Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৮৭

জাহানারা পর্ব ৮৭

জাহানারা পর্ব ৮৭
জান্নাত মুন

আমি নাবিলা চৌধুরীর রুমের সামনে এসে দেখি দরজা ভেতর থেকে ভেজিয়ে রাখা। তাই নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। পুরো ঘর মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন। নাবিলা চৌধুরী বিছানায় শুয়ে আছেন। আমি খাবারের প্লেট টি-টেবিলের উপর রেখে এগিয়ে গিয়ে ব্যালকনির পর্দা সরিয়ে দিলাম। অমনি হুড়মুড়িয়ে দিনের আলো ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। আচমকা বুঁজে রাখা চোখে-মুখে আলোর ঝলমলে রশ্মি ঠিকরে পড়ায় চোখ খিঁচে নিলেন নাবিলা চৌধুরী। তারপর চোখ মেলে তাকাতেই আমাকে দেখতে পেলেন। অনিচ্ছুক থাকা সত্যেও ধীরলয়ে উঠে বসলেন। এক হাতে অক্ষিযুগল কচলাতে কচলাতে বড্ড অনিহা নিয়ে শুধালানে,

–“কি হয়েছে? এভাবে ঘরের পর্দা সরালে কেন? দেখছিল তো ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম!”
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,“সকালেও তেমন কিছু খেলেন না। এখন দিন গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলো, অথচ আপনি না খেয়ে আছেন। এভাবে চললে তো শরীর খারাপ হবে, নাকি?”
–“আর শরীর খারাপ!”
অস্ফুটে আওড়ালেন তিনি। আমি খাবারের প্লেট নিয়ে উনার পাশে বিছানায় বসলাম। প্লেট উনার সামনে রেখে আরজ করে বললাম,“মা খেয়ে নিন খাবারটুকু। আপনার শরীরটা কদিন ধরেই ভালো যাচ্ছে না। দেখেই বুঝাচ্ছে সুস্থ শরীরটা ভেঙে পড়ছে।”
–“রেখে যাও, পরে খিদে লাগলে খাব খন।”
সহসা অমত পোষণ করে বললাম,“সে তো কেমন খান কদিন ধরে দেখছিই! যেমন খাবার দিয়ে যাই তেমনই প্লেটে পড়ে থাকে। মাঝেমধ্যে মনে হয় পাখি বোধহয় খাবারে কয়েক জায়গায় ঠোকর দিয়েছে!”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানার পিঠে মাথা হেলিয়ে দিলেন তিনি। উনার বিছানায় রাখা হাতটা আমি এক হাতে মুঠোবন্দী করে আস্থা দিয়ে বললাম,“এমন করলে কি আর জীবন চলবে, মা? নিজেকে একটু শক্ত করেন।”
শ্লেষ হাসলেন তিনি। তার এই মিইয়ে যাওয়া শুকনো চেহারায় তা বড্ড মর্মস্পর্শী। তিনি আলতো অধর নাড়িয়ে মৃদু গলায় বললেন,“আমার আর জীবন কতটুকই বা! অনেক বছর তো আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলেন। শুকিয়া উনার প্রতি। এবার তো বয়স হচ্ছে।”

–“বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। সারাক্ষণ এভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকেন বলেই মন ভালো হচ্ছে না। কাল থেকে আগের মতো বিজনেসে হাত লাগাবেন। না হলে ঘরে বন্দী হয়ে থাকবেন না। বাইরে হাঁটা-চলা করবেন, সবার মধ্যে থাকলে দেখবেন ভালো লাগছে।”
আমার কথা শুনে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন তিনি। বললেন,“এই বাড়িতে আর সবার! এক এক করে তো সবাই নিজ কর্মফল ভোগ করছে। এবার বোধহয় আমার পালা।”
তিনি থামলেন। উনার চেহারা বিষন্ন দেখাল। তিনি আবার কথা জুড়ে দিয়ে বললেন,“নিজের কথা ভাবি না। শুধু চিন্তা হয় আমার এইটুকু মেয়েটার জন্য। ছোট মানুষ, এখনো পৃথিবী নিয়ে ধ্যানজ্ঞান হলো না। বড় চিন্তা হয়।”
আমি নাবিলা চৌধুরীর কাঁধ আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম। ভরসা দিয়ে বললাম,
–“মা, আপনি অহেতুক বেশি ভাবছেন। এবার দেখবেন সব সুন্দর করে চলবে। নিজেকে একটু শক্ত রাখেন। আমি আর আপনার ছেলে তো আছি। সব ঠিক করে দিব। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।”
নাবিলা চৌধুরীর চোখজোড়া আর্দ্র হয়ে উঠল। চোখের নোনা জল ধরে রাখতে পারলেন না বিধায় গাল বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি আলতো হাতে মুছে দিলাম। বুঝতে পারছি মানুষটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাই জোর করে নিজ হাতেই খাইয়ে দিলাম।

ব্যস্ত সড়কে গাড়িটি নিজ গতিতে চলছে। ভেতরে বসে আছে নোহা আর ইতি। ইতির চেহারায় উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। বেচারি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বড্ড চিন্তিত হয়ে আছে৷ কদিন এক নাগাড়ে অসুস্থ থাকায় পুতুলের মতো গোলগাল চেহারাটা মিলিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে। মেয়েটা জানালার গ্লাস দিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করছে আর দাঁত দিয়ে নখ কুটকুট করছে।
ইতির পাশের সিটেই চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে বসে আছে নোহা। তার চেহারায় কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। সে আপন মনে চিপস চিবোচ্ছে, আর যতসব উদ্ভট প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছে সামনের সিটে আসীন চালককে। বেচারা মধ্যবয়সী ড্রাইভার কোনোমতে হজম করে নিচ্ছেন নোহার এহেন অনর্গল বকবকানি আর মাথা ধরার মতো অ’ত্যাচার। অনেকক্ষণ যাবৎ নোহা লক্ষ্য করল ইতির চিন্তিত চেহারা। সে চিপসের প্যাকেট ইতির মুখের সামনে ধরতেই ইতি মাথা নেড়ে মানা করল খাবে না। নোহা এবার শুধালো,
–“কিছু হয়েছে লিটিল গার্ল?”
ইতি পুনরায় মাথা নেড়ে না করল। নোহা আবার জিজ্ঞেস করল,“আমরা কোথায় যাচ্ছি বল তো?”
ইতি কিছু বলার আগেই গাড়িটি একটি পার্কের সামনে এসে থামল। ওরা দুজন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। নোহা আরেকটি চিপস মুখে পুড়ে বলল,“ওহো তুমি পার্কে আসার জন্য এমন করছিলে। ভালো করেছ। আমারও বাসায় বোরিং লাগছিল। চল আমরা দুজন পার্কটি ঘুরে দেখি। ইতি কোনো জবাব দিল না। চেহারা তার শুকনো। সে আশেপাশে সচকিত দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। নোহাও ইতির দৃষ্টি অনুযায়ী আশেপাশে তাকাল। অতঃপর বলে উঠলো,

–“আরও কেউ কি আসবে বেইব?”
ইতি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল। নোহা আশেপাশে দেখে নিল। না, চেনা কেউ তার নজরে আসে নি। সে পুনরায় প্রশ্ন করল,“কে আসবে বল তো?”
ইতি কিছু বলার আগেই একটি কালো গাড়ি এসে থামল। মূহুর্তেই ইতির ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা খেলা করল। নোহা আরেকটি চিপস মুখে ঢুকানোর জন্য উদ্যুত হলো, তক্ষুনি গাড়ি থেকে জিতু ভাইয়া নামল। সহসা নোহার হাত মুখের সামনেই স্থির হয়ে গেল। হা করে চোখ পিটপিট করে সামনের লোকটাকে আপাদমস্তক পরখ করে নিল। লোকটার চোখে কালো রোদ চশমা। পরণে সফেদা রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট। শার্টটি বলিষ্ঠ দেহের সাথে দারুণ আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে। শার্টের হাতা ভাজ করে গুটিয়ে রাখা। জিতু ভাইয়া ইতির সাথে নোহাকে দেখে বিরক্ত হলো। নাখোশ মুখেই বড় বড় কদমে এগিয়ে যেতে লাগল। নোহা সামনের লোকটা কে নিশ্চিত হতেই টুক করে মুখের ভেতর চিপসটি পুড়ে নিল। অতঃপর চেচিয়ে উঠলো,

–“জিতু বেবি..”
বলেই নোহা ছুট লাগল। যেই জিতু ভাইয়ার উপর হামলে পড়বে অমনি লোকটা এক পাশে সরে গেল৷ বেখেয়ালি নোহা মুখ থুবড়ে পড়ল জমিনে। হাতে থাকা চিপসের প্যাকেট থেকে চিপসগুলো ছিটিয়ে পড়ল মাটিতে। নোহার এহেন কান্ডে জিতু ভাইয়া বিরক্ত হলো৷ তিনি চোখের চশমা খুলে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে দৃষ্টি ঘুরাল। ইতি তৎক্ষনাৎ ছুটে এসে নোহাকে ধরে তুলল। নোহা বিস্ময় নিয়ে জমিনে পড়ে থাকা চিপসগুলো দেখতে দেখতে আওড়ালো,
–“এ যাহ্, পড়ে গেছে!”
অতঃপর হাতের প্যাকেটে সুক্ষ্ম নজর দিতেই খুশিতে গদগদ করে বলে উঠলো, “হেহেহে তিনটা চিপস বেঁচে গেছে।”
নোহার কান্ড দেখে আড়ালে তপ্তশ্বাস ছাড়ল জিতু ভাইয়া। ইতি ঝুঁকে নোহার উম্মুক্ত হাঁটুতে লেগে থাকা ময়লা তার ছোট হাতের সাহায্যে মুছে দিল। সরল চেহারায় জিজ্ঞেস করল,

–“নোহাপু ব্যথা পেয়েছ?”
–“না না না আমি ঠিক আছি।”
তারপর ঘুরে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার উদ্দেশ্য প্রশ্ন করল,“জিতু বেবি তুমি এখানে?”
জিতু ভাইয়া উত্তর দিতে পারল না। সে শান্ত চেহারায় ইতির দিকে তাকাল। ভিডিও কলে কথা হয়েছে তাদের। জিতু ভাইয়া তখন বুঝতে পেরেছে মেয়েটা অনেক শুকিয়ে গেছে। তাই বলে এতটা শুকিয়ে গেছে আগে বুঝতে পারে নি। ইতির চেহারা দেখে বড় মায়া হলো তার৷ ফোনকলে সবসময় মেয়েটাকে বুঝিয়েছে, যা হয়েছে সব ভুলে যেতে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবুও মেয়েটার মন থেকে ভয় একটুও সরে না। বারবার বলে এই বাড়িতে তার খুব ভয় লাগে। সে থাকতে চায় না। জিতু ভাইয়া যেন ইতিকে চৌধুরী বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। জিতু ভাইয়াও আশ্বাস দেয়, পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই তার কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু গতকাল রাতে হঠাৎ আবদার করে বসে দেখা করতে চায়। জিতু ভাইয়া কারণ জিজ্ঞেস করলেও ইতির থেকে যথোপযুক্ত উত্তর পায় নি। আর তিনিও এত জেরা করেন নি। একটু ভেবে রাজি হয়েছে, সময় ম্যানেজ করতে পারলে দেখা করবে।

তিনি কিছুদিন ধরে বিশ্রাম নেওয়ারও সুযোগটুকু পাচ্ছেন না। তাদের আন্ডারে থাকা পুরাতন কেইসগুলো এখন সিআইডি হ্যাডকোর্টারে চলে গেছে। সিআইডিরা এখন নতুন কেইস নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে এখন চলছে তোলপাড়। নিজ বাসভবনে মিনিস্টার এবং তার বড় পুত্র খু’নের ঘটনায় সকলে সংকিত। প্রত্যেক দেশে এখন এই নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এসবের মধ্যে জিতু ভাইয়ার হাতে অপচয় করার মতো সময় আর কই! ব্যস্ত মানুষ তিনি। নেহাৎ প্রেয়সী বাইনা ধরেছে তাই সকল কাজ কোনো মতে সামলে হাজির হয়েছে।
জিতু ভাইয়া প্যান্টের পকেটে দু হাত গুঁজে ইতির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। ইতি মাথা নুইয়ে ফেলল সহসা। বুকটা কেমন দুরুদুরু কাঁপছে। জিতু ভাইয়া বলল,“এখন শরীর কেমন?”
উত্তর করলো না বালিকা। চেহারা তার আরও বিষণ্ণ হয়ে উঠলো। জিতু ভাইয়া লক্ষ্য করল মেয়েটার চেহারার মলিনতা। সে আরও নরম গলায় বললেন,“দুপুরে খেয়েছ?”
বালিকা মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল। জিতু ভাইয়া বলল,“দেখে তো মনে হচ্ছে কত-শত দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো কর না।”

ইতির খুব কান্না আসছে। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি এড়াল না জিতু ভাইয়ার। তিনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখলেন আশেপাশ। ইতির উদ্দেশ্যে শুধালেন,
–“কি খাবে বল? আশেপাশে অনেক কিছুই দেখছি আছে।”
ইতি কোনো উত্তর করল না। নোহা লাফিয়ে বলে উঠলো,“আমি আইসক্রিম খাব।”
পাশেই আইসক্রিমের ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। জিতু ভাইয়া ছেলেটিকে বলল আইসক্রিম দিতে। নোহা এগিয়ে গেল নেওয়ার জন্য। তিনি পুনরায় মনযোগ দিলেন ইতির দিকে। অতঃপর বললেন,
–“কি হয়েছে? মন খারাপ কেন? কেউ কিছু বলেছে?”
আস্কারা পেয়ে হেঁচকি তুলে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ইতি। ছোট বুক কান্নার তোড়ে উঠানামা করছে। চোখের পাপড়ি ভিজে উঠেছে। বালিকা কিছুতেই নিজেকে সামাল দিতে পারছে না। ইতিকে ফুঁপিয়ে উঠতে দেখে বিচলিত হয়ে উঠল জিতু ভাইয়া। সহসা বালিকার দু’গাল দু হাতে আঁকড়ে ধরে শুধালো,
–“লজ্জাবতী কি হয়েছে আবার? বাসায় কিছু হয়েছে?”

ইতি মাথা নেড়ে না করল। এবার বাচ্চাদের মতো মৃদু আওয়াজ তুলে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। বালিকার মনে এখন অনেক কষ্টেরা দানা বেঁধেছে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর এটাও বুঝে গেছে, তার বাবা আর ফিরে আসবে না। ছোট থেকে দেখে আসা বাড়ির কাছের মানুষগুলো এভাবে এক এক করে চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়ায় বাচা এখন বড্ড শঙ্কিত। তাদের কথা মনে হলেই গুমরে গুমরে কাঁদে। জিতু ভাইয়া চিন্তিত চেহারায় বলে উঠলেন,
–“আর কিভাবে তোমাকে বুঝাব বল? কিসের এত ভয় তোমার? আমি আছি তো পাশে। এরকম করলে যে আমি কাজে ফোকাস করতে পারছি না।”
নোহা নিজের এবং ইতির জন্য দুটো আইসক্রিম নিল। নিজেরটা খেতে খেতে ঘুরে দাঁড়াল তখনই দেখল অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটি। ইতি জিতু ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে আছে। উচ্চতায় ইতি অনেক ছোট। তাই দীর্ঘদেহী জিতু ভাইয়ার দেহের সাথে মিশে যাওয়া মেয়েটাকে কেমন এইটুকু দেখাচ্ছে। নোহার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা তৎক্ষনাৎ চুপসে গেল। ফ্যাকাসে মুখ করে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল দুই মানবীকে। কিছুই তার বোধগম্য হলো না। এদিকে ইতি বাইনা ধরেছে জিতু ভাইয়ার সাথে থাকবে। আর চৌধুরী বাড়িতে যাবে না। জিতু ভাইয়া জানে সেই কথা। এই নিয়ে অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু বালিকা কিছুতেই তা বুঝতে চাচ্ছে না।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হলো। শেষ পর্যায়ে জিতু ভাইয়া হার মানল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,“ঠিক আছে। তোমার কথায় রাখলাম। তবে আরেকবার ভেবে দেখ।”

–“ভেবেছি তো। অনেকদিন ধরেই ভেবেছি। আমার খুব ভয় লাগে। আমি আর যাব না বাড়িতে। আমাকে আপনার সাথে রাখুন। না হলে আমাকেও মে…
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না ইতি। তার আগেই জিতু ভাইয়া বালিকার গোলাপি অধরে আঙুল ধরে হিশশ আওয়াজ তুলে থামিয়ে দিল। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,“কিচ্ছুটি হবে না তোমার। আমার বোকাফুল, আমি তো আছি।”
নোহা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। পিছন থেকে শুধালো,“কি হয়েছে? কি কথা বলছ তোমরা?”
ইতির অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে বিচলিত হয়ে উঠল,“এ কি লিটিল গার্ল, হুয়াই আর ইউ ক্রায়িং?”
–“ক..কিছু হয় নি।”
জিতু ভাইয়া হাত ঘড়িতে সময় দেখে তাড়া দিয়ে বলল, “আমার সাথে চল।”
–“কোথায়?”
সহসা নোহা প্রশ্ন করল। জিতু ভাইয়া উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। তিনি নিজ গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন কারো সাথে ফোনকলে কথা বলতে বলতে। ইতি আর নোহাও পিছু নিল।

মাগরিবের আজান হয়েছে। জিতু ভাইয়া, ইতি আর নোহা সহ সিআইডি অফিসাররা কাজী অফিসে অবস্থান করছে। জিতু ভাইয়ার চেহারা স্বাভাবিক। কিন্তু বাকি অফিসারদের চেহারায় চরম বিস্ময় খেলা করছে। নামাজ শেষ করে কাজী সাহেব তাদের সামনে টেবিলের চেয়ারে এসে বসলেন। বিশ লাখ টকা কাবিননামা ধার্য করে জিতু ভাইয়া এবং ইতির বিয়ে পড়ানো হলো। পাত্র পক্ষের হয়ে সাক্ষর করল কবির এবং অরনা। অপর দিকে পাত্রী পক্ষের হয়ে সাক্ষী হিসাবে সাক্ষর করবে হিমন এবং নোহা। হিমন সাক্ষর করে নোহাকে কলম এগিয়ে দিল। নোহা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। উপস্থিত সকলে এই প্রথম নোহাকে এত শান্ত দেখল।
নোহা যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। যখন জানতে পারল আজ ইতি আর জিতুর বিয়ে তখন থেকেই একদম চুপ। তার দুধে আলতা চেহারা দেখে বুঝা দুষ্কর যে তার মনে কি চলছে? চেহারায় হাসি নেই, আর না আছে রাগ। বড্ড মলিন ঠেকছে। মানুষ বলে যখন কষ্ট কাউকে ঝাপটে ধরে তখন মানুষ বোবা হয়ে যায়। বোধহয় নোহার ক্ষেত্রেও তাই। সে হাতে কলম তুলে নিল। তার হাতে মৃদু কম্পন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেচারি অনুভব করছে কলমটা ভীষণ ভারী ঠেকছে তার নিকট। তবুও আঙুলের মধ্যে শক্ত করে আটকে ধরল। সাক্ষর করার জন্য যখন সামনের কাজটিতে চোখ রাখল তখনই ভেসে উঠল বর কনের সাক্ষর। নোহা অনুভব করছে এক লহমায় এতক্ষণের বুকের চিনচিনে ব্যথাটা আরও কয়েক ধাপ বেড়ে গেছে। গলায় যেন কিছু একটা আঁটকে আছে। বড্ড কষ্ট হচ্ছে ঢোক গিলতে। এতক্ষণ ধরে সে চোখের জল সকলের আড়াল করে রেখেছে। এখন শেষ মূহুর্তে কি ধরা পড়বে? উহু! নোহা এটা কিছুতেই হতে দিবে না।

নোহার কাঁপা কাঁপা হাতের সাক্ষর করা শেষ হতেই টুপ করে এক ফোটা তপ্ত নোনা জল কাগজে পড়ে গেল। কাগজে সেই অংশটুকু গোলাকৃতির হয়ে ভিজে উঠল। নোহা নিজেকে আড়াল করার বৃথা প্রয়াস চালাল। কিন্তু সকলের আড়াল করতে পারল না। এমনকি জিতু ভাইয়াও লক্ষ্য করল। কিন্তু তার কিছু করার নেই এতে। কেউ যদি নিজে থেকে কষ্ট পেতে আসে তাহলে সেই বা কি করবে? সে তো বহু আগে থেকেই স্পষ্ট বারণ করছে তার সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে। সিআইডি অফিসাররা আড় চোখে বসের দিকে তাকাল। যার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হলো না। বিয়ের কাজ শেষ হলে সকলে কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে আসল। নতুন দম্পতিকে সকলে শুভেচ্ছা জানাল। নোহাও বাদ গেল না। মুখে একরাশ মিথ্যা হাসি নিয়ে জড়িয়ে ধরল ইতিকে। মেয়েটার সেই কখন থেকে লাজে মরি মরি অবস্থা। নোহা ইতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“আমার যে কি খুশি লাগছে লিটিল গার্ল, তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না! নতুন জীবনের জন্য তোমাকে কংগ্রাচুলেশনস। আমি তোমাকে খুব মিস করব।”
ইতি কেঁদে উঠল। নোহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,“আমিও খুব মিস করব তোমায়। তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে সবসময়।”
নোহা নাক টেনে হেসে বলল,“আচ্ছা।”

জিতু ভাইয়া, অরনা এবং কণাকে এটিএম কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে বলল ইতির জন্য যা যা লাগে কিনে বাসায় যেতে। এখন উনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে, তাই তিনি ফেরার আগ পর্যন্ত যেন ইতির সাথেই সকলে বাসায় থাকে। কণা ইতিকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। অরনা যাওয়ার আগে নোহাকে ডাকল। নোহার ঠোঁটে মেকি হাসির রেখা। সে ধীরে পায়ে এগিয়ে আসছে। কেন যেন তার পা আজ চলতেই চাইছে না। যেন অসাড় হয়ে আসছে। দেহের ডকল শক্তি ধীরেলয়ে লোপ পাচ্ছে। নোহা এগিয়ে জিতু ভাইয়ার পাশে দাঁড়াল। বেখেয়ালি নোহার উপর নজর আটকাল জিতু ভাইয়ার। কখন এসে দাঁড়াল ঠিক ঠাহর করতে পারল না। এই মূহুর্তে কাজ নিয়ে চিন্তিত তিনি। বিয়ের কাজ করতে গিয়ে অনেকটা সময় অপচয় হয়েছে।
নোহা এক নাগাড়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল সামনের যুবকটির পানে। জিতু ভাইয়া ভ্রুকুটি করল। তার প্রশ্নবিদ্ধ চেহারা দেখে নোহার ঠোঁটের কোণের হাসি প্রশস্ত হলো। অথচ এই হাসি দেখে যে কেউ নির্দ্বিধায় আন্দাজ করে ফেলবে, এ আসলে ব্যথাতুর হাসি। জিতু লোকটা কি ধরতে পারে নি? পেরেছে, তবে তিনি তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। তিনি বড় বিচক্ষণ পুরুষ। আবেগে গা ভাসিয়ে যে জীবন চলে না তার বাস্তব অহরহ প্রমাণ পেয়েছে এই জীবনে। নোহার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। সে তবুও দৃষ্টি সরালো না। সহাস্যে বলল,

–“কংগ্রাচুলেশনস।”
–“ধন্যবাদ।”
সপাটে প্রত্যুত্তর ভেসে আসল যুবকের থেকে। নোহা তাকিয়ে দেখল লোকটাকে। ঝাপসা নয়ন আরও ঝাপসা হলো। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তপ্ত নোনা জল। সে ফের সহাস্যে ভাঙা তরল গলায় বলল,
–“যাও, তোমার খুশির জন্য তোমাকে পাওয়ার খেলায় হার মেনে দিলাম। ভালো থেকো।”
জিতু ভাইয়া কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। হ্যা তিনি নোহাকে পছন্দ করেন না। শুধু নোহাকে না, নোহার মতো মেয়েদের পছন্দ করেন না। তাই তো নোহাকে সবসময় এড়িয়ে চলেছেন। আজও তাই করলেন। ঘুরে দাঁড়ালেন। নোহা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। বড্ড করুন দেখাল সেই হাসি।

ঘড়ির কাটা রাত এগারোটার ঘরে এসে থেমেছে। জিতু ভাইয়া বাসায় ফিরল সবেমাত্র। এসেই দেখে তার জন্য বসার ঘরে অপেক্ষা করছিল অরনা আর কণা। জিতু ভাইয়া ইতির খোঁজ চাইলে তারা শুয়ার ঘর দেখিয়ে দিল। অতঃপর বিদায় নিয়ে চলে গেল। জিতু ভাইয়া বড্ড ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেছেন। শার্টের হাতার বোতাম খুলতে খুলতে নিজ রুমের দিকে অগ্রসর হলো। দরজা খুলতেই দেখল, সারা রুম অন্ধকার হয়ে আছে। শুধু কিছু মোমবাতির হলদেটে আভায় চারপাশ মৃদৃ আলোকিত। জিতু ভাইয়া ভ্রুকুটি করে রুমের লাইট জ্বালালো। মূহুর্তেই দৃশ্যমান হলো সম্পূর্ণ রুম। পুরো কক্ষ মিষ্টি সুঘ্রাণে ম ম করছে। কেননা, তাজা সুগন্ধিযুক্ত ফুল দিয়ে পুরো ঘর সাজানো হয়েছে। সাদা চাদরে মোড়ানো বিছানার মাঝখানে লাল টকটকে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লাভ আঁকা। জিতু ভাইয়া অরনাদের এহেন কাজ দেখে বিরক্তবোধ করল। এসব কেমন ছোলেমানুষী? সে বিয়ে করেছে বলেই কি বাসর করবে নাকি? এখনো ইতি একটা নির্বোধ বাচ্চা মেয়ে। এইটুকু মেয়ের সাথে আবার কিসের বাসর!

এক সেকেন্ড! ভাবতে গিয়ে থমকাল জিতু। তার সদ্য বিবাহিত বউ কোথায়? অতর্কিত দৃষ্টি ফের সারা রুমে বোলাল। না কোথাও ইতির অস্তিত্ব নেই। জিতু ভাইয়া এগিয়ে গিয়ে সুক্ষ্ম নজরে রুমের চারপাশ দেখল। ইতিকে চোখে পড়ল না। মেয়েটা কোথায় গেল? জিতু ভাইয়া এক হাত কোমরে ধরে অপর হাতে মাথার চুল খামচে ধরল। এগিয়ে গিয়ে দেখল ওয়াশরুমের দরজা বাইরে থেকে লাগানো। এক এক করে পুরো ফ্ল্যাট ঘুরে দেখল মেয়েটা কোথাও নেই। জিতু ভাইয়া ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। চেহারায় চিন্তার ছাপ। কপালে সুক্ষ্ম ক’টা ভাজের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন লজ্জায় বোধহয় বালিকা নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। একটু খুঁজলেই পাবে।

জিতু ভাইয়া নিচু কন্ঠে কয়েকবার ইতির নাম ধরে ডাকল। মেয়েটার সারা নেই। এবার বড় চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। দ্রুত ফোন হাতে তুলে নিল। অরনাকে কল করতেই কোথা থেকে মটমট আওয়াজ ভেসে আসল। তবে সে আওয়াজ বড্ড সুক্ষ্ম। সারারুম নৈঃশব্দ্যে ছেয়ে থাকায় জিতু ভাইয়ার কর্ণকুহরে যেন মৃদৃ পৌঁছাল। তাই কল কেটে পিছনে ঘুরে তাকাল। আসবাপত্র ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ল না। ফের মটমট আওয়াজ হলো। শব্দের উৎস খুঁজতে তিনি এগিয়ে গেলেন। কাঠের বিশাল আলমারির কাছে গিয়ে তার পা থামল। আলমারির আশেপাশে কোনো ফাঁকা জায়গা নেই লুকিয়ে থকার মতো। তিনি পিছন ঘুরে দাঁড়ালেন। এক কদম এগিয়ে গিয়েও পিছনে ফিরলেন। কিছু একটা ভেবে আলমারির দরজা খুলতেই তার চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। আলমারির ভেতরে কাপড়-চোপড়ের মধ্যেই হেলান দিয়ে বসে আছে ইতি। হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকা কাপড়ের আড়ালে বালিকার মুখ ঢেকে আছে। জিতু ভাইয়া হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। আবার খুব হাসিও পেল তার। বিয়ের আগে কথার কথা বলেছিল, বিয়ের পর বউকে আলমারিতে তুলে রাখবে। নির্বোধ বউ সত্যি সত্যি ভেবে বসল।
জিতু ভাইয়া ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি দমানোর পায়তারা করল। অতঃপর ক্ষীণ গলায় আদুরে কণ্ঠে ঢাকল,“লজ্জাবতী, বেড়িয়ে আস।”

ইতির মধ্যে নড়চড় দেখা গেল না। জিতু ভাইয়া ফের ডাকল, তবে সারা পেল না। কপালে ভাজ পড়ল তার। হাত বাড়িয়ে কাপড়গুলো সরাতেই দৃষ্টিগোচর হলো বধূয়ারূপী বালিকার স্নিগ্ধ মুখাবয়ব। এক মূহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল জিতু ভাইয়া। তার বুকের ভেতর ধুকপুক আওয়াজ হলো৷ তারপর দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। পাঁজাকোল করে বের করে আনল ইতিকে। বালিকা ঘুমের ঘোরে কিছুটা নাড়াচাড়া উঠল। গায়ে তার সামান্য অথচ দামী কিছু ঝলমলে সোনার অলংকার। পরণে ভারী শাড়ি। মুখেও আলতো প্রসাধনীর আস্তর। যা এত সুক্ষ্ম আর নিখুঁত যে বুঝায় যাচ্ছে কোনো দক্ষ হাতের কাজ। পুতুলের মতো মেয়েটা আজ সত্যিকারের জীবন্ত পুতুল ঠেকছে।
জিতু ভাইয়া খুব যত্ন নিয়ে ইতিকে বিছানায় শুইয়ে দিল। অতঃপর নিজে গিয়ে সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়ে আসল। বালিকা এখনো বেঘোরে ঘুমে আচ্ছন্ন। কদিন যাবৎ অযাচিত ভয়ের কারণে ঠিক মতো ঘুমায় নি। চোখ বুঝলেও ধরফরিয়ে উঠে বসত। কখনো চিৎকার করে উঠতো। মেয়েটার জন্য সকলে বড্ড চিন্তিত ছিলাম এ কদিন। আজ বোধহয় বালিকা ঘুমের সব ঘাটতি পূরণ করবে।

জিতু ভাইয়া কিছুক্ষণ বধূরূপী সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে মন ভরে দেখল। খেয়াল করল এত সাজ-গোজের কারণে মেয়েটার অস্বস্তি হচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে মেয়েটার গা থেকে সব অলংকার খুলে নিল। না চাইতেও তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে যাচ্ছে বালিকার রক্তিম বর্ণ পাতলা অধরে। যা তাকে চুম্বকের মতো কাছে টানছে। কিছু কামনারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। তিনি বেখেয়ালি বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে খুব যত্ন করে বালিকার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে রাঙা হলো তার বৃদ্ধাঙ্গুল। তিনি সেসব খেয়াল করলেন না। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলেন বালিকার অধরের পানে। পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টি সংযত করলেন। তিনি বড় আত্মসংযমী পুরুষ। তাই সেই দৃশ্য তাকে পুরোপুরি ঘায়েল করতে পারল না।
তিনি বালিকার পাশে শুইয়ে পড়লেন। হাত বাড়িয়ে রুমের সকল লাইট বন্ধ করে নিলেন। এখনো রুমে কিছু মোমবাতি জ্বলজ্বল করছে। তার মৃদু আলোয় চারপাশ আবছা দৃশ্যমান করে তুলেছে। দেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে দুজন মানব-মানবীর অবয়ব। জিতু ভাইয়া অন্ধকারের মধ্যেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার ঘুমন্ত নয়া বধূর পানে। ঘুমের ঘোরে ইতি নড়েচড়ে নিজের অজান্তেই স্বামীকে জড়িয়ে ধরল। যদি সে এই মূহুর্তে সজ্ঞানে থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠত। জিতু ভাইয়া ইতিকে সরালেন না। বরং বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে নিল। যেন সারাজীবন আগলে রাখার অব্যক্ত নতুন আরেকটি প্রতিশ্রুতি। হিসহিসিয়ে অস্ফুটে আওড়ালো,
–“সংসার করার জন্য এখনো অনেক সময় পড়ে আছে, আমার লজ্জাবতী। আগে বড় হও তুমি। বুঝতে শেখ আমায়। বুঝতে শেখ সংসার কি? তারপরে না-হয় সব হবে।”

প্যারিস, ফ্রান্স।।
সন্ধ্যার পর থেকে ইফান তার সুউচ্চ পেন্ট হাউজেই অবস্থান করছে। এই পেন্ট হাউজটি প্যারিস শহরের পূর্বাঞ্চলে। অঞ্চলটি জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ায় এই অঞ্চলেই মাফিয়া বসের ঘাঁটি। যদিও মেইন শহরসহ নানান জায়গায় তার বেশক’টি পেন্ট হাউজ রয়েছে। তবে বর্তমানে এই পেন্ট হাউজটিই তার জন্য নিরাপদ স্থান। আর এটিই মাফিয়া গ্রুপ ব্ল্যাক ভেনমের প্রথম ঘাঁটি। পেন্ট হাউজটি বিশাল এরিয়া দখল করে শির উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টায় এই এরিয়া জুড়ে চলে ভেনম গার্ডসদের কড়া টহল। যা ফাঁকি দিয়ে একটা মাছি পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। পেন্ট হাউজের গ্রাউন্ড ফ্লোরে রয়েছে বিশাল এক ক্যাসিনো। যেখানে সার্বক্ষণিক ওড়ে অবৈধ কোটি কোটি টাকা আর চলে অন্ধকার জগতের লেনদেন।

প্যারিসে সূর্য ডুবে আধার নেমেছে। জনসমাগমপূর্ণ শহর না হওয়ায় এই এরিয়াটা সূর্য ডুবলেই কেমন ঝিমিয়ে পড়ে। চারপাশ ঢুবে যায় অন্ধকারে। গহীন জঙ্গল থেকে ভেসে আসে রাত জাগা নিশাচরদের চাপা গুঞ্জন। ইফান নিজ অফিস কক্ষের নান্দনিক কাউচে বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে। তার উরুর উপর একটি ল্যাপটপ। গায়ে জড়ানো অসুভ রঙা শার্ট। যার সামনের তিনটে বোতাম খোলা থাকায় ফর্সা ঢেউখেলানো বক্ষদেশ আংশিক উন্মুক্ত। মাথার ঘন কালো চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। কানে গুঁজে রাখা ব্লুটুথ। চেহারায় চরম কাঠিন্য। তাতে যেন মাফিয়া বসকে আরও বেশি সুদর্শন ঠেকছে। তবে রুমের আবহাওয়া ঠিক লাগছে না। ইফানের ঠোঁটে গুঁজে আছে সিগারেটের শলাকা। দৃষ্টি তার ল্যাপটপে নিবদ্ধ। তার বাম হাতে কালো ফিতার একটি নামী ব্র্যান্ডের ভীষণ এক্সক্লুসিভ ওয়াচ। সেই হাত দিয়ে ঠোঁট থেকে সিগারেটের শলাকা নামিয়ে নিলো। তাতে আলতো নাড়া দিয়ে সিগারেটের আগা থেকে ছাই ফেলল। অতঃপর মুখ ভর্তি ধোঁয়াকুন্ডলী উপরে ছেড়ে সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইনানের দিকে এক পলক তাকাল। তারপর সিগারেট ধরে রাখা হাতেই টি-টেবিল থেকে একটা ওয়াইনের গ্লাস তুলে নিল। ছোট্ট করে সিপ নিয়ে ফের দৃষ্টি ঘুরাল ইনানের দিকে।

বেচারা ইনান একটু বেশিই ঘাবড়ে আছে। একেই অনেক বড় গন্ডগোল চলছে মিনিস্টারের খু”ন কেন্দ্র করে। যদিও মাফিয়া বসের সেসব বিষয়ে কোনো হুঁশ নেই। এর আগেও এমন বড় বড় গন্ডগোল পাকিয়েছে সে। আর সেইসব সমস্যা সমাধান করতে মাহিন আর ইনানের কত-শত কাঠকুটোই না পোড়াতে হয়! তবে এখন বিষয়টা অন্য জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই তো সবে মাত্র সে ইফানকে খবর দিল তার এক মাত্র বোন ইতি চৌধুরী সম্পর্কে। যে কিনা কাউকে না জানিয়ে একজন সিআইডি টিম লিডার এসপি আরমান শেখকে বিয়ে করেছে। কিন্তু না, ইফান এ নিয়ে কোনো রিয়েক্ট করল না। কারণ এই বিষয় জানার আগে থেকেই সে অনেক ক্রুদ্ধ হয়ে আছে।
রেগেই বা থাকবে না কেন? সে যে অনেক চেষ্টা করেও বউয়ের সাথে কথা বলতে পারল না। তাই অতিরিক্ত রা’গে চুপ হয়ে আছে। চোয়াল যেন ব্লেডের মতো ধারালো দেখাচ্ছে। তবে ইতির বিয়ে নিয়ে জানার পর এখন তার চেহারায় সুক্ষ্ম চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। ইনান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

–“তবে ভাই, মীরা জানাল সে আপনার মাকে সামলে নিয়েছে। চিন্তার কোনো বিষয় নেই। আর ভাবি তো আছেই। তাছাড়া জিতু তো আর আমাদের অপরিচিত নয়। ভাবির ভাই। আশা করি ইতির সমস্যা হবে না কখনো।”
ইফান কোনো প্রত্যুত্তর করল না। স্বভাববশত বাম ভ্রুর নিচে আলতো চুলকালো। পাশ থেকে ফোন হাতে নিয়ে নোহাকে কল লাগাল। কানের ব্লুটুথ অন করে অপেক্ষা করল ফোন রিসিভ করার। মেয়েটা ফোন রিসিভ করল না। বিকাল থেকে কতবার নোহাকে কল করেছে সে। মেয়েটা একটা কলও রিসিভ করে নি। এই নিয়েই অবশ্য রাগের মাত্রাটা বেশি ছিল। কিন্তু এই মূহুর্তে তার মুখাবয়বে রা’গের আভা কম, চিন্তার ছাপ বেশি।

নোহা পলক কাইসারের ভীষণ আদরের মেয়ে। বেশি আদরে আদরে মেয়েটা বাদর হয়েছে। এই বলে নোহা কাইসার যে একেবারে বোকা-সোকা, এটা ভাবা চরম ভুল। হ্যা, ওর মধ্যে ছেলেমানুষী স্বাভাব রয়েছে। মন তার বড়ই স্বচ্ছ আর নরম। ছোট থেকেই ইফানকে পছন্দ করত নোহা। সেই সময়টায় ইফানেকে প্রায়শই সাক্ষাৎ করতে যেতে হতো পলক কাইসারের কাছে। ইফান বলতে নোহা ছিল অজ্ঞান। মেয়েটা বড় হয়ে যখন বুঝল তার পছন্দের মানুষের মনে তার কোনো ঠায় নেই, তখন হতাশ হলো। বড্ড কষ্ট পেয়েছিল মেয়েটা। মেলামেশা করতো উচ্ছন্নে যাওয়া তার মতো বড় সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সাথে। পরিণতি সরূপ তাদের হাওয়া নোহার গায়ে লাগে। কিন্তু ইফানের প্রতি ভালোবাসা তার একটুও খামতি নেই। হ্যা, সেই ভালোবাসা প্রেমের নয়, বরং এক ভালো বন্ধুত্বের। এই জন্যই তো মীরার পরে ইফান নোহাকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করত। সেই ভরসা থেকেই নোহাকে দেশে এনেছিল আমার দেখা-শোনা করতে। প্রথম দিকে তো আমাকে রাগান্বিত করার জন্য আমার সামনে ইফান নোহার সাথে ফাইজলামি করত। ঐ যে, আমাকে খেপাতে চুমু খাওয়ার নটক করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তো চুমু খায় নি। বরং ওরা উল্টো দিকে ফিরে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকায় আমার মধ্যে ভুল-ভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন ইফান আর নোহাকে নিয়ে কত কি-ই না ভেবে বসেছিলাম! এখন ভাবলেই বড্ড হাসি লাগে।

ইফানের কথা মতো নোহা ঠিক তাই করল। মা ভাইয়ের অবাধ্য হয়ে সবসময় ইফানের ইন্সট্রাকশন ফলো করত।
নোহার আরেকটা গোপন কাজও অবশ্য ছিল। সেটা হলো সিআইডি টিম লিডার জিতুর সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা। যাতে কাছাকাছি থেকে তাদের গতিবিধি শনাক্ত করে ইফানকে সতর্ক করতে পারে। কখনোই জিতুর ক্ষতি করা তাদের কারও উদ্দেশ্য ছিল না। শুধু নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য এই কৌশল আরকি। কিন্তু মেয়েটা প্রেমে পড়ে গেল। প্রেমে পড়ে তার সকল বাজে নেশাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিল। ইফান আগে থেকেই জানতো নোহা জিতুকে পছন্দ করে। এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ইফানের কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এখন? ইফান নোহাকে নিয়ে চিন্তিত। আজ অনেকবার আমার সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য নোহার সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছে। এখন বুঝতে পারছে নোহার কল না ধরার কারণ!

উত্তরা, ঢাকা।।
প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা বোধহয় বাজে। নোহা বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের উপর। চারপাশ ঘন তিমিরে ঢাকা। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আভায় যতটুকু ফুটছে ততটুকুই দৃশ্যমান। নোহা এক দৃষ্টিতে অমানিশার পানে তাকিয়ে আছে। তার মাথায় এখন স্কার্ফটা নেই। সে স্কার্ফটা জিতু ভাইয়ার বাসায় খুলেছিল, পরে আর তা পরা হয় নি। সেখানে অরনা আর কণার সাথে ইতির বাসর ঘর সাজিয়েছে। এমনকি সে নিজ হাতে ইতিকে খুব যত্ন করে সাজিয়েছে। অতঃপর জিতু ভাইয়া বাসায় আসার আগেই বেড়িয়ে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসেছে আর সেই কখন থেকে এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে। শীতল বাতাসের ঝাপটায় পিঠে পড়ে থাকা রেশমি চুলগুলো উড়ছে। কখনো চোখেমুখে আঁচড়ে পড়ছে। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মেয়েটার। ফোনে বারবার কল হয়ে আবার কেটে যাচ্ছে। নোহা ধরছে না। এক পর্যায়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে চোখের সামনে ধরল। ইফানের নাম দেখে চোখ আরও বেশি ঝাপসা হয়ে আসল। রিসিভ করে কানে ধরতেই ইফান ধমকে উঠল,

–“কোথায় থাকিস তুই?”
নোহা কোনো রা করল না। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ইফান চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করে নরম গলায় বলল,
–“শুন নু, পাগলামি করিস না। বাড়িতে ফিরে যা।”
–“আমি কি খুব খারাপ, বন্ধু?”
নোহার কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে ইফান বিচলিত হয়ে উঠল। শঙ্কিত গলায় শুধালো,“কি হয়েছে তোর? এই পাগলি তুই ঠিক আছিস?”
নোহার চোখের জল নাকের জল মিলেমিশে একাকার। এলোমেলো চেহারা আলগোছে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল৷ সহাস্যে বলল,
–“কিচ্ছু হয় নি। ঠিক আছি। আমি একদম ঠিক আছি। টাটা।”
বলেই ফোন কেটে দিল। তারপর চোখের সামনে ফোনটি ধরল অবেলায়। যার কারণে হাত ফসকে ফোন ব্রিজের নিচে পড়ে গেল। নোহা ঠোঁট বাকিয়ে হাসল। অতঃপর উন্মাদের মতো হাসতে লাগল। ধীরে ধীরে হাসি মিলিয়ে গিয়ে কান্নায় রূপ নিল। খুব কাঁদল মেয়েটা।

কৃত্রিম আলোয় আলোকিত পুরো শহর। এত রাতেও শহরের ব্যস্ততায় একটু খানি ভাটা পড়ল না। চতুর্দিকে মানুষ নিজ কর্মে ব্যস্ত। বেখেয়ালি আর বড় উদাস মনে মহা সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে নোহা। বড় বিধস্ত ঠেকছে তাকে। আশেপাশের কোনো শোরগোল তার কানে যেন পৌঁছাতে পারছে না। হঠাৎ চোখেমুখে তীব্র আলো আঁচড়ে পড়ায় চোখ তুলল সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিশাল মালবাহী ট্রাক বিকট আওয়াজ তুলে রাস্তা মা’রিয়া চলে গেল। তৎক্ষনাৎ রাস্তার লোকজন চিৎকার করে উঠল। তীব্র ধাক্কায় নোহা ছিটকে গিয়ে পড়ল রাস্তার এক পাশে। মূহুর্তেই তাকে ঘিরে ধরল সকলে। কেউ এগিয়ে আসছে না। মেয়েটাকে ধরে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করছে না। শুধু ভয়ে তটস্থ হয়ে চিৎকার চেচামেচি করে হাহুতাশ করছে।

নোহার মাথা থেকে বেরিয়ে আসা র’ক্তের ধারায় রঞ্জিত হলো পিচঢালা রাস্তা। কি হয়ে গেল বোধে আসছে না মেয়েটার! মনে হচ্ছে খুব দূর থেকে তার কানে অস্পষ্ট চিৎকার চেচামেচি ভেসে আসছে। নোহার প্রায় বুঁজে আসা ঝাপসা চোখ দুটো আশেপাশে দৃষ্টি বোলাল। শত শত মানুষের ভীড়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষকে খোঁজ পেল না সে। র’ক্তমাখা বি’ধ্বস্ত চেহারায় ফুটে উঠল মলিন তাচ্ছিল্যেরের হাসি। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল তপ্ত অশ্রু কণা। চিরকালের মতো চোখ বোঁজার আগে অস্ফুটে আওড়াল,

জাহানারা পর্ব ৮৬

–“ওপারেও দেখা হবে না প্রিয়, কারণ আমি যে তোমার হালাল অধ্যায় ছিলাম না।”
থেমে জোড়ে দিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
–“আলবিদা।”

জাহানারা পর্ব ৮৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here