নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৩
নাজনীন নেছা নাবিলা
পরীক্ষা হতে হয়তো আর এক মাস আছে। এর ভিতরে আর গল্প দেওয়া সম্ভব না তবু আমি চেষ্টা করি। কিন্তু জানিনা কেন আপনারা পাগল হয়ে যান।
মিহালের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটা শব্দ যেন জাদুর মতো নীলার দম আটকে দিচ্ছিল। এই লোকটা বড্ড অদ্ভুত, প্রতিবার কেমন অনায়াসে নিজের কথার মায়াজালে নীলাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। নীলা না পারছে নিজেকে মিহালের এই মায়াজাল থেকে মুক্ত করতে, আর না পারছে এই বাঁধনে পুরোপুরি ধরা দিতে। কথাগুলো শেষ করে মিহাল আরও এক ধাপ এগিয়ে এল নীলার দিকে। তাদের মধ্যকার দূরত্বটুকু নিমেষেই মিলিয়ে গেল। মিহালের খাঁড়া নাকটা এখন নীলার নাক ছুঁই ছুঁই করছে। হৃদপিণ্ডের অবাধ্য গতির মাঝে নীলা আবারও কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলল। পরিস্থিতি এমন এক টানটান জায়গায় দাঁড়িয়ে যে, মনে হচ্ছে এই বুঝি দুজনের ঠোঁটের সীমানা এক হয়ে যাবে। এত তীব্র আকর্ষণের পরেও নীলা একচুল পিছিয়ে গেল না।
মনের কোনো এক গহীন কোণে, নিজের অজান্তেই মিহালের প্রতি তার এক অটল বিশ্বাসের পাহাড় গড়ে উঠেছে, যা ভাঙার সাধ্য কারও নেই। সে খুব ভালো করেই জানে, মিহাল তার মৌন সম্মতি বা অনুমতি ছাড়া কখনোই তাকে স্পর্শ করে সেই পবিত্র বিশ্বাসটুকু ভাঙবে না। ঠিক এই বিশ্বাসের জোর আর ভরসাতেই সে মিহালের এত কাছে অটল রইল, এক কদমও পিছিয়ে গেল না। আর মিহাল তার নিজের চেয়েও প্রিয় নীলাঞ্জনার বিশ্বাস ভাঙবে এমনটা তো ভাবাই যায় না। তাই তো চরম ব্যাকুলতার মাঝেও সে নিজের আবেগটুকু সামলে নিল। নীলার নাক বরাবর নিজের খাঁড়া নাকটা আলতো করে ঘঁষে দিয়ে সে হুট করেই কিছুটা পিছিয়ে গেল। মিহালের সেই ক্ষণিক, অথচ তীব্র ছোঁয়ায় এক অপার্থিব আবেশে চোখ দুটো বুজে ফেলল নীলা। মিহাল ধীরে ধীরে পিছিয়ে এসে আবার নিজের রকিং চেয়ারটায় পিঠ ঠেকিয়ে দিল। তার বুকটা তখন ঘন ঘন নিশ্বাসের ওঠানামার কারণে অশান্ত হয়ে আছে।
সাধের নীলাঞ্জনা এত কাছে থাকার পরেও তাকে মনের মতো করে ছুঁতে না পারার এক প্রচ্ছন্ন কষ্ট আর হাহাকার তার ভেতরটায় মোচড় দিয়ে উঠছে। নিজেকে সামলানোর এই লড়াইটা বড্ড কঠিন। তবুও সে নিজের ভালোবাসার মানুষের সম্মানের জন্য, তার বিশ্বাসের জন্য এই মধুর কষ্টটুকু হাসিমুখে সহ্য করতে রাজি। কয়েক মুহূর্ত পর নীলা নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করল। তারপর লজ্জা ভাবটা কাটিয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। চোখ খুলতেই তার প্রথম দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে থাকা মিহালের ওপর। মিহাল তখনো এক অদ্ভুত, নেশাভরা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই চাউনিতে যেন এক তীব্র তৃষ্ণা আর আকুলতা লুকিয়ে ছিল, যা দেখে নীলার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল এবং পলকেই তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। নীলার চোখ গেল মিহালের ঠোঁটের দিকে। মিহালের ঠোঁট দুটো শুকিয়ে আছে। মিহাল বার বার জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছে। মিহালের শুকনো ঠোঁট দেখে নীলার ঠোঁটও খানিকটা শুকিয়ে গেল। নীলাও নিজের জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। মিহাল নিজেকে নিজের আয়ত্তে এনে আবার নীলার কাছে চলে এলো। এইবার নীলা কিছুটা পিছিয়ে গেল। কিন্তু মিহাল একদম কাছে গিয়ে হাস্কি ভয়েসে বলল__
“আই উইল ওয়েট, আন্টিল ইউ গিভ মি পারমিশন টু টাচ ইউ।”
মিহাল যখন আরও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই রুমের ভেতর থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। ঘরের পিনপতন নীরবতা ভেঙে মিহালের ফোনের রিংটোনটা সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করল নীলার কানে—
“যখন খোলা চুলে হয়তো মনের ভুলে,
তাকাতো সে অবহেলে দু’চোখ মেলে,
হাজার কবিতা বেকার সবই তা
হাজার কবিতা বেকার সবই তা
তার কথা কেউ বলে না,
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।”
গানের লাইনগুলো কানে আসতেই নীলা একদম স্তম্ভিত হয়ে বড় বড় চোখে মিহালের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের সেই চাউনি দেখে মিহাল নিজের ধরা পড়ে যাওয়ার অস্বস্তি ঢাকতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল। নীলার মনে তখন বিস্ময়ের সীমা নেই। কারণ, তার নিজের ফোনের রিংটোন হলো ‘প্যারালাল’ গানের, আর মিহালের ফোনের রিংটোন এই ‘নীলাঞ্জনা’। অবিকল যেন এক অলিখিত মেলবন্ধন। তারা দুজন দুজনকে এই নামে ডাকে, ঠিক সেই নামগুলোই জড়িয়ে আছে দুজনের ফোনের সুরে। অবচেতন মনেই তাদের দুজনের ভাবনার জগৎ কতটা এক সুতোয় গাঁথা, তা ভেবে নীলা মনে মনে শিউরে উঠল। মিহাল আর দেরি না করে রকিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরের যে কোণায় ফোনটা রাখা ছিল, সেখানে গিয়ে সে ডিভাইসটি হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল তার এক বন্ধু কল করেছে। মিহাল ফোনটা রিসিভ করে ওপাশে থাকা বন্ধুর সাথে কথা বলতে শুরু করল।
নীলা এইবার নিজের অবস্থানটা খেয়াল করল। সে এখনো সেই রকিং চেয়ারটার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। ঘোর কাটতেই সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল এবং জামাতছ হাত দিয়ে ঝেড়ে নিল। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে কী করবে দিশা না পেয়ে, সে দ্রুত পায়ে ঘরের লাগোয়া বারান্দার দিকে চলে গেল।
বারান্দায় পা রাখতেই নীলার চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল। এত বড়, আলিশান বারান্দা সে তার জীবনে আগে কখনো দেখেনি। মিহালের এই বারান্দা দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন কোনো বারান্দা নয়, বরং আস্ত একটা ছাদ কিংবা বিলাসবহুল কোনো লিভিং রুম। সেখানে নীল জলের এক চমৎকার সুইমিংপুল চকচক করছে, পাশে রয়েছে আড্ডা দেওয়ার জন্য সুদৃশ্য বসার জায়গা। আর এক কোণে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ পরম যত্নে সাজানো। সবচেয়ে বড় চমকটা অপেক্ষা করছিল ঠিক সামনের আকাশে। সেখান থেকে আইফেল টাওয়ারটা একদম স্পষ্ট, জাজ্বল্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীলার নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকেও আইফেল টাওয়ার দেখা যেত বটে, কিন্তু এতটা কাছ থেকে আর এতখানি স্পষ্ট কখনো লাগেনি। নীলা মুগ্ধ নয়নে মিহালের বারান্দা নামক সেই আলিশান ঘরটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। চারপাশটা ভীষণ পরিপাটি আর পরিষ্কার। সুরক্ষার জন্য বারান্দার চারধারে নিচের অর্ধেক অংশ ইটের স্টাইলিস দেয়াল আর বাকি ওপরের অর্ধেকটা থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা।
গ্লাসগুলো এই মুহূর্তে পুরোটা খোলা থাকার কারণে প্যারিসের বুক চিরে এক কনকনে ঠান্ডা ও সতেজ হাওয়া ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ছে। আর সেই মাতাল হাওয়ায় নীলার খোলা চুলগুলো অবাধ্য হয়ে বাতাসে উড়তে শুরু করল। নীলার মনে হলো, যেকোনো মানসিক রোগী কিংবা তীব্র কষ্টে থাকা মানুষ যদি এই জায়গাটায় একবার আসে, তবে ক্ষণিকের মাঝেই তার মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। চারপাশের এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই নীলার মাথায় এক অদ্ভুত খেয়াল চাপল, সে এবার এই নিখুঁত বারান্দাটায় কী কী খামতি আছে, তা খুঁজতে শুরু করল। তার প্রথম নজর গিয়ে ঠেকল টলটলে জলের সুইমিংপুলটার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করার পর সে আপন মনেই ভাবতে লাগল,,,,যদি এই পুলের ঠিক ওপরের অংশটায় কোনো ছাদ না থাকত, মানে বারান্দার বাকিটা ঢাকা থাকলেও এই দিকটায় যদি উন্মুক্ত আকাশ হতো, তবে ঝুম বৃষ্টি নামলে এই পুলে সাঁতার কাটার মজাই আলাদা হতো। ঠিক এমন সময় তার পেছনের বাতাসে এক পরিচিত সুবাস ভেসে এল, সে টের পেল কেউ একজন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটা আর কেউ নয় বরং মিহাল। নীলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিহাল অত্যন্ত আলতো করে তাকে পেছন থেকে নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরল। মিহালের আচমকা এই আলিঙ্গনে নীলার পুরো শরীর বেয়ে এক তীব্র বিদ্যুন্ময় শিহরণ বয়ে গেল। এই সমস্ত কিছু, এই তীব্র নৈকট্য তার জন্য একদম নতুন এক অনুভূতি। মিহালের স্পর্শটুকু ভীষণ স্বাভাবিক আর মায়াভরা হলেও নীলার মনে হতে লাগলৎভেতরে কেউ যেন তার হৃৎপিণ্ডের ওপর কামারের হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করে চলেছে। নীলা নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে গলার স্বরে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে বলল__
“চুক্তির কথা ভুলে গেছেন?”
মিহাল বেশ বিরক্ত হওয়ার ভান করে উত্তর দিল__
“আরে বাদ দাও তো ওই অভিশপ্ত কাগজের কথা! আর চুক্তিপত্রে তো লেখা ছিল,,,,আমি তোমার অনুমতি ছাড়া তোমাকে ‘স্পর্শ’ করতে পারব না। আমি তো তোমাকে ‘ঐ স্পর্শ’ করিনি, বরং ‘এই স্পর্শ’ করেছি।”
নীলা একদম আকাশ থেকে পড়ল। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না মিহাল কী সব আবল-তাবল বকছে! ‘এই স্পর্শ’ আর ‘ঐ স্পর্শ’—এর মানে কী? কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে কিছুই না বুঝে জিজ্ঞেস করল__
“এই স্পর্শ কী, আর ঐ স্পর্শই বা কী?”
মিহাল ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে বলল__
“আরে, ‘এই স্পর্শ’ মানে এই যে আমি এখন তোমাকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে আছি। ভালোবেসে ছোঁয়াটাকে বলে ‘এই স্পর্শ’।”
নীলা যেন মস্ত বড় একটা রহস্য উদঘাটন করেছে, এমন ভঙ্গি করে মাথা নেড়ে বলল__
“হুমমমম।”
মিহাল মুচকি হেসে নীলার রেশমি চুলে আলতো করে একটা চুমু খেল। তারপর তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল__
“আর ‘ঐ স্পর্শ’ মানে ওই যে ওইটা… এহেম… ইউ নো হোয়াট আই মিন… যেই স্পর্শটা তোমার আর আমার মাঝে হলে আমাদের ঘরে একটা ছোট্ট মিষ্টি বাচ্চা—”
কথার মাঝেই মিহালের চরম অসভ্যতায় নীলার কান-মাথা এক নিমেষে ঝাঁঝাঁ করে উঠল। কথাটি সম্পূর্ণ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে সে ঝড়ের বেগে মিহালের দিকে ফিরে নিজের নরম হাত দিয়ে মিহালের মুখটা চেপে ধরল। নীলা আচমকা উল্টো ঘুরে যাওয়ায় মিহালের হাত দুটোও অজান্তেই সরে এসে নীলার কোমরের দুপাশে শক্ত করে জেঁকে বসল। নীলা মিহালের মুখটা চেপে ধরে রেখেই লজ্জায় লাল হয়ে রাগতস্বরে বলল__
“ভারী অসভ্য তো আপনি! চুপ করুন বলছি। একদম চুপ!”
মিহাল এক ভ্রু উঁচু করে নীলার দিকে দুষ্টুমিভরা চাউনিতে তাকাল। তারপর নীলার যে ডানহাতটা তার মুখ চেপে ধরে রেখেছিল, ঠিক সেই হাতের তালুতেই বেশ শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বসল। আচমকা এই কাণ্ডে নীলা চমকে উঠে ঝটপট মিহালের মুখের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। লজ্জায় কান-মাথা গরম হয়ে উঠতেই সে মিহালের চওড়া বুকে এলোপাথাড়ি নরম চড় মারতে মারতে বলতে লাগল__
“আপনি একটা আস্ত অসভ্য, নির্লজ্জ লোক!”
মিহাল আর মার খাওয়ার মুডে ছিল না। সে চট করে নীলার দুই হাতের কব্জি একসাথে শক্ত করে ধরে ফেলল, যাতে সে আর নড়াচড়া করতে না পারে। তারপর নীলার একদম কানের কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে এনে গুনগুন সুরে গাইতে লাগল—
“তুই দেখবি ঠিকই জিতে নেবো একদিন তোকে,
চেয়ে দেখবি আমি সোনা হবো তোর নোলকে।”
মিহালের এমন রোমান্টিক গানের জবাবে নীলা মোটেও গলে গেল না। বরং সে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা ও অহংকারী হাসি ফুটিয়ে জবাব দিল__
“আমার সোনার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ আমি নিজেই একটা ডায়মন্ড!”
নীলার এমন চটপটে জবাব আর রাজকীয় অ্যাটিটিউড দেখে মিহাল নিজের ঠোঁট কামড়ে হেসেই ফেলল। মনে মনে সে তার এই রূপসীর প্রেমে আরও একবার কুপোকাত হলো। নীলা বুঝতে পারল পরিস্থিতি ক্রমশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই চট করে কথা ঘোরানোর জন্য একটু চড়া সুরে বলল__
“দেখি, ছাড়ুন তো আমায়।”
মিহাল আর নীলাকে বিরক্ত করল না, এক কথাতেই তার হাতের বাঁধন আলগা করে তাকে ছেড়ে দিল। মুক্তি পেতেই নীলা হালকা নাক ফুলিয়ে বেশ একটা অভিযোগের স্বরে বলে উঠল__
“আপনার এত বড় বারান্দা, অথচ এখানে কোনো দোলনা নেই কেন? একটা সুন্দর দোলনা থাকলে কি খুব মন্দ হতো? মোটেও না, বারান্দাটা আরও কত চমৎকার লাগত!”
নীলার মুখে এই অনুযোগ শুনে মিহালের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এই প্রথম তার নীলাঞ্জনা নিজের অজান্তেই তার কাছে কোনো আবদার বা ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। যে মানুষটাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে, তার এই সামান্য ইচ্ছেটা সে কী করে অপূর্ণ রাখে?
এদিকে মিহালের কাছে এভাবে অভিযোগের সুরে কথাটি বলেই নীলা মনে মনে বেশ বোকা বনে গেল। সে তো সচরাচর নিজের থেকে কারও কাছে কখনোই কিছু চায় না। ছোটবেলা থেকে কেবল নিজের বাবা আর ইমরান চাচার কাছেই যা একটু আবদার করেছে। এমনকি ইরফানের কাছ থেকেও আজ পর্যন্ত সে মুখ ফুটে কিছু চাইতে পারেনি। আর চাইবেই বা কী করে? ইরফান নিজেই তো সবসময় তার কাছে এটা-সেটা চেয়ে কুল পায় না, সেখানে নীলার নিজের কিছু চাওয়ার সুযোগ কই!
কিন্তু আজ মিহালের কাছে কত অনায়াসে, কত সুন্দর করে সে এই আবদারটুকু করে বসল, ভাবতেই নীলার নিজের কাছেই সব অদ্ভুত ঠেকতে লাগল। সে তো মোটেও এই স্বভাবের মেয়ে নয়। সচরাচর কারও কাছে কিছু চাইলে তার নিজের ভেতরেই কেমন যেন একটা ছোটোবড়ো বোধ কাজ করে, এক ধরনের জড়তা এসে গ্রাস করে। ঠিক এই কারণেই মির্জা পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষ সবসময় তার মনের ইচ্ছে পূরণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকলেও, সে কেবল নিজের বাবা আর বড় আব্বুর কাছেই বায়না ধরত। কারণ, এই দুজন মানুষের সাথেই সে সবচেয়ে বেশি সহজ হতে পারত। বলতে গেলে, এদেরকেই সে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। আর বিগত কয়েক বছর ধরে তো সে কারও কাছেই কোনো কিছু চাওয়া একদম ছেড়ে দিয়েছিল। ছোটবেলার সেই দিনগুলো তো আর নেই। সময়ের সাথে সাথে সে যত বড় হতে লাগল, ততই নিজের ভালোলাগা-মন্দলাগার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল। নিজের জমানো টাকা দিয়ে নিজের পছন্দের জিনিসগুলো কিনতে শুরু করল। তবুও মনের কোনো এক গহীন কোণে একটা চাপা আক্ষেপ সবসময়ই চারা দিয়ে উঠত, তার ভালোবাসার মানুষটি নিজে থেকে তার মনের সব ইচ্ছে আর ছোট ছোট আবদারগুলোর খোঁজ নেবে, পরম মায়ায় তা পূরণ করবে। কিন্তু যখন ইরফান তার মনের এই নীরব আকুতিগুলো বিন্দুমাত্র বুঝতে পারত না, তখন নীলার বুকের ভেতরটায় ভীষণ কষ্ট হতো, এক তীব্র অবহেলায় মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত।
তবে নীলা বরাবরই এমন এক শক্ত মনের মেয়ে ছিল, যে নিজেকে খুব বেশি সময় কষ্টের সাগরে ডুবিয়ে রাখতে দিত না। তাই তো একসময় জীবনের খাতা থেকে এই অবাস্তব আশার রঙটুকুই সে চিরতরে মুছে ফেলেছিল। অথচ আজ কত বছর পর, অবলীলায় সে মিহালের কাছে মনের এক সুপ্ত আবদার প্রকাশ করে ফেলল। কতদিনই বা চেনে সে এই লোকটিকে? কতটুকুই বা জানে তার সম্পর্কে?
নিজের মনকে ঠিক এই প্রশ্নগুলোই ছুঁড়ে দিল নীলা।
‘যতটুকু চেনূ, ততটুকুই যথেষ্ট তার প্রতি অটল বিশ্বাস রাখার জন্য!’
নীলার মনের একদম গভীর থেকে এক অকাট্য উত্তর ভেসে এল। নীলা যখন নিজের মনের ভেতর এই বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে ডুবে ছিল, ঠিক তখনই মিহাল একদম কাছে এসে পরম আদুরে গলায় ডেকে উঠল__
“দোলনা চাই তো আমার মহারানীর?”
মিহালের এই আবেগমিশ্রিত কণ্ঠস্বরে নীলার ভাবনার ঘোর এক পলকে ভেঙে গেল। সে মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে শুধু মাথা ওপর-নিচ ঝাঁকাল। নীলার এই সম্মতি দেখে মিহাল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে চট করে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। তারপর কাউকে একটা কল লাগিয়ে বেশ গম্ভীর অথচ আদেশসূচক গলায় ইংরেজিতে বলল__
“আই ওয়ান্ট টু সি দ্য সুইং অন মাই ব্যালকনি ইন থার্টি মিনিটস, অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু সি দ্য সুইং ফিক্সড ইন অ্যান আওয়ার।”
(আমি ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আমার বারান্দার দোলনা দেখতে চাই, এবং এক ঘণ্টার মধ্যে দোলনাটা ঠিক করা দেখতে চাই।)
নীলা অবিশ্বাস্য চোখে বড় বড় করে তাকিয়ে রইল মিহালের দিকে। তার মুখ ফুটে মনের ইচ্ছেটা প্রকাশ করতে যতটুকু না দেরি হয়েছে, মিহালের সেই ইচ্ছে পূরণের উদ্যোগ নিতে তার চেয়েও কম সময় লাগল। মিহাল ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নীলার দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা একদৃষ্টে তার দিকেই চেয়ে আছে। সে কলটা কেটে ফোনটা আবার পকেটে চালান করে দিয়ে সহজ গলায় বলল__
“আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে কল করলাম। ও একদম সময় মেপে ঠিকঠাক কাজটা করিয়ে দেবে।”
মিহালের কথা শুনে নীলার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন ও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। আর সেই মায়াবী হাসিটুকু দেখেই মিহালের মনের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, মনে হলো যেন সে এক নিমেষে পুরো বিশ্ব জয় করে ফেলেছে। নীলা মনের সুখে মুচকি হাসতে হাসতে সুইমিংপুলের ধারের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আলতো করে পুলের পাড়ে বসে নিজের পা দুটো টলটলে জলের ভেতর ডুবিয়ে দিল। মিহালও নিঃশব্দে নীলার পেছন পেছন গিয়ে ঠিক তার গা ঘেঁষে পাশে বসল। নীলা জলের শীতল ছোঁয়া পেয়ে বেশ আরাম বোধ করল। সে পা নাড়িয়ে সুইমিংপুলের পানির সাথে এক মনে খেলা করতে করতে আপন খেয়ালে বলল__
“এই সুইমিংপুলটার ওপর যদি এই ছাদটা না থাকত, তবে কতই না ভালো হতো। ঝুমঝুমিয়ে যখন বৃষ্টি পড়ত, তখন পুলে বসে ভিজতে আরও অনেক বেশি ভালো লাগত।”
মিহাল নীলার কথা শুনে শুধু মুচকি হাসল, মুখে কিছুই বলল না। তাদের বসার জায়গার ঠিক পাশেই একটা ছোট চমৎকার টেবিল রাখা ছিল, যা সাধারণত হালকা খাবার কিংবা পানীয় রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। মিহাল সেই টেবিলের নিচে থাকা ছোট ড্রয়ারটা টেনে সেখান থেকে একটি রিমোট বের করল। তারপর নীলার অলক্ষ্যেই রিমোটের একটা বোতামে আলতো করে চাপ দিল। আর অলৌকিক কাণ্ডের মতোই, সাথে সাথে সুইমিংপুলের মাথার ওপর থাকা ছাদটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে খুলে যেতে লাগল।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪২
সুইমিংপুলের টলটলে জলের বুকে হঠাৎ দুপুরের সোনালী রোদের ঝিলিক এসে পড়তেই নীলা চমকে উঠল। সে কৌতূহল সামলাতে না পেরে চট করে মাথার ওপর তাকাল। আর তাকাতেই বিস্ময়ে তার চোখ দুটো আবার বড় বড় হয়ে গেল। মাথার ওপর এখন আর কোনো ছাদ নেই, সেখানে উঁকি দিচ্ছে নীল আকাশ। নীলার যেন বিশ্বাসই হতে চাইছিল না যে, আজ সে মুখ ফুটে যা-ই আবদার করছে, মিহাল চোখের পলকে জাদুর মতো তা-ই পূরণ করে দিচ্ছে। হৃদয়ের অবাধ্য খুশিতে গদগদ হয়ে নীলা মিহালের দিকে তাকাল এবং নিজের সবটুকু মায়া ঢেলে তাকে এক চিলতে চওড়া হাসি উপহার দিল। সেই এক চিলতে অমলিন হাসির মাঝে এতখানি জাদু ছিল যে, মিহালের মতো গম্ভীর পুরুষের পক্ষে তার ওপর পুরোপুরি ফিদা হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। নীলার সেই হাসির জবাবে মিহালের ঠোঁটের কোণেও ফুটে উঠল এক টুকরো মুগ্ধতার হাসি।
