলে উঠল,
“স্ত্রীকে মানুষ বানাতে না পারলে, অন্তত চুপ করাতে শিখাবি। আর সেটাও না পারলে পরের বার বাইরে বের হওয়ার আগে হাতে চুড়ি পরবি দ্যান রাস্তায় এই মুখ নিয়ে বের হবি। শালা আবাল!”
মেয়েটা এবার রাগে ফেঁটে পড়ল। চিল্লিয়ে বলে উঠল,
“আমি এক্ষুনি পুলিশ ডাকবো। রাস্তার গুন্ডারা এসে গুন্ডামি করছে অথচ কেউ একটা শব্দ করছে না।”
আযরান উঠে দাঁড়াল। মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলেই আর্শি এসে হাত চেপে ধরল তার। মেয়েটা ভয়ে জমে আছে। আযরানের রাগ হলো। প্রচন্ড রাগ! অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল আর্শির পানে। এতে আরও খানিকটা গুটিয়ে গেল আর্শি। তবে হাত ছাড়ল না। আযরান এবার মেয়েটার দিকে চোয়াল শক্ত করে চাইল। রাগে শরীর জ্বলছে তার।
“ডাকুন কাকে ডাকার। মেয়ে বলে ছেড়ে দিচ্ছি। নাহলে এই কাপুরুষকে মারা ঘুষিটা আপনার মুখে দিতাম।”
আযরান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। ঘুরে এসে আর্শির হাত শক্ত করে ধরল। এবার তার স্পর্শটা আগের মতো রুক্ষ না…কিন্তু শক্ত।
“চল।”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৭
আর্শি নির্বাক হয়ে তার পিছু নিল। কিছু বলার সাহস অব্দি করল না। আযরানের হাতের রগগুলো ফুঁলে আছে রাগে। আর্শি সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলল। ভয়ে অন্তর আত্মা অব্দি কেঁপে উঠছে তার। কিছুদূর এগিয়েই আযরান থেমে গেল। হঠাৎ করেই আর্শিকে টেনে নিল নিজের দিকে। একদম নিকটে। অন্তস্থলে ভূমিকম্পের ন্যায় কম্পন হলো আর্শির। বিস্ময়কর দৃষ্টিপাত করল আযরানের পানে। অস্বাভাবিক হয়ে গেছে হৃদস্পন্দনের গতি। আরেকটু শক্ত করে একদম নিজের সাথে তাকে চেপে ধরল আযরান। আযরানের চোখ দুটো তখনও জ্বলছে রাগে। শক্ত কন্ঠে বলে উঠল,
“এত ভীতু কেন তুই? সবসময় আমি থাকবো তোর হয়ে কথা বলতে? বল থাকবো? কবে একটু শক্ত হবি? এত বড় একটা মেয়ে মুখ দিয়ে কথা বের হয় না তোর? চড়িয়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো আমি বেয়াদব।”
