Mad for you 2 part 14
তানিয়া খাতুন
হাসপাতালের কেবিনে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আছে।
সাদা দেয়াল, ওষুধের তীব্র গন্ধ আর মাথার উপরের মৃদু আলো—সব মিলিয়ে পরিবেশটা আরও ভারী লাগছে।
কেবিনের মাঝখানে রাখা বেডে গম্ভীর মুখে বসে আছেন রুহির আব্বু।
তার ডান পায়ে মোটা ব্যান্ডেজ করা।
মাঝে মাঝেই ব্যথায় পুরো পা টনটন করে উঠছে, কিন্তু তবুও মুখে কোনো কষ্টের ছাপ প্রকাশ করছেন না তিনি।
বরং চোয়াল শক্ত করে বসে আছেন।
যেন ব্যথার চেয়েও তার অহংকারে বেশি আঘাত লেগেছে।
পাশেই উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন রুহির আম্মু।
তিনি বারবার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন।
মুখের অস্বাভাবিক শক্ত ভাবটা দেখেই বুঝতে পারছেন—ব্যথা যথেষ্টই হচ্ছে।
তবুও লোকটা স্বীকার করবেন না।
অবশেষে তিনি ধীরে গলায় আবার জিজ্ঞেস করলেন—
“খুব ব্যথা করছে?”
রুহির আব্বু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।
“না।”
কিন্তু সেই “না”-এর সাথে সাথে তার কপাল কুঁচকে উঠল।
রুহির আম্মু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তিনি খুব ভালো করেই জানেন—লোকটা যতই শক্ত সাজুক, ব্যথায় ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছেন।
আর সেই সাথে রাগে জ্বলছেনও।
কারণ এই পুরো ঘটনার পেছনে কার হাত আছে, সেটা বুঝতে তার বাকি নেই।
ঘটনাটা মনে পড়তেই রুহির আব্বুর মুখ আরও কালো হয়ে গেল।
আজ সকালে তিনি নিজের রুমে বসে newspaper পড়ছিলেন।
বাড়ি তখন অস্বাভাবিক শান্ত।
হঠাৎ দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় কুটুশ।
তার মুখে অদ্ভুত রহস্যময় হাসি।
চোখ দুটো চকচক করছে।
“আব্বু…”
সে অত্যন্ত ভদ্র গলায় ডাকে।
রুহির আব্বু newspaper নামালেন না।
শুধু গম্ভীর গলায় বললেন—
“কি হয়েছে?”
কুটুশ তখন ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে ঢুকল।
তার কোলে বসে আছে কোকো।
কোকোকে দেখেই রুহির আব্বুর মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে উঠল।
তিনি কুকুর এমনিতেই সহ্য করতে পারেন না।
তার উপর এটা আবার ক্ৰিশের কুকুর!
এই বাড়িতে ক্ৰিশের কোনো জিনিস দেখলেই এখন তার রক্তচাপ বেড়ে যায়।
কুটুশ অবশ্য নির্বিকার।
সে কোকো কে আরও আদর করতে করতে রুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল।
তারপর নিষ্পাপ গলায় বলল—
“আব্বু, কোকো তোমার সাথে খেলবে।”
রুহির আব্বু পেপার নামিয়ে বিরক্ত চোখে তাকালেন।
“এটাকে বাইরে নিয়ে যাও।”
কিন্তু কুটুশ যেন কথাটাই শুনল না।
সে খুব দ্রুত কোকোকে মেঝেতে নামিয়ে দিয়ে বলল—
“একটু থাকো, আমি আসছি!”
তারপর দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রুহির আব্বু কিছু বোঝার আগেই—
“ঠাস!”
বাইরে থেকে দরজা লক হওয়ার শব্দ হলো।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালেন।
“এই! কুটুশ!”
বাইরে থেকে তখন কুটুশের চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কোকো ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
রুহির আব্বুর মুখ শুকিয়ে গেল।
“এই… এই দূরে যা!”
তিনি তাড়াহুড়ো করে পাশে রাখা চিরুনি ছুঁড়ে মারলেন কোকোর দিকে।
চিরুনিটা গিয়ে লাগল কোকোর গায়ে।
ব্যাস।
বেচারা কোকো অপমানিত হয়ে গেল।
সে মুহূর্তেই “ঘেউউউ!” করে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন রুহির আব্বু।
কোকো একবার না—
তিন তিনবার তার ডান পায়ে কামড় বসিয়েছে।
তিনি রুমের ভেতর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন আর কোকো পিছনে পিছনে ঘেউ ঘেউ করছে।
বাইরে তখন রুহির আম্মু আর কাজের লোকজন আতঙ্কে দরজা ধাক্কাচ্ছে।
“কি হয়েছে?”
“দরজা খোলেন!”
শেষ পর্যন্ত দরজা খুলে যখন সবাই ভেতরে ঢুকল, তখন রুহির আব্বুর অবস্থা একেবারে করুণ।
পায়ে রক্ত।
মুখ রাগে লাল।
আর কোকো দূরে দাঁড়িয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে লেজ নাড়ছে।
ঘটনাটা মনে পড়তেই হাসপাতালের বেডেক বসে রুহির আব্বু দাঁতে দাঁত চেপে ফেললেন।
মনে মনে হাজারটা গালি দিলেন ক্ৰিশকে।
“ভাগ্য করে একটা জামাই পেয়েছি!”
রুহির আম্মু বলেন—
“আমি আগেই বলেছিলাম, ওই ছেলের সাথে বেশি লাগতে যেও না…”
রুহির আব্বু সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত গলায় বলেন—
“আমি লাগতে গেছি? ওই শয়তান আমার সাথে লাগছে!”
কথাটা বলতেই তার পা আবার ব্যথায় টনটন করে উঠল।
তিনি মুখ শক্ত করে ব্যথা চেপে রাখলেন।
ছাদের এক কোণায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে রুহি।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
আকাশজুড়ে হালকা কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে তার খোলা চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে।
কিন্তু সেদিকে রুহির কোনো খেয়াল নেই।
তার দৃষ্টি বারবার রাস্তার দিকেই চলে যাচ্ছে।
তার আব্বু-আম্মু আসবে , তাই সে অধীর আগ্ৰহে অপেক্ষা করছে।
তার থেকে কিছুটা দূরে কুটুশ কোকোকে নিয়ে খেলছে।
কখনো দৌড়াচ্ছে, কখনো কোকোর সাথে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
আর কোকোও লেজ নেড়ে আনন্দে ঘেউ ঘেউ করছে।
হঠাৎ—
পেছন থেকে শক্ত দুটো হাত এসে জড়িয়ে ধরল রুহিকে।
রুহি চমকে উঠল।
পরের মুহূর্তেই অনুভব করল ক্ৰিশের উষ্ণ শরীর তার পিঠের সাথে মিশে গেছে।
ক্ৰিশ তার সরু কোমর জড়িয়ে আরও কাছে টেনে নিল।
তার গরম নিঃশ্বাস এসে লাগল রুহির ঘাড়ে।
রুহির পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে বলে—
“কি করছেন! কুটুশ আছে…”
ক্ৰিশ যেন কথাটার কোনো গুরুত্বই দিল না।
বরং আরও একটু ঝুঁকে রুহির ঘাড়ে মুখ গুঁজে নিচু গলায় বলে—
“রুমে চলো… কথা আছে।”
রুহি বিরক্ত হয়ে তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
“আপনার কোনো কাজ নেই? সব সময় আমার পিছনেই ঘোরেন কেন?”
ক্ৰিশ মৃদু হেসে রুহির ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
তারপর ভারী গলায় ফিসফিস করে বলে—
“ভ্রমর মধু খাওয়ার জন্য ফুলের উপর বসবে—এটাই স্বাভাবিক…”
তারপর আরও কাছে টেনে নিয়ে বলে—
“এখন এটা বলো না, লেদু…সোনা যে তুমি এনজয় করো না something something”
রুহির বুক ধড়ফড় করে উঠল।
সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই— “জিজুউউ!”
দৌড়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল কুটুশ।
তার মুখে দুষ্টু হাসি।
“জিজু something something…”
ক্ৰিশ দাঁত বের করে হাসল।
“কুটুশ, তুমি এখানে খেলো। আমি একটু তোমার আপুর সাথে খেলে আসি, কেমন?”
কুটুশ একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
“ওক্কে জিজু!”
রুহি লজ্জা আর বিরক্তিতে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“কুটুশ……..!”
কিন্তু ততক্ষণে ক্ৰিশ হঠাৎ করেই তাকে কোলে তুলে নিয়েছে।
রুহি চমকে উঠে ছটফট করতে লাগল।
“ছাড়ুন! কি করছেন!”
ক্ৰিশ নির্বিকার।
সে রুহিকে শক্ত করে ধরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
তারপর রুহির কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে—
“আমার ভেতরটা পুড়ছে, butterfly…”
তার কণ্ঠটা অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল।
“আজ আর ছাড়ছি না…”
রুহিকে কোলে করেই রুমে নিয়ে এলো ক্ৰিশ।
দরজা পা দিয়ে ঠেলে বন্ধ করতেই রুম জুড়ে ভারী নীরবতা নেমে এলো।
পরের মুহূর্তেই ক্ৰিশ রুহিকে ছুড়ে বিছানার উপর ফেলে দিল।
নরম গদির উপর পড়তেই রুহির বুক ধক করে উঠল।
সে আতঙ্কিত চোখে ক্ৰিশের দিকে তাকিয়ে দ্রুত একটু পিছিয়ে গেল।
তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠছে।
কারণ আগের রাতের প্রতিটা মুহূর্ত এখনো তার শরীরে স্পষ্ট হয়ে আছে।
প্রথমে ক্ৰিশের স্পর্শগুলো নরম ছিল।
অদ্ভুত যত্নে ভরা।
কিন্তু ধীরে ধীরে লোকটা যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।
তার স্পর্শ, তার আদর—সবকিছু ঝড়ের মতো তীব্র হয়ে উঠেছিল।
আর সেই স্মৃতি মনে পড়তেই রুহির পুরো শরীর আবার কেঁপে উঠল।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে বিছানায় উঠল।
তারপর দুই হাত রুহির দুপাশে রেখে ঝুঁকে এলো।
তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক গভীর লাগছে।
মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো অদৃশ্য আগুন জ্বলছে।
সে নিচু, কর্কশ গলায় ফিসফিস করে বলে—
“কি আছে তোর মধ্যে এত?”
ক্ৰিশ আরও ঝুঁকে এলো।
তার গরম নিঃশ্বাস এসে লাগল রুহির মুখে।
“কেন এত টানিস আমায়?”
তার কণ্ঠে এবার অদ্ভুত ক্লান্তি মিশে গেল।
“তোকে দেখলেই আমি control হারিয়ে ফেলি…”
নিজেকে দিশেহারা লাগে বড্ড…..মনে হয় তোকে বুকের মধ্যে জাপ্টে ধরে রাখি।
রুহি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
ক্ৰিশের মতো মানুষের মুখে এমন কথা সে কখনো শোনেনি।
লোকটা সবসময় জোর করে।
আদেশ দেয়।
ভয় দেখায়।
কিন্তু এই মুহূর্তে তার কণ্ঠে অন্যরকম কিছু আছে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে রুহির গালে হাত রাখল।
আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার ঠোঁট।
“বিশ্বাস কর…যদি তুই কষ্ট না পেতিস…”
সে থামল।
চোখ সরু করে গভীরভাবে তাকাল রুহির দিকে।
“তাহলে প্রতি ঘণ্টায় তোকে আদরে ভরিয়ে দিতাম।”
কথাটা শুনে রুহির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
তার পুরো মুখ লাল হয়ে উঠল।
মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল।
“প্রতি ঘণ্টায়?”
মানুষ এসবও বলে?
এসবও করে?
লজ্জা, বিস্ময় আর অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তার বুক কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে রুহির আম্মুর গলা ভেসে এলো—
“রুহি মা! একবার এদিকে আয়!”
মুহূর্তের মধ্যে ক্ৰিশের মুখ গোমড়া হয়ে গেল।
সে বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।
তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তার পুরো mood নষ্ট হয়ে গেছে।
রুহি লজ্জায় তাড়াতাড়ি উঠে বসল।
ক্ৰিশ বিরক্ত মুখে চুলে হাত চালিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
তারপর নিচু গলায় বিড়বিড় করে বলে—
“এই বাড়িতে privacy বলে কিছু নেই…”
রুহি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল।
ক্ৰিশ সেটা দেখেই চোখ সরু করল।
তারপর হঠাৎ আবার ঝুঁকে এসে রুহির থুতনি ধরে বলে—
“হাসছিস কেন?”
রুহি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।
“না তো…”
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচু, ভারী গলায় বলে—
“আমরা আজ রাতেই বাড়ি ফিরব, butterfly…”
তার চোখে আবার সেই তীব্র দৃষ্টি ফুটে উঠল।
“আমার আর ধৈর্য নেই…”
রাতের রাস্তা চিরে ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে ক্ৰিশ। মাথার ভেতর যেন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, মুখজুড়ে কঠিন আর ভয়ংকর এক নীরবতা।
সে রুহিকে নিয়ে আজ রাতেই বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল।
কারণ একান্তে রুহিকে নিজের কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে ভেতর থেকে অস্থির করে তুলেছিল।
কিন্তু রুহি রাজি হয়নি।
উল্টো কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলেছিল,
Mad for you 2 part 13
— “আমি আজ ফিরবো না… সকালে যাবো…”
এই কথাটুকুই যেন ক্ৰিশের ধৈর্যের শেষ সীমা ভেঙে দেয়।
রাগ আর অদ্ভুত এক দহন বুকে নিয়ে সে রুহির পুরো রুম তছনছ করে বেরিয়ে আসে।
তারপর বাইক নিয়ে ঝড়ের বেগে রাস্তায় নেমে পড়ে।
চারপাশের বাতাস কেঁপে উঠছে তার গতিতে।
রাস্তার লাইটগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে, অথচ ক্ৰিশের মাথার ভেতরের ঝড় থামছে না।
হঠাৎ করেই তার মাথায় অন্য এক চিন্তা আসে।
চোখের দৃষ্টি আরও ধারালো হয়ে ওঠে।
পরমুহূর্তেই সে ব্রেক কষে বাইকটা ঘুরিয়ে নেয় উল্টো দিকে…
