জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৬৬
লামিয়া রহমান মেঘলা
ধীরে ধীরে সকালের সূর্যটা পশ্চিম আকাশের দিকে ঢলে পড়ছে। দুপুরের প্রখর তেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা কোমল আলো ঘরের ভেতর এক প্রশান্ত আবহ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিকেলের আগমনী সুর, যেন ব্যস্ত দিনের শেষে প্রকৃতিও একটু বিশ্রামের আয়োজন করছে।
সবাই এখন লাঞ্চ টেবিলে বসেছে। কারণ দুপুরের পুরোটা সময় সায়েরের বিয়ের কাজ নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিল। আর আদ্রিস ও আদ্রিতা নিজেদের কাজেই মগ্ন ছিল।
মিসেস মিহু সবার জন্য খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই আদ্রিস আদ্রিতাকে পাঁজাকোলে নিয়ে নিচে নেমে আসে।
মিসেস মিহু একবার সেদিকে তাকান। আদ্রিতাকে দেখে তার মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে।
আদ্রিস আদ্রিতাকে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
মিসেস মিহু আদ্রিতার সামনে প্লেট এগিয়ে দেন।
আদ্রিস আদ্রিতার পাশে না বসে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
মিসেস মিহু তা দেখে বলেন,
“কোথায় যাচ্ছিস বাবা? খাবিনা?”
“মম, এয়ারপোর্টে যাব।”
“ও, মাধবী আসবে?”
“হ্যাঁ।”
“কিছু তো খেয়ে যা।”
“মমকে নিয়ে একসাথে খাব।”
“ঠিক আছে।”
আদ্রিস বেরিয়ে যায়।
আদ্রিতা কিছুক্ষণ আদ্রিসের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন যদি পুরোপুরি সুস্থ থাকত, তবে হয়তো সে হেঁটে হেঁটেই আদ্রিসের সঙ্গে বাইরে পর্যন্ত যেত।
একসময় সে সামনে সাজানো খাবারগুলোর দিকে তাকায়। মিসেস মিহু তার পছন্দের সব খাবারই রান্না করেছেন।
সায়ের আর মিরা দুজন বেশ দূরে দূরে বসে আছে। তবে খেতে খেতে সায়েরের দৃষ্টি বারবার মিরার দিকেই ছুটে যাচ্ছে।
অন্যদিকে রেভেন ও প্রিয়ার অবস্থাও একই। তারাও নিজেদের অজান্তেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে যাচ্ছে।
শুধুমাত্র আদ্রিতাই মনোযোগ দিয়ে খাবার খাচ্ছে।
খাবার টেবিলে ধীরে ধীরে জমে ওঠে টুকটাক হাসি, গল্প আর মৃদু ঠাট্টা। সেই হাসির শব্দে ঘরের পরিবেশ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
মিসেস মিহু দু চোখ ভরে সেই দৃশ্য দেখলেন।
এই তো তার পরিপূর্ণ পরিবার।
সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্ত নিয়ে কখনো নারাজ হতে নেই। তিনি যেমন একদিন মিসেস মিহুর কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলেন, তেমনি আজ আবার একে একে সব ফিরিয়েও দিয়েছেন।
তার হৃদয় আজ পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে ভরা।
জীবনের কাছে আর কোনো চাওয়া নেই তার। শুধু এই মানুষগুলোকে ঘিরে এমনই হাসিমাখা দিন যেন অটুট থাকে, এটাই তার নীরব প্রার্থনা।
বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। রাশিয়ার ব্যস্ত নগরীর রাস্তাগুলো তখনও মানুষের পদচারণা আর যানবাহনের শব্দে মুখর। সেই কোলাহল ভেদ করেই এগিয়ে চলেছে আদ্রিসের গাড়ি। তার গাড়ির পেছনে আরও দুটো গাড়ি, যেখানে অবস্থান করছে তার নিরাপত্তারক্ষীরা।
ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে একসময় এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছায় আদ্রিস।
গাড়ি থেকে নামতেই তার দৃষ্টি পড়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকজন রিপোর্টারের দিকে। তারা যেন অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছিল।
পেছন থেকে দ্রুত এগিয়ে আসে গার্ডরা। দক্ষ হাতে তারা সবাইকে সরিয়ে দিয়ে আদ্রিসের জন্য পথ পরিষ্কার করে।
আদ্রিস ভেতরে প্রবেশ করে সোজা রেস্ট রুমের দিকে যায়।
সেখানে বসে আছেন মাধবী বেগম।
অনেকদিন পর মাকে সামনে দেখে আদ্রিস এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
ছেলের উষ্ণ আলিঙ্গনে মাধবী বেগমের মনেও নেমে আসে একরাশ প্রশান্তি।
“কেমন আছিস বাবা?”
“ভালো মম। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। আদ্রিতা কোথায়?”
“ওকে আনিনি। চলো, তুমি গিয়ে দেখবে।”
“আমার প্রিয়া কেমন আছে?”
“চলো, গিয়েই দেখবে।”
মাধবী বেগমকে সঙ্গে নিয়ে আবার মেনশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয় আদ্রিস।
গাড়িতে বসে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাধবী বেগমের বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। ছেলের এই সাফল্য, এই প্রতিষ্ঠা, সবকিছু যেন তাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দিচ্ছে। রাশিয়ার মতো বিশাল একটি দেশে আদ্রিস নিজের পরিচয় তৈরি করেছে। তার জন্য রিপোর্টাররা অপেক্ষা করে, অসংখ্য মানুষ তাকে একনজর দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।
এসব ভাবতেই মাধবী বেগমের হৃদয় গর্বে ভরে ওঠে।
আদ্রিস নিজেই ড্রাইভ করে মাকে নিয়ে মেনশনে পৌঁছে যায়।
ভেতরে তখন সবাই বসে গল্প করছিল।
আদ্রিতা শুধু কাউচে বসে আছে। তার এক হাত আলতো করে নিজের পেটের উপর রাখা, যেন অজান্তেই সে তার অনাগত সন্তানকে আগলে রেখেছে।
বাকি সবাই নিচে বসে ব্যস্ত নিজেদের কাজে।
লিভিং রুমের মাঝখানে প্রিয়া আলপনা আঁকছে। বিয়ের আয়োজনের মধ্যে একটু বাঙালি ছোঁয়া এনে দেওয়ার চেষ্টা। শুধু প্রিয়াই নয়, এই কাজে সায়েরকেও নামিয়ে দিয়েছে সে।
শুধু মিরা আর আদ্রিতা নেই।
আদ্রিতা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়, আর মিরার সামনে বিয়ে। হবু কনের জন্য আলাদা আভা আর যত্নের প্রয়োজন।
মিসেস মিহুও তাদের সঙ্গে আলপনার কাজে ব্যস্ত।
বাড়িতে এতগুলো সার্ভেন্ট থাকা সত্ত্বেও এই কাজটা তারা নিজেরাই করছে।
কারণ এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি ঐতিহ্য, পারিবারিক উষ্ণতা আর একান্ত কিছু মুহূর্তের আবেগ।
সবাই মিলে আলপনা আঁকছে, গল্প করছে, হাসছে।
সেই হাসির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
ঠিক তখনই আদ্রিস মাধবী বেগমকে নিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করে।
ঘরে ঢুকতেই মাধবী বেগমের দৃষ্টি গিয়ে থামে মিসেস মিহুর দিকে।
তার মুখে এক প্রশান্ত, পরিপূর্ণ হাসি।
চারপাশে সন্তানদের নিয়ে এক সুখী পরিবার।
দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে যান মাধবী বেগম।
একসময় তার জীবনও এমনই ছিল।
তার পরিবারও ছিল পরিপূর্ণ।
তার ঘরও এমন হাসি, গল্প আর আনন্দে ভরে থাকত।
কিন্তু সময় বদলেছে।
জীবনের নিষ্ঠুর স্রোতে একে একে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু।
অদ্ভুত এক হিংসা নীরবে জন্ম নেয় তার মনে।
এই পরিবার তো একসময় তার ছিল।
কিন্তু আজ সেটি মিসেস মিহুর হয়ে গেছে।
মাধবী বেগমকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদ্রিস একবার ডাক দেয়,
“মম। চলো, ভেতরে চলো।”
মাধবী বেগম চমকে উঠে মৃদু হাসলেন।
তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে গেলেন।
তাকে দেখেই প্রিয়া আর মিরা উঠে দাঁড়ায়।
দুজন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
মাধবী বেগম স্নেহভরে দুজনের কপালে চুমু খান।
“কেমন আছিস তোরা?”
“খুব ভালো আম্মু। তুমি কেমন আছো?”
“তোদের দেখে ভালো লাগছে।”
আদ্রিতাও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
তাকে দেখেই মাধবী বেগম নিজে সামনে এগিয়ে যান।
“কিরে, কেমন আছিস?”
“ভালো। তুমি কেমন আছো?”
“খুব ভালো। তোকে দেখে আরও ভালো লাগছে। দাদি হব যে।”
আদ্রিতা মৃদু হেসে ফেলে।
তারপর মাধবী বেগম এগিয়ে যান মিসেস মিহুর দিকে।
“আপা, ছেলে মেয়েদের কতটা যত্ন করেন আপনি। সত্যি আমি কৃতজ্ঞ।”
মিসেস মিহুও মৃদু হাসলেন।
“ওরা আমারও ছেলে মেয়ে আপা। আমাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর কিছু নেই। আমি উল্টো আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার মেয়ের জন্য এত পারফেক্ট একটা বর যে বানিয়েছেন আপনি।”
দুজনের ঠোঁটে হাসি থাকলেও কথার আড়ালে যেন অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতা কাজ করছিল।
সেই সূক্ষ্ম সুরটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল সায়ের আর আদ্রিস।
পরিস্থিতি হালকা করার জন্য আদ্রিস এগিয়ে এসে বলল,
“মম, চলো ফ্রেশ হয়ে নিই। খাবার খেতে হবে। তোমার সঙ্গে খাব বলে এখনও খাইনি আমি।”
“আচ্ছা বেশ, চল তবে।”
মাধবী বেগম ছেলের সঙ্গে চলে গেলেন।
মিসেস মিহু স্থির দৃষ্টিতে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মাধবী বেগমের কথাগুলোর মধ্যে তিনি এক অদ্ভুত রহস্যের আভাস পেয়েছেন।
কথাগুলো ছিল সাধারণ, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ যেন অনেক গভীর।
সেই অদৃশ্য ইঙ্গিতই নিঃশব্দে ভাবিয়ে তুলল তাকে।
আদ্রিস এবং মাধবী বেগমকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলো আদ্রিতা।
মাধবী বেগম জার্নি করে এসেছে তিনি ক্লান্ত। খাবার খেয়ে ঘুমাবে। খাবার দেওয়া শেষ হলে আদ্রিতা গিয়ে দাঁড়ায় আদ্রিসের পাশে।
আদ্রিস চেয়ার টেনে আদ্রিতাকে বসায়।
“দাঁড়িয়ে কেন আছিস এখনো?”
“খাবার দিচ্ছিলাম না৷”
আদ্রিস ডান হাতে খাবার খেতে খেতে বাম হাতে আদ্রিতার পেটে হাত বুলিয়ে দিতে লাগে। আদ্রিতা, আদ্রিসের হাত পিছিয়ে দিতে চাইলেও পারেনা। আদ্রিসের চোখ দেখে থেমে যায়।
মাধবী বেগম খাবার খেতে খেতে বললেন,
“আদ্রিতা খাবার কে রান্না করে?”
“সেফ আছে মা।”
“ও আমি ভাবলাম তোর আম্মু করে কিনা৷”
“না না আম্মুর ইচ্ছে হলে অনেক রান্না করবেন একা। ইচ্ছে না হলে কখনোই যাবেন না রান্না ঘরে।”
“আর যদি তোরা কিছু শখ করে খেতে চাস।”
“তবুও সেফ করে দেবে। ইচ্ছে না হলে আম্মু কিছু করেন না।”
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৬৫
“বাহ তাহলেত খুব শান্তির জীবন তার৷”
আদ্রিতা কথাটা শুনে একবার আদ্রিসের দিকে তাকালো। আদ্রিস যে হাত আদ্রিতার পেটে রেখে বুলিয়ে দিচ্ছিলো সেই হাতে আলতো করে ট্যাপ করে এটা বুঝাতে যে মাধবী বেগমকে কিছু না বলতে। আদ্রিতাও তাই চুপ হয়ে যায়।
