হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ধরনীর বুকে আজানের মিষ্টি ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তেই ঘুম হালকা হয়ে এলো কৃশানের। আজানের সাথে ঘুম ভেঙে যাওয়া এখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সময় নিয়ে বন্ধ আঁখিযুগল মেলে তাকাল সে। ঘরময় আবছা আলোয়, নিজের বুকে আবিস্কার করল একটা নরম দেহ। যা পুরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে তাকে। যেন ছেড়ে দিলেই কোথাও পালিয়ে যাবে। দুনিয়ার সকল সুখ শান্তি এখানেই খুঁজে নিয়েছে দেহের মালকিন। দৃশ্যখানা কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করল কৃশান। সূক্ষ্ম হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। পরপর কিছুটা ঝুঁকে ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল,
“ এই হুজুরনী….”
“ হুম! ”
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে উত্তর করল হুমায়রা। আজানের সুর তারও কর্ণকুহরে পৌঁছেছে। তবে শরীরের দুর্বলতা , আর ঘুমের তাড়নায় চোখ মেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। মানুষটার কণ্ঠ শুনে এবেলায় এসে ভারী চোখের পাতা পিটপিট করে খুলল সে। কৃশানের লোমশ যুক্ত নগ্ন বুকে চোখ গেল তৎক্ষনাৎ। ওমনিই মনে পড়ল রাতে মানুষটার করা পাগলামির কথা। সাথে সাথেই কপোলদ্বয়ে লালাভ আভা ছড়িয়ে পড়ল মেয়েটার। লাজে আইঢাঁই করে উঠল মন! চোখ বুঁজে এলো আপনা আপনিই। কতক্ষণ এভাবেই কাটল। একটা সময় কৃশানের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে ধীর গতিতে মাথা তুলে তাকাল হুমায়রা। ওমনিই চোখাচোখি হলো দুজনের। মেয়েটা খানেক চমকাল। এর মাঝেই ভেসে আসলো মানুষটার ঠান্ডা কণ্ঠ,
“ আসসালামু আলাইকুম, মহারানী। ঘুম হয়েছে আপনার? ”
মেয়েটা ঘুমিয়েছে ঘণ্টা খানেক হবে কিনা সন্দেহ! অথচ তার ঘুম হারাম করা ব্যক্তি কি সুন্দর করে জিজ্ঞেস করছে- ঘুম হয়েছে কিনা! হুমায়রা প্রথমে সালামের জবাব নিল। পরপর মিহি স্বরে বলল,
“ হুম। ”
“ তাহলে এবার নামাজের জন্য যাওয়া যাক? ”
হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল হুমায়রা। অতঃপর বিছানা ছেড়ে মাটিতে ভর দিতেই শরীরে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল। চোখ মুখ খিচে নিল। শরীরটা খানেক হেলে দুলে উঠল। ব্যাপারটা লক্ষ্য করল কৃশান। পরপর হুমায়রাকে কিছু বুঝতে না দিয়েই তার ছোট্ট দেহটা দুহাতের আজলায় নিয়ে নিল, বিলম্বহীন হাঁটা ধরল ওয়াশরুমের দিক। আকস্মিক কাণ্ডে হকচকিত হুমায়রা তৎক্ষনাৎ মানুষটার গলা জড়িয়ে ধরল। তাকাল চোখ বড় বড় করে! কিছু বলতে নিবে তখনি শুনতে পেল প্রত্যাশিত কিছু বাক্য,
“ এতোটা নাজুক হওয়ার কি খুব বেশি দরকার ছিল? এখন এই নাজুকপাখিতে আমার অবাধ্য বিচরণ নিয়মকরে সামাল দিতে পারবি তো? ”
মেয়েটার গা যেন প্রায় শিউরে উঠল মানুষটার কথায়। নজর নামিয়ে নিল তৎক্ষনাৎ। কুণ্ঠায় মিইয়ে গিয়ে মুখ লুকাল স্বামীর বক্ষ প্রাঙ্গণে। পৃষ্ঠে কোনোরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে সক্ষম হলো না আর! ওঁর কান্ড দেখে ঠোঁট চেপে হাসল কৃশান।
শাওয়ার নিয়ে একেবারে ওযু করে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো কৃশান ও হুমায়রা। খাটের মাথায় একটা শপিং ব্যাগে জায়নামাজ দেখা যাচ্ছে। সাথে আরো কয়েকটা শপিং এ তাদের দুজনের জামা কাপড়। রাতের বেলা অতকিছু খেয়াল করেনি হুমায়রা। সে এগিয়ে গিয়ে জায়নামাজের ব্যাগটা হাতে নেয়। সেখান থেকে দুটো জায়নামাজ এনে বিছিয়ে দেয় ফ্লোরে। কৃশান টুপি পড়ে এসে দাঁড়ায় একটাতে, অপরটাতে দাঁড়ায় হুমায়রা। মেয়েটা আড়চোখে এক পলক তাকায় মানুষটার দিক। দেখতে পায় তার দোয়া ও ধৈর্যের ফল! অবশেষে আল্লাহর দয়ায় তার দোয়া কবুল হলো! স্বামীর জায়নামাজের পাশাপাশি সালাত আদায়ের সৌভাগ্য হলো তার। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে নেয় সে। শুকরিয়া জানায় তার রবের নিকট। পরপর সালাত শুরু করে।
কৃশানের নামাজ আগে শেষ হয় গেছে। জায়নামাজে বসে মনোযোগ সহকারে হুমায়রা কে দেখতে ব্যস্ত সে। হুমায়রার তখন নামাজ শেষ করে মোনাজাত ধরেছে। সময় নিয়ে মোনাজাত শেষ করে সে। তৎক্ষনাৎ তার কোলের উপর শুয়ে পড়ে কৃশান। মেয়েটা খানেক ভরকে যায়। কণ্ঠনালী চিরে বেরিয়ে আসে অস্ফুট আর্তনাদ,
“ এমা! কি করছেন? ”
“ উমম, প্রশ্ন নয়! কতদিন ধরে এখানটায় ঘুমানো হয়না। কথা না বলে চুলে হাত বুলিয়ে দে! ”
বিলম্বহীন চুলের মাঝে হাত রাখে হুমায়রা। ঠোঁট কামড়ে বলে,
“ এক সময় একজন বখাটে পুরুষ তার চুলে হাত দিলে মোটেও পছন্দ করত না! খু*ন করার দৃষ্টিতে তাকাত! ”
চোখ বন্ধ করেই কিঞ্চিৎ হাসে কৃশান। উত্তরে বলে,
“ কোনো এক মায়াবিনীর, মায়াভরা চাহনীতে
ঐ পুরুষটি খু*ন হয়েছে সেই কবে কখন!
ওই মায়ায় যে তার দাফন হয় নিয়্মকরে এখন! ”
“ পুরুষটি তার স্ত্রীকে বলেছিল- তার থেকে তিন মাইল দূরে থাকতে! ”
“ অথচ স্ত্রী নামক সে বোকা নারীটি তো জানত না-
সে সামান্য দূরত্ব বাড়ালে,
পুরুষটি জ্বলসে যেতা আড়ালে! ”
“ তাঁকে তো বলেনি কেউ! ”
“ সে কি পুরুষটির চোখের দিক তাকায়নি? ”
“ তাকালেই তো চোখ রাঙাতো! ”
কৃশান এবার খানেক শব্দ করে হেসে ফেলে। বলে,
“ আচ্ছা বাবা! মানলাম ভুল ঐ পুরুষটিরই ছিল! কিন্তু এখন তো সে নিজেকে শুধরে নিয়েছে! ”
“ হুম। ”
“ আগের পুরুষটির থেকে ভালো তো? ”
“ উমম, আগের পুরুষটিও ততটা মন্দ ছিল না। শুধু একটু বখাটে ছিল এই যা! তবে এখনের সে একটু বেশিই ভালো! ”
সময় নিয়ে উত্তর করল হুমায়রা। জবাবে কৃশান ফটাফট বলে উঠল,
“ তাহলে এখন তাকে একটা চুমু দেয়া হোক। একটা চুমু তো নিশ্চয়ই পাওনা সে! ”
মেয়েটা থতমত খায়! চোখ বড় বড় করে তাকায় মানুষটার পানে। কৃশানের চোখ তখনো বন্ধ। চুলে হাত বুলানো পরম আবেশে উপভোগ করছে সে। ফের ঠোঁট নেড়ে বলে,
“ স্ত্রীর ভালোবাসা পাওয়া কিন্তু স্বামীর হক! ফটাফট চুমুটা খেয়ে নে হুজুরনী! নয়তো…..”
কথার মাঝেই কপালে কারো নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে থেমে গেল কৃশান। প্রথম নারী স্পর্শে ভিতরটা কেমন যেন অদ্ভুত শিহরিত হলো। এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় ভালোলাগারা আছড়ে পড়ল হৃদয়ে। কিয়ৎক্ষণ নীরবতা বহমান রইল কক্ষ জুড়ে। সহসা কিছু একটা মনে পড়তেই তড়াক দৃষ্টিতে চোখ খুলল কৃশান। ব্যস্ত স্বরে বলল,
“ কুরআন তেলাওয়াত করবি না? ”
“ এনেছেন? ”
“ হুম। ”
সোজা হয়ে বসল কৃশান। পরপর এগোলো দেয়ালের তাকের দিক। আলতো হাতে সেখানে রাখা কুরআন শরীফটা হাতে নিল। ঘরের জন্য সর্বপ্রথম এই পবিত্র গ্রন্থটিই এনেছে সে। তারপর বাদ বাকি সবকিছু এনেছে। হুমায়রার বিস্ময় দৃষ্টি কৃশানের এগিয়ে আসা পদযুগলেই নিবদ্ধ। তার তাকিয়ে থাকার মাঝেই সামনে এসে বসল মানুষটা। তার হাতে পবিত্র গ্রন্থটি দিয়ে বলল,
“ এই নে, আমার পবিত্র নারীর ঘর এই পবিত্র বস্তু হীন একেবারেই বেমানান! তাই সর্বপ্রথম এটিই ঘরে এনেছি! ”
হুমায়রার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটল। আগ্রহী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ আপনি শিখবেন না কুরআন তেলাওয়াত? ”
“ হুম, শুরু থেকে শেখার জন্য যা যা প্রয়োজন সব আজকে নিয়ে আসব। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল থেকে শিখব। ”
হুমায়রা প্রয়োজনীয় দোয়া, দুরুদ পাঠ করে কুরআন খুলে। আরবি ও বাংলা উচ্চারণ, অর্থ সহ একটি নূরানী কুরআন। সে পড়া শুরু করে। আর কৃশান তা মনোযোগ সহকারে শুনে।
ছ’ মাসের ভারী পেট নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ইকরা। মাত্রই নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত করে উঠেছে সে। উমর মসজিদ থেকে এখনো ফেরেনি। আজকাল প্রায় সময়ই বিষন্নতায় কাটে তার। উমর যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ বিষণ্নতা তেমন একটা গ্রাস করতে পারেনা। সে ক্ষণিকের জন্য বাইরে গেলেই মলিন মুখ নিয়ে ভাবনায় ডুব দেয় মেয়েটা। মায়ের সাথে কথা হয়না, দেখা হয়না বহুদিন। সাথে প্রিয় সখি ও ভাইয়ার কোনো খুঁজ আজও পায়নি। কৃশানের নাম্বার সবসময় বন্ধ পায়। শতবার চেষ্টার পরেও উত্তর একটাই আসে- আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জিনিয়ার প্রতি মনটা ভয়ানক বিষিয়ে আছে। তাকে সামনাসামনি পেয়ে কিছু কথা শুনালে হয়তো একটু শান্তি পেত। কিন্তু সেই উপায়ও নেই। মায়ের প্রতি থাকা অভিমানের পাহাড় ভেঙে ও বাড়িতে আর পা দেয়ার ইচ্ছে নেই। যেদিন তার সখিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে সেদিনই সে বাড়িতে পা রাখবে সে। কি থেকে কি হয়ে গেল তার পরিবারটা! ভাবতেই কান্না পেল মেয়েটার। চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ার আগেই শুনতে পায় স্বামীর স্বর,
“ বারান্দায় দাঁড়িয়ে একলা একলা কি করছেন ইকরাবিবি? ”
তড়িঘড়ি করে চোখ মুখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয় সে। ঘুরে তাকায় হাসি মুখে। জবাবে বলে,
“ এমনিই একটু বাতাস খেয়ে মনটা হালকা করছিলাম। ”
“ মনটা আবার ভারী হলো কেন? ”
“ আরে ওটা তো কথার কথা! মানুষ বলে না বাতাস খেয়ে হালকা হলাম! ”
ধীর পায়ে রুমের ভিতর আসতে আসতে বলল ইকরা। অথচ তার কথা মোটেও আমলে নিল না উমর। বলল,
“ কথার কথা আবার কি? কথা তো কথাই! আবার ও বাড়ির কথা মনে করে মন খারাপ করেছেন….? ”
এবেলায় এসে চুপ মেরে গেল ইকরা। কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ মন খারাপ না এমনিতেই বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। এ অবস্থায় তো বেশিরভাগ সময়ই মেয়েরা বাপের বাড়িতে থাকে। মায়ের আদর যত্ন পায়! আর আমার মা তো জানেও না! ”
“ জানান নি আপনিই! আর কোনোভাবে কি আমি আপনাকে যত্নে রাখতে সক্ষম হচ্ছি না? ”
“ এটা কেমন প্রশ্ন করলেন ইমাম সাহেব! আপনার যত্নের কবলে পড়ে দিনে একবারের জন্য রুম থেকেই বেরোতে পারিনা আমি! আর আপনি বলছেন আপনি যত্ন করতে সক্ষম হচ্ছেন না…! ”
“ তাহলে বারবার কেন একটা কথাই বলেন? মায়ের আদর যত্নের অভাব কেন বারবার স্মরণে আসে আপনার? নিশ্চয়ই আমার যত্নের সংকটে? ”
হাত দিয়ে কপাল চাপড়ায় মেয়েটা। অসহায় স্বরে বলে,
“ আরে আমি ওভাবে বলি না তো! মায়ের কথা মনে আসলে মায়ের আদর যত্নের কথা এমনিতেই মাথায় এসে যায়! ”
উমরের নিকট এগিয়ে আসে ইকরা। ফের নিজের ভরাট চেহারাটায় উমরের দুহাত রেখে বলে,
“ আপনার যত্নের পরিমাণ আমার চেহারাতেই দেখুন! মেয়েদের প্রিয় পুরষের যত্ন তাদের চেহারাতেই ফুটে ওঠে। আমার চেহারা দেখেছেন? আপনি তো প্রতিদিনই বলেন আমি দিনদিন সুন্দর হচ্ছি। তার পেছনের মূল কারণ আপনার যত্ন ইমাম সাহেব! ”
“ আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু আপনার কি মনে হয় আপনার পরিবারে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমি আপনাকে ও বাড়িতে থাকতে দিতাম? ”
“ দিতেন না? ”
“ মোটেও না! ওখানে বউ বাচ্চা রেখে এখানে আমি চিন্তায় অনাহারীর মতো ছটফট করতাম! ”
কথা শুনে হেসে ফেলল ইকরা! হাসল উমরও। অতঃপর ইকরার বিষন্ন তারা হারিয়ে গেল নিমিষেই!
ধরণীতে তখনো পুরোপুরি আলোর রেখা পৌঁছায়নি। হালকা আলোতে অস্পষ্ট প্রকৃতি। চতুর্দিকে পশু- পাখির ডাক ব্যতিত অন্য কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের বুকে বিরাজ করছে অদ্ভূত নীরবতা। সকলে এখনো ঘুমের ঘোরে মগ্ন।
ঘরে মিরর না থাকায় এমনিতেই বোরকা পড়ে রেডি হচ্ছে হুমায়রা। সামনেই মাথার টুপি পকেটে পুরে ভদ্র পুরুষের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রোল করছে কৃশান। হুমায়রা রেডি হলেই তাকে নিজের ক্যাফে দেখানোর জন্য নিয়ে যাবে। বোরকা পড়ে বরাবরের মতোই উপরে সাত লেয়ারের নিকাব পড়ে নিল হুমায়রা। এগিয়ে এসে বলল,
“ চলুন! ”
কৃশান চোখ তুলে তাকাল। ফোন পকেটে রাখতে রাখতেই হুমায়রার নিকাবের দিক লক্ষ্য করল। পরপর ঝুঁকে এসে নিকাবে হাত রাখল। খানেক বাকিয়ে থাকা নিকাবটা ঠিকঠাক ভাবে পড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ কালো নিকাবের মাঝে মেয়েটার সুদীর্ঘ পল্লব বিশিষ্ট চোখ জোড়া দেখল। মন গহীনে আবিষ্কার করল একটা নতুন সত্যি,
“ মেয়েদের নিকাবের মাঝে ভেসে থাকা আঁখিযুগল মারাত্মক সুন্দর! একেবারে বর্ণনাহীন সুন্দর যাকে বলে! ”
হঠাৎ কোনোরূপ বাক্য বিনিময় হীন প্রথম লেয়ার টা হুমায়রার চোখের উপর নামিয়ে দিল কৃশান। এতেও চোখ গুলো পুরোপুরি ঢাকেনি। মেয়েটার ফ্যালফ্যাল চাহনি তখনো বুঝা যাচ্ছে। আরেকটা লেয়ার টেনে দিল সে। ওমনিই নেত্রযুগল কালো কাপড়ের আড়ালে চলে গেল রমণীর। এবেলায় এসে স্বস্তি পেল মানব। স্ত্রীর মোজা পরা হাত খানা মুঠোয় পুরে নিয়ে হাঁটা ধরল। শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ লেয়ার টেনে দেয়ায় সমস্যা হচ্ছে? ”
“ উহু! ঠিক আছে। ”
কাপড় অত ভারী না হওয়ায় খানেক অস্পষ্ট হলেও সবকিছু দেখতে পাচ্ছে হুমায়রা। সাথে তো তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাত আছেই। এই হাতে হাত রেখে তো চোখ বন্ধ করেও নির্ভয়ে চলতে পারবে সে!
উঠোনে পা রাখতেই চমকে গেল হুমায়রা। রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়ারা-রা যেন প্রলেপে এঁকে দিয়েছে জমিন জুড়ে। সেই দৃশ্য দেখে পদযুগল থামিয়ে দেয় মেয়েটা। মুগ্ধ কণ্ঠে আওড়ায়,
“ মাশাআল্লাহ! ”
তাকে থামতে দেখে কৃশানও থেমে যায়। পিছন ফিরতেই হুমায়রা আবদার ছুঁড়,
“ কিছু ফুল নিই আমি? ”
“ এখন এগুলো নিয়ে কোথায় রাখবি? একটু পরেই তো ফিরব আমরা। তখন নেয়া যাবে এখন চল। ”
বলেই পা চালাল। হুমায়রা ও কথা না বাড়িয়ে পা মেলাল। তখনি ফের ভেসে আসলো মানুষটার ভরাট স্বর,
“ তোর কি ফুল খুব পছন্দ? ”
“ হুম অনেক। আপনার পছন্দ না? ”
“ হুম তবে সবফুল নয়। কয়েকটা পছন্দ তন্মধ্যে সবচেয়ে পছন্দ টিউলিপ! ”
“ হুম আমিও শুনেছি এই ফুলটা অনেক সুন্দর। তবে দেখিনি এখনো! ”
রবি, অভি ও সাইফুল তিন বন্ধু একসাথে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসলো। ফজরের নামাজটা প্রতিদিনই দেরী হয়ে যায় তাদের। মসজিদে তখন মুসল্লী দের আনাগোনাও থাকে না। অবশ্য এমনিতেও চার, পাঁচ জনের বেশি মানুষ কখনোই হয় না। শহরের মসজিদ গুলো যেন আজকাল একটু বেশিই মুসল্লী দের অভাবে ভোগে! মসজিদে আসার পর থেকে এটুকু পর্যবেক্ষণ করছে তারা। যদিও মাস কয়েক আগে তাদের ক্ষেত্রেও একই কান্ড ঘটত। কিন্তু কৃশানের জন্য সে অভ্যাস আর ধরা রাখা হয়নি। সবগুলোকে জোর করে হলেও নিজের সাথে মসজিদে নিয়ে গেছে সে। অতঃপর এখন তাদের নিজদেরই নামাজ আদায়ের অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম কৃশানের উপর বিরক্ত হতো, এক ওয়াক্ত পড়লে আরেক ওয়াক্ত পড়তে চাইত না। কিন্তু এখন এক ওয়াক্ত বাদ পড়লেই যেন অশান্তি লাগে।
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৩
সমসাময়িক জেনারেশনের কবলে পড়ে সেদিন সুখ খুঁজতে যেই ছেলেগুলো নেশার জগতে পা রেখেছিল। সেই ছেলেগুলো আজ বুঝতে পারে – প্রকৃত সুখ, শান্তি শুধু রবের ধারেই মেলে! আগে মনে হত কেউ তাদের ভালোবাসে না, শুধু নেশাই তাদের পেশা! আর এখন যেন ভালোবাসার মানুষের অভাব নেই। সকলের কাছেই কোনো না কোনো মাধ্যমে প্রিয় হয়ে উঠেছে তারা। এখন আর কেউ দেখলেই নেশাখোর, বিরিখোর বলে ঘৃণার উপাধি দেয় না। বরং পরম স্নেহে আগলে নেয়।
