তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৮
আতিয়া আদিবা
দুপুরের মৃদু রোদটা তখন স্কাইলাইন ভিলার রাজকীয় বাগানে জেঁকে বসেছে। পাতাগুলো দুলছে অলস ভঙ্গিতে। সামাইরা সকাল থেকেই ছটফট করছিল। আজ তার মনের ভেতরে জমাট বাঁধা অন্ধকার। কোনোভাবেই সে অন্ধকার দূর করতে পারছিল না।
তার অবচেতন মনে বারবার কেবল একটি কথাই বাজছিল, গত রাতে শেহজাদ বাড়ি ফেরেনি।
দুপুর ঠিক দেড়টা। নিচে ড্রাইভওয়েতে মার্সিডিজের গর্জন শোনা গেল। সামাইরা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রেলিং ঘেঁষে সামান্য নিচের দিকে ঝুঁকল। দেখল গাড়ি থেকে শেহজাদ নেমেছে। শার্টের হাতা দুটো নিখুঁতভাবে গোটাতে গোটাতে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল।
তাকে দেখে কোনোক্রমেই বোঝার উপায় নেই যে গতরাতে এই মানুষটা এক বোতল হুইস্কির নেশায় মাতাল হয়ে সিগারেটের আগুনে নিজেকে মায়াহীন ভাবে পুড়িয়েছে।
সুফিয়া রহমান ছেলের অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। শেহজাদ ঘরের ভেতরে ঢুকেই মায়ের হাবভাব দেখে দ্রুত বলে উঠল,
-মা, ভীষণ খিদে পেয়েছে। চলো তো একসাথে খেতে বসি।
সুফিয়া সরু চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। খটকা লাগছে তার। তিনি জন্মদাত্রী। ছেলের মন খারাপের খবর ঠাহর করতে পারবেন না? তবে এই মুহুর্তে কথা বাড়াতে চাইলেন না। ছেলের সাথে খাবার টেবিলে বসলেন। সামাইরাকেও ডাকা হল।
ডাইনিং টেবিলে স্বাভাবিকভাবেই পাশাপাশি বসল ওরা। তবুও মাঝখানে এক অলিখিত নীরবতার দেয়াল। গৃহকর্মীরা এসে খাবারের সরঞ্জাম এগিয়ে দিচ্ছিল। খাবার পাতে তুলে দিচ্ছিল। গোটা ঘরে কেবলমাত্র থালা, বাটি, আর চামচের মৃদু ঠুনঠুন শব্দ।
শেহজাদ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ ধীরগতিতে খাচ্ছিল। সামাইরাও খাচ্ছে আর আঁড়চোখে শেহজাদকে পর্যপেক্ষণ করছে। ঠিক তখনই ঘটল এক ঘটনা।
শেহজাদ টেবিলের ওপর থেকে লবণের পাত্রটা নেওয়ার জন্য ডান হাত বাড়িয়ে দিল। থাই গ্লাস পেরিয়ে মৃদু
রোদের সরু আলো সরাসরি গিয়ে পড়ল শেহজাদের ফর্সা ফরআর্মের ওপর। সামাইরার প্রখর চোখজোড়াও সেখানে চুম্বকের মত আটকে গেল। পুরো শরীর এক ঝটকায় জমে বরফ হয়ে গেল।
শেহজাদের চামড়ার ওপর জ্বলজ্বল করছে একদম কাঁচা ফোস্কা। সিগারেটের ছ্যাঁকার ক্ষত নাকি? সামাইরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল! সে আর এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে পারল না।
খাওয়ার পর্ব কোনোমতে চুকিয়ে শেহজাদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার শরীরজুড়ে অসহনীয় যন্ত্রণা। তবুও সে স্বাভাবিক। যেন বাকি দশটা দিনের মতই আজকের দিনটা পার হচ্ছে তার। শেহজাদ সিঁড়ি বেয়ে নিজের বেডরুমের দিকে চলে গেল। সামাইরাও টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সমস্ত ইগো, জেদ ওই ক্ষতগুলো দেখে কেমন নড়বড়ে হয়ে গেছে।
যে মানুষটাকে সে দেহলোভী বলে সম্বোধন করে, তার শরীরের ক্ষতর বিপরীতে লুকিয়ে থাকা সত্যটা জানতেই সামাইরা ভেতরে ভেতরে পাগল হয়ে গেল।
সে প্রায় দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। শেহজাদ মাত্রই সন্তপর্ণে নিজের শার্টের বোতামগুলো খোলার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। সামাইরা আজ আর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করল না। সে ধড়াম করে দরজা খুলে দ্রুত পায়ে শেহজাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেহজাদের সেই ক্ষতবিক্ষত হাতটা খপ করে নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।
কাঁচা ক্ষতের ওপর সামাইরার নরম আঙুলের ছোঁয়া লাগা মাত্রই শেহজাদের পুরো শরীরটা শিউরে উঠল ব্যাথায়। তবুও তার মুখ থেকে কোনো আর্তনাদ বের হলো না। মুখমণ্ডল যৎসামান্য কুঁচকে গেল শুধু।
খুব কাছ থেকে সেই বীভৎস আর পুড়ে যাওয়া লালচে ফোস্কাগুলো দেখে সামাইরা আতঙ্কে এক ভয়ংকর চিৎকার দিতে চাইল,
-ওহ্ খোদা! আপনার হাতে এসব… এটা কীভাবে…
সামাইরা নিজের কথা শেষ করতে পারল না। তার মুখ থেকে চিৎকার বের হওয়া মাত্র শেহজাদ নিজের বাম হাতের চওড়া তালু দিয়ে সামাইরার ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে ধরল। তার শরীরের সেই চেনা তামাক আর পারফিউমের সুবাস সামাইরার নাকে আছড়ে পড়ল। শেহজাদ সামাইরাকে নিজের সামান্য কাছে টেনে নিল।তাদের নিঃশ্বাস তখন একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
শেহজাদ সামাইরার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিচু স্বরে বলল,
-শসসস.. চুপ। একদম চিৎকার করো না, সামাইরা।
-এসব কি করেছেন আপনি?
-আবার চিৎকার করছো? আমি চাই না মা এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু জানতে পারুক। উনি এমনিতেই অসুস্থ, এই ধকল কিন্তু নিতে পারবে না। এমনিই অনেক কিছু হয়েছে একদিনে!
সামাইরা এবার চুপ করে রইল। তবে শেহজাদের হাতের তালুর নিচে তার ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছিল। শেহজাদ ধীরে ধীরে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল ওর মুখের ওপর থেকে। সামাইরা জানতে চাইল,
-তবে বলুন আমাকে, এমনটা কীভাবে হলো? কেন করলেন নিজের সাথে এমন জঘন্য অবিচার? এই ক্ষতগুলো করে কি লাভ হল আপনার?
শেহজাদ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের শার্টের হাতাটা আবার নিচে নামিয়ে বোতামটা আটকে দিল। তার মুখে উদাসীন ভাব। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-কিছুই হয়নি আবার অনেক কিছুই হয়েছে। ইউ ওন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড, সামাইরা।
-এই ক্ষতগুলো কি পুড়িয়ে করেছেন?
-হুঁ। জাস্ট সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছি। এটা আমার জন্য নতুন কিছু নয়, আমি আগেও এমনটা করেছি।
– অসাধারণ! এই কাজের উপকারীতা শুনি?
-কোনো উপকারীতা নেই। আবার অপকারও নেই। এটা আমার কোপিং মেকানিজম। যখন ভেতরের ক্ষতগুলো বেশি চিৎকার করে, তখন বাইরের চামড়া পুড়িয়ে তাদের শান্ত করতে হয়। ইটস জাস্ট মাই ওয়ে অফ হিলিং।
এমন অদ্ভুত কথা শুনে সামাইরা অন্যসময় রেগে যেত। আজ ভিন্ন কিছু হল। সে নিজের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শেহজাদের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। প্রথমবারের মতো নিজের জেদের বর্মটা এক পাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-আমার ওই কথাগুলো বোধহয় আপনার বড্ড বেশি লেগেছে। আপনি কি আমার কথায় খুব বেশি কষ্ট পেয়েছেন?
শেহজাদ সামাইরার এই প্রথমবার দেখানো অধিকারবোধ বেশ উপভোগ করল। কিন্তু মুখে কোনো উত্তর দিল না। বরং নিজের বাম হাতটা তুলে কবজিতে থাকা দামী প্ল্যাটিনামের রোলেক্স ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। যেন সময় দেখাটা এই মুহূর্তে তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কাজ।
সামাইরা নিজের ভেতরের অপরাধবোধ তীব্র হল। সে পুনরায় বলল,
-আমি জানি, লাউটারব্রুনেনের বাগানে আমি বড্ড বেশি বলে ফেলেছিলাম। আসলে সুইজারল্যান্ডের ওই ঘটনার পর আমার নিজের মস্তিস্কও স্বাভাবিক ছিল না। আপনি নিজেও তখন নেশার ঘোরে ছিলেন, আমার ওভাবে রিয়াক্ট করা একদম উচিত হয়নি। আই অ্যাম রিয়েলি…
সামাইরা থেমে গেলো। ‘সরি’ শব্দটি তার উচ্চারণ করতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও চোখমুখ শক্ত করে এক ধাক্কায় বলে ফেলল,
-সরি।
শেহজাদ সামাইরার এই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা শুনে তার চোখের দিকে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল। সামাইরার মুখমণ্ডল ভাবলেশহীন। ক্ষমাটা আদৌও মন থেকে চেয়েছে কিনা কে জানে?
শেহজাদ এবারো নিশ্চুপ থেকে কেবলমাত্র নিজের চোখের ইশারায় সামাইরাকে আশ্বস্ত করল। যেন সে বলতে চাইল,
আমি তোমার চাইলেও রেগে থাকতে পারি না। ঘৃণা করতে পারি না। আবার ভালোবাসতেও পারছি না। নাকি ভালোবেসে ফেলেছি জানি না! এসব মিডল ক্লাস মেলোড্রামার প্রয়োজন নেই।
সামাইরা শেহজাদের নীরব সম্মতি পেয়ে নিজের ভেতরের ভারী ভাবটা কিছুটা লাঘব করতে পারল। সে এবার হাসার চেষ্টা করে বলল,
-আমার তরফ থেকে একটা অফার আছে আপনার জন্য।
শেহজাদ এবার নিজের ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে ফেলল। স্বভাববশত পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করতে করতে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
-কীসের অফার?
সামাইরা দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে কিছুটা সহজ হওয়ার ভংগিমায় বলল,
-দেখুন, এই স্কাইলাইন ভিলার একই ছাদের নিচে যখন আমাদের একসাথে থাকতেই হচ্ছে, তাহলে প্রতিদিন এমন যুদ্ধ আর ঝগড়া করে কী লাভ? আমাদের এই বৈবাহিক সম্পর্কের মেয়াদ বেশিদিন নয় তা আমরা দুজনেই জানি। তাহলে অন্তত যে কয়টা দিন আমি এই বাড়িতে আছি… আমরা না হয় বন্ধুর মতোই থাকি? সব ধরনের ঝুই ঝামেলা পেছনে ফেলে লেটস বি ফ্রেন্ডস?
শেহজাদ নিজের ঠোঁটের মাঝে সিগারেট চেপে ধরল। একটা দীর্ঘ ও গভীর টান দিল। ধোঁয়ার গাঢ় নীলচে কুণ্ডলী সামাইরার মুখের ওপর ভাসিয়ে দিয়ে পুরুষালি স্বরে বলল,
-আমি আমার কোনো বান্ধবীর সাথে কোনোদিনও সেসব করব না সামাইরা, যা আমি গতরাতে তোমার সাথে করেছি। নেভার।
শেহজাদের দুষ্ট হাসি চওড়া হল। অন্য সময় একথা শুনলে সামাইরার মুখ থেকে মিষ্টি হাসি এক পলকে উধাও হয়ে যেত। সে কঠিন গলায় বলত,
আপনি একজন অসভ্য মানুষ।
আজও বলেছে কিন্তু ভিন্নভাবে। সামাইরা নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ ভুলে হঠাৎ ফিঁক করে হেসে ফেলল। সে হাসতে হাসতেই নিজের মাথাটা সামান্য দুলিয়ে বলল,
-আপনি আস্ত একটা অসভ্য জানেন সেটা? একদম আনসিভিলাইজড!
-জানি।
-হুম। তার মানে, আপনার বোধহয় আমার সাথে বন্ধুত্ব করার বিন্দুমাত্র কোনো ইচ্ছা নেই।
শেহজাদ সিগারেটের ছাইটা অ্যাসট্রেতে ঝেড়ে ফেলে শান্ত গলায় বলল,
-ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই সামাইরা। কারণ তুমি আমার বান্ধবী নও। ইমপসিবল শি*ট!
তবে একটা কাজ করা যায়।
সামাইরা চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল,
-কী কাজ?
-তুমি বরংআমার ‘বউ’ হিসেবেই শেষ কটা দিন থেকে যাও।
সামাইরা একথা শুনে নিজের চোখ জোড়া পাকিয়ে ফেলল। তবে শেহজাদ তাকে সাথে সাথে আশ্বস্ত করে নিজের হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে হালকা মুচকি হেসে বলল,
-আরে চিল! স্বামীর কোনো অধিকার আমি তোমার ওপর খাটাতে আসব না, এবিষয়ে আগেই ক্লিয়ার করেছি সব। আবারোও কথা দিলাম। তুমি জাস্ট এই বাড়ির বউয়ের সম্মানটুকু নিয়ে ভালো থাকো। দ্যাটস ইট।
সামাইরা আবারো ফিঁক করে হেসে ফেলল। এভাবে ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ঝুলিয়ে, এত মিষ্টি করে সে আগে কোনোদিন হাসেনি। শেহজাদ পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সামাইরার এই অবাধ্য এলোমেলো চুল আর তার ঠোঁটের ওই স্বর্গীয় হাসি শেহজাদের এক মুহুর্তের জন্য নিস্পাপ বালকে পরিণত করল।
কোনো নারীর হাসি কি কোনো ছেলের বুক এভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে? শেহজাদ নিজের অবাধ্য মনটাকে পুনরায় প্রশ্ন করল। এই যে দিন দিন সে নিজের অজান্তেই সামাইরা বিনতে হকের প্রতি চরম আকারে দুর্বল হয়ে পড়ছে, এর শেষ কোথায়? সে কি সত্যিই এই মধ্যবিত্ত মেয়েটার প্রেমের নেশায় চিরতরে দেউলিয়া হয়ে যাবে?
শেহজাদ নিজের ভেতরের এই ব্যাকুলতা আড়াল করতে ল্যাপটপের ব্যাগটা কাধে তুলে অফিসরুমের দিকে যেতে চাইল। ঠিক তখনই সামাইরা পেছন থেকে আবার ডেকে উঠল। তার গলার স্বরে আজ এক অদ্ভুত মিষ্টতা।
-শুনুন মিস্টার অসভ্য! নিজেকে কোনোদিন আর এভাবে আগুনের ছ্যাঁকা দিয়ে কষ্ট দিয়েন না। এই বাড়ির বউ হিসেবে অনুরোধ করলাম প্রথম বারের মতো। অবশ্য অনুরোধ না রাখলেও সমস্যা নেই। আপনার শরীর আপনার ইচ্ছে!
কথাটি শেষ করেই সামাইরা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। একটা দীর্ঘ শাওয়ার নেবে সে।
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৭
শেহজাদ দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণেও তখন এক চিলতে হাসি। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
-ব্লাডি মিডল ক্লাস উইমেন! এমন কেন তুমি? উড়ে এসে আমার টাকার পাহাড়ে জুড়ে বসেছো। তাতেও হয় না? আমার মনটাকে এবার বশ করতে চাচ্ছো! আই রিয়েলি… রিয়েলি হেইট ইউ।
