৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৭
রুপান্জলি
সকাল ৯ টা ২৮ মিনিট,,
,,, বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে দ্বীপ,, দক্ষিণের হাওয়ায় সফেদ রঙা পর্দাগুলো মৃদু মৃদু ঝাপটা খাচ্ছে,, বাতাসের স্নিগ্ধতায় মাথার সিল্কি চুলগুলো এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। শরীর উন্মুক্ত থাকায় পিঠের পিছনে কিছু দাগ স্পষ্ট, এগুলো খুব আগের। হাতের কনুই থেকে কিছুটা নিচ পর্যন্ত জায়গায় একটা ঘা এখনো প্রায় তরতাজা,, এটা কেটেছে তিনদিন আগে। তাও নিজ ইচ্ছায় কেটেছে,, কাটার ফলে তিনদিন যাবত বেশ জ্বরে ভুগেছে সে। দ্বীপের ফর্সা শরীরে এই দাগ গুলো ও বড্ড সুন্দর ঠেকলো। চাঁদ সুন্দর বলে যেমন তার কলঙ্কগুলোকেও আকর্ষণীয় লাগে দ্বীপের বেলায় ও তেমন। দ্বীপকে পর্যবেক্ষন করে তপ্ত শ্বাস ফেললো বিহান,, অর্পনা যদি জানতো এই সাতটা দিনে দ্বীপ ওর জন্য কতটা পাগলামি করেছে তাহলে কখনোই এতোটা দূরে থাকতে পারতো না। পাগলামি বললে ভুল হবে দ্বীপ লিটেরেল্লি মেয়েটার জন্য বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করে,, এই সাত দিনে কতোবার অসহায়ের মতো অর্পনাকে ডেকেছে তার কোনো কূলকিনারা নেই। ওর সাথে দূরত্ব সহ্য করতে না পেরে নিজেকে স্যুট করতেও নিয়েছে,
ভাগ্যক্রমে তখন সে পৌঁছে গিয়েছিলো নয়তো দ্বীপ এখনো পৃথিবীতে এক্সিস্ট করতো না। অর্পনা জানেনা বললে ভুল হবে,, অর্পনা জানে এসব। বিহানের দেখা সবচেয়ে বড়ো অভিনেত্রী এই অর্পনা নামক রমনিটি। সবসময় এমন একটা ভাব নিয়ে থাকবে যেনো সব ওকেহ,, কিছু হয়নি,, তার কিছু আসে যায়না অথচ ঠান্ডা মাথায় ঠিক প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। এইযে এই সময়টা!! সাতটা দিন দ্বীপকে দূরে রাখার আসল কারন দ্বীপ একটা সময় ওর থেকে দশ দিন দূরে ছিলো। সে যেমন কষ্ট পেয়েছে এখন দ্বীপকেও সমান হাড়ে কষ্ট দিচ্ছে। দ্বীপ যখন অর্পনার থেকে দূরে ছিলো তখন অর্পনা এসির পাওয়ার ৫ এ এনে দেড় ঘন্টা রুমে আটক ছিলো। মরে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা সহ্য করেও পরেছিলো। ভাগ্যিস বিহান ওদের ঘরে সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছিলো, নয়তো সেদিন অর্পনা মারা যেতো। ওই সময় টানা পাঁচদিন জ্বরে ভুগেছে মেয়েটা, এখন দ্বীপ ভুগছে। তখন অর্পনা ঔষধ খায়নি এখন দ্বীপ খাচ্ছেনা,, সব হিসেব সমান সমান হচ্ছে। এই পর্যায়ে অর্পনা স্বীকার করবে,,
ওকে যদি ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করা হয় দ্বীপকে দূরে রাখার কারন কি? প্রথমে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করবে না, কিন্তু কোনো ভাবে যদি উত্তর দেয় তাহলে সত্যিটাই বলবে। মেয়েটা যাই করুক না কেনো সেটাই গর্বের সহিত স্বীকার করে। বিহানের মনে হয় এখন যদি অর্পনাকে কোর্টে নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, সে মোট কয়টা খুন করেছে,, সে প্রথমে ভাব নিবে, মানে জজকে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করবে না। তারপর ওকে অনেক রিকোয়েস্ট করতে হবে এরপর অর্পনা যা বলবে সত্যিটা বলবে। সেই সত্যি শুনার পর জজ তাকে শাস্তি দিলে, সে ঠান্ডা মাথায় মেনে নিবে। তারপর জেল থেকে বের হয়ে সর্বপ্রথম জজের লাইফ হেল করে দিবে। এটা যতো বছর পরেই হোকনা কেনো। ভেবেই হাসলো বিহান,, এদিক থেকে বেশ শান্তিতে আছে সে,, তার মেধা রানীর মনে অতো প্যাঁচ নেই। তার জীবনে আল্লাহ বহুত শান্তি দিয়েছেন,, বহুত!! যা প্রকাশ করার নয়। বিহান এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের নাম ধরে ডাকলো কিন্তু দ্বীপের উঠার নাম নেই। কাল অর্পনার সাথে একটুখানি কথা বলতে পেরে দ্বীপ কতোটা যে খুশি হয়েছিলো, আল্লাহ!! ভাবতে গেলেও বিহানের হাসি পায়। অনেকটা সময় ডাকার পর চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ,, চোখের সামনে বিহানকে দেখে ভ্রু কুচকে বললো — কি চাই? এখানে কি?
,,,বিহান আয়েশ করে ডিভানে বসলো,, পায়ের উপর পা তুলে পা নাচাতে নাচাতে বললো — তর জন্য কয়েকটা নিউজ আছে আর সেগুলো অবশ্যই শকিং নিউজ,, হার্ট এটাক হলে আমায় দোষ দিবি না
,,, নাটক না করে, কি হয়েছে বল।
,,, লাস্ট ওইকে যেই তিনটা ডিল সাইন করা হয়েছিলো সেটা কম্প্লিট করতে পারলে আনুমানিক প্রতি প্রজেক্টে ১০-১৪ কোটি টাকা প্রোফিট হতো। আজ সকাল ৬ টা ৫৩ মিনিটে সেই তিনটে ডিল ক্যান্সেল করা হয়েছে।
,,, দ্বীপের চোখ জ্বলে উঠলো,, সাথে দেখা গেলো তীব্র রাগ। রাগের তোপে কপালের মাঝখানে থাকা শিড়াটা ফুলে উঠলো। এই প্রজেক্ট গুলো পেতে কতোটা পরিশ্রম করতে হয়েছে সেটা একমাত্র সেই জানে। টাকা ইনকাম করা চারটে খানি কথা নয়,, শরীর থেকে মস্তিষ্ক সব ক্ষয় করতে হয় বিজনেসের খাতিরে। দ্বীপকে রাগতে দেখে বিহান বললো — কুল কুল!! এতো হাইপার হইসনা, বাকি গুলো শুন। প্রোজেক্টের জন্য গতো দুদিন আগে নগদে ৩ কোটি টাকা এডভান্স করে যেই প্রডাক্ট গুলো অর্ডার দিয়েছিলি। আলহামদুলিল্লাহ!! সেই প্রডাক্ট রিসিভের পরিবর্তে উল্টো বেক পাঠিয়ে,, নগদ তিন কোটি টাকা ২৭ টা আশ্রম-,মাদ্রাসায় দান করা কম্প্লিট।
,,, রাগের তোপে দ্বীপের হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে এলো,চোখের শিরা লাল। ভাব এমন যেনো যে এই কাজটা করেছে তাকে চোখ দ্বারা ঝলসে দিবে। দ্বীপ দাঁতে দাঁত চেপে বললো– আর??
,,, গতোকাল ভোর রাতে আম্মু অর্পনাকে বকেছে তাই আপাতত তর ঘরের সব ফার্নিচার চেন্জ করতে ৩৭ লাখ টাকা বেঙ্ক থেকে উইথড্র করতে হয়েছে। ( চাপা, চাপা, সব চাপা মারলাম। নিজের ছিড়া খেতাও নাই আবার ৩৭ লাখ,, হুহ ) এই আরকি!! এবার জিজ্ঞেস করিস না, এগুলো কার কাজ। আমি ই বলে দিচ্ছি, এই সবগুলো কাজ আপনার বউ ঠান্ডা মাথায় করেছেন। যদিও ভাঙচুর টা করার সময় মাথা খুব গরম ছিলো,, ভোর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সে আপনার ঘর আর জীবন দুটোই লন্ডবন্ড করেছে।
,,, বিহানের কথায় চোখ ছোট ছোট করে নিলো দ্বীপ,, মুষ্টি বদ্ধ করে রাখা হাত শিথিল হলো,, ধীরে ধীরে সব রাগ হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেলো। গতকাল রাতে ফাইল নষ্ট করার দৃশ্যটা মাথায় আসতেই,, ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ। বিহান যদি জানে মেয়েটা আরও সর্বনাশ করে রেখেছে তাহলে এখানে বসে থেকেই হার্ট এটাক করে ফেলবে, নিশ্চিৎ। দ্বীপ মাথার চুলগুলো বেকব্রাশ করে বললো — ওহআচ্ছা!! সমস্যা নেই।
,,, বিহান অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে বললো — সমস্যা নেই মানে? কতোগুলো টাকা লস হয়েছে ভাবতে পারছিস?
,,, তাতে কি?
,,, ভাই, ৩০-৪০ কোটি টাকা!!
,, সু? ভেলোরা যদি আমার বাপ দাদার পুরো সম্পত্তিতেও আগুন ধরিয়ে দিতে চায় আমি নিজে লাইটার এগিয়ে দিবো।
,,, আব্বু চাচ্চুকে কি উত্তর দিবি?
,,, গাড়ি বের করতে বল। বাড়িতে যাবো, আম্মুর সাথে কথা আছে আমার।
,,,কি মামা!! সকাল ৮ টা বাজে এনে বসিয়ে রেখেছিস, এখন বাজে ১১ টা ১৭। আসার পর থেকে কথা বলিস না, ক্লাসে যাসনা, কি হইছে বলতো? তরে কি সকাল সকাল বোবায় ধরছে?
,,, ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে বসে আছে পাঁচ জন, এতোক্ষণ সবাই নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বললেও পল্লবের কথায় সবাই অর্পনার দিকে তাকালো। মেয়েটা সকাল ৭ টা ৪৬ এ গ্রুপ মেসেজ দিয়েছে ৮ টার মধ্যে সবাইকে ক্যাম্পাসে না পেলে সবাইকে জীবন থেকে লাত্থি মেরে বের করে দিবে। অগত্যা সবাই তাড়াহুড়ো করে কোনোমতে ড্রেসটা চেন্জ করে চলে এসেছে। এর মধ্যে পল্লব বাড়ির টিশার্ট আর ট্রাউজার পরেই চলে এসেছে,, চুলগুলো এখনো উষ্ক ক্ষুস্ক হয়ে পরে আছে। কি করার? পল্লব যখন মেসেজ সিন করেছে তখন বাজে ৭ টা ৫৪ মিনিট। ব্যাচারা ১০ মিনিটের রাস্তা ৫ মিনিটে এসেছে। এসেই একদম ঘাসের উপর হাত পা ছড়িয়ে বসে পরেছিলো, ওকে বসতে দেখেই সবাই এসে এখানে বসেছে। পল্লবের কথায় উত্তর করলো না অর্পনা, পল্লব ওর চুল হালকা করে টেনে বললো — আপা কিছু বলেন,,
,,, অর্পনা শান্ত দৃষ্টিতে পল্লবের দিকে তাকিয়ে বললো — পল্লব!! এই মুহুর্তে একটা খুন করতে পারলে শান্তি লাগতো,, তকে মেরে ফেলি।
,,, ইরা তাড়াহুড়ো করে খোপা থেকে কাটা খুলে এগিয়ে দিয়ে বললো — এটা দিয়ে ট্রাই কর, অনেক চোকা।
,,, পল্লব খুক খুক করে কেশে উঠে কাটাটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে মেরে বললো — আল্লাহ মাফ করো,, আমি বন্ধু পালি নাকি সাপ পালি?
,,, ক্যাম্পাসে অনেক্ক্ষণ যাবত দুটো ৫-৬ বছরের বাচ্চা ঘুরঘুর করছে। মেবি বড়ো বোন কিংবা ভাইয়ের সাথে ভার্সিটিতে এসেছে। সেই বাচ্চাগুলো খেলতে খেলতে এদিকেই আসছিলো। পল্লবের কথা শুনে পিছনের ছেলেটি সামনের মেয়েটিকে সাবধান করে বললো — এই ওখানে যেওনা যেওনা,, ওখানে হাপ আছে। ( ২৫ সালের ভাইরাল ছিলো এটা, মনে করে দেখো)
,,, বাচ্চাটির কথা শুনে সবাই খিল খিল করে হেসে উঠলো। এতোক্ষণ মুখ গুমরা করে বসে থাকা অর্পনাও হেসে ফেললো,, ইরা হাসতে হাসতে অর্পনার উপরে ঢলে পরলো। ভার রাখতে না পেরে অর্পনা ঘাসের উপর পরে গেলো, ইরা তখনো অর্পনার উপরে পরে থেকে হেসে যাচ্ছে। চিকন অর্পনা ঠেলেও ইরাকে সরাতে পারছেনা। ওদের কান্ড দেখে রাত্রি হাসতে হাসতে পিছনে হেলে পরতেই অরুণ ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। সুযোগের সৎ ব্যাবহার করতে দেখে রাত্রি অরুনের পেটে কনুই দিয়ে গুতো মারলো। অরুন পেট চেপে ওমা বলে ফের হেসে দিলো। পল্লব হাসতে হাসতে তাকালো ওদের দিকে, পরক্ষণেই নজর সরিয়ে ইরাকে বললো — এই হাতি উঠ, আমার বান্ধবীকে মেরে ফেললো। ( ইরার চুল টেনে উঠিয়ে অর্পনার হাত ধরে) উঠ বইনা উঠ,, তুই মরলে ৪০ শা খাইতে পারলেও বিয়াটা খাওয়া হবেনা। আগে ধুমধাম করে বিয়েটা করে তারপর মরিস,, উঠ।
,,, অর্পনা উঠে বসার আগেই ইরা চুলের ব্যাথার প্রতিশোধ নিতে পল্লবের উষ্কখুষ্ক চুলগুলো দুহাতে টেনে ধরলো,, পল্লব ও কম যায়না সেও টেনে ধরলো ইরার চুল। ইরা চুলের ব্যাথা সামলাতে না পেরে এক হাতে পল্লবের চুল ধরে অন্য হাতে গালে খামচি দিয়ে ধরলো। ইরার লম্বা লম্বা নখ গালে লাগতেই পল্লব মাথা দিয়ে ইরার মাথায় বারি মারলো। ইরা পল্লবের চাপায় ঘুসি মারলো, পল্লব ইরার বাহুতে ঘুসি মারলো। পরক্ষণে আবার দুজনে দুজনার চুল চেপে ধরলো। ওদের মারামারি দেখে রাত্রি হাসতে হাসতে অরুনের বুকে হেলে পরে বললো — ওদের থামা প্লিজ নয়তো আমি হাসতে হাসতে মরেই যাবো।
,,, অরুন রাতকে আকরে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো — ওহুম এভাবে না, তুই আমার ভালোবাসার অনলে পুড়ে মরবি।
,,, রাতের হাসি বন্ধ হয়ে গেলো,, ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেলো,, অরুন সন্তর্পণে রাতের লাল হওয়া গালে চুমু খেতেই সাথে সাথে সরে এলো রাত্রি, মুখ নাড়িয়ে দুটো গালি দিলো। ইরা আর পল্লবের ঝগড়া থামার নাম নেই দেখে অর্পনা উঠে দাড়ালো,, হাত ঝাড়া দিয়ে এক পা উচিয়ে বললো — তরা থামবি নাকি লাত্থি খাবি? বল!!
,,, অর্পনাকে পাত্তা দিলো না কেউ। বন্ধু বান্ধবের কাছে পাত্তা না পেয়ে বড্ড ব্যাথিত হলো মেয়েটা। আজ সে জেদ করে আগের মতো টিশার্ট আর জগার্স পরে ভার্সিটিতে এসেছে। এখন থেকে এভাবেই চলবে সে। এবার যার মন চায় জীবনে থাকবে যার মন না চাইবে তাকে সে নিজে থেকেই লাত্থি মেরে বের করে দিবে। ওসব ভালোবাসা টালোবাসা চুলোয় যাক। মানুষ ভুলা তার জন্য আহামরি কোনো ব্যাপার না। আদিকে তো কম ভালোবাসেনি,, কি হয়েছে? মরে গিয়েছে? ঐ দ্বীপ মির্জাকে ভুলাও কোনো ব্যাপার না। তাকে অভদ্র বলা? ভালো হয়ে ছিলো ভালো লাগেনি,, এখন থেকে আগে যেমন ছিলো তার থেকেও বেশি অভদ্রতা করবে। ফালতু শ্বশুর বাড়ি আর ফালতু সংসার। এই সংসার নামক বেড়াজালে শিং মাছ ছেড়ে দিবে সে। ইরা আর পল্লবের কাছে পাত্তা না পেয়ে কিছুক্ষণ আগের রাগটা আবার যেকে বসলো। সত্যি সত্যি লাত্থি মারলো দুজনকে। পরপর দুটো করে লাত্থি খাওয়ার পর ইরা আর পল্লব থেমে গিয়ে অর্পনার দিকে গোল গোল চোখে তাকালো। না মানে এই লাত্থি গুলো তারা কেনো খেলো? কি দোষ তাদের? এগুলো কি সত্যি ই তারা পাওনা ছিলো? ওদের এই অবাকতার চার আনার দাম দিলোনা অর্পনা। অরুন আর রাত্রির দিকে এগিয়ে গিয়ে দুজনকে দুটো লাত্থি মেরে গেইটের দিকে হাটা দিলো। অরুন আর রাত্রি অবাক হতে গিয়েও হতে পারলো না। মাথায় একটা কথা আসতেই দৌড়ে গেলো অর্পনার পিছু পিছু,, একটু দৌড়াতেই ধরে ফেললো। অরুন আগে ভাগে অর্পনার পাশাপাশি পৌঁছে কাধে হাত রেখে বললো — দোস্ত তুই কি আমাদের লাত্থি মেরে জীবন থেকে বের করে দিলি?
,,, ইরা অপর পাশ দিয়ে এসে ওর কাধে হাত রেখে বললো — আমরা কি আর তর বন্ধু নেই?
,,, অর্পনা নিশ্চুপ, আগের মতো জেদ দেখিয়ে হাটছে। কতো বড়ো সাহস তাকে পাত্তা দেয়না। এখন পিছু পিছু ঘুরলেও সে পাত্তা দিবেনা। পল্লব দৌড়ে ওর সামনে দাড়িয়ে বললো — দোস্ত, তুই কি মাইন্ড খাইছিস? আমাদের বহিষ্কার করার কারন কি?
,,, পল্লব সামনে দাড়ানোতে অর্পনা নড়তে পারলো না, ইরা, অরুন আর পল্লব তাকে ঘিরে রেখেছে। রাত্রি জায়গা না পেয়ে অরুণ আর পল্লবের মাঝে যতোটুকু ফাকা ছিলো সেখান দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে উকি দিয়ে বললো — দোস্ত আমার পা ব্যাথা করছে।
,,, অর্পনা নাক ফুলিয়ে রাত্রির দিকে তাকালো। এখানে সে রাগ করেছে, এর মধ্যে এই মেয়েকে কেউ জিজ্ঞেস করেছে? তার পা ব্যাথা করছে কিনা? তাহলে বললো কেনো? ফালতু মেয়ে টেয়ে। রাত্রি ইনোসেন্ট ফেইস করে আবার বললো — পা ব্যাথা!!
,,, অর্পনা হেসে ফেললো, এদের নিয়ে খুব সেটিস্ফাইড সে। পাত্তা না পেয়ে ওদের বেপাত্তা করে দিলে ওরা আবার পাত্তা দিতে পিছন পিছন ছুটবে। এটাই তার আপন জায়গা, যেখানে অতো বাদ বিচার নেই, নিয়ম নেই, বেরাজাল নেই, আছে শুধু সস্থি। হঠাৎ অরুনের ফোনে কল এলো,, সে কল রিসিভ করে কথা বলতে বলতে অর্পনাকে ছেড়ে কিছুটা দূরে চলে গেলো,, মুখ পুরো সিরিয়াস। অর্পনা রাগ টাগ ভুলে অরুনের কাছে এগিয়ে গেলো, সাথে বাকিরাও গেলো। অরুন কথা বলা শেষ করে পিছনে তাকাতেই সবাইকে দেখে মুচকি হাসলো। অর্পনা ভ্রু কুচকে বললো — তর নানির জানাজা কয়টায়?
,,, অর্পনার কথায় অরুন ঠোঁট টিপে বললো — আমার নানি তিন বছর আগেই মারা গিয়েছে।
,,, তাহলে মুখ এতো সিরিয়াস কেনো? দেখে মনে হচ্ছে নানি মারা যাওয়ার শোকে নিজে মরে যাচ্ছিস।
,,,অরুন হেসে ফেললো, ইরার দিকে তাকিয়ে বললো — দোস্ত!! তুই রাতকে নিয়ে একটু বস,, আমরা আসছি। কাজ শেষ করে এসে তদের সবটা জানাবো।
,,, ইরা মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো কিন্তু রাত্রি মানলো না, সে গো ধরে বললো — নাহ!! আমরাও যাবো, নিয়ে যা।
,,, অরুন নাকোচ করে বললো — নাহ!! তর পায়ে ব্যাথা, এতো পথ হাটতে পারবি না।
,,, রাত্রি তখনো জেদ ধরে বললো — পারবো!! আমি যাবোই
,,, রাত্রিকে অবাধ্য হতে দেখে কর্ড়া চোখে তাকালো অরুন। রাত্রি ভয় পেলোনা তবে অভিমান হলো,, সে মুখ অন্ধকার করে ইরার হাত ধরে আগের জায়গার দিকে চলে গেলো। অরুন বুঝলো রাতের অভিমানী দৃষ্টি। কিন্তু সবসময় অভিমানকে পাত্তা দিতে নেই। মেয়েটা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আহ্লাদী,, তবে এখন আহ্লাদ করলে পায়ের অবস্থা আরও খারাপ হবে। আর রাতকে নিয়ে অন্তত সে কোনো রিস্ক নিতে পারবেনা,, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জননী বলে কথা,, একটু আদটু কেয়ার করাটা প্রয়োজন।
,,, অরুন, পল্লব আর অর্পনাকে নিয়ে গেইট পেরিয়ে , শিক্ষকদের কোয়ার্টারের পিছন দিয়ে হেটে চললো। অর্পনা অরুনের প্রতি বিরক্ত ,, ৪-৫ মিনিট যাবত জিজ্ঞেস করছে তারা কোথায় যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে,, বাট ছেলেটার উত্তর করার নাম নেই। হাটছে তো হেটেই যাচ্ছে। এবার আর প্রশ্ন করলো না সে, হাটতে লাগলো। ফুলার রোডে ঢুকতেই অর্পনার হাতে হুট করে টান পরলো,, সাথে সাথে হুমরি খেয়ে কারোর শক্ত পোক্ত বুকে আছড়ে পরলো। সামনের ব্যাক্তিটি কে? দেখার প্রয়োজন মনে করলো না সে, সহসা হাটু দিয়ে কিক মারলো অজ্ঞাত ব্যাক্তির পেটে,, দ্বীপ খুক খুক করে কেশে উঠলো তবুও অর্পনাকে ছাড়লো না। কাশির শব্দ শুনে চোখ তুলে তাকালো অর্পনা, তার চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি,, সে ঘাড় বাকিয়ে অরুন আর পল্লবের দিকে তাকালো। পল্লব ইনোসেন্ট লুক করে বুঝালো, সে এসবের কিছুই জানতো না। অরুনের দিকে তসকাতেই অরুন বললো — সরি, ভাইয়ার কথা ফেলার সাধ্যি নেই। ভাইয়া!! আমরা সামনেই আছি, দরকার হলে একটা টেক্সট পাঠাবেন।
,,, অর্পনা অনুভব করলো তার বন্ধুরাও তাকে ধোকা দিলো। তারা কি জানে এই মুহুর্তে দ্বীপ মির্জাকে তার কতোটা অসহ্য লাগছে? কোনো ভালোবাসা কিংবা প্রেমানুভূতি আসছেনা। অর্পনা জোর খাটিয়ে দ্বীপের থেকে সরতে চাইলে দ্বীপ ছেড়ে দিলো, পরোক্ষনেই কিছু বলার আগে কোলে তুলে নিয়ে সামনের দিকে হাটা দিলো। অর্পনা নিরুত্তাপ,, ভালো লাগছেনা,, এখন ছুটাছুটির মতো নাটকটা তার করতে ইচ্ছা করছে না। এই মুহুর্তে তাদের মিট করাটা কিছুটা প্রয়োজনের কাতারেই পরে,, এইযে এতোকিছু করলো সে,, কোটি কোটি টাকা লসের সাগরে ভাসিয়ে দিলো,, একটা স্ট্রং কনভারসনের প্রয়োজন আছে না? অবশ্যই আছে!! কিছু পথ হাটতেই দ্বীপের কালো গাড়িটি দেখতে পেলো। দ্বীপ সন্তর্পণে গাড়ির ডোর খুলে অর্পনাকে বেক সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজেও উঠে বসলো। রিমোট টিপে এসির পাওয়ারটা বাড়িয়ে দিয়ে সিটে গা হেলিয়ে দিলো।
,,, অর্পনা বিরক্তিকর চাহনি ফেলে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে,, ওর চোখে মুখে বিরক্ত থাকলেও দ্বীপ তার দিকে তৃষ্ণার্থ পথিকের মতো তাকিয়ে আছে। যেনো বহু বছর ধরে পানির অভাবে তার গলাটা শুকিয়ে চৌচির হয়ে রয়েছে। দ্বীপ অর্পনার দিকে এগুতে চেয়েও এগুলো না। দূরে থেকেই বললো — কিছু কথা ছিলো,, বলা যাবে?
,,, কি বলবেন? আপনার বাবার টাকা নষ্ট করেছি কেনো সেটা? নাকি ভাঙচুর করেছি কোনো, এটা?
,,, দ্বীপ অর্পনার দিকে কিছুটা এগিয়ে ক্ষিন হেসে বললো — এই মুহুর্তে তুমি আমায় স্যুট করে দিলেও কিছু বলবো না, ওসব তো টাকা পয়সাই। নিজের জীবনের থেকে অন্তত টাকা পয়সা ইম্পর্ট্যান্ট না।
,,, অর্পনা নাক কুঁচকে ঘৃণিত দৃষ্টি ফেলে বললো — আরও কয়েকবার মাউথ ওয়াশ করা প্রয়োজন ছিলো,, উ*ইস্কির ঘ্রাণ আসছে,, আরেকটু দূরে গিয়ে কথা বলুন
,,, অর্পনার কথায় ব্যাথিত হাসলো দ্বীপ, আগের জায়গায় সরে এসে বললো — তুই খুব ভাগ্যবান অর্পনা,, তুই যাকে কষ্ট দিস সে শুধু কষ্টই পায়,, তর মতো প্রতিশোধ নিতে পারেনা।
,,, অর্পনা এক গাছি চুল নিয়ে আঙুলে পেচাতে পেচাতে বাকা হেসে বললো — ইফেক্ট করার পর সাইড ইফেক্ট আসবে এটাই স্বাভাবিক। এখন এটাকে আপনারা প্রতিশোধ ধরে নিলে অর্পনার কি করনীয়?
,,, অর্পনা যতোটা নিরুত্তাপ দ্বীপ ততোটাই ভঙুর, কাতর কন্ঠে বললো — তুই তো কথা দিয়েছিলি বেশিদিন দূরে থাকবি না,, আমাদের দূরত্ব কি কোনোদিন মিটবে না অর্পনা?
,,, অর্পনার মুখের বাকা হাসি টুকু মুছে গেলো, নরম চোখে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বললো — কথা তো আপনিও দিয়েছিলেন,, কয়টা কথা রেখেছেন আপনি?
,,, দ্বীপ উত্তর দিতে পারলো না,, উত্তর নেই তার কাছে। সে কিছুটা ঝুকে রেস্টুরেন্ট থেকে কিনে আনা পিজ্জাটা বের করে নিলো, সাথে স্পিড ও এনেছে,, অর্পনার পছন্দ বলে কথা। বাড়িতে যাওয়ার পর যখন জানলো অর্পনা সেহরি করেনি তখনি ছুটে এসেছে এখানে,, উদ্দেশ্য বুঝিয়ে সুঝিয়ে খাওয়ানো আর এক পলক দেখতে পাওয়া। দ্বীপ পিজ্জার স্লাইস গুলো ভালো মতো ছাড়িয়ে অর্পনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো — খেয়ে নাও,,
,,, অর্পনা মুখ ফিরিয়ে বললো– আমি রোজা!!
,,, না খেয়ে তোলপাড় করলে রোজা হয়না।
,,, আমি আপনার মতো নেশাখোর নাস্তিক নয়,, নিয়ত সৎ থাকলে সেহরি ছাড়াও রোজা হয়।
,,, আমার নেশায় তর এতো অনিহা কেনো? গতো একমাসে কখনো টের পেয়েছিস আমি যে নেশা করি?
,,, অর্পনা তাচ্ছিল্য হেসে বললো– বিশ্বাস করেছিলাম, সেদিন বিশ্বাসটা ভাঙলো।
,,, দ্বীপ বিরক্ত হলো,, এই মেয়েটার সাথে যথেষ্ঠ নরম স্বরে কথা বলে সে। এর আগে কারোর সাথে কান্টিনিওয়াসলি নরম স্বরে কথা বলা হয়নি,, শুধু নির্বাচনের আগে জনগনের সাথে টুকটাক শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলতে হয়,, এখানেও অনেক ক্যাপাসিটি আছে। সার্থ ছাড়া দ্বীপ মির্জা একফালি পলক ও ঝাপ্টায়না। অথচ এইটুকু মেয়ের সাথে সে প্রতিনিয়ত, সকাল- রাত প্রতিটা মুহুর্তে নিজেকে নরম, শান্ত রাখার চেষ্টা করে। দ্বীপ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের মাঝে অসীম ধৈর্য নিয়ে বুঝানোর মতো করে বললো– শুন ভেলোরা!! নে*শা বড্ড বাজে জিনিস,, যে একবার ধরে সে ছাড়তে পারেনা।
,,, অর্পনা দ্বীপের বুঝকে পাত্তা না দিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো — ছলনা করবেন না, আটমাস আপনি সামান্য সিগারেট ও ছোননি।
,,, দ্বীপ হাড় মানলো, তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — সত্যি বলবো?
,,, ইচ্ছা!!
,,, দ্বীপ নিজেকে ভেঙে সরল স্বীকারুক্তি দিলো — তর ভাবনা, আমি তর মাঝে পারুকে খুজি তাই তকে জীবনে রাখতে চাচ্ছি। রং, ইউ আর এবসোলোট্লি রং। তুই আমার সবচেয়ে বিশেষ জায়গা তাই আমি তর কাছে থাকতে চাই। তুই আর পারু আমার কাছে আলাদা আলাদা পারসন তদের মূল্য ও আলাদা। তবে আমি পারুকে খুজি,, নেশার টানে, অবুঝের ঘোরে, মন খারাপের সময়ে খুজি,, পারু ও আসে,, আমার সাথে কথা বলে। নেশা ছাড়া মানে পারুকে ছেড়ে দেওয়া,, এই কারনেই ছাড়তে পারছিনা।
,,,, অর্পনা শান্ত, যেনো কিছুই হয়নি। দ্বীপ এমন কিছুই বলেনি যাতে তার সামান্য পরিমান কষ্ট হতে পারে। সে দ্বীপের দিকে তীব্র অনিহা নিয়ে তাকিয়ে বললো — পারতে হবেনা,, আপনাকে কেউ জোর জবরদস্তি করছেনা, আর না আমি অর্পনা আরও একবার আপনার কাছে আবদার ঝারি করবো। যা করছেন বেশ করছেন,, নিজের কাজের কৈফিয়ত দেওয়া উচিৎ না। আমিও দেইনা। আজকের পর প্রতিদিন নেশা করবেন,, প্রয়োজনে সারাদিন নেশা করে কল্পনায় পারুর সাথে সংসার করবেন,, আই হেভ নো প্রবলেম। জাস্ট আমাকে টানবেন না,,আপনি দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার ক্ষমতা রাখলেও, আপনার এক পায়ের ভর নেওয়ার মতো রুচি আমি নামক নৌকার নেই। ১০ দিন পূর্ন হলে ১১ দিনের মাথায় বাড়ি ফিরে আসবেন,, আপনার ব্যাপারে আমার আর কোনো মতামত নেই। যাই হোক, আমি মুসলিম,, মেরে ফেললেও রোজা ভাঙবো না। আপনার আর আমার কনভারসন আজ এই পর্যন্তই। আপাতত চলে যেতে চাচ্ছি,, আশা করবো জোর জবরদস্তি করবেন না।
,,, অর্পনা না করলেও দ্বীপ ওকে আটকে দিলো,, টেনে কাছে না এনে নিজেই এগিয়ে এলো। মাঝে থাকা আধ হাতের দারত্ব গুছিয়ে নেনো সেন্টিমিটার জায়গাও অবশিষ্ঠ রাখলো না। জোর পূর্বক চুমু খেলো পুরো মুখশ্রিতে। অর্পনার চোখে মুখে বিতৃষ্না যেনো দ্বীপের মতো ঘৃনিত বস্তু এই পৃথিবীতে দুটো নেই। এই ঘৃনিত ভাবটা বড্ড আঘাত করলো দ্বীপকে, কলিজায় চীড় ধরালো। সে অর্পনার থেকে সরে এসে বললো — আমাকে তোমার খুব অসহ্য লাগে তাইনা? তুমি বলো সবাই সার্থপর, তাহলে কি তুমিও সার্থপর? আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি অথচ তুমি ভালোবাসা চাইছো। ভালোবাসা চাওয়াটা কি সার্থপরতা নয়?
— নো কমেন্টস!!
,,, বলেই অর্পনা গাড়ির ডোর ওপেন করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালো, তখনি কানে লাগলো একটা কথা —
,,, তুমি তো আল্লাহ এর নেক বান্দি, আমার মতো নাস্তিক নে*শাখোর নও। নফল নামাজ পরে দোয়া করো, যেনো আগামীকাল রাজনীতির মাঠ হতে আমার মৃত্যু সংবাদ আসে,, আমি মরে গেলে ঘৃণা করোনা। কাছে গিয়ে একবার জড়িয়ে ধরো,, ইচ্ছা হলে একবার কানের কাছে ফিসফিস করে বলো “” ভালোবাসি””
,,,, দ্বীপের এহেন কথায় ফিরে তাকালো অর্পনা, ঠোটে মুচকি হাসি। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো দ্বীপের দিকে। কাছে একদম খুব কাছে এসে দ্বীপের গলা জড়িয়ে ধরে মুখের কাছে মুখ রাখলো। এতোটাই কাছে যে, আর এক সেন্টিমিটার এগুলেই দুজনার উষ্ঠের মিলন ঘটবে। আপাতত দৃষ্টিতে বিষয়টা রোমান্টিক ঠেকলেও দ্বীপ জানে অর্পনা এমন কিছু বলবে যাতে দ্বীপ বড্ড ব্যাথিত হবে। দ্বীপের ভাবনাকে সঠিক প্রমান করে দিয়ে অর্পনা বললো– আমার ভিতরে একটা মর্গ আছে জানেন? খুবি শান্ত নিরব,, সেখানে সাতটা লাশ আছে,, একটা আমার, দ্বিতীয়টি আমার,, বাকি পাঁচটাও আমার। আমি প্রথমবার মরেছিলাম আমার মায়ের অবহেলায়,, দ্বিতীয়বার মরেছিলাম এক সুনিপুণ সুদর্শনের আঘাতে,, সেই রাতে আমি আরও একবার খুন হলাম। কয়েকজন মিলে খুন করলো আমায়,, চতুর্থবার মরলাম নিজের ইচ্ছায়। এইবারে ঐ ব্যাক্তির কোনো দোষ ছিলোনা,, আপনাকে কখনো দোষ দেইনা আমি। আরও তিনটে লাস আগাম রেখে দিয়েছি। যদি আবার কেউ মারতে চায়? যেনো অবাক না হই। তাই আমায় মরার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই,, আমি মরতে মরতে মৃত্যুকে জয় করে নিয়েছি। ভালো থাকতে বলবো না,, একেবারে ভালো থাকা উচিৎ না,, আবার একজীবনে সব পেয়ে যাওয়া ও উচিৎ না। অনুপম রায়ের একটা গান আছে জানেন তো?
,,, আমাকে আমার মতো থাকতে দাও,,
আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি,,
যা ছিলোনা ছিলোনা, তা না পাওয়াই ভালো,,
সব পেলে নষ্ট জীবন,,
,, সুতরাং,, এই একজীবনে আপনাকে আমার চাইনা!!
,,,,কথাটা বলে দ্বীপের ঠোঁটে চুমু বসালো অর্পনা। পরপর শিষ বাজাতে বাজাতে গাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো,,কিছুদূর হেটে জোরে জোরে গাইলো “” আমার এই বাজে স্বভাব কোনোদিন যাবেনা”” দ্বীপ তাকিয়ে রইলো,, ইদানীং খুব ভয় পায় দ্বীপ,, এই মেয়েটাকে হারানোর ভয়,, এই মেয়েটার ব্রেইনকে ভয়,, এই মেয়েটার মনে কি চলে সেটা নিয়ে তীব্র ভয়ে থাকে সে। মেয়েটা যেই হাড়ে ভালোবাসতে জানে,, তার থেকেও তীব্র ভাবে প্রতিশোধ নিতে জানে। কোন কাজের প্রতিশোধ কিভাবে নিবে এটা কেউ ধরতে পারবেনা।অর্পনা খুব বেপরোয়া,, ও কোনো কাজ হিসেব করে করেনা অথচ যে শিকার হয় সে ঠিক টাইমে হিসেবটা বুঝে যায়। আর এই বেপরোয়া হওয়ার একমাত্র কারন একাকিত্ব। যে মানুষ একা একা ট্রাজেডির মধ্যে জীবন পার করে সে কখনো স্বাভাবিক থাকেনা,, ট্রমাটাইজ্ড কিংবা সাইকোপ্যাথ হয়ে যায়। অর্পনার বেলায় কোনটা হয়েছে ধরা যাচ্ছেনা। দ্বীপ অনুভব করলো, একটা জীবন তাকে প্রতিশোধের উপর দিয়েই যেতে হবে। যখনি ভুল করবে তখনি প্রতিশোধের শিকার হতে হবে।বর্তমানে সে ভুল করছে,, অর্পনার বিশ্বাস ভেঙেছে,, কান্টিনিউয়্যাসলি নেশা করে এসেছে,, এই অপরাধের প্রতিশোধ কিভাবে নিবে মেয়েটা? জানা নেই। তবুও তার এই মেয়েটাকে চাই,, এই মেয়েটাকে না হলে তার চলবে না,, দম আটকে আসে যে,, মরে যেতে মন চায়।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৬ (২)
দ্বীপ আরও বুঝলো, ভালোবাসায় বড্ড পেইন থাকে যার কোনো পরিশেধক থাকেনা।
In love, there is only pain
a pain for which no painkiller exists.
