Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৩

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৩

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

রাতের আঁধারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে ধরণী। সাথে রেখা বেগমের চোখে মুখেও আঁধার নেমে এসেছে। ভয়ে জবুথবু অবস্থা তার। বারবার আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছে সামনে সটান দেহে দাঁড়িয়ে থাকা কৃশানকে। আজকে তাকে দেখে পুরো ভদ্র ঘরের ছেলে মনে হচ্ছে! গোছানো শার্ট, সবগুলো বোতাম লাগানো, হাতে ব্রেসলেট এর বদলে স্থান পেয়েছে ঘড়ি, ঘাড় সমান লম্বা চুল আবৃত হয়ে আছে টুপিতে, মুখে হালকা চাপ দাঁড়ি, নাকের নিচে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট গোঁফ, দৃষ্টি শান্ত, তবে গভীরতা অনেক- একেবারে ভদ্রপুরুষ যাকে বলে। অথচ মাত্রই তার ঠান্ডা হুমকিতে পত্র পক্ষরা দল বেঁধে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে অবশ্য ভদ্রমহিলাকে কথা শোনাতে ভুলেনি। কৃশান খানেক এগিয়ে আসে রেখা বেগমের দিকে। শান্ত স্বরে বলে,

“ আপনার কি মনে হয়েছিল শ্বাশুড়ি আম্মা?আমাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে আপনি আমার স্ত্রীকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিবেন আর আমি টের পাব না? এতো কেয়ারলেস হয়ে আপনার মতো মহিলার কাছে আমার স্ত্রীকে আমানত হিসেবে দিয়ে গেছি আমি! ”
“ আসলে……”
“ আসলে…..? ”
কথা বলতে গিয়ে ঘেমে উঠছেন রেখা বেগম। কৃশান কিছুক্ষণ ভাবনায় ডুবে থেকে রেখা বেগমের স্বামীর উদ্দেশ্যে হাঁক ছুঁড়ে,
“ শ্বশুর আব্বা এদিকে আসেন। ”
ভদ্রলোক তৎক্ষনাৎ এগিয়ে আসেন। তখনি শুনতে পান কৃশানের আশ্চর্য কথাবার্তা,
“ শ্বাশুড়ি আম্মাকে দুই গালে দুটো কষিয়ে থাপ্পড় দিন। যেন ঘরের প্রতিটি কোণায় থাপ্পড়ের আওয়াজ পৌঁছায়! ”
কৃশান আজ অব্দি কখনো মুরুব্বি দের উপর হাত তুলেনি। আর রেখা বেগম যেহেতু মা বয়সী নারী তার উপররে কোনোভাবেই হাত তুলতে না সে। কিন্তু এই মহিলাকে শায়েস্তা তো করতেই হবে। তাই এই পন্থা বেছে নেয়। ভদ্রলোক তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেছেন। স্ত্রীর পানে একবার চেয়ে একবার চাইলেন। যেখানে তিনি স্ত্রীর মুখের ওপর সামান্য কথাও বলতে পারেন না সেখানে থাপ্পড় মারবে? তিনি অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললেন,

“ কি বললে বাবা? বুঝতে পারলাম না। ”
“ বলেছি আপনার স্ত্রীর দুগালে কষিয়ে দুটো থাপ্পড় মারেন। হাতের ছাপ যেন অবশ্যই বসে। আর যদি না পারেন তাহলে আপনাকে পাশের ঘরের বিধবা রুজিনা আন্টির সাথে বিয়ে পড়িয়ে দিব। এতে অবশ্য আপনার ভালোই হবে? কি বলেন শ্বশুর আব্বা! ”
রেখা বেগম চোখ বড় বড় করে তাকান। মানে তার সামনে তার স্বামীর কথা বলছে এই ছেলে।
“ কি যা তা বলছো এসব তুমি! ”
“ যা তা নয় শ্বাশুড়ি আম্মা! আপনি জানেন আমি কথার খেলাপ করি না। আন্টির সাথে আমার আগেই কথা হয়েছে এখন কথা না শুনলে শুধু কাজ সম্পন্ন করব। মানুষজনের চিন্তা করবেন না, পুরো এলাকার ছেলে, ফেলে আছে। এক ডাক দিলেই পুরো আয়োজন সমেত বিয়ে সম্পন্ন করে যাবে। ”
চুপসে যান রেখা বেগম। তবে থাপ্পড় খেতেও রাজি নন তিনি। কৃশান সিরিয়াস, সে শ্বশুরের হাত ধরে সম্মানের সাথে। এগোতে এগোতে বলে,

“ চলেন শ্বশুর আব্বা, আপনাকে বিয়েটা তাহলে পড়িয়েই দিই। এতে করে এই মহিলার থেকে মুক্তিও পাবেন আপনি। রুজিনা আন্টি মানুষ ভালো! ”
“ এই ছেলে, এই! উনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তুমি? ”
কৃশান গ্রাহ্য করে না। রেখা বেগম তড়িৎ হস্তে এগিয়ে আসেন। এই ছেলেকে মোটেও হালকা ভাবে নেওয়া যাবেনা। তাই নিজেই পরাজয় বরণ করলেন,
“ আরে আরে থামো, অর্নার বাপ তুমি আমারে থাপ্পড় মারো সমস্যা নাই! ”
থেমে যায় কৃশান। ঘুরে তাকায় হাসিমুখে। ভদ্রলোকের হাত ছেড়ে ঠান্ডা কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ে,
“ নিন কাজ সম্পন্ন করুন শ্বশুর আব্বা! যেভাবে বলেছি সেভাবেই দিবেন কিন্তু। ”
কৃশানের কথায় স্ত্রীর দিকে তাকান তিনি। বিভ্রান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। পরপর শব্দ করে চড় বসান স্ত্রীর গালে। রেখা বেগম প্রায় নুয়ে পড়েছে।এর মাঝেই আরেক গালে থাবিয়ে চড় খেলেন। স্বামীর বলিষ্ঠ হাতে পরপর দুটো চড় খেয়ে মাথা সুদ্ধ ভনভন করছে তার। পাশের সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন তিনি। ততক্ষনে গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। কৃশানের মায়া হলো না। উল্টো শক্ত কণ্ঠে বলল,

“ আপনি যদি মহিলা না হতেন আজকে আপনার লাশ পুঁতে দিতাম আমি! ”
“ বাবা ও বুঝতে পারেনি। ক্ষমা করে দাও ওকে। ”
“ ঠিকমতো বউ শাসন করতে না পারলে আরেকবার এসে আপনাকে গনধোলাই খাওয়াব বলে দিলাম! মেরুদণ্ড হীন লোক! ”
কথা শেষ করেই গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করল কৃশান। ভদ্রলোক তার যাওযার পানে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নিজেও জানতেন না আজকের ব্যাপারে। হুমায়রা দের মতো সেও ক্ষণিক আগেই জেনেছি সব। অবশ্য জেনেও কাজ কি? তিনি তো আর স্ত্রীর সাথে পেরে উঠে না কখনোই। তাকে মানলে তো রেখা বেগম?

কৃশান ধীর পায়ে এসে কক্ষের সামনে দাঁড়ায়। ক্ষীণ স্বরে ডাকে,
“ অর্না, দরজাটা খুলো। ”
ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। একটু পর খট করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে অর্না। কৃশানকে দেখেই মুচকি হাসে। সালাম চুকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে। উত্তরে স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দেয় কৃশান। পরপর কথা না বাড়িয়ে স্থান ত্যাগ করে কিশোরী। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে কৃশান। হুমায়রা তখনো খাটের সাথে হেলান দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে কৃশান। এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে স্ত্রীর সামনে। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি বুঝাতে চায়। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে শীতল কন্ঠে ডাকে,
“ এই হুজুরনী…! ”
বহুদিন পর এই আকাঙ্ক্ষিত ডাকটি শুনে হৃদযের কার্নিশ ছুঁয়ে ভালোলাগার স্রোত বয়ে যায় হুমায়রার। তবে অভিমানের কাছে সেই ভালো লাগারা ঠাই মেলে না। ওভাবেই মুখ গুঁজে বসে রয় সে। এর মাঝেই ফের ভেসে আসে মানুষটার গলা,

“ রেডি হয়ে নে, চলে যাব আমরা। ”
“ আপনি কেন এখানে এসেছেন? ”
“ কেন আবার? আমার বউ নিতে…! ”
কিয়ৎক্ষণ নীরব রইল পরিবেশ। সময় নিয়ে ভেসে আসে রমণীর অভিমানী স্বর,
“ আমি কোথাও যাব না। ”
কৃশান ঠোঁট কামড়ে হাসল। অবলীলায় বলল,
“ না যাওযার কোনো অপশন তো নেই! হয় ইচ্ছাকৃত ভাবে রেডি হয়ে যেতে হবে। নয়তো আমার কোলে চড়ে…! ”
হুমায়রা আমলে নিল না কথাখানা। ঠায় বসে রইল। তখনি অকস্মাৎ তার দেহটা শূন্যে তুলে নিল কৃশান। মেয়েটা চমকায়, হকচকায়। তবে অভিমানে মুখ দিয়ে টু শব্দটি করে না। কৃশানের পা চলমান। ওভাবেই রেখা বেগমের কক্ষ হতে বসার রুমে উপস্থিত সকলের সামনে দিয়েই হুমায়রার রুমে এসে থামে সে। হাত আলগা করে কোল থেকে নামায় মেয়েটাকে। বলে,

“ বোরকা পড় তাড়াতাড়ি। নয়তো এভাবেই নিয়ে যাব কিন্তু। ”
হুমায়রার নাকের পাটা বারবার ফুলে ফুলে উঠছে। যেকোনো সময় অশ্রুরা বাঁধ ভেঙে ঢলে পড়বে বোধ হয়। সে বিরক্তি নিয়ে আলমারি খুলে। পরপর বোরকা পরে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নিজেকে পর্দায় আবৃত করে নেয়। কৃশান এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরতে নেয় ওমনিই পিছিয়ে যায় মেয়েটা। শান্ত দৃষ্টিতে সে দৃশ্য দেখে মানব। এরপর আর জোর করে না। পা বাড়ায় সামনের দিকে। হুমায়রাও চুপচাপ হেঁটে চলে পিছু পিছু।
বাইরে স্ট্যান্ড করা কৃশানের বাইকটা দেখতেই ভ্রূ কুঁচকে গেল হুমায়রার। আরেকবার যেই বন্ধুর বাইকটা নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিল সেই বাইকটাই এটা। মেয়েটার মনে প্রশ্ন জাগে,

“ এরমানে কি উনি এতদিন বন্ধুদের সাথে ছিল? ”
প্রশ্নটা মনের মধ্যেই চেপে রেখে দ্বিরুক্তি না করে বাইকে উঠে পড়ে। কৃশানকে না ধরে এক হাতে শক্ত করে বাইক ধরতে উদ্যত হয়। সেই দৃশ্য ভিউ মিররে লক্ষ্য করে তৎক্ষনাৎ হুমায়রার হাত খানা ধরে ফেলল কৃশান। পরপর নিজের কোমর জড়িয়ে ন্যায় সে হাত দিয়ে। মানুষটার শক্ত হাতের বাঁধন থেকে চেয়েও হাত ছাড়াতে পারেনা হুমায়রা। ব্যার্থ শ্বাস ফেলার মাঝেই শুনতে পায় একটা ভারী স্বর,
“ হাজার জেদ দেখাবি মেনে নেব তবে যেই জেদ তোর ক্ষতি ডেকে আনে সেই জেদ দেখাবি না দ্বিতীয়বার! কেননা তোর মাঝেই আমার আমিটা বেঁচে থাকি! নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে জানে মেরে ফেলব একদম..! ”
“ মাথায় টুপি পড়েছে শুধুই! ঘাড়ত্যাড়ামী এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে বখাটে পুরুষ! ”
মনে মনে বিড়বিড় করল হুমায়রা। অতঃপর ভিতরের জেদ দমিয়ে রেখে মুখে কুলুপ এঁটে চলল বাকি রাস্তা।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা জার্নির পর কুমিল্লা থেকে ঢাকার এই দীর্ঘ পথ শেষ করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাল কৃশান। উত্তরার একটি দোতলা বাড়ির গেইট পেড়িয়ে ঢুকল তার বাইকটি। বাড়িটা দেখতে বেশ সৌখিন। সাথে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ বাড়িটির ছাদ ছুঁয়েছে। চারপাশে জ্বলমান সোডিয়ামের কৃত্রিম আলোয় সেই দৃশ্য মুগ্ধ নয়নে দেখতে দেখতে বাইক থেকে নামল হুমায়রা। ভালোভাবে অচেনা জায়গাটার সর্বত্র নজর বুলাতে লাগল। এর মাঝেই বাইক পার্ক করে তার সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিল কৃশান। এবারও তাকে উপেক্ষা করল রমণী। মানুষটা বোধ হয় এরকম কিছুই আশা করেছিল তাই তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং পথ দেখিয়ে দিল। পথ অনুসরণ করে পা বাড়ায় সে। তবে সিঁড়ি অতিক্রম করতে যেয়ে বিপত্তি ঘটে। মাত্র দুটো সিঁড়ি পেড়িয়ে তিন নাম্বার সিঁড়িতে পা রাখতে নিবে তখনি বোরকার সাথে পা আটকে পড়তে নেয়। ওমনিই পাশ থেকে এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত এসে আঁকড়ে ধরে তার হেলে পড়তে নেওয়া শরীরটা কে। হুমায়রা বিরক্ত হয় নিজের প্রতি! খোদার দুনিয়ায় ঠিকমতো একটু রাগও দেখাতে পারে না বেচারি! সব ঝামেলা এসে আছড়ে পড়ে তার রাগের বিপক্ষে! প্রকৃতিও যেন মেনে নিতে পারছে না ওদের এই দুরত্ব।
মেয়েটা বিরক্তির শ্বাস ফেলে। নিজেকে ছাড়াতে নিবে এর আগেই কোনোরূপ কথাবার্তা হীন তাকে এবারও কোলে তুলে নেয় কৃশান। ছটফটিয়ে উঠে সে। রাগী স্বর কণ্ঠনালী ভেদ করে বাইরে বেরোনোর আগেই শুনতে পায় মানুষটার নিষেধাজ্ঞা,

“ হুশ, মানুষ আছে এখানে। ”
দোতলার সবগুলো রুম অতিক্রম করে একেবারে কর্নারের রুমে এসে থামল কৃশান। পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলতেই গটগট পায়ে অন্ধকার রুমেই ঢুকে পড়ল হুমায়রা। জানালার থাইগ্লাস খোলা থাকায়, হালকা রূপালী আলো এসে রুমে প্রবেশ করছে। সেই আলোয় রুমের মধ্যে শুধু একটা নরমাল খাট আবিষ্কার করল। বোরকা খুলে খাটের মাথায় রাখে সে। পরপর খিটখিটে মেজাজে বলে উঠে,
“ খোদার দুনিয়ায় আমার কোনো মূল্যই নেই বোধ হয়! যে যেভাবে পারবে আচরণ করবে। যখন ইচ্ছে কাছে টানবে যখন ইচ্ছে ছুঁড়ে ফেলবে। আমার কোনো ইচ্ছা, অনিচ্ছা নেই। সবার ইচ্ছে মতোই চলতে হয় আমাকে! আমাকে মানুষই মনে হয়না কারো! ”
বলতেই বলতেই বিছানার একপাশে বসে পূর্বের ন্যায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে দিল। সবকিছুই মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে কৃশান। পৃষ্ঠে কিছুই বলে না। দরজা লক করে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে স্ত্রীর নিকট। নিঃশব্দে পাশে বসে। হীমশীতল কণ্ঠে বলে,

“ তারপর..? ”
হুমায়রা প্রতিউত্তর করে না। ওভাবেই আরেকটু দূরে সরে বসে। কৃশানও এগিয়ে বসে। ফের একই স্বরে জানতে চায়,
“ কিরে বউ! চুপ হয়ে গেলি কেন? যত অভিযোগ অভিমান আছে ঝেড়ে ফেল আমি সবটুকু মেনে নিতে প্রস্তুত! ”
এবারও কোনোরূপ সাড়া মেলে না। বরং আগের মতোই দূরে সরে যায় রমণী। কৃশানও একই কান্ড ঘটায়। এভাবেই পেছাতে পেছাতে একেবারে খাটের অপর প্রান্তে চলে আসে দুজন। হুমায়রার সেদিকে খেয়াল নেই। হাঁটুতে মুখ গুঁজা বিদায় ব্যাপারটা বুঝতে সক্ষম হয়নি সে। মানুষটার সান্নিধ্যে কোনোকিছু না ভেবেই এবারও পিছিয়ে গেল। ওমনিই দেহ খানা বিছানার বাইরে পড়তে নিল। তৎক্ষনাৎ কৃশানের পুরুষালী হাত টান মেরে এদিকটায় নিয়ে আসে তাকে। কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটাকে শুইয়ে দিয়ে তার উপর আধশোয়া হয়! আকস্মিক ঘটনায় কিছুটা ভরকে যায় হুমায়রা। থতমত খাওয়া দৃষ্টিতে তাকায় মানুষটার পানে। তার প্রতিক্রিয়ায় দেখে না চাইতেও ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে কৃশান। বলে,

“ আরেকটু হলে এখন ফ্লোরে চিৎ হয়ে থাকতেন মহারানী! স্বামীর থেকে দূরত্ব বাড়ালে এমনি হয়! ”
এ পর্যায়ে এসে নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারল না হুমায়রা। রাগে, দুঃখে, শব্দহীন ডুকরে কেঁদে দিল। এই প্রথম হুমায়রাকে এভাবে সরাসরি কাঁদতে দেখল কৃশান। ছেলেটার মনে হলো ক্রন্দনরত অবস্থায় মেয়েটাকে আরো মাতাল করা সুন্দর লাগে। লালিত চোখ মুখ খিঁচে রাখা, উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে রেখেছে, ক্ষণে ক্ষণে নাকের পাটা ফুলে উঠছে – সবকিছু মিলিয়ে এক অন্যরকম মায়াবী লাগছে মেয়েটাকে। এর মাঝেই কান্নার গতি কমে হুমায়রার। অশ্রুসিক্ত নয়ন মেলে তাকায় সে। কান্নভেজা কণ্ঠেই থেমে থেমে বলে,
“ আপনি.. আপনি অনেক খারাপ। আমাকে কষ্ট দিতেই শুধু ভালো লাগে আপনার। এবারও বোধ হয় এজন্যই ফিরেছেন! আবারও একদিন বলা কওয়া ছাড়াই আমাকে ফেলে চলে যা………”

কথা শেষ করতে পারল না মেয়েটা। এর এক জোড়া শুকনো ঠোঁট এসে তার ঠোঁট জোড়া দখলে নিয়ে নিল। হুট করেই, একদম হুট করেই ঘটনাটা ঘটে গেল। সেকেন্ডের জন্য ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁপে উঠল রমণীর লতানো দেহখানা। জবান বন্ধ হলো নিমিষেই। স্বামীর খুঁচা খুঁচা দাঁড়ির স্পর্শ গাল ছুঁতেই হাতদ্বয় আপনা আপনি খামচে ধরল মানুষটার পিঠ। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুমায়রাকে ছেড়ে দিল কৃশান। পরপর কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুতপ্ত স্বরে বলল,
“ স্যরি বউ, আর কখনো ছেড়ে যাব না। এবারের মতো ক্ষমা করে দে এই অধমকে। কথা দিচ্ছি- এদেহে প্রাণ থাকতে আমার এই প্রাণপাখি টাকে আর কখনো দুঃখরা ছুঁতে পারবে না। ”
শান্ত হয়ে রয় হুমায়রা। কোনো প্রকার শব্দ করে না। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুকণা। ফের শুনতে পায় মানুষটার কাতর স্বর,

“ এই প্রাণপাখি…..? স্যরি তো রে কলিজাবউ! কথা বল না একটু? অস্থির লাগছে তো…! ”
“ পুরো ছমাস যে একবারও কথা বলেননি তখন অস্থির লাগেনি…? ”
মেয়েটার মুখের দিক পূর্ণদৃষ্টী নিক্ষেপ করে কৃশান। কিয়ৎক্ষণ তার টলমলে চোখে চেয়ে থেকে বলে,
“ তুই জানিস কতোটা অসহ্যরকম ছিল এই ছমাসের একেকটা দিন! ”
“ বলেছেন আমায়? খুঁজই তো নেননি আমার! ”

“ জীবন যে কতোটা কঠিন হতে পারে এই ছমাসে তা হারে হারে টের পেয়েছি আমি। প্রথম দুয়েক মাস পুরো ভবঘুরে হয়ে ছিলাম। কোনো কিছুর সাথেই খাপ খাইয়ে উঠতে পারছিলাম না। না ছিল কোনো কাজের অভিজ্ঞতা, না ছিল কোনো টাকা! ভালো কাজের সন্ধানে গেলেই টাকার প্রয়োজন। আর অন্যান্য কাজ আমার দ্বারা হয়ে উঠত না। তবুও এক প্রায় এক মাসের কাছাকাছি একটা মোবাইলের সৌরমে কাজ করেছিলাম। তবে কোনো টাকা মেলেনি। তারা কাজ শিখিয়েছে পরিবর্তে আমি কাজ করেছি। দুকানেই থেকেছি। এভাবেই এক মাস কেটে যেতে থাকে তবুও আমার বেতন ধরা হয়না। এইদিকে সবকিছু ম্যানেজ করে তোকে আনতে হলে আমার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকা প্রয়োজন। তাই এই কাজ ছেড়ে দেই। তারপর একটা গার্মেন্টস এ চাকরি হয়। সেখানে প্রথম প্রথম কাজ শেখাতে গিয়ে ঐখানকার লোকরা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করাতে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তুই তো চিনিসই আমায়! বেশিদিন সহ্য হয়নি এসব। একদিন ওদের মুখের উপর জবাব দিয়ে সেখান থেকেও চলে আসি। এভাবেই কোনোকিছুর সাথে নিজেকে মানাতে না পেরে পুরো দিশেহারা অবস্থা হয় আমার। থাকা, খাওয়ার চিন্তা তো আছেই। কয়েকটা ছেলের সাথে একটা ব্যাচেলর রুমে থাকতাম তবুও ভাড়া দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো। ঠিকমতো খাবারটাও মিলত না। অতঃপর একটা সময় পা রাখি আল্লাহর ঘরে। উনার কাছে সাহায্য চাইতে শুরু করি।

আলহামদুলিল্লাহ, একদিনের মধ্যেই একটা রেস্টুরেন্টে কাজ পেই। খাওয়া দাওয়া সেখানেই হতো। প্রতি সপ্তাহে তোর মামনির কাছে টাকা পাঠাতাম। এতকিছুর ভিড়েও সেটা কখনোই মিস করিনি। রাস্তাঘাটে হেল্পারের কাজ করে হলেও এখানে আসার পর থেকে সপ্তাহে সপ্তাহে সেই টাকা পাঠানো হতো। মাস শেষ হয়, তবে মাস শেষে তোর মামনির কাছে পাঠানো টাকা কেটে যে টাকা হাতে আসে সেটা দিয়ে রুম ভাড়া দিলেই টাকা শেষ! পুনরায় চিন্তায় পড়ে যাই! তবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা তখনো ছাড়িনি। এভাবেই চলে যায় আড়াই মাসের মতো। হঠাৎ করে একদিন আমার রুমে এসে উপস্থিত হয় আমার বন্ধুরা। আমার দুটো সিম ছিল। যে সিমের নাম্বার সবার কাছে ছিল সেটা বন্ধ করে রেখেছিলাম। ওরা কীভাবে আমাকে খুঁজে বের করেছে আমি আজও বলতে পারব না। ওরা আসার পর আমার ভবঘুরে জীবনের সমাপ্তি হয়।

চার বন্ধু মিলে অনেক চেষ্টার পর প্ল্যান করি ক্যাফে খুলার! তবে টাকা ছাড়া এটাও সম্ভব নয়। এবেলায় টাকা আমাকে আটকে রাখতে পারিনি কারণ আমার বন্ধুরা আমার সাথে ছিল। আমার অজান্তেই সাইফুল ওর বাইকটা বিক্রি করে দেয়, রবি ও অভি লোনের ব্যবস্থা করে এনে আমার হাতে টাকা ধরিয়ে দেয়। আমি হতবাক হয়ে থাকি বন্ধুদের কাণ্ডে। অবশেষে একদিন ক্যাফে খুলেই ফেলি এবং আল্লাহর রহমতে এক মাসের মধ্যেই সেই ক্যাফে ভালোই উন্নতি হয়। আস্তে আস্তে ক্যাফের অগ্রগতির সাথে সাথে লোন শেষ করে ফেলি। রবির সাহায্য নিয়ে সাইফুলের বাইকটাও ফিরিয়ে আনি। ভাগ্যিস যার কাছে বাইকটা বিক্রি করেছিল সেই ছেলেটা ভালো ছিল। তারপর এই রুমটা ভাড়া নেই, একটা খাট কিনি। ভেবেছিলাম, আরো কিছু কিনে এ মাস শেষেই তোকে নিয়ে আসব। তবে তোর মামনি এর আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলল! উনি যদি মহিলা না হতো আজকে উনাকে ঠিক খতম করে ফেলতাম আমি! ”

“ আপনি কি আগে থেকেই মামনির সম্পর্কে সব জানতেন? আর আপনি কি এখনো মারামারি করেন? ”
“ হুম, প্রথম যেদিন তোকে আনতে ওবাড়িতে গিয়েছিলাম সেদিনই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। পরে খবর নিয়ে সব জেনেছি! আর মারামারি এখন আর ভবিষ্যতে কি? আমার কলিজায় কেউ হাত দিলে তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব আমি। সেটা যখনি হোক! ”
পৃষ্ঠে খানেক নীরব থেকে। হুমায়রা অভিমানী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে,
“ মামনির সাথে তো আপনার যোগাযোগ ছিলই! তাহলে আমার সাথে কেন একবারও কথা বলেননি? ”
“ ওরে পাগলি রে! তোর সাথে কথা বললেই তুই কাঁদতি। পরিস্থিতি না বুঝেই আবদার ছুঁড়ে বসতি তোকে নিয়ে আসার। বলতি- পরিস্থিতি যেমনি হোক, তুই সব মানিয়ে নিবি। আমি জানি তুই মানাতে পারতি, তিন বেলা খাবার না পেলেও কিছু বলতি না। কিন্তু ঘরে ফিরে তোর অনাহারী মুখখানা দেখার সহ্যক্ষমতা আমার হয়নি। তখন আমি নিজেকে কীভাবে সামলাতাম বল? সবদিক ভেবেই আমি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। আর এতে কি শুধু তোরই কষ্ট হয়েছে? আমার হয়নি? ”

“ আপনার কষ্ট হলেই কি? আপনিতো সব কষ্ট সিগারেটের ধোঁয়ার সাথেই উড়িয়ে দেন! এমনকি গোটা আমি টাকেই! ”
“ তুই তো সিগারেটের থেকেও ভয়ানক নেশা রে প্রাণপাখি! তোকে ভুলানোর সাধ্যি কোনো নেশাতে আছে….! তুই নামক নেশাতে যে আমি চির আসক্ত! ”
একেকটা বাক্য মন জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ জাগায় হুমায়রার। ভিতরে দলা পাকায় ভালোলাগার অনুভূতিরা। এর মাঝেই ফের কর্ণপাত হয় মানুষটার গলা,
“ রাগ কমেছে মহারানী? ”
মেয়েটার দৃষ্টি এলোমেলো হয়। কৃশানের এমন সহজ স্বীকারোক্তিতে আড়ষ্ট বদন নুইয়ে নেয় তৎক্ষনাৎ। সেই দৃশ্য নিরীক্ষণ করে হাসে কৃশান। বলে,
“ আর হ্যাঁ, কেবল তোকে ছুঁবে বলে গত পাঁচ মাস যাবৎ এই ঠোঁট জোড়া কোনোরূপ অপবিত্র জিনিস ছুঁয়ে দেখেনি। সুতরাং এখন ঠোঁটের মালকিন কোনো বিরিখোর, নেশাখোর নয় একেবারে ভদ্র পুরুষ!
একটু থেমে বলে,

অতটাও ভালো হতে পারিনি, তুই হয়তো বা আলেম, হাফেজ অথবা হুজুর স্বামী চেয়েছিলি তবে ওসব হতে পারিনি। শুধুমাত্র নামাজটুকু পড়তে পারি আর বাকিসব নাহয় তুই শিখিয়ে দিস? চলবে তো? ”
অত্যধিক বিস্ময়ে অভিভূত হুমায়রা। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না তার। ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে। মিহি স্বরে বলে,
“ আপনাকে কে বলেছে আমি আলেম, হাফেজ, হুজুর জীবনসঙ্গী চেয়েছি? আমি সবসময় একজন দ্বীনদার স্বামী চেয়েছি। আপনাকে দিয়েই বেশ চলবে আমার! ”
কৃশান তৃপ্তিময় হাসে। ঠোঁট ছুঁয়ায় স্ত্রীর কপালে। পরপর গালে, নাকে, থুতনিতে, ঠোঁটে একে একে সমস্ত মুখশ্রী জুড়ে ভালোবাসার বর্ষণ বইয়ে দেয়। কানের কাছেও চুমু খায়। ফিসফিস করে বলে,
“ ভালোবাসি বউ, বড্ডো বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসি! ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪২

বলেই হুমায়রার হাত দুটো শক্ত করে মুঠোয় পুরে নেয়। পরপর মুখ ডুবিয়ে দেয় গলদেশে। মেয়েটা শিউরে উঠে। মুহূর্তেই মানুষটার ছুঁযায় ভিজে উঠে গ্রিবাদেশ। ভিতরে শুরু হয় তোলপাড়! হাপরের মতো উঠা নামা করতে থাকে বক্ষ। কৃশান থেমে নেই। ধীরে ধীরে হুমায়রার মাঝে আরো গভীরভাবে মত্ত হয়ে উঠে। গভীর হয় তার ছুঁয়া! সেই গভীরতা সামলাতে বেগ পোহাতে হয় হুমায়রাকে। একটা সময় পরম আবেশে সয়ে নেয় স্বামী নামক পুরুষটির উম্মাদনা। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দুফোঁটো সুখের নোনাজল! দেহের প্রতিটা অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ সিক্ত হয় প্রিয় পুরষের ভালোবাসার পরশে। অতঃপর রজনীর বুকে একত্র হয় দুটি দেহ! হৃদয় রঙিন হয় মিলনের মধুময় ছুঁয়ায়। লিখা হয় আরেকটি প্রেমের পবিত্র পূর্ণতা। যার নামকরণ করা হয়-
~হৃদয় রাঙানো প্রেম~

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৪

1 COMMENT

Comments are closed.