Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭২
Maha Aarat

তবে এবার উৎসাহী সুরে বলল,
“যাই হোক, আমি আপনার জন্য একটা উপহার এনেছি।”
মাহের ভ্রু উঁচু করে তাকালেন।
“আমার জন্য?” উনার চোখে একটু কৌতূহল, একটু বিস্ময়।
আইরা চট করে পাশের রুমে ঢুকে গেল।মুহূর্তেই ফিরে এল হাতে একটা ছোট লাল রঙের বাক্স, চকচকে র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো।
‘এই নিন, খুলুন তো দেখি!’আইরার কণ্ঠে যেন একটা কিশোরীসুলভ দুষ্টু উত্তেজনা।
মাহের ধীরে ধীরে প্যাকেটটা খুলতে লাগলেন।চোখে-মুখে একধরনের ছেলেমানুষি কৌতূহল, যা সাধারণত তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে রাখেন।
কিন্তু এবার নিজেকে থামাতে পারলেন না।
পেপারটা খুলতেই বেরিয়ে এলো একটা ছোট প্যাকেট।প্যাকেট খুলে মাহের এক মুহূর্ত স্তব্ধ।মুখটা লাল হয়ে গেল, কানের গোঁড়ায় লজ্জার রঙ ছড়িয়ে পড়ল।
ভেতরে থেকে বেরিয়ে এলো এক প্যাকেট বেনসন এ্যান্ড হেজেস সিগারেটের প্যাকেট।

”…আইরা!”—মাহের এতটাই হতচকিত, বুঝতেই পারছেন না কী বলবেন।
“কী হলো?”—আইরা নিষ্পাপ মুখ করে বলে, চোখে একধরনের অবুঝ ভঙ্গি।
‘পছন্দ হয়নি? আমি ভাবছিলাম আপনি… মানে… মাঝে মাঝে টানেন এবং খুব পছন্দও করেন… তাই ভাবলাম…”
“না না! মানে… না তো!”—মাহের এবার পুরো লাল হয়ে গেলেন।
““না না! এইটা… মানে, এইটা আবার কী আইরা!—আঙুল তুলে এমন ভঙ্গিতে বললেন যেন স্কুলে ছাত্র ধরা পড়েছে!
আইরা মুখ গম্ভীর করে বলল,
“তাহলে ফেলে দিন।”
“ফেলে দিবো মানে? এটা আবার কেউ উপহার দেয়!”
“হ্যাঁ, যিনি চায় আপনি সেটা ছেড়ে দিন!”—আইরা চোখ টিপে হেসে ফেললো।
মাহের হেসে মাথা নাড়লেন,
“you are a real troublemaker(দুষ্টু)।আমার জীবনে কেউ এত প্ল্যান করে উপহারে লজ্জায় ফেলে দেয়নি!”
আইরা এবার একটু শান্ত গলায় বলে,

“আচ্ছা, এবার আসল গিফটটা দিন!”
“মানে?”
সে আবার রুমে গেল, এবার ফিরে এলো একটা নরম কাপড়ে মোড়ানো বড়সড় বাক্স হাতে।
“এইবার সত্যি। চোখ বন্ধ করেন!”
“না আমার আর উপহার প্রয়োজন নেই।’
‘প্লিজ স্যার।এবার হতাশ করবো না।’
“আইরা, আর সাই দিবে না তো?’
“না স্যার, এবার আপনি গর্ব করতে পারবেন!”
মাহের চোখ বন্ধ করলেন।আইরা তার কাঁধে বাক্সটা রাখতেই তিনি ধীরে ধীরে খুলে দেখলেন—একটা সুন্দর অফ-হোয়াইট রঙের পান্জাবি, হাতে এমব্রয়ডারি, গলার কাছে সূক্ষ্ম কাজ করা। কাপড়টা চোখে-মুখে ঘষেই বোঝা যায়, দারুণ সিলেকশন।

‘নাইস!’
‘শুধু নাইস?’
‘ভালো।’
আইরা হতাশ।তবুও সন্তুষ্ট সে।এই লোকের মুখ থেকে আর কোনো প্রশংসা তার আশার বাইরে।
‘তুমি আমার গিফটটা কেন নিচ্ছো না?আই এম সরী।’
‘এমনি।আপনি পাউন্ড গুলো জমা দিয়ে ক্যাশ নিয়ে নিন আবার।’
‘তুমি রাগ করেছো।’
‘নাহ।’
‘তোমার উপহার আমি নিয়েছি।সো,আমারটা ফিরিয়ে দিবে না।’
দুজনেই চুপ। কেবল জানালার বাইরে হালকা বাতাসে একটা পর্দা দুলে ওঠে।আইরার ভেতর যে নীরব ক্ষত জ্বলে,মাহের এতো কাছে থেকেও সেটা টের পেলেন না।

একটা নিরিবিলি দুপুর। চা খেতে খেতে দুজন গল্প করছে।
‘আমি আপনার পাশে জান্নাতে খেজুর গাছ লাগিয়ে রাখবো।’
‘আপনি যদি আগে জান্নাতে যান, আমাকে ভুলে যাবেন না তো?”
আরহাম চমকে বলেন, ‘আপনি কেমন কথা বলেন!আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে আল্লাহকে বলবো, ‘ইনি না হলে আমি ঢুকবো না!’”
মাইমুনা হেসে উত্তর দেন, ‘আর যদি আমি গিয়ে দেখি, আপনি জান্নাতের এক কোণে খেজুর গাছের নিচে ঘুমোচ্ছেন!’
‘তখন তোমার জন্য সেই গাছের পাশে চেয়ার সাজিয়ে রাখবো, আর বলবো, ‘মাইমুনা জান্নাতেও রেগে গেলেন!আমার কপাল!’”
মাইমুনা চোখ ছোট করে বললেন,
“আমি ঠিকই জানি, জান্নাতে আপনার আশপাশে হুররা ঘোরাঘুরি করবে, তখন দেখবো আপনি তাদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছেন!”

‘উহু।’
‘শুনুন না শাহ,হুরের কী দরকার।আমি আর আপনি একসাথে সারাক্ষণ গল্প করবো,ঘুরবো,এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াবো,আত্নীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করবো।তাই আপনি আল্লাহকে বলে দিবেন,যে আপনার হুরের কোনো প্রয়োজন নাই।আপনার হুরগুলো আপনি অন্য কাউকে দান করে দিবেন,হবে না?’
আরহাম মুচকি হাসলেন।উনার হাসিতে মাইমুনার হার্টবিট মিস হলো কয়েকটা।এই লোকটার চোখেমুখে নূর চিকচিক করে যেনো।আজন্মকাল তাকিয়ে থাকলেও যেনো বিরক্তি আসবে না।সৃষ্টিকর্তা উনাকে এতো সৌন্দর্য দিয়ে তৈরী করেছেন।
‘ঠিক আছে।দান করে দিবো।’-আরহামের উত্তর।
মাইমুনা সন্তুষ্টিজনক উত্তর পেয়ে দারুন খুশি হলেন।বললেন , ‘আচ্ছা, যদি জান্নাতে আপনি আমায় চিনতেই না পারেন?”
আরহাম গম্ভীর মুখ করে বললেন,
“তাহলে আল্লাহর কাছে শোক প্রকাশ করবো—‘ইয়া রব্ব, এই চেহারাটাকে আমি দুনিয়াতে রোজা রেখে, নামায পড়ে, ধৈর্য ধরে ভালোবেসেছি। এ তো আমার জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত! আমি জান্নাতেও যেনো উনাকে ভুলে না যাই।’
মাইমুনা চোখে জল আসা হাসি সামলে বলেন, ‘জান্নাতেও আপনি এত সুন্দর সুন্দর কথা বলবেন?”
আরহাম হেসে বলল,

“না বললে আপনি কীভাবে জানবেন আমি এখনও আপনার পছন্দের মানুষটা?”
মাইমুনা ধীরে ধীরে বলে,
“আচ্ছা, আপনি যদি আগে চলে যান, আমাকে একা ফেলে, তখন ওখানে কী করবেন একা একা?’
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ করে ভেবে উত্তর দিলেন,
‘তাহলে জান্নাতে আমি প্রতিদিন আপনার জন্য দোয়া করবো—‘ইয়া আল্লাহ, আমার স্ত্রীকে আমার কাছে এনে দিন।উনাকে ছাড়া আমার ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।’

ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা।
বাড়ির উঠোনে রোদের চুমু খেতে খেতে একজোড়া চশমা মুছছেন আহনাফ সাহেব।কালো চকচকে চওড়া ঘন দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি—তাঁকে দেখে যে কেউ বলবে, “ইনি নিশ্চয়ই বাড়ির বড়জন”। কিন্তু আজ তাঁর চোখে-মুখে এক রহস্যময় চাঞ্চল্যতা।
আজকের দিনটা অন্যরকম।
সারাবছর বাড়ির মেয়েরা খেটেখুটে খায়,পরের মুখে খাবার তুলে দেয়, ঘাম ঝরায়—তাদের জন্য আজকের দিন উৎসর্গ করা হয়েছে।
মেয়েরা আজ হাতও ভিজাবে না।
আর রান্নাঘরে নামবে— বাবা ছেলে, আর জামাতা।
মাহের আর আইরাকে খুব সকালে গিয়ে নিয়ে এসেছেন আরহাম,আহনাফ তাজওয়ার এর তলবে।
ফ্ল্যাশব্যাক_
বিশাল ডাইনিং রুমে একটা ছোট্ট মিটিং বসেছে। চায়ের কাপে ভাঁজ করা বিস্কুট চুবিয়ে চিবাতে চিবাতে আহনাফ সাহেব বললেন,

“সারাবছর মেয়েরা খেটেখুটে রান্না করে, অতিথি সামলায়, বাচ্চা সামলায়… আর আমরা কিছু করিনা।দাঁড়াই আর খাই।”
আরহাম সম্মতিসূচক দৃষ্টি মিলালেন।
আরহাম গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।আহনাফ তাজওয়ার বললেন, “আজ তাদের বিশ্রামের দিন। রান্না আজ আমরাই করবো।”
“আমি তো পারি না… একমাত্র রান্না করি ইনস্ট্যান্ট নুডলস,” মাহের কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন।
“তোমার কাজ হলো ঝাল ঝাল রান্নার দায়িত্ব। আমি করবো বিরিয়ানি। আব্বু আপনি–”
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “আমি করবো মোরগ পোলাও! কিন্তু একটা শর্ত আছে—কেউ পাশে দাঁড়িয়ে উপদেশ দিলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আলু বাছার কাজে পাঠিয়ে দেবো!”
বর্তমান_

এখান থেকেই প্ল্যান তৈরী।
“মাহের! আরহাম!এখনো তৈরী হওনি!তাড়াতাড়ি বেরোও।আহনাফ তাজওয়ার হাঁক দেন।
মিনিট পাঁচেক পর দুজনেই হাজির।
মাহের – সদ্য জামাতা, একটু গম্ভীর প্রকৃতির। পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ভেতরে গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে।লিস্টে আবার চোখ বুলিয়ে পকেটে গুজে নিলেন।
আরহাম – পান্জাবির হাতা গুটানো শেষ হলে বাইক স্টার্ট দিলেন।আব্বু ইতিমধ্যে এগিয়ে গিয়েছেন।
[বাজার যাত্রা]
তিনজন উপস্থিত হলো বাজারে। আহনাফ সাহেব, মাথায় সাদা টুপি, মুখে সুশীল ভঙ্গি, কিন্তু চোখে একধরনের আগুন—সবজির দরদামে আজ উনাকে কেউ ঠকাতে পারবে না!এমন একটা ভাবসাব।
আরহামের এক হাতে ঝোলা ব্যাগ, আহনাফ তাজওয়ার মোবাইল হাতে কাঁচা বাজারের লিস্ট লিখছেন,আর মাহের চোখ বড় বড় করে সব দেখছেন,এত সকালে তিনি কখনো বাজারে আসেননি!
তিনজনই হাঁটছেন কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, চোখে দাম যাচাইয়ের তীব্র দৃষ্টি।
প্রথম স্টপে মুরগির দোকানে,

আহনাফ সাহেব হুঙ্কার দিয়ে বললেন—
“ভাই, এই যে! ওই মোরগটা ধরেন! হ্যাঁ, ওইটা… না না, সাদা না, কালচে… ওটা নড়ছে বেশি, মানে ফ্রেশ!”
মাহের মুখে মাস্ক, চোখে সন্দেহ—
“এটা কি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে?”
আরহাম বললেন,
“এইটা নিশ্চয় তোমার প্রেমে পড়ছে! মোরগেও তো ইমোশন থাকে।”
মুরগির দোকানে লোক গিজগিজ করছে।আরেক দোকানদার ডাক দেয়—
“নিয়া যান ভাইজান, লাল মুরগি! দৌড়াইলে পুলিশেরে ধরায় না!”
আহনাফ তাজওয়ার হেসে বলেন, “তোমার মুরগি পুলিশেরে না ধরালে, রান্নায় ধরাব কি দিয়ে?”
তিনজন মিলে একটা মুরগি বেছে নিল।
দোকানদার পানের ফিঁক ফেলে হাসিহাসি কন্ঠে বললো, “এইডা দিমু না ভাই, ইগো চোখে প্রেম আছে, কাটলে গুণাহ হইবো!”
মাহের চমকে উঠে, “আচ্ছা?আপনি কিভাবে বুঝলেন?”

“চোখে চেয়ে দেখেন, ক্যামন নরমে তাকায়! হেহেহে…”
তারা শেষমেশ আরেকটা মুরগি বেছে কাটাল। দোকানি বললো, “ভাইজান,চাচা এইডা লন।খাইয়া এতো টেস্ট পাইবেন,চাচি আপামনিরা আবার আপনেগো আমার দোহানে পাঠাইবো।’
গরুর মাংসের দোকানে গিয়ে দাম শুনে মাহের অবাক হোন,এত দাম! গরু কি বিদেশ থেকে এসেছে?”
কসাই হেসে বলেন, “না, দেশি গরু, কিন্তু দাম আন্তর্জাতিক।”
আহনাফ তাজওয়ার দর কষাকষি করে গোস্ত কিনে ফেললেন।
আরহাম বলেন, “আব্বু ৫ কেজি নিলেন কেন? হাড্ডি বেশি!”
আহনাফ বলেন, “তুমি বুঝবে না, হাড্ডি দিলে ঝোল বেশি হয়। আর ঝোল বেশি মানেই মেহমান খুশি।”
খাসির মাংসের দোকানে এক হাস্যকর ঘটনা…

একটা খাসি কোটরে বসে হাঁচি দিচ্ছিল।
মাহের বললেন, ‘এই খাসিটা তো ঠাণ্ডায় ভুগছে।’
কসাই উত্তর দেয়, “না ভাই, প্রেমে পড়ছে।কালকে পাশের খাসিটার লগে আলাপ হইছিল।”
আরহাম বললেন, ‘তাহলে এটাকে ছাড়ুন, আমরা মন ভাঙতে চাই না।’
দোকানদারসহ সবাই হেসে উঠে!
দুধের দোকানে…
দুধওয়ালা একটা ছোট্ট লাইন লাগিয়েছেন।
আহনাফ তাজওয়ার আগ বাড়িয়ে বললেন, “ভাই, দুধটা না ঝাঁকিয়ে ঠাস করে ঢালেন,ঝাঁকানোর কাজটা বাড়ি যেতে যেতে হয়ে যাবে এমনিতেই।
দুধ নেওয়ার সময়, এক বিড়াল ছুটে এসে আহনাফ সাহেবের থলের দিকে ঝাঁপ দেয়।
মাহের চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওহ নো!দুধ পলুটেড হয়ে গেল!”
আরহাম হাসতে হাসতে বলেন, ‘এই বিড়ালটা জানে, আমরা রান্না করবো তাই সেও মজা নিতে ছাড়লো না।’
এবার তিনজন মিলে এবার ঢুকলেন সবজির গলিতে। চারপাশে রঙ-বেরঙের সবজি—টকটকে লাল টমেটো, সবুজ ঝিঙে, হলুদ কুমড়া, হালকা রঙের করলা। আহনাফ সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন প্রথমেই এক ঝিঙেওয়ালার সামনে..
ঝিঙে হাতে নিয়ভদ্রলোক বললেন—

“এই জিনিসটা না একটা শিল্প। ফ্রাই করলেই মনে হয় পলকেই গায়েব!”
আরহাম বললেন , ‘আর করলা তো কাব্যিক যন্ত্রণা। ভিতরে তিতা, বাইরে শান্ত।”
আহনাফ তাজওয়ার আঙুল তুলে বললেন , ‘তিতা খাবো, কিন্তু হজম করবো ভালোবাসা দিয়ে!”
দোকানি তো থ হয়ে গেছে—এই মানুষগুলো কী সবজি কিনতে এসেছে, না চা খেতে খেতে দার্শনিকতা শেয়ার করতে!
টমেটোর দোকানে দাঁড়িয়ে তিনজন গভীর আলোচনা শুরু করলেন—
মাহের টমেটোর স্টপে নিঁখুত দৃষ্টি গেঁথে বললেন , ‘এই টমেটো তো টক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কাঁচা আছে এখনো। রান্না করলে রাগ করবে!”
আরহাম জবাব দিলেন ‘টক হোক বা মিষ্টি— টমেটো ছাড়া রান্না হয় না।কত দামে দিচ্ছেন চাচা?”
দোকানি ঝাঁজালো গলায়, “৮০ টাকা স্যার!”
আরহাম একটা টমেটো তুলে বললেন , “এই টমেটো দেখেই মনে হচ্ছে—রান্নার চাপে আত্মসমর্পণ করে ফেলবে।’
আহনাফ তাজওয়ার ধীরকন্ঠে বললেন , ‘তোমরা দুজন টমেটোর প্রেমে পড়ছো নাকি?আমি ভাবছি, দামে কিছু কম করা যায় কি না!”

দোকানির মুখ দেখে বোঝা গেল, তিনি এখন এই তিনজনকে একটা থলে ভর্তি টমেটো ফ্রি দিয়েও বিদায় করতে রাজি!
অতপর তিনজনে হেঁটে হেঁটে এবার কুমড়ার দোকানে।
কুমড়া হাতে তুলে আহনাফ তাজওয়ার ,
“এই জিনিসটা ভালো। এইটা তো আমার ছাত্রজীবনের স্মৃতি।শাস্তির প্রতীক!”
মাহের বললেন, ‘কুমড়াটা দেখেই কেন জানি মনে হচ্ছে, এটা sick। রঙটা তো একেবারে দুঃখী মানুষদের মতো ফ্যাকাসে!”
কুমড়াওয়ালা মজা করে, ‘ওটা হয়তো আপনাদের দেখে ভয় পেয়ে এমন হয়েছে!”
আরহাম এক কুমড়া তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছেন।আব্বুর পজিটিভ মন্তব্যের পাশে মন্তব্য তুলে বললেন ,
আরহাম হেসে, ‘আর কেটে ফেললে? তখন হয়ে যায় ছোট ছোট দুঃখ!এই কুমড়ার বর্ণনায় একটা কবিতা লেখা উচিত

—‘কুমড়ার চোখে জল নেই, তবু রান্নায় কান্না আসে।’”
আহনাফ তাজওয়ার বললেন,
“কুমড়া কিনে যদি কবিতা লেখতে হয় তোমাদের,তবে প্রয়োজন নেই,রেখে দাও।
মরিচ বিক্রেতা বলল,
“এই মরিচগুলো অনেক রাগী… রান্নায় দিলে ঝাল হয়ে যায়!”
আরহাম বললেন,
“তাহলে এইটা আইরার মতো!কি বলো মাহের?’
মাহের ফিসফিস করে বললেন,
“বলে কি বাঁচি,তোমার বোন যদি শুনেন, আজ আর রোস্ট হবে না, আমি-ই রোস্ট হয়ে যাবো!”
পটলের দোকানে এসে ,
আহনাফ তাজওয়ার ভ্রু কুঁচকে, ‘ভাই, পটলের মুখ হাসছে না কেন? পটল যদি বিষন্ন থাকে, তরকারিতে কীভাবে আনন্দ আসবে?”
পটলওয়ালা হাসি চেপে, “স্যার, বাজারে হালকা মন খারাপের বাতাস বইছে। সবজি’রা আজকে একটু কেমন কেমন করছে।”

মাহের চোখ কুঁচকে পটলের দিকে তাকিয়ে,
“এইটা তো পুরোটাই আইলানের মতো দেখাচ্ছে! বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে জেলি হয়ে যাবে।”
আরহাম পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ,
“আমরা কি আসলে বাজারে আসছি, নাকি নাট্যশালায়?”
সবজিওয়ালার দোকানে গিয়ে আরহাম বললেন, “এই ফুলকপিটা তো কালো, আরেকটা দিন চাচা।’
দোকানি চোখ কুঁচকে মজার হাসি হেসে বললো, “ভাই, শীত গেলে কপি কেমন হয় জানেন?”
আহনাফ সাহেব হালকা গর্জনে বললেন, “তর্ক করবেন না! সমযতায় আসি।যেটা ভালো টেস্ট দিবে,সেটাই দিন।’
দোকানদার চাপা কন্ঠে বিড়বিড় করলো, ‘আপনাদের রান্নার হাতে ফুলকপি পড়ে সেটা আলু ভর্তা না হয়ে যায়।
সবশেষে মসলা মার্কেটে,
এখানে তো একেকটা দোকান যেন সুরমার আড়ত!
আহনাফ বললেন—লিস্ট টা পড়ো আরহাম!
আরহাম পড়লেন,

“তেজপাতা, দারচিনি,লবঙ্গ, আদা, রসুন… সব দিতে হবে ভালো মানের।”
আহনাফ তাজওয়ার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন , ‘এলাচ?’
আরহাম দেখলেন ওটা চোখের সামনে থেকেও ঠোঁটের আসেনি।মুখ গম্ভীর করে বলল—
“আমার মনে হচ্ছে এলাচ আমাকে অবহেলা করছে।”
বাজার শেষে যখন ফিরছেন , হঠাৎ পিছন থেকে এক ছেলেমানুষ চিৎকার করলো—
“হুজুর!আপনারা কি ইউটিউবার? বাজারে ক্যামেরা কই?”
তারা তিনজনে বুঝলেন,এটা সেই ছেলে যে এতক্ষণ তাদের পিছুপিছু ঘুরছিলো।আর তাদের বিহ্যাবিওর দেখে এমন প্রশ্ন করাটাও সমীচিন।
আহনাফ তাজওয়ার ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বললেন—

“আমরা ক্যামেরাবিহীন কনটেন্ট। লাইভ মার্কেটিং বুঝছো?”
আরহামও থলে তুলে বললেন,
“এই থলেতেই আজকের স্ক্রিপ্ট! রান্না ঘরে ঢুকলেই শুরু হবে নতুন পর্ব।
বাইক রেখে আসার সময় তিনজন মিলে একটা অটোতে করে ফিরছেন। সবার কাঁধে একেকটা ব্যাগ।
আহনাফ তাজওয়ার বললেন,
“তিনজন পুরুষ একসাথে বাজার করে এসেছে—এটা ইতিহাসে লেখা থাকবে।”
আরহাম বললেন,
“আর রান্নার পর আমাদের নাম ইতিহাস থেকে মুছে যাবে!’
রান্নাঘর এখন যুদ্ধক্ষেত্র!

আরহাম একটা ইউটিউব ভিডিও অন করে বলছেন, “দেখো মাহের এইভাবে ইজিলি পেঁয়াজ কাটা যায়।’
মাহের: “এই ছুরি তো দাঁত ভাঙা… বলতে না বলতেই হাতে আঘাত লাগে।মাহের মৃদু আর্তনাদ করে উঠেন, ‘আহ্! আমার আঙুল!”
আহনাফ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে: “তুমি আস্তে করো! এক আঙুল কেটেই যদি ছুটি চাও, তবে আমি কী বলবো!”
আরহাম জিরা ভাজতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন।পুরো ঘর ধোঁয়ায় ভরে গেলে তিনজন সার্ভেন্টের মতো ছুটে আসেন জানালা খুলতে!
আহনাফ সাহেব চট করে মুরগির চামড়া ছাড়াতে গিয়ে বলেন, “এইটা হাড়? নাকি প্লাস্টিক?”
মাহের ফ্রাইড রাইস বানাতে গিয়ে বলেন, “ভাত তো কাঁচাই থেকে গেল!”
আহনাফ তাজওয়ার উত্তর দেন, “এই জন্য বলি, জামাতাকে শুধু গাড়ি চালাতে দিয়ো, চুলা নয়!”
আরহাম মাঝেমাঝে ছবি তুলে ভিডিও বানাচ্ছেন, ক্যাপশন দিয়ে রাখছেন:
“পুরুষ রাঁধুনির প্রথম দিন—শেষ দিনও হতে পারে!”
আহনাফ সাহেব দায়িত্ব নিয়েছেন খাসির মাংস রান্নার। এক হাতে মশলা ছিটিয়ে, অন্য হাতে চামচ নাড়াচ্ছেন।

“দেখিয়েন আব্বু, মশলা যেন অন্তরে ঢুকে যায়! আল্লাহ বলেন, ‘ওয়াজিদনা হু মিছকা’, অর্থাৎ সুবাস ছড়াও, কিন্তু গন্ধে নয়, স্বাদে!”-আরহাম।
মাহের নিয়েছেন বিরিয়ানি রান্নার দায়িত্ব। তিনি রাইস কুকারে চাল ঢালতে গিয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যে কুকারের ঢাকনাটা উল্টো লাগিয়েই গ্যাস জ্বালিয়ে দিলেন!
আর হ্যাঁ, লবণ! লবণ দিতে গিয়ে মাহের হাত এতটাই উদার ছিল, যে আহনাফ এক চামচ মুখে দিয়ে বললেন,
“বাপরে! এত লবণ তো রোযার দিনে মানুষ চোখের পানি দিয়েও খায় না! তোমার এই বিরিয়ানি খেলে তো মানুষের প্রেসার বাড়বে!”
আরহাম নিচ্ছেন সবজি রাঁধার দায়িত্ব। কিন্তু উনার গাজর কাটার কায়দা দেখে মাহের বললেন,

“তুমি কি গাজর কাঁটছো না গাজরকে নির্যাতন করছো? এমন কাটা দেখে গাজরের আত্মীয়স্বজনও লজ্জ্বা পাবে!
রান্না চলছে।এর মাঝেই আহনাফ সাহেব শুরু করলেন আলোচনা।
“তোমরা জানো? নবীজি (স.) নিজ হাতে জামা সেলাই করতেন, ছাগল দোয়াতেন, ঘরের কাজ করতেন।”
মাহের সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আমিও সেদিকেই যাচ্ছি, আমি আজ বিরিয়ানি রান্না করব, কাল জামা সেলাই করব।”
আরহাম বললেন, “আর আমি ছাগল দোয়াবো—তবে রান্না শেষে, পেট ভরে গেলে যেন সাহস হয়!”
আহনাফ সাহেব বললেন, “ছাগল যদি শুনতো, বলতো—‘এরা না আগে রান্না করে, পরে দোয়ায়!’
সমাপ্তি নয়, চা-বিরতি!
রান্নার মাঝে তিনজন বসে চা খাচ্ছেন। কাপের পাশে ভিজে টিস্যু, লাল মরিচে চোখ রগড়ে দেওয়া মাহের, মাংসের কাঁটায় আঙুল কেটে বসে থাকা আহনাফ সাহেব, আর একপাশে দাঁড়িয়ে ঘামে ভিজে যাওয়া আরহাম—তিনজনের মুখে হাঁসি।

“এই দিনটা লিখে রাখতে হবে,” আহনাফ তাজওয়ার বললেন।
আরহাম হাসলেন, “আর এই খাবার খাওয়ার পরে যে বেঁচে থাকবে, তার সাক্ষাৎকার নিতে হবে!”
বাইরে বসে আইরা, মাইমুনা আর হাফসা তিনজন একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।আইরা বলল,
“উনি আজ লবণের গুণে ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। এই রান্না খেয়ে যারা বেঁচে থাকবে, তারা অলৌকিক!”
মাইমুনা বলল, “আর শাহ’য়ের রান্না দেখে গাজরও ভয়ে পালাতে চাইবে!”
হাফসা বলল, ‘ আব্বু তো একদিকে তসবি পড়ছেন,আরেকদিকে ঝালমুড়ি স্টাইলে মশলা ঢালছেন—কী যে হবে!
তারা মিলে ঠিক করলেন, রান্না শেষে এক বিশাল ‘স্বাদ পরীক্ষার কোর্ট’ বসবে, যেখানে বিচার হবে কে কেমন রান্না করেছে। শাস্তি হবে দুধ-চিনি ছাড়া চা!
রান্না শেষ!

বিরিয়ানি পরিবেশনের আগে, তিনজন চেঁকে দেখার সিদ্ধান্ত নেন।ভদ্রলোক বলেন, “চোখ বন্ধ করে একে অপরের রান্না জাজ করি। যেমন রিয়েলিটি শোতে হয়!”
আহনাফ চেখে দেখলেন আরহামের রান্না,হুম… স্বাদে একটু কম, তবে চাল একদম পারফেক্ট! কিন্তু ঝালটা কই? মোরগ কি ঠান্ডায় পালিয়েছে?”
আরহাম লজ্জা লুকাতে গিয়ে বলেন, “আমি উনাদের কথা ভেবে কম ঝাল দিয়েছি।”
মাহেরের রান্না আহনাফ মুখে তুলে প্রথম চামচেই থেমে গেলেন।মাহেরের চোখেমুখে আতঙ্ক জড়ো হলো।নিশ্চয়ই শ্বশুর সাহেবের এমন রিয়েকশন ভালো পূর্বাভাস নয়।
“এইটা কি গরুর গোশত না ডেন্টিস্টের টুলস?”
মাহের অসহায়ভাবে বলেন, “চুলার আঁচ কম ছিলো… আমি আসলে মন থেকে চেয়েছিলাম ভালো হোক!”
সবার রান্না টেস্ট করা শেষে এবার আব্বুর রান্না আরহাম আর মাহের দুজনেই মুখে তুলে অবাক।
“আব্বু, আপনার হাতের রান্না অসাধারণ!”
আহনাফ তাজওয়ার গম্ভীর হয়ে বলেন, “আমি আসলে ছোটবেলায় রান্না করতাম… মা বলতেন, যেই ছেলের রান্না ভালো, সে স্ত্রীকে বোঝে ভালো।”

পরিবেশন~
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। মাহের, আরহাম আর আহনাফ তাজওয়ার সার্ভ করলেন। তিনজনেরই পরনে শেফকোট।দেখে মনে হচ্ছে,বিয়েবাড়ির সিনিয়র বাবুর্চি। লাল–কমলা রঙের আলো এসে পড়ছে ডাইনিং টেবিলের ওপর। টেবিলভর্তি থালা, হাঁড়ি, বড় বড় বাটি—আর তাদের মাঝখানে তিন পুরুষের আশা-নিরাশার প্রতিচ্ছবি।মাইমুনা ড্রয়িং এ আসার আগেই মাহের সাইড রুমে চলে গেলেন।
মাইমুনা, হাফসা, আইরা, এবং মিসেস আফসানা অবাক!
আম্মু বলেন, “আজ তো স্বপ্নের মতো একটা দিন।”
হাফসা হাসে, “আমাদের রান্নার থেকেও ভালো হয়েছে মনে হচ্ছে।”
মাইমুনা নিচু কন্ঠে ঠাট্টা করে বলেন, “নাকি আমরা এতদিন ভুল করে রান্না করছিলাম?”
আরহাম বললেন, ‘দয়া করে শুরু করুন এই কাঁচা হাতের

‘তরকারি-সমীক্ষা’!”
মাইমুনা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“আপনি কী বলছেন?এটা কি খাবার না গবেষণা?”
আইরা বললো,
আমি বিরিয়ানি দিয়ে শুরু করবো। পোলাওয়ের মতো দেখাচ্ছে তো?”
এক চামচ মুখে দিয়েই চোখ বড় করে তাকালো।
মাহেরের কাছে গিয়ে সে বলে, ‘আল্লাহ! কে বলেছে এখানে শুধু চাল থাকবে? লবণ দিয়ে পুরো কাব্য লেখা যায় এখানে!”
মাহের জবাবে বলল,
“ওটা বিশেষ রেসিপি—লবণ-স্বপ্ন বিরিয়ানি!”

হাফসা এক চামচ মুখে দিয়েই উঠে দাঁড়ালেন!
“আম্মু গো! এই ঝাল তো পাকস্থলীতে বাজ পড়ে দেওয়ার মতো!”
মাইমুনা বলল,
“বাহ! এত ঝাল, আমি ভাবলাম ওটা কারি নয়, আগুনেই রান্না হয়েছে!”
আহনাফ সাহেব মাথা চুলকে বললেন,
“আমি ভাবছিলাম, জিহ্বা যেন গরম থাকে! নবীজি বলেছিলেন, ‘তোমাদের খাবারে বরকত থাকুক’, আমি বুঝেছি, ‘তোমাদের জিভে বারুদ থাকুক!’”
আইরা আর হাফসা যখন আরহামের রান্না করা সবজি খেলেন, তখন আইরা বলল,
“এই গাজরগুলা এমনভাবে কাটা, মনে হচ্ছে ওরা কোনও অপরাধ করেছে!”
তিন বিচারক পয়েন্ট রেটিং দিতে লাগলেন।
মাইমুনা বলল—

আব্বুর রোস্ট খেয়ে চোখে পানি এসে গিয়েছে , তবুও রেটিং ৬।
আইরা বলল ভাইয়ার সবজিতে আলু না থাকলেও হাস্যকর ভাবে কিউট,রেটিং ৫।
আম্মু বললেন ,
মাহের,যিনি রেসিপিতে নদীর মতো লবণ ঢেলেছেন রেটিং ৪।
সবচেয়ে কম নম্বর পেয়ে মাহের সাহেবকে ঘোষণা করা হলো ‘সোল্টি’!
তাঁকে দেওয়া হলো এক বোতল চিনি আর লেখা:
“মিষ্টতা চর্চা করুন!”
মিডিয়াম নম্বর পেলেন আরহাম সাহেব!
তাঁকে দেওয়া হলো একগুচ্ছ গাজর, সঙ্গে লেখা:
“আরো ভালো করো, এবার আলুও দাও!”
আহনাফ সাহেব নিজেই বললেন,
“আমাকে পুরস্কার দিও না, আমাকে দোয়া করো যেন আগামীবার ঝাল একটু কম হয়!”
চায়ের আড্ডা ও উপসংহার~
আহনাফ তাজওয়ার বললেন,
“জীবনে কেবল নারীকে দায়িত্ব না দিয়ে, মাঝে মাঝে আমাদেরও এগিয়ে আসতে হয়।বছরের প্রতিটা দিন ঘরের নারীরা খেটে মরে,অন্তত একটা দিন তারা আরাম-আয়েশ করুক।আর রান্না শুধু কাজ না, ভালোবাসার প্রকাশ।”
আরহাম হাসলেন, “তবে এটা স্বীকার করতে হবে, আপনার রান্না আমাদের দুইজনের মিলেও হয়নি!তবে আজকের স্মৃতি আমি জীবনে ভুলবো না। রান্না করতে গিয়ে মনে হলো, সংসারটা কেবল খাবার বা রুটি-রুজির না, ওটা ভালোবাসার কিচেনও।”
আহনাফ তাজওয়ার মাহেরের দিকে জিজ্ঞাসাদৃষ্টিতে তাকালেন।যিনি চুপিচুপি চা’য়ে চুমুক দিতেই ব্যস্ত।মাহের ভদ্রলোকের সাথে দৃষ্টি মিলাতে বুঝলেন উনার চোখে যেনো এমন প্রশ্ন, ‘হুয়াটস আপ ইয়াংম্যান!তোমার কিছু বলার নেই!
মাহের খানিক বিব্রতবোধ করলেন।বললেন , ‘জ্বি ভালো লেগেছে।’
শেষ হাসির মুহূর্ত~
রাতে সবাই বসে চা খাচ্ছে,হাফসা মাইমুনা পাশের রুমেই।আম্মু বললেন,
“আমরা সারাবছর রান্না করি, আজ আপনারা করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ। তবে আমরা এখন বুঝলাম—আপনাদের হাতে আমাদের জীবন কতটা বিপন্ন!”
তারা মাথা নিচু করে বললেন,
“আমরা বুঝেছি, একদিনের জন্য রান্না মানে সাতদিনের ক্লান্তি!”
আহনাফ তাজওয়ার বললেন,
“আর একবারও যদি কেউ বলে—‘বাসার কাজ তো কিছুই না’, আমি ওই লোককে একবেলা রান্নাঘরে ঢুকিয়ে কুরআনের আয়াত শুনিয়ে বের করবো!”
নামাজ শেষে সবার মুখে একটাই কথা—
“আলহামদুলিল্লাহ, এমন সময় বারবার আসুক।”

আইরা বলল,
আজকের দিনটা কেবল রান্না নয়, ছিলো বন্ধন গড়ার এক রকম উৎসব।”
আর মাইমুনা আর হাফসার আবদার,
“আরও চাই এমন দিন… অন্তত প্রতি মাসে একবার!”
শেষে সবাই মিলে দোয়া করলেন—
“হে আল্লাহ, আমাদের পরিবারে ভালোবাসা, রহমত ও হাসি-আনন্দ কেয়ামত পর্যন্ত রাখুন।”
রাতে যতোটা সম্ভব খাবার আইটেমগুলো কিছুটা ঠিকঠাক করে নিলেন ঘরের মেয়েরা।মহিলা,পুরুষদের আলাদা আলাদা খাবার পর সকলে একসাথে বসা হয়েছে।
রাত গভীর হতে লাগলো, কিন্তু আলাপ যেন কেবল শুরু।
মাহের কিছুটা এক্সাইটমেন্ট নিয়ে বললেন, ‘আজকের রান্নাগুলো লবনের ঝোল আর জাল জাল হলেও টেস্ট ছিল।’
আরহাম মজা করে বললেন,
“আজকের রান্নার ভিডিও যদি ইউটিউবে দিই, নাম দেব—‘তিন পুরুষ, এক রান্না বিপ্লব!’”
হাফসা আর মাইমুনা দূর থেকে একসাথে হেসে উঠলো।
মাইমুনা বললো,
“তিন জনে মিলে একদিনে রান্না করলো, আর এখন গর্বে পিঠে নিজেই চাপড়াচ্ছে!”
ডাইনিংয়ের ব্যস্ততা শেষ, পেটও যেন বলে—আজকে তো ভালোবাসায় রেঁধেছিলো কেউ!
আহনাফ সাহেব খাওয়ার শেষে ধীরে ধীরে উঠে এলেন। বললেন,
“চলো, এবার একটু দোয়া পড়ি সবাই মিলে।”
ছাদে একটু খোলামেলা বসার জায়গায় সবাই গোল হয়ে বসলো। মাইমুনা, হাফসা, আইরা—তিনজন একটু পেছনে চিলেকোঠার সামনের আলগা বারান্দায়।(মাইমুনার সমস্ত শরীর পর্দায় আবৃত)
আর পুরুষরা বসে ছিলেন খোলা ছাদের নিচে।।
আহনাফ তাজওয়ার ধীরে বলে উঠলেন,

“এই সময়গুলোই তো জীবনের সঞ্চয়। জান্নাতে যদি এমন একসাথে বসতে পারি, তাহলেই তো সব পূর্ণ।”
আরহাম সূরা ফাতিহা পড়লেন ধীরে ধীরে। কণ্ঠে ছিলো শান্তি, সুরে ছিলো মাধুর্যতা।
মাহের সূরা ইখলাস পড়লেন, প্রতিটি আয়াতে যেন ভালোবাসা ঢেলে দিলেন।
আইরা মনে মনে বললো,
“সারা জীবনের ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই গলে গেলো।”
হাফসা বললো,
“ঘরটা আজ এত নরম লাগছে, মনে হচ্ছে বেহেশতের হাওয়া।”
তিনজন স্বামী আর চারজন স্ত্রী—সাতটি হৃদয় এক সাথে, সাতটি নীরব কান্না, সাতটি ভালোবাসায় পূর্ণ মন।
সবশেষে,

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭১

‘একটা কথা বলবো?” – জিজ্ঞেস করলো আইরা।
সবার সম্মতি পেতেই সে বলল,
‘এই বাড়িটা যেন কোরআন-সুন্নাহর আলোয় সবসময় এমনই থাকে।”
সবাই চুপ। চারপাশে পাখির ডাক। কাপে ধোঁয়া উঠে আসে। কারো চোখে পানি জমে।
কেউ বলে না, কিন্তু মনে মনে সবাই বলে—
“আল্লাহুম্মা আমীন।”

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here