অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৫
সুমি চৌধুরী
সন্ধ্যা ৭:০০ টার ফ্লাইটে উঠল নির্ভান। বিমানের ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করল সে। আজ সে যাচ্ছে, হয় কাউকে ছিনিয়ে আনতে নয়তো কাউকে চিরতরে শেষ করে দিতে। তার জেদ চেপেছে, যেকোনো একটা করেই সে ছাড়বে। চোখ দুটো বন্ধ করেই ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“আমি আসছি। নরক যন্ত্রণার জন্য রেডি থাক।”
হঠাৎ পকেটে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল। নির্ভান বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“স্যার আপনি এসেছেন এই খবরটা গোপন রাখতে হবে। শুভ্র যদি কোনোভাবে জানতে পারে তবে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। তার ওপর ওর বিয়ের সময়। আপাতত কোনো অ্যাকশন নেওয়া যাবে না। তাড়াহুড়ো করলে আপনি জিততে পারবেন না।”
নির্ভান দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল।
“হু’গা মারা কথা বলবি না তো। আমি বাংলাদেশে প্রেম করতে যাচ্ছি না যে নাটক করব। কাউকে শান্তিতে বিশ্রাম দিতে যাচ্ছি।”
ওপাশ থেকে লোকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল।
“স্যার আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এই মুহূর্তে ভুল পদক্ষেপ নিলে আপনি ধরা খেয়ে যাবেন। শুভ্রর পরিচয় তো জানেন। ও শান্ত বাঘের মতো। যখন শান্ত থাকে তখন লোকটাকে দেখাই যায় না। কিন্তু একবার খেপে গেলে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। বড় সাহেব অনেক কষ্টে আপনাকে জেল থেকে বের করেছে। তাই ধৈর্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে হবে।”
এত ঘ্যান ঘ্যান শুনে নির্ভানের চোখের মণি আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে অস্থিরভাবে নিজের চুলের ভেতর হাত চালিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। নির্ভান হিশহিশিয়ে বলল।
“তোর শা’উয়্যা ,আসতেছি তোর বা’ল কাটতে।”
বলেই সে ফোনটা আছাড় মারার মতো করে কেটে দিল। রাগে তার বুকের খাঁচা ওঠানামা করছে। ও ভয় পাবে? ওর মতো শিকারি বাঘের ভয় কিসের? পুরো পৃথিবী ওকে দেখে কাঁপপে। এই ভাবনাটা তাকে আরও অস্থির করে তুলল। জানালা দিয়ে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নির্ভান নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতের দিকে তাকাল, তার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। সে নিশ্চিত, এবার শুভ্রর সব দম্ভ সে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।
“তোর জামাই হবে আস্ত মোটা! পেট থাকবে ঢোলের মতো। হাঁটতে বের হলে সবাই বলবে এই যে, এইটা শুভ্রার মুটকা জামাই না?”
কথাটা বলেই মিহি তার কোমর দুলিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। শুভ্রা তার দিকে অগ্নিশর্মা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“”আর তোর জামাই হবে একদম টাকলা! রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সবাই আঙুল দেখিয়ে বলবে ওই যে, মিহির টাকলা জামাই! দেখ, মাথাটা কেমন বাতির মতো চকচক করছে।”
স্টেজের এক কোণায় দাঁড়িয়ে মিহি আর শুভ্রা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি ঝগড়ায় মেতে উঠেছে, পুরো অনুষ্ঠানবাড়িই তাদের হাসির শব্দে কাঁপছে। মিহি হঠাৎ শয়তানি হাসি দিয়ে শুভ্রাকে ধরতে দৌড় দিল। শুভ্রাও হাসতে হাসতে শাড়ির কুচি সামলে রাস্তার দিকে দৌড় শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে চৌধুরী বাড়ির দামী দামী গাড়িগুলো সারি সারি লাইনে এসে রিদিদের বাড়ির সামনে এসে থামল। ইশান, রিফাত, আর তুর্যর দলবল গাড়ি থেকে নেমে রাজকীয় ভঙ্গিতে বাড়ির ভেতরে দিকে হাঁটা দিল।
এদিকে শুভ্রা পিছন দিকে মিহির দিকে তাকিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আচমকা ইশানের সঙ্গে ধাক্কা খেল। ইশান হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে পিছনের দিকে ঠাস করে পড়ে গেল, আর শুভ্রাও গিয়ে ইশানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কেউই বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না। এক অপ্রস্তুত মুহূর্তে তাদের ঠোঁট একে অপরের সঙ্গে লেগে গেল। দুজনের শরীরই যেন মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে এলো। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বিস্মিত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রা কী ঘটেছে বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ইশানের ওপর থেকে উঠে শাড়ির কুঁচি ধরে প্রায় দৌড়েই বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
পিছন থেকে রিফাত আর তুর্য হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা। ওদিকে ইশানের কোমরে যে ব্যথাটা লেগেছে, তা যেন তার পুরো পুরুষত্ব আর ইগোকে চুরমার করে দিয়েছে। সে মাটিতেই বসে কোমরে হাত দিয়ে কাতরাতে কাতরাতে আর্তনাদ করে উঠল।
“আহহ! আমার কোমর! মনে হচ্ছে কোমরের হাড়টাই দুই টুকরো হয়ে গেছে।”
তুর্য হাসতে হাসতে ঈশানের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“ভালোই তো! ফ্রিতে একটা পুরো সিনেমার সিন দেখে ফেললাম।”
রিফাতও হেসে কুটিকুটি অবস্থা।
“একদম ঠিক বলেছিস! কী সুন্দর এন্ট্রি ছিল দেখেছিস? শুভ্রা দৌড়ে এলো, গিয়ে সোজা ঈশানের উপর পড়ল, তারপর এমন লজ্জা পেল যে দৌড়ে পালিয়ে গেল। একদম সিনেমার প্রথম দৃশ্যের নায়িকার মতো!”
ঈশান বিরক্ত মুখে তাদের দিকে তাকাল।
“জানি না ওই শুভ্রা আমার সঙ্গে কিসের শত্রুতা। বিশেষ করে আমার কোমরের সঙ্গে! আমি নিশ্চিত, ও মনে মনে শপথ নিয়েছে আমার কোমর একদিন না একদিন ভেঙেই ছাড়বে।”
কথাটা বলতেই তুর্য আবার হো হো করে হেসে উঠল।
“কোমরটা এখনও অক্ষত আছে তো, ভাই?”
“চুপ করো!”
ঈশানের ধমক শুনে রিফাত আর তুর্য আরও জোরে হেসে উঠল।শেষমেশ তুর্য হাসতে হাসতেই ঈশানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ঈশান তার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। শার্টে হালকা ধুলো লেগে গিয়েছিল। বিরক্ত মুখে ধুলো ঝেড়ে জামাটা ঠিক করল সে।এরই মধ্যে বাড়ির সামনে অতিথিদের ভিড় আরও বেড়ে গেছে। চারপাশে উৎসবমুখর পরিবেশ, আলো, হাসি আর কোলাহলে মুখর পুরো জায়গা।তিনজন একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল। স্টেজের সামনে এসে দাঁড়াতেই তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল রঙিন সাজসজ্জায় মোড়া পুরো অনুষ্ঠানস্থল। চারপাশে ব্যস্ততা, আনন্দ আর উৎসবের আমেজে জমে উঠেছে পরিবেশ।
ওদিকে শুভ্রা লজ্জায় দৌড়ে রুমে ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুকের ভেতরটা যেন এখনো ধুকপুক করে চলেছে। এক হাত বুকের ওপর চেপে ধরে দ্রুত শ্বাস নিতে লাগল সে। গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না। ভাবতেই সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে।
এদিকে রিদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজটা শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিল। হঠাৎ শুভ্রাকে এভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“কি হয়েছে তোর? এভাবে কুকুরের দৌড়ানি খাওয়া মানুষের মতো দৌড়ে আসলি কেন?”
শুভ্রা দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। মুখের অস্থিরতা লুকিয়ে জোর করে একটা হাসি এনে বলল,
“কিছু হয়নি রে। পরে বলব। এখন চল, তোর জন্য হলুদ চলে এসেছে।”
রিদি সন্দেহভরা চোখে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না।কিছুক্ষণ পর পাখি, মিহি, শুভ্রাসহ আরও অনেক মেয়ে মিলে রিদির মাথার ওপর একটি ওড়না ধরল। হাসি-আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের মাঝেই তারা ধীরে ধীরে রিদিকে নিয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।এদিকে স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে ঈশান, তুর্য আর রিফাত আড্ডায় মশগুল ছিল।হঠাৎ ঈশানের চোখ চলে গেল বাড়ির সদর দরজার দিকে।এক মুহূর্তেই তার চারপাশের সব শব্দ যেন দূরে মিলিয়ে গেল।ওড়নার নিচে মাথা নত করে হাঁটছে রিদি। আর তার চারপাশে ওড়নার কোণা ধরে হেঁটে আসছে একঝাঁক মেয়েরা।
কিন্তু ঈশানের দৃষ্টি সেখানে আটকে রইল না।তার চোখ গিয়ে থামল শুভ্রার ওপর।হলুদ রঙের সবুজ পাড়ের শাড়িতে মেয়েটা যেন চারপাশের সব আলো নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। সারা শরীরে লাল গাঁদা ফুলের গয়না, মাথার খোঁপায় ফুল, হাতে ফুলের চুড়ি, কোমরে ফুলের বেল্ট দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো হলুদ পরী ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে।সন্ধ্যার আলো, চারপাশের সাজসজ্জা আর মানুষের ভিড়ের মাঝেও মেয়েটাকে আলাদা করে চোখে পড়ছে।
ঈশান অজান্তেই স্থির হয়ে গেল।মুহূর্তের জন্য চারপাশের কোলাহল, মানুষের কথা, তুর্য-রিফাতের আড্ডা সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গেল।শুধু স্পষ্ট হয়ে রইল হলুদ শাড়ি পরা এক চঞ্চল মেয়ের অবয়ব। ঈশান ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে শুভ্রার চোখ গিয়ে পড়ল ঈশানের দিকে।
দূর থেকে ঈশানকে নিজের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। লজ্জায় তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল সে। আজকাল কেন জানি ঈশানের সামনে এলেই তার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়। হৃদপিণ্ডটা অকারণে দ্রুত চলতে শুরু করে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
আর হবেই বা না কেন?শুভ্রা বুঝে গেছে, সে আর স্বাভাবিক নেই।কবে, কখন, কীভাবে সে জানে না।শুধু জানে, অজান্তেই ঈশান নামের মানুষটার প্রতি তার হৃদয়ে গভীর এক অনুভূতি জন্ম নিয়েছে। এমন এক অনুভূতি, যার নাম ভালোবাসা।রিদিকে স্টেজের মাঝখানে বসানো হলো। চারপাশে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে সবাই। বক্সে উচ্চস্বরে গান বাজছে, তরুণ-তরুণীদের হাসি-চিৎকারে পুরো পরিবেশ মুখরিত হয়ে উঠেছে।শুভ্রা হঠাৎ তুর্য আর রিফাতের বাবা-মাকে দেখতে পেয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল।
মিষ্টি হেসে সালাম করতেই সবাই স্নেহভরা হাসিতে সালামের জবাব দিল।তুর্যের মা শুভ্রার থুতনি আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ! তুমি তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছ মা। সেই ছোটবেলায় দেখেছিলাম তোমাকে।”
শুভ্রা লাজুক হেসে মাথা নিচু করল।তুর্যের মা এবার নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি কি মিথ্যা বলেছি, তুর্যের বাবা? দেখেন না, মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে! আর দেখতে তো একেবারে পরীর মতো হয়েছে।”
তুর্যের বাবা মৃদু হেসে বললেন,
“আরে, মেয়েরা তো চোখের পলকেই বড় হয়ে যায়। বুঝতেই সময় লাগে না।”
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।শুভ্রাও মুচকি হেসে আবার স্টেজে গিয়ে রিদির পাশে বসল।এদিকে তুর্যের মা শুভ্রার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বললেন,
“শুনুন, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আমরা তো তুর্যের বিয়ের কথা ভাবছি। তাই বলছিলাম, বাইরে মেয়ে খুঁজতে যাব কেন? শুভ্রার সঙ্গেই তুর্যের বিয়ের কথা বলি না! মেয়েটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ছেলের বউ হিসেবে একদম পারফেক্ট। আর দুজনকে মানাবেও দারুণ।”
কথাটা শুনে তুর্যের বাবা হেসে ফেললেন।
“তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিই?”
“কী সারপ্রাইজ?”
“তুর্য আর শুভ্রার বিয়ের কথা আমি আজ থেকে দুই বছর আগেই ঠিক করে রেখেছি।”
তুর্যের মা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেললেন।
“বলেন কী!”
“হ্যাঁ। এই ব্যাপারটা শুধু আমি আর সোহান চৌধুরী জানি। আর কেউ না।”
“কিন্তু কবে? কীভাবে?”
তুর্যের বাবা স্মৃতিমাখা হাসি হেসে বললেন,
“একদিন আমি আর সোহান চৌধুরী একসঙ্গে গাড়িতে করে ফিরছিলাম। তখন হঠাৎ রাস্তায় শুভ্রাকে দেখি। মেয়েটা তখন সবে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। প্রথম দেখাতেই আমার খুব ভালো লাগে। তারপর সোহানকে বললাম বিষয়টা। উনিও রাজি হয়ে গেলেন।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
“তুর্যকে তো তিনি ছোটবেলা থেকেই চেনেন। ছেলেটার স্বভাব-চরিত্র, পরিবার সবই তার জানা। আর শুভ্রাও তুর্যকে ছোটবেলা থেকেই চেনে। তাই দুজনকে নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা ছিল না।”
তুর্যের মা এখনও বিস্মিত মুখে তাকিয়ে আছেন।
তুর্যের বাবা হেসে বললেন,
“আজই তোমাকে কথাটা বলতাম। কিন্তু দেখো, নিয়তির খেলাটা কেমন! আমি বলার আগেই মেয়েটাকে তোমারও পছন্দ হয়ে গেল।”
তুর্যের মা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠল। তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন,
“আপনি জানেন না, কী বড় সারপ্রাইজ দিলেন আমাকে! আমি আমার ছেলের বউ হিসেবে শুভ্রাকেই চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা করুন।”
তুর্যের বাবা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
“আরে, এতটা উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল, তুর্য যখন আমার ব্যবসার দায়িত্ব নেবে, তখনই বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা হবে। এখন তো তুর্য ব্যবসা সামলাতে শুরু করেছে। বিষয়টা জানার পর সোহান চৌধুরীও আমাকে বলে রেখেছেন, আজকের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফিরেই তুর্য আর শুভ্রার বিয়ের বিষয়ে বসবেন।”
তুর্যের মা খুশিতে আবারও শুভ্রার দিকে তাকালেন। মনে মনে যেন মেয়েটাকে ইতোমধ্যেই নিজের ছেলের বউ হিসেবে কল্পনা করে ফেলেছেন।
এদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।স্টেজজুড়ে আনন্দ আর কোলাহলের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে। একে একে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই স্টেজে উঠে রিদির গালে, কপালে আর হাতে হলুদ মেখে দিতে লাগল। চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠছে বারবার। হাসি, ঠাট্টা আর শুভকামনায় মুখর পুরো পরিবেশ।
হঠাৎ বক্সে বাজতে থাকা গানের ভলিউম আরও একটু বেড়ে গেল।আর তার সঙ্গে সঙ্গে শুভ্রা, মিহি, পাখি আর তাদের বয়সী আরও কয়েকজন মেয়ে স্টেজের সামনে চলে এলো।মুহূর্তের মধ্যেই তারা গানের তালে তালে নাচ শুরু করে দিল।
কেউ দুই হাত উঁচু করে ঘুরছে, কেউ কোমর দুলিয়ে তাল মিলিয়ে নাচছে, কেউ আবার হাসতে হাসতে অন্যদের টেনে নিচ্ছে মাঝখানে।
নাচতে নাচতে শুভ্রা, মিহি, পাখি আর বাকি মেয়েরা একসঙ্গে গেয়ে উঠল।
“নান্টু ঘটকের কথা শুইনা,
অল্প বয়সেই করলাম বিয়া,
মুরুব্বি কয়লো সবাই নো টেনশন নো চিন্তা…”
গানের তালে তালে তারা সবাই একসঙ্গে হাত তুলে বুকের সামনে হৃদয়ের আকৃতি বানিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগল।তারপর আরও জোরে গেয়ে উঠল।
“পোলা তো নয়, সে তো আগুনের গোলা রে,
পোলা তো নয়, একখান আগুনের গোলা”
চারপাশের ছেলেরা শিস বাজিয়ে আর চিৎকার করে উৎসাহ দিতে লাগল।
“ওহহহহ!”
স্টেজের সামনে হৈচৈ পড়ে গেল।এদিকে ঈশান দুই হাত বুকে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।এরা আবার কোন গান বের করে নাচছে।মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকাতে যাবে, ঠিক তখনই। শুভ্রা নাচতে নাচতেই তার সামনে এসে দাঁড়াল।
ঈশান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা নির্লজ্জের মতো তার শার্টের কলার চেপে ধরল।
“এই”
কথা শেষ করার সুযোগই পেল না সে।শুভ্রা টেনে তাকে সোজা স্টেজের মাঝখানে নিয়ে এলো।চারপাশে মুহূর্তেই হইহই পড়ে গেল।রিফাত আর তুর্য তো হাসতে হাসতে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।ঈশান অবিশ্বাস নিয়ে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে আছে।আর শুভ্রা?সে দিব্যি গানের তালে তালে নাচতে নাচতে ঈশানের চারপাশে ঘুরে গেয়ে উঠল।
“দেখলে তারে মনে হয় বড়ই ভোলা-ভালা,
আমার লাগি পরানে তার দেয় না কভু দোলা”
গান গাইতে গাইতে একবার আঙুল তুলে ঈশানের দিকে দেখাল।ব্যাস!জনতা আবার চিৎকার দিয়ে উঠল।
“উইইইইই!”
ঈশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।আর শুভ্রার মুখে তখন দুষ্টু হাসি।গান শেষ হতেই সে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে ঈশানকে আবার সাইডে সরিয়ে দিল।তারপর বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবার গেয়ে উঠল।
“মুরুব্বিরা কয়লো সবাই নো টেনশন নো চিন্তা,
পাইছো জীবনে দারুণ একটা পোলা।”
“পোলা তো নয়, সে তো আগুনের গোলা রে,
পোলা তো নয়, একখান আগুনের গোলা”
স্টেজজুড়ে হাসি, হাততালি আর শিসের শব্দে উৎসব যেন আরও জমে উঠল।গান শেষ হতেই শুভ্রা হাসতে হাসতে মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে আর কোথাও দেখা গেল না।
এদিকে স্টেজের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানের মুখ অন্ধকার হয়ে আছে।এই মেয়েটার সাহস দিন দিন বাড়ছেই!সবার সামনে তার শার্টের কলার ধরে টেনে স্টেজে তুলে এনেছে। এখন পুরো অনুষ্ঠানে কে কী ভাবছে ইশ্বরই জানে।চোয়াল শক্ত করে সে ভিড় থেকে বেরিয়ে এলো।
আজ শুভ্রাকে খুঁজে বের করবেই।
তারপর…
তারপর কী করবে সে নিজেও জানে না, তবে মেয়েটার খবর আছে আজকে। স্টেজের আশপাশে খুঁজল।বাড়ির ভেতরে খুঁজল।কিন্তু শুভ্রার কোনো হদিস নেই।হাঁটতে হাঁটতে সে বাড়ির সামনের নিরিবিলি রাস্তার দিকে চলে এলো।চারপাশে রঙিন লাইটের আলো ছড়িয়ে আছে। দূর থেকে ভেসে আসছে গানের শব্দ আর মানুষের কোলাহল।ঈশান থেমে চারপাশে তাকাল।
“গেল কোথায় মেয়েটা?”
নিজের মনেই বিড়বিড় করল সে।ঠিক তখনই
ঠান্ডা, নরম কিছু একটা তার গালে ছুঁয়ে গেল।ঈশানের পুরো শরীর কেঁপে উঠল।প্রতিক্রিয়া দেখাতে এক সেকেন্ডও সময় নিল না।দ্রুত হাত বাড়িয়ে সে নিজের গালের কাছে থাকা হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।পেছন থেকে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো পরিচিত এক কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ।
“ঈ-ঈ… ঈশান ভাই…”
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৪
শুভ্রা!কণ্ঠস্বর শুনেই ঈশানের চোখ সরু হয়ে এলো।
হাতের মুঠো আরও শক্ত হলো।অন্ধকারে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল সে।
শুভ্রা ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।চোখেমুখে স্পষ্ট ধরা পড়েছে অপরাধবোধ।ঈশান কিছু বলল না। ধীরে ধীরে শুভ্রার হাতটা নিজের দিকে টেনে আনল।তারপর হাতের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকল।সঙ্গে সঙ্গে কাঁচা হলুদের তীব্র গন্ধ নাকে এসে লাগল।ঈশানের নাক কুঁচকে উঠল।আর বুঝতে একটুও বাকি রইল না।এই দুর্ধর্ষ মেয়েটা একটু আগে সুযোগ বুঝে তার গালে হলুদ মেখে দিয়েছে
