সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৬
তানিয়া হুসাইন
রান্না শেষ হতেই ভীর প্লেটে করে খাবারটা এনে ইশায়ার সামনে রাখে।গরম গরম ক্রিমি চিংড়ি আর মাসরুম থেকে দারুণ গন্ধ বের হচ্ছে।
ইশায়া হাতে থাকা চকলেটটা পাশে রেখে চামচ দিয়ে একটু তুলে মুখে নেয়।ভীর বলে গরম আস্তে খাও।
ইশায়া মুখে তুলতেই পরের মুহূর্তেই তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে যায়।
ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠে,
___উমমম… অনেক মজা….
ইশায়ার এমন তৃপ্ত মুখ দেখে ভীরের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে ওঠে।এই ভালো লাগাটুকুই তার সব কষ্টকে সার্থক করে দেয়।
ইশায়া আবার এক চামচ তুলে এবার হাত বাড়িয়ে দেয় ভীরের দিকে।
ভীর কিছু না বলে তার হাত থেকেই খেয়ে নেয়।
এসব খাবার খায় না সে তবুও খেলো ইশায়া দিয়েছে বলে।
ইশায়া তখনও ধীরে ধীরে খাচ্ছিল।মাঝরাতের সেই শান্ত মুহূর্তটা অদ্ভুত কোমল হয়ে উঠেছে।
কিন্তু হঠাৎই ইশায়ার চোখ গিয়ে থামে রুমের অদূরে।
ঝাপসা একটা অবয়ব।
ইশায়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে ভয়ংকরভাবে। চামচটা হাত থেকে পড়ে যায়।
সে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে,
___আপু! আপু…!
ভীর মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়।হঠাৎ ইশায়াকে এমন আতঙ্কিত হতে দেখে দ্রুত পিছন ফিরে তাকায় সে। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই।
আবার তাকায় ইশায়ার দিকে।ইশায়া তখন কাঁপছে।পুরো শরীর থরথর করছে ভয়ে।ভীর দ্রুত তাকে আগলে ধরে বুকের সাথে।মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে।
____বেইব… শান্ত হও।
কিন্তু ইশায়া যেন শুনছেই না কিছু।ভয়ার্ত চোখে সামনে তাকিয়ে কাঁপা গলায় শুধু বলেই যাচ্ছে,
___আপু… আপু…
ভীর এবার শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
___ওখানে কেউ নেই। দেখো… কেউ নেই।
ইশায়া তাকাতে চাইছিল না।তার বুক ধড়ফড় করছে।
কিন্তু ভীর বারবার বলায় অবশেষে কাঁপতে কাঁপতে তাকায় সে।সত্যিই সেখানে কেউ নেই।তবুও তার কান্না থামে না।
এই ভয় তাকে ভেতর থেকে গ্রাস করে ফেলেছে।এখন সে স্বপ্নেও দেখে সাফাকে।সেই গুয়াতেমালার ডেলমা মহিলাকেও দেখতে পায় বারবার।তার বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব ভয় হয় তার।
কেন এমন হচ্ছে তার সাথে সে নিজেও জানে না।
ভীর ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
অনেকক্ষণ পর ইশায়া কিছুটা শান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু তার ফোঁপানো থামে না।
হঠাৎ সে আহত গলায় বলে ওঠে,
___কেন মারলেন আপনি আমার আপুকে? কি দোষ ছিলো তার?
এই প্রথম এই বিষয়টা নিয়ে সরাসরি ভীরকে কিছু বলল ইশায়া।
অন্য সময় হলে হয়তো ভীর কোনো উত্তরই দিত না।কিন্তু আজ সে চুপ থাকে না।
নিচু গলায় বলে,
___আমি মারিনি, ইশায়া।
ইশায়া কেঁপে ওঠে।
___তোমার বোনকে আমি দেখিওনি।ওকে নিয়ে আমার কিছুই ছিলো না আমি শুধু তোমাকে দেখেছিলাম। তোমার খোঁজ বের করতে বলেছিলাম,আর তোমাকেই আনতে চেয়েছি। আমি তোমাকেই এনেছি।
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে সে,
___কিন্তু নিক চেয়েছিল তোমার বোনকে। এটা ওর ইচ্ছা ছিল।
হ্যাঁ… এর জন্য তুমি আমাকেও দায়ী বলতে পারো। কারণ আমি নিককে কোনো কিছুতেই থামাই না। আর কখনো থামাবও না। সে যা-ই করুক না কেন, সে আমার ভাই। তার সব কাজে ভীর ছায়ার মতো তার পাশে থাকবে আজীবন।
ইশায়া কিছু বলে না।
ইশায়ার প্রাণোচ্ছল মুখে অন্ধকার নেমে আসতে-ই,
ভীর শান্ত গলায় বলে,
___যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। এগুলোর কিছুই আর ঠিক হবে না। তাই এগুলো ভুলে যাও।
তারপর ইশায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে,
___মানিয়ে নিতে হবে তোমাকে। কারণ আমি তোমাকে ছাড়ছি না।
যত দ্রুত তুমি এটা বুঝতে পারবে সেটা তোমার জন্য ভালো।
ইশায়ার চোখের কোনা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
সে নির্লিপ্ত, ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
___অন্যের জীবন ধ্বংস করে নিজের জীবন সাজানো যায় না।
ভীর হেসে ওঠে।
সেই হাসিতে কোনো অনুশোচনা নেই।
কোনো অপরাধবোধও নেই।শুধু অধিকার।
ইশায়ার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।
ভীর শক্ত গলায় বলে ওঠে,
___চোখের পানি মুছো, ইশায়া। আমাকে রাগিও না।
ইশায়া ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
___আমি আপনাকে কখনো ক্ষমা করবো না। কখনো না।
ভীর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ওঠে।
___So what does that change for me? Do you really think I care about any of this? Rajveer doesn’t give a damn about such things.
তার কালো চোখদুটো স্থির হয়ে থাকে ইশায়ার উপর।
___আমি যা চাই, তা নিজের করে নিতে জানি। কে কি চাইল বা না চাইল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
ইশায়া চোখ ফিরিয়ে নেয়,তার ইচ্ছে করছে না এই লোকের সাথে আর কোন কথা বলতে।
ভীর ইশায়ার থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে তার মুখ তুলে বলে,
___যা আমার… তা আমারই। আর সেটা আমার কাছেই থাকবে।তুমি চাইলেও আর না চাইলেও তাই এটা মাথায় ঢুকিয়ে নাও।
এদিকে ইশায়ার কান্না থামার কোনো নামই নেই।
তার চোখের জল ভীরের ভেতরের রাগটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে তার। কপালের শিরা টানটান।রাগে ভেতরটা জ্বলছে ভীরের।তবুও সে নিজেকে আটকে রাখার চেষ্টা করছে।
কারণ সে জানে রাগের মাথায় সে এমন কিছু করে ফেলতে পারে,যেটা পরে ঠিক করতে পারবেনা সে।
অনেক দিন পর এই সম্পর্কটা একটু স্বাভাবিক হয়েছে।
কিন্তু ইশায়া থামছে না।কান্নার মাঝেই হঠাৎ পেট চেপে ধরে ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে সে।এটা দেখে ভীরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।রাগে গর্জে ওঠে সে,
___বাড়াবাড়ি বেশি-ই করছিস না?
তার কালো চোখদুটো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
শান্ত আছি আমি। ভালো লাগছে না তোর? আমার ভেতরের আমিটাকে বের করতে চাইছিস,পরে সামলাতে পারবি তো।
ইশায়া দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করে।তার মুখটা ধীরে ধীরে নীলচে হয়ে উঠছে যন্ত্রণায়।
আর ততক্ষণে ভীরের মেজাজ পুরোপুরি হায়ার।
সে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
___বোনের জন্য কষ্ট উতলে পড়ছে তোর? আমার বাচ্চার কিছু হলে এবার তোর বোন কেন.. তোর পুরো পরিবারকে কেটে পিস পিস করে আমার পোষ্য প্রাণীকে খাওয়াবো,বুঝেছিস?
ভীর আরও এগিয়ে এসে নিচু ভয়ংকর গলায় বলে,
___আমাকে প্রশ্ন করার সাহস হয় কি করে, হ্যাঁ? কিছু বলি না বলে দিন দিন মাথায় চড়ে বসেছিস।
ইশায়া কিছু বলে না।এক হাত পেটের উপর চেপে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে ডেস্ক থেকে।তার মুখটা ব্যথায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তা দেখে থেমে যায় ভীর।এক মুহূর্তেই তার রাগটা কোথাও মিলিয়ে যায়।
এই মেয়েটার সামান্য কষ্টও সে সহ্য করতে পারে না অথচ সবসময় কেন এমন ত্যাড়ামি করে বসে, সে নিজেও জানে না।ভীর দ্রুত এগিয়ে এসে ইশায়াকে ধরে।আস্তে করে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসায় তাকে।
তারপর ড্রয়ার খুলে রাতের মিস হওয়া ঔষধগুলো দেয়।
ইশায়া চুপচাপ সেগুলো খেয়ে নেয় তর্ক করার শক্তিও নেই তার।
ভীর তাকে শুইয়ে দেয় বিছানায়।কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ইশায়াকে পেটে হাত দিয়ে কুঁকড়ে উঠতে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
ইশায়া ব্যথায় চোখ-মুখ শক্ত করে ফেলছে বারবার।ভীর ধীরে হাত রাখে তার পেটের উপর।
আর সঙ্গে সঙ্গেই
তার হাতের নিচে হালকা একটা নড়াচড়া অনুভব করে সে।মুহূর্তেই থমকে যায় ভীর।তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি দোলা দিয়ে ওঠে।
ভীর ইশায়ার টি-শার্টটা একটু ওপরে তোলে সে।
বাড়ন্ত পেটটার দিকে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ আবার পেটের একপাশ সামান্য ফুলে উঠতেই ভীরের চোখ চকচক করে ওঠে।তার বাচ্চা নড়ছে।রাজভীরের মতো ভয়ংকর একজন মানুষের চোখেও সেই মুহূর্তে অদ্ভুত কোমলতা নেমে আসে।
ভীর ধীরে ঝুঁকে ইশায়ার পেটে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
একটা দীর্ঘ চুমু।
তারপর এক হাত সেখানেই রেখে দেয়,নিজের অস্তিত্ব আগলে রাখেছে সে।
ইশায়ার পেটের উপর হাত রেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় ভীর।
____এদিকে সুযোগ বুঝে ম্যাটিয়াস বাইরে বেরিয়ে আসে।ডিয়েগো সহ বাকি গার্ডরা ব্যস্ত পুরো শরর জুড়ে তল্লাশি চালাতে যাতে ওই লোকগুলোকে ধরতে পারে।
কত বড় রিস্ক নিয়ে বের হতে হয়েছে তাকে। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে, প্রতিটা শিরায় শিরায় জমে থাকা আগুন ফেটে বের হতে চাইছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখ দুটো রক্তিম।একটা নির্জন জায়গায় গিয়ে দ্রুত অন্য একটা ফোন বের করে লুকাকে কল করে।
ফোন রিসিভ হতেই ম্যাটিয়াস দাঁতে দাঁত চেপে রাগি গলায় বলে ওঠে,
___আজকের এই আক্রমণের কারণ কী, লুকা?
সব কিছু ঠিক হওয়ার পরেও আমাকে কিছু না জানিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিলে কেন তোমরা?
ওপাশে নীরবতা। তারপর লুকার গম্ভীর।কণ্ঠ ভেসে আসে,
___ভীরের ওই মেয়েটাকে আমার চাই তাই।কথাটা শুনে মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটে ম্যাটিয়াসের। রাগে তার শিরা ফুলে ওঠে।
সে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
___তুমি কী ভাবছো? ওর ওপর শুধু তোমার নজর পড়েছে।
ভীরের জান ওই মেয়ে। ভীর বেঁচে থাকতে তার নাগাল কেউ কোনোদিন পাবে না।
কিছুক্ষণ থেমে নিচু গলায় বলে ওঠে সে,
___ভীরকে শেষ করার পর ওই মেয়েটাই আমার ফার্স্ট টার্গেট । কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে আগে ভীরকে শেষ করতে হবে। তুমি এখন এমন কোনো ভুলভাল কাজ করো না যাতে আমাদের পুরো প্ল্যান নষ্ট হয়ে যায়।
ম্যাটিয়াস গভীর শ্বাস নেয়। কণ্ঠে বিরক্তি
___আজ আমাদের অনেক লোক মারা পড়েছে তোমার এই বোকামির কারনে। এর মাঝেও কিছু লোক পালিয়ে গেছে। আর ভীর ইতিমধ্যেই ডিয়েগোকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন সামান্য একটা ভুলও আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
হঠাৎ ফোনটা মাতেও নিজের হাতে নিয়ে নেয়।
তার কণ্ঠ বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস।
___তুমি চিন্তা করো না। আমি ইতিমধ্যেই সব কিছু বদলে ফেলেছি। এই মাথামোটার জন্য একদিন আমাদের প্রাণ হারাতে হবে।
মাতেও ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসে, তারপর ধীর গলায় বলে,
___ওরা ঠিক অতটুকুই জানবে, যতটুকু আমরা তাদের জানতে দিতে চাই। এর বাইরে কিছুই না। আর এরপর সব কিছু প্ল্যান মাফিকই হবে।
___তোমার আর ফোন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি এখন সেফ থাকো।
ম্যাটিয়াস কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর ফোনটা কেটে দেয়।
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
এখানের সকালগুলো অন্যরকম সুন্দর।ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে আকাশের গাঢ় নীল রঙ সরিয়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়। দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢেকে থাকে, আর সূর্যের আলো সেই কুয়াশা ভেদ করে চারদিকে এক স্বপ্নময় আবহ তৈরি করে।
প্যালেসের চারপাশে থাকা গাছগুলোয় পাতায় রাতের শিশির এখনো ঝুলে আছে। হালকা বাতাস বইতেই সেগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। দূরে পাখির ডাক ভেসে আসছে, কিন্তু এই সুন্দর সকালের মাঝেও ইশায়ার মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে।
রাতে কান্না করতে করতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। চোখ দুটো এখনো জ্বালা করছে। ঘুম ভাঙতেই অভ্যাসবশত পাশে হাত বাড়ায় সে কিন্তু ভীরকে পায় না।খালি বিছানা দেখে স্বস্তি-ই পায় সে।
লোকটার হঠাৎ এমন বদলে যাওয়া আচরণ ইশায়াকে বড্ড ভাবাচ্ছে।সে কি এমন বলেছিল?ইশায়ার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে।তার মনের ভেতর ভয়ংকর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে,ভীরের এই সুন্দর ব্যবহার এই যত্ন সবকিছুর কারণ-ই কি শুধু তার গর্ভে থাকা বাচ্চাটা।তার নিজের জন্য কি ভীরের মনে কিছুই নেই।যা করছে সে সব নিজের বাচ্চার জন্য।স্বার্থ শেষ হয়ে গেলে কি আবারো আগের মত হয়ে যাবে,
চোখের কোণে পানি জমে ওঠে ইশায়ার।
মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। অদ্ভুত অস্বস্তি নিয়ে ধীরে ধীরে সে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যায়। হয়তো সকালের হাওয়া একটু ভালো লাগাবে তাকে।
কিন্তু ব্যালকনিতে গিয়ে যে দৃশ্য তার চোখের সামনে ধরা দেয়, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
মুহূর্তেই তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়।
দেড় বছরে এই জায়গায় অনেক ভয়ংকর জিনিস দেখেছে ইশায়া।র*ক্ত দেখেছে। মৃ*ত্যু দেখেছে।
কিন্তু এমন নির্মমতা এমন নৃশংসতা সে কখনো দেখেনি।নিচের বিশাল প্রাঙ্গণটা র*ক্তে লাল হয়ে আছে।চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য দে*হ।
আর সেই রক্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ভীর।
তার পুরো শরীর রক্তে রঞ্জিত। মুখে ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা। হাতে ধারালো অ*স্ত্র।
একেকজন মানুষকে সে এমনভাবে আঘাত করছে, যেন তাদের শরীর আর মানুষ নয় নিছক মাংসের টুকরো।
সে নিজের হাতে ছিন্নভিন্ন করছে সব কিছু। শরীর থেকে অ*ঙ্গ-প্রত্য*ঙ্গ আলাদা করে ফেলছে।
চারপাশে আর্তনাদের বিভীষিকা।ইশায়ার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।
ভয়ংকর আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে সে, পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।
দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে ইশায়া।কাউকে ডাকতেও পারছে না শব্দ ফুরিয়ে আসছে।
ধপ করে নিচে বসে পড়ে সে।
দুই হাত কাঁপছে তার। চোখ বড় বড় হয়ে আছে।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না।
হঠাৎ ইশায়ার চিৎকার
শুনে ভীর থেমে যায়। মাথা তুলে ব্যালকনির দিকে তাকায় সে।
ইশায়াকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায় তার চোয়াল।
চোখে বিরক্তি, রাগ আর আতঙ্ক একসাথে ফুটে ওঠে।
___Shit… shit…
দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে ওঠে ভীর।
তারপর হাতের রক্তমাখা ধারালো অ*স্ত্রটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
নিজের রক্তে রঞ্জিত শার্ট খুলে ছুঁড়ে মেরে দ্রুত প্যালেসের ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়।
___ইশায়ার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতেই চারপাশে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।গার্ডরা দ্রুত দৌড়ে আসে। কারও মুখে আতঙ্ক, কারও চোখে বিভ্রান্তি।কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারিয়া এলেনা ছুটে এসে ইশায়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
ইশায়ার পুরো শরীর কাঁপছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। চোখ-মুখ ভেজা, আতঙ্কে।মারিয়া এলেনা বারবার শান্ত গলায় বলতে থাকে,
___ম্যাম, শান্ত হন প্লিজ কিছু হয়নি।
কিন্তু ইশায়া কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।ইশায়া মারিয়া এলেনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে একটু আগের সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য
র*ক্ত ছিন্নভিন্ন শরীর আর সেই র*ক্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভীর।তাকে কতোটা ভয়ংকর লাগছিলো।ইশায়ার মাথা ঘুড়ে ওঠে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রুমে ঢুকে ভীর।রুমে ঢুকেই তার চোখ পড়ে ইশায়ার দিকে।মেয়েটা পুরো কুঁকড়ে আছে ভয়ে মারিয়া এলেনার পেছনে লুকিয়ে আছে।
ভীরকে দেখেই আরও ভয় পেয়ে যায় ইশায়া।
মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায় ভীরের চোয়াল।
রাগে তার চোখ লাল হয়ে ওঠে।
সে গর্জে উঠে বলে,
___কোথায় ছিলি তোরা, ও ব্যালকনিতে গেলো কীভাবে, হুম?
রুমে থাকা গার্ডরা ভয় পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।
তাদের মধ্যে একজন কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
__বস… আপনি থাকলে তো আমরা রুমে থাকি না।আর এই সময় তো…
রানিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ভীর বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে আর কিছু শুনতে চায় না।দ্রুত পায়ে ইশায়ার দিকে এগোতে যায় সে।কিন্তু ভীরকে নিজের দিকে আসতে দেখে ইশায়া আরও জোরে কেঁদে ওঠে।
তার চোখের সামনে শুধু ভীরকে ওইরকম-ই লাগছে
র*ক্তমাখা হাত,ধারালো অ*স্ত্র, মানুষের ছিন্নভিন্ন শরীর যেন তাকে ও এখন-ই মেরে ফেলবে।
ভয়ে ইশায়া আরও শক্ত করে মারিয়া এলেনাকে আঁকড়ে ধরে।
মারিয়া এলেনা একবার ইশায়ার দিকে তাকায়, তারপর ভীরের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে,
___বস, ম্যাম এখন খুব ভয় পাচ্ছেন। উনি প্যানিক করছেন। আপনাকে এই অবস্থায় দেখে উনার ভয়টা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এখন….
ভীর থেমে যায়, নিজের দিকে তাকায় সে।তার পুরো শরীর এখনো র*ক্তে মাখামাখি। হাতে, গলায়, বুকজুড়ে শুকিয়ে যাওয়া লালচে দাগ।মারিয়া এলেনার কথাটা বুঝতে তার আর বাকি থাকে না।
এই মুহূর্তে ইশায়ার সামনে যাওয়া মানে পরিস্থিতি আরও খারাপ করা।
ভীরের বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা জমে ওঠে।
সে বুঝতেই পারছে না হঠাৎ করে সব কিছু এভাবে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন।
যা একটু ঠিক হচ্ছিল, সেটাও যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ভীর।
তারপর কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে।আর পিছনে রয়ে যায় আতঙ্কে কাঁপতে থাকা ইশায়ার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।
____ পাহাড় আর ঘন বন ঘেরা এক নির্জন অঞ্চল সান লুসিয়ানো ভ্যালি।
চারদিকে খাড়া পাথুরে দেয়াল, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু রাস্তা আর নিচে গর্জন করতে থাকা কালচে নদী জায়গাটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
ভীরের হাতে ধরা রক্তাক্ত লোকটা শেষ নিঃশ্বাসের আগে কাঁপা গলায় শুধু একটাই নাম বলেছিল,
___স… সান… লুসিয়ানো ভ্যালি।
তারপরই নিথর হয়ে যায় সে।নামটা শুনেই পুরো পরিবেশ অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গিয়েছিল।
আর এখন প্যালেসের বিশাল মিটিং রুমে বসে সেই জায়গা নিয়েই আলোচনা চলছে।
ঘরজুড়ে ভারী উত্তেজনা।
দেয়ালে টাঙানো বিশাল ডিজিটাল ম্যাপে লাল চিহ্ন দিয়ে মার্ক করা সান লুসিয়ানো ভ্যালি।
টেবিলের চারপাশে বসে আছে ভীরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোকেরা।
সবার চোখেমুখে যুদ্ধের আগুন।
নিক টেবিলের উপর দুই হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।তার কণ্ঠে স্পষ্ট রাগ।
___ব্রো, এবার এই মাতেও এর গেম ওভার।
আমাদের এবার যেতে হবে। ওরা দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে বসে থাকলে চলবে না। একটা না একটা ব্যবস্থা এবার নিতেই হবে।
তার চোখ হঠাৎ রাগে জ্বলে ওঠে।ওদের সাহস কতটুকু হলে ইশায়াকে টার্গেট করার সাহস করে?
ভীর চুপচাপ বসে ছিল এতক্ষণ।তার চোখ স্থির ম্যাপের উপর।কয়েক সেকেন্ড পর সে মাথা তোলে।
চোখ দুটো ভয়ংকর ঠান্ডা।শক্ত গলায় সে বলে ওঠে,
মিশনের প্রস্তুতি নাও।
রুমের সবাই ভীরের দিকে তাকায়।ভীর ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়।
___সব কিছুর প্রস্তুতি নাও। যত দ্রুত সম্ভব।
তার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এবার শেষ হবে এই গেম।
নিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,
___ব্রো… ইশায়াকে এই অবস্থায় রেখে যাবে?
প্রশ্নটা শুনে ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আতঙ্কে কাঁপতে থাকা ইশায়ার মুখটা।
তার কান্না,ভয় পাওয়া চোখ…কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই অনুভূতিকে চাপা দেয় রাগ। ভয়ংকর, দহন করা রাগ।
ভীর নিচু অথচ শক্ত গলায় বলে ওঠে,
___এখন ওদের শেষ করাটাই বেশি প্রয়োজন।নাহলে সামনে ওরা আমাদের জন্য আরো বড় বিপদ নিয়ে দাঁড়াতে পারে, এটা ভুলে যাস না শত্রুর শেষ রাখতে নেই।
ভীর টেবিলের উপর হাত রাখে,তার আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ।আমার জানের উপর নজর দেওয়ার সাহস করেছে ওরা।
তার গলা আরও ভারী হয়ে আসে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৫
___ওদের শেষ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
কেউ আর কিছু বলে না।
শুরু হয় প্রস্তুতি। পুরো প্যালেস যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।একদল অ*স্ত্র পরীক্ষা করছে, কেউ গু*লি ভর্তি করছে ম্যাগাজিনে, কেউ ম্যাপে রুট মার্ক করছে।
বিশাল টেবিলজুড়ে সাজানো অত্যাধুনিক রা***ল, পি*ল, গ্রে*ড আর ধারালো অ*স্ত্র।
গ্যারেজে একের পর এক কালো এসইউভি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
গাড়ির দরজা খুলে অ*স্ত্র তোলা হচ্ছে ভেতরে।
সবার মুখে কঠিন অভিব্যক্তি।
