তাকদীর পর্ব ৫
নিরুর কল্পনারাজ্য
জুনায়েদ জ্ঞান হারানোর পর আয়রা এবং আমিরা দুজন-ই ভীষণ হতভম্ব হলো। এটা কী হলো? জুনায়েদ হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো কেনো তা তাদের বোধগম্য হলোনা। তবে পরক্ষণেই আয়রা রুহানি সৈয়দকে ডেকে আনলো। ছেলের বেহাল দশা দেখে তিনি বিরক্ত এবং একই সাথে হতাশ ও হলেন। আপনমনে বিলাপ করলেন,
— জুনায়েদের আব্বু! দেখে যান আপনার ছেলের দশা। নিশ্চয় মদ-টদ খেয়ে পড়ে আছে।
তিনি ভীষণ অবজ্ঞায় কথাগুলো বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। জুনায়েদকে টেনে তোলার সময় তিনি উপলব্ধি করলেন- ছেলের প্রচন্ড জ্বর। তিনি অবাক হলেন। শেষ কবে যে জুনায়েদের জ্বর এসেছিলো তা মনে করা বড্ড দায়! তিনি দ্রুত এহমাদ শাহরিয়ারকে ডাক দিলেন,
— জুনায়েদের আব্বু, এদিকে আসুন। দ্রুত আসুন৷ আপনার ছেলের শরীর গরম করেছে। ইয়া আল্লাহ! এটা কী হলো হঠাৎ করে।
রুহানি সৈয়দের কন্ঠস্বর মুহূর্তেই পরিবর্তিত হয়ে আর্তনাদে পরিণত হলো। আয়রা হতবাক আদলে চেয়ে। ধীর কন্ঠে সে বললো,
— আম্মি, উনি হঠাৎ এলেন আর আমি সালাম দেওয়ার পর অজ্ঞান হয়ে গেলেন। জানিনা কী হয়েছে হঠাৎ।
রুহানি সৈয়দ ছেলেকে আকরে ধরে বললেন,
— এক কাজ করো, দ্রুত গিয়ে তৈরি হয়ে নাও। হসপিটালে যেতে হবে আমাদের।
এহমাদ শাহরিয়ার ও তখন টগবগিয়ে এলেন। ছেলের এ’অবস্থা দেখে তিনিও হতবাক। দু’জনের মনেই সন্দেহের দানা বিধেছে। ছেলের এতোকাল উশৃঙ্খল জীবন-যাপনের কারণে কী সাংঘাতিক রোগ হয়েছে? আয়রা আমিরাকে দ্রুত হিজাব পড়িয়ে দিয়ে মুখটা নেকাবের আড়ালে আবদ্ধ করে দেয়। নিজেও খুব দ্রুত একটা বোরকা সাথে নেকাব পড়ে বেরিয়ে আসে। সে ভীষণ ইতস্তত বোধ করলো এমন মুহূর্তে।
অতঃপর তারা দ্রুত-ই তাকে নিয়ে হসপিটালে গেলো। হসপিটালে তাকে ভর্তি করানো হলো। অবস্থা ছিলো খুবই বেগতিক। সাধারণ মানুষের ১০৩° অথবা ১০৪° ডিগ্রি জ্বর হলেই সে নেতিয়ে পড়ে। সে স্থানে জুনায়েদের জ্বর ছিলো ১০৫°। এসব রেয়ার কেইস। তাই জটিলতা কমাতে ডাক্তাররা জুনায়েদকে হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি করিয়ে দেয় যা আবশ্যক। তার ওপর বড়লোক পরিবার হওয়ার দরুণ টাকার গুচ্ছটাও বাড়ানো যাবে। জুনায়েদ হসপিটালের কাপড়ে শুয়ে আছে কেভিনে। হাতে ক্যানুলা। এখনো অজ্ঞান সে। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার চিকিৎসার পর তার জ্বর অল্প কমানো গিয়েছে। যার দরুণ এখন সকলেই চিন্তামুক্ত। সাথে এখন তাকে বেডে শিফ্ট করা হয়েছে সরাসরি।
এখন রাত হয়তো আটটা নাগাদ হবে। রুহানি সৈয়দ ছেলের পার্শ্বে বসে। তিনি একবার আড়চোখে আয়রার দিকে তাকালেন। সেবার যখন প্রথমবারের মতো আয়রাকে তিনি দেখেছিলেন তখন আয়রা ছিলো বিবাহিত এবং ফারিশের স্ত্রী। তবে সময়ের আবর্তে ফারিশের সাথে আমিরার তালাক হয়ে যাওয়ার ঘটনা তার কানে ঠিক এসেছিলো। এ’কারণে তিনি আয়রাকেই তার ঘারত্যাড়া ছেলে জুনায়েদের জন্য ঠিক করেন। বিয়ে মেয়েটার অমতে হয়েছে নাকি মতে তা তার জানা নেই। ছেলের জন্য যদি দু’একটা গুণাহ হয়েও থাকে তাতে মাতৃমন যদি শান্তি পায় তাহলে ক্ষতি কী? তিনি মিষ্ট কন্ঠে আয়রাকে কাছে ডাকলেন,
— আম্মু! এদিকে এসো।
এহমাদ শাহরিয়ার তখন ডক্টরের সাথে কথা বলতে বাহিরে গিয়েছিলো। আয়রা আমিরাকে সোফায় বসিয়ে রেখে রুহানি সৈয়দের কাছে গেলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন,
— আম্মু! তুমি কী একটু আমার ছেলেটার পাশে বসতে পারবে? আমি একটু অযু করে আসি? নামাজটা আদায় করে এসেই আমি আবারও বসবো।
আয়রা নিষেধ করতে পারেনা। করবেই-বা কী করে? একজন মা এভাবে আকুতি করলে মুখের ওপর না বলা যায়? আয়রা নিজেকে শান্ত করলো। অতীতকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার কোনো মানে নেই। আর না-তো অতীতের জন্য বর্তমানকে অবহেলা করার স্পর্ধা আয়রার আছে। আয়রা নীরবে ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়,
— জ্বী, আম্মি!
রুহানি সৈয়দ মিষ্টি হাসলেন। মেয়েটা একদম শান্তশিষ্ট। তিনি একগাল হেসে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে আমিরার সাথেও কথা বলে গেলেন,
— দাদিজান, কী খাবেন আপনি?
আমিরা শান্ত বাচ্চার ন্যায় সোফায় বসে সকলকিছু অবলোকন করছিলো। বোধ-বুদ্ধি তার অধিক। সে এক লহমা মায়ের ওপর নজর রাখে। আয়রা তাকে চোখের মাধ্যমে আশ্বস্ত করতেই বাচ্চা বাচ্চা বুলিতে সে বলে,
— এট্টুতানি খাবার আনলই অবে।
রুহানি সৈয়দ হাসলেন। আমিরার দুগালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে চলে গেলেন এশারের নামাজ আদায় করতে। হসপিটালের ওই কেভিন নাম্বার ৪০৩ এ পিনপতন নীরবতার সাথে সাথে কেবল-ই আয়রা, আমিরা এবং জুনায়েদের উপস্থিতি ছিলো। আয়রা প্রথমবারের মতো জুনায়েদের চেহারায় গভীরভাবে নজর রাখে। ছেলেটা তুলনার চেয়ে অধিক সুন্দর। অনেকটাই! পুরুষটির দীঘলপেল্লবযুক্ত চক্ষুবিশেষ; শক্ত চোয়াল সাথে এতো সুন্দর মখমলে কেশদ্বয় সাথে মসৃণ কপাল। আয়রা প্রথমবারের মতো তাকে নিজের স্বামীরূপে কল্পনা করার চেষ্টা করলো। কে এই পুরুষ? যে কিনা খুবই উশৃঙ্খল সাথে ভীষণ অসভ্য? প্রথম সাক্ষাতে-ই কিনা যার ওপর সে অসন্তুষ্ট হয়েছিলো? আয়রার আনমনে হাসি পেলো। সে আল্লাহতায়ালার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। তবু তার হাসি পেলো যে তার ভাগ্য ঘুরেফিরে সে মানুষটির কাছে এসে উপনীত হয়েছে যার কথা সে কষ্মিনকালেও ভাবেনি। এরইমাঝে এতোঘন্টা পর অতি ধীরে পিটপিট নজরে চোখ মেলে চায়লো জুনায়েদ। চারিদিক চোখ ফেরানোর সময় অকস্মাৎ আয়রাকে তার পাশে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো সে। চোখদুটো তার বড় বড় হয়ে গেলো। তার অবেধ্য কন্ঠস্বর যেনো আজ ফিঁকে হয়ে আয়রার সম্মুখে। তবু সে কোনোরকমে বললো,
— দূরে যাও তুমি। সামনে থেকে সরে যাও।
আয়রা হতবাক হলো। সে দ্রুত-ই সরে আসলো সেখান থেকে। মিহিস্বরে শুধালো,
— আ..আপনার কী কিছু প্রয়োজন?
আয়রা নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইলো। তা দেখে জুনায়েদ একপলক তার দিকে ফিরলো। আয়রার মলিন এবং অতিশান্ত আদল জুনায়েদকে আহত করলো। উফ! কী হচ্ছে তার সাথে? নিজমনেই সে নিজেকে প্রশ্ন করে,
— কী হচ্ছে এসব আমার সাথে? আমাকে কী এই মেয়েটা কালো জাদু করেছে? ওহহ গড!
সে বিরক্ত হলো ভীষণ। একই সাথে শান্তি এবং বিরক্তি অনুভব হতে আরম্ভ করলো। সে তার উচ্চবিলাসী জীবন মোটেই ছাড়তে চায়না। অথচ এই মেয়েটা! এই মেয়েটা তার জীবন সম্পূর্ণ ওলট-পালট করে দিচ্ছে। সে সময় নিয়ে আমিরার পানে তাকায়। সে খেয়াল করেনি যে আমিরাও এখানে উপস্থিত। তাহলে নিশ্চয় সে এমন আচরণ করতোনা। বর্তমানে প্রায় ১০৪° জ্বর নিয়েও সে আয়রার চিন্তায় বিভোর। সে কিছুক্ষণের মাঝেই আবারও জ্ঞান হারালো। শরীরের অত বেশি উত্তাপ তার সহ্য হলোনা। ভীষণ চেষ্টা করার পরও সে চেয়েও চোখ খুলে রাখতে পারলোনা। আয়রা হতচকিত চোখে চেয়ে রইলো। হুট করে জ্ঞান ফিরলো আবার হারিয়েও গেলো? আয়রা বিচক্ষণ। সে দ্রুত ডক্টরকে ডাকলো। ডক্টর এসে জুনায়েদ কে পরখ করলেন ভীষণ সন্তপর্ণে। স্টেথোস্কোপের সাহায্যে গম্ভীরমুখো হয়ে হার্টবিট চেক করলেন। বললেন,
— পেশেন্টের হার্টবিট ভীষণ ফাস্ট। ১০৫° জ্বর ব্যাসিকালি রেয়ার। সাধারণ মানুষের হয়না। তবে আল্লাহ সঙ্গে থাকলে অবশ্যই তিনি রিকোভার করবেন খুব দ্রুত। জ্বর তো খানিকটা কমেছে-ই। বাকিটা আল্লাহতায়ালার ওপর!
ডক্টর জুনায়েদের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করতে বললেন। সাথে স্যালাইনের ডোজ হালকা বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। আয়রা চিন্তিত মুখে চেয়ে রইলো। আমিরার পাশে গিয়ে মুখে হাত দিয়ে বসলো। একদৃষ্টে চেয়ে রইলো জুনায়েদের পানে। সুশ্রী মুখশ্রী ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে; সাজানো-গোছানো সিল্কি চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। হাতে ক্যানুলা লাগানো। বিবর্ণ মুখ। আয়রা কখনো ভাবেনি জুনায়েদের সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ তার এমন হবে। পাশ থেকে আমিরা তাকে ডাকলো মিহি এবং বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠে,
— আম্মিজান, আঙ্তেলের তী অয়েছে?
আয়রা মলিন মুখো হয়ে আমিরার পানে তাকালো। তাকে নিজের কোলে বসিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে বললো,
— আঙ্কেল অসুস্থ আম্মিজান।
— বেশি?
— জ্বী আম্মিজান।
অমনি ছোট্ট সত্ত্বাটি কী মনে করে যেনো নিজের দু’হাত ওপরে তুললো। ছোট ছোট কোমল দু’হাত উঁচু করে নিজের রবের কাছে দোয়া চায়লো সেই অজানা আঙ্কেলটির জন্য,
— ইয়া আল্লাহ, আঙ্তেল তে তাত্তাড়ি ভালো তরে দিন। আমিন!
আয়রা আমিরার এহেন কান্ডে আবেগে আপ্লুত হলো। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো জুনায়েদ ঘোরের মাঝেই বিড়বিড় করছে। সে আমিরাকে রেখে এগিয়ে গেলো। দু’কদম বাড়িয়ে জুনায়েদের কাছাকাছি গিয়ে কান পাতার চেষ্টা করলো। নেকাব ধরে মুখ খানিকটা নিচু করে ঝুঁকে পড়লো সে। জুনায়েদের ঠোঁট তখন বিড়বিড় করে কিছু বলে চলেছে। আয়রা শোনার চেষ্টা করেও শুনতে পেলোনা। যার দরুণ আরও খানিকটা নিচে ঝুঁকে পড়লো। জুনায়েদের ওষ্টের একদম কাছেই নিজের কান পেতেই শুনতে পেলো বিড়বিড়িয়ে বলা কিছু বাক্য,
— ‘ ওই মেয়েটা…মেয়েটা..
আয়রা কিছুই বুঝে উঠলোনা। জুনায়েদ আবারও বিড়বিড় করা আরম্ভ করলো,
— পানি..পানি…!
এবারে আয়রা বুঝলো জুনায়েদে আকাঙ্ক্ষা। সে দ্রুত উঠে ডক্টরের কাছে গেলো। যাওয়ার আগে আমিরাকে বলে গেলো,
— আম্মিজান, আপনি এখানেই বসে থাকবেন। কেমন? নড়বেন না যেনো।
অতঃপর নিজেই বিড়বিড় করলো সে,
তাকদীর পর্ব ৪
— ইয়া আল্লাহ! এ কোন ফ্যাসাদে ফেলে দিলেন আপনি আমাকে। এখন তো এখানে আম্মু-আব্বুও নেই।
আয়রা কিছুক্ষণের মাঝেই ডক্টরের সাক্ষাৎ নিয়েই ফিরে এলো। ফিরে এসে যা দৃশ্যমান হলো তা দেখার জন্য মোটেই সে প্রস্তুত ছিলোনা। সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকপানে। জুনায়েদের শক্তপোক্ত বুকে ছোট্ট আমিরার দেহখানা। জুনায়েদ আমিরার নরম দেহকে নিজের মাঝে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। তার ক্যানুলাযুক্ত হাতটি আমিরার পিঠে। আমিরাও নিজের নরম দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। দু’জনের আদলের মায়া এবং আদরের জোয়ার। যেনো সত্যিকারের কোনো বাবা-মেয়ে।
