Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৪

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৪

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৪
লাইরা আয়নাত

থিয়া-ঘটিত আকস্মিক ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। পুরো রয়্যাল ম্যানশনের আবহাওয়া আগে থেকেই এক অদৃশ্য বরফে ঢাকা। চারদিকে বলতে গেলে ডার্ক অরা বিরাজ করছে। এর মাঝেই আয়াজ আর ইনায়াতকে নিজের স্টাডি রুমে তলব করেন আয়াজের বাবা, বর্তমান আ্যাশ ফ্যামলির কিং। তার এই অপ্রত্যাশিত তলব মানেই নতুন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস। আর এবার তিনি যে রয়্যাল ডিক্রি জারি করলেন, তাতে দুজনেরই পায়ের তলার মাটি আসরে যাওয়ার উপক্রম। তিনি কোনো ভনিতা ছাড়াই একদম স্ট্রেটকাট জানিয়ে দেন রয়্যাল ব্লাডলাইনের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে আয়াজ আর ইনায়াতকে খুব জলদি একটি বেবি কনসিভ করতে হবে। সেই বেবি বয় হলে সে হবে ফিউচার ক্রাউন প্রিন্স, আর গার্ল হলে প্রিন্সেস। এই উত্তরাধিকারী পৃথিবীর আলো দেখার সাথে সাথেই আয়াজ অফিশিয়ালি কিং হিসেবে ক্রাউন গ্রহণ করবে, আর তার বাবা যাবেন অবসরে।

এই সাডেন শকে দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য পাথর হয়ে গিয়েছিল। কোনোমতে ফর্মালিটি মেইনটেইন করে মাথা নেড়ে তারা নিজেদের রুমে ফিরে আসে। আয়াজ ইনায়াতের দিকে একবারও না তাকিয়ে, বিরক্তিসঞ্চার করে নিজের এক্সপেনসিভ স্যুট জ্যাকেটটা খুলতে খুলতে সে সাফ জানিয়ে দেয়,
“লিসেন, আমি তোমাকে টাচ করব না। আর তোমার থেকে আমার কোনো বেবিও চাই না। সো ডোন্ট এক্সপেক্ট এনিথিং ফ্রম মি!”
কথাটা শুনে ইনায়াতের হিমমগ্ন মুখাবয়বে একরাশ তাচ্ছিল্য আর বিরক্তি ফুটে ওঠে। সে এক পা পিছিয়ে নিজের ফোল্ড করা হাত দুটো বুকের কাছে রেখে পালটা সারকাজম মেশানো গলায় বলে,
“আপনাকে টাচ করতে বলেছে কে? বেবিই তো লাগবে! যান, গিয়ে আপনাদের হাই-ক্লাস সোসাইটি থেকে আপনার লেভেলের কাউকে মিসেস বানিয়ে বেবি নিয়ে নিন। আমার সাথেই নিতে হবে, এমন তো কোনো হার্ড অ্যান্ড ফাস্ট রুল নেই।”

জ্যাকেটটা সোফার ওপর ছুড়ে মেরে আয়াজ এবার বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়ায়। তার চোখের দৃষ্টি এখন ইগলের মতো তীক্ষ্ণ ইনায়াতের দিকে তাক করা। চোয়াল শক্ত করে সে বলে,
“আমি বহু বিয়েতে বিলিভ করি না। আমি আগে তোমাকে ডিভোর্স দেব, তারপর নিজের চয়েসে কাউকে বিয়ে করব, আর তারপর বেবি নেব। ক্লিয়ার?”
ইনায়াত অতুলনীয় বিরক্তিতে একটা ডিপ ব্রেথ নিয়ে ফুস করে শ্বাস ছাড়ে। আয়াজের এই চাইল্ডিশ অথচ অ্যারোগেন্ট কথায় পাত্তা না দিয়ে সে তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ক্যাজুয়াল টোনে বলে,
“তো নিন না ভাই! কে আটকেছে আপনাকে? শুধু শুধু এই ইউজলেস টপিক নিয়ে কথা বলে আমার টাইম ওয়েস্ট করলেন।”

কথাটা শেষ করে ইনায়াত চলে যেতে নেয়, কিন্তু আয়াজ তাকে এক পা-ও এগোতে দেয় না। ইনায়াতের এই ‘ডোন্ট কেয়ার’ অ্যাটিটিউড তার ইগোতে মারাত্মক রুপে আঘাত করে। এক ঝটকায় খপ করে ইনায়াতের ডান হাতের কব্জিটা চেপে ধরে সে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একটানে ইনায়াতকে একদম নিজের বুকের কাছে টেনে আনে। দুজনের মাঝে এখন এক ইঞ্চিরও দূরত্ব নেই আয়াজের চওড়া, পেশিবহুল শক্ত বুকের সাথে ইনায়াতের শরীর প্রায় লেপ্টে আছে। আয়াজের উষ্ণ, রাগান্বিত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে ইনায়াতের মুখে। এই সাডেন ক্লোজনেসে ইনায়াত কিছুটা বিচলিতে হয়ে পড়ে। তাও এমন আকস্মিক অ্যাগ্রেশনেও ইনায়াত ঘাবড়ায় না, বরং শক্ত চোখে আয়াজের দিকে তাকায়। এত কাছ থেকে আয়াজকে সে এর আগে কখনো খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পায়নি। আজ প্রথমবার নোটিশ করে আয়াজের বাঁ ভ্রুতে একটা শার্প আইব্রো স্লিট করা, যা তার রাগি ফেসটাকে আরো ডেঞ্জারাস লুক দিচ্ছে। কপালে এসে পড়েছে মেসড আপ কার্টেন হেয়ারস্টাইলের কয়েকটা অবাধ্য চুল। তার গভীর চোখদুটোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।ইনায়াতের এই ভয়ডরহীন, বোল্ড আই-কন্ট্যাক্ট আয়াজকে শান্ত করার বদলে আরো ট্রিগার করে দেয়। সাধারণত তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কারো নেই, আর এই মেয়েটা কিনা বিন্দুমাত্র না কেঁপে তার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে! সে দাঁতে দাঁত চেপে, একদম ডেডলি গলায় ফিসফিস করে বলে,

“তোমার কিসের এত পাওয়ার, হ্যাঁ? এত ইগো, এত অ্যাটিটিউড, এত জেদ ঠিক কিসের ভিত্তিতে দেখাও তুমি?”
ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে একটা ওয়ান সাইডেড ডেভিলিশ স্মাইল ফুটে ওঠে। পরিস্থিতির ভয়ংকর রূপ দেখেও সে একদম রিল্যাক্সে অনাসক্ত গলায় জবাব দেয়,
“আমার তেজ, আমার জেদ, আমার ইগো এগুলোই আমার পাওয়ার।”
আয়াজ ক্ষিপ্ত হয়ে হিসহিস করে ওঠে,
“শাট আপ! আমাকে তোমার এই ফালতু ইগো দেখানোর ট্রাই করবে না। খবরদার!”
ইনায়াত এক ফোঁটাও না দমে আয়াজের চোখের সেই জ্বলন্ত আগুনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“আমার ইগো কারো বাপের কেনা প্রপার্টি নয়। আমি কাকে দেখাবো, আর কার থেকে লুকাবো দ্যাটস টোটালি মাই বিজনেস। মাইন্ড ইট!”

আয়াজের হাতের মুঠো এবার আরো শক্ত হয়। ইনায়াতের নাজুক কব্জিটা প্রায় পিষে ফেলার মতো ধরে সে তাচ্ছিল্যের এক বাঁকা হাসি হেসে বলে,
“নিজেকে খুব কুল ভাবো, তাই না? আমার মতো একজন রয়্যাল ব্লাড জুটল তোমার মতো এক সাধারণ স্লেভ-লাইক মেয়ের কপালে, তাও তোমার মধ্যে বিন্দুমাত্র গ্রেটফুলনেস নেই?”
“নো! একদমই নেই!”
আয়াজ কয়েক সেকেন্ড সাইলেন্ট থাকে। সে এক্সপেক্ট করেছিল ইনায়াত হয়তো আরো তর্ক করবে, নিজের পজিশন ডিফেন্ড করার চেষ্টা করবে। সত্যি বলতে সে চাইছে ইনায়াত তার সাথে আরো কথা বলুক, ফাইট ব্যাক করুক, তাকে চ্যালেঞ্জ করুক কিন্তু নিজের এই উইয়ার্ড চাওয়াটা আয়াজ নিজেও রিলাইজ করতে পারে না।
ইনায়াত এবার নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য জোরে মোচড় দেয়। কিন্তু আয়াজের হাতের মুঠো আরো টাইট হয়ে বসে,”

“স্টপ! হাত নড়াচড়া করবে না। আমার কথা এখনো ফিনিশ হয়নি।”
ইনায়াত ব্যঙ্গ করে বলে,
“কারো সাথে কথা বলতে হলে তার হাত এভাবে ফিজিক্যালি চেপে ধরতে হয়? এটাই কি আপনাদের রয়্যাল প্রোটোকল নাকি, ইওর হাইনেস?”
“তুমি কি আমার রয়্যালিটিকে ইনসাল্ট করার ট্রাই করছো?”
ইনায়াত বাঁকা হাসে “অবশ্যই না। কারণ যারা মানুষকে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অপমান করে, তারা পার্সোনালিটি-লেস। আর আমি অন্তত ওই চিপ কাতারে পড়ি না।”
কথাটা ডিরেক্টলি তীরের মতো বিঁধে যায় আয়াজের অহংকারে। সে চাপা, থ্রেটনিং গলায় বলে,
“তুমি কি কথাটা ঘুরিয়ে আমাকে বললে যে আমার পার্সোনালিটি নেই?”
“আমি আপনাকে ডিরেক্টলি বলতে যাব কেন? আমি তো স্পষ্টই বলেছি আমি কাদের মিন করেছি। এখন আপনি যদি নিজে থেকেই ওই কাতারে গিয়ে পড়েন, তাহলে আপনিও তাই। সিম্পল!”
বলে ইনায়াত আয়াজের হাতটা নিজের অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

“এবার হাতটা ছাড়লে বেটার হয়।”
কিন্তু আয়াজ হাত ধরে রাখে। জেদের বশে আগের মতোই শক্ত করে ধরে রাখে,
“ছাড়ব না। যতক্ষণ না আমার কথা শেষ হয়।”
ইনায়াতের মনে একবার তীব্র ইচ্ছে হয় আয়াজের সেনসিটিভ জায়গায় একটা সজোরে কিক মেরে নিজেকে এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে ছাড়িয়ে নিতে। কিন্তু সে নিজের ইমোশন শক্ত হাতে কন্ট্রোল করে। বেশি ফিজিক্যাল স্ট্রেন্থ দেখালে আয়াজ ডাউট করবে। আয়াজ বাইরে থেকে নিজেকে যতটা অ্যারোগেন্ট আর ইম্পালসিভ হিসেবে শো করে, ভেতর ভেতর সে যে কতটা ম্যানিপুলেটিভ আর ডিপ ওয়াটার ফিশ তা ইনায়াত খুব ভালো করেই টের পায়। তাই ইনায়াত ফিজিক্যাল ফাইট থামিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে।
“ফাইন। বলুন, আর কী পয়েন্ট বাকি আছে আপনার?”
আয়াজ এবার ইনায়াতের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই সমস্ত রাগ আর অ্যাগ্রেশন সরিয়ে একদম সিরিয়াস, রহস্যময় আর ইনটেন্স হয়ে যায়,
“তোমার বাবা ঠিক কী মোটিভে তোমাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন? তার আসল গেমপ্ল্যানটা কী সেটা আমাকে বলো।”
ইনায়াত আয়াজের চোখের দিকে তাকায়,

“বললে ট্রাস্ট করবেন না।”
“বলো। আমি করব।”
ইনায়াত ধীর কিন্তু ফার্ম গলায় বলে,
“দ্য ট্রুথ ইজ আমি সত্যিই জানি না তিনি কী স্বার্থে এই বিয়ে দিয়েছেন। তবে কোনো না কোনো হিডেন মোটিভ অবশ্যই আছে। মিস্টার ব্যারন ইভান তো আর নিজের কোনো সেলফিশ রিজন ছাড়া এক পা-ও ফেলেন না।”
আয়াজ কথাটা শুনেই নিজের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরও তীক্ষ্ণ করে বলে, “তোমার এই ওভাররেটেড ড্রামাটা এবার বন্ধ করো। আর আমাকে এক্সাক্ট সত্যিটা বলো।”
ইনায়াত কোনো তাড়াহুড়ো করে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনুভূতিশূন্য ভঙ্গিতে বলে, “আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম, বিশ্বাস করবেন না। তারপরও অযথাই কষ্ট দিলেন।”

কথাটা বলেই ইনায়াত একটা হেঁচকা টানে ওর শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চায়। কিন্তু আয়াজ এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। সে হাত তো ছাড়েই না, উল্টো আরও ডমিনেটিং ভঙ্গিতে, আরও শক্ত করে ইনায়াতকে নিজের দিকে টেনে নেয়। ইনায়াত বিন্দুমাত্র রিঅ্যাক্ট করে না, রেগেও যায় না। শুধু তার চোখের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে অনন্তশুদ্ধ বিতৃষ্ণা। বরফের মতো ঠান্ডা গলায় সে বলে, “আপনার যদি আমার এই হাতখানা এতোই পছন্দ হয়ে থাকে, জাস্ট একবার বলুন। আমি হাতটা শরীর থেকে আলাদা করেই দিয়ে দিচ্ছি আপনাকে। আপনি বরং সেটা এভাবেই ধরে রাখুন।”
ইনায়াতের এমন সাইকোপ্যাথিক উত্তর শুনে আয়াজ চট করে ওর হাত ছেড়ে দেয়। তার ইগোতে মারাত্মক আঘাত লাগে। তাচ্ছিল্য ভরা গলায় সে বলে, “গ্রেট! এখন নিজের হাত স্পেশালি স্যানিটাইজ করতে হবে আমাকে, তোমার মতো স্টুপিড মেয়ের হাত ধরেছি বলে!”

ইনায়াত ওর কথাটাকে জাস্ট বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে অন্যদিকে তাকায়। নিজের ব্ল্যাক ট্রাউজারের পকেট থেকে ফোনটা বের করে আনলক করতে করতে অবজ্ঞার সুরে সামনে যেতে যেতে বলে, “ড্রামার কোনো শেষ নেই! একদম ফ্রিতে টপ-নচ ওয়েব সিরিজ দেখতে পাচ্ছি।”
আয়াজ পেছন থেকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, “হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সে?”
ইনায়াত প্রশ্নটা শুনেও না শোনার ভান করে। সে নিজের ফোন স্ক্রল করতে করতে সোজা ব্যালকনির দিকে চলে যায়। আয়াজ খুব ভালো করেই বুঝতে পারে যে ইনায়াত ইচ্ছা করেই তাকে ইগনোর করছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এই মেয়েটা আসলে কী, হু নোজ!

পরের দিন,,,
ভার্সিটির অডিটোরিয়াম স্টাইলের ক্লাসরুম। ইনায়াত নিজের সিটের পাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে লেকচার দিচ্ছে স্বয়ং আয়াজ। তার মাঝে প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা কাজ করছে আজ। ক্লাসের মাঝখানে সে ইনায়াতকে একের পর এক এমন সব আউট-অফ-সিলেবাস আর কমপ্লেক্স প্রশ্ন করেছে, যা ইনায়াতের সাধ্যের একেবারেই বাইরে। ইনায়াতও কোনো এক্সকিউজ না দিয়ে স্ট্রেটকাট বলে দিয়েছে, “পারবো না, স্যার।”
“কেন পারবে না?”
“পারবো না, তাই পারবো না। আই অ্যাম সরি, স্যার।”

আর এই স্পর্ধার শাস্তি স্বরূপ সে তাকে পুরোটা ত্রিশ মিনিট ক্লাস জুড়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, সাথে ধরিয়ে দিয়েছেন সাতটা টাফ আর লেংথি অ্যাসাইনমেন্ট করে আনার জন্য। ইনায়াত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আয়াজের চোখে একটা ব্ল্যাক-ফ্রেমড স্টাইলিশ গ্লাস, পরনে একটা গাঢ় নীল রঙের স্লিম-ফিট শার্ট আর অফ-হোয়াইট কালারের প্যান্ট। লোকটাকে দেখতে মারাত্মক কুল আর অ্যারোগেন্ট লাগছে। কিন্তু এই লোকটা যে ভেতরে ভেতরে কত বড় একটা ডেভিল, সেটা ইনায়াত ছাড়া আর কে-ই বা জানে। অথচ ভার্সিটির মেজরিটি ফিমেল স্টুডেন্টদের ফার্স্ট ক্রাশ হয়ে বসে আছে সে। ইনায়াতের তো তার দিকে তাকাতেও লিটারেলি বমি আসে। সে আসলেই বোঝে না, মেয়েরা এসব ‘টক্সিক ম্যান’-দের মাঝে কী এমন পায় যে একেবারে হামলে পড়ে।
আয়াজ হঠাৎ পড়া থামিয়ে, মার্কারটা হাতে ঘুরিয়ে ইনায়াতের দিকে পয়েন্ট করে প্রশ্ন করে, “হেই ইউ! এতক্ষণ এক্সাক্টলি কী বিষয়ে লেকচার দিলাম, বলো তো?”

আয়াজ ভেবেছিল ইনায়াত পাজলড হয়ে যাবে, সবার সামনে হিউমিলিয়েট হবে। কিন্তু সে অত্যন্ত নিখুঁত আর কনফিডেন্টলি পুরো টপিকটা এক নিঃশ্বাসে এক্সপ্লেইন করে দেয়। ওকে শাস্তি দিয়ে এতক্ষণ আয়াজের ভেতরটায় বেশ একটা স্যাডিস্টিক শান্তি কাজ করছিল, কিন্তু ওর পারফেক্ট অ্যানসার শুনে ওর ইগোতে আবারও আঁচড় লাগে। ভেতরে ভেতরে অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে।
ক্লাস টাইম ওভার। স্টুডেন্টরা বের হতে শুরু করে। আজ ইনায়াতের বেস্ট ফ্রেন্ড এলিজা ক্লাসে আসেনি, তাই সে একা একাই নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে করিডোর পেরিয়ে মেইন গেটের দিকে এগোয়। গেটের সামনে আসতেই হঠাৎ দেখা হয়ে যায় ওর এক সিনিয়রের সাথে। ছেলেটাকে দেখলেই ইনায়াতের চরম বিরক্তি লাগে, একটা চিপ ভাইব আসে ওর কাছ থেকে। তারপরও সোশ্যাল কার্টেসি মেইনটেইন করে ইনায়াত ওর কথার উত্তর দেয়। ক্যাজুয়াল কিছু কথাবার্তা চলতে থাকে ওদের মাঝে।

ঠিক এমন সময় আয়াজ নিজের বিলাসবহুল স্পোর্টস কারটা নিয়ে ওদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা সজোরে ব্রেক কষে। টায়ারের তীক্ষ্ণ শব্দে সবাই সেদিকে তাকায়। এরপর মুহূর্তেই সে স্পিড বাড়িয়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার সময় গাড়ির কালো গ্লাস ভেদ করে তার শিকারি দৃষ্টিটা স্থির ছিল ইনায়াতের ওপর।
ইনায়াত এসব পাত্তা না দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসে। ওদিকে আয়াজ কিছুদূর গিয়ে রাস্তা ফাঁকা দেখে গাড়িটা সাইড করে থামিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। তার উদ্দেশ্য ইনায়াতকে লিফট দেওয়া নয়, বরং ওই সিনিয়রের সাথে ওর ইকুয়েশনটা কী, সেটা বোঝার চেষ্টা করা। আয়াজের ভেতরে কেমন যেন একটা চাপা, জ্বলন্ত রাগ কাজ করছে। যতই হোক, মেয়েটা লিগ্যালি তার ওয়াইফ! তার মিসেসের সাথে অন্য কোনো থার্ড ক্লাস ছেলে কেন এভাবে হেসে কথা বলবে? পরক্ষণেই আবার সে স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে ঘুষি মেরে নিজেকে সামলে নেয়, ড্যাম ইট! বলুক কথা, তাতে আমার কী? আই ডোন্ট কেয়ার!
সাইড মিররে চোখ পড়তেই সে দেখতে পায় ইনায়াত হেঁটে হেঁটে বেশ কিছুটা কাছাকাছি চলে এসেছে। সে ভেতর থেকেই গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা খুলে দিয়ে অত্যন্ত কমান্ডিং আর অথরিটেটিভ টোনে বলে, “গাড়িতে এসো।”

ইনায়াত গাড়ির খোলা দরজাটার দিকে একবার তাকায়। তারপর ঠাস করে দরজাটা আটকে দিয়ে একটা শান্ত অথচ তাচ্ছিল্য ভরা হাসি হাসে। “রয়্যালদের পাশে কমনর মানায় না, স্যার। আর আপনার এই গাড়িতে ওঠার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।”
কথাটা বাতাসে জাস্ট ছুঁড়ে দিয়েই ইনায়াত ঘুরে দাঁড়ায়। নিজের কনফিডেন্ট পদক্ষেপে একা সামনের দিকে হাঁটা ধরে সে। আয়াজের মতো একজন মানুষের সাথে একই গাড়িতে যাওয়ার ইন্টারেস্ট, মুড বা রুচি কোনোটাই তার নেই। লাইফের এই পর্যায়ে এসে এসব সস্তা ইমোশনাল ড্রামা টলারেট করার মতো টাইম আর এনার্জি কোনোটাই সে ওয়েস্ট করতে রাজি নয়। মাথার ভেতর এখন শুধু নেক্সট মুভ নিয়ে প্রফেশনাল ক্যালকুলেশন। কারেন্ট কেসটা অলরেডি সলভড। আগামীকাল থেকেই স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স MI6-এ তার, নাভিদ আর এলিজের নতুন জয়েনিং। আজ হেডকোয়ার্টারে ফাইনাল রিপোর্টিং সাবমিট করে রানিং প্রজেক্টটার পুরোপুরি ক্লোজড চ্যাপ্টার করতে হবে। এরপর নেক্সট কী ডেডলি মিশন অ্যাসাইন হয়, কার কমান্ডের আন্ডারে কাজ করতে হয় ব্রেইনের ভেতর চলা এই হাই-ভোল্টেজ থটসের মাঝখানে অন্য কোনো ইউজলেস জিনিসের স্পেস নেই। সত্যি বলতে, আয়াজের এই সব ফাউ ছাও কথা তার ব্রেইনে কোনো ইমপ্যাক্টই ফেলে না। ইনায়াত এতটাই ফোকাসড যে, সে মাঝেমধ্যে তো ভুলে যায় আয়াজ নামের এই পারসনটা অন পেপার তার লিগ্যাল হাজবেন্ড!

অন্যদিকে, ইনায়াতের এই আইস-কোল্ড ইগনোরেন্স আয়াজের মেল ইগোতে একদম পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে হিট করে। ওর এমন অবজ্ঞায় তীব্র ইনসাল্টেড ফিল করে রাগে ব্লাইন্ড হয়ে যায় আয়াজ। অপমানে তার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। রাফলি গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় আয়াজ। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথেই তার ভেতরের ডার্কনেস জেগে ওঠে। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন পিওর ডেস্ট্রাকশন আর সাইকোপ্যাথিক জেদ। উইন্ডশিল্ডের ভেতর দিয়ে সামনে হেঁটে যাওয়া ইনায়াতের ফিগারের দিকে তাকিয়ে তার টার্গেট ফিক্সড হয়ে যায় গাড়িটা ডিরেক্ট এক্সিলারেট করে ইনায়াতের শরীরের ওপর দিয়ে ড্রাইভ করা!

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৩

আজ এই অ্যারোগেন্ট মেয়েটাকে কবরে না পাঠানো পর্যন্ত তার ভেতরের প্রতিহিংসার আগুন কিছুতেই শান্ত হওয়ার নয়। পুরো লাইফেও কেউ তাকে এতটা হিউমিলিয়েট করার সাহস দেখায়নি, প্রতিনিয়ত যতটা অ্যাটিটিউড আর ইগনোরেন্স ইনায়াত তাকে দেখিয়ে চলেছে। স্টিয়ারিং হুইলটা এত শক্ত হাতে গ্রিপ করে যে আয়াজের হাতের রগগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে ওঠে,
“গেম ওভার, ইনায়াত! আজই হতে যাচ্ছে তোমার লাইফের লাস্ট ডে!”

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here