Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩ (২)

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩ (২)

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩ (২)
আরাফাত আদনান সামি

​ছাদ থেকে নামার পরও কৌশিকের সেই গাঢ়, স্পর্শের রেশ মায়ার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত ভালোলাগার শিহরণ জাগিয়ে রেখেছিল। ঘরের হালকা নীল ডিম লাইটের আলোয় সে যখন নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করছিল, তখনই নিচ থেকে সায়েরা চৌধুরীর এক তীব্র চিৎকারের আওয়াজ চৌধুরী ভিলার নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান করে দিল।
​“ওরে কে কোথায় আছো। আমার সর্বনাশ হয়ে গেলো গো। আপা ও আপা, আপা! আমার সর্বনাশ হয়ে গেলো গো! আমার তিয়াশা ঘরে নেই! মেয়েটা একা একা কোথায় চলে গেল এই রাতের বেলা!”

​সায়েরা চৌধুরী’র এই বুকফাঁটা কান্না আর আর্তনাদ শোনা মাত্রই মায়ার ভেতরের সমস্ত ঘোর এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে নিচে ডাইনিং রুমের দিকে ছুটে গেল। পেছন পেছন কৌশিকও তার গম্ভীর ও শক্ত অবয়ব নিয়ে নেমে এল। ​নিচে নামতেই দেখা গেল এক হুলস্থুল কাণ্ড। সায়েরা চৌধুরী সোফায় বসে হাউমাউ করে কাঁদছেন, আর মাহিমা চৌধুরী ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আসিফ চৌধুরী আর আশরাফ চৌধুরী তখন ফোনের ডায়াল প্যাডে আঙুল চালাচ্ছেন, তাঁদের চোখে-মুখে তীব্র আতঙ্ক। ​কৌশিক সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়েই বাঘের মতো গর্জে উঠল,

“কী হয়েছে মা? কাকি এভাবে কাঁদছেন কেন? তিয়াশা ঘরে নেই মানে কী?”
​আসিফ চৌধুরী হাত কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “কৌশিক বাবা, তোর কাকি তিয়াশাকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখে ঘরের পেছনের জানালাটা খোলা। আর টেবিলের ওপর একটা চিরকুট রাখা। মেয়েটা নাকি রাগ করে ওর ওই বান্ধবী নিধির বাসায় চলে গেছে! এই রাতের বেলা, দেশের এই পরিস্থিতিতে ও একা একা…”
​আসিফ চৌধুরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক ড্রইংরুমের কাঁচের টেবিলে এক প্রচণ্ড জোরে ঘুষি মারল। সেই আঘাতে টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কৌশিকের চোখের মণি দুটো রাগে ও হিংস্রতায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে গেছে।
​“আই হেইট দিস! আমি ওকে স্পষ্ট বারণ করেছিলাম ঘরের বাইরে এক পা না রাখতে! ও এত বড় অবাধ্যতা করার সাহস কীভাবে পেল?”

কৌশিকের কণ্ঠস্বর পুরো চৌধুরী ভিলার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। ​ঠিক তখনই রোহিত ড্রইংরুমে এসে ঢুকল। ওনার হাতে তখন নিধির দেওয়া সেই কোচিংয়ের খাতাটা। বাড়ির এই অবস্থা দেখে সে থমকে গেল। নিজের মা’কে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে সে দ্রুত পা চালিয়ে নিজের মায়ের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
“কী হয়েছে আম্মু? আর তোমরা সবাই এভাবে কাঁদছ কেন?”
​কৌশিক রোহিতের দিকে ফিরে এক তীব্র ধমক দিল,
“তোর বোন তিয়াশা তোর ওই ‘মিরচি পকোড়া’ নিধির বাসায় চলে গেছে এই রাতের বেলায়।”
কথাটা শুনা মাত্র রোহিত রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
“এই তিয়াশাকে নিয়ে আমি যে কী করি। দিনকে দিন বড্ড বেড়েই চলেছে।”
“এখন এইসব কথা বলার সময় না। নিধির বাসাটা জানি কোথায় রোহিত?তোর কাছে নিধির নাম্বার আছে না?”
“হ্যাঁ ভাইয়া আছে।”
“তুই এখনই নিধিকে ফোন কর!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি করছি।”
কৌশিকের মুখ থেকে ​নিধির নাম শুনতেই রোহিতের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের ফোন থেকে নিধির নম্বরে ডায়াল করল। দুই-তিনবার রিং হওয়ার পর নিধি ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো গলায় বলল,

“হ্যালো, কে?”
রোহিতের গলায় তখন এক চরম ব্যাকুলতা নিয়ে বলল,
​“নিধি! আমি রোহিত বলছি! গাধী নাম্বার দেখো। তিয়াশা কি তোমার বাসায় গেছে? ও কি তোমার ওখানে?”
​নিধি রোহিতের গলার আওয়াজ শুনে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল।
“আপনি এইসব কী বলছেনটা কী? তিয়াশা আমার এখানে আসবে কেন? ও তো সকাল থেকে আমার সাথে কোনো রকম কোন যোগাযোগই করেনি! আর এইসময়ে ওর তো বাড়িতেই থাকার কথা!”
​নিধির এই কথাটি লাউডস্পিকারে থাকা ফোনের মাধ্যমে পুরো ড্রইংরুমে ছড়িয়ে পড়া মাত্রই সায়েরা চৌধুরী এক বিকট চিৎকার দিয়ে সোফা থেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। তিয়াশা নিধির বাসায় যায়নি! তার মানে, তিয়াশা এই রাতের অন্ধকারে নিখোঁজ! কৌশিক ফোনটা রোহিতের হাত থেকে এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে নিজের পকেটে পুরল। তার সেই ধারালো, তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি এবার সরাসরি গিয়ে স্থির হলো মায়ার ওপর। মায়ার ফর্সা মুখটা তখন ভয়ে ও আতঙ্কে পুরোপুরি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সকালে দেখা সেই টিভির নিউজের পাচারকারী চক্রের কালো ছায়াটা যেন এখন ওনার চোখের সামনে ভাসছে। কৌশিক মায়ার দুই কাঁধ নিজের শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরে ওনার খুব কাছে এসে বলল,

“মায়া, তুমি এই মুহূর্তে মা আর কাকির সাথে ওপরে নিজের ঘরে যাবে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে রাখবে। আমি আর রোহিত তিয়াশাকে খুঁজতে বের হচ্ছি। যতক্ষণ না আমি ফিরছি, তুমি এই চৌধুরী ভিলার মেইন দরজার বাইরে এক পা-ও রাখবে না। দিস ইজ মাই ফাইনাল অর্ডার!”
​কৌশিক আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে রোহিতকে ইশারা করতেই দুজনে জিপের চাবির গোছা নিয়ে ঝড়ের গতিতে চৌধুরী ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে রয়ে গেল এক তীব্র শূন্যতা আর কান্নার রোল। কৌশিক চলে যাওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা কেটে গেছে। রাত এখন একটা। মাহিমা চৌধুরী সায়েরা চৌধুরীকে মাথায় পানি দিয়ে ওনার ঘরে শুইয়ে রেখেছেন। আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তাদের ফোন করে তিয়াশার লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করছেন। মায়া নিজের মাস্টার বেডরুমে একা বসে আছে। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন ওকে গ্রাস করতে আসছিল। কিন্তু ওর মনে তখন কোনো শান্তি ছিল না; বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তিয়াশার সেই কান্নায় ভেজা মুখ আর বিকেলের সেই রহস্যময় কালো মাইক্রোবাসের দৃশ্য।

​“নাহ্, আমি এভাবে ঘরে বসে হাত পা গুটিয়ে থাকতে তো পারি না!”
​মায়ার ভেতরের সেই ভীরু, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা মেয়েটা যেন এক নিমেষেই মরে গেল। সে শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো জল নেই, সেখানে জমা হয়েছে এক অনমনীয় প্রতিজ্ঞা। সে এই চৌধুরী পরিবারের বড় বউ। তিয়াশা ওর ছোট বোন, ওর ননদ। ওর বোন যখন এক ভয়ংকর বিপদের মুখে, তখন সে নিজের সুরক্ষার কথা ভেবে ঘরে বন্দি থাকতে পারে না। মায়া আলতো করে ওর শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে বাঁধল। তার অবয়বে এখন এক অন্যরকম গাম্ভীর্য ও কাঠিন্য। সে মনে মনে বলল,
“কৌশিক আমাকে বাইরে যেতে বারণ করেছে জানি। কিন্তু আজ যদি আমি নিজের বোনের জন্য কোনো পদক্ষেপ না নেই, তবে হয়তো সারাজীবনের জন্য এই পরিবারটা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি থাকতে তা কখনো হতে দেব না।”
​মায়া ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে তিয়াশার ঘরে ঢুকল। সে দেখতে চাইল তিয়াশা যাওয়ার সময় কোনো ক্লু রেখে গেছে কিনা। মায়ার নজর প্রথমেই গেলো টেবিলের উপর। টেবিলের ওপর তিয়াশার ডায়েরিটা খোলা ছিল। মায়া ওটা হাতে নিয়ে দেখল, উপরের পাতায় তড়িঘড়ি করে একটা ঠিকানা লেখা,

‘গুলশান লেক পাড়, পুরনো পরিত্যক্ত গুদামঘর’।
এর ঠিক নিচে লেখা ছিল,
‘তুই এখানে চলে আয়, আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’
~নিধি
​মায়ার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে চট করে কাজ করল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“নিধি তো এমন মেয়ে নয়। ও কেনো এত রাতে তিয়াশাকে এমন ভয়ংকর জায়গায় ডাকতে যাবে? নিধির যখন দরকার পড়ে ও তো তখন সরাসরি আমাদের বাড়িতেই চলে আসে তাহলে ও…না…না তিয়াশাকে নিশ্চয়ই নিধির নাম করে কেউ মিথ্যা মেসেজ বা ঠিকানা দিয়ে ডেকেছে। আর তিয়াশা অবুঝের মতো সেই ফাঁদে পা দিয়েছে! এই মেয়েটাও না…”

​মায়া আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কৌশিককে কল করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওপাশ থেকে অনবরত বিজি টোন আসছিল। হয়তো সে অলরেডি পুলিশের সাথে কোনো অভিযানে ব্যস্ত। মায়া আর অপেক্ষা করার ঝুঁকি নিতে পারল না। সে নিজের ঘরে গিয়ে একটা কালো রঙের চাদর দিয়ে শরীরটা ভালো করে ঢেকে নিল, যাতে রাতের অন্ধকারে কেউ ওকে সহজে চিনতে না পারে। ​সে নিচে নেমে দেখল বড়রা সবাই সায়েরা চৌধুরীর ঘরে ব্যস্ত। মায়া অত্যন্ত সাবধানে, বিড়ালের মতো পায়ে হেঁটে চৌধুরী ভিলার পেছনের ছোট দরজা দিয়ে বাগানে বের হয়ে এল। রাতের সেই ঠাণ্ডা বাতাস আর ঘুটঘুটে অন্ধকার ওকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারল না। সে মেইন গেটের সিকিউরিটির চোখ এড়িয়ে এক ঝটকায় হাইওয়ের পাশে এসে একটা খালি সিএনজি থামাল।
​“মামা, গুলশান লেক পাড়ের সেই পুরনো গুদামঘরের দিকে চলো। জলদি!”

​মায়ার কণ্ঠস্বরে এক অন্যরকম জোর ও শাসন ছিল, যা শুনে সিএনজিওয়ালা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিল। রাত তখন পৌনে দুইটা। গুলশানের এক নির্জন, অন্ধকার লেক পাড়। চারদিকে বড় বড় গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের কারণে জায়গাটা দিনের বেলাতেও বেশ ভুতুড়ে দেখায়। লেকের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল, জীর্ণ ও পরিত্যক্ত লোহার গুদামঘর। ওটার চারদিকের দেওয়ালগুলো খসে পড়েছে, আর প্রধান দরজাটা মরিচা ধরা। গুদামঘরের ভেতরে একটা মাত্র হ্যারিকেনের আলো জ্বলছিল। সেই আবছা আলো-আঁধারির মাঝে একটা কাঠের চেয়ারের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তিয়াশাকে। তিয়াশার মুখে কালো টেপ মারা, আর তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রুধারা ঝরছে। সে তীব্র ভয়ে ও আতঙ্কে কাঁপছে। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই বিকালের কালো মাইক্রোবাসের হিংস্র টিমের লিডার আর তার দুইজন সহযোগী। লিডার একটা কুৎসিত হাসি দিল।
​“বাহ্! চৌধুরী বংশের ছোট মেয়ে তো দেখতে আসলেই মাখনের মতো। ওপারে ওর যা ডিমান্ড হবে না, পুরো মাখন! আমাদের টিমের এবারের শিকারটা আসলেই জবরদস্ত হয়েছে।”

টমের ​লিডার তিয়াশার থুতনিটা নিজের নোংরা আঙুল দিয়ে চেপে ধরল। তিয়াশা ওর হাতের বাঁধন খোলার জন্য ছটফট করতে লাগল এবং মুখের টেপের ভেতর থেকেই ‘উঁ উঁ’ করে আর্তনাদ করতে লাগল। সে মনে মনে ওর রোহিত ভাইয়া আর কৌশিককে ডাকছিল, কিন্তু সে জানত না যে এই নরপশুদের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় ওর কাছে নেই। ​ঠিক তখনই গুদামঘরের পেছনের একটা ভাঙা জানালার কাঁচ খট করে ভেঙে পড়ার শব্দ হলো। টিমের একজন চট করে নিজের কোমর থেকে পিস্তল বের করে সেই দিকে তাক করে বলল,
​“কে ওখানে? কার এত বড় সাহস যে আমাদের আস্তানায় পা দেয়?”

​জানালার অন্ধকার কোণ থেকে ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরের আলোয় এসে দাঁড়াল এক নারী। গায়ের কালো চাদরটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিতেই প্রকাশ পেল মায়ার সেই ধারালো, শান্ত ও তেজস্বী অবয়ব। মায়ার এই আকস্মিক এন্ট্রি দেখে তিয়াশার চোখ দুটো বিস্ময়ে ও আশায় বড় বড় হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, যে মেয়েটাকে সে বেস কয়েকদিন অবজ্ঞা করেছে, নানান কথা বলে অপমান করেছে, সে আজ ওকে বাঁচাতে এই মৃত্যুর মুখে চলে এসেছে! ​টিম লিডার মায়াকে দেখে এক বিকট ও চতুর হাসি দিল।
​“আরে বাহ্ মেঘ না চাইতেই জল! এ তো দেখছি চৌধুরী বাড়ির বড় বউরে! তোদের মনে নেই? এ যে দুপুরের সেই মিষ্টি মেমসাহেব! তা ম্যাডাম, আপনি একা একা এই রাতের বেলা? ও বুঝতে পেরেছি, আপনার ননদকে আমাদের হাত থেকে বাঁচাতে আসলেন বুঝি? তা আপনার ওই বাঘের মতো স্বামী কৌশিক আর আপনার ভাই রোহিত কোথায়? ওরা কি পুলিশ নিয়ে অন্য কোথাও ঘুরছে?”

​মায়া বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে সোজা লিডারের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় এবং বরফশীতল গলায় বলল,
“ওদের এই নোংরা জায়গায় আসার কোনো প্রয়োজন নেই। তোদের মতো জঘন্য জানোয়ারদের শায়েস্তা করার জন্য এই চৌধুরী বাড়ির বড় বউ একাই যথেষ্ট। তিয়াশাকে এখনই ছেড়ে দে, অন্যথায় আমার স্বামী যদি একবার তোদের কথা জানতে পারে তাহলে তোদের এই পুরো টিম আজ রাতে এই লেকের পানিতে লাশ হয়ে ভাসবে! আর হ্যাঁ, তোদের ধারণাও নেই তোরা কার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। তাই বলছি, ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দে তিয়াশাকে।”
​মায়ার এই অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস আর সাহসী রূপ দেখে পাচারকারী চক্রের লোকগুলো এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই লিডার আর বাকি সবাই জোরে হেসে উঠল।
​“ছোট মুখে বড় কথা! এই বান্দীর মেয়েটাকে ধর! আজ একটার দামে আর একটা শিকার ফ্রিতে পেয়ে গেলাম! ওপারে এদের দুজনের যা দাম পাওয়া যাবে, আমাদের পুরো টিমের লাইফ সেট হয়ে যাবে! এই মালটা ওটার থেকেও তেজি আর দেখতেও সুন্দর আছে। এটাকে বাদ দিছিলাম এর স্বামী আছে বলে, বাট ও নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনল। এই, তোরা ধর এই বান্দির মেয়েকে!”

​লিডারের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই দুই সহযোগী মায়ার দিকে হিংস্র পশুর মতো তেড়ে এল। ​মায়া জানত যে শারীরিক শক্তিতে সে এই দুই পুরুষের সাথে পারবে না। তাই সে আগে থেকেই নিজের কালো চাদরের নিচে লুকিয়ে রাখা একটা বড় মেহগনি কাঠের ভারী লাঠি শক্ত করে দুই হাতে চেপে ধরল। প্রথম লোকটা মায়ার হাত ধরতে আসতেই মায়া নিজের পুরো শক্তি দিয়ে লাঠিটা লোকটার হাঁটুতে সপাটে এক আঘাত করল।
​“আহ্!”

লোকটা তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ​দ্বিতীয় লোকটা মায়ার এই রূপ দেখে কিছুটা সতর্ক হয়ে ওর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল। মায়া চট করে টেবিলের ওপর রাখা জ্বলন্ত হ্যারিকেনটা এক টানে তুলে লোকটার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল। হ্যারিকেনের কাঁচ ভেঙে ভেতরের জ্বলন্ত কেরোসিন লোকটার জামায় লাগতেই ওর শরীরে দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল। সে আগুন লাগা শরীর নিয়ে ব্যথায় চিৎকার করতে করতে গুদামঘরের বাইরে পানির খোঁজে দৌড়াতে লাগল। টিম লিডারটা যেই ছুরি নিয়ে মায়াকে আঘাত করতে যাবে ওমনি মায়া লাঠি দিয়ে তার মাথা বরাবর একটা সজোরে বারি মারে। সেই লোকটি ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে যায়। ব্যথায় দুই হাত মাথায় চেপে ধরে। মায়া এই সুযোগে দ্রুত তিয়াশার দিকে এগিয়ে গেল। সে তিয়াশার হাতের আর পায়ের দড়িগুলো এক এক করে খুলতে লাগল। দড়ি খুলা শেষ হতেই সে তিয়াশার মুখের টেপটা এক টানে সরিয়ে দিল। তিয়াশা মায়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

​“আপু! আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি অনেক ভুল করেছি, তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি, আমি তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি, কত অপমান করেছি! আর তুমি নিজের জীবন বাজি রেখে আমাকে…”
​মায়া তিয়াশার গালে নিজের হাত রেখে অত্যন্ত মমতার সাথে বলল,
“চুপ, একদম চুপ তিয়াশা! এখন কাঁদার সময় নয়। এখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। তুমি আগে সোজা এই পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে গিয়ে হাইওয়ের রাস্তার দিকে দৌড়াও। ওখানে একটা সিএনজি দাঁড় করানো আছে।”
​“আর তুমি আপু? তুমি যাবে না আমার সাথে?” তিয়াশা মায়ার হাত ছাড়তে চাইল না।
​“আমি তোর পেছনেই আসছি তিয়াশা। তুমি আগে বেরও, কোনো দিকে তাকাবে না! পরে আমি বের হচ্ছি।”
​মায়া তিয়াশাকে এক ধাক্কা দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিল। তিয়াশা এক পলক মায়ার দিকে তাকাতেই মায়া চোখের ইশারায় বলল,

“কী হলো, যাও। আমি আসছি তো।”
​তিয়াশা আবারও এক পলক মায়ার দিকে তাকাল, তারপর ওর জীবনের সমস্ত শক্তি দিয়ে অন্ধকারের মাঝে দৌড় দিল। কিন্তু মায়া যখন নিজে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে টিম লিডার উঠে এসে মায়ার চুল মুঠো বন্ধ করে ধরে এক প্রচণ্ড টানে ওকে মেঝেতে আছাড় দিয়ে ফেলল। মায়ার মাথাটা গুদামঘরের একটা লোহার পিলারের সাথে সপাটে ধাক্কা খেল। এক মুহূর্তের জন্য মায়ার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল। কপাল বেয়ে এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে গরম রক্ত ওর ফর্সা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। ​লিডার মায়ার বুকের ওপর নিজের ভারী বুট জুতোটা চেপে ধরে ওর কোমর থেকে সেই ছুরিটা কেড়ে নিল। ওর মুখে এক পৈশাচিক ও হিংস্র হাসি।

​“বান্দির মেয়ে তোর খুব বীরত্ব দেখানোর শখ, তাই না? তোর ননদকে তো বাঁচিয়ে নিলি, কিন্তু তোর কী হবে এখন? মনে তো চাচ্ছে তোর গাল বরাবর সজোরে ইচ্ছা মতো থাপ্পড় মারতে, কিন্তু না, তোকে আমি মারব না। কারণ তোর গালে বা তোর এই ফর্সা শরীরের কোথাও দাগ লাগলে আমি বাজারে ভালো টাকা পাব না। তোকে আমি এমন এক জায়গায় পাচার করব, যেখানে তোর ওই প্রেমিক আশিক সারাজীবন খুঁজলেও তোর একটা হাড়ের টুকরোও খুঁজে পাবে না! তুই তো ফেঁসে গেলিরে মেয়ে।”
​লিডার মায়ার মুখে একটা ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল শক্ত করে চেপে ধরল। মায়া নিজের হাত-পা নাড়িয়ে শেষবারের মতো লড়াই করার চেষ্টা করল। ওর চোখের সামনে তখন ভেসে উঠছিল কৌশিকের সেই ছাদে বলা শেষ কথাগুলো,
‘আমি তোমাকেও হারাতে পারব না মায়া। তুমি আমার জীবন…’
​“কৌ-শিক…”
​মায়ার মুখ থেকে এক শেষ অবশ নিশ্বাস বের হলো, আর ওর চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। সে সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে নিথর হয়ে পড়ল। লিডার মায়াকে এক ঝটকায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে গুদামঘরের বাইরে রাখা সেই কালো মাইক্রোবাসের দিকে এগিয়ে গেল। গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে চোখের পলকে অন্ধকারের মাঝে বিলীন হয়ে গেল।

​রাত আড়াইটা। চৌধুরী ভিলার মেইন গেটের সামনে একটা সিএনজি এসে থামল। ওটার ভেতর থেকে তিয়াশা প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায়, কেঁদে কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ঠিক তখনই কৌশিক আর রোহিতও তাদের জিপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল, কারণ তারা পুরো গুলশান খুঁজেও তিয়াশার কোনো সন্ধান পায়নি। জিপ থেকে নামতেই রোহিতের চোখ পড়ল তিয়াশার ওপর। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তিয়াশাকে ধরে ওকে সোজা করে দাঁড় করাল।
​“তিয়াশা বোন আমার! তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি? আর তোর এই অবস্থা কে করল? তুই ঠিক আছিস?”
​“হ..হ্যাঁ ভাইয়া আমি ঠিক আছি।”
কথাটা বলে তিয়াশা রোহিতের কাছ থেকে কোনোমতে সরে কৌশিকের পা জড়িয়ে ধরে বুকফাঁটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“ভাইয়া! মায়া আপুকে তুমি বাঁচাও!”
​কৌশিক তিয়াশার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠোর কণ্ঠস্বরে সে বলল,

“বাচাবো মানে? কীসব আজেবাজে বকছিস? মায়াকে বাঁচাব মানে? মায়ার কী হবে? ও তো বাড়িতে মা আর বাকিদের সাথে নিজের ঘরে।”
​তিয়াশার শরীর ভয়ে অবস হয়ে আসছিল। সে তার অর্ধ-খোলা চোখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“না…মায়া আপু বাড়িতে নেই! তুমি শুনতে পাচ্ছো আমি কী বলছি ভাইয়া? মায়া আপু বাড়িতে নেই! আমাকে ওই পাচারকারী চক্রের হিংস্র টিমটা কিডন্যাপ করেছিল। আমি জানতাম না সেখানে কী করে মায়া আপু পৌঁছাল, কিন্তু মায়া আপু নিজের জীবন বাজি রেখে ওই গুদামঘরে গিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে! ও আমাকে জোর করে তাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু নিজে… নিজে হয়তো ও ওই জানোয়ারদের কবলে পড়ে গেছে! ওরা আপুকে নিয়ে গেছে ভাইয়া! ওরা মায়া আপুকে নিয়ে গেছে! তুমি ভাবিকে বাঁচাও!”

​তিয়াশার এই কথাটি শোনা মাত্রই কৌশিকের মাথার ভেতরে যেন একটা বজ্রপাত হলো। তার বুকের বাঁপাশটা সজোরে ‘ধক’ করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সে এক জীবন্ত পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। ওর হাতের সমস্ত শক্তি যেন এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই সে একটা উন্মাদের মতো দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজল, মাস্টার বেডরুমের খালি বিছানাটা দেখে ওর কলিজা ছিঁড়ে গেল। সে সজোরে “মায়া! মায়া!” বলে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, কিন্তু পুরো বাড়িতে মায়ার কোনো সাড়া-শব্দ নেই। কৌশিকের এই পৈশাচিক চিৎকারে বাড়ির সবাই হলরুমে এসে জড়ো হলো। সবাই কৌশিককে চেপে ধরল,
“কী হয়েছে কৌশিক? তুই পাগলের এমন করছিস কেন?”
কৌশিকের মুখে কোনো জবাব নেই। সে এক হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পশুর মতো মায়াকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ​এমন সময় হলরুমে প্রবেশ করল রোহিত, তার পেছনে নিধি। নিধিকে অক্ষত দেখে সবাই তাদের কাছে ছুটে গেল। সায়েরা চৌধুরী নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“আমাকে না বলে কোথায় গিয়েছিলি হ্যাঁ? যদি তোর কিছু হয়ে যেত আমার কী হতো? তোর বাপের কী হতো? একবারও চিন্তা করে দেখেছিস?”
​তিয়াশা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা, আমি ইচ্ছা করে যাইনি। আমাকে ফাঁশানো হয়েছিল। আমাকে নিধির নাম করে কিডন্যাপাররা মেসেজ পাঠিয়ে ফাঁদে ফেলেছিল মা।”
​কিডন্যাপ শব্দটা শোনা মাত্রই সবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আসিফ চৌধুরী মেয়ের কাছে এসে বললেন,
“তুই কিডন্যাপ হয়েছিলি?তুই ঠিক আছিস তো মা?”
​“হ্যাঁ আব্বু, আমি একদম ঠিক আছি, কিন্তু মা…”
​তিয়াশার পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক হলরুমের মাঝখানে নিজের শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার বুক চিরে এক অমানুষিক আর্তনাদ বের হলো,
“মায়াআআআ!”

​সেই বিকট চিৎকার পুরো চৌধুরী ভিলাতে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। কৌশিকের এই রূপ দেখে সবাই ভয়ে পিছিয়ে গেল। মাহিমা চৌধুরী দৌড়ে নিজের ছেলের কাছে গিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। ওঁর হাত দুটো কাঁপছিল। ওঁর ছেলের এমন অবস্থা উনি জীবনেও দেখেননি।
​“কী হয়েছে বাবা? তুই এমন করছিস কেন? আর মায়ার জন্য চিৎকার করছিস কেন? ও হয়তো নিজের ঘরে আছে, দেখ ভালো করে।”
​কৌশিক সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল,
“না মা, আমি সব জায়গায় খুঁজেছি নেই ও ঘরে। না এই বাড়িতে।”
​“মানে? তাহলে কোথায় ও?”
​কৌশিক শূন্য দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“মায়া… তুমি কোথায়? তোমাকে আমি বারণ করেছিলাম না যে আমার অনুমতি ছাড়া এই বাড়ি থেকে এক চুলও নড়বে না! তাহলে কেন তুমি আমার কথা শুনলে না? কেন! কেন! কেন!”
​আশরাফ চৌধুরী ও আসিফ চৌধুরী দুজনেই কৌশিকের কাছে এলেন। আশরাফ চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
“কী হয়েছে টা কী কৌশিক? সেটা তো আমাদের বলবি নাকি?”

​কৌশিক এবারও কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতা যেন এক প্রলয়ের পূর্বাভাস। তিয়াশা এবার এগিয়ে এসে মুখ খুলল। সে একে একে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাটা, গুদামঘরের সেই নরক গুলজার আর মায়ার আত্মত্যাগের সবটা সবার সামনে খুলে বলল। ​সব শুনে হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সবার চোখ কান্নায় আর বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। মাহিমা চৌধুরী নিজের ছেলেকে বৃথা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু কৌশিকের তখন হিতাহিত জ্ঞানটুকু নেই। ওর মায়াবতী পরী, ওর সুইটহার্ট, ওর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন মায়া আজ ওরই অবাধ্যতা করতে গিয়ে এক ভয়ংকর নরপশুদের কবলে পড়ে গেছে! রোহিত তিয়াশাকে ধরে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর বড় ভাইয়ের এই ভয়ংকর হিংস্র রূপ দেখে ওর হাত থেকে জিপের চাবিটা মেঝেতে পড়ে গেল। কৌশিক ধীরে ধীরে নিজের হাত দুটো সজোরে মুষ্টিবদ্ধ করল। ওর হাতের রগ ওর ঘাড়ের রগগুলো ফুলে উঠেছে, আর চোখ দুটো থেকে যেন এক তীব্র লাল আলো বের হচ্ছিল। একজন ঠান্ডা মাথার কর্পোরেট টাইকুন কৌশিক নীর চৌধুরী যেন এক নিমেষেই এক কুখ্যাত হিংস্র মানবে রূপান্তরিত হলো। তার চেহারার দিকে তাকাতেও সবাই ভয় পাচ্ছে। তার অবয়বে এখন কোনো দয়া নেই, কোনো নীতি নেই, আছে শুধু এক পৈশাচিক ধ্বংসলীলার তৃষ্ণা।
​“মায়াআআআ!”

​সে আবারও ছাদের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র ও ভয়ংকর গর্জন ছাড়ল, যা পুরো ভিলার কাঁচের ঝাড়বাতিগুলোকে কাঁপিয়ে তুলল। কৌশিক তিয়াশার দিকে এক জোড়া রক্তিম ও বিষাক্ত চোখ নিক্ষেপ করে বরফশীতল গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
“শুধু মাত্র তোর জন্য আমার মায়ার আজ আমার কাছে নেই মায়ার এই অবস্থা শুধু মাত্র তোর জন্য। তুই আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা। চলে যা বলছি।”
​কৌশিকের সেই পৈশাচিক ধমকে তিয়াশার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সাহস পেল না, কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেল। ​কৌশিক এবার তার পকেট থেকে ফোনটা বের করল। সে কোনো পুলিশ স্টেশন বা সাধারণ কোনো ফোর্স নয়, সরাসরি ডায়াল করল শহরের পুলিশ কমিশনার এবং তার নিজস্ব আন্ডারগ্রাউন্ড পার্সোনাল ব্ল্যাক সিকিউরিটি ফোর্সের চিফকে। ওর কণ্ঠস্বর এখন আর কোনো মানুষের মতো ছিল না, ছিল এক রক্তাক্ত ও আহত নরখাদক সিংহের মতো, যে নিজের রানীকে হারানোর পর পুরো দুনিয়াকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে প্রস্তুত। কৌশিক ফোনের স্পিকারে গর্জে উঠল,

​“কমিশনার সাহেব!”
ফোনের ওপাশ থেকে কমিশনারের গলা কাঁপছিল, সে কৌশিকের ক্ষমতার গভীরতা ভালো করেই জানে।
“জ্বি স্যার বলুন। আমরা অলরেডি ফোর্স পাঠাচ্ছি…”
​“শাট আপ!”
কৌশিক এক ঝটকায় কমিশনারের কথা থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর এতটাই ভারী ছিল যে মনে হচ্ছিল ওপাশ থেকে কেউ শ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আমি আপনাকে অনুরোধ করছি না কমিশনার, আমি আপনাকে অর্ডার দিচ্ছি! আই ডোন্ট ওয়ান্ট অ্যানি এক্সকিউজ! এই মুহূর্ত থেকে পুরো ঢাকা শহর লকডাউন হবে! শহরের প্রতিটা এক্সিট পয়েন্ট, প্রতিটা হাইওয়ে, প্রতিটা গলি, প্রতিটা বাস ও ট্রেন টার্মিনাল, প্রতিটা নদীপথ, প্রতিটা ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার সব সিল করে দিন! একটা মাছিও যেন এই শহরের সীমানা পার করতে না পারে!”
​কমিশনার ওপাশ থেকে আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু স্যার, রাতের বেলা হুট করে পুরো বর্ডার আর ক্যাপিটাল লকডাউন করা তো আইনি প্রক্রিয়ার…”
​“আইন?”

কৌশিক এক পৈশাচিক ও ক্রূর হাসি দিল, যা শুনলে যেকোনো মানুষের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাবে।
“আইন আজ আমি লিখব, কমিশনার সাহেব! চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পুরো ম্যানপাওয়ার, আমার পার্সোনাল স্কোয়াড আজ রাস্তায় নামবে। আমার প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা অস্ত্র, আমার অগাধ অর্থ আর ক্ষমতা আজ আমি নরকের মতো ব্যবহার করব! যে নরপিশাচগুলো আমার মায়ার দিকে হাত বাড়ানোর সাহস দেখিয়েছে, তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, যদি পাতাল ফেঁড়েও লুকায়, সেখান থেকে ওদের চামড়া ছাড়িয়ে টেনে আনা হবে!”
​কৌশিক জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো ছোট করল। সে বলল,
“যারা ওকে ছুঁয়েছে, তাদের বাতাস থেকে অক্সিজেন নেওয়ার অধিকার পর্যন্ত আমি কেড়ে নেব! কৌশিক নীর চৌধুরী তার প্রাণকে ফিরিয়ে আনার জন্য কতটা পৈশাচিক আর কতটা বেপরোয়া হতে পারে তা আজ এই পুরো পৃথিবী দেখবে! আইন যদি ধীরে চলে, আমি ধ্বংসযজ্ঞের ঝড় হয়ে নামব! পুড়িয়ে খাক করে দেব সব কিছু!”
​সে একটু থামল, তার গলার টোন আরও ভারী ও কড়া হলো,

“প্রয়োজন হলে রাতকে দিন বানাব, আকাশের চাঁদ মাটিতে নামিয়ে আনব, কিন্তু আমার মায়াকে আমি ফিরিয়ে আনবই! যেকোনো মূল্য, যেকোনো যুদ্ধ, যেকোনো অবৈধ পথ সবকিছুর জন্য প্রস্তুত আমি! মনে রাখবেন কমিশনার, কৌশিক নীর চৌধুরী হার মানতে শেখেনি! না কখনো হেরেছে, আর না কখনো হারবে। আমার মায়াকে ফিরিয়ে আনার পথে আজ যদি পুরো সৃষ্টিও আমার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, আমি সেই দেয়াল ভেঙে সামনে এগোব। হাজার বাধা আসুক, আমি থামব না। আমি ওই জানোয়ারগুলোকে এমন এক মৃত্যু দেব, যা দেখে স্বয়ং মৃত্যুও থরথর করে কেঁপে উঠবে!”

​কমিশনারের মুখ থেকে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই কৌশিক সজোরে ফোনটা আছাড় মেরে মেঝেতে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলল। ​হলরুমের সবাই স্তম্ভিত, ভয়ার্ত চোখে কৌশিকের এই রূপ দেখছিল। সে দ্রুত পা ফেলে বাইরের দিকে যেতে যেতে রোহিতের দিকে তাকাল। রোহিত ওর এই চিরচেনা ভাইয়ের পাশে এক শক্ত দেওয়াল হয়ে এসে দাঁড়াল। সে কৌশিকের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি তোমার সাথে আছি কৌশিক ভাই। ভাবিকে আমরা খুজে বের করবোই করব, আর ওই জানোয়ারগুলোর একটা হাড়ও আস্ত রাখব না। আজ পুরো শহর দেখবে এই চৌধুরী বাড়ি আসল রূপ! আর চৌধুরী পরিবারের দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার ফল কেমন হয় সবাই হাড়ে হাড়ে বুঝে যাবে।”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৩

​কৌশিক কোনো কথা না বলে জিপের স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসল। জিপের ইঞ্জিনটা এক তীব্র গর্জন করে উঠল। চাকার নিচে ধুলো আর আগুনের ফুলকি উড়িয়ে জিপটা হাইওয়ের দিকে তীরের বেগে ছুটে গেল।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here