Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৫

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৫

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৫
লাইরা আয়নাত

ইনায়াত কে গাড়ির চাকায় পিষে ফেলার একটা ইচ্ছে কয়েক মুহূর্ত আগেই আয়াজকে গ্রাস করলেও, লাস্ট মোমেন্টে নিজেকে সামলে নেয় সে। দুজনের পথ বেঁকে যায় দুদিকে।
ঘড়ির কাঁটায় এখন ঠিক ছ’টা, সন্ধ্যা নেমেছে। আজ বাড়িতে এক গ্র্যান্ড ফ্যামিলি পার্টির আয়োজন। ইনায়াতকেও সেখানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবে আয়াজের ‘ওয়াইফ’ হিসেবে নয়, জাস্ট একজন নরমাল ‘গেস্ট’ হিসেবে। তবে আজকের এই পার্টি কেবলই একটা গেট-টুগেদার নয়, ইনায়াতের জন্য এটা একটা হাই-রিস্ক মিশন। আজ এই পার্টিতেই উপস্থিত হবে কিল্টন নামের এক বিজনেস টাইকুন, যার সফিস্টিকেটেড আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কুখ্যাত নারী পাচারকারী। জয়েনিংয়ের পরপরই ইনায়াত, নাভিদ আর এলিজ এই কিল্টনকে ধরার অ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছে। অবশ্য সাথে সিনিয়র অফিসাররাও আছেন, তারা পুরো মিশন গাইড আর লিড করবেন।

পার্টিতে যাওয়ার জিরো ইন্টারেস্ট ইনায়াতের, কিন্তু ডিউটি তো করতেই হবে। গায়ে একটা ওভারসাইজড জার্সি জড়িয়েই সে আনমনে রুমে পায়চারি করছে। অন্যদিকে, আয়াজ রেডি হচ্ছে নিজের পার্সোনাল চেঞ্জিং রুমে। রয়্যাল বিলংগিংস তার, রেডি হওয়ার জন্যও একশো জন মেইডের প্রয়োজন! পরিচারিকারা সব কিছু নিখুঁতভাবে এগিয়ে দিচ্ছে। ফাইনাল টাচ শেষে আয়াজ যখন চেঞ্জিং রুম থেকে বেরোয়, মেইডরা সাইলেন্টলি রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ইনায়াত জাস্ট একপলক তাকায় আয়াজের দিকে। অ্যাজ অলওয়েজ তার পরনে হাই-ক্লাস রয়্যাল অ্যাটায়ার। এক সেকেন্ডের ফ্র্যাকশন টাইম দেখেই ইনায়াত চোখ সরিয়ে নেয়। ইনায়াতকে এখনও আনরেডি দেখে আয়াজ ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কিছুটা ইরিটেটেড টোনে বলে ওঠে, “হেই ইউ! তুমি রেডি হবে না?”
ইনায়াত খুব শর্ট একটা রিপ্লাই দেয়, “হবো।”

“কখন হবে? সাড়ে ছ’টা বাজে, সাতটায় পার্টি স্টার্ট!”
“আমার চিন্তা আপনার না করলেও আই থিংক হবে।”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই ইনায়াত নিজের ড্রেসিং রুমের দিকে পা বাড়ায়। একবারও সে পেছন ফিরে তাকায় না। তাকালে হয়তো দেখতে পেত আয়াজের চোখে জ্বলতে থাকা একটা ডেডলি, ক্ষিপ্ত দৃষ্টি।
পার্টি স্টার্ট হয়ে যায়। একে একে ইনভাইটেড গেস্টরা উপস্থিত হচ্ছেন। নাভিদও ইনভাইটেড ছিল, সে এলিজাকে নিজের ‘ফেক গার্লফ্রেন্ড’ বানিয়ে বেশ স্মার্টলি পার্টিতে এন্ট্রি নিয়েছে। ক্রাউড এড়িয়ে ইনায়াত ধীরপায়ে এসে দাঁড়ায় গার্ডেনের এক কর্নারে। কারও স্পটলাইটে সে না এলেও, আয়াজের শার্প চোখ ঠিকই আটকে যায় তার ওপর। যেখানে পার্টির অন্যান্য মেয়েদের পরনে গ্ল্যামারাস সব শর্ট ড্রেস, সেখানে ইনায়াতের গায়ে জড়ানো একটা ব্ল্যাক লং স্ট্রেইট কুর্তি, সাথে হোয়াইট ওয়াইড-লেগ পালাজো আর কাঁধে সাদা নেটের দোপাট্টা। তার লালচে-কালো চুলগুলো আনটাইড অবস্থায় পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। রোবট মেয়েটাকে আজ এক অদ্ভুত সফ্ট ভাইব আর মায়ায় ঘিরে রেখেছে। হাতে ধরা ওয়াইনের গ্লাসে আলতো চুমুক দেয় আয়াজ, কিন্তু তার সাইড-আই লুক এক মুহূর্তের জন্যও সরে না ইনায়াতের ওপর থেকে। কেমন যেন একটা ঘোরে তাকিয়ে থাকে সে। ঠিক তখনই ওর বেস্ট ফ্রেন্ড থিও এসে দাঁড়ায় পাশে। আয়াজের এমন রোমান্টিক স্টেয়ারিং দেখে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী রে! কী দেখছিস ওভাবে?”

আয়াজের ঠোঁট থেকে আনমনেই বেরিয়ে আসে, “হুর!”
থিও তো রীতিমতো শকড, “অ্যাঁ! তুই এই দুনিয়ার বুকে হুর কোথায় পেলি?”
থিওর এই সারপ্রাইজিং রিঅ্যাকশনে আয়াজের ঘোর কেটে যায়। মুহূর্তে নিজেকে কন্ট্রোল করে নিয়ে হালকা হেসে সে ক্যাজুয়াল টোনে বলে, “আরে না, নাথিং! সামনে চল।”
কথাটা বলে থিওর কাঁধে হাত রেখে সে সামনে এগোতে নেয়। কিন্তু ব্রেইন সিগন্যাল না দিলেও, এক অদম্য ইচ্ছেয় তার ঘাড় যেন আপনাআপনিই টার্ন নেয় ইনায়াতের দিকে। আয়াজ মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে বসে, “হোয়াট’স রং উইথ মি? কী হচ্ছে আমার সাথে?”
ইনায়াত ধীর পায়ে এগিয়ে যায় নাভিদ আর এলিজার দিকে গিয়ে খুব সন্তর্পণে, ঠোঁটের কোণে মেকি হাসি ধরে রেখে সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, “কিরে, কিল্টন কি এসেছে?”
এলিজা শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার ভান করে ছোট করে মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ।”
নাভিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশের পরিস্থিতি একবার মেপে নেয়। তারপর নিচু স্বরে, কিন্তু বেশ কাঠখোট্টা গলায় বলে, “একটু পরেই ওরা প্রাইভেট লাউঞ্জে মিটিংয়ে বসবে, ডিল ফাইনাল করবে। তুই শুধু পুরো ব্যাপারটা নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে নিস। নো মিসটেকস, ইনায়াত।”

ইনায়াত আলতো করে নিজের ডান কানের দুলটায় হাত বোলায়। এটি নিছক কোনো এক্সপেন্সিভ গয়না নয়, হাই-এন্ড টেকনোলজিতে মোড়ানো নিখুঁত একটি স্পাই গ্যাজেট। সে স্মিত হেসে বলে, “রিলাক্স! আমি অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডার একদম পারফেক্টলি সেট করে নিয়েছি। দে ওন্ট ইভেন নো হোয়াট হিট দেম।”
নাভিদ সন্তুষ্ট হয়ে বলে, “ওকে, আমরা তাহলে ক্রাউডের সাথে মিশে অন্যদিকে মুভ করছি। তুই এদিকে চোখ রাখ।”
ইনায়াত হালকা মাথা নাড়ায়, “ওকে।”

নাভিদ আর এলিজা ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে যেতেই ইনায়াত সামনের দিকে পা বাড়ায়। তার অল্প দূরেই আয়াজ দাঁড়িয়ে আছে হাতে ক্রিস্টাল গ্লাস। চারপাশের এলিট অতিথিদের সাথে ক্যাজুয়াল কনভারসেশনে ব্যস্ত সে। ইনায়াত সচেতনভাবেই তাকে ইগনোর করে সামনে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই আয়াজের কাজিন এরিক এসে ওর পথ আটকায়। ঠোঁটে একটা চার্মিং, প্লেফুল হাসি ঝুলিয়ে এরিক হাত বাড়িয়ে দেয়, “এক্সকিউজ মি,! আমরা একটা গেম খেলছি। তুমি কি আমার পার্টনার হবে? আনফরচুনেটলি সবারই ফিমেল পার্টনার আছে, শুধু আমারই নেই।”
এমনিতেই চারপাশের এই সাসপেন্সফুল পরিবেশ, তার ওপর এরিকের এই অযাচিত অফার! ইনায়াতের খুবি বিরক্তি লাগে। তবুও কপালের ভাঁজ লুকিয়ে সে কৃত্রিম জড়তা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কিসের গেম?”
এরিক বেশ এক্সাইটেড হয়ে বলে, “আরে, মিস্টার কিল্টন আর উনার ওয়াইফ একটা স্পেশাল সাইকোলজিক্যাল গেম ডিজাইন করেছেন। আমরা জাস্ট রিয়েল লাইফে সেটা ট্রাই করব।”

কিল্টন! নামটা কানে যেতেই ইনায়াতের ভাবনায় একটা ক্লিক করে। এই তো সুযোগ! সরাসরি কিল্টনের সার্কেলে ইনপুট করার এটাই তো মোক্ষম সময়। সে ধীরে ধীরে এরিকের দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু এরিকের হাতটা স্পর্শ করার আগেই ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। চিলের মতো ছোঁ মেরে কেউ একজন ইনায়াতের হাতখানা নিজের শক্ত, উষ্ণ মুঠোয় বন্দি করে নেয়। আর সে কেউ না সে আয়াজ!
আয়াজ এরিকের দিকে তাকিয়ে বেশ ক্যাজুয়াল টোনে বলে, “আমিও তো খেলব এরিক। কিন্তু আমার পার্টনার পাব কই? ও তো আমার ওয়াইফ, ওকে আমিই নিয়ে যাব।”
বেচারা এরিক হতভম্ব হয়ে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কী হলো এটা? এদিকে আয়াজ ইনায়াতের হাত শক্ত করে ধরে সামনে এগোতে থাকে। ইনায়াতের এমনিতেই মেজাজ খারাপ, তার ওপর আয়াজের এই ওভার-পজেসিভ ড্রামা! সে আয়াজের দিকে একটা তীক্ষ্ণ, শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হিসহিস করে ওঠে, “আমার হাত ধরেছেন কেন আপনি? ছাড়ুন!”

আয়াজ চারদিকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয়, “কেন? আমি ধরলে কোনো প্রবলেম নাকি?”
ইনায়াত নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য লোকচক্ষুর আড়ালে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বলে, “হ্যাঁ, অফকোর্স প্রবলেম!”
আয়াজ এবার একটু ঝুঁকে আসে, তার গলার স্বর আরো নিচু, কিন্তু ধারালো, “আমি ধরলে প্রবলেম, আর আমার ভাই ধরলে কোনো প্রবলেম নেই? বাহ! হোয়াট আ লজিক! এখন চুপচাপ আমার সাথে চলো, এখানে কোনো সিন ক্রিয়েট করো না।”
ইনায়াতের তীব্র ইচ্ছে করছে আয়াজের শিনবোনে একটা সলিড কিক মারতে। কিন্তু এখন ইমোশনের চেয়ে লজিক আর প্রফেশনালিজম বেশি জরুরি। কিল্টনের কাছাকাছি পৌঁছানোটা প্রাইম টার্গেট। তাই সে রাগটা জোর করে গিলে ফেলে।
আয়াজ ওকে নিয়ে একটা রাউন্ড টেবিলের পাশে পাশাপাশি দুটো ভেলভেট চেয়ারে বসে পড়ে। ততক্ষণে গেম ওভার। তবুও সে ইনায়াতের হাত ছাড়ল না, বরং তাকে নিয়ে বসেই রইল। টেবিলের ঠিক অপর পাশেই বসা কিল্টন। লোকটার চোখেমুখে এক ধরনের ধূর্ততা। সে এক নজর ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে আয়াজকে প্রশ্ন করে, “প্রিন্স, ইনি কে? আগে তো কখনো দেখিনি।”

আয়াজ এক পলক ইনায়াতের দিকে তাকায়, তারপর কিল্টনের দিকে ফিরে উদাসীনভাবে বলে, “তেমন কেউ না। আমার অফিসের একজন স্টাফ। বেশ সিনিয়র আর কাজেও ভালো, তাই খেলায় তাকেই পার্টনার হিসেবে নিয়ে এলাম। এসে তো দেখি গেম ওভার।”
আয়াজের এমন চরম অবমাননাকর কথায় ইনায়াত বিন্দুমাত্র রিয়্যাক্ট করে না। এই ইনসাল্ট তার কাছে এখন ম্যাটার করে না, তার ফোকাস এখন অন্যখানে। সে বরং কিল্টনের দিকে তাকিয়ে একটা প্রফেশনাল, মেপে রাখা মুচকি হাসি দেয়, আর চোখের কোণে চারপাশটা স্ক্যান করতে থাকে নাভিদ আর এলিজা গেল কই? এই দুটোও আরেক যন্ত্রণা!
ইনায়াতের এই ডোন্ট কেয়ার অ্যাটিটিউড দেখে আয়াজ মনে মনে বেশ অবাক হয়। এই মেয়ে কি সিওর একটা রোবট? ওর হাসবেন্ড সবার সামনে ওকে জাস্ট ‘স্টাফ’ বলে পরিচয় করাচ্ছে, আর ওর কোনো পাত্তাই নেই!*
হঠাৎ আয়াজ ইনায়াতের কানের খুব কাছে ঝুঁকে আসে। আয়াজের দামি টম ফোর্ড পারফিউম আর ওর শরীরের একটা বুনো ঘ্রাণ তীব্রভাবে ধাক্কা মারে ইনায়াতের নাকে। আয়াজ ফিসফিস করে বলে, “এদিকে-ওদিকে না তাকিয়ে টেবিলে যারা বসে আছে, তাদের দিকে ফোকাস করো।”

ইনায়াত এবার আয়াজের কাঁধে আঙুল দিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয়। তারপর চাপা স্বরে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে, “ওদের সামনে তো আমাকে অফিসের স্টাফ বানালেন, এখন বস হয়ে স্টাফের ওপর এভাবে ঢলে পড়ছেন কেন? একটু ডিসটেন্স মেইনটেইন করুন মিস্টার আয়াজ, নয়তো মানুষ সন্দেহ করবে।”
আয়াজ ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে বলে, “করলে করুক। আমার এসবে কিচ্ছু যায় আসে না।”
ইনায়াত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “কিন্তু আমার খুব বিরক্ত লাগছে। আপনি একটু সরুন। আমার সাথে এতটা ক্লোজ হওয়ার কোনো দরকার নেই। আপনার এই সস্তা ড্রামা আমার অসহ্য লাগে।”
আয়াজ বাধ্য হয়েই কিছুটা সরে বসে। তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। মনে মনে সে ঠিক করে রাখে রুমে ফিরে এর হিসেব কড়ায়-গণ্ডায় চুকানো হবে। এই অহংকারী মেয়েটাকে আজ বুঝিয়ে ছাড়ব। এত বড় সাহস আমাকে অপমান করার!
আয়াজ সরে যেতেই ইনায়াত আবার কিল্টনের দিকে তাকায়। তার ডান কানের হীরের দুলটা মৃদু আলোয় একবার ঝিকমিক করে ওঠে। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একটা প্রচ্ছন্ন, ওয়ান সাইড ডেভিল স্মাইল!
মনে মনে সে এক ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞা করে, “আজই তোমার কেল্লা ফতে করা হবে মিস্টার কিল্টন। যা হাসার, এখনই হেসে নাও। দ্য গেম হ্যাজ জাস্ট বিগান।”
খুব সিক আমি যার জন্য গল্প দিতে পারি না কেম হয়েছে বলবেন অনেক যন্ত্রণা নিয়ে লিখা
রাত ঠিক দশটা।

ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে ইনায়াত। সারা দিনের ক্লান্তি পানির উষ্ণ ধারায় ধুয়ে গেছে। আজ তার মনটা বেশ ফুরফুরে, ভেতর প্রশান্তি কাজ করছে। কিল্টনের যাবতীয় কুকীর্তির বেশ কিছু অকাট্য ভিডিও প্রমাণ সে আজই সিনিয়রের হাতে তুলে দিয়েছে। আগামীকালের সকালটা কিল্টনের জন্য একটা দুঃস্বপ্ন হতে যাচ্ছে, সবার সামনে তাকে পুরোপুরি এক্সপোজ করা হবে এই চিন্তাটাই ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি এনে দেয়।
কিন্তু রুমে পা রাখতেই সেই তৃপ্তির রেশ নিমিষেই উবে যায়। চোখ যায় ঘরের এক কোণে রাখা সোফাটার দিকে। পুরো সোফাটা পানিতে ভিজে একেবারে জবুথবু হয়ে আছে, পানি চুইয়ে পড়ছে ফ্লোরে। আর ঠিক পাশেই, পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ। পরিস্থিতি বুঝতে ইনায়াতের এক মুহূর্তও লাগে না। আয়াজের এই ভান ধরা চেহারার পেছনে যে শয়তানিটা লুকিয়ে আছে, তা তার কাছে দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
ইনায়াত ধীর, মেপে মেপে ফেলা পায়ে সোফার দিকে এগিয়ে যায়। তার চেহারায় বিন্দুমাত্র রাগের বহিঃপ্রকাশ নেই, বরং শীতলতা। শান্ত, অথচ বরফের মতো ঠান্ডা গলায় সে প্রশ্ন করে, “সোফায় এত পানি এল কোথা থেকে?”
আয়াজ ভীষণ গা-ছাড়া ভাবে, যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে কাঁধ ঝাঁকায়। অত্যন্ত অবলীলায় মিথ্যে বলে, “আর বোলো না, আমি বসে পানি খাচ্ছিলাম, হঠাৎ হাত ফসকে গ্লাসটা পড়ে গেল। কী আর করা!”
ইনায়াত এক পলক তীক্ষ্ণ চোখে আয়াজের দিকে তাকায়। এই মিথ্যেটা এতই হাস্যকর যে তার রাগ হওয়ার বদলে প্রচণ্ড বিরক্তি লাগছে। এসব ছেলেমানুষি তাকে ক্লান্ত করে। তবু সে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে, কোনো রকম তর্ক না বাড়িয়ে একদম ছোট্ট করে শুধু বলে, “ওহ।”

ইনায়াতের এই নিস্পৃহ উত্তর শুনে আয়াজের তো রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়! এই মেয়ে কি আসলেই পাগল? সে তো চেয়েছিল ইনায়াতকে রাগিয়ে দিতে, শাস্তি দিতে। অথচ উল্টো আয়াজ নিজেই যেন নিজের পাতা ফাঁদে আটকে শায়েস্তা হয়ে যাচ্ছে। ইনায়াত এবার আয়াজের চোখের দিকে সরাসরি তাকায়। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও তীক্ষ্ণ, “আপনি তো বেশ জ্ঞানী-গুণী মানুষ! এবার আপনিই আপনার মেধা খাটিয়ে ঠিক করুন আমি কোথায় ঘুমাবো? যেহেতু সোফাটা আপনি নিজের হাতেই নষ্ট করেছেন।”
আয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সে একটু ভাবে। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে, “ওকে, যখন সিদ্ধান্তটা আমার ওপরই ছেড়ে দিলে, তাহলে চলো বেডেই ঘুমাই। বিশাল খাট, তুমি একপাশে থাকবে, আর আমি অন্যপাশে। ডিল?”
কিছুক্ষণ পর।

ঘরের আলো স্তিমিত হয়ে আছে বিশাল বিছানায় দুজনে শুয়ে আছে। একপাশে আয়াজ, অন্য একেবারে শেষ প্রান্তে ইনায়াত। ইনায়াত প্রথমে এই প্রস্তাবে আপত্তি করলেও শেষমেশ যুক্তির কাছে হার মেনেছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, আয়াজ যতই হেনতেন করুক না কেন, সে অন্তত তার সুযোগ নেওয়ার কোনো হীন চেষ্টা করবে না।
আয়াজের পরনে শুধু একটা স্লিপিং শর্টস। তার পুরুষালী পারফেক্ট শরীরের ওপরের অংশ সম্পূর্ণ অনাবৃত। সে উপুড় হয়ে, হাত-পা ছড়িয়ে একেবারে বেসামাল ভঙ্গিতে শুয়ে আছে; ঘুমানোর সময় তার এই এক অদ্ভুত আর ছন্নছাড়া অভ্যাস। কিন্তু ইনায়াতের ভেতরে প্রচণ্ড অস্বস্তি কাজ করছে। যতই তাদের মধ্যে একটা নীরব বোঝাপড়া থাকুক, সে একজন নারী, আর আয়াজ তার ঠিক পাশেই এভাবে নির্লজ্জের মতো, প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় শুয়ে আছে! ইনায়াত বাধ্য হয়ে একটা ভারী কাঁথা দিয়ে নিজেকে গলা অব্দি ভালো করে ঢেকে, একদম আড়ষ্ট হয়ে সোজা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে। তার শ্বাস-প্রশ্বাসও একটু ভারী হয়ে আসছে।
ইনায়াতের এই আড়ষ্টতা আয়াজের নজর এড়ায় না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে, এক হাত মাথার নিচে দিয়ে ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে একটু খোঁচা দেওয়ার সুরেই জিজ্ঞেস করে, “কী হলো? এভাবে কাঠের পুতুলের মতো শুয়ে আছ কেন? ঘুমাচ্ছো না কেন?”

ইনায়াত চোখ না নামিয়ে, দৃষ্টি সিলিংয়েই স্থির রেখে অত্যন্ত কাঠখোট্টা গলায় উত্তর দেয়, “আপনি এভাবে অর্ধনগ্ন হয়ে শুয়ে আছেন। এই অবস্থায় আমার অস্বস্তি হচ্ছে।”
কথাটা শোনা মাত্রই আয়াজের ঠোঁটে এক শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। অন্ধকারের মধ্যেও সেই হাসির ঝলক টের পাওয়া যায়। সে দুষ্টুমি আর উস্কানিমূলক সুরে বলে ওঠে, “তাই নাকি? তোমাকে আরও একটু অস্বস্তিতে ফেলতে… তুমি চাইলে আমি শর্টসটাও সরিয়ে দিতে পারি! কী বলো?”

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৪

কথাটা শেষ হতে না হতেই ইনায়াত স্প্রিংয়ের মতো এক লাফে বিছানা থেকে উঠে বসে। তার চোখেমুখে বিরক্তি আর ক্ষোভের মিশেল। দ্বিতীয় কোনো বাক্যব্যয় না করে, আয়াজের দিকে আর একবারও না তাকিয়ে সে নিজের বালিশ আর কাঁথাটা টেনে নেয়। তারপর গটগট করে হেঁটে গিয়ে সোজা সেই ভিজে, স্যাঁতসেঁতে সোফাতেই শুয়ে পড়ে।
বিছানায় একা শুয়ে আয়াজ তো রীতিমতো থতমত খেয়ে যায়! সে শূন্য দৃষ্টিতে ভিজে সোফায় শুয়ে থাকা ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তো একটু মজা করছিল, পরিস্থিতিটা হালকা করতে চেয়েছিল। আর তাতেই মেয়েটা এমন ফায়ার হয়ে গেল! নিজের রসিকতায় এখন নিজেই বোকা বনে গেছে আয়াজ।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here