প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৬
আরাফাত আদনান সামি
কিছুক্ষণ মায়ার দিকে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কৌশিক এক উন্মাদ পশুর মতো হসপিটালের করিডোর দিয়ে দৌড় দিল। ওর পেছনে রোহিত বলল,
“ব্রো! ব্রো, শোন!”
বলেই সে ও কৌশিকের পেছনে দৌড়াতে লাগল, কিন্তু কৌশিক আজ কোনো বাধা, কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করার অবস্থায় নেই। সে হসপিটালের নিচে নেমে নিজের জিপে গিয়ে বসল। ওর দুই হাত স্টিয়ারিংয়ের ওপর অনবরত আছাড় খাচ্ছিল। ফোনটা বের করে সে ওর ফেসবুক পেজ, ওর কোম্পানির অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট এবং ওর পার্সোনাল কন্ট্যাক্টের প্রতিটি বড় বড় মিডিয়া হাউজের এডিটরদের সরাসরি কল করতে লাগল।
“লাইভে যাও! এই মুহূর্তের মধ্যে ঢাকার প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ চালাও! চৌধুরী গ্রুপের কৌশিক নীর চৌধুরী স্ত্রী মিসেস মায়া নীর চৌধুরী’র জন্য জরুরি ও-নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন! যে ব্যক্তি এই রক্ত দিতে পারবে, ওকে এই কৌশিক নীর চৌধুরী এক কোটি টাকা ক্যাশ রিওয়ার্ড দেবে! ঢাকার প্রতিটি বিলবোর্ডে ওর নাম ঝুলিয়ে দেব! জাস্ট গেট মি দ্যাট ব্লাড!”
কৌশিক ফোনে চিললাতে লাগল। ওর গলা ভেঙে বসে গেছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। ওর এই রাজকীয়, অহংকারী রূপ আজ ওর ভালোবাসার জীবনের কাছে কতটা তুচ্ছ, তা ওর এই দিশেহারা রূপ দেখলেই বোঝা ঝাচ্ছিল। সে জিপটা স্টার্ট দিয়ে ঝড়ের গতিতে ঢাকার পিজি হসপিটালের ব্লাড ব্যাংকের দিকে রওনা হল। সে নিজেই এক একটা ব্লাড ব্যাংকে ঢুকছিল, ওখানকার স্টাফদের কলার চেপে ধরছিল, টাকার বান্ডিল ওনাদের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারছিল।
“ও-নেগেটিভ রক্ত নেই মানে কী? তোদের এত বড় হসপিটাল, তোরা এক ফোঁটা রক্ত দিতে পারিস না? তাহলে তোদের এই হসপিটাল রেখে লাভ কী? আমি এই পুরো ব্লাড ব্যাংক গুঁড়িয়ে দেব!”
কৌশিক কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ল্যাবের ভেতরে ঢুকে ওখানকার কাঁচের জারগুলো ভাঙতে লাগল। হঠাৎ এক টুকরো কাচ তার হাতে গিয়ে বিদল সাথে সাথে ওর হাত কেটে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু ওর সেই শারীরিক ব্যথার কোনো অনুভূতিই ওর মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছিল না। ওর মনে হচ্ছিল, ওর নিজের শরীরের সমস্ত রক্ত যদি ও-নেগেটিভ হতো, তবে সে নিজের বুক চিরে সমস্ত রক্ত ওর মায়ার শরীরে ঢেলে দিত। রোহিত পেছন থেকে এসে কৌশিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর নিজের চোখ দিয়েও জল পড়ছিল।
“ভাই! ভাই…এটা তুমি কী করছো? শান্ত হও! তুমি এভাবে পাগলামি করলে ভাবিকে কে বাঁচাবে? আমি আমাদের ফেসবুক পেজে অলরেডি পোস্ট দিয়েছি। হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করছে। কেউ না কেউ তো আসবেই, ব্রো! প্লিজ নিজেকে সামলাও!”
কৌশিক রোহিতের বুকের ওপর নিজের মাথাটা রেখে এক অবরুদ্ধ শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে কৌশিক নীর চৌধুরী কোনোদিন কারও সামনে মাথা নত করেনি, আজ সে ওর ছোট ভাইয়ের বুকের ওপর ভেঙে পড়ল।
“রোহিত… মায়া শুধু আমার ভালোবাসা না, ও আমার বেঁচে থাকার কারণ। ও আমার রাগ, আমার শান্তি, আমার হাসি, আমার পুরো পৃথিবী। ও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায়, আমি কার ওপর আমার এই রাগ দেখাব বল? কাকে ‘চিপকালি’ বলে খেপাব? কে রাগে চোখ বড় বড় করে বলবে, ‘আপনি আসলেই একটা অসভ্য’? কে আমার এলোমেলো জীবনটা নিজের মতো করে গুছিয়ে দেবে? আমার সব প্রোপার্টি নিয়ে নিক, সব সুখ নিয়ে নিক, তবুও আমার মায়াকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ো না আল্লাহ… কারণ মায়াকে ছাড়া কৌশিক শুধু নিঃস্ব না, একদম শেষ হয়ে যাবে…”
কৌশিকের এই বুকফাঁটা কান্না দেখে ব্লাড ব্যাংকের সাধারণ মানুষগুলোও ওনাদের চোখ মুছে ফেলল। কৌশিকের আর্তনাদ যেন পুরো ঢাকার আকাশকে ভারী করে তুলেছিল। সকাল ১০টা বেজে ১৫ মিনিট। সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। হসপিটালের ওটি-র ভেতরের ডক্টররা অনবরত মায়ার কৃত্রিম হার্টবিট সচল রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু রক্তের অভাবে ওর শরীর আস্তে আস্তে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছিল। কৌশিক জিপ নিয়ে হসপিটালের পাশে থাকা এক বিশাল ও পুরনো মসজিদে এসে থামল। ওর জুতো জোড়া গাড়িতেই পড়ে রইল। সে খালি পায়ে, রক্তমাখা শার্ট নিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকল। তখনও জোহরের নামাজের সময় হয়নি, মসজিদটা পুরোপুরি শান্ত, নির্জন। মেহরাবের সামনে থাকা কার্পেটের ওপর কৌশিক ধপাস করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ওর দুই হাত আকাশের দিকে তুলে সে আল্লাহর দরবারে ওর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ভিক্ষাটা চাইল। ওর চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রুধারা ঝরছে, যা ওর রক্তমাখা হাতের তালু বেয়ে কার্পেটের ওপর টুপটুপ করে পড়ছিল।
❝ইয়া আল্লাহ, ইয়া রব্বুল আলামিন! আমি জানি, তুমি সর্বশক্তিমান। তুমি যা করো, তার পেছনেও গভীর হিকমত থাকে। আমি জানি, তোমার ফয়সালার ওপর প্রশ্ন তোলার অধিকার আমার মতো নগণ্য বান্দার নেই। কিন্তু ওগো মালিক, ওগো সাত আসমানের মালিক, আরশের অধিপতি, তুমি তো আল-মালিকুল কুদ্দুস, আস-সালাম, আল-মু’মিন। আমি জানি, আমি গুনাহগার, পাপিষ্ঠ। আমার গুনাহর বোঝা অনেক ভারী। আমি ভুল করেছি, অনেক ভুল করেছি। অহংকার করেছি। নিজের সামর্থ্য আর ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করেছি। ভেবেছি হয়তো আমার টাকা, আমার ক্ষমতা, আমার বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু নিজের মতো করে ঠিক করে নিতে পারব। কিন্তু আজ, আজ মায়ার এই অবস্থা দেখে বুঝছি, আমি কত অসহায়। আমার কোনো ক্ষমতা নেই, কোনো শক্তি নেই, সবকিছুই কেবল তোমার রহমতে। তুমি না চাইলে একটা পাতা পর্যন্ত নড়ে না। আমি তো ধুলোর সমতুল্যও নই। ওগো ইয়া রব, আমার জান, আমার মায়ার ওপর একটু রহম করো। সে এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, ওগো আল্লাহ। তার প্রতিটি শ্বাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আমি কিছু করতে পারছি না। ওগো রাব্বুল আলামিন, তুমি তো রাহমান, তুমি তো রাহিম। তুমি তো শাফি, তুমি তো সুস্থতা দানকারী।
আমার মায়াকে তুমি ফিরিয়ে দাও। তার কষ্টগুলোকে তুমি দূর করে দাও। সে বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে, আল্লাহ। তার ওপর দিয়ে কত বড় ঝড় বয়ে যাচ্ছে! যদি এই কষ্ট তার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে থাকে, তবে হে ইয়া শাফি, তাকে সেই পরীক্ষা পার হওয়ার শক্তি দাও। সে বড্ড ছোট, বড্ড অবুঝ। এই কঠিন পরীক্ষা সে কীভাবে সইবে? তাকে সবর করার তৌফিক দাও, তাকে আরাম দাও। আল্লাহ, তুমি তো অন্তরের খবর জানো। তুমি তো সব জানো। তুমি জানো, ও আমার জীবনের কতটা জায়গা জুড়ে আছে। তুমি জানো, ওর একটা হাসি আমার জন্য কতটা শান্তি, ওর একটু ভালো থাকা আমার কতটা স্বস্তি। ওর কষ্ট দেখলে আমার বুকটা ফেটে যায়, আমি শ্বাস নিতে পারি না। আমার পুরো দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে আসে। তুমি কি চাও না, ও আবার আমার সামনে হাসিমুখে দাঁড়াক? আল্লাহ, আমি তোমার রহমত থেকে কখনোই নিরাশ নই। আমি জানি, তুমি চাইলে অসম্ভবকেও সম্ভব করে দিতে পারো। তুমি চাইলে মৃতকে জীবিত করতে করতে পারো।
তোমার রহমতের একটু ইশারাতেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। তুমি চাইলে কষ্টের পর সহজই আসে। তাই আমি তোমার কাছেই চেয়েছি, কেবল তোমার কাছেই চাই, আমার মায়াকে সুস্থতা দান করো। তার জীবনকে বরকতময় করে দাও। তাকে সব ধরনের বিপদ থেকে নিরাপদে রাখো। তার জন্য আমার সবার জীবন উজাড় করে দিতে প্রস্তুত আছি, তুমি শুধু তাকে ফিরিয়ে দাও। ইয়া আল্লাহ, আমার অন্তরকে সবর করার শক্তি দাও। আমাকে শক্তি দাও এই কঠিন সময়টা পার করার। আমাকে তোমার ফয়সালার ওপর সব সময় সন্তুষ্ট থাকার তৌফিক দাও। আর যদি আমার এই দোয়ায় কোনো কল্যাণ থাকে, তোমার এই পাপিষ্ঠ বান্দার আর্তনাদে যদি তোমার রহমতের নদী একটু হলেও উথলে ওঠে, তাহলে আমার মায়াকে তুমি দ্রুত সুস্থ করে আমার সামনে হাসিমুখে ফিরিয়ে দাও। তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করো। তুমি তো উত্তম পরিকল্পনাকারী, ইয়া রব। তোমার পরিকল্পনার ওপর আমার পুরো আস্থা আছে। তোমার রহমত ছাড়া আমার কোনো আশ্রয় নেই। তুমি আমাদের রক্ষা করো, তুমি আমাদের মাফ করো। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, যার কাছে আমি আমার এই মনের সব আকুতি জানাতে পারি। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, যে আমার এই মনের হাহাকার শুনতে পারে। ইয়া আল্লাহ, দয়া করো। ইয়া আল্লাহ, মায়াকে মাফ করো। ইয়া আল্লাহ, আমার মায়াকে তুমি সুস্থ করো। তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দিও না মাবুদ। তুমি আমাদের দোয়া কবুল করো। আমিন, ইয়া রব্বুল আলামিন।❞
কৌশিক কথাটা বলে ওর মাথাটা মসজিদের শক্ত সেজদার জায়গায় ঠুকে ঠুকে কাঁদতে লাগল। সে কাঁদতে কাঁদতে আবার বলল,
“আমি মানত করছি আল্লাহ, আমার মায়া যদি আজ সুস্থ হয়ে আমার বুকে ফিরে আসে, আমি ঢাকার প্রতিটি এতিমখানায়, প্রতিটি মসজিদে আমার চৌধুরী গ্রুপের পক্ষ থেকে আজীবন সমস্ত খরচ জোগাব। আশেপাশে যতগুলো মসজিদ আছে, সব জায়গায় আমি লক্ষ লক্ষ টাকা মন থেকে দান করব ওখানকার গরিব-দুঃখীদের দোয়ার জন্য। দয়া করো আল্লাহ, দয়া করো ওর ওপর!”
কৌশিক ওর পকেট থেকে ওর পার্সোনাল ওয়ালেট বের করে ওটার ভেতরে থাকা সমস্ত ক্যাশ টাকা, ওর ব্লাঙ্ক চেক বইটা মসজিদের দান বাক্সের সামনে রেখে ওখানকার খাদেমের হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন।
“হুজুর! আপনারা এখনই সব মুসল্লিদের ডাকুন! আমার মায়ার জন্য দোয়ার ব্যবস্থা করুন! এই চেক বইয়ে আমি সাইন করে দিচ্ছি, আপনাদের যত টাকা লাগে এই মসজিদের উন্নয়নের জন্য আপনারা তুলে নিন, জাস্ট আমার মায়ার জন্য আল্লাহর কাছে একটু হাত পাতুন!”
কৌশিকের এই বাউণ্ডুলে, কান্নায় ভেঙে পড়া রূপ দেখে মসজিদের ইমাম সাহেবও ওর মাথায় হাত রেখে এক দীর্ঘ মোনাজাত শুরু করলেন। ওনারা সবাই মিলে আল্লাহর দরবারে সেই নিষ্পাপ মেয়েটার জীবনের জন্য কান্নাকাটি করতে লাগলেন। এদিকে হসপিটালের তিন তলার ওটি-র সামনে নিধি সোফায় বসে এক দৃষ্টিতে ওটি-র বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে আছিল। ওর নিজের পরনের কামিজের কোণাটা ওর চোখের জলে ভিজে ভারী হয়ে গেছে। সে মনে মনে অনবরত মায়ার জন্য দোয়া করছি আর মায়ার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইছিল। ঠিক তখনই করিডোরের শেষ মাথা দিয়ে অত্যন্ত ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে মুখে হেঁটে এল রোহিত। ওর শার্টের হাতা গুটানো, কপালে ধুলো আর চোখ দুটো লাল। সারা ঢাকা শহর চষে ফেলেও সে এক ফোঁটা ও-নেগেটিভ রক্ত জোগাড় করতে পারেননি। ওর এই ব্যর্থতা ওকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল। সে করিডোরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে মেঝের ওপর বসে পড়ল এবং ওর দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেলল। নিধি রোহিতের এই অবস্থা দেখে আর নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারল না।
ওর ভেতরের সেই চিরচেনা রাগী, জেদি ‘মিরচি পকোড়া’ রূপটা আজ এক পরম মমতাময়ী নারীর রূপে রূপান্তরিত হলো। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রোহিতের সামনে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। নিধি কোনো দ্বিধা না করে ওর নরম, পবিত্র হাত দুটো দিয়ে রোহিতের সেই কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। রোহিত নিধির এই আচমকা ছোঁয়ায় চমকে উঠে ওর চোখের দিকে তাকাল। নিধির সেই রেগে থাকা চোখে আজ কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক পরম সান্ত্বনা আর ভালোবাসা।
“রোহিত ভাইয়া, নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেলবেন না। আপনি তো চৌধুরী বংশের স্তম্ভ। কৌশিক ভাইয়া তো অলরেডি পাগল হয়ে গেছেন, আপনিও যদি এভাবে হাল ছেড়ে দেন, তবে বাকিদের কে সামলাবে?”
নিধির কণ্ঠস্বর অত্যন্ত মিষ্টি ও শান্ত শোনাল। রোহিত নিধির হাতের বাঁধনটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে এক ভাঙা গলায় বললেন,
“নিধি, আমি প্রথমবার নিজের লাইফে নিজেকে এত অসহায় ভাবছি। আমাদের এত বড় কোম্পানি, এত পাওয়ার, এত টাকা তাও আমার ভাবির জন্য আমি এক ফোঁটা রক্ত জোগাড় করতে পারছি না। ভাবি যদি আজ আমাদের ছেড়ে চলে যায়, তবে আমার এই বড় ভাইটা জ্যান্ত মরে যাবে। কৌশিক ভাই মায়াকে ছাড়া পাগল হয়ে যাবে। আমি কী করব নিধি? আমি আর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মাথা কাজ করছে না।”
নিধি ওর অন্য হাতটা দিয়ে রোহিতের গালের এক ফোঁটা অশ্রু মুছে দিল। সে বলল,
“আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, রোহিত ভাইয়া। যে মায়া ভাবি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে তিয়াশাকে বাঁচিয়েছে, আল্লাহ ওনাকে এত সহজে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবেন না। কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আসবে। আপনি জাস্ট একটু শক্ত হোন।”
রোহিত নিধির চোখের মনিতে এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেল। এই মেয়েটা যতবার ওর সামনে এসে ঝগড়া করত, ওর মনে হতো এর চেয়ে তিতকুটে মেয়ে আর পৃথিবীতে একটিও নেই। কিন্তু আজ ওর এই বিপদের দিনে নিধি যেভাবে ওর পাশে এসে এক শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, ওর হাত ধরে ওনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তা রোহিতের হৃদয়ের গভীরে এক চিরন্তন ভালোবাসার জন্ম দিল। ওরা দুজনে মেঝের ওপর বসে একে অপরের হাত ধরে ওটি-র দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, এক অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায়।
১১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটা এই মুহূর্তে ওটি (OT)-র বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে একেকটা ডেথ ওয়ারেন্টের মতো শোনাচ্ছে। করিডোরের বাতাসে ক্লোরোফর্ম আর ডেথ-অ্যানজাইটির এক দমবন্ধ করা মিশ্রণ। ওটি-র ভারী দরজাটা এক কর্কশ শব্দ করে খুলে গেল। সেখান থেকে বের হয়ে এলেন ডক্টর সালাহউদ্দিন। ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মুখের চামড়া ভয়ে আর ক্লান্তিতে কুঁচকে আছে। ওনার শেষ নোটিশটা দেওয়ার জন্য যখন তিনি মুখ খুললেন, ওনার গলা কাঁপছিল।
“মিস্টার অমিতাভ পাটোয়ারী, ঘড়ির দিকে তাকান। আর মাত্র ১৫ মিনিট। এর মধ্যে যদি ও-নেগেটিভ (O-) রক্ত ওটি-র টেবিলে না পৌঁছায়, তবে ওনার ক্লিনিক্যাল ডেথ ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা খোলা থাকবে না। ওনার পালস রেট এখন থার্টিতে (30) নেমে এসেছে, যা যেকোনো সেকেন্ডে জিরো হয়ে যাবে।”
কথাটা ছুড়ে দিয়ে ডক্টর সালাহউদ্দিন হন্তদন্ত হয়ে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেলেন। এই একটা বাক্য করিডোরে উপস্থিত প্রতিটা মানুষের কলিজায় যেন তপ্ত শিসা ঢেলে দিল। রুবিনা পাটোয়ারী আর নিজের শরীরের ভর ধরে রাখতে পারলেন না; ঠাস করে ধূলিমলিন মেঝেতে ধসে পড়লেন। শূন্যে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে শেষবারের মতো বুকফাটা আর্তনাদ করতে লাগলেন। কৌশিক তখনো মসজিদ থেকে ফেরেনি। সে হয়তো আল্লাহর দরবারে নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু বাজি রেখে ওর মায়ার প্রাণের জন্য ভিখারির মতো কাঁদছে। কৌশিকের যে আর কিছু করার নেই। তার টাকার অভাব নেই কিন্তু সে হেরে যাচ্ছে রক্তের কাছে। সময় যেন জল্লাদের মতো হাত বাড়িয়ে মায়ার টুঁটি চেপে ধরছে। ১৪ মিনিট… ১৩ মিনিট… ১২ মিনিট…
মেঝের ওপর বসে থাকা অমিতাভ পাটোয়ারী স্তব্ধ পাথরের মতো নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুরুষ মানুষের কান্নার আওয়াজ হয় না, কিন্তু তাদের ভেতরের ভাঙচুরটা বাইরের যেকোনো সুনামি থেকে ধ্বংসাত্মক। রুবিনা পাটোয়ারী গগনবিদারী চিৎকারে হসপিটালের নার্সরা ছুটে এসে তাকে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু এক মায়ের আকুলতাকে আটকে রাখার সাধ্য কার?
“আমার মায়া! ও আল্লাহ, আমার নিষ্পাপ মেয়েটার বদলে তুমি আমাকে তুলে নাও! ও তো এখনো দুনিয়াটা দেখলই না ভালো করে! মাত্র কয়দিন পর ওর এইচএসসি পরীক্ষা… ও কত স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করছিল! কৌশিকের সাথে ওর সংসারটা মাত্র শুরু হয়েছিল, তুমি কেন আমার কোল খালি করছো মাবুদ!”
বাকি সবাই স্তব্ধ হয়ে আছে কারো মুখে কোন কথা নেই। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তিয়াশা আজ অপরাধীর মতো গুটিয়ে গেছে। এই মায়াকে সে সহ্য করতে পারত না। মায়া যখন কৌশিককে বিয়ে করে এই বাড়িতে পা রেখেছিল, তিয়াশার মনে হয়েছিল মায়া ওর কৌশিক কে ওর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তিয়াশা সবসময় জেদ দেখাত, মায়াকে নানাভাবে অবহেলা করত, খোঁটা দিয়ে কথা বলত। কিন্তু আজ? আজ সেই মায়াই নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে, সেই হিংস্র পাচারকারী চক্রের হাত থেকে তিয়াশাকে বাঁচিয়েছে। কিডন্যাপারদের সেই অন্ধকার গুহা থেকে তিয়াশাকে যখন ওরা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মায়া বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওদের ওপর। তিয়াশাকে বলেছিল,
“তুই পালা তিয়াশা! বাড়ির সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে! আমি তোর পেছনেই আসছি!”
তিয়াশা পালাতে পেরেছিল, কিন্তু মায়া পারেনি। ওদের অমানুষিক নির্যাতনে আজ মায়া ওটি-র শীতল বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তিয়াশা নিজের দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে দেওয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল।
“আমি পাপী! আমি আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মতো হিংসা করেছি ভাবিকে! ভাবি প্লিজ ফিরে আসো, আমি আর কোনোদিন তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব না! আমি তোমাকে কোনোদিন আর কষ্ট দেব না ভাবি, প্লিজ একটা বার চোখ খোল!”
নিধি তিয়াশার এই রূপ দেখে ওর দিকে এগিয়ে গেল। তিয়াশাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু নিধির নিজের চোখ থেকেও তখন শ্রাবণের ধারার মতো জল নামছে। নিধি রোহিতের দিকে তাকাল। রোহিত এখনো মেঝের ওপর বসে আছে, ওর হাত দুটো নিধির হাতের মুঠোয়। কিন্তু রোহিতের চোখ দুটো যেন শূন্য, নির্জীব। এক প্রবল ঝড় যেমন সমস্ত অরণ্যকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে শান্ত হয়ে যায়, রোহিতের অবস্থাও ঠিক তেমন। হঠাৎ হসপিটালের মেইন গেটের দিকে একটা তীব্র শোরগোল শোনা গেল। করিডোরের শেষ মাথায় থাকা লিফটের বেলটা সশব্দে বেজে উঠল এবং সিঁড়িঘর দিয়ে একসাথে অনেক মানুষের পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। রোহিত ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। নিধিও ওর সাথে উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ির মুখ দিয়ে প্রথমে ঢুকলেন চৌধুরী বংশের অভিভাবক আশরাফ চৌধুরী এবং আসিফ চৌধুরী। তাদের পেছনে পেছনে প্রায় বিশ-ত্রিশ জন যুবক ছেলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে করিডোরে প্রবেশ করল। সবার পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু প্রত্যেকের চোখে-মুখে এক তীব্র উদ্বেগ। তাদের পেছনে হন্তদন্ত হয়ে ওটি-র দিকে ছুটে আসছেন কৌশিক। কৌশিকের পায়ে কোনো জুতো নেই। ওর খালি পা দুটো ধুলো আর রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে। জামার হাতা দুটো ছেঁড়া, হাতের কাঁচের আঘাত থেকে তখনো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে। কিন্তু কৌশিকের সেই দিকে কোনো খেয়াল নেই। ওর চোখ দুটো লাল জবার মতো জ্বলছে। ও হসপিটালের করিডোরে পা রাখতেই বাঘের মতো গর্জে উঠল,
“কোথায় ডক্টর? ডক্টর সালাহউদ্দিন কোথায়? ব্লাড নিয়ে এসেছি আমি! আ-আমি ও-নেগেটিভ ব্লাড পেয়েছি! এই যে দেখুন!”
কৌশিকের পেছনের ছেলেদের মধ্যে চার-পাঁচজন একযোগে তাদের ব্লাড ডোনেশন কার্ড এবং সিরিঞ্জ ও ব্যাগের সিল দেখানো ফাইলগুলো উঁচিয়ে ধরল। কৌশিক কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আর পিজি হসপিটালে যে পাগলামি করেছিল, যে লাইভ ভিডিও ওর পেজ আর মিডিয়া হাউজগুলো থেকে প্রচার হয়েছিল, তা ঝড়ের গতিতে সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফেসবুকে লাখ লাখ শেয়ার আর টিভির স্ক্রলে “জরুরি ও-নেগেটিভ রক্ত প্রয়োজন” দেখে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ ছাত্র, রিকশাচালক, কর্পোরেট জব হোল্ডার,যার রক্ত ও-নেগেটিভ, সে সব কাজ ফেলে হসপিটালের দিকে ছুটে এসেছে। কেউ বাইক নিয়ে, কেউ উবারে, কেউ পায়ে হেঁটে এসেছে শুধু একটা নিষ্পাপ প্রাণ বাঁচাতে। কৌশিক ওটি-র দরজায় গিয়ে অনবরত ধাক্কা দিতে লাগল।
“ডক্টর! দরজা খুলুন! এই দেখুন, রক্ত এসে গেছে! এবার আমার মায়াকে বাঁচান!”
ডক্টর সালাহউদ্দিন ওটি-র ছোট উইন্ডো দিয়ে বাইরে তাকালেন। রক্তের ব্যাগ আর ডোনারদের দেখে ওনার মৃতপ্রায় চোখে যেন এক নতুন আলোর ঝলকানি দেখা দিল। তিনি দ্রুত ওটি-র দরজা খুলে নার্সদের নির্দেশ দিলেন,
“দ্রুত! ডোনারদের ভেতরে নাও! ক্রসম্যাচিং করার সময় নেই, স্ক্রিনিং করা ব্লাড সরাসরি ওটি-র ভেতরে ঢোকাও! কুইক!”
তিনজন ও-নেগেটিভ ডোনারকে সাথে সাথে ওটি-র ভেতরের প্রি-রূমে নিয়ে যাওয়া হলো ব্লাড নেওয়ার জন্য। ডক্টর সালাহউদ্দিন কৌশিকের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত নরম গলায় বললেন, “মিস্টার কৌশিক, আল্লাহ আপনার ডাক শুনেছেন। আর মাত্র ৫ মিনিট বাকি ছিল। আপনি শেষ সময়ে মিরাকল ঘটিয়েছেন। এখন বাকিটা ওপর ওয়ালার হাতে। আপনারা সবাই দোয়া করুন।”
দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। লাল বাতিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল। কৌশিক ওটি-র বন্ধ দরজার গায়ে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। ওর শরীর আর চলছিল না। গত ১৪ ঘণ্টা ধরে মায়াকে খোঁজা, কিডন্যাপারদের ডেরা ভাঙা, তারপর হসপিটালে এই রক্তের জন্য যুদ্ধ, ওর ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল। রোহিত দ্রুত গিয়ে কৌশিককে জড়িয়ে ধরল।
“ব্রো! তুমি পেরেছো! ভাবি ঠিক ফিরে আসবে! দেখো, আল্লাহ আমাদের নিরাশ করেননি!”
কৌশিক রোহিতের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছিল।
“রোহিত… মায়ার কিছু হবে না তো? আমি মসজিদে সেজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে আমার জীবনের সমস্ত সুখ লিখে দিয়ে এসেছি। আমি বলেছি, আমার মায়াকে সুস্থ করে দাও। আল্লাহ কি আমার ওপর দয়া করবেন না?”
রোহিত কৌশিকের মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল।
“অবশ্যই করবেন ব্রো। তুমি দেখো, ভাবি আবার তোমার সামনে ওই বড় বড় চোখ করে তাকাবে। তোমাকে ‘অসভ্য’ বলে বকবে।”
কৌশিক এক তীব্র যন্ত্রণাকাতর হাসি হাসল। ওর মনে পড়ে গেল মায়ার সাথে কাটানো শেষ মুহূর্তগুলোর কথা। মায়া কত অভিমানী একটা মেয়ে! কৌশিক একটু গম্ভীর প্রকৃতির আর কর্তৃত্বপরায়ণ। ও মায়াকে বড্ড শাসন করত, ভালোবাসার চাদরে এমনভাবে জড়িয়ে রাখত যে মাঝে মাঝে মায়া বলত,
“আপনার এই ভালোবাসা মাঝেমধ্যে আমার দম আটকে দেয়, জানেন? আপনি এত হিংস্র কেন?”
কৌশিক তখন মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলত, “কারণ তুমি আমার চিপকালি। চৌধুরী বংশের বড় বউকে আগলে রাখার দায়িত্ব এই কৌশিক নীর চৌধুরীর। আর আমার জিনিসে অন্য কারও নজর তো দূরের কথা, খারাপ বাতাসও যেন ছুঁতে না পারে।”
মায়া তখন রাগে মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকত। কৌশিক মায়ার সেই অভিমানী মুখটা দুহাতে ধরে ওর কপালে গভীর এক চুমু এঁকে দিত। কৌশিক মায়ার প্রতি ভালোবাসাও ছিল এক উগ্র, গভীর এবং একাধিপত্যবাদী। কিন্তু আজ সেই উগ্র কৌশিক মায়ার জীবনের জন্য দুনিয়ার সমস্ত মানুষের সামনে হাত পেতেছে। ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা পেরিয়ে ১টার দিকে এগোচ্ছে। ওটি-র ভেতর থেকে একের পর এক রক্তের ব্যাগ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রথম ব্যাগ, দ্বিতীয় ব্যাগ, তৃতীয় ব্যাগ… মায়ার শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হচ্ছে। ভেতরের ডক্টররা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এদিকে রুবিনা পাটোয়ারী এক কোণে বসে তসবিহ জপছেন। অমিতাভ পাটোয়ারী, আশরাফ চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরী হসপিটালের বাকি ফর্মালিটিজ আর বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করছেন। নিধি আর তিয়াশা পাশাপাশি বসে আছে। মাহিমা চৌধুরী চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী এক কোণে বসে আছেন। তিয়াশা এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর নিধি ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি বারবার ওটি-র দরজার দিকে তাকাচ্ছে। রোহিত কৌশিকের পাশে বসে ওর ক্ষতবিক্ষত হাতটাতে ডেটল আর তুলা দিয়ে ড্রেসিং করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কৌশিক হাতটা সরিয়ে দিল।
“রেখে দে রোহিত। এই শারীরিক ব্যথা আমার ভেতরের ব্যথার কাছে কিছুই না। মায়া যখন ওটি থেকে বের হবে, ও যদি দেখে আমার হাত কেটে গেছে, ও নিজে কেঁদে অস্থির হয়ে উঠবে আমাকে বেন্ডেজ করার জন্য। ও খালি একবার উঠুক আমি ওকে বড্ড জোরে জোরে বকা দিবো। জানিস রোহিত ও বড্ড নরম মনের রে… ও অন্যের কষ্ট সইতে পারে না। অথচ দেখ, আজ ও নিজেই কত বড় কষ্টের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।”
রোহিত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুলাটা রেখে দিল। ও নিধির দিকে তাকাল। নিধিও ঠিক সেই মুহূর্তে রোহিতের দিকে তাকাল। দুই জোড়া চোখের মিলন হলো। নিধির চোখে তখন এক অদ্ভুত আশ্বস্ততার ছায়া। সে রোহিতকে ইশারায় বোঝাল-‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। রোহিত নিজের অজান্তেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটা সত্যিই এক অদ্ভুত জাদুকরী। ওর রুক্ষ স্বভাবের পেছনে যে এত বড় একটা সুন্দর মন লুকিয়ে আছে, তা রোহিত আজ এই চরম বিপদের দিনে না এলে কোনোদিন জানতে পারত না। ঠিক দুপুর ২টা বেজে ৩০ মিনিট। ওটি-র ওপরের লাল বাতিটা হঠাৎ নিভে গেল। করিডোরের প্রতিটি মানুষ এক সেকেন্ডের মধ্যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবার চোখ তখন ওটি-র দরজার দিকে। কৌশিক সবার আগে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। ওর বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। দরজাটা খুলে গেল।
ডক্টর সালাহউদ্দিন ওটি থেকে বের হয়ে এলেন। ওনার মুখের মাস্কটা ওনার গলায় ঝুলছে। ওনার ফ্যাকাশে মুখে এখন এক ক্লান্ত কিন্তু বিজয়ী হাসি। তিনি কৌশিকের দিকে তাকিয়ে ওনার ডান হাতটা কৌশিকের কাঁধে রাখলেন।
“মিস্টার কৌশিক নীর চৌধুরী কংগ্রাচুলেশনস। মিরাকল হ্যাজ হ্যাপেন্ড। মায়ার শরীরে নতুন রক্ত খুব সুন্দরভাবে কাজ করা শুরু করেছে। ওনার ইন্টারনাল ব্লিডিং পুরোপুরি বন্ধ। পালস রেট এখন নরমাল ৭২ এ চলে এসেছে। সি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে পুরো করিডোরে যেন এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। রুবিনা পাটোয়ারী “আলহামদুলিল্লাহ” বলে আবার সেজদায় পড়ে গেলেন। অমিতাভ পাটোয়ারী আশরাফ চৌধুরী ও আসিফ চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। তিয়াশা আর নিধি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে লাফিয়ে উঠল। মাহিমা চৌধুরী ও সায়েরা চৌধুরী আলহামদুলিল্লাহ বলে শান্তির নিশ্বাস ফেললেন। কিন্তু কৌশিক? কৌশিক কোনো শব্দ করল না। সে কোনো চিৎকার করল না, হাসলও না। ও শুধু দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঢাকল এবং ওটি-র দরজার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে মেঝের ওপর বসে পড়ল। ওর চোখ দিয়ে তখন আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ও মনে মনে শুধু একটা কথাই বলছিল,
“ধন্যবাদ আল্লাহ… ধন্যবাদ আমার মায়াকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।”
রোহিত কৌশিকের সামনে এসে বসল। ও কৌশিকের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
“ব্রো! ভাবি ঠিক আছে! তুমি শুনছ তো? ভাবি আমাদের কাছে ফিরে আসছে!”
কৌশিক মুখ থেকে হাত সরাল। ওর চোখ দুটো তখনো ভেজা, কিন্তু ওটার ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকার কেটে গিয়ে এখন এক পরম শান্তির আলো ফুটে উঠেছে। ও উঠে দাঁড়াল।
“ডক্টর, আমি কি মায়াকে একবার দেখতে পারি? শুধু দূর থেকে একটু দেখব। ওর কি জ্ঞান ফিরেছে?”
ডক্টর সালাহউদ্দিন হাসলেন।
“এখনো অ্যানাস্থেশিয়ার প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। আমরা ওনাকে কেবিনে শিফট করছি। আধা ঘণ্টার মধ্যে ওনার জ্ঞান ফিরবে। তবে হ্যাঁ, বেশি ভিড় করবেন না। শুধু একজন বা দুজন ভেতরে যাবেন।”
কৌশিক মাথা নাড়ল।
“শুধু আমি যাব ডক্টর। আমার মায়ার পাশে এই মুহূর্তে অন্য কেউ থাকবে না।”
বিকেল ৪টা। হসপিটালের ভিআইপি কেবিন নম্বর ৪০৫। কেবিনের চারপাশটা একদম শান্ত। জানালার পর্দাগুলো একটু সরানো, সেখান থেকে বিকেলের নরম রোদ এসে মায়ার ফ্যাকাশে মুখের ওপর পড়েছে। মায়ার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে স্যালাইন আর ব্লাড ট্রান্সফিউশনের সুঁই ফোটানো। ওর ঠোঁট দুটো শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু ওটার মধ্যেও এক অদ্ভুত পবিত্রতা, আর সৌন্দর্য জড়িয়ে আছে। কৌশিক কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও ধীর পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। ওর পায়ের শব্দ এতই হালকা ছিল যে মনে হচ্ছিল ও কোনো কাঁচের তৈরি প্রাসাদে হাঁটছে, যেখানে একটু জোরে পা ফেললেই সব ভেঙে যাবে। কৌশিক মায়ার বিছানার পাশে থাকা চেয়ারটায় বসল। ও মায়ার সেই নরম, ফ্যাকাশে হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। মায়ার হাতটা বড্ড ঠাণ্ডা হয়ে আছে। কৌশিক নিজের গরম ঠোঁট দুটো মায়ার হাতের পিঠে ছোঁয়াল। ও নিজের গালের উষ্ণতা দিয়ে মায়ার হাতটা গরম করার চেষ্টা করতে লাগল।
“চিপকালি…”
কৌশিক বড্ড ভাঙা আর আদুরে গলায় ডাকল। কৌশিকের চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝাড়ছে। সে বলল,
“চোখ খোল মায়াবতী। দেখ তোর অসভ্যটা তোর সামনে কীভাবে অসহায়ের মতো বসে আছে। তুই না বলেছিলি আমি বড্ড অসভ্য, বড্ড শাসন করি তোকে? দেখ আজ থেকে আমি আর তোকে শাসন করব না। তুমি যেভাবে চাইবে, আমি ঠিক সেভাবেই চলব। তুমি শুধু একটা বার চোখ খোল না, প্লিজ।”
কৌশিকের চোখের এক ফোঁটা জল মায়ার হাতের ওপর পড়ল। মায়ার হাতের আঙুলগুলো একটু নড়ে উঠল। মায়ার চোখের পাতা দুটো কাঁপতে লাগল। ও বড্ড কষ্ট করে নিজের ভারী চোখের পাতা দুটো মেলতে লাগল। হসপিটালের সাদা ছাদ আর চারপাশের আলো দেখে মায়ার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ও নিজের চোখ দুটো আবার বন্ধ করে পরক্ষণেই আবার খুলল। এবার ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল এক চিরচেনা মুখ। অত্যন্ত চেনা, বড্ড প্রিয় আর ভালোবাসার সেই মুখ কৌশিক নীর চৌধুরী।কৌশিককে দেখে মায়ার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। ও বড্ড দুর্বল গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“আ… আপনি এসেছেন?”
কৌশিক মায়ার দিকে তাকিয়ে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। ও মায়ার মুখের ওপর নিজের মুখটা ঝুঁকিয়ে আনল। ওর কপালে, ওর দুই গালে, ওর বন্ধ চোখের পাতায় অনবরত পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল।
“হ্যাঁ রে আমার মায়াবতী, আমি এসেছি। তোমার এই কৌশিক তোমাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি, যেতেও পারবে না। তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি কেন দিলে? তুমি কেন ওই পশুদের সামনে নিজে গিয়ে দাঁড়ালে? তোমার যদি কিছু হয়ে যেত, আমি কাকে নিয়ে বাঁচতাম?”
মায়া কৌশিকের এই ব্যাকুলতা দেখে ওর চোখ দিয়েও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ও বড্ড কষ্ট করে নিজের ডান হাতটা তুলে কৌশিকের গালের সেই কাটা দাগ আর ধুলোবালি মাখা মুখটা ছোঁয়ার চেষ্টা করল।
“তিয়াশা… তিয়াশা ভালো আছে তো? ও বাড়িতে ফিরেছে?”
মায়ার প্রথম চিন্তাই ছিল তিয়াশাকে নিয়ে। কৌশিক মায়ার হাতটা নিজের গালে চেপে ধরল। “হ্যাঁ, তিয়াশা একদম ভালো আছে। ও বাইরে দাঁড়িয়ে তোমার জন্য কাঁদছে। ও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে মায়া। তুমি চৌধুরী বংশের সম্মান আর তিয়াশার জীবন বাঁচিয়েছো। তুমি এই চৌধুরী বংশের গর্ব।”
মায়া চোখ বন্ধ করে এক গভীর শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“আমি জানতাম… আপনি আমাকে ঠিক খুঁজে বের করবেন। যখন ওরা আমাকে মারছিল, যখন আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসছিল, আমার শুধু আপনার কথাই মনে পড়ছিল। আমি জানতাম আমার অসভ্য লোক আমাকে এত সহজে মরতে দেবে না। ও ঠিক চলে আসবে আমাকে বাঁচাতে।”
কৌশিক মায়ার ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল রাখল।
“আর কোনো কথা না মায়া। তুমি বড্ড দুর্বল। এখন শুধু বিশ্রাম নেও।”
কৌশিক মায়ার কপালের ওপর নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে রাখল। এই কেবিনের ভেতরের বাতাস তখন এক গভীর, পবিত্র ভালোবাসার গন্ধে ম ম করছিল। দীর্ঘ ঝড়ের পর যেমন এক শান্ত, স্নিগ্ধ সকাল আসে, কৌশিক আর মায়ার জীবনেও ঠিক তেমন এক নতুন ভোরের সূচনা হলো।
কেবিনের বাইরে করিডোরে তখনো সবাই অপেক্ষা করছিল। ডক্টর এসে জানালেন যে মায়ার জ্ঞান ফিরেছে এবং ও এখন সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত। রুবিনা পাটোয়ারী আর মাহিমা বেগম কেবিনের ভেতরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন, কিন্তু আশরাফ চৌধুরী তাদের আটকে দিলেন।
“এখন যেও না রুবিনা। কৌশিক আর মায়ার এই মুহূর্তটা একান্তই ওদের। ওরা একটা বিশাল যন্ত্রণা পার করে এসেছে। ওদের নিজেদের একটু সময় দাও।”
রোহিত করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। দুপুরের সেই মেঘলা আকাশটা কেটে গিয়ে এখন এক ঝলমলে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। রোদটা বড্ড মিষ্টি লাগছে। ওর পাশে এসে দাঁড়াল নিধি।
নিধির মুখে এখন আর সেই রাগী ভাবটা নেই। ও রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রোহিত ভাইয়া, এবার তো আপনার মুখে একটু হাসি দেখতে পারি? না মানে ভাবি তো এখন একদম ঠিক আছেন।”
রোহিত নিধির দিকে ঘুরল। ও নিধির চোখের দিকে তাকাল। নিধির এই শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ দেখে রোহিতের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হলো। যে মেয়েটাকে ও সবসময় ‘মিরচি পকোড়া’ বলে খেপাত, যার সাথে এক সেকেন্ড কথা বললেই ঝগড়া বেঁধে যেত, আজ সেই মেয়েটার উপস্থিতি রোহিতের হৃদয়ে এক চিরন্তন শান্তির সৃষ্টি করছে। রোহিত নিধির খুব কাছে এগিয়ে এল। নিধি একটু চমকে উঠে পিছাতে চাইল, কিন্তু রোহিত ওর হাতটা আবার নিজের হাতের মুঠোয় নিল। এবার আর সান্ত্বনার জন্য নয়, এবার এক অধিকার বোধ থেকে।
“নিধি…”
রোহিত বড্ড গম্ভীর কিন্তু এক গভীর আকুলতায় ডাকল।
“আজ যদি তুমি আমার পাশে এভাবে না দাঁড়াতে, আমি হয়তো সত্যিই ভেঙে পড়তাম। থ্যাংক ইউ সো মাচ নিধি… আমার এই কঠিন সময়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখার জন্য।”
নিধি রোহিতের এত কাছে আসা আর ওর ওই গভীর চোখের চাউনি দেখে নিজের অজান্তেই লজ্জা পেয়ে গেল। ওর ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। ও নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নিয়ে বড্ড নিচু গলায় বলল,
“আমি তো শুধু আমার বান্ধবীর ভাবির জন্য… আর আপনার এই অবস্থা দেখে…”
“শুধু বান্ধবীর ভাবির জন্য?”
রোহিত একটু দুষ্টুমি করে হাসল, ওর সেই চিরচেনা রূপটা আবার ফিরে আসছে।
“নাকি এই রোহিত চৌধুরীর জন্যও একটু টান ছিল, হুম?”
নিধি রাগে আর লজ্জায় মুখ লাল করে ওর হাতটা ছুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
“আপনি আসলেই একটা… একদম কৌশিক ভাইয়ার মতো অসভ্য! মায়া ভাবি ঠিকই বলে, চৌধুরী বংশের ছেলেরাই এমন!”
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩৫
রোহিত উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ওর এই হাসি দেখে করিডোরের বাকি মানুষগুলোও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চৌধুরী বংশের ছোট ছেলেও তার স্বাভাবিক রূপে ফিরে এসেছে। তিয়াশা দূর থেকে নিধি আর রোহিতের এই দৃশ্য দেখছিল। ওর মনে আজ কোনো হিংসা ছিল না। ও মায়ার এই আত্মত্যাগ দেখে বুঝতে পেরেছে যে ভালোবাসা মানে কাউকে কেড়ে নেওয়া নয়, ভালোবাসা মানে কাউকে আগলে রাখা, কারও জন্য নিজের জীবন বাজি রাখা। ও মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল এবং মায়ার কাছে মনে মনে ক্ষমা চাইল।
