কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৯
তন্ময়ী তিতিক্ষা
প্রভাতের নরম রোদ মাটির বুকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে।হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দ তুলে দুলছে। চারপাশে এক ধরনের প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে। যেন প্রকৃতি নিজেই নতুন একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করছে। পার্কের এক কোণায় পুরোনো কাঠের বেঞ্চে বসে আছে আর্শি। পরনে লাল শাড়ি। চুলগুলো খোলা…যা বাতাসের তালে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে অনবরত। কপালে ছোট্ট কালো টিপ। চোখে অদ্ভুত এক শান্তি আবার কোথাও যেন একটু অস্থিরতাও আছে। বেশখানিকটা সময় ধরে অপেক্ষারত মেয়েটা। অস্থির চক্ষুদ্বয় বারবার বুলিয়ে চলেছে হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে। প্রচন্ড ঘুমের চোটে আঁখি বুজে আসতে চাইছে। মাথার একপাশে চিনচিনে ব্যথার অনুভব হতেই চক্ষুদ্বয় খিঁচে ফেলল আর্শি। টেনশনে রাতে একমুহূর্তও চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সে যা করছে তা ঠিক করছে তো? এইসব ভাবতে ভাবতেই পুরোরাত পেরিয়ে গেছে। বড় একটা শ্বাস নিজের মাঝে টেনে নিলো। নিজেকেই প্রশ্ন করে বলে উঠল,
“আমি কি ঠিক করছি?”
খানিকটা সময় ঠোঁট কামড়ে বসে রইলো আর্শি। পরপরই নিজেকে বুঝ দিয়ে বলে উঠল,
“শান্ত হো আর্শি। ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে নেওয়া কোনো অন্যায় না। তারমানে তুই ভুল কিছু করছিস না।”
চক্ষে একরাশ ঘুম নিয়েই আনমনে কিছুক্ষণ বকবক করল মেয়েটা। এখন পিছু হটবে সে উপায় নেই। ছোট মাকে রাতে সব জানিয়ে দিয়েছে। এখন যদি বিয়ে নাও হয় ছোটমা তাকে মেরেই ফেলবে। অভ্যন্তর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আর্শি। কপালে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামটুকু মুছে একবার মস্তক ঘুরিয়ে তাকালো চারপাশে। নাহ! নোমানের আসার কোনো নামই নেই। এবার আর্শি আর বসে থাকতে পারলো না। হাতে থাকা বাটন ফোনটা থেকে নাম্বার বের করে কল লাগালো নোমানের নাম্বারে। ঠিক তখনই শ্রবণশক্তিতে কর্ণপাত হলো,
“সরি একটু লেট হয়ে গেল।”
আর্শির আঙুল থেমে গেল। কলটা আর করা হলো না। মাথা তুলে সামনে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দূরে দাঁড়িয়ে আছে নোমান। আজ কতদিন পরে মানুষটাকে দেখলো। সাদা চেক শার্টে যেন নোমানের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আর্শির বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল নিমিষেই। দু্’হাতে শক্ত করে চেপে ধরল ফোনটা। নোমান এগিয়ে এল। আর্শির সামনে এসেই থেমে গেল পদচারণ। হুট করে ঝুঁকে এলো আর্শির পানে। আর্শি ঘাবড়ে গিয়ে পিছনে হেলে পড়ল। অস্বস্তিতে শিউরে উঠল প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। নোমান অদ্ভুতভাবে হাসল। ঠোঁট নাড়িয়ে বলে উঠল,
“তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আর্শি। চলো আমরা যাই।”
“কাজি অফিস কোথায় তুমি চিনো?”
কিছুটা ইতস্তত করেই বলে উঠল আর্শি। মুহুর্তে মুখের ভঙ্গিমা কেমন পরিবর্তন হয়ে এলো নোমানের। একবার তাকিয়ে চক্ষুদ্বয় ফিরিয়ে নিল। আঙ্গুল গুলো নাড়িয়ে চুল ঠিক করল কয়েকবার। পুরোটাই লক্ষ্য করলো আর্শি। মিনমিন করে বলে উঠল,
“তুমি ঠিক আছো? ”
নোমান একটু হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসিতে স্বস্তির চেয়ে যেন অস্বস্তিই বেশি।
“হ্যাঁ..মানে..একটু নার্ভাস লাগছে।”
আর্শির ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল,
“আমারও।”
নোমানের ঠোঁটের কোণে সেই অস্বস্তিকর হাসিটা আরও একটু গাঢ় হলো। চারপাশে একবার চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে আর্শির পানে তাকিয়ে বলে উঠল,
“চলো! দেরি করা ঠিক হবে না।”
আর্শি আর কিছু না বলে মাথা নাড়ল। দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। নোমান একটু এগিয়ে আর আর্শি তার পিছু পিছু। হাঁটতে হাঁটতে নোমান হুট করে বলে উঠল,
“তুমি কাউকে কিছু বলোনি তো?”
“উঁহু শুধু ছোটমাকে বলেছি।”
“ভালো করেছো।”
কিছু একটা মনে পড়তেই হুট করেই আর্শির পদযুগল থেমে গেল। আযরানকে তো বলাই হয়নি। আর্শির থেমে যাওয়ার নোমান ভ্রুঁ কুঁচকে চাইল।
“কি হলো? চলো।”
আর্শি তড়িঘড়ি করে ফোন বের করল। আনমনে বলে উঠল,
“আযরান বলেছিল আসবে। কালকে লেট করে ঘুমাতে গেছে বিধায় আমাকে বলেছিলো সকালে ফোন করতে। আমার একদমই মনে ছিল না নোমান। দুই মিনিট অপেক্ষা কর প্লিজ।”
ঠাস করে ফোনটা কেঁড়ে নিল নোমান। আর্শি হকচকিয়ে গেল। প্রশ্নোবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নোমানের পানে। নোমান জোরপূর্বক হাসল। কিছুটা নিম্নস্বরে বলল,
“ও..ওকে আবার কেন? বিয়ে হয়ে গেলে জানিয়ে দিও।”
“আযরান আমার বেস্টফ্রেন্ড নোমান। ও আমার বিয়েতে থাকবে না?”
“নাহ! ওকে নিয়ে আমার জেলাস হয়৷ আমরা বিয়ে করে নেই তারপর ও আসবে।”
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল আর্শি। ভিতরে ভিতরে পুলকিত হলো মন। লজ্জাও পেল সামান্য। দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে আবার ফিরে চাইল নোমানের পানে মিনমিন করে বলে উঠল,
“আচ্ছা এবার চলো।”
রাস্তার দু’পাশে পুরনো, জরাজীর্ণ দালান। জানালাগুলো অর্ধেক খোলা, কোথাও ছেঁড়া পর্দা উড়ছে। চওড়া রাস্তা সরু হয়ে এলোদোকানগুলোও কেমন যেন অদ্ভুত অর্ধেক খোলা। চারপাশে লাল নীল আলোতে ছেয়ে আছে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে আর্শি। বুঝতে পারছে না কোথায় এসেছে। এবার আর থাকতে না পেরে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“রাস্তাটা কেমন অচেনা লাগছে না?”
নোমান থামল না। হাঁটতে হাঁটতেই বলে,
“শর্টকাট।”
পথচারী কয়েকজন চেয়ে আছে তাদের দিকে। হুট করে পাশের জানালা দিয়ে উঁকি দিলো দু’জন নারী। কৃত্রিম রঙে রাঙানো ওষ্ঠযুগল বাঁকিয়ে হেসে ফেলল আর্শিকে দেখামাত্র। অদ্ভুত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“নোমান ভাই। এই দেখি মোটা মেয়ে।”
আর্শির বড্ড অস্বস্তি হলো। কাছ ঘেষে দাঁড়াল নোমানের। নোমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেয়ে দু’টোর দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“নিজেদের কাজ কর যা।”
নিমিষেই হাসতে হাসতে জায়গা প্রস্থার করল মেয়ে দু’টো। নোমান অপ্রস্তুতভাবে হাসল। কিছুটা আমতা আমতা করে বলে উঠল,
“এলাকার মানুষ তো.. একটু অদ্ভুত। ইগনোর করো এদের।”
আর্শি সামান্য ঢোক গিলল। কেমন অস্বস্তি লাগছে সবকিছু। তবুও নোমান পাশে বলে ভরসা পেল। হাঁটতে হাঁটতে হাতটা মুঠোয় পুরে নিল নোমান। আর্শি তীব্র অবাক হলো। সেই সাথে ভালোলাগায় ভরে উঠল মন। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা তারপরই সারাজীবনের মতো মানুষটা তার। লজ্জায় আর মাথা উঠাতে পারল না আর্শি। নিঃশব্দে এগিয়ে গেল নোমানের পিছু পিছু। একটা কক্ষে প্রবেশ করেই হাত ছেড়ে দিল নোমান। সামনে একজন মাঝবয়সী মহিলা বসে আছে। তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি। ঠোঁট লাল লিপস্টিক দিয়ে আবৃত। নোমান গলা খাঁকারি দিলো,
“আন্টি…”
মহিলাটি মাথা তুললেন। প্রথমে নোমানের দিকে পরক্ষণেই আর্শির দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা যেন একবারেই ভেদ করে গেল আর্শিকে।
“এই বুঝি সেই মেয়ে?”
নোমান হালকা হেসে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ আন্টি। বলেছিলাম না…”
আর্শি ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না। মহিলাটা হেসে উঠল। আর্শির পানে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আর্শির মাথা থেকে পা পর্যন্ত চক্ষুদ্বয় বুলিয়ে নোমানের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“খারাপ না ভালোই।”
কথাটা বলেই কাউকে ডেকে উঠল মহিলাটি,
“এই শীলা! একবার এদিকে আয় তো।”
কিছুক্ষণের মাঝেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা মেয়ে। বয়স খুব বেশি না। আর্শির কাছাকাছি। মেয়েটার উদ্দেশ্য বলে উঠল,
“ওকে ভেতরে নিয়ে যা।”
এবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো আর্শির পানে। কিছুটা ঘাবড়ালো আর্শি। পান খাওয়া লাল দাঁতে হেসে উঠল মহিলাটি। আর্শির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“শিলার সাথে যাও। ও তোমাকে রেডি করে দিবে।”
আর্শি এবার খানিকটা লজ্জা পেল। মাথা উঁচিয়ে চাইল নোমানের পানে। নোমান ইশারায় যেতে বলল। লজ্জিত মুখেই আর্শি মাথা নাড়াল সামান্য। পরক্ষণেই শিলা নামক মেয়েটির পিছু পিছু চলল।
করিডরের দুপাশেই সারিবদ্ধ কক্ষ। সেই কক্ষের দরজার সামনে বেশ কিছু মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্ভুত পোশাক সকলের গায়ে। আর্শির মন এবার কিছুটা ভীত হলো। অজানা ভয়ে সেটে গেল মেয়েটা। একটা দরজার সামনে এসে থামল শীলা। দরজাটা ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল । আর্শিও ধীরে ধীরে পা বাড়াল। ঘরটা ছোট। একটা খাট, পাশে একটা আয়না, টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রসাধনী। পুরো রুমে এবার আঁখিদ্বয় বুলিয়ে নিল আর্শি। এখানেও কেমন লাল, নীল আলো জ্বলছে। আর্শি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোটানায় পড়ে গেলো। শিলা নামক মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। আর্শি কিছুটা অবাক হলো। তবুও অবাকতা লুকিয়ে বলে উঠল,
“জায়গাটা কেমন যেন অদ্ভুত!”
শীলা এবার ঘুরে তাকালো। চোখে কেমন নির্লিপ্ততা। নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে উঠল,
“তুমি এখানে কেন এসেছো?”
আর্শি অবাক হলো। সূক্ষ্মকন্ঠে বলে উঠল,
“নোমানের সাথে আমার বিয়ে হবে তাই।”
“এখানে কেউ বিয়ে করতে আসে না। কোথায় আছো তুমি জানো?”
নিবার্ক, নিস্তব্ধতায় আর্শি কাটিয়ে দিলো কয়েকমুহুর্ত। শীলার মুখের দিকে তাকিয়ে সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলল। কপালে ছোট্ট ভাঁজ পরিস্ফুটিত হলো। কৌতূহল নিয়েই বলে উঠল,
“কোথায় আছি?”
“পতিতা পল্লি।”
আকস্মিক এমন কথায় দুনিয়া যেন থমকে গেল আর্শি। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মূর্তির ন্যায়। অতিশয় বিস্ময়ে হতবাক মেয়েটা। পায়ের মাটি যেন সরে গেল নিমিষেই। ধীরে ধীরে চক্ষুকোণে জল জমতে শুরু করল। থরথর করে কাঁপতে থাকে সমস্ত কায়া। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে শিলাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“তুমি এইসব উল্টো পাল্টা কথা কেন বলছো?”
মেয়েটা কেমন নিস্তব্ধ। পূর্বের ন্যায় শীতল কন্ঠে বলে উঠল,
“পরিবেশ দেখেও বুঝোনি কিছু?”
আর্শির চোখে অশ্রুকণা চিকচিক করছে। সে নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে। মেয়েটাকে কিছু প্রশ্ন করতে যাবে এর পূর্বেই শিলা বেরিয়ে গেল। যাওয়ার পূর্বে দরজা লাগাতে ভুললো না। আর্শি ঘাবড়ে গেল। ছুটে গিয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করল।
“দরজা কেন বন্ধ করলে? আমাকে বের করো। নোমান..নোমান কোথায় তুমি? এ..এই নোমান। আসছো না কেন?”
পাগলের মতো দরজা ধাক্কিয়ে চলেছে আর্শি। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। ভয়ে বার বার শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। অজানা আশাঙ্কায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। অসহনীয় পীড়নে শরীর কেঁপে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই মাথা ঠেকিয়ে বসে পড়ল দরজার সামনে। আহাজারি করে বলে উঠল,
“এটা কি করলে নোমান। এটা কি করলে? ভালোবাসার এই প্রতিদান দিলে? বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে শেষে কিনা পতিতার খাতায় নাম লেখাতে হবে? ও আল্লাহ! আমাকে বাঁচিয়ে নেও। এই ট্যাগ আমি মানতে পারবো না খোদা। কিছু হওয়ার আগেই আমার মরণ দেও আল্লাহ।”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৮
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে আর্শি। কান্নাগুলো দলা পাঁকিয়ে উঠছে। আকস্মিক আযরানের কথা মনে আসতেই আর্শি ঠোঁট কামড়ে কেঁদে উঠল। হেচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে আনমনে বলে উঠল,
“আযরান..এই আযরান রে.. দেখ না তোর মুটি কোথায় ফেঁসে গেছে। আমি মরে যাবো আযরান..সত্যিই মরে যাবো। আমাকে বাঁচা আযরান। প্লিজ বাঁচা।”
