Mad for you 2 part 15
তানিয়া খাতুন
রাত ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে।
নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে পুরো বাড়ি। চারপাশে এমন এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ কোথাও গিয়ে থেমে আছে।
জানালার ফাঁক গলে আসা ম্লান চাঁদের আলো ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত আবছায়া তৈরি করেছে।
দিনভর ক্লান্তির পর বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
রুহিও তার ব্যতিক্রম নয়।
নিজের ঘরের মাঝখানে বড় বিছানাটার উপর হাত-পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে।
যেহেতু ক্ৰিশ নেই, তাই আজ যেন একটু স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে পেরেছে রুহি।
তার এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে বালিশজুড়ে, মুখে ক্লান্ত অথচ শান্ত এক আবেশ।
ধীরে ধীরে তার চোখের পাতাগুলো আরও ভারী হয়ে আসছিল।
ঠিক তখনই—
খুব আস্তে, প্রায় নিঃশব্দে, তার ঘরের দরজাটা খুলে যায়।
অন্ধকারে দীর্ঘ এক ছায়ামূর্তি ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
ভারী জুতোর চাপা শব্দ নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
ঘুমের ঘোরেও শব্দটা কানে আসে রুহির।
তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে ওঠে, যেন অবচেতন মন বিপদের আভাস পেয়েছে।
কিন্তু গভীর তন্দ্রার কারণে চোখ খুলে দেখার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।
ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে।
চাঁদের আবছা আলোয় তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে ক্ৰিশের মুখ।
তার মুখভঙ্গি ভয়ংকর রকম কঠিন। চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
মনে হচ্ছে ভেতরে জমে থাকা সমস্ত রাগ, অভিমান আর দহন তাকে অস্থির করে তুলেছে।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রুহির দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
তারপর আচমকাই ঝড়ের মতো ঝুঁকে পড়ে।
পরের মুহূর্তেই রুহির ঠোঁটে প্রবল হামলা চালায়।
ঘুমের মাঝেই তার নিঃশ্বাস আটকে আসে। আতঙ্কে চোখ খুলতেই সে দেখে ক্ৰিশ তার উপর ঝুঁকে আছে।
রুহি কিছু বোঝার আগেই ক্ৰিশ তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিছানার সঙ্গে আটকে রাখে।
সেই চাপ এতটাই দৃঢ় যে রুহির মনে হয় তার কবজিগুলো বুঝি ভেঙে যাবে।
ক্ৰিশ কোনো কথা বলে না।
শুধু একরাশ উন্মত্ত রাগ নিয়ে রুহির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে।
তার আচরণে কোনো কোমলতা নেই, নেই কোনো ধৈর্য।
বরং মনে হচ্ছে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ সে এই মুহূর্তে রুহির উপরই উগরে দিতে চাইছে।
প্রচণ্ড জোরে দাঁতের চাপ বসে যায় রুহির নরম ঠোঁটে।
ব্যথায় কেঁপে ওঠে সে। অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে আসে তার গলা থেকে।
রুহি ছটফট করতে থাকে।
নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে।
কখনো হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়।
কিন্তু ক্ৰিশের শক্ত বাঁধনের সামনে তার সমস্ত চেষ্টা অসহায় হয়ে পড়ে।
ধীরে ধীরে লড়াই করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলতে থাকে রুহি।
তার শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। হাতের ছটফটানি থেমে যায় একসময়।
ঠিক তখনই ক্ৰিশ ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায় রুহির দিকে।
রুহির বুক তখনও দ্রুত ওঠানামা করছে। আতঙ্কে তার চোখদুটো বিস্ফারিত, ঠোঁট কাঁপছে হালকা করে।
সে যেন এখনও বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কী ঘটছে।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিরবতা পালন করে।
সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক দহন— ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর।
তারপর ধীরে ধীরে নেমে পাশের টেবিলটার দিকে যায় সে।
সেখানে রাখা ছিল ছোট্ট একটি মিউজিক বক্স। মাঝেমধ্যে একা থাকলে রুহি সেই বক্সে গান শুনত।
ক্ৰিশ সেটি হাতে তুলে নেয়।
পরমুহূর্তেই নিজের মোবাইলের সঙ্গে সংযোগ করে ফেলে।
রুহি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে তার প্রতিটি কাজের দিকে।
তার ভেতরে অজানা আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
হঠাৎ করেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে উচ্চস্বরে গান বেজে ওঠে।
ফুল ভলিউমে চলতে থাকা গানের শব্দ মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর কাঁপিয়ে দেয়।
মনে হচ্ছিল ক্ৰিশ ইচ্ছে করেই শব্দের আড়ালে সবকিছু ঢেকে দিতে চাইছে।
গান চালিয়েই সে আবার ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে আসে।
রুহি ভয়ে তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে যেতে চায়।
কিন্তু তার আগেই ক্ৰিশ ঝটকা মেরে তাকে টেনে নেয় নিজের দিকে।
পরমুহূর্তেই রুহির শরীর আবার বিছানায় আছড়ে পড়ে।
ক্ৰিশ নিজের সমস্ত ভার তার উপর ছেড়ে দেয়।
রুহির নিঃশ্বাস যেন মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে আসে।
সে চোখ-মুখ কুঁচকে কিছু বলতে চেয়েছিল, হয়তো থামতে বলতে চেয়েছিল তাকে।
কিন্তু ঠোঁট খুলে শব্দ বের করার সুযোগটুকুও দেয় না ক্ৰিশ।
আবারও ঝড়ের মতো নেমে আসে তার ঠোঁট।
কোনো কোমলতা নয়, কোনো ধৈর্য নয়—
শুধু দখল, জেদ আর উন্মত্ত এক আধিপত্য যেন ছড়িয়ে পড়ে তার আচরণে।
রুহির কাঁপতে থাকা শরীরটাকে শক্ত করে চেপে ধরে।
তার এক হাত ধীরে ধীরে উপরের পোশাকের ভাঁজ পেরিয়ে এগিয়ে যায়, মুঠো শক্ত হয়ে আসে কাপড়ের উপর।
রুহি আতঙ্কে শরীর শক্ত করে ফেলে।
চোখের কোণে জমে ওঠে পানি।
ঘরের ভেতর তখন উচ্চস্বরে বাজতে থাকা গানের তালে তালে ভারী হয়ে ওঠে দুজন মানুষের অসামঞ্জস্য নিঃশ্বাসের শব্দ।
আরও একধাপ এগিয়ে আসে ক্ৰিশ।
তার চোখদুটো তখন অদ্ভুতভাবে জ্বলছিল—
হঠাৎ করেই সে রুহিকে নিজের দিকে টেনে বসায়।
অপ্রস্তুত রুহি ভারসাম্য হারিয়ে ক্ৰিশের বুকের উপর এসে পড়ে।
পরমুহূর্তেই ক্ৰিশের দুই হাতের টানে এলোমেলো হয়ে যায় রুহির পরনের টপ।
ঘটনার আকস্মিকতায় কেঁপে ওঠে রুহি।
লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে মুখ নুয়ে আসে তার।
চোখ তুলে ক্ৰিশের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেলে সে।
সেই তীব্র, গাঢ় দৃষ্টি তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছিল।
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই নিজেকে আড়াল করার জন্য ক্ৰিশের বুকেই মুখ লুকিয়ে ফেলে রুহি।
তার উষ্ণ নিঃশ্বাস বারবার আছড়ে পড়ছিল ক্ৰিশের বুকে।
আর সেই স্পর্শে ক্ৰিশের ভেতরের দহন যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।
দুজনের শরীরের ঘর্ষণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
রুহির আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে চেপে ধরে ক্ৰিশের শার্ট।
ঘরের ভেতর তখন উচ্চস্বরে বাজতে থাকা গান, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর দ্রুত কাঁপতে থাকা হৃদস্পন্দন— সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভরে উঠেছিল পরিবেশটা।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রুহির শেষ আবরণটুকুও সরিয়ে দেয়।
লজ্জায় রুহির চোখ বুজে আসে। তার গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠে।
সে দুর্বলভাবে ক্ৰিশের বুকের কাছে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিতে চাইলেও ক্ৰিশ ঠেলে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়।
নরম বিছানার উপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রুহির চুল।
চাঁদের আবছা আলোয় তাকে অসম্ভব কোমল লাগছিল।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তার উপর ঝুঁকে আসে।
তার সুঠাম, উত্তপ্ত দেহের নিচে চাপা পড়ে যায় রুহি।
হালকা ব্যথায় কেঁপে উঠে অস্ফুট স্বরে গুঙিয়ে ওঠে সে, কিন্তু সেই শব্দ মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় ঘরে বাজতে থাকা গানের তীব্র আওয়াজে।
ক্ৰিশ যেন আজ আর নিজেকে থামাতে পারছিল না।
তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল জেদ, অধিকার আর উন্মত্ত এক আকাঙ্ক্ষা।
রুহির শরীর বারবার শিহরে উঠছিল তার ছোঁয়ায়।
কখনো চোখ বন্ধ করে নিচ্ছিল সে, কখনো কাঁপতে থাকা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল ক্ৰিশের দিকে।
আর ক্ৰিশ—
সে যেন ঝড়ের মতো নিজের আধিপত্য ছড়িয়ে দিচ্ছিল রুহির প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি কাঁপনে।
মনে হচ্ছিল তার প্রতিটি ছোঁয়ায় আগুন জ্বলে উঠছে রুহির সারা দেহে।
সেই আগুনে ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল অভিমান, রাগ আর সমস্ত দূরত্ব।
বাইরে তখন রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
চাঁদের আলো নিঃশব্দে জানালার ধারে পড়ে আছে।
আর ভেতরে—
দুটি অস্থির হৃদয় একে অপরের উষ্ণতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল।
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
জানালার বাইরে দূরের আকাশে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে নিঃশব্দে, আর সেই ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে ঘরের এলোমেলো বিছানার উপর।
ঘরের ভেতর এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে উষ্ণ নিঃশ্বাসের ভারী আবেশ।
ক্ৰিশ ক্লান্ত শরীরে রুহির বুকের কাছে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে।
তার দ্রুত, গরম নিঃশ্বাস বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল রুহির ত্বক।
রুহি নিঃশব্দে শুয়ে ছিল কিছুক্ষণ।
কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরের অস্বস্তি আর ব্যথা যেন তাকে অস্থির করে তোলে।
পরমুহূর্তেই কেঁপে ওঠে সে।
শিশুর মতো চাপা স্বরে কেঁদে ওঠে।
ঠিক তখনই ক্ৰিশ মুখ তুলে তাকায় তার দিকে।
কিছুক্ষণ আগেই সে মিউজিক বক্সটা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তাই এবার রুহির কান্নার প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে কানে আসে তার।
রুহির ঠোঁট দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে।
বাচ্চাদের মতো মুখ কুঁচকে কাঁদছে সে।
অদ্ভুতভাবে সেই দৃশ্যটা ক্ৰিশের কাছে অসম্ভব মায়াবী মনে হলো।
কান্নার মাঝেও কাউকে এত সুন্দর লাগতে পারে— হয়তো আগে কখনও দেখেনি সে।
ক্ৰিশের ভেতর আবারও তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
মনে হচ্ছিল আরেকবার রুহিকে নিজের করে আদর করে দিক।
কিন্তু এবার নিজেকে শক্ত করে সামলে নেয় সে।
ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রুহির চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে দেয়।
তারপর খুব যত্ন করে কপালে একটা গাঢ় চুম্বন এঁকে ফিসফিস স্বরে বলে,
— “ডোন্ট ক্রাই, বাটারফ্লাই…”
রুহি হেঁচকি তুলে অবাক চোখে তাকায় তার দিকে।
লজ্জায় আবার মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঁপা গলায় বলে— “আমার ব্যথা করছে… এবার কি কাঁদতেও পারবো না?”
ক্ৰিশ নিজের কপাল ঠেকায় রুহির কপালে।
তার গরম নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছিল রুহির মুখ।
— “না, কাঁদবি না… কারণ তোর কান্নাভেজা মুখ দেখলে আমার আবার মুড আসছে।
এখন যদি আবার আমি বেসামাল হয়ে যাই, পারবি আমাকে সামলাতে?”
কথাটা বলেই দুষ্টুমিভরা দৃষ্টিতে তাকায় সে।
— “আরেকবার কাঁদাই, বাটারফ্লাই?”
রুহি সঙ্গে সঙ্গে জোরে কেঁদে উঠে ক্ৰিশের বুকে ছোট ছোট কিল মারতে থাকে।
— “আপনি ভীষণ খারাপ! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…”
তার কাঁপা গলায় অভিমান মিশে ছিল।
ক্ৰিশ ঠোঁট টিপে হেসে ফেলে।
তবুও এবার নিজের ইচ্ছেটাকে কোনোমতে দমিয়ে রাখে সে।
তারপর ধীরে ধীরে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে রুহিকে টেনে তোলে নিজের বুকের উপর।
রুহি ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিঃশব্দে মাথা রাখে তার বুকে।
ক্ৰিশ খুব আদর করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।
আঙুলের কোমল স্পর্শে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে রুহি।
Mad for you 2 part 14
— “একটু ঘুমিয়ে নাও… ব্যথা কমে যাবে। না হলে সকালে মেডিসিন নিয়ে নিও…”
তার কণ্ঠে তখন আর আগের সেই উন্মত্ততা ছিল না।
তার কণ্ঠে তখন আর আগের সেই ঝড় ছিল না।
ছিল শুধু গভীর, ক্লান্ত এক কোমলতা।
