Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৫)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৫)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৫)
রুপান্জলি

রাত ১২ টা ৩৭ মিনিট।
,,, দ্বীপ মির্জা কখনো তার কথার বরখেলাপি করেনা,, সে বরাবরই নিজের কথা রাখতে সক্ষম। আজো তাই করবে হয়তো। দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে কক্সবাজারের ভীলাতে ফিরে এসেছে। হেলিকপ্টার থেকে নামানো থেকে শুরু করে দোতলার এক কোনার রুম পর্যন্ত পৌছানোর আগ পর্যন্ত অর্পনা আট বার পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। দ্বীপ দেখেনি, নির্দয়ের মতো টেনে নিয়ে গিয়েছে। অর্পনা প্রথমে ব্যাথাতুর শব্দ করলেও মাঝে নিশ্চুপ হয়ে যায়,, যেখানে তার ব্যাথার কোনো দাম ই নেই, সেখানে ব্যাথাতুর শব্দ করাটা বেমানান। তবে অর্পনার এই নিশ্চুপতা বেশিক্ষণ টিকলো না৷। দ্বীপ অর্পনার হাত ধরে টানতে টানতে ভিলার একদম কর্নারের রুমের সামনে এসে দাড়াতেই রুম থেকে দুইজন গার্ড বেড়িয়ে এলো। দ্বীপকে আসতে দেখে গার্ডরা নিজেদের মতো প্রস্থান নিলো,, এখানে তাদের আর কোনো কাজ নেই। দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে রুমে ঢুকলো,, ভিতরে ঢুকতেই তাজ্জব বনে গেলো অর্পনা। দ্বীপ কি তাকে সত্যি সত্যি হিংস্র প্রানীদের হাতে ছেড়ে দিবে? লোকটা কি এতোটাই নির্দয়? ভয়ে চিৎকার করে উঠলো অর্পনা। সে ভাবতে পারেনি দ্বীপ সত্যি সত্যি ই এটা করবে। নিজের তৈরি করা শক্ত আবরন ভেঙে আশ্রয় স্থল স্বরুপ দ্বীপকে জড়িয়ে ধরলো, চোখ মুখ খিঁচে কাতর কন্ঠে বললো — আমি কুকুরে ভয় পাই দ্বীপ,, এটা ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি দিন। আমায় মারতে চাইলে মারুন, মেরে ফেলতে চাইলেও মেরে ফেলুন আমার কোনো সমস্যা নেই, শুধু এদের কাছে ছেড়ে দিবেন না। আমার ভয় লাগছে।

,,, অর্পনার জড়িয়ে ধরাটা দ্বীপের মনে চলন্ত ঝড়কে কিছুটা শান্ত করলেও অর্পনার বলা পরবর্তী কথাগুলো মনটা আরও অশান্ত করে দিলো। তার অবচেতন মন বিষয়টা অন্য ভাবে নিলো। অর্পনা তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত নয়,, ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি, উল্টো আদ্রিয়ান কাইসারের জন্য মার খেতেও প্রস্তুত আর মরতেও প্রস্তুত। দ্বীপের কঠোর মন আরও কঠোর হলো,, যেই নারী অন্যের জন্য মরতে চায় সেই নারী মরে যাক, তার আসে যায়না। অতঃপর অর্পনাকে ধাক্কা মেরে রুমের ভিতর ফেলে বাহির থেকে দরজা আটকে দিয়ে হন হন করে বেড়িয়ে গেলো দ্বীপ । আচমকা ধাক্কায় ফ্লোরে মুখ থুবরে পরলো অর্পনা, সারাদিন রোজা রাখার পর দূর্বলতায় নিজের ব্যালেন্স রাখতে পারেনি,,যার ফলে শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে। কুকুরের ফোসানো ধ্বনিতে অর্পনা মুখ তুলে চাইলো তার থেকে কিছুটা দূরে চারটে কুকুর দাড়িয়ে আছে যারা অনবরত ফোঁস ফোঁস শদ্ব করে নিজেদের হিংস্রতার জানান দিচ্ছে। অর্পনার আত্না ছলকে উঠলো,, এখানে স্রিফান নেই,, স্রিফান পরিচিত হওয়া সত্তেও ওকে আজরাইলের ন্যায় ভয় পায় অর্পনা। এখানে সবগুলো কুকুর সাইজে অনেক বড়ো। এরকম কুকুর সে আগে দেখেনি,, এটা কি ধরনের কুকুর সেই সম্পর্কে ধারনা ও নেই তার। অর্পনা গভীর ভাবে ভাবলো, কিছুদিন আগে ইন্সটাতে এমন একটা কুকুর দেখেছিলো সে,, নাম মেবি আলাস্কান ম্যালামিউট। দ্বীপ আলেক্সা থেকে কুকুর এনে লালন পালন করে? এই লোক আর কি কি করে? এতো কুকুর দিয়ে উনার কাজ কি? অর্পনা ভয়ার্ত ঢোক গিলে ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালো,, দরজার কাছে এসে দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বললো — দরজাটা খুলুন দ্বীপ, খুলুন না। আমার ভয় লাগছে। আমি কুকুর দেখলে ঠিক থাকতে পারি না, ট্রমা কাজ করে। দ্বীপ!! আপনি তো আমার অতিত সম্পর্কে জানেন, খুলেন না, দ্বীপ!!

,,, ওপাশের ব্যাক্তির কানে বোধহয় কথাটি পৌছায়নি,, ওকে ছুড়ে ফেলার সাথে সাথেই গটগট পায়ে জায়গা হতে প্রস্থান নিয়েছে সে। অর্পনা দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো,, কুকুর চারটা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। অর্পনা এবার ভয়ে দরজার সাথে মিশে গেলো। তার চোখে ভাসছে স্রিফান আদ্রিয়ানকে কিভাবে আঘাত করেছিলো আর আঘাত করার সময় স্রিফানকে এতোটাই হিংস্র দেখাচ্ছিলো। অর্পনা ডুকরে উঠলো, দরজায় আবারও ধাক্কা দিতে দিতে বললো — দ্বীপ!! আ,আমার অনেক ভয় করছে, সত্যি!! আপনি এতোটা নিষ্ঠুর কি করে হয়ে গেলেন? দ্বীপ!!

,,, ইতিমধ্যে কুকুরগুলো তার খুব কাছে চলে এসেছে, অর্পনা ভীত কদমে দরজা হতে সরে যেতে চাইলে অসাবধানতায় দরজার পাশে রাখা ফ্লাওয়ার বাসটা পরে গেলো,, সেই শব্দে কুকুর গুলো ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলো। অর্পনার ঠোটে মৃধু হাসি ফুটলো,, সে নিজেকে প্রটোক্ট করার সমাধান পেয়েছে। অর্পনা ফুল ধানির ভাঙা টুকরো গুলোর পাশে বসে পরলো। সেখান থেকে একটা একটা টুকরো নিয়ে কুকুর গুলোর উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারলো, এতে যেনো কুকুর গুলোর রাগ আরও বাড়লো। দুটো কুকুর তেড়ে এসে অর্পনাকে আঘাত করতে নিলে অর্পনা দৌড়ে কিছুটা দূরে সরে গেলো। রুমটা তীব্র লাল আলোতে আলোকিত হওয়ায় অর্পনার ভয় বেড়ে দ্বীগুন হয়েছে, হুট করেই রুমের লাইট অফ হয়ে গেলো। সাথে বাহিরে বাজ পরার তীব্র শব্দ,, ভয়ে চিৎকার করে উঠলো অর্পনা,, অসাবধানতায় আরও একটা ফুলদানী ভেঙে পরলো,, এতক্ষণে কুকুর গুলো অর্পনাকে শত্রপক্ষ ভেবে নিয়েছে,, অন্ধকারেই তার দিকে এগুতে লাগলো,, অন্ধকার হওয়া সত্তেও অর্পনা কুকুর গুলোর উপস্থিতি টের পাচ্ছে। তৎক্ষনাৎ আবারও তীব্র শব্দে বাজ পরলো,, বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে বোধয়। অর্পনা ঝড় বৃষ্টি, বাজ এসবে ভয় পায়না তবে আজ ভয় লাগছে। ভয়ের তোপে আবারও চিৎকার করে উঠলো।,

পিছাতে গিয়ে ফুলদানির ভাঙ্গা অংশে পা লাগতেই একটা অংশ পায়ে ফুটে গেলো, ব্যাথায় কেঁকিয়ে উঠে মেঝেতে বসে পরলো অর্পনা, তৎক্ষণাৎ রুমে কালো খয়েরি রঙের লাইট জ্বলে উঠলো। সেই আলোয় পায়ে দেবে যাওয়া পোড়ামাটির অংশ টুকু টেনে তুললো ,, ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচে মৃধু স্বরে পাপ্পাকে ডাকলো,, চোখ বেয়ে অজোর ধারায় পানি গড়াচ্ছে। অর্পনা অনুভব করলো রুমের এসি বন্ধ,, তার শরীর ঘেমে একাকার, ভিতরটা হাসফাস করছে, সারাদিন একটু পানি ও না খাওয়ার দরুন গলাটা শুকিয়ে কাঠ, মনে হচ্ছে এখোনি দেহ থেকে প্রানটা বেড়িয়ে যাবে। অর্পনা গায়ের উড়নাটা ফেলে দিলো,, উড়না ফেলে দেওয়ার পর মনে হলো এটা দিয়ে সে কিছু একটা করতে পারবে। ভাবনা অনুসারে উড়নার মাঝ বরাবর বড়ো বড়ো দুটো গিট দিলো তারপর উঠে দাড়িয়ে সেই গিট দেওয়া অংশ দিয়ে কুকুর গুলোকে আঘাত করতে লাগলো। কুকুর গুলো এতোক্ষণ কিছুটা শান্ত থাকলেও এবার বেশ অশান্ত,, তারা তেড়ে এসে অর্পনাকে আচর কাটতে চাইলে অর্পনা ফের বারি মারলো। অনেকটা সময় ধরে অর্পনা আর কুকুর গুলোর মাঝে লড়াই চললো। তবে দূর্বল অর্পনা বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না,, ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পরলো। অর্পনার এই পর্যায়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে,, একদম সেই রাতের মতো। অর্পনা অনুভব করলো কুকুর গুলো আবার ওর নিকটে চলে এসেছে,, চারদিক থেকে চারটি কুকুর লোভাতুর দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে,, যেনো এখনি ওকে মেরে ক্ষান্ত হবে। অর্পনা এবার শব্দ করে কেঁদে দিলো,, হাটুতে মুখ গুজে ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললো — পাপ্পা!! তুমি কই? আমি তোমার কাছে যাবো,, আমার অনেক ভয় করছে। তুমি তো আমায় সবসময় প্রটেক্ট করো,,, আজ আসবে না?

,,,, সিসি টিভি কন্ট্রোল রুমে বসে থাকা বিহান কেঁপে উঠলো,, প্রথম দিকে অর্পনাকে ভয় দেখাতে পারবে ভেবে বেশ আনন্দিত হলেও এখম বুকটা মুচর দিয়ে উঠলো। শতো ঝগড়া হলেও অর্পনাকে সে বোন বলেই মানে। শক্ত ব্যাক্তিত্বের মেয়েটাকে এতোটা অসহায় রুপে দেখতে তার ভিষণ অসহ্য লাগছে,, সত্যি মেনে নেওয়ার মতো না। বিহানের পাশাপাশি গম্ভীর মুখে বসে আছে দ্বীপ, তার দৃষ্টি ও স্ক্রিনে। যেনো অর্পনার আহাজারিতে তার কিছু আসে যায়না। বিহান বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো — কি শুরু করেছিস ভাই? মেয়েটা এমনেই কুকুরে ভয় পায়। অনেক তো হলো,, এবার ডোর টা খুলে দে, যাহ!!
,,, দ্বীপ ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে বিহানের দিকে তাকালো — মন চায় মরে যাক, তাতে তর কি?
,,, বিহান ও সমান রাগ দেখিয়ে বললো– ও আমার বোন।
,,, তর বোন যখন নাগরের পিরিতে মরতে যাচ্ছিলো তখন কই ছিলি? রাগ বারাস না তাহলে ওকে নিয়ে এমাজনে ছেড়ে আসবো।

,,, মরে গেলে বাচতে পারবি?
,,, তকে কে বলেছে আমি বাচতে চাই? এসব ছলনাকারী জীবনে রাখার চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম।
,,,৷ বিহান আর কিছু বলার ভাষা পেলো না। মেয়েটা গোটা ২৩ মিনিট যাবত কুকুরের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে,, তার খুব মায়া হলেও কিছু করার নেই। বিহান আবারও স্ক্রিনের দিকে তাকালো। হাটুতে মুখ গুজে কাদতে থাকা অর্পনা হুট করেই থেমে গেলো ,, তার সামনে দাড়িয়ে থাকা কুকুর গুলোর দিকে শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো,, এতোক্ষণ ভয় করলেও এখন চোখে মুখে অভিমানের ছাপ স্পষ্ট। অর্পনা উঠে দাড়ালো,, কুকুর গুলো তার সামনে দাড়িয়ে ফুসছে তা নিয়েও অর্পনার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। সে কুকুরগুলোকে পরোয়া না করে খোরাতে খোরাতে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। অর্পনার কান্ডে ভ্রু গুটিয়ে নিলো বিহান,, এই মেয়ে দরজা বন্ধ করলো কেনো? আজব তো। বিহানের প্রশ্নের জবাব স্বরুপ অর্পনা বিছানার কাছে গিয়ে এসির রিমোট নিয়ে এসির পাওয়ার কমিয়ে দিলো। +3 তাপমাত্রায় দিয়ে সে মেঝেতে বসে পরলো। এরকম ঠান্ডা আবহাওয়া পেয়ে কুকুরগুলো বোধয় বেশ সন্তুষ্ট হয়েছে। বরফের চুড়ায় আলাক্সান মালমিউট কুকুরদের বসবাস,, তারা শীতলতায় বসবাস করে অভ্যস্ত তাই হয়তো গায়ে তীব্র ঠান্ডা হাওয়া লাগতেই মাথা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। চারটি কুকুর ই অর্পনার থেকে কিছুটা দূরে মেঝেতে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পরলো। অর্পনার কোনো ভাবাবেগ নেই,, শীতে থর থর করে কাপছে,, নাক মুখ দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত হিম করে দেওয়ার জোগার। তবুও সে পাথরের মতো বসে রইলো,, লোকটার উদ্দেশ্য তাকে কষ্ট দেওয়া তাহলে এতো নরমাল ভাবে দিতে হবে কেনো? বর্তমানে রুমের তাপমাত্রা যতটুকু, এটুকু তাপমাত্রায় শীতবস্ত্র ছাড়া একটা মানুষ এক-দের ঘন্টার বেশি বাচবে না। তবে এটাই হোক,, সে ঠান্ডায় কেপে মরে যাক আর দ্বীপ মির্জা শান্তি পাক। দ্বীপ শক্ত দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, রাগে কপালের মধভাগে থাকা রগটা ফুলে উঠেছে। সে স্ক্রিনে নজর রেখেই দাতে দাতে পিষে বললো — ঘারত্যারার বাচ্চা!! ওর ত্যারামি আজ বের করবো আমি। আমাকে ভয় দেখায়? ওয়েট!!

,,, বলেই চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো। হনহন করে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। হতাশ হলো বিহান,, এটা কেমন মেয়ে? এরকম ঘারত্যাড়া জীবনে প্রথম দেখেছে সে। দ্বীপ চেয়েছিলো ওকে একটু ভয় দেখাতে,, কিছুক্ষণ পরেই গিয়ে ঠিক দরজা খুলে দিতো। আর এমনিতেও কুকুর চারটে তেমন হিংস্র নয়,, এরা বেশ বন্ধু সূলভ। শুধু এসির পাওয়ার বাড়িয়ে রাখার কারনে গরমে এরকম ফোসফোস করছিলো,, প্রথম দিকে অর্পনার কাছে এগুচ্ছিলো এসির পাওয়ার বাড়ানোর জন্য কিন্তু মেয়েটা ভেবেছে তাকে আঘাত করতে চাচ্ছে। এরপর অর্পনা যখন ফুদানি ভেঙে ফেললো এবং সেই ভাঙা টুকরো দিয়ে আঘাত করতে চাইলো তখনি তারা অর্পনাকে শত্রু ভেবে আঘাত করতে এগিয়েছে। দ্বীপ চাইলেও অর্পনাকে আঘাত করতে পারবে না,, কারন অর্পনা তার কাছে বড্ড স্যানসিটিভ,, আঘাত করলে সেই উল্টো কষ্ট পাবে। আবার অর্পনার বরবরতাগুলো মেনেও নিতে পারবে না। অর্পনা দ্বীপের প্রথম ভালোবাসাকে রেসপেক্ট করে কিন্তু দ্বীপ তো অর্পনার মতো মহান নয়। যেটা তার সেটা শুধুই তার,, সে ব্যাতিত অন্য কাউকে ভাবনায় আনার সুযোগটাও দিবে না দ্বীপ। আর এমনিতেও অর্পনা কুকুর ব্যাতিত এই পৃথিবীতে অন্য কোনোকিছুকে ভয় পায় না,, মরতেও ভয় পায়না। সেজন্যই দ্বীপ ওকে কুকুরের সাথে আটকে রেখে শাস্তি দিতে চেয়েছিলো অথচ মেয়েটা ত্যাড়ামি করে দ্বীপের জান নেওয়ার চেষ্টায় মেতেছে। অর্পনার কান্ডে হতাশ হলেও শব্দ করে হেসে ফেললো বিহান,, এই মেয়েটা বড্ড চালাক। কাকে কিভাবে টাইট দিতে হয় ভালো করে জানে।

,,,, দ্বীপ বড়ো বড়ো কদম ফেলে অর্পনাকে আটকে রাখা রুমের সামনে এসে দাড়ালো,, দরজায় করাঘাত করে লাভ নেই,, সে জানে যতোই ডাকুক অর্পনা দরজা খুলবে না অগত্যা দরজা ভাঙতে হবে। ইতিমধ্যে বিহান দৌড়ে এসে দ্বীপের পিছনে দাড়িয়েছে। বিহানকে ইশারা করতেই এগিয়ে এলো বিহান,, দুজন মিলে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে দরজার সিটকিনি ভেঙে দরজা খুলে গেলো। সিসিটিভি রুম থেকে এই রুমের দূরত্ব ৪-৫ মিনিটের। আর অর্পনা ঠান্ডা তাপমাত্রায় আছে ৬-৭ মিনিট হবে। এটুকু সময়েই শীতের তোপে দূর্বল হয়ে পরেছে অর্পনা। তবুও মেয়েটা তীব্র অভিমানে কাট হয়ে বসে আছে,, দ্বীপ অধৈর্যের ন্যায় অর্পনার কাছে ছুটে গেলো। মেয়েটা শীতে থরথর করে কাপছে,, দ্বীপ অর্পনার গালে গলায় হাত রাখতেই বুঝলো এটুকু সময়ে শরীর বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সে তাড়াহুড়ো করে অর্পনাকে কোলে নিতে চাইলে অর্পনা বাধা দিলো,, ভগ্ন শরীর নিয়েই দ্বীপের থেকে দূরে সরে যেতে চেয়ে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — আপনার মতো নিষ্ঠুর স্বামী কারোর না হোক,, আমার শত্রুর ও না। চেয়েছিলেন না মরে যাই? শাস্তি পাই? পাচ্ছি তো, যান এখান থেকে। ছুবেন না আমায়।

,,, দ্বীপ মানলো না,, অর্পনকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে বিছানা শুয়িয়ে দিলো। বিহান এসি বন্ধ করে আলমারি থেকে কম্ফোর্টার বের করে দ্বীপের কাছে এগিয়ে দিতেই দ্বীপ সেটা নিয়ে অর্পনাকে পুরোপুরি ঢেকে দিলো কিন্তু ত্যারা অর্পনা জেদ দেখিয়ে সেটা গা থেকে সরিয়ে দিলো। দ্বীপ আবারও ঢেকে দিলে অর্পনা আবারও ফেলে দিলো। এই পর্যায়ে রাগ উঠে গেলো দ্বীপের,, অর্পনার দিকে ঝুকে গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললো — ঘাড়ত্যারার বাচ্চা!! তর ঘাড়ের রগ গুলো সত্যি সত্যি ই টেনে ছিড়বো আমি তারপর অপারেশন করে সেসব সোজা করে আনবো।
,, অর্পনা উত্তর করার শক্তি পেলো না। দ্বীপ অর্পনার মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলো,, ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিহানের উদ্দেশ্যে বললো —
,,, বিহান!! ওদেরকে নিয়ে বাহিরে যা।
,,, কি বলছিস? বাহিরে যাবো মানে? অর্পনার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে,, হাত পা গরম করা প্রয়োজন।
,,, সেজন্যই বলছি বাহিরে যাহ।
,,, মানে? আমি বাহিরে গেলে,,
,,, বিহানকে তর্ক করতে দেখে ধমকে উঠলো দ্বীপ– কুত্তার বাচ্চা!! তকে যেতে বললাম না? যাহ।
,,, বিহান কন্ঠে কাতরতা ঢেলে বললো — ভাই হাইপার হোসনা অর্পনা অসুস্থ ।
,,, দ্বীপ দাতে দাত পিষে বিহানের দিকে তাকালো, বিহান ঠোট উল্টালো,, কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে একবার দূর্বল অর্পনার দিকে তাকিয়ে কুকুর গুলোকে নিয়ে বাহিরে চলে গেলো। বিহান এখনো গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত,, করিডর দিয়ে হাটতে হাটতে হুট করেই পিছনে তাকালো,, কিছু একটা মিলালো পরপর দাত দিয়ে ঠোট কামরে বললো — তারমানে এখন দ্বীপ,, নাহ!! ওরা তো প্রতিদ্বন্দ্বী,, লড়াই করবে ঠিক আছে কিন্তু এটা হতেই পারে না।

,,,,বিহান বাহিরে যেতেই অর্পনাকে টেনে উষ্ঠ যুগল দখল করে নিলো দ্বীপ,, ধীরে ধীরে স্পর্শ গভীর হতে লাগলো। দ্বীপের মনোভাব বুঝতে পেরে ওকে নিজের থেকে দূরে সরাতে চাইলো অর্পনা। শরীরে তেমন জোর নেই তবুও সর্বোচ্চ শক্তি খাটিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলো। দ্বীপ সেসবের পরোয়া করলো না,, অর্পনাকে ধমক দিয়ে নিজের মন মতো নিজেকে অবাধ্য করে তুললো। ধীরে ধীরে দুজনার অবস্থা বেগতিকের দিকে এগুচ্ছে,, বিষয়টা যখন খুব গভীরে পৌছে গেলো তখন অর্পনা ঠোঁট নাড়িয়ে মৃধু শব্দে আওড়ালো — আই সেইড নো!!
,,, দ্বীপ ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে অর্পনার মুখশ্রীর দিকে তাকালো,, অর্পনা চোখ বুঝে রেখেছে, ঠান্ডায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ঠোট দুটো তিরতির করে কাপছে,, তার প্রতিটা স্পর্শে কেপে কেপে উঠেছে মেয়েটা, রেসপন্স করেছে অথচ মুখে না বলছে। এই না এর মানে বুঝে দ্বীপ, অর্পনা কি চাচ্ছে সে বিষয়েও সে অজ্ঞত। অগত্যা হাড় মানলো,, জ্বীব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সরল স্বীকারোক্তি দিলো — ওকেহ!! আমি স্বীকার করছি,, আজ প্রথম এবং শেষ বারের মতো বলছি। আই লাভ ইউ, লাভ ইউ সু মাচ ডেম্ন! দ্বীপ মির্জা তকে ভালোবাসে,, হয়েছে শান্তি? এবার এটা মাথায় সেইভ করে রাখ আর কখনো শুনতে চাইবি না।

,,,, অর্পনার চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়ালো, বাধা দেওয়া হাতটাও শিথিল হয়ে এলো,, কতো গুলো দিনের প্রতিক্ষা। এই ভালোবাসি কথাটুকু শুনার জন্য কতো ছলনা, কতো নাটক করলো,, আজ এতোদিন পর সে সফল হয়েছে সে,, দ্বীপ মির্জা তার ভালোবাসার কথা স্বীকার করেছে। অর্পনার অনুমতি পেয়ে আবারও অর্পনার গলায় মুখ গুজে দিলো দ্বীপ। অর্পনা বুঝে রাখা চোখের পাতা দুটো মেলে এসির দিকে তাকালো,, সাথে সাথে তার ঠোঁট একপাশ থেকে কিছুটা প্রসারিত হলো,, এই হাসিটা বড্ড রহস্যময় ঠেকলো। কে বলে ভালোবাসা পেতে বেহায়া হতে হয়? কিংবা জোর করে আদায় করতে হয়? ওহুম, রং!! মাঝেমধ্যে ভালোবাসা বেহায়ামি কিংবা জোর করে নয় কৌশল করে আদায় করতে হয়। “” কথায় আছে সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাকাতে হয় কিন্তু অর্পনা তো ঘারত্যারা,, সে প্রয়োজনে ঘি টা গরম করে ঢেলে নিবে তবুও আঙুল বাকা করবে না”‘

অর্পনা ঠোঁটে বাকা হাসি রেখেই দ্বীপের চুলের ভাজে হাত চালিয়ে চোখ বুঝে নিলো,, এক হাতে চুল আকরে ধরে অন্য হাতে দ্বীপের উন্মুক্ত পিঠ আকরে ধরলো। অর্পনার আশকারা পেয়ে ধীরে ধীরে লাগাম হীন হলো দ্বীপ,, অর্পনার তরফ থেকেও একই প্রতিক্রিয়া। দুজন লাগামহীন ব্যাক্তি যখন একে অপরের মাঝে আসক্ত হয়ে পরে তখন বিষয়টা প্রকৃতিতে চলা ঘুর্ণিঝড়কেও হাড় মানায়। দুজনার মত্ততার মাঝেই হুট করে বাহির হতে গাছ ভেঙে পরার শব্দ হলো, পরপর একটার পর একটা বাজ পরার শব্দ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এখন তুমুল রুপ নিয়েছে। ঝর বৃষ্টির তোপে বোধহয় সমুদ্রে জোয়ার এসেছে যার ফলে ক্ষনে ক্ষনে সমুদ্রের গর্জনে কেপে উঠছে মির্জাদের ভিলা। প্রকৃতিতে আজ ততোখানি ঝড় বইছে যতখানি ভিলার এক কোনার রুমটায় বয়ে যাচ্ছে।

,,, অর্পনা, দ্বীপ, বিহান কক্সবাজারে রয়ে গেলেও ইরাকে নিয়ে পল্লব আর অরুন ঢাকায় ফিরে এসেছে। ইরার মন মেজাজ ভালো না তাই ওকে আর হোস্টেলে যেতে দেয়নি তারা, আপাতত রাতদের ফ্লাটে আছে। সুহাসিনী আন্টি সবটা জানতে পেরে ইরাকে আরও কয়েকটা দিন নিজের কাছে রেখে দিবে বলে ঠিক করেছে,, ইরা অবশ্য থাকবে না,, কালকেই হোস্টেলে কিংবা সিলেট চলে যাবে। অর্পনাকে দেখানোর মতো মুখ নেই তার,, সে তো বেইমান,, বেঈমানি করে অর্পনা আর দ্বীপকে এতোটা ঝামেলায় ফেলেছে,, কষ্ট দিয়েছে। লাস্ট মোমেন্টে অর্পনাকে দ্বীপ যেভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো,, সেই মুহুর্তটা ভাবতে গেলেই তার কান্না পাচ্ছে। দ্বীপ মির্জা কি অর্পনাকে মারবে? কষ্ট দিবে? ইসস!! কি অবলীলায় অর্পনার কষ্টের কারন হয়ে গেলো সে। সারাজীবন বন্ধুদের ভালো চাওয়ার প্রতিজ্ঞা করার পরেও অর্পনার ক্ষতি করে দিলো। অর্পনা তো বিশ্বাস ঘাতকদের জীবনপ জায়গা দেয়না। তাকেও কি জীবন থেকে সরিয়ে দিবে? ইরার চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো,, তার কোনোমতেই শান্তি লাগছে না। ইরার ভাবনার মাঝেই মেসেঞ্জারে মেসেজ আসার টোন বাজলো, ধরফরিয়ে উঠলো ইরাদ। তাড়াহুড়ো করে মোবাইলের সাইড বাটন চাপতেই দেখল এটা তার কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তি নয়, ওপাশ থেকে মেসেজ আসেনি বরং অরুন মেসেজ দিয়েছে।
“”” কান্নাকাটি করলে মার খাবি,, যা হয়েছে হয়েছে। আগামীকাল সকাল সকাল আমরা সবাই মিট করছি,, ওকে? আর হে,, ঢাকা ছাড়ার কথা ভাবলে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো। কান্নাকাটি বাদ দিয়ে ঘুমা”””

ইরার কেমন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে,, এই সময়টা তাদের ছিলো,, প্রতি রাতে সে এই সময় আদ্রিয়ান কাইসার নামক আইডির সাথে প্রেমে মত্ত থাকতো, ভালোবাসাময় বুলি আওড়াতো। অথচ আজ সে একা, কিছু নেই, কেউ নেই, কেউ মেসেজ দিচ্ছে না।””ভালোবাসি মাই লাভ, ভালোবাসি মাই লাভ”” বলে পাগল করে দিচ্ছে না। লোকটা কতো পাগলামি করতো, সারাক্ষণ ওকে নিয়েই পরে থাকতো,, ইরাদ খেয়েছে কিনা, কি খেয়েছে? এটা করেনি কেনো? ওটা করেনি কেনো? ইরাদকে তার প্রয়োজন,, ইরাদকে সে মিস করছে,, কবে ইরাদকে বুকের মাঝে আকরে ধরে একটা শান্তির ঘুম দিতে পারবে,, আরও কতো উল্টাপাল্টা কথা। ইরাদ তখন লজ্জা পেতো, লজ্জা পেয়ে একা একাই বালিশে মুখ গুজে হাসতো। অথচ আজ একটা দিনের ব্যাবধানে কতো কি হয়ে গেলো,, ইরা কান্নার শব্দ আটকাতে বালিশে মুখ গুজে রাখলো। এসব মিথ্যা হোক, দুঃস্বপ্ন হোক, ইরার ভালো লাগছে না, বুকের বাম পাশে যন্ত্রণা হচ্ছে,, ওপাশের ব্যাক্তিটা বেইমান না হোক,, সে সচ্ছ কাচের ন্যায় পরিষ্কার হোক,, সবটা ঠিক হয়ে যাক। ইরাদ কান্না দমাতে না পেরে ঠোট কামরে ধরে পাশে শুয়ে থাকা রাতের দিকে তাকালো। মেয়েটা কগ্ত নিশ্পাপ,, ওর জীবনে অন্তত এমন কোনো টাফ সিচুয়েশনে না আসুক। আল্লাহ ওকে হেফাজত করুন।

ইরাদ ফোন হাতে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে টায়েল্সের মেঝেতে বসে পরলো। তার বুকের বাম পাশটা জ্বলে যাচ্ছে, ক্ষনে ক্ষনে ভিতর থেকে হৃদপিন্ডটা কেউ খামচে ধরছে,, এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়? কি করলে একটু শান্তি পাবে সে? ইরাদ কান্না আটকাতে না পেরে গায়ের উড়নাটা কুন্ডলী পাকিয়ে মুখে গুজে হাওমাও করে কেদে উঠলো। কাদতে কাদতে ম্যাসেন্জারে ঢুকলো ইরাদ। আদ্রিয়ান কাইসার নামক আইডিতে ঢুকে তার আর সিদ্বার্থের করা পুরোনো ম্যাসেজগুলো একটা একটা পড়তে লাগলো। সিদ্বার্থের বলা প্রতিটি কথা তার হৃদয়ে আঘাত হানছে,, ঐ লোকটা এতো কেয়ার করতো,, এতোটা ভালোবাসতো অথচ লোকটা বেইমান,, উনি তো জানতো ইরাদ আদিকে ভালোবাসে। ভালোবাসা নিয়ে এতো বড়ো গেইম খেলার আগে একটাবার ওর মনের কথা ভাবলো না? এখন তো সিদ্বার্থ তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। মনে একজন আর অভ্যাসে একজন,, এটা কেমন নিয়তি হলো তার? মেসেজ পড়তে পড়তে ইরাদ খেয়াল করলো আইডিটা অনলাইন দেখাচ্ছে,, তারমানে কি সিদ্বার্থ ও ওপাশ হতে তাকে মিস করছে? ইরাদ ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে আবারও শব্দ করে কেদে উঠলো। সে সিদ্বার্থকে মানতে পারবে না, এটা কোনোদিনি সম্ভব না আবার মেসেজের ওপাশে থসকা ব্যাক্তিকে ছাড়া সব ফাকা ফাকা লাগছে। গলার কাছে কেমন যেনো দলা পাকিয়ে আসছে,, সিদ্বার্থ একটা ঠক, জোচ্চর, বেইমান, সিদ্বার্থ অপরাধী,, ইরাদের অপরাধী। সিদ্বার্থকে কখনো ক্ষমা করবেনা ইরাদ আর না ঐ আদ্রিয়ান কাইসারকে। টাইপিং এর খটখট শব্দে ইরাদের কান্না থেমে গেলো,, সেকেন্ডের মাঝে ওপাশ থেকে মেসেজ এলো,,

,,, মিস করছো মাই লাভ?
,,, সিদ্বার্থের মেসেজে কেপে উঠলো ইরাদ, আবারও মেসেজ এলো–
,,,আমিও মিস করছি তোমায়।
আবারো মেসেজ করলো–
— একটাবার ঘৃণা করি বলবে?
,,, দুটো গালি অন্তত দেও।
,, আমার বুকে খুব ব্যাথা করছে,, হাতটাও ব্যাথা করছে।
,,, একটা কিছু বলো।
,,, আমি কেমন আছি, কোথায় আছি জানতে চাইবে না?
,,, ভাইয়ার কথা জানতে চাইবে কি?
,,, আমার কোনো মূল্য নেই ইরাদ?
,,, মাই লাভ!! আই লাভ ইউ।
,,, পুরুষের তো কান্না করা বারন তবুও আমার কান্না পাচ্ছে,, আমি কি করবো?
,,,ইরাদ মেসেজ পড়ছে আর ফুপাচ্ছে। ইচ্ছা করছে রিপ্লাই দিতে কিন্তু ওপাশের ব্যাক্তিটা সিদ্বার্থ। আর সিদ্বার্থ কখনোই তার ভালোবাসা না,, ওকে সেই নজরে দেখা অসম্ভব। ওপাশের ব্যাক্তিটি বোধহয় রেগে গেলো, মেসেজ পাঠালো–
,,, রিপ্লাই যখন দিবেই না ইনবক্সে কি করছো? চলে যাও।
,,৷ ইরাদ আর থাকতে পারলো না। স্ক্রিন অফ করে হাটুতে মুখ গুজে ফুপিয়ে উঠলো।

,,, বিছানার একপ্রান্তে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে অর্পনা,, চোখ দুটো বন্ধ হলেও জেগে রয়েছে,, হেয়ার ড্রায়ার ইউজ না করায় চুলগুলো এখনো খানিক ভেজা। শরীরে তীব্র ব্যাথা, অশার হয়ে আছে,, সাথে মন মেজাজ ও খুব খারাপ। গতকাল রাতে দ্বীপ ভালোবাসি বলার পর আর একটা কথাও বলেনি। এমনকি ভোর রাতে সেহরি করার সময় ও তাকে খায়িয়ে দেয়নি অথচ লাস্ট যতোগুলো দিন ওর সাথে ছিলো ওকে কখনো নিজের হাতে খেতে দেয়নি। এমনকি গোসল শেষে ওর চুলগুলো ও শুকিয়ে দেয়নি,, পায়ের বেন্ডেজটাও মহিলা ডক্টরকে দিয়ে করিয়েছে। অর্পনা জানে লোকটা কষ্ট পেয়েছে, রেগে গিয়েছে কিন্তু ওকে শাস্তি ও তো কম দেয়নি। আর এমনিতেও তারা গতো রাতে এক হয়ে গেলো না? এরপরেও উনার রাগ কমেনি? নাকি কষ্টটা কমেনি? অর্পনা বালিশে মুখ গুজে বিরক্তিকর নিশ্বাস ফেললো,, ঘাড়টাও ব্যাথা করছে,, এই লোকটা এমন কেন? আজরাইল একটা!! নিজের মনমাফিক সব করবে,, এতে অর্পনার কতোটা কষ্ট হলো না হলো তাতে উনার কি? অর্পনার ইচ্ছা করছে খুব রাগারাগি করতে,, গতোকাল রাতে করা উনার খামখেয়ালি নিয়ে উনাকে হাজারটা কথা শুনাতে, ফালতু লোক,, এটাকে বিয়ে করাই উচিৎ হয়নি। আগে যদি জানতো এই লোক এতো কঠোর জীবনেও বিয়ে করতো না। অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝেই ওর হাত ধরে হেচকা টান দিলো কেউ,, ভাবনা কাটিয়ে ধরফরিয়ে উঠে বসলো অর্পনা। দ্বীপ চোখ মুখ শক্ত করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, অর্পনা ভ্রু কুচকে সুধালো — কি সমস্যা? আপনি কি সত্যি ই নরমাল মানুষের মতো ডাকাডাকি করতে পারেন না? আমার তো একটা নাম আছে নাকি? কখনো কোমর ধরে টানাটানি করেন এখন আবার হাত, আমায় কি আপনি রসি পেয়েছেন?

,,, দ্বীপ কিছু বললো না, এমন ভাব যেনো অর্পনা নামক কোনো বস্তু তার সামনে নেই,, দ্বীপকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মেধা দরজা ঠেলে উঁকি দিতেই দ্বীপ ইশারায় ভিতরে আসার অনুমতি দিলো। মেধা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো হাতে বড়ো বড়ো সাইজের কয়েকটা শপিং ব্যাগ। মেধার পিছন পিছন পরশীও এলো তার হাতে লাল একটা বক্স, দেখে গোল্ডের বক্স মনে হচ্ছে। অর্পনা নাক কুচকে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেধা আর পরশী জিনিসগুলো রেখে চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো,, অর্পনা চোখে মুখে জিজ্ঞাসা নিয়ে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দ্বীপ ওর গা থেকে উড়নাটা সরিয়ে দিলো। ড্রেসে হাত দিতেই ছ্যাত করে উঠলো অর্পনা— কি করছেন? মাথা টাথা খারাপ নাকি? আমি রোজা,, সরুন তো।

,,, বলেই দ্বীপের বুকে ধাক্কা দিতেই ওর হাত ধরে নিলো দ্বীপ। অন্য হাতে চুল খামচে ধরে মুখটা উচু করে দাতে দাত চেপে বললো — কু*ত্তার বাচ্চা!! আরেকটা কথা বললে তর মুখ ভেঙে দিবো, চুপচাপ বসে থাক।
,,, আর সময় গালিগালাজ সহ্য করলেও আজ অর্পনার সহ্য হলো না, দ্বীপের থেকেও চরম মেজাজ দেখিয়ে তর্জনী আঙুল তাক করে বললো — আপনি আমার সাথে এরকম বিহেব করবেন না, আমি এসব পছন্দ করিনা।
,,, অর্পনা রাগ দেখাতে গিয়ে কথাটা একটু জোরেই বলে ফেলেছে যেটাকে এক কথায় উচ্চস্বরে কথা বলা এমনকি বেয়াদবি বুঝায়। দ্বীপের গরম হওয়া মেজাজ আরও গরম হলো,, ধূসর চোখ জোড়াতে হিংস্রতা। সে অর্পনার হাত ছেড়ে মুখ চেপে ধরে মুখের কাছে মুখ এনে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো — তর পছন্দ অপছন্দ ততোক্ষণ দাম পাবে যতোক্ষণ দ্বীপ মির্জা তার মূল্যায়ন করবে। একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নে,, দ্বীপ মির্জাকে ভালোবেসে মানানো যায় কিন্তু কন্ট্রোল করা যায় না। তুই গেইমার হলে দ্বীপ মির্জা গেইম চেইন্জার,, তুই যেই রাজ্যের রানী দ্বীপ মির্জা সেই রাজ্য পরিচালনা করে। সু,ডন্ট শাউট।

,,, চুল আর মুখের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা,, লোকটা তাকে সত্যি ই আঘাত করছে সাথে খুব খারাপ ব্যাবহার ও। কিন্তু এতোকিছু অর্পনা আমলে নেওয়ার সময় পেলো না,, সে চিন্তিত দ্বীপ ওকে গেইমার বললো কেনো? দ্বীপ কি সব জেনে গিয়েছে? কিন্তু কিভাবে? হাউ ইজ দেট পসিবল? নাকি এমনি এমনি বলেছে? চিন্তিত অর্পনার চিন্তার ঘোর কাটার আগেই ওকে ছেড়ে দিলো দ্বীপ। মেধা আর পরশীর রেখে যাওয়া জিনিস পত্র গুলো থেকে দুটো শখিং ব্যাগ উল্টে দিলো, সাথে সাথে জরজর করে সাজগোজের প্রডাক্ট বিছানায় আছড়ে পরলো। পরপর আরও একটা শপিং ব্যাগ উল্টালো,, রেড কালারের ওয়েডিং শাড়ি, ব্লাউজ। গোল্ডেের বক্স খুলতেই সেখান থেকে উকি দিলো নানার বাহারের গহনা। শাড়ির দিকে নজর যেতেই কেপে উঠলো অর্পনা, মানস্পটে সেই বাজে দৃশ্য গুলো ভেসে উঠলো। সে দু’হাতে মুখ ঢেকে হাপাতে হাপাতে বললো — এটা!! এটা সরান, আমি শাড়ি পরবো না, প্লিজ!!
,,, দ্বীপের কোনো ভাবাবেগ হলো না, সে বিরক্তি নিয়ে অর্পনার দিকে তাকিয়ে,, দ্বীপের রেসপন্স না পেয়ে অনেকটা সময় পর শান্ত হলো অর্পনা। দ্বীপ বিরক্তিকর মুখ নিয়েই অর্পনার মুখ থেকে হাত সরিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো — নাটক বন্ধ,, একদম নাটক করবি না। শাড়ীতে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে? যারা অন্যায় করেছে তাদের ছেড়ে দেইনি আমি, উত্তম শাস্তি দিয়েছি। এখনো এতো নাটক করতে হবে কেনো? তর নাগর তকে শাড়িতে পছন্দ করেনি বলে? থাপরে একদম গাল লাল করে ফেলবো।আজকের পর তর আগের সব স্বভাব বাতিল,, এখন থেকে প্রতিদিন শাড়ি পরবি তুই। ঠিক হয়ে বস, বিরক্ত করবি না।

,,, দ্বীপের ধমকে কেপে উঠলো অর্পনা,, রাগী লোকটাকে আজ ভয়ঙ্কর লাগছে। এই মুহুর্তে যদি সেও রাগারাগি করে তাহলে বিষয়টা আরও জটিল হবে,, তাই আপাতত মেনে নিলো। একজনের মাথা গরম থাকলে আরেকজনের চুপ থাকা উচিৎ নয়তো সম্পর্ক খারাপ হয়। সেই সাথে সে নিজে অন্যায় করেছে, দ্বীপকে কষ্ট দিয়েছে, এটুকু রাগ হয়তো সে প্রাপ্পো। অর্পনা আর বাধা দিলো না। ভয়, শঙ্কা নিয়েও চুপচাপ বসে রইলো। দ্বীপ নিজের কাজে মত্ত হলো, অর্পনার শরীরে দ্বিতীয়বারের মতো ব্লাউজ উঠলো,,কাধে শাড়ির আচল পরলো,, একটা সময় কুচি ঠিক করতে না পেরে মায়ের ধারে ধারে ঘুরতে গিয়ে নানির বাড়ি পরে থাকার খোটা শুনা অর্পনার উদরে আজ পারফ্যাক্টলি শাড়ির কুচি গুজা হলো। পাগল দ্বীপ মির্জাকে বিয়ে করার পর অনেকেই বলেছিলো লোকটা সুস্থ হওয়ার পর তাকে নাকি ছুড়ে ফেলে দিবে। অথচ আজ অর্পনার সেই পাগল স্বামী সুস্থ হয়ে একটু একটু করে তার সকল অপূর্ণতা ঢেকে দিচ্ছে। অর্পনা অনুভব করলো তার বনমানুষের ভালোবাসায় তার একজীবনে ভালোবাসা না পাওয়ার আক্ষেপ মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। শাড়ি পড়ানো শেষে অর্পনার চুল গুলো এব্রো থেব্রো ভাবে খোপা করতে চাইলো দ্বীপ,, বেনি করাটা শিখতে পারলেও খোপার প্যাচটা সে দিতে পারেনা। অর্পনা মেনে নিলো, এই এব্রো থেব্রো খোপাটাই তার কাছে বহু মুল্যের। ধীরে ধীরে অর্পনার শরীর স্বর্নে মুড়িয়ে দিলো দ্বীপ,, লাল শাড়ির সাথে মিলিয়ে লাল টিপ দিলো। বৃদ্ধাঙ্গুলের মাথায় একটু খানি কাজল নিয়ে অর্পনার চোখের দুটো পাতায় লেপ্টে দিলো,, খরখরা আঙুলটা চোখের কার্নিশ ছুতেই চোখ বুঝে নিলো অর্পনা,, চোখ ছাপিয়ে দুফোঁটা পানি গড়ালো, দ্বীপ ঠোঁট দাবিয়ে সেই পানিটুকু শুষে নিলো। ঠোঁটের ভাজে অপরিপক্কতার সাথে মেরুন লিপস্টিক দিয়ে দিলো,, সাজটা একদমি পারফেক্ট হয়নি তবুও অর্পনার কাছে এটা অমুল্য,, নিজের স্বামীর হাতে সাজার মতো ভাগ্য সবার হয় না। সাঝ কমপ্লিট হতেই দ্বীপ তর্জনী আঙুল দিয়ে অর্পনার থুতনিটা উপরে তুললো,, দ্বীপের চোখে চোখ রাখলো অর্পনা। মোটা করে কাজল দেওয়া হরিণী চোখে চিক চিক করা পানি,, কপালে মাঝারি সাইজের টিকলি, কানে বড়ো ঝুমকা, গলায় হাতে অলঙ্কার, নাকে ঝলঝল করা স্বর্নের নাক ফুল,, গায়ে লাল শাড়ি,, দ্বীপ থমকালো কিছুটা। এতোটা সুন্দর কোনো মানুষ হতে পারেনা,, নিশ্চয়ই রমনি কোনো রুপকথার রাজকুমারী। অর্পনা চেয়ে থেকেই প্রশ্ন করলো —

,,, আমায় সাজালেন কেনো?
,,, দ্বীপ প্রতিত্তোর করলো না,, এখনো চোখ মুখ শক্ত সে অর্পনার সাথে কথা বলতে রাজি নয়। বিষয়টা বুঝতেই অর্পনা ব্যাথিত হলো,, এতোকিছুর পরেও মানুষ রাগ করে থাকতে পারে?সে তো কখনো কারোর রাগ ভাঙায়নি,, যতবার উনার রাগ ভাঙাতে গিয়েছে উল্টো নিজে রাগ করে ফিরে এসেছে। তার দ্বারা কি আদেও রাগ ভাঙানো সম্ভব? দ্বীপ কিছুটা ঝুকে অর্পনাকে কোলে তুলে নিলো,, অর্পনা ঠাওর করতে পারছে তার সাথে এখন কিছু একটা ঘটবে,, অবশ্যই সেটা ভালো কিছু। দ্বীপের মাধ্যমে তার খারাপ হতেই পারে না।
,,,, বসার রুমের সোফায় বসে আছে বিহান,, তার পাশে তাদের নির্দিষ্ট ডকুমেন্ট রাইটার,, সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে একজন মুরব্বি,, তিনি পেশায় কাজি। মেধা আর পরশী ভীত নজর ফেলে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে আছে,, তারা জানে দ্বীপ রেগে আছে,, এতোটাই রেগে আছে যে বিহানের সাথে পর্যন্ত প্রয়োজনের বাহিরে কোনো কথা বলছে না সেই সাথে গতকাল অর্পনাকে দেওয়া শাস্তির কথা মাথায় আসতেই তাদের কলিজায় চির ধরে যাচ্ছে। তাই আপাতত তারা নিশ্চুপ।

,,, দ্বীপ অর্পনাকে কোলে নিয়ে সিরি বেয়ে নিচে নামছে। অর্পনার শরীরে লাল শাড়ি, বধু সাজ আর দ্বীপের পরনে ফরমাল শার্ট,, পেন্টের সাথে ইন করে রেখেছে। বিহান বরাবরের ন্যায় হতাশ হলো,, কে বলবে আজ এদের বিয়ে? শার্ট পেন্ট পরে বিয়ে করা যায় এই প্রথম জানলো বিহান। সে যে তার মেধা রানীকে তুলে নিয়ে, ব্লাকমেইল করে বিয়ে করেছে তবুও তার পরনে একটা সাদা পাঞ্জাবি ছিলো। তবে হতাশ হওয়া সত্তেও কিছু বললো না বিহান,, বললে পরে দ্বীপ আরও রেগে গেলে সমস্যা।
,,দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে এসে কাজির মুখোমুখি সোফায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশাপাশি বসলো। দ্বীপ আর অর্পনার যখন বিয়ে হয়েছিলো দ্বীপ তখন হুসে ছিলো না,, জীবনে কাকে কবুল করেছে সেটাও বুঝতে পারেনি সেই সাথে তাদের কোনো কাবিন নামা নেই। এই বিষয়গুলো ঠিক হচ্ছে না,, অর্পনার একটা প্রাপ্য আছে যেটা মিটানো দ্বীপের দায়িত্ব। বিষয়টা বুঝতে পেরে কিছুটা বিরক্ত হলো অর্পনা। সে বুঝতে পারছেনা এসবের কি প্রয়োজন? সে তো দ্বীপকে অস্বীকার করছে না। বিয়েতে কাবিন নামা এতোটাও ইম্পর্ট্যান্ট না, আগেকার দিনে এসব হতো না, তখন কি স্বামী স্ত্রীরা সংসার করেনি? ভেঙে গিয়েছে? আজব লোক। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ডকুমেন্ট রাইটার ওর দিকে এক গাদা কাগজ এগিয়ে দিলো,, অর্পনা ভ্রু কুচকে কাগজগুলো নিয়ে প্রশ্ন করলো — এতো কাগজ কেনো? এগুলো একত্র করলে তো একটা মোটা বই বানানো যাবে।

,,, ডকুমেন্ট রাইটার একটা প্যান এগিয়ে দিয়ে বললো — সবচেয়ে উপরের কাগজটা পড়ে নিন ম্যাম, ওটা একটা এগ্রিমেন্ট প্যাপার। স্যার যাকে জীবনে পারমানেন্টলি এড করেন তার জন্য এরকম এগ্রিমেন্ট প্যাপার বানানো হয়। আপনি যেহেতু স্যারের ওয়াইফ সেহেতু শর্তগুলো কিছুটা পারশোনাল, একান্ত ভাবে পড়ে নিন।
,,, অর্পনা আড় চোখে দ্বীপের দিকে তাকালো, তাকে এগ্রিম্যান্টে সাক্ষর করে তারপর উনার জীবনে ঢুকতে হবে? সে কি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে নাকি? যে জব কনফার্মেশন লেটার নেওয়ার আগে এগ্রিমেন্ট করতে হবে? অর্পনা তাকিয়ে থাকলেও দ্বীপের ভাবান্তর নেই, সে চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে। অর্পনা বিরক্ত হলো,, কাগজটাতে চোখ বুলাতেই দেখলো সেখানে ছোট ছোট করে লিখা,,,

,,, আমি অর্পনা জামান স্ব-ইচ্ছায় নিজেকে দ্বীপ মির্জার নামে লিখে দিচ্ছি,, আজকের পর আমি থেকে শুরু করে আমার মন, মস্তিষ্ক এমনকি প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর অধীকার শুধুই দ্বীপ মির্জার। আমি দ্বীপ মির্জা ব্যতিত অন্য কারোর নাম মুখে কিংবা মনেও আনবো না। যদি কখনো বেইমানি কিংবা বিশ্বাস ঘাতকতা করি,, তখন যদি দ্বীপ মির্জা আমার শরীরের হাড় মাংস আলাদা করে দেয় তবুও তার কোনো দায় থাকবে না,, সম্পূর্ন দায় আমার এবং আমার কর্মের। আমি কখনো ডিভোর্স শব্দটা মুখে আনবো না আর যদি আনি তারপর দ্বীপ মির্জা আমার সাথে যাই করুক আমি কোনোরুপ বাধা দিবো না। আমি মারা যাওয়ার পর আমার কবর আমার স্বামী দ্বীপ মির্জার সাথে জয়পুরহাট গোরস্তানে দেওয়া হবে,, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার স্বামী হতে পাওয়া সম্পূর্ণ দেনমোহর আমি গ্রহণ করবো এবং তা যথাযথ নিয়মে নিজের আয়ত্বে রাখবো। আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমি আমার স্বামীর প্রতি অনুগত্য থাকবো,, কোনোরুপ বেয়াদবি এবং ঘারত্যারামি করবো না।

,,, শর্তের কাগজ পড়ে অর্পনার মাথা কাজ করা বন্ধ,, এরকম এগ্রিমেন্ট কেনো দিবে সে? আজব তো!! এখানে যা যা লিখা আছে এর মধ্যে শুধু দুইটা বিষয় এগ্রি করতে পারকে,, একটা হলো জয়পুরহাট পারুর সাথে কবর,, এটা তার একান্ত ইচ্ছা ছিলো। আরেকটা অন্য কারোর নাম মুখে না আনা। এর বাহিরে বাকি একটাও পারবে না,,তার কি টাকার অভাব আছে? যে অন্যের থেকে কিছু নিতে হবে? আর সে নিজের নিয়মে চলবে, ত্যারামি তার রক্তে মিশে আছে। উনার জন্য এটা ছাড়া অসম্ভব। কথায় কথায় ডিভোর্স চাওয়াটাও তার ঠোটষ্থ হয়ে গিয়েছে। এতো তারাতারি চেন্জ করতে পারবে না। কোনোকিছুই মনমাফিক না হওয়ায় অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললো — এসব কি? এসবে কেনো সাইন করবো? আজব!! যে থাকার সে এমনি ই থাকে, অতো কাগজ পত্র আর শর্তের প্রয়োজন পরে না।
,,, অর্পনার উচ্চস্বরে কথা বলাটা দ্বীপের কানে বাজলো,, মুখ নামিয়ে শাসানোর স্বরে বললো — হুস!! গলা নিচে,, আমি তোমার ছোট ভাই না, হাসবেন্ড হই। সম্মান দিতে শিখো, তাহলেই সম্মান পাবে। সাইন হেয়ার, ফাস্ট!!
,,,দ্বীপের ব্যাবহারে আশ্চর্যের পর আশ্চর্য হচ্ছে অর্পনা। যেখানে লোকটা কখনো তার সাথে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেনি সেখানে কিনা এভাবে ব্যাবহার করছে? কি হয়েছে উনার? লোকটা কি পাল্টে গেলো? আপাতত কিছু বলবে না সে,, যা করার করে নিক,, সময় তার ও আসবে। সে উপরের কাগজটা সরিয়ে বাকি কাগজ গুলো দেখতে দেখতে বললো

— এগুলো আবার কি? এতো কাগজে সাইন করবো আমি?
,,, বিহান মৃধু হেসে বললো — করতে হবে, এগুলো কাবিন নামা।
,,, অর্পনা ভ্রু কুচকে নিলো– আর ইউ মেড? এতোগুলো কাবিন নামা? বোকা পেয়েছেন আমায়?
,,, বিহানের পাশে বসে থাকা ডকুমেন্ট রাইটার হেসে ফেললো, সাথে সাথে দ্বীপের দিকে চোখ যেতেই থেমে গেলো। প্রফেশনালদের মতো করে বললো — বর্তমান পৃথিবীতে ১৯৫ টি স্বাধীন দেশ রয়েছে,, আপাতত এখানে থাকা সবগুলো কাগজ সেই প্রতিটি দেশের নিয়মে তৈরি করা ম্যারেজ রেজিষ্ট্রি প্যাপার। আপনি যদি কখনো স্যারকে ডিভোর্স দিতে চান তাহলে প্রতিটি দেশে গিয়ে প্রতিটি দেশের নিয়মে আপনাকে ডিভোর্স দিতে হবে নয়তো আপনাদের ডিভোর্স হবে না, হলেও স্যার মানবেন না, পরবর্তীতে আপনারি প্রবলেম হবে,, এতে আমরা কতৃপক্ষের কোনো দায় নেই।
,,, অর্পনার কুচকানো ভ্রু শিথিল হলো, গাড়ো নিশ্বাস ফেলে বললো — আচ্ছা মানলাম কিন্তু আপনাদের স্যার? সে যদি আমাকে ডিভোর্স দিতে চায় তখন?
,,, ডকুম্যান্ট রাইটার গর্বের সহিত বললো– স্যার চাইলে এখানে বসে থেকেই আপনাকে ১৯৫ টি দেশ থেকে ডিভোর্স দিতে পারবে,, সবচেয়ে বড়ো কথা স্যার চাইলে মুখেই তালাক,, বুঝেন ই তো ম্যাম, আমি নাহয় নাই বললাম। ( আমতা আমতা করে)

,,, অর্পনা মাথা ঝাকালো মানে বুঝেছে। সে এবার সরাসরি ডকুম্যান্ট রাইটারের দিকে তাকিয়ে বললো– মানে বলতে চাচ্ছেন উনি ছেলে বলে যখন তখন আমাকে ডিভোর্স দিতে পারবে,, আমার কোনো মতামত থাকবে না? আর আমি মেয়ে বলে উনাকে ডিভোর্স দিতে হলে দেশে দেশে ঘুরতে হবে?
,,, অর্পনার সোজা সাপ্টা কথায় লোকটা থতমত খেয়ে গেলো,, ফের আমতা আমতা করে বললো — জ্বী ম্যাম, কিন্তু স্যার তো আপনাকে ডিভোর্স দিবেনা। বুঝেন ই তো,,
,,, বুঝেন ই তো,, এই বুঝেন ই তো শুনে অর্পনার মেজাজ চরমে পৌছালো,, সে দাতে দাত চেপে বললো– হ্যা আমি সব বুঝি,, বুঝে উদ্বার করে ফেলছি সব কিছু। যাই হোক!! আপনার স্যারকে বলে দিন,, আমি কারো দাসী হয়ে থাকার জন্য জন্ম নেইনি। হয় আমার সম্মান হোক নয়তো আজীবন সঙ্গিবিহীন থাকার ভাগ্য হোক। এরকম নিয়মে আপনাদের স্যারকে আমার লাগবে না। যদি শর্ত দিতেই হয় তাহলে আমিও দিবো,, নিয়ম তৈরি করার হলে আমিও করবো। এবার আপনাদের স্যারকে জিজ্ঞেস করুন সে রাজি কিনা, নয়তো আমি উঠলাম। আমি উনার এক হাজার টাকার বউ এক হাজার টাকারি থাকবো,, সম্মান দিতে হলে পুরোটা দিতে হবে, নয়তো থাক। আসছি!!
,,, বলেই উঠতে নিলে ওর হাতের কব্জিতে টান পরলো। দ্বীপ ওকে টেনে আবারও বসিয়ে দিয়ে ডকুমেন্ট রাইটারে উদ্দেশ্য বললো–

,,, যা যা বলে লিখে দাও।
,,, ডকুমেন্ট রাইটার মাথা ঝাকালো, অর্পনার উদ্দেশ্যে বললো– বলুন ম্যাম আপনি দেনমোহর হিসেবে কি চান?
,,, অর্পনা বলা শুরু করলো — দেনমোহর হিসেবে আমিও উনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চাই,, বিশেষ করে কলিজা, হৃৎপিণ্ড,, ফুসফুস আর চোখ। যদি কখনো উনি আমাকে ছাড়তে চান তাহলে এসব দিয়ে তারপর আমাকে ছাড়তে হবে। আজকের পর উনি সম্পূর্ণ রুপে আমার,, উনি যদি ভবিষ্যতে কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করে কিংবা আমাকে ঠকানোর ট্রাই করে তাহলে আমি নিজ দায়িত্বে আমার দখলনামায় থাকা জিনিস গুলো খুলে নিবো। এই জন্য আশা করি আমায় পুলিশের কাছে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না কারন যেগুলো নিচ্ছি সেগুলো উনি স্ব-ইচ্ছায় আমার নামে লিখে দিচ্ছেন। আমি কোনোরুপ পরিবর্তন হতে পারবো না,, হয়তো মাঝেমধ্যে উনার পছন্দ মতো কিছু করতে পারি কিন্তু নিজের স্বভাব বাদ দিবো না। আপাতত এই টুকুই, তবে নিচে অনেকটুকু ফাকা জায়গা রাখবেন যেনো ভবিষ্যতে নিজের প্রয়োজন মতো শর্ত লিখে দিতে পারি,, দেট্স ইট!! আমি সাধারণ মানুষ, চাহিদাও কম,,
,,, অর্পনার কথায় কাজি সাহেব আর বিহান কেশে উঠলো,, মেধা আর পরশী হতভম্ব সাথে ডকুম্যান্ট রাইটার ও। এটা কাদের পাল্লায় পরে গেলো সে? এরা তো হৃদপিণ্ড, কলিজা, হাড়,মাংস আলাদা করা ছাড়া কিছুই পারেনা। এটা কি বিয়ে হচ্ছে নাকি বিশ্ব যুদ্বের হুসিয়ারি? এদের প্রথম বিয়েটা কে দিয়েছিলো? তাকে পেলে সে একবার কর্ড়া ভাষায় দুটো কথা শুনিয়ে দিতো,, লাগলে দুটো চর থাপ্পড় ও দিতো। এতো বড়ো ডেন্জেরাস কাজটা করার আগে এদের আসেপাশে থাকা লোক গুলোর কথা ভাবলো না? কাটাকাটি করার কথা বলে ওরা আর আত্মা লাফ দিয়ে উঠে যারা শুনে তাদের।

,, ডকুমেন্ট রাইটার সুন্দর করে অর্পনার বলা কথাগুলো কাগজে লিখে দিলো। অর্পনা সেটা পড়ে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিতেই দ্বীপ সেটা নিয়ে নিলো। দুজনেই দুজনার দিকে বাকা নজরে তাকালো,, দুজনার চোখ মুখ শক্ত,, যেনো এরা হাসবেন্ড ওয়াইফ নয় জনম জনমের শত্রু। দ্বীপ আর অর্পনা একসাথে কলম নিলো, দুজনেই এগ্রিমেন্ট প্যাপারে সাইন করে আবারও দুজনের দিকে তাকালো। অর্পনা দ্বীপের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,,
,,তখন কি যেনো বলেছিলেন? আমি যেই রাজ্যের রানী আপনি সেই রাজ্য পরিচালনা করেন? হেই ম্যান!! আপনি রাজ্য পরিচালনা করলেও আপনাকে পরিচালনা করার ক্ষমতা রয়েছে আমার। আপনাকে এক মুহুর্তে ধ্বংস করে দিতে পারি আমি। আপনি গেইম চেন্জ করেন আর আমি গেইম ক্রিয়েট করি। কখন কোন গেইমে ফাসিয়ে আপনার গলায় ফাস লাগিয়ে দিবো টের ও পাবেন না।আপনাকে ভালোবেসে জয় করতে হলে,, আমায় ভালোবেসে, সম্মান দিয়ে, তারপর জয় করতে হবে। ভাববেন না নির্বাচন শেষ মানে প্রচারনা বন্ধ করে দিবেন। গতকাল রাতে যা হয়েছে তা রিপিট হবে,, সেই আপনাকে আমার কাছেই আসতে হবে। সু,, ভাব নিয়েন না, আমার সামনে কেউ ভাব নিবে এটা আমারও পছন্দ না।
,,, অর্পনার কথায় শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপ,, অর্পনা পাত্তা দিলো না। সে ১৯৫ টা কাগজ নিয়ে একটা একটা সাইন করে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিলো। টানা অনেকটা সময় নিয়ে দুজন মিলে ১৯৫ টা কাগজে সাক্ষর করার পর কাগজ কলমের মাধ্যমে এক হলো দুজন।
,,, রেজেস্ট্রি শেষ হতেই কাজি খুতবা পড়া শুরু করলেন। বিয়ের সকল ফরমালিটিস পালন করে অর্পনার উদ্দেশ্যে বললেন–

,,, মাহিদ মির্জার একমাত্র পূত্র দ্বীপ জোহান মির্জা তার সম্পদের প্রতিটি অংশের ৫০% শেয়ার দেনমোহর হিসেবে ধার্য করে আরশাদ জামানের একমাত্র কন্যা পৃথা জামান অর্পনাকে বিবাহ করার প্রস্তাব রাখছেন,, এই প্রস্তাবে পৃথা জামান অর্পনা, আপনার সম্মতি রয়েছে? সম্মতি থাকলে দ্বীপ জোহান মির্জাকে কবুল করুন।
,,,, অর্পনা আবারও বাকা নজরে দ্বীপের দিকে তাকালো,, দ্বীপ ওর দিকেই তাকিয়ে,, দ্বীপ নিরবে অর্পনার হাতটা শক্ত করে ধরতেই অর্পনা মুচকি হেসে বললো– কবুল করছি,,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৪)

সবার ঠোটে হাসি ফুটলো। কাজি এবার দ্বীপের উদ্দশ্যে বললো — “দ্বীপ জোহান মির্জা, আপনি কি আরশাদ জামনের একমাত্র কন্যা পৃথা জামান অর্পনাকে, আপনার সম্পদের প্রতিটি অংশের ৫০% শেয়ার দেনমোহর হিসেবে দিয়ে স্ত্রী বানাতে প্রস্তুত? সম্মতি থাকলে কবুল করুন,,,
,,, দ্বীপ অর্পনার দিকে তাকিয়ে থেকেই আওড়ালো — কবুল করছি, কবুল করছি,, কবুল করছি,,,,!!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৬)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here