Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৮

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৮

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৮
লাইরা আয়নাত

কথা বলতে বলতেই আয়াজ তার ডমিন্যান্ট নেচার শো করে বসে। ইনায়াতকে প্রোভোক করার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে ওর সরু কোমরে দুই হাত চেপে ধরে খুব স্মুথলি স্লাইড করতে থাকে। ইনায়াত সাথে সাথেই ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, “আপনি আমাকে এভাবে টাচ করছেন কেন? রিমুভ ইওর হ্যান্ডস।”
কিন্তু আয়াজ কি আর সেই কথা শোনার পাত্র? সে বরং একটা ডেভিলিশ স্মার্ক দিয়ে দাঁত চেপে ধরে টাচটাকে আরও ডিপ আর ইনটিমেট করে তোলে। ক্যাজুয়াল টোনে বলে, “তোমার কোমর অনেক বেশি স্লিম, টাচ করতে বেশ কমফোর্টেবল লাগছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছে, তাই করছি। হোয়াটস ইওর প্রবলেম?”

“হোয়াটস মাই প্রবলেম মানে? আপনি আমার কোমরে হাত রাখবেন আর বলবেন আমার কী?” ইনায়াত গলা চড়িয়ে রিয়্যাক্ট করে। কিন্তু আয়াজের তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। উল্টো সে ইনায়াতের টি-শার্টটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে স্লাইড করতে শুরু করে। ইনায়াত আয়াজের চোখের দিকে তাকায়। সে খুব ভালো করেই জানে, এখন টিপিক্যাল কমিক্স বা নভেলের নায়িকাদের মতো প্যানিক করে ‘ছাড়ুন ছাড়ুন’ করলে এই অ্যারোগ্যান্ট আয়াজটা আরও বেশি অ্যাডভান্টেজ নেবে। তাই সে একদম স্ট্রং আই-কন্ট্যাক্ট ধরে রেখে, কোল্ড ভয়েসে মোক্ষম জায়গায় হিট করে, “একজন কনকিউবাইন-এর মেয়েকে নিজের লিগ্যাল ওয়াইফ হিসেবে অ্যাক্সেপ্ট করতে আপনার প্রেস্টিজে লাগে, কিন্তু তাকে এত ব্যাডলি টাচ করতে একটুও শেইম ফিল হয় না আপনার?”

কথাটা একেবারে তীরের মতো ওর ইগোতে গিয়ে বিঁধে। আয়াজ সাথে সাথে ইনায়াতকে রিলিজ করে দেয়। সত্যি বলতে, আজ ওর ইনটেনশনই ছিল ইনায়াতের সাথে একটা রোমান্টিক নাইট স্পেন্ড করা। ওদের এই এলিট রয়্যাল কালচারে এভাবে ফোর্সফুলি রোমান্স ইনিশিয়েট করাটা বেশ নরমাল। কিন্তু ইনায়াত ঠিক ওর উইক পয়েন্টে আঘাত করেছে। আয়াজ নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একরাশ ফেক ডিসগাস্ট শো করে বলে, “ড্যাম ইট! এখন আমাকে আবার শাওয়ার নিতে হবে। তোমাকে ছুঁয়েছি বলে কথা!”
ইনায়াত ওর এই হিউমিলিয়েশনে বিন্দুমাত্র রিঅ্যাক্ট করে না। বরং একদম শান্ত, ফ্রিজিং টোনে বলে, “তো আসেন কেন ছুঁতে? নিজের ‘ক্লাস’ আর স্ট্যাটাস ভুলে এমন আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যান কেন? আপনি একজন প্রফেসর, তার ওপর ক্রাউন! একজন মেয়ের কোমর নিয়ে এমন চিপ টানাটানি করাটা আপনার হাই-প্রোফাইল ইমেজের সাথে বড্ড বেমানান।”

এইটুকু বলেই ইনায়াত আর কোনো আর্গুমেন্ট না বাড়িয়ে সোফায় পিলো আর ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে শুয়ে পড়ে। আয়াজ কিছুক্ষণ একটা স্ট্যাচুর মতো স্পিচলেস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নিজের প্রাইড আর ইগো স্যাটিসফাই করতে, স্রেফ ইনায়াতকে দেখানোর জন্যই ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। বিন্দুমাত্র ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও অনেকটা সময় নিয়ে কোল্ড শাওয়ার নিয়ে তবেই বেরিয়ে আসে।
রুমে ফিরে আয়াজ দেখে ইনায়াত ততক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। টাওয়েল দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে সে ধীরপায়ে সোফার দিকে এগিয়ে যায়। তারপর একদম সাইলেন্টলি দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে ঘুমন্ত ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক অদ্ভুত অবসেশন আর মোহ তাকে গ্রাস করে নেয়। ইনায়াতের এই পিসফুল, স্নিগ্ধ ঘুমন্ত চেহারাটা মনে হচ্ছে ফেয়ারিটেলের স্নো হোয়াইট কিংবা কোনো ডার্ক কার্স-এ ঘুমিয়ে থাকা ম্যাজিকাল প্রিন্সেসকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। ব্রিটিশ মেয়েরা অবভিয়াসলি গর্জিয়াস আর এলিগেন্ট হয়, কিন্তু ইনায়াতের এই ফ্ল-লেস বিউটিতে আল্লাহ কোনো দিকেই এতটুকু খুঁত রাখেননি।
আয়াজ আরেকটু সামনে ঝুঁকে আসে। নামহীণ একটা ফ্যাসিনেশন আর অনামী তৃপ্তি নিয়ে সে ইনায়াতের মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। এভাবে একটানা ঘাড় গুঁজে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ওর ঘাড়ে রীতিমতো পেইন শুরু হয়ে যায়, তবুও আয়াজ নিজের চোখ দুটো এক সেকেন্ডের জন্যও ইনায়াতের দিক থেকে সরাতে পারে না।

সকাল ঠিক সাতটা।
ইনায়াত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে গতকাল নাভিদের দেওয়া নতুন জার্সি আর ট্রাউজার, চুলগুলো ক্যাজুয়ালি খোলা। ইনায়াত এমনিতে জার্সি ক্রেজি, ওর ফেভারিট ড্রেসআপই হলো জার্সি। ট্রাউজারের পকেটে দুহাত গুঁজে আয়নার সামনে এদিক-ওদিক ঘুরে নিজেকে খুব খুঁটিয়ে এক্সামিন করছে সে। ঠিক তখনই জিম সেশন শেষ করে রুমে এন্টার করে আয়াজ। সকাল সকাল ইনায়াতের এমন অ্যামেজিং একটা লুক দেখে ওর ভেতরে তো প্রজাপতি উড়তে শুরু করেছে একপ্রকার। কিন্তু নিজের সেই ফিলিংটা দারুণভাবে হাইড করে স্বভাবসুলভ সারকাস্টিক টোনে পিনচ মারে সে,

“এমন অ্যাটিটিউড নিয়ে আয়না দেখছো, মনে হচ্ছে এইমাত্র মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জিতে এসেছো।”
ইনায়াত আয়নার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই কুললি রিপ্লাই দেয়, “আমার খেতাব নিয়ে আপনাকে এত ওভারথিংক করতে হবে না।”
“আরে না, আমি ওসব করছি না। আমার এত ফালতু টাইম নেই। তোমার এই ওভারলুকিং অবস্থা দেখে জাস্ট অপিনিয়ন দিলাম।”
ইনায়াত নিজের জার্সির ফিটিংটা চেক করতে করতে বেশ বিরক্তি নিয়ে বলে, “আপনাকে তো আমি জাজ করতে বলিনি ভাই! আপনি আপনার জোনে থাকুন, আমাকে আমার মতো থাকতে দিন।”
আয়াজ এবার সোজা ইনায়াতের কাছে গিয়ে ওকে আয়নার সামনে থেকে একপ্রকার সরিয়ে দেয়। “সরো তো, এবার আমাকে আমার বডিটা দেখতে দাও।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জিম-করা বডি ফ্লেক্স করতে শুরু করে আয়াজ। সিক্স প্যাক অ্যাবস শো-অফ করে ইনায়াতকে বলে, “লুক অ্যাট দিস! কত পারফেক্ট আর নাইস বডি আমার! জীবনে কখনো রিয়েলিটিতে এমন সিক্স প্যাক দেখেছিলে?”
ইনায়াত চরম বিরক্তি নিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ডিরেক্টলি কিছু না বলে বিড়বিড় করে ওঠে, “পুরো একটা পাঠার মতো লাগতেছে! জংলি পাঠা কোথাকার!”
কথাটা আয়াজের কান এড়ায় না। সে সাথে সাথে ঘুরে তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করে, “হোয়াট? কী বললে? রিপিট করো তো!”

“নাথিং,” বলে ইনায়াত ইগনোর করে ব্যালকনির দিকে পা বাড়ায়। আয়াজের সামনে থাকলেই আননেসেসারি আর্গুমেন্ট হবে, আর ওর কথাগুলো ইনায়াতের কাছে একদম অসহ্য লাগে।
কিন্তু ইনায়াত ব্যালকনিতে যাওয়ার আগেই আয়াজ পেছন থেকে বলে ওঠে, “তোমার বাবা এসেছেন। নিচে ব্রেকফাস্ট ডেটে তোমার জন্য ওয়েট করছেন।”
‘বাবা’ শব্দটা কানে যেতেই ইনায়াতের হাঁটার গতি থেমে যায়। সে আয়াজের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কোল্ড আর ডার্ক হয়ে যায়। শক্ত গলায় সে বলে, “আমার কোনো বাবা নেই।”
আয়াজের কপালের ভাঁজ পড়ে গভীর হয় কনফিউশনে, “হোয়াট ডু ইউ মিন? তাহলে মিস্টার ইভান তোমার কে?”
ইনায়াত পাথরের মতো এক্সপ্রেশনলেস মুখে জবাব দেয়, “উনি আমার জন্মদাতা, কিন্তু বাবা নন।”
“এ কেমন কথা? বাবা নন কেন?”
“কারণ বাবা হতে গেলে কিছু কোয়ালিফিকেশন লাগে, যা মিস্টার ইভানের নেই। আমরা ওনার চাহিদার ফল, কোনো ভালোবাসা বা ইচ্ছের ফসল নই। আর না তিনি কখনো আমাদের কোনো বাবার মতো ভালোবাসা দিয়েছেন। সো, হি ইজ নট মাই ফাদার।”

কথাগুলো শুনে আয়াজ পুরোপুরি স্টানড হয়ে যায়। কী রিয়্যাক্ট করা উচিত বা কী বলা উচিত, ওর ব্রেইইন সিগন্যাল দেওয়া বন্ধ করে দেয়। রুমের ভেতরে যখন এই ইনটেন্স কনভারসেশন চলছে, তখন দরজার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মিস্টার ইভান। নিচে ওদের লেট হতে দেখে নিজেই এসেছিলেন ডাকতে, আর নিজের কানেই শুনে ফেলেন ইনায়াতের সবটা কথা। ভারী হয়ে আসা বুকটা নিয়ে তিনি দরজায় নক করেন, “আসতে পারি?”
আয়াজ নিজের ভেতরের অকোয়ার্ডনেস কাটিয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। “জি, আসুন আংকেল,” বলে সে একটু সরে দাঁড়ায়। মিস্টার ইভান ধীর পায়ে রুমের ভেতর এন্টার করেন।
ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে একদম টিপিক্যাল ফাদারলি টোনে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “কেমন আছো ইনায়াত? ম্যারেড লাইফ ভালো যাচ্ছে তো?”

ইনায়াতের ফেসে কোনো এক্সপ্রেশন নেই। একদম রোবটিক আর কোল্ড টোনে সে জবাব দেয়, “ভালো থাকার জন্য তো আর আপনি বিয়ে দেননি। একজন ক্রাউন প্রিন্স আর একজন কনকিউবাইনের মেয়ের ম্যারেড লাইফ তো আর ফেয়ারিটেলের মতো হওয়ার কথা নয়, তাই না? সো, না আমি ভালো আছি, আর না আমার লাইফ ভালো যাচ্ছে।”
মিস্টার ইভান শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আয়াজ তাদের এই পার্সোনাল ফ্যামিলি ড্রামার মাঝে ইন্টারফেয়ার করতে চায় না। সে জাস্ট ক্লিয়ার করে দেয়, “আচ্ছা, আমি একটু চেঞ্জ করে আসি। আপনারা কথা বলুন।” এই বলে সোজা চেঞ্জিং রুমে ঢুকে সে দরজা লক করে দেয়, কিন্তু দরজায় কান পেতে ঠিকই পুরো কনভারসেশন শুনতে থাকে।
আয়াজ যেতেই মিস্টার ইভান এবার ইনায়াতের দিকে ফোকাস করেন। “আই অ্যাম ইয়োর ফাদার, ইনায়াত! তোমার ভালোর জন্যই এই রয়্যাল ফ্যামিলিতে তোমার বিয়ে দিয়েছি, যাতে তুমি একটা বেটার লাইফ পাও। আর তুমি আমার সাথেই এমন রুড বিহেভিয়ার করছো?”

ইনায়াতের ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের স্মার্ক ফুটে ওঠে। দু’হাত বুকে ফোল্ড করে সে বেশ রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বলে, “মিস্টার ইভান, আয়াজ এখন এখানে নেই। সো প্লিজ, আপনার এই ফেইক কনসার্নের ড্রামাটা অফ করুন। নিজের প্রেস্টিজ বাঁচাতে আমাকে এখানে স্যাক্রিফাইস করেছেন, আমার ভালো থাকার জন্য না। আর আপনি আমার বাবা নন, আপনার সাথে আমার কোনো রিলেশন নেই। এই বিয়ের ডিল ক্র্যাক করে আমরা আপনার থেকে পার্মানেন্টলি মুক্তি পেয়েছি, ভুলে গেছেন?”
মিস্টার ইভান এবার দাঁত চেপে, নিচু কিন্তু থ্রেটেনিং স্বরে বলেন, “রয়্যাল ফ্যামিলিতে বিয়ে হয়েছে বলে গলার ভয়েস কি একটু বেশিই রেইজ করছো? খুব বেশি উড়ো না ইনায়াত। আমার এক কথায় কিন্তু তোমার ডিভোর্স হয়ে যাবে!”
“তো করিয়ে দিন না, ব্রো!আপনার যখন এতই পাওয়ার, তাহলে জাস্ট এই ফেভারটুকু করে দিন। এই রয়্যাল লাইফের টক্সিক বন্দিদশা থেকে আমাকে মুক্তি দিন।”

“আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? তুমি আমায় ‘ব্রো’ বলছো? আমি তোমার বাবা!”
“বাবা আপনি অবশ্যই, কিন্তু আমার বা আমার ভাইয়ের না। আপনি জাস্ট আপনার লিগ্যাল মিসেসের সন্তানদের বাবা। ডিফারেন্সটা অন্তত এবার বুঝতে শিখুন।”
“শাট আপ! এইসব বেয়াদবি বন্ধ করো।” ইভান এবার অ্যাডভাইস দেওয়ার টোনে বলেন, “ভালো হয়ে যাও ইনায়াত, নয়তো এই সংসার টিকবে না। তোমার যা অ্যাটিটিউড, আয়াজের কনকিউবাইন হওয়ার কোয়ালিফিকেশনও তোমার নেই।”
‘অ্যাডভাইস’ শব্দটা শুনে ইনায়াত লিটারেলি খিলখিল করে হেসে ওঠে। “অ্যাডভাইস? ব্যাপারটা পুরো এমন হয়ে গেল না যে এক ইবলিশ দিচ্ছে আরেক ইবলিশকে ভালো হওয়ার অ্যাডভাইস! আর আয়াজের মতো ওই হাই-ক্লাস কিন্তু থার্ড-ক্লাস মেন্টালিটির পাঠার সাথে থাকার কোনো রুচি আমার নেই। আপনি প্লিজ এবার লিভ করুন। আপনার এই ডিসগাস্টিং চেহারাটা যত দেখছি, আমার তত বমি আসার চান্স বাড়ছে।”

ইনায়াত আর এক মুহূর্তও এই সাফোকেটিং রুমটাতে দাঁড়ায় না। গটগট করে হেঁটে সোজা ব্যালকনির দিকে চলে যায় ও। ওর প্রতিটা ফুটস্টেপে যেন জমে থাকা বছরের পর বছর ধরে চাপা দেওয়া রাগের এক্সপ্রেশন। মিস্টার ইভান জাস্ট কিছুক্ষণ স্টানড হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। হয়তো ইনায়াতের ছুড়ে দেওয়া তীক্ষ্ণ কথাগুলো তার ইগোতে খুব বাজেভাবে হিট করেছে, হয়তো আনএক্সপেক্টেড ছিল এই রিঅ্যাকশনটা। ডেডলি এক রাশ সাইলেন্স পেছনে ফেলে তিনিও ফাইনালি রুম থেকে বেরিয়ে যান।

ব্যালকনির কোল্ড আইরন গ্রিলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়াতেই ইনায়াতের ভেতরটা একদম ব্ল্যাংক আর এম্পটি ফিল হতে শুরু করে। সামনের বিশাল আকাশটার দিকে তাকিয়ে ওর নিজের ভেতরটা একটা ডার্ক ভ্যাকিউম মনে হয়। মনে হচ্ছে, মানুষটাকে আরও অনেক হার্শ কথা বলা বাকি ছিল। বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারটা কমপ্লেইন থ্রো করার ছিল। কিন্তু চরম ঘৃণা আর তীব্র বিতৃষ্ণায় ওর আর রুচিই হয় না। দিস ম্যান ডাজন্ট ইভেন ডিজার্ভ হার অ্যাঙ্গার! রাগেরও তো একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকে। হুট করে ছোটবেলার একটা ট্রমাটিক মেমোরি ওর মাথায় হাতুড়ির মতো হিট করে। একবার খেলতে গিয়ে ফ্রেয়া ইনায়াতের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। ফ্রেয়ার পিঠের সামান্য একটু জায়গা জাস্ট ছিলে গিয়েছিল, ইভেন ব্লিডিংও হয়নি ঠিকমতো। অথচ সেই সিলি একটা অ্যাক্সিডেন্টের পানিশমেন্ট কী ছিল? পানিশমেন্ট দেওয়া হয় ইনায়াতের ইনোসেন্ট মাকে! মিস্টার ইভান এর কোল্ড-ব্লাডেড অর্ডারে ইনায়াতের মায়ের পিঠ থেকে এক ইঞ্চি মাংস জ্যান্ত খুবলে নেওয়া হয়েছিল। জাস্ট ফর আ স্ক্র্যাচ! মায়ের সেই যন্ত্রণাকাতর চিৎকার আজও মাঝে মাঝে ইনায়াতের রাতের ঘুমের ঘোরে এসে হানা দেয়। মিস্টার ইভান তাদের এমন রকম এক বাবা যে কোনোদিন তাদের দুই ভাইবোনকে একবারের জন্যও মমতায় বুকে টেনে নেয়নি।

কখনো আদর করে কপালে একটা জেন্টেল কিস করেনি, ছোট ছোট আঙুলগুলো ধরে একটা সিঙ্গেল স্টেপও হাঁটতে শেখায়নি। এমনকি এই ফেক, শো-অফ করা সোসাইটিতে কখনো প্রাউডলি ‘এরা আমার সন্তান’ বলে আইডেন্টিটি পর্যন্ত দেয়নি। ক্যান ইউ ইমাজিন, জন্মের ঠিক দুই মাস পর তিনি প্রথম ওদের মুখ দেখেছিলেন? উনার কাছে ওরা কোনো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া গারবেজ! কিন্ডারগার্টেনের দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইনায়াতের, যা ওর হার্টকে হাজার টুকরো করে দিচ্ছে। ফ্রেয়ারা যেই এলিট স্কুলে পড়ত, ওরাও সেম স্কুলেই পড়ত। মিস্টার ইভান মাঝে মাঝে ফ্রেয়াদের স্কুল থেকে পিক করতে আসতেন। দূর থেকে দেখলেই ফ্রেয়ারা ‘বাবা বাবা’ বলে লাফিয়ে উনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ত, উনিও তাদের মমতায় নিজের দুই হাতে জড়িয়ে নিতেন। আ পারফেক্ট ফাদার ফিগার! অথচ ওরা দুই ভাইবোন একপাশে একদম হেল্পলেস আর ইনভিজিবল হয়ে দাঁড়িয়ে জাস্ট সেই হার্টব্রেকিং দৃশ্যটা দেখত। ছোট দুটো মন শুধু ভাবত, মানুষটা তো ব্লাড-কানেকশনে তাদেরও বাবা ছিলেন! তাহলে এত পার্শিয়ালিটি কেন? ফ্রেয়াদের সব আনরিজনেবল, এক্সপেনসিভ ডিমান্ড চোখের পলকে নিমিষেই ফুলফিল হতো, কিন্তু ওদের জন্য কোনোদিন নিজের হাতে একটা সিঙ্গেল, সস্তা চকলেটও কিনে আনেননি তিনি।

ইনায়াত চোখ বন্ধ করে একটা হেভি, কাঁপতে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও বের হয় না। বুকের ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো এখন আর ওকে পোড়ায় না। ছোটবেলা থেকে কন্টিনিউয়াস নেগলেক্ট, ফিজিক্যাল-মেন্টাল অ্যাবিউজ আর কনস্ট্যান্ট রিজেকশন পেতে পেতে এখন এসব আর ওর গায়েই লাগে না। একসময় যে ছোট্ট মনটা বাবার একটু অ্যাটেনশনের জন্য ক্রেভ করত, সেই হার্টটা এখন একদম স্টোন-কোল্ড হয়ে গেছে। নো এক্সপেকটেশনস, নো পেইন। শি ইজ জাস্ট ইউজড টু ইট।
হঠাৎ পেছন থেকে আয়াজের ভয়েস কানে আসে। সে এসে ইনায়াতের ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। বেশ কড়া, অথরিটেটিভ গলায় বলে ওঠে, “এক্সকিউজ মি! আমি কিন্তু সব শুনেছি। তুমি আমায় ‘পাঠা’ বলেছো? হাউ ড্যায়ার ইউ!”
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বেলকনিতে ইনায়াতের মনের ভেতর যেন রাজ্যের বিরক্তি এসে ভর করে। আয়াজকে দেখেই ওর সারা শরীর রিরি করে ওঠে। মনে মনে বিতৃষ্ণা নিয়ে বিড়বিড় করে বলে, “হোয়াট আ নাইটমেয়ার! শান্তি মতো একটু নিঃশ্বাস নেব, তারও উপায় নেই। চলে এসেছে আরেক ইবলিশ।”

আয়াজের দিকে একদম তীক্ষ্ণ, ব্লেডের মতো ধারালো দৃষ্টিতে তাকায় ইনায়াত। চোখে চোখ রেখে স্পর্ধার সাথে, কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলে, “আমার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে আপনি একটা আস্ত পাঁঠা, তাই পাঁঠাই বলেছি। দিস ইজ মাই রাইট! আমার নিশ্চয়ই ফ্রিডম অফ স্পিচ আছে, নাকি সেটাও কেড়ে নিয়েছেন?”
আয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রাগে, কপালের রগগুলো দপদপ করতে থাকে। কণ্ঠে একরাশ তাচ্ছিল্য আর বিষ ঢেলে সে বলে, “তুমি একটা বেয়াদব। যে মেয়ে নিজের বাবাকে ‘ব্রো’ বলে ডাকতে পারে, যার কাছে ওটা কোনো গালাগালির সমান নয়, তার মুখ থেকে তো এসব সস্তা ল্যাঙ্গুয়েজই বেরোবে! মাই ব্যাড, আমিই ভুলে গিয়েছিলাম তোমার স্ট্যান্ডার্ডের কথা।”

আয়াজের এই খোঁটানো কথাটায় ইনায়াতের মাথার শিরা যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আয়াজের কোনো কথায় এই প্রথম এতটা ফিউরিয়াস লাগছে ওকে, অপমানে রীতিমতো দমবন্ধ হয়ে আসছে। কোনো উত্তর না দিয়ে, আয়াজকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে চলে যেতে উদ্যত হয় সে। আয়াজ ওর হাতটা খপ করে চেপে ধরতে গেলেই ইনায়াত যেন আগুনে হাত পড়ার মতো সজোরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। একদম ঠান্ডা, হিসহিস করা গলায় বলে ওঠে, “ডোন্ট টাচ মি! আমার মতো মানুষকে টাচ করবেন না। আপনি একজন হাইক্লাস পার্সন, মিস্টার ক্রাউন! আপনার স্ট্যাটাসে দাগ লেগে যাবে।”
মুহূর্তেই আয়াজের চোখের দৃষ্টি পাল্টে হিংস্রতায় রূপ নেয়। ইনায়াতের এই অবজ্ঞা তার ইগোতে চরম আঘাত করে। এক ঝটকায় ইনায়াতকে ধাক্কা দিয়ে বেলকনির ঠান্ডা দেয়ালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে সে। দুজনের মাঝখানে এক সুতোরও দূরত্ব নেই। একদম ওর মুখের কাছে ঝুঁকে এসে, উষ্ণ শ্বাস ফেলে ফিসফিস করে ওঠে আয়াজ, “আমি টাচ করব। কী করবে তুমি? আমাকে আটকানোর ক্ষমতা তোমার আছে? আমার যতবার ইচ্ছে, আমি ঠিক ততবার টাচ করব।”

রাগের ঘোরে আয়াজ অ্যাগ্রেসিভ আর আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে ওঠে। ওর হাত চলে যায় ইনায়াতের গলায়, গর্দানে। নামহীন বন্য অধিকারবোধ নিয়ে ইনায়াতের জার্সির ভেতরে পেটে, পিঠে গাঢ়ভাবে স্পর্শ করতে করতে আয়াজ ঘোরের মধ্যে পাগলের মতো বলতে থাকে, “আমি এখানে টাচ করব, ওখানে করবআমার যেখানে ইচ্ছে, আমি ঠিক সেখানে করব! নো ওয়ান ক্যান স্টপ মি!”

আয়াজের এই জবরদস্তি আর গায়ে পড়া স্পর্শে ইনায়াতের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ছোটবেলার জঘন্য, অসহ্য ট্রমাগুলো যেন নিমেষেই ট্রিগার করে যায়। অন্ধকারে ঢাকা শুকিয়ে যাওয়া পুরনো ক্ষতগুলো আবার দগদগে হয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে এমনিতেই মনে মনে। মুহূর্তের মধ্যে তীব্র আক্রোশ আর ঘেন্নায় ফেটে পড়ে ইনায়াত। গায়ের সমস্ত জোর একত্র করে আয়াজের ডান উরুতে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দেয় সে। ব্যথায় আয়াজ কিছুটা হকচকিয়ে পিছিয়ে যেতেই, ইনায়াত নিজের হাতটা শূন্যে তুলে ওর গালে ‘ঠাস’ করে এক সপাটে চড় কষিয়ে দেয়।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৭

রাগে ইনায়াতের বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। দাঁতে দাঁত চেপে, চোখের দৃষ্টি দিয়ে যেন আয়াজকে ভস্ম করে দেবে, এমন ঘৃণায় সে হিসহিস করে ওঠে, “হ্যাঁ, করবিই তো! আমি তো তোর বাপ-দাদার কিনে নেওয়া প্রোপার্টি, তাই না? শেম অন ইউ! একটুও লজ্জা করে না তোর? যাকে তুই নিজের ওয়াইফ হিসেবে একদিনের জন্যও অ্যাকসেপ্ট করিস না, তাকে এভাবে যখন-তখন নিজের ফ্রাস্ট্রেশন মেটাতে টাচ করতে আসিস! তোর কী মনে হয়? আমি সস্তা কোনো ড্রামার উইক নায়িকা? তুই আমাকে দেয়ালে চেপে ধরবি আর আমি তোর ভয়ে থরথর করে কাঁপব? কিপ ইট ইন ইওর মাইন্ড, তোর এই জঘন্য আর তথাকথিত ‘হাইক্লাস’ ছোঁয়া তোর নিজের কাছেই রাখ, মিস্টার ক্রাউন! ডোন্ট ডেয়ার টু ক্রস ইওর লিমিট এগেইন!”

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here