Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৬

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৬

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

বৈশাখের সেই দহনমাখা দিনগুলো যেনো বহু পুরোনো কোনো গল্প হয়ে গেছে এখন । যে প্রকৃতিতে একসময় রোদের তপ্ততা নেমে আসতো, সেখানে আজ হেমন্তের নরম আলো বিরাজ করে প্রকৃতিজুড়ে। সময় কবে যে বর্ষার অঝোর কান্না পেরিয়ে এতদূর চলে এসেছে, টের পাওয়াই দুষ্কর । একসময় আকাশ জুড়ে ছিলো কালো মেঘের রাজত্ব। দিনের পর দিন বৃষ্টি নেমেছে অবিরাম, পাহাড়ের গাঁ জড়িয়ে থাকা সবুজে সবুজ গাছপালা বৃষ্টির পানিতে ঝকঝক করতো, কাদামাখা পথে জমতো ছোট ছোট জলরাশি। সন্ধ্যাগুলো ছিলো স্যাঁতসেঁতে, বাতাসে ছিলো এক অদ্ভুত বিষণ্নতা। সেই বর্ষাও একদিন নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে।

এখন হেমন্ত। ভোরের বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া লেগে থাকে। মাঠের ধানগুলো সোনালি হয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে, যেনো পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি শেষে তারা অবশেষে শান্তি খুঁজে পেয়েছে। কাশফুলের সাদা ঢেউ দূরের পথঘাটকে অন্যরকম মায়াময় করে রেখেছে যেনো । গাছের পাতাগুলো আর আগের মতো উচ্ছ্বল নয়; তারা ধীরে ধীরে রঙ হারিয়ে নিস্তব্ধ হতে শিখেছে। সন্ধ্যা নামলে চারপাশে হালকা কুয়াশার আস্তরণ পড়ে আজকাল।
সময়ের সাথে ঋতুর পরিবর্তন বেশ করে চোখের পরার মতো । ঘড়ির কাটা ঘুরে এরই-মাঝে পার হয়ে গিয়েছে ছয় ছয়টি মাস । রোজকার জীবনের ব্যাস্ততা চলছে পুরো দমেই। অয়ন-শিয়া বলা হোক বা আকাশ-প্রিয়া। সবার বিবাহিত জীবনই বেশ গোছানো। নবদম্পতিরা সেই শুরুর মতোই নয়া প্রেমে মগ্ন এখনো।
প্রিয়ার ভার্সিটির ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। সামনে মাসেই ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা। আকাশদের প্রজেক্টের কাজ চলছে পুরোদমে। আর সম্ভবত মাস সাতেক সময় লাগবে পুরোপুরি কাজ শেষ হতে।
বেলা এগারোটা সবে। প্রিয়া আজ ভার্সিটি যায়নি। সকাল সকাল সবাই অফিস গেলেও শিয়া তাকে পাকড়াও করে নিয়ে এসেছে। এই মূহুর্তে দু বোন বসে আছে সিটি হসপিটালের করিডরে। খানিক-আগে কিছু টেস্ট করিয়েছে শিয়া। সে-সবের রিপোর্ট আসতে লাগবে কিছুসময়।

শিয়ার রোগ টা ঠিক কি, সেটা জানা নেই প্রিয়ার। সে গম্ভীর মুখে বসা । মিনিট পাঁচেক এর মাথায় একজন নার্স এসে জানালো আরও একটা টেস্ট বাকি আছে শিয়ার।
বাংলা কার্তিক মাসের মাঝামঝি । বেশ শীত শীত পরা শুরু করেছে প্রকৃতিতে। দিনের বেলা আবহাওয়া খানিক উষ্ণ থাকলেও রাত হওয়া শুরু করতেই শিরশির করে শরীর। হাসপাতালে খুব একটা ভির নেই। এখানকার স্থানীয় হাসপাতাল। বেশ বড়সড় হলেও এলাকার লোকসংখ্যা কম হওয়ায় বলা যায় রুগীর সংখ্যাও বেশ কমই। বোনের পিছু পিছু প্রিয়াও ঢুকেছে নার্সের দেখানো রুমটাতে। রুমটা আলট্রাসনোগ্রাফির। প্রিয়া নির্বিকার দাঁড়িয়ে। তবে সেই ভাবলেশহীনতা বজায় থাকলো না। মিনিট দুয়েকের মাথায়ই সামনের মনিটরে ভেসে উঠলো কিছু একটা। হার্টবিট! ডাক্তার মহিলাটি মুচকি হাসি দিয়ে তাকালো শিয়ার দিকে। শিয়ার চোখ ছলছল করছে। বোনের দিকে তাকাতেই দেখলো বড় বড় চোখ করে মনিটরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রিয়া। চোখেমুখে রাজ্যোর বিষ্ময়।
ডাক্তার আরও কিছুক্ষণ পরীক্ষা করলো। শিয়ার সাথে টুকিটাক কথাও বললো। মুচকি হেসে বললো,
—’ মিসেস মেহনাজ চৌধুরী, আপনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ‘

শিয়া সম্ভবত আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলো বিষয়টা। প্রিয়া কে সাথে নিয়ে আসার কারণও সেটাই। তবে প্রিয়ার হতবিহ্বলতা কাটছে না কিছুতেই। অজান্তেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো নোনাজল। খুশিতে লাফিয়ে উঠলো একপ্রকার।
পাহাড়ের কোল ঘেষে ছোট্ট একটা টং ঘর। প্রিয়াদের কটেজ আর আকাশদের কনস্ট্রাকশান সাইটের ঠিক মাঝামাঝি ফাঁকা রাস্তার বাঁকে এই চায়ের দোকানটা। এখানেও ভিড়ভাট্টা খুবই কম। স্থানীয় এক উপজাতির দোকান এটা। আকাশদের কাজের লোকজনই বেশিরভাগ যাতায়াত করে এদিকটায়। দু বোন গাড়ি নিয়ে আসেনি। এসেছিলো রিকশায়। হসপিটাল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে নেমেছে এখানটায়। প্রিয়ার আবদারে। সে আদতে এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি শিয়ার মা হওয়ার খবর।
ওদিকে সৌমির প্রায় সাত মাস চলে। ওকে কয়েকদিন আগেই দেখতে ঢাকা গিয়েছিলো ওরা সকলে। আর পাঁচটা গর্ভবতীর মতো ভরাট চেহারা নেই মেয়েটার। সেই রুপ সৌন্দর্য, জৌলুশ সব মিয়িয়ে গিয়েছে। সৌমির বাবা মেনে নেননি মেয়ের বিয়ে এবং এই বাচ্চা। রিয়ান এখনো জেলে। রিয়ান স্বইচ্ছায় যোগাযোগ করেনি সৌমির সাথে। সুতরাং একই জেদে সৌমিও চেষ্টা করেনি রিয়ানের জামিনের ব্যাবস্থা করার। মেয়েটার বাবা বারবার প্রেশার দিচ্ছিলো বাচ্চাটাকে দুনিয়াতে না আনতে। বাবার সাথে দুরত্বের কারণ এটাও একটা। আলাদা ফ্ল্যাট নিয়ে বসুন্ধরাতে এক কাজের মেয়ে নিয়ে একাই থাকে সৌমি। ওদিকে রাকা,তুশি নিয়মিত খবর রাখে যদিও। তবুও, একাকিত্ব, যত্নের অভাব, মানসিক অশান্তি সব মিলিয়ে মেয়েটার অবস্থা দূর্বিষহ বলা যায়।

প্রিয়া চায়ের ভাড় হাতে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বোনের দিকে। শিয়ার চোখমুখে দুত্যি ছড়াচ্ছে যেনো। ফর্শা মুখটা রক্তিম লাগছে। প্রিয়া ঘনঘন নাক টানছে।
চায়ের ভাড় পাশে রেখে বোনের কাছে ঘেষে আসলো। আচমকা জড়িয়ে ধরলো বোনকে। হু হু করে কেঁদেও ফেললো। ভাঙা গলায় বললো,
—’ বাবু আমাকে কি ডাকবে আপু? মামনী? নাকি মাম্মাম?’
শিয়া মুচকি হাসে। বোনের মাথায় হাত বুলায়। সে নিজেও কতটা খুশি হয়েছে কাউকে বোঝাতে পারবে না। অয়ন ঠিক কতটা অপেক্ষা করছিলো এই দিনটার! একটা বাচ্চা। তাদের সংসার, সেই সংসারে তার আর অয়নের বাচ্চা!
শিয়া নরম সুরে বোনের মাথায় হাত রেখে বললো,
—’ তোর যা শুনতে ইচ্ছে, সেটাই ডাকবে। মাম্মাম, মা, মামনী যেটা চাস…’
—’ভাইয়া খুব খুশি হবে আপু।’
—’হুম।’
—’ আমার তো এখনি সবাইকে বলে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। মা বাবাকে জানাবে কখন? ওরা খুশিতে দেশে ছুটে আসতে হাসঁফাস করবে।’
বাবা মার কথা শুনতেই শিয়া মলিন হাসলো। সত্যিই তো আজকের এমন একটা খবর। বাবা মা শুনলে সত্যিই পাগল হয়ে যাবে । এমন সময় মেয়েদের আগলে রাখে মায়েরা। অথচ তার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো হচ্ছে। অবশ্য অয়নের মা মানে তাদের শাশুড়ী অমায়িক মানুষ। খবরটা পেলে সেও ছুটে আসবে। শিয়া, প্রিয়াকে মেয়ের মতোন ভালোবাসে কি-না।

রাতের রান্না শেষ হয়েছে। বুয়া বেরিয়ে গেলো সবেই। শিয়া প্রিয়া দু বোনই ডায়নিং এ অপেক্ষা করছে সবার ফেরার। অন্যদিন আরোও আগেই ফেরে। আজকাল অবশ্য ব্যাস্ততা তুঙ্গে।
অয়ন আকাশরা সবাই যখন ফিরলো তখন বেশ রাত হয়েছে। বাইরে বেশ শীত শীত পরেছে। পাহাড়ি এলাকায় এমন সময় শীতে কাঁপুনি ধরে বাইক বা পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে গেলে। সদর দরজা খুলে ঢুকতেই নাকে এসে বাড়ি দিলো খাবারের গন্ধ। অয়ন দরজার ওখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠলো।
—’ পোলাওয়ের গন্ধ পাচ্ছি! এক্সপেরিমেন্ট টা কে করলো? ঘরওয়ালি? নাকি আধি-ঘরওয়ালি?’
প্রিয়ার চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। পেট ফুলে উঠছে শুভ খবরটা চিৎকার করে সবাই জানাতে না পেরে। শিয়া নিজেও দেখছে বোনের ছটফট। প্রিয়া বারবার বলেছে এই শুভ সংবাদ টা সবাইকে সেই জানাবে। ওদিকে তাদের বাবা মাকেও জানিয়েছে খানিক আগেই। আনিসুল সাহেব আর রেনুকা দুজনেই কেঁদে কেটে একাকার। তাদের বড় মেয়েটা মা হবে! ওইটুকুন মেয়ে, দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেলো। নিজেরা দাড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়ে গেলো। সেই মেয়ের ঘরে নাকি আরেকটি বাচ্চা আসছে!
প্রিয়া প্রায় ছুটে গেলো অয়নদের দিকে। অয়নের হাত থেকে ব্যাগটা হাতে নিতে নিতে বললো,

—’খাবার যেই রাধুক। একটা নিউজ দেওয়ার আছে। এবং সেটা তোমার আধি-ঘরওয়ালিই দেবে। তার আগে দশ মিনিট সময়। ফ্রেশ হয়ে খেতে চলে এসো সবাই। ‘
আকাশ ভ্রু কুচকে প্রিয়া অতি উৎসাহী রুপ দেখতে ব্যাস্ত। মেয়েটা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। কি আশ্চর্যের বিষয়। কি এমন শুভ সংবাদ। যার কারণে এমন ছুটে এসে অয়নের ব্যাগ নিলো। ওদের সাথে গদগদ ভাব অথচ নিজের স্বামীর দিকে ফিরেও দেখছে না! আকাশ বাড়িতে ছিলো তিনদিন। সকালে ফিরেছে। প্রিয়া তখন ঘুমে। দু চারটা কথা হয়েছে। সে যখন অফিসে বেরিয়ে যায় তখনও প্রিয়া ঘুমে। এখন তো মেয়েটার উচিত তাকে নিয়ে আহ্লাদ করা। তা না!অয়ন রা কেউ-ই ওপরে গেলো না। অয়ন হাসি হাসি মুখে ভ্রু জোড়া উচিয়ে বললো,
—’ উহু, অতো ধৈর্য নেই। আগে সংবাদ টা শুনি। টার্মে ফেল করোনি তো? আমার ভাইটার মানসম্মান ডুববে কিন্তু। ‘
প্রিয়া ঠোট উল্টায়। শিয়া মাথা ঝুকিয়ে বসা ডাইনিংয়ে। রাতুল, রাকিব, রেদোয়ান ও এখানেই। প্রিয়াকে সবাই বেশ আশকারা দেয়। সুতরাং সারাদিনের ব্যাস্ততা সত্ত্বেও প্রিয়ার আহ্লাদ উপেক্ষা করে কেউ ঘরে যাচ্ছে না। বরং সবাই বেশ আগ্রহ করেই অপেক্ষা করছে প্রিয়া কি বলে সেটা শুনতে। শিয়া লজ্জায় আড়ষ্ট হচ্ছে। ঘরভর্তি সবার সমানে এসব না বললেই নয়! প্রিয়া তা মানবে কেনো? সে তো পারলে মাইকিং করে দেয় গোটা এলাকা।
আকাশ নিজের হাতের ব্যাগটা চেয়ারে রেখে এগিয়ে গেলো বেসিং এর দিকে। ইচ্ছে তো হচ্ছে বউ তাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় রাগ দেখিয়ে ওপরে চলে যেতে। কিন্তু সেটা করলে ম্যাডাম তার ওপর গোটা মাসের কারফিউ জারি করে দেবে। তাকে ধরাছোঁয়া দুটোই অলিক কল্পনা হয়ে দাড়াবে তখন।
প্রিয়া আর সাসপেন্স বাড়ালো না। অয়নের হাতের কবজি ধরে টেনে এনে দাড় করালো বোনের একদম পাশেই। ঠোঁট টিপে মুচকি হেসে বললো,

—’ ইশশ পরীক্ষায় ফেল! তাও আবার আমি? হাহ্। তাছাড়া পরীক্ষা তো শুরুই হয়নি। খবরটা অন্য। ‘
—‘শুনি।’
—‘চৌধুরীদের বড় ছেলে জলদিই বাবা হতে যাচ্ছে। আমি বোধহয় চাচি, খালা একসাথে! ‘
অয়নের হাসি-হাসি মুখটা থমকালো। বলাবাহুল্য গোটা ঘরেই কয়েক মূহুর্তের কঠিন নিরবতা বয়ে গেলো। সবার আগে লাফিয়ে উঠলো রাতুল । পরপর রাকিব আর রেদোয়ান। আকাশ মুচকি হেসে এসে দাড়ালো ভাইয়ের পাশে । কাঁধ জড়িয়ে বললো,
—’কনগ্রাচুলেশন অয়ন মেহনাজ চৌধুরী। বাবা হয়ে গেলেন! ’
অয়ন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। শুকনো ঢোক গিলে কোনোমতে তাকালো স্ত্রীর দিকে। খেয়াল করলো তার পা জোড়া ঠকঠক করে কাঁপছে। শিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতেই স্থান, কাল ভুলে বুকে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে। কাট কাট কন্ঠে কয়েকটা শব্দ শুধু আউরাতে পারলো,
—’ভালবাসি, জান। খুউব থ্যাংক ইউ। আ-আমাকে এই স্বর্গীয় অনূভুতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য। আমি…আমি কৃতজ্ঞ তোমার কাছে।’
উপস্থিত সকলেই উচ্চস্বরে হাসছে। রাতুলরা একে একে নিজেদের ব্যাগ তুলে রওনা দিলো দোতলার দিকে। আকাশও প্রিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে ছুটলো ওপরে।
শিয়া চোখমেলে দেখলো সবার প্রস্থান। তাদের প্রাইভেসি দেওয়া হচ্ছে! মৃদু হাসলো সে। চোখের পানি ততক্ষণে ভিজিয়েছে অয়নের শার্টের অংশটুকু। হাতের বাধন দৃঢ় করলো। মিহি কন্ঠে শুধালো,
—’খুশি?’
অয়ন দ্বিগুণ শক্ত করে মেয়েটাকে চেপে ধরলো বুকে। জোরে জোরে শ্বাস টেনে বললো,
—’ আ-আমি বাবা হচ্ছি, জান। খুশি হবো না? আমার থেকে খুশি আজকের দিনে আর কে হতে পারে? কেউ না,কেউ না।’

—’ অন্যের বাবা মা হওয়ায় এতো লাফালাফি করে নিজের স্বামীকে দূরে সরিয়ে রাখলে চলবে, পাখি? নিজেরও তো মা হতে হবে নাকি? সেই প্রেশার নেওয়াও শিখতে হবে না?’
ঘরে ঢোকা মাত্র একটা শব্দও উচ্চারণের সময় সুযোগ দেওয়া হলো না প্রিয়াকে। শব্দ করে আটকে গেলো আকাশের ঘরের দরজা। চোখ খুলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো তুলতুলে বিছানার। আর তার তুলতুলে উদরের ওপর হামলে পরেছে যেনো কোনো দানব! মুচড়ে উঠলো প্রিয়া। আকাশ গত তিন’দিন কটেজে ছিলো না। ঢাকায় গিয়েছিলো প্রজেক্টের কাজে। ফিরেছে গতকাল ভোরের দিকে। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়েই আবার ছুটেছে অফিসে। সকাল ঘুম থেকে উঠে আকাশকে পায়নি সে। এখন ফিরেছে। দুদণ্ড বসে কথা আর বলবে কি। সে আছে তার কাজে। প্রিয়া আকাশের ঠোঁটের ভাজ থেকে কোনোমতে শ্বাস নিতে ঘাড় ঘুরিয়ে ফেললো।

—’ আরেহ, ফ্রেশ হবেন তো নাকি? এসেই… ‘
প্রিয়ার কথা শেষ হয়না। আকাশের ঠোঁট স্পর্শ করে প্রিয়ার উন্মুক্ত কাঁধ। হাস্কিস্বরে বলে,
—’ একটু শান্ত হতে দাও, পাখি। পরে কথা বলি হ্যা?’
ঘড়ির কাটা ঘুরছে রাত বারোটার ঘরে। বিধ্বস্ত প্রিয়া এলোমেলো অবস্থায় পরে আছে বিছানায়। পাশেই আকাশ। ঘেমে নেয়ে একাকার দু’জনেই। আকাশের পেশল বাহুতে মাথা রেখে পরে আছে প্রিয়া। বিয়ের পাঁচ মাস পার হয়ে গিয়েছে। এই হাতেগোনা কয়েকজন বাদে তাদের বিবাহিত জীবনের রহস্য এখনো অজানা। লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের গোছানো সংসার। সুন্দর একটা বিবাহিত জীবন। আকাশের উন্মাদনায় এখন দারুনভাবে অভ্যস্ত প্রিয়া । নির্দ্বিধায় সয়ে নেয় আকাশের আদরগুলো। যদিও সেই আগের দিনগুলোর মতোই রাঙা হয়ে থাকে এই মূহুর্তগুলোতে।
প্রিয়া ধীরেসুস্থে পাশ ফিরে শুলো আকাশের দিকে। একহাতের আকাশের ঘর্মাক্ত নগ্ন উদর আকড়ে ধরলো। মুখ ডুবালো আকাশের বুকে। আকাশের পুরুষালি হাতে প্রিয়ার চুলের ভাজে।

—’ সম্পর্কের প্রমোশন হলো । হুম? নতুন সদস্য আসছে! জানাও নি কেনো সারাদিন? ‘
অয়ন -শিয়ার বাচ্চাটার কথা মনে হতেই এতক্ষণের ক্লান্তি যেনো ভুলে বসলো প্রিয়া। নড়েচড়ে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আধশোয়া হলো। দু হাতে বুকের কাছে কমফোর্টার টা চেপে ধরা। গদগদ হয়ে বললো,
—’ কি সুন্দর হার্টবিট দেখা যাচ্ছিলো জানেন? আমার তো নিজেরই হার্টবিট বন্ধ হয়ে আসছিলো ওটা দেখে।’
আকাশের হাসি দীর্ঘ হলো প্রিয়ার খুশি দেখে।
—’ বাচ্চা ভালো লাগে? ‘
—’ কি আশ্চর্য! বাচ্চা কার না ভাল্লাগে! ‘
—’ তোমার চাই?’
—’ চাই তো। অনেকগুলো…’
—’হুম?’
প্রিয়া থমকায়। আকাশের কথার তালে তালে বলে ফেলেছে এতোগুলো কথা। অপ্রস্তুত হলো ভীষন। হাতের বাধন দৃঢ় করে সরে যেতে নিতেই আকাশ মাথা উঁচিয়ে ভেজা চুমু আকলো মেয়েটার নাকের ডগায়। বিয়ের এ কয়দিনে মেয়েটার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে বেশখানিকটা। এমনিতেই ফুলো ফুলো গাল,আরও ফুলো লাগে। আকাশ কিছু বললেই বা ছুঁয়ে দিলেই টকটক করে মুখটা । প্রিয়ার ইতস্তততা দেখে শব্দ করে হেসে ফেললো আকাশ। প্রিয়া রাঙিয়ে ওঠে আরও দ্বিগুণ হারে।

—’ দেবো। আমাদের ঘরেও বাচ্চা আসবে। হাসবে, খেলবে। আমরাও বাবা মা হবো। সময় হোক। বড় হও। কেমন?’
প্রিয়া আলতো মাথা ঝাকায় । কমফোর্টার আকড়ে উঠে বসতে বসতে মিহি গলায় বলে,
—’ডিনার করবেন চলুন। আপু, ভাইয়ারা কি ভাববে বলুন তো।’
শিয়া এসেছিলো ডাকতে। রাতের খাবারের জন্য। তবে বদ্ধ দরজা দেখে হাকডাক না করে আলগোছে নিচে নেমে গিয়েছে। হয়তো দরজার ওপাশে ওদের মূহুর্তগুলো আন্দাজ করতে পেরেছে। আকাশ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে বসলো। খিদে পেয়েছে সত্যিই। সেই সকালে নাস্তা করে বের হয়েছিলো। সারাদিনে কয়েককাপ কফি ছাড়া আর কিচ্ছু পেটে পরেনি। উঠে বসা মাত্রই চোখ বুজে ফেললো। প্রিয়ার দিকে হতাশ মুখে তাকালো। ফিচেল গলায় বললো,
—’ এতোগুলো দিন হয়েছে বিয়ের। ঘুরেফিরে সব দোষ আমার?’
প্রিয়া অবুঝের মতো তাকালো আকাশের মুখের দিকে। আকাশ প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকানো। ভ্রু জোড়া কপালে তুলে বললো,

—’ বুঝলাম না।’
—’ একটু জেন্টাল হতে হয় পাখি। আমাকে অভিযোগ করো প্রতিনিয়ত । ব্লেম করো,আমি নাকি জেন্টাল না। তাই যদি হয়, তাহলে আমার পিঠে এগুলো কিসের নমুনা?’
আকাশ পিঠ ঘুরিয়ে শুয়েছে এরইমধ্যে। প্রিয়াকে ইশারা করলো তার পিঠের দিকে। প্রিয়া সেদিকে দেখলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে দৃষ্টি ফিরিয়েও নিলো। ছিটেফোঁটা রক্ত ভেসে আছে গোটা পিঠ জুড়ে। ফর্শা পিঠে তার নখের কারুকার্য কি নিষ্ঠুর ভাবেই না ফুটে উঠেছে। আকাশ প্রিয়ার লজ্জারুণ মুখটা দেখে উঠে বসলো। দু হাত মাথার পিছনের দিকে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। আকাশের উদাম শরীরে শ্বাস আটকে এলো প্রিয়ার। কে বলবে খানিক আগেই ওই শরীরের ছোঁয়ায় স্বর্গীয় সুখে মরে যাচ্ছিলো না। প্রিয়ার দিকে ঝুকে আকাশ হাস্কিস্বরে বললো,
—’আজকে প্রচুর গরম। শার্ট পরা অসম্ভব। শার্ট গায়ে না জড়িয়ে নিচে গেলে কেমন হয়?’
প্রিয়া বিস্ফোরিত নয়নে তাকায়। বলে কি এ বেহায়া লোক! কোথায় গরম? কিসের গরম! গরম বিদায় নিয়েছে বহু আগে। আজকাল বিকেলের পর থেকে বেশ শীত পরে। এই রাতে তো বেশ কাবু করে ফেলে। এইযে, এতক্ষণ যেমন কামনায় বাসানার তাড়নায় শীত টের না পেলেও এখন বেশ ঠান্ডা লাগছে। নগ্ন শরীরে জাপটে রাখা কমফোর্টার। আর এই লোকের নাকি গরম লাগে! খালি বেহায়া চিন্তাভাবনা।

—’ একদম উল্টাপাল্টা করবেন না? সবাই কি ভাববে. ছিহ্।’
আকাশ ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
—’কি বলবে? এতো সুন্দর আর্ট! সবার দেখা উচিত। ‘
প্রিয়া লজ্জায় মরিমরি অবস্থা একপ্রকারে। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামতে যাবে তখনই আকাশের শক্তপোক্ত হাত প্রিয়ার নগ্ন পেট গলিয়ে প্রিয়াকে বিড়ালছানার মতো টেনে নিয়ে আসলো নিজের কাছে। মেয়েটা নগ্ন পিঠ এসে ঠেকলো তার উদাম, বলিষ্ঠ বুকের সাথে। এলোমেলো চুলগুলো পিঠের ওপর থেকে সরিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো প্রিয়ার পিঠে।
—’ কাল সিলেট যাচ্ছি, পাখি।’
প্রিয়া নিজের পেটের ওপর থেকে আকাশের হাত সরিয়ে পাশ ফিরে বসলো। মলিনমুখে বললো,

—”আজই তো ফিরলেন ঢাকা থেকে। আবার কালই সিলেট কেনো? ‘
—’ একা না কিন্তু। তুমিও যাচ্ছো।’
—’আমি?’
—’হুম।’
—’ঘুরতে?’
—’অনেকটা তাই। অফিসের কাজে। ভাবলাম তোমাকে নিয়ে যাই। হানিমুনটাও সারা হয়ে যাবে। তাইনা?’
প্রিয়া আকাশের বাঁকা কন্ঠে এখন খেয়াল দিলো না। ু
আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’কখন রওনা হবো?’
—’সকাল সকালই। ‘
—’আমরা দুজনেই?’
—’হু।’

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৫ (২)

প্রিয়ার মুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো। সিলেট যাওয়া হয়নি কখনো। ভীষন শখ ছিলো তার। পাশ থেকে আকাশের শার্টটা গায়ে জড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে নেমে গেলো বিছানা থেকে। কত গোছাগোছ এর ব্যাপার আছে!

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৭