ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৭
লাইরা আয়নাত
ইনায়াত ক্যাসেলের গার্ডেনের এক কোণে বসে আছে এখানে আ্যাশ পরিবারে সব ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে তাই তাকেও আয়াজের মা এখানে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আর হ্যাঁ তার ঠোঁটের ক্ষতটা খুব যত্ন করে মেকআপ দিয়ে ঢেকে রেখেছে সে, এতটাই নিখুঁতভাবে যে কেউ বুঝতেই পারেনি ওর ঠোঁট কাটা। আসলে তার প্ল্যান ছিল জাস্ট নিচে এসে হালকা কিছু স্ন্যাকস নিয়ে নিজের কমফোর্ট জোনে, অর্থাৎ রুমে ফিরে যাওয়া কারণ এই ধরনের ক্রাউড তার একদমই পছন্দ নয়। কিন্তু আয়াজের মায়ের কাছে হার মানতেই হয় তাকে। জোর করেই তাকে এই কোলাহলের একদম সেন্টার অফ অ্যাটেনশনে বসিয়ে দেন তিনি।
আয়াজের কাজিনরা সবাই মিলে দারুণ এক গেমে মেতে ওঠেছেড৷ । অনেকদিন পর এমন একটা ফ্যামিলি গেট-টুগেদার হওয়ায় আয়াজও এসে জয়েন করে তাদের সাথে। ইনায়াতের পজিশন হয় সোফার মনে হয় এই আসরের সাথে তার কোনো কানেকশনই নেই। তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে, আয়াজের প্রায় গা ঘেঁষে বসে আছে এভা আয়াজের বেস্ট ফ্রেন্ড এবং থিয়ার মামাতো বোন। এভার এই গায়ে পড়া, ডেসপারেট স্বভাবটা ইনায়াতের কাছে বিরক্তিকর লাগে। তার ঠিক পাশেই বসে থাকে লেক্সি, যার কথায় কথায় হাত নেড়ে ওভার-অ্যাক্টিং করার স্বভাব ইনায়াতের মেজাজ আরও স্পয়েল করে দেয়। দুনিয়ার সব গেম থাকতে এরা মাতে ট্রুথ অর ডেয়ার গেমে, তবে রুলসগুলো একটু মডিফাই করা। একটা গ্লাস বোল থেকে চিরকুট তুলতে হয়, আর তাতে যে ডেয়ার লেখা থাকে, নো কোয়েশ্চেনস আস্কড সেটাই করতে হয়। ফার্স্ট টার্ন পড়ে আইজ্যাকের। তাকে ডান্স করতে বলা হয়। সে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিতে নাচতে শুরু করতেই চারপাশে হাসাহাসি আর হইহুল্লোড়ের রোলারকোস্টার শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ইনায়াতের ফোকাস সেদিকে থাকে না। তার ভাবলেশহীন দৃষ্টি একবার আয়াজের দিকে গিয়ে পড়। এভা আঠার মতো সেঁটে আছে আয়াজের সাথে। দৃশ্যটা দেখে তীব্র এক বিতৃষ্ণায় চোখ সরিয়ে নেয় ইনায়াত। ও মনে মনে একটা শব্দই ঘুরপাক খায়”প্যাথেটিক! ক্যারেক্টারলেস!”
আইজ্যাকের পর ইনেসের পালা। তাকে সবার জন্য ড্রিংকস সার্ভ করার টাস্ক দেওয়া হয়। এরপরই আসে আয়াজের টার্ন। সে চিরকুট খুলতেই সবার মাঝে একটা চাপা এক্সাইটমেন্ট ছড়িয়ে পড়ে। ওর টাস্ক “ডিপ কিস সামওয়ান”। তাদের এই কালচারে এসব খুব ক্যাজুয়াল হলেও, গেমের এই পয়েন্টটা সবার কাছেই বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়। এভা তো নিজের ঠোঁট হালকা করে মুছে অলরেডি রেডি হতে শুরু করেছে । তার ওভার-কনফিডেন্স বলে, আয়াজ ডেফিনেটলি তাকেই চুজ করবে।
আয়াজ চিরকুটের দিকে কিছুক্ষণ শান্ত, কোল্ড দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর সবার দিকে চোখ ফিরিয়ে স্বভাবসুলভ ডার্ক আর রাশভারী গলায় বলে, “আমি তোদের বড় ভাই। আমার রোমান্স দেখলে তোরা অকওয়ার্ড ফিল করবি। এটা স্কিপ কর, অন্য কোনো ডেয়ার দে।”
কিন্তু কাজিনদের কেউই এই এক্সকিউজ মানতে নারাজ। থিয়া আর লারা তো ডিরেক্ট বলেই বসে, “আরে এভাকেই করো! আমরা তো জানিই তোমার ফার্স্ট চয়েস কে হবে।” আয়াজ যে ইনায়াতকে নিজের লিগ্যাল ওয়াইফ হিসেবে এখনো মন থেকে অ্যাকসেপ্ট করে না এবং সবসময় ইগনোর করে, সেটা এদের সবারই জানা। তাই তাদের এই এক্সপেকটেশন একেবারেই আনরিয়েলিস্টিক মনে হয় না।
আয়াজ আর কোনো আর্গুমেন্টে যায় না। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ সবার গেস গেমকে কমপ্লিটলি শ্যাটার করে দিয়ে ধীর, মেপে মেপে ফেলা পদক্ষেপে এগিয়ে যায় ইনায়াতের দিকে। একদম ইনায়াতের সামনে এসে একটু পারফেক্ট অ্যাঙ্গেলে ঝুঁকে দাঁড়ায় সে। লম্বা, শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে আলতো কিন্তু ডমিনেটিং স্টাইলে ইনায়াতের থুতনিটা তুলে ধরে। তারপর ফিসফিস করা ভেলভেট স্বরে বলে, “করতে যখন হবেই, তখন তোমাকেই করি। আফটার অল, ইউ আর মাই ওয়াইফ আমি মন থেকে অ্যাকসেপ্ট করি বা না করি।”
কথাটা শেষ করেই সে মুখ এগিয়ে আনে। ইনায়াতের ভেতরে এখন অপমানে আর ইগোতে রীতিমতো লাভা ফুটছে। দাঁত চেপে রাগ কন্ট্রোল করে সে ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আয়াজ তাকে সেই স্পেস দেয় না। ইনায়াতের চোখের আগুন দেখে সে এক হাতে ইনায়াতের চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে সবার সামনেই ওর ঠোঁটে নিজের অধিকারের সিলমোহর বসিয়ে দেয়।
একটা লং, ইনটেন্স মুহূর্ত! চারপাশের চিয়ারিং, শিস আর হাততালির শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। আর ওদিকে অপমানে এভার মাটিতে মিশে যেতে মনে চাচ্ছে! কোথায় সে কী ফ্যান্টাসাইজ করে, আর রিয়েলিটিতে কী হয়ে যায়! জিলাসিতে তার মুখটা পুরো ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর আয়াজ ইনায়াতকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। রাগের বশে ইনায়াতের দেওয়া বন্য কামড়ে আয়াজের নিচের ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোচ্ছে। নিজের ঠোঁট থেকে সদ্য চুইয়ে পড়া রক্তটুকু আঙুলের উল্টোপিঠে খুব ক্যাজুয়ালি ওয়াইপ করতে করতে কাজিনদের দিকে তাকায় আয়াজ। ঠোঁটের কোণে একটা ডেভিলিশ স্মার্ক ঝুলিয়ে স্বভাবসুলভ অ্যারোগেন্ট ভঙ্গিতে বলে, “তোদের এই গেমের চক্করে আমার তো ঠোঁটই কাটল। কাল থেকে খেতে প্রবলেম হলে, আমার খাবার কিন্তু তোদেরই খাইয়ে দিতে হবে, মাইন্ড ইট!”
কথাটা শেষ করেই আয়াজ তার কর্তৃত্বপরায়ণ স্বভাব অনুযায়ী লেক্সিকে সামান্য সরে যাওয়ার ইশারা করে। লেক্সি জায়গা ছেড়ে দিতেই আয়াজ ইনায়াতের ঠিক গা ঘেঁষেই বসে পড়ে। আয়াজের পারফিউমের কড়া সুবাস আর সদ্য কেটে যাওয়া ঠোঁটের কাঁচা রক্তের হালকা মেটালিক গন্ধ মিলেমিশে ইনায়াতের নাকে ধাক্কা খায়। রাগের বশে ইনায়াতের করা বন্য কামড়ে আয়াজের ঠোঁট কেটে যে রক্ত বেরিয়েছে, তার কিছুটা লালচে ছোপ এখনও ইনায়াতের নিজের ঠোঁটেও লেগে থাকে।
অপমানে, ক্ষোভে আর অকল্পনীয় এক অস্বস্তিতে ইনায়াতের সারা শরীর তখন রিরি করে কাঁপছে। এটি তার সযত্নে লালন করা ফার্স্ট কিস, আর সেটি কিনা আয়াজের মতো একজন অহংকারী মানুষের কাছে এভাবেই বেহাত হয়ে গেল! ইনায়াত তীব্র ঘেন্নায় হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নিজের ঠোঁটটা জোরে মুছে নেয়। তারপর একেবারে প্রাণহীন, শান্ত পাথরের মতো বসে থাকে। কিন্তু তার ভেতরের চাপা রাগ তো আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার অপেক্ষায় আছে। নিজেকে যেকোনো মূল্যে শান্ত রাখতে সে তার দুই হাত দিয়ে সোফার নরম কাভারটা এমন শক্ত করে খাবলে ধরে রাখে,ওর হাতের নখগুলো কাপড়ের ভেতর গেঁথে যায়। ওদিকে চারপাশের হইহুল্লোড় থামে না, আবারও গেম শুরু হওয়ার তোড়জোড় চলে। ইনায়াত শান্ত গলায় বলে ওঠে, “আমি আর খেলছি না, আমি এমনিই বসে দেখছি।” ওর গলার স্বরের কাঠিন্য শুনে আর কেউ তাকে নিয়ে জোরাজুরি করে না। গেম আগের মতোই তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। তবে পুরো আসরে এভার চোখ বারবার তীরের মতো ছুটে আসে আয়াজের দিকে। ঈর্ষায় আর অপমানে তার মুখটা থমথম হয়ে গেছে।
সবাই যখন গেম নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আয়াজ নিজের বাঁ হাতটা ইনায়াতের হেলান দেওয়া সোফার হেডবোর্ডে আলতো করে রাখে। তার পেশিবহুল শরীরটা ইনায়াতের একদম কাছাকাছি ঝুঁকে আসে, এতটাই কাছে যে আয়াজের উষ্ণ নিশ্বাস ইনায়াতের কানের কাছে আছড়ে পড়ে। তারপর অত্যন্ত নিচু, রাশভারী কিন্তু তাচ্ছিল্যে ভরা ফিসফিসে গলায় সে বলে, “সবার সামনে কিস করেছি বলে আবার নিজের মনে ফ্যান্টাসি তৈরি করে ভেবো না যে তোমায় কোনো প্রায়োরিটি দিচ্ছি। জাস্ট কিপ ইন মাইন্ড, এটা জাস্ট একটা গেম।”
কথাটা শোনামাত্রই ইনায়াত ঝটকা মেরে আয়াজের দিকে ঘোরে। তার আয়তাকার চোখদুটো রাগে রীতিমতো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ও দাঁত চেপে হিসহিস করে জবাব দেয়, “আপনার মতো একজন মানুষের কাছ থেকে প্রায়োরিটি পাওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া আমার কাছে অনেক বেশি সম্মানের! কার কথায় আপনি কিস করেছেন আমাকে? একবারও কি আমার পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন?”
ইনায়াতের এই বারুদ-ঠাসা কথায় আয়াজের বিন্দুমাত্র হেলদোল হয় না। সে এসব কথায় পাত্তাই দেয় না। উল্টো ইনায়াতের রাগে লাল হয়ে থাকা মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে অত্যন্ত ঠাট্টার সুরে বলে, “উফ! তোমায় এভাবে রাগলে তো একদম টমেটো সসের মতো ইয়ামি ইয়ামি ফিল আসে। আমার সামনে এমন রাগ দেখিও না, পরে টমেটো মনে করে সত্যি সত্যি কামড়ে দিলে কিন্তু আমার কোনো দোষ দিতে পারবে না!”
এই কথার পর ইনায়াত বুঝতে পারে, এই বেপরোয়া আর ইগোস্টিক লোকটার সাথে তর্ক করাটা নেহায়েতই বোকামি। সে আর টুঁ শব্দটিও না করে, একটা অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে ধপ করে উঠে দাঁড়ায় এবং সোজা রুমের দিকে পা বাড়ায়। আয়াজ নিজের জায়গায় বসেই একদৃষ্টিতে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ডার্ক চোখদুটোতে অদ্ভুত এক তৃপ্তি, আর ঠোঁটের কোণে তখনও ঝুলতে থাকে এক রহস্যময়, মুচকি হাসি।
রুমে ঢুকেই ইনায়াত সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে সশব্দে দরজাটা লক করে দেয়। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে সে ট্যাাপের ঠান্ডা পানি ছেড়ে দেয়। আয়াজের জোরপূর্বক স্পর্শের কথা মনে পড়তেই ঘেন্নায় তার রীতিমতো গা গুলাতে শুরু করেছে। হাতের তালুতে পানি নিয়ে পাগলের মতো নিজের ঠোঁট ঘষতে থাকে সে, অন্তত একশোবারের ওপর কুলি করে মুখের ভেতরের অস্বাদ দূর করার চেষ্টা করে। কী এক জঘন্য, বিশ্রী এক্সপেরিয়েন্স! যদি এটি কোনো ভালোবাসার কিস হয়, তবে অনুভূতিটা হয়তো অন্যরকম হতো, কিন্তু এটি তো জাস্ট অধিকার ফলানোর এক নোংরা খেলা। আয়নার দিকে তাকাতেই নিজের রাগে জ্বলতে থাকা, জলভেজা প্রতিবিম্বটা চোখে পড়ে ইনায়াতের। চোখদুটো এখনও লাল, বুকটা হাঁপারের মতো ওঠানামা করছে। কিন্তু কিছুক্ষণ আয়নার দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ তার চেহারার এক্সপ্রেশন ম্যাজিকের মতো পালটে যেতে থাকে। রাগের মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নেয় একটা ভয়ংকর নীরবতা। আর তারপরই, তার ভেজা ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা হিসেবি এবং তীক্ষ্ণ শয়তানি হাসি!
লন্ডন শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বহুদূরে, জনমানবহীন এক গহীন অরণ্যের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী এক পরিত্যক্ত ক্যাসেল। সেই ক্যাসেলেরই আন্ডারগ্রাউন্ডের একটি স্যাঁতসেঁতে, সাফোকেটিং সেলে বাতাসের বদলে ভারী হয়ে আছে পোড়া মাংস আর জমাট বাঁধা রক্তের তীব্র, বমি উদ্রেককারী গন্ধ। সেলের রুমের ঠিক মাঝখানে সিলিং থেকে ঝুলে আছে ইনায়াতের স্টেপ-সিস্টার, ফ্রেয়া। তার দুই হাত কবজি বরাবর মোটা, খসখসে দড়ি দিয়ে শক্তভাবে বাঁধা। দড়ির নির্মম ঘর্ষণে কবজির চামড়া ছিলে অবিরাম রক্ত ঝরছে। কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও ভয়াবহ তার পুরো শরীরের বর্তমান অবস্থা। টানা ৪৮ ঘণ্টার হাই-ভোল্টেজ ইলেকট্রিক শকের কারণে তার শরীরটা এখন এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছে। ঝলসে যাওয়া চামড়াগুলো খসে পড়ছে, শরীরের প্রতিটি নার্ভ বোধহয় যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। মৃত্যুর ঠিক দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে সে, তার প্রতিটি নিঃশ্বাস এক একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। তার ঠিক নিচেই, মেঝের ওপর পড়ে আছে এক পচন ধরা লাশ। এই সেই ছেলে, ফ্রেয়া যার হাত ধরে এক ব্রাইট ফিউচারের স্বপ্ন চোখে নিয়ে পালিয়েছিল। আজ সেই ছেলেটার নিথর দেহ পোকামাকড়ের খাবারে পরিণত হয়েছে। চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষের এই বীভৎস পরিণতি ফ্রেয়ার মেন্টাল ট্রমাকে ইনফিনিটি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা আর প্যানিক অ্যাটাকের মাঝেই ফ্রেয়া ঘোলাটে চোখে নিচের দিকে তাকায়। গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না,তাও জমানো সর্বশক্তি দিয়ে সে এক বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে, “আমাকে আর এত কষ্ট দিও না আয়াজ! প্লিজ… জাস্ট কিল মি… প্লিজ আমায় মেরে ফেলো!”
নিচে, ফ্রেয়ার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আয়াজ। পরনে তার এক্সপেন্সিভ ডার্ক স্যুট, চুলে পরিপাটি স্টাইলিং। ফ্রেয়ার এই করুণ, বীভৎস দশার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক শীতল, সাইকোপ্যাথিক হাসি নির্বিকার স্বরে সে বলে, “তোমার তো ঠিক এভাবেই মৃত্যু হওয়ার কথা ছিল, ডার্লিং। আমার সাথে বিয়ে ঠিক করে তুমি অন্যের সাথে পালিয়ে গেলে আমাকে রিজেক্ট করলে! দিস ইজ হোয়াট ইউ ডিজার্ভ।”
ফ্রেয়া যন্ত্রণায় ডুকরে কেঁদে ওঠে, তার শরীর থরথর করে কাঁপছে, “আ… আমাকে মাফ করে দাও! প্লিজ আ-আমি বুঝতে পারিনি তুমি এমন।”
কথাটা শুনে আয়াজের মনে হচ্ছে দারুণ কোনো জোক শুনল। শব্দ করে হেসে উঠে পকেটে হাত গুঁজে নেয় সে। তারপর প্রতিটি শব্দ মেপে মেপে বলে, “উমমম… মাফ তো করতেই পারতাম। কিন্তু বিষয়টা যে আমার ইগোর, তাই সেটা আর হচ্ছে না। আমি আসলে কী, আমার ডার্ক সাইডটা কতটা ভয়াবহ, তা তো এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছ। তবে হ্যাঁ, একটা কথা স্বীকার করতেই হয় তোমার চেয়ে তোমার বোনকে আমার কাছে অনেক বেশি স্যাটিসফাইং মনে হয়েছে। তোমার সাথে বিয়ে না হয়ে বরং আমার লাভই হয়েছে বলতে পারো। আই গট আ বেটার ডিল।”
এই কথা শুনে ফ্রেয়ার চোখের দৃষ্টিতে এক মরীচিকার মতো আশা ফুটে ওঠে। সে মরিয়া হয়ে মিনতি করতে থাকে, “তাহলে প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও! প্লিজ আয়াজ! আমার বোনকে তো তোমার পছন্দ হয়েছে, তাহলে আমার চলে যাওয়াতে তো তোমার কোনো ক্ষতি হয়নি? লেট মি গো!”
আয়াজ কথাটার লজিক নিয়ে কয়েক সেকেন্ড একটু ভাবে, তারপর ধীর পায়ে ফ্রেয়ার আরেকটু কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, “দ্যাটস ট্রু। তোমার বোনকে আমার মারাত্মক মনে ধরেছে। আর তুমি চলে গেছ, সেটা কোনো বড় বিষয় নয় এতে আমার বালেরও এক ইঞ্চিও ক্ষতি হয়নি আমার কি ক্ষতি হবে। কিন্তু তুমি আমাকে রিজেক্ট করেছ এবং আমার ইগো হার্ট হয়েছে দ্যাট ইজ দ্য মেইন থিং! আমাকে রিজেক্ট করার সাহস কেউ করে না, ফ্রেয়া।”
আয়াজ একটু থেমে, হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার বলে, “তো এনিওয়ে, যেহেতু তোমার কারণে তোমার বোনকে পেয়েছি, তাই তোমাকে আর নিজ হাতে টর্চার করব না। আর মাত্র দুদিন এই অটোমেটেড সিস্টেমে ঝুলে থাকবে। তারপরও যদি এই হাই-ভোল্টেজ শকে সারভাইভ করো, তাহলে নিজের হাতে শুট করে মেরে ফেলব। আই প্রমিস, বেশি সাফার করতে দেব না।”
কথাগুলো শেষ করেই আয়াজের মুখে ফুটে ওঠে এক ডেভিলিশ স্মাইল। সে ধীরপায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ফ্রেয়া যন্ত্রণায় পাগলের মতো হাসতে থাকে, আবার পরক্ষণেই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। সে যদি ঘুণাক্ষরেও জানত আয়াজ এতটা ভয়াবহ, এতটা নিখুঁত একজন সাইকো, তাহলে ভুল করেও ওর ত্রিসীমানায় পা রাখত না! এই লোকটা একটা আস্ত মনস্টার। হঠাৎ করেই যান্ত্রিক একটা বিং শব্দ বেজে ওঠে। ফ্রেয়ার কান্না আর আক্ষেপের মাঝেই মেশিনের টাইমার অনুযায়ী আবার চালু হয়ে যায় কারেন্টের অটোমেটেড হাই-ভোল্টেজ শক। নীলচে বিদ্যুতের ঝলকানির সাথে ফ্রেয়ার একটা সাফোকেটিং আর্তনাদ মিলিয়ে যায় ক্যাসেলের নিস্তব্ধতায়। অন্ধকার ক্যাসেলের এই বদ্ধ রুমে এখন ফ্রেয়ার শুধু একটাই অপেক্ষা তা হলো মৃত্যু।
আয়াজ বাড়ি ফিরে নিঃশব্দে রুমে পা রাখতেই একটা মৃদু গুনগুন সুর ওর কানে ভেসে আসে। সোফায় পা গুটিয়ে বসে আছে ইনায়াত। কানে হেডফোন, দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির। কাজের ফাঁকে সম্পূর্ণ আনমনেই নিজের ঘোরে সে গেয়ে চলছে
*Stand with you forever be true*
*Keep you on my mente siempre mi vida*
*I’m a gangster’s wife to an anybody killa…*
*Daddy let me know that I’m your only girl*
*The only man that I need in this gangster world*
*Is you and I wouldn’t trade it. So why you think I would lie? Won’t you tell me girl?*
*The only one that I need in my gangster world is you*
*And I wouldn’t trade it *
ইনায়াত টেরই পায় না যে আয়াজ কখন রুমে ঢুকেছে। আয়াজ ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে একটা টিপিক্যাল স্মার্ক ঝুলিয়ে টিপ্পনী কাটে, “তাহলে তো দেখছি এখন আমাকেও গ্যাংস্টার হতে হবে! যখন আমার ওয়াইফ নিজেই গ্যাংস্টার ওয়াইফ হওয়ার গান গাইছে।”
আয়াজের ব্যারিটোন ভয়েস কানে যেতেই ইনায়াতের সুর কেটে যায়। চোখের পলকেই নিজের সেই চিরচেনা কোল্ড অরা তে ফিরে যায় সে। আয়াজের কথায় বিন্দুমাত্র রিঅ্যাক্ট না করে, জাস্ট ইগনোর করে ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাতে থাকে। আয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢোকে। ডোর লক করার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মাথাতেই ভেতর থেকে ধপাস করে একটা বিকট শব্দ আসে! ফ্লোরে ইনায়াত খুব সন্তর্পণে একটা ট্রান্সপারেন্ট লিকুইড গাম ঢেলে রেখেছিল, যা সাধারণ চোখে চট করে ধরা পড়ার কোনো চান্সই নেই। আয়াজ পা পিছলে এমন বাজেভাবে স্লিপ কাটে যে ওর নিজেরই ঘোর কাটে না! কোনোমতে ব্যালেন্স করে উঠতে যেতেই আবারও পড়ে। মাজার হাড্ডি টা তো ভাঙার উপক্রম, সাথে ইগোটারও একেবারে দফারফা হয়ে গেল তার। আর এদিকে সোফায় বসে ইনায়াত আড়চোখে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে একটা ডেভিলিশ স্মাইল ঝুলিয়ে রাখে।
আয়াজ কোনোমতে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। রাগে গজগজ করতে করতে শার্ট খুলে কোমরে একটা টাওয়াল জড়িয়ে নেয় সে। ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করে তাই দাঁত ব্রাশ করার জন্য পেস্ট হাতে নিতেই সেখানে অপেক্ষা করছে আরেকটা ব্রিলিয়ান্ট সারপ্রাইজ! টুথপেস্টের টিউবে পেস্টের বদলে সযত্নে ইনজেক্ট করা আছে হাই-পাওয়ারের ঝাল বাম! তাকে জোর করে কিস করার এটা একটা ইনিশিয়াল পানিশমেন্ট। এরপর আয়াজ যদি নিজের লিমিট ক্রস করে, তবে কনসিকোয়েন্সেস আরও ভয়াবহ হবে। আয়াজের রাগে তখন মাথার রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। ব্রাশটা সজোরে বেসিনে ছুড়ে মেরে সে হনহন করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। এটা যে ইনায়াতের কাজ সেটা ও ভালো করেই জানে আয়াজ জ্বলন্ত চোখে চিৎকার করে ওঠে, “ইনায়াত! হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস? এসব ফাইজলামির মানে কী?”
ইনায়াত বিন্দুমাত্র প্যানিক করে না। ল্যাপটপটা সাইডে সরিয়ে এলিগ্যান্ট ভঙ্গিতে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আয়াজের রোষকষায়িত চোখের দিকে ডিরেক্ট আই-কন্ট্যাক্ট রেখে একদম আইস-কোল্ড টোনে জবাব দেয়, “এটা একজন কনকিউবাইন-এর মেয়েকে কিস করার আফটারম্যাথ।”
আয়াজ ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “ওটা জাস্ট একটা গেম ছিল! আমি তোমায় ইনটেনশনালি কিস করিনি।”
“গেমই যখন ছিল, তখন নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে কেন চুজ করলেন না? আমাকে কেন করতে এলেন? নেক্সট টাইম এমন অডাসিটি দেখাবেন না। আমার ঠোঁট সস্তা কোনো বাজারের মেয়ের নয়!”
কথাটা আয়াজের মেল ইগোতে গিয়ে তীব্র আঘাত করে। সে কয়েক পা তেড়ে আসে ইনায়াতের দিকে, “তুমি আমাকে থ্রেট দিচ্ছো?”
ইনায়াত একচুলও ব্যাকআউট করে না। উল্টো আয়াজের আরও ক্লোজ স্পেসে গিয়ে, বুকে দুই হাত ফোল্ড করে সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জিং সুরে বলে, “হ্যাঁ, দিচ্ছি।”
“আমার সাথে পাঙ্গা নেওয়ার ট্রাই করছো নাকি?”
“হ্যাঁ, করলে করছি!”
আয়াজ হঠাৎ শব্দ করে হেসে ওঠে। তবে সে হাসিতে কোনো হিউমার নেই, আছে ডার্ক মকারি। পরক্ষণেই ওর মুখাবয়ের ধরন শক্ত হয়ে যায়। রাফ ভয়েসে বলে, “আমার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া আছে তোমার? কী থেকে কী বলছো, সেন্স কাজ করছে তো?”
ইনায়াত এবার নিজের একটা আঙ্গুল সোজা আয়াজের খালি বুকের বাঁ পাশে রাখে। আলতো করে একটা খোঁচা দিয়ে ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফুটিয়ে বলে, “যতটুকু আইডিয়া আছে, ততটুকু দিয়ে আপনার এক-আধ ইঞ্চি ড্যামেজ তো অনায়াসেই করতে পারি। তাই আমার পথে আসবেন না, আমিও আপনার পথে আসব না। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট।”
ইনায়াতের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব আয়াজের ভেতরের জেদটাকে আরও উসকে দেয়। বিদ্যুতবেগে ইনায়াতের সেই হাতটা খপ করে ধরে হেঁচকা টানে ওকে একেবারে নিজের খালি বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় সে। অন্য হাতটা সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে ইনায়াতের কোমর। তারপর ওর কোমরের উন্মুক্ত ত্বকে আঙুল স্লাইড করতে করতে একটা শয়তানি হাসি দেয় আয়াজ। ফিসফিস করে বলে,
“আমি আসব। তুমি আমার রাস্তায় এসো না, কিন্তু আমি ঠিকই তোমার রাস্তায় আসব। তখন কী করতে পারো তুমি কি বাল ফালাতে পারো আমার লেটস সি।”
ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৬
এমন অপ্রত্যাশিত ঘনিষ্ঠতায় অন্য যেকোনো মেয়ে হলে হয়তো কেঁপে উঠত, কিন্তু ইনায়াত ঘাবড়ায় না। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের মুক্ত হাতটা আয়াজের চওড়া কাঁধের ওপর রাখে। চোখের দৃষ্টিতে একটা ডেডলি কোল্ডনেস এনে মুচকি হেসে বলে, “এটা-ওটা না ফেলে অন্য কোনো জিনিস যদি সরাসরি কেটে ফেলে দিই, তাহলে?”
ইনায়াতের স্পর্শে আয়াজের ভালো লাগে ভালো নয় একটু বেশিই ভালো লাগে কিন্তু ওর কথার এই ডেঞ্জারাস হিন্টসে আয়াজ রীতিমতো দাঁত চেপে বলে, ” সাহস বড্ড বেড়ে গেছে তোমার! কী বলছো, বুঝতে পারছো?”
ইনায়াত অবজ্ঞার ভঙ্গিতে একটু ঠোঁট উল্টে বলে, “সাহস? ওটা আমার বর্ন-ট্যালেন্ট জন্ম থেকেই আমার সাহস একটু বেশি। আর আমি ননসেন্স বকা মেয়ে নই, তাই যা বলছি একদম বুঝেশুনেই বলছি।”
