Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব 

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব 

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ পর্ব 
নূরজাহান আক্তার আলো

সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। আজ যা বর্তমান আগামীকাল তা অতীত। মানুষ মূলত অতীতের অভিজ্ঞতায়
বর্তমানকে সাজায় আর বর্তমানকে ভিত্তি করে গড়তে চায় তার অদূর ভবিষ্যৎ। কিন্তু জীবন কি পরিকল্পনা মাফিক চলে? চলে না! বরং যখন যা পরিকল্পনা করে সেটারই বিপরীত কিছু ঘটে। মানুষ যাকেই আঁকড়ে ধরতে চায় সেটাই সবার আগে হারিয়ে যায়। তখন মনে হয় চেনা পৃথিবী নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেশক্তিটুকুও হারিয়ে গেছে। কিন্তু
সময় যত গড়ায়, কিছুর উসিলা হলেও শূন্যের ঘরের শূন্যস্থানগুলোও
ধীরে ধীরে পূরণ হতে থাকে। ঠিক যেমন ​শীতকালে ঝরা পাতা ঝরিয়ে প্রকৃতি যখন নিঃস্ব হয়ে পড়ে তখনই কিন্তু বসন্তের আগমন ঘটে। গাছে গাছে, ডালে ডালে নতুন কুঁড়ি গজাতে থাকে। শূন্য গাছটাও নিজের রূপ ফিরে পায়। এটাও জীবনের শিক্ষণীয় দিক। প্রকৃতি যেন উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেয় ঝরে যাওয়া মানেই শেষ নয়। হারানো মানেই থমকে যাওয়া নয়। বরং কখনো কখনো ঝরে যাওয়া মানে নতুন কিছুর সূচনাও হয়।

তিনদিন পরের ঘটনা,
দেখতে দেখতে নির্বাচনের তিনদিন পেরিয়ে গেছে। তবে চৌধুরী নিবাস থেকে শুরু করে সায়নের পার্টি অফিসে আনন্দের রেশ এখনো কাটেনি।
বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা লেগেই আছে। যদিও সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার আইন অনুযায়ী বিজয়ী প্রার্থী ভোট পাওয়ার পরদিনই চেয়ারে বসতে পারে না। কারণ মেয়র হওয়ার পর বেশ কয়েকটি আইনি ধাপের মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী সব দায়িত্ব বুঝে নিতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে সায়নের। এতে অবশ্য ভালো হয়েছে শরীরটা ভীষণ খারাপ তার। হঠাৎ জ্বরে আরো কাবু হয়ে গেছে বেচারা।
এমনিতেই তিনবেলা কড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খেতে হচ্ছে। ওষুধের প্রভাবে ঘুম ঘুম ভাব বেড়ে গেছে। বসে থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে পড়ছে।

আবার কখন রাত শেষে ভোর নামে তাও বুঝতে পারে না। জেদ দেখিয়ে
না ঘুমালে শরীর থরথর করে কাঁপে। মাথা ঘুরে। তাছাড়া যে বিপদ থেকে বেঁচে ফিরেছে টাইম টু টাইম ওষুধ না খেলে শীঘ্রই বিছানাগত হয়ে পড়ে থাকতে হবে। কিন্তু এখন কি পড়ে থাকার মতো পরিস্থিতি আছে? নেই!
বোনটাকে বাড়ি আনতে হবে, বউটার যত্ন নিতে হবে, দায়িত্ববান মেয়র হতে হবে, বাড়ির মানুষগুলোকে ভালো রাখতে হবে। এখন কত কাজ!
কত দায়িত্ব! এদিকে ঘুমন্ত সায়নের বুকে মাথা রেখে স্বর্ণের রাত কাটে তাকে দেখতে দেখতেই। একটুও ঘুমাতে পারে না সে। ঘুমই আসে না।
যদিও চোখ বুজে আচমকা চমকে উঠে সায়নকে হাতড়ে খুঁজতে থাকে। মস্তিষ্কে এখনো হারানোর ভয়টুকু গেঁথে আছে। ঘুমালে মনে হয় এই বুঝি স্বপ্ন ভেঙে গেল? এই বুঝি সায়ন হারিয়ে গেল। মনে যখন এসব ভাবনা জেঁকে বসে তখন ঘুমন্ত সায়নকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। তার ক্ষততে আলতো স্পর্শে হাত বুলায়, ঠোঁট ছোঁয়ায়। প্রিয় পুরুষের শরীরে কাঁটাছেড়া দেখে
নীরবে চোখের জল ফেলে। সে যে ফিরে এসেছে এজন্য যতবার তাকে ছোঁয় ততবারই শুকরিয়া জ্ঞাপন করে করে।
এখন সকাল দশটা।

অথচ রোদের তাপ দেখে মনে হচ্ছে শরীর ঝলসে দেবে! দিনটা কেমন হতে যাচ্ছে, সূর্যমামা যেন সকাল থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাতে কি কাজকর্ম থেমে থাকবে? থাকবে না। কারণ দিনমজুর থেকে শুরু করে হতদরিদ্রের পরিবারগুলোর কাজ করলে টাকা পাবে আর টাকায় পাবে একমুঠো ভাত। তাদের জন্য রোদ কিংবা বৃষ্টি বড় না; বড় হলো পেটের ক্ষুধা। চৌধুরী পরিবারের সদস্যগুলোও নাস্তা সেরে যে যার কর্মে বেরিয়ে গেছে। বাড়ির গৃহিণীরা লেগে পড়েছে সাংসারিক কাজে। সায়ন আজও দেরি করে উঠে নাস্তা সারল। দুদিনের তুলনায় আজকে ঝরঝরে লাগল। গায়ে জ্বর নেই। তাই আজমকে ডেকে নিয়ে নগরভবনে একবার ঢু মেরে পূর্বের পার্টি অফিসের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে বসল। অন্য ছেলে পুলে সঙ্গে আছে। কথা হচ্ছে, হাসাহাসি হচ্ছে। আজমের বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। আজমের কেমন পাত্রী দরকার এই নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। হঠাৎ চৌধুরী বাড়ির গাড়ি দাঁড়াতেই সায়ন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
গাড়ির জানালা দিয়ে স্বর্ণকে মাথা বের করতে দেখে সায়ন ক্রাচ নিয়ে
খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়ির কাছে গেল। বলল,

_’কি হে লালবনের লালসুন্দরী ফুলটুশী সেজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? ‘
_’উঠে এসো।’
একথা শুনে সায়ন চোখ-মুখ কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
_’ দিনে দুপুরে ফাঁকা গাড়িতে ডাকছিস কেন? বাসায় বাপ-ভাই নাই?।’
_’বাপ-ভাই আছে, কিন্তু জামাই নাই তাই আপনাকে ডাকছি।’
_’ডাকার কারণ?’
_’ বড্ড প্রেম প্রেম পাচ্ছে যদি প্রেম করতে সাহায্য করতেন খুব উপকার হতো।”
_’ছিঃ! ছিঃ! চৌধুরী বাড়ির মেয়ের এত অধঃপতন!’
_’ আসবে তুমি? ডাক্তারের কাছে যাব লেইট হচ্ছে।’
ডাক্তারের কথা শুনে সায়ন ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল। সে বসতেই স্বর্ণ বিনাবাক্যে কাঁধে মাথা রেখে চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। নিঃশব্দে
প্রিয় ঘ্রাণ টেনে নিলো। সায়ন তাকে বাহুডোর আগলে নিয়ে কপালের একপাশে চুমু এঁকে চিন্তিত সুরে বলল,

_’ শরীর কি বেশিই খারাপ? এত বমি হচ্ছে কেন? দিন দিন কমার বদলে বাড়তেই আছে। গতরাত থেকে কিছুই খেতে পারিসনি৷ না খেলে আমার ছানা পুষ্টি পাবে কিভাবে? শালার ডাক্তার ভালো ওষুধ দিচ্ছে না নাকি? শালাকে দোচন না দিলে হবে না দেখছি।’
সায়নের কথা শুনে স্বর্ণ দুম করে তার উরুর ওপর কিল বসিয়ে দিলো। তারপর ধমকের সুরে বলল,
_’খবরদার, ডাক্তারের চেম্বারে উল্টো পাল্টা কথা বলবে না৷ ‘
_’জীবনে দেখেছিস আমি উল্টো পাল্টা কথা বলেছি? আমি হলাম পুরুষ মানুষ। যা বলি মুখের ওপর বলার সাহস রাখি। ম্যাউম্যাউ করার স্বভাব আমার নাই। তাছাড়া আমি জেন্টেলম্যান ওসব বালছালমার্কা কথাবার্তা আমার মুখেও আসে না।
_’ তাই না? অথচ সেদিন দুপুরেই দেখলাম আবেগে পড়ে আবেগীর বাপ হয়ে বলেছিলে, ‘লাজনীতি করব না! ব্যবছা কলবো!’ শুদ্ধ ভাইয়ের বাঁশ খেয়ে পরে না হুঁশ ফিরল।’
_’তুই কি আমাকে অপমান করলি?’
_’করলাম।’
_’গায়ে মাখলাম না, হুহ।’

একথা শুনে স্বর্ণ না চাইতেও হেসে ফেলল। বেহায়া, নিলজ্জ পুরুষটাকে এই কারণেই এত ভালোবাসে। অতঃপর খুনশুটি করতে করতে দুজনেই ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার স্বর্ণকে চেকআপ করে জানালেন আগের ওষুধ চলবে। ওজন কমে যাচ্ছে পুষ্টিকর খাবার দাবার খেতে হবে৷ বেশি
করে পানি পান করতে হবে। সাবধানে হাঁটা-চলা করতে হবে৷ জার্নি, উঁচু সিঁড়ি দিয়ে বারবার উঠানামা করা যাবে না। এইটুকু বলে ভদ্র হয়ে পাশে বসা সায়নের দিকে একবার তাকালেন। বুঝলেন এটা পেশেন্টের স্বামী।
তাই তাকে উদ্দেশ্য করেই আরও একটা সতর্কবাণী দিলেন,
_’দুজনই মাথায় রাখবেন আপনাদের অনাগত সন্তানের কথা। সহবাসের সময় সচেতনতা অবলম্বন করবেন। একটু অসচেতনতায় আপনাদের বাচ্চার ক্ষতির কারণ হতে পারে।’
স্বর্ণের বারণ শুনে সায়ন এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। মন দিয়ে ডাক্তারের কথা শুনছিল। হঠাৎ একথা শুনে তার মনে হলো চুপ করে বসে থাকলে দায়িত্ববান স্বামী হওয়া যায় না। তাছাড়া সে যথেষ্ট সচেতন ডাক্তারকেও জানানো উচিত। তাই স্বর্ণকে উদ্দেশ্য করে বলল,

_’ আমি এখন সচেতনই থাকি তাই না বল জান? এইতো গতকাল রাতে জেন্টেল ছিলাম। তুই না বলার পর আর জোর করেছি?’
তার কথা শুনে ডাক্তার খুকখুক করে কাশলেন। ভালো করে তাকালেন সামনের চেয়ারে বসা ভদ্রবেশের ছেলেটাকে। যথেষ্ট সুদর্শন তবে মুখের
লাগামে একটু সমস্যা আছে সেটাও বুঝলেন। একজন ডাক্তার হিসেবে পেশেন্টকে সাবধান করা উনার কাজ। তাই পাশে রাখা ক্রাচ দেখে মনে করিয়ে দিতে বললেন,
_’আপনার তো পা ভাঙা দেখছি।’
_’তাতে কি? অন্যকিছু তো আর ভাঙা না।’
সায়নের জবাব শুনে স্বর্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। ডাক্তার নাহয় তাদের ভালোর জন্যই কথাগুলো বলছে। তাই বলে সেও এসব বলবে?
চেম্বারে ঢোকার আগেও কত সুন্দর করে বোঝাল উল্টোপাল্টা কিছু না বলতে। অথচ বলে কি না অন্যকিছু তো আর ভাঙা না! সে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দিলো না কোনোমতে প্রেসক্রিপশন নিয়ে হাঁটা ধরল। তাকে এভাবে রেগে যেতে দেখে সায়ন ভীষণ অবাকই হলো। বউটা হঠাৎ রেগে গেল কেন? যা বলার ভদ্রভাবেই তো বলল, খুলে তো আর দেখায় নি তাও রেগে গেল? স্বর্ণ চলে যাচ্ছে দেখে সেও বউয়ের পেছনে যেতে যেতে বলল,

__’ রাগিস না বউ। আস্তে হাঁট ব্যাথা পাবি তো। আচ্ছা যা, ভাঙা! ভাঙা!’
তার কথা শুনে স্বর্ণ দাঁড়িয়ে গেল। হাতে থাকা পানির বোতলটা ছুঁড়তেই সায়ন ক্যাচ ধরে ফেলল। কি আশ্চর্য! ভাঙা না- বললেও রেগে যাচ্ছে আবার ভাঙা বললে তেড়ে মারতে আসছে। এ কোন পাগল-ছাগল বউ
জুটেছে তার কপালে? এসবের চক্করে এখন তো নিজেই দোটানায় পড়ে যায় আসলে ভাঙা নাকি ভাঙা না? কিন্তু বউটাকে তো এখন সামলাতে হবে। এখন রাগারাগি মোটেও ভালো না তাই বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে বলল,
_’ রাগ করে না পাখি। শান্ত হ। আসলে হয়েছে কি,,ভাঙতে গিয়েও ভাঙে নি।’

_’স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার ফল তাদের সন্তান। তাহলে বেবি কনসিভ হয়েছে কী না জানার জন্য মায়ের ইউরিন লাগলে বাবারটা লাগে না কেন? বাবা কি তার সন্তানকে ভালোবাসে না? নাকি বাবার ভালোবাসা ভালোবাসার কাতারে পড়ে না?’
কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঐশ্বর্যকে কল করেই প্রশ্নখানা করল রুবাব।
তার এমন অহেতুক কথা শুনে ঐশ্বর্য বিরক্ত হলো। হাতের বইটা রেখে জবাব দেওয়ার আগেই কিছু স্মরণে আসতেই কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,
_’রু..রুবাব!’
_’হুম।’
_’কোথায় তুমি?’
_’রিপোর্ট নিতে এসেছি।’
_’কী..কী এসেছে?
-‘পজেটিভ।’

কথাখানা কর্ণকুহুরে পৌঁছানো মাত্রই ঐশ্বর্য থমকে গেল। হাত চলে গেল পেটে। ড্রয়িংরুমে বসা সিতারা, সিমিন, সিরাত তখন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকে পেটে হাত দিতে দেখে যা বোঝার বুঝে গেলেন। সিতারা ভ্রু নাচাতেই ঐশ্বর্য একপ্রকার পালিয়ে নিজের রুমে এল। বেশ কয়েকদিন ধরেই উনারা তিন জা ঐশ্বর্যকে খেয়াল করছিলেন। অভিজ্ঞ চোখে ধরে ফেলেছেন বাড়িতে আরো একটি সুখবর আসতে চলেছে। কিন্তু ঐশ্বর্য মানতে রাজি না বারবার বলছিল এরকম উইক সারাবছরই থাকে সে।
প্রেসার সবসময় লো থাকে। মাথা ঘুরানো স্বাভাবিক ব্যাপার। ওসব কিছু না এসব বলে মানতে রাজি না। তারপর জোর করেই ইউরিন আর ব্লাড টেস্ট দুটোই করিয়েছেন। সেই টেস্টের রিপোর্ট আনতে গিয়েছিল রুবাব। রিপোর্ট দেখে কিছুক্ষণ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিল রুবাব। অবিশ্বাস্য লাগছে ব্যাপারখানা। সে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঐশ্বর্যকে কল দিলো। উক্তি কথাখানা বলতেই বুঝল ঐশ্বর্য কাঁদছে। তাও কিছু বলল। তাকে নিশ্চুপ দেখে ঐশ্বর্য বলল,

_’সরি।’
_’পরিকল্পিত ছিল তাই না?’
_’সরি বলছি তো।’
_’এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হলো? জানতে চাচ্ছি, পরিকল্পিত কি না?’
_’ হুম।’
_’আমি কিন্তু বলেছিলাম আরও কিছুদিন পর বেবি নেব?”
_’তুমি খুশি না, রুবাব? আমাদের সন্তান। আমাদের ভালোবাসার ফল।’
_’তুমিও আমার অনেক কষ্টের প্রাপ্তি ঐশ্বর্য।’
রুবাবের কথায় ঐশ্বর্য থমকে গেল। গড়গড়িয়ে গাল বেয়ে অঝরে অশ্রু ঝরতে লাগল। রুবাব রেগে আছে তাও স্বাভাবিক সুরে কথা বলছে। সে অকারণে ঐশ্বর্যের সঙ্গে জোরে কথা বলে না। ঐশ্বর্য নিজেও বুঝে তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে থেমে থেমে বলল,
_’ সে তো তোমারই অংশ, এসেছে নাহয় একটু তাড়াতাড়ি তাতে ক্ষতি কি? পিৎজা খেতে ইচ্ছে করছে। তাড়াতাড়ি এসো।’

একথা বলে ঐশ্বর্য কলটা কেটে দিলো। রুবাব কান থেকে ফোন সরিয়ে
রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুদিন আগে শুদ্ধ যখন তার সন্তানকে কবর দিলো তখনো খারাপ লেগেছিল। ভাই কষ্ট পাচ্ছে দেখে তারও খুব কষ্ট হয়েছিল। সায়ন বাড়ি ফিরে বাবার হওয়ার কথা জেনেও কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে আবার হেসেওছিল। আল্লাহ যে এতবড় নিয়ামত দান করেছে তাই বারবার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিল। সেই মুহূর্তে সায়নের অবস্থা দেখে খু্ব হেসেছিল। ভাইয়ের খুশিতে খুশিও হয়েছিল।
কিন্তু আজকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছে না। বুঝতে পারছে না কেমন লাগছে। নিজের বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। কতদিন বাবাকে বাবা বলে ডাকে না। বাবা নামের কেউ কাঁধে হাত রাখে না। সে আবারও রিপোর্ট হাত বুলিয়ে ঝাপসা চোখে তাকাল। না, সত্যি পজেটিভ! সত্যিই কেউ আসছে। কিন্তু তার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। বাবা হারা ছেলেটা নাকি বাবা হবে। ছোটো থেকে বাবার স্নেহছায়া না পাওয়া ছেলে নাকি কারো ছায়াবৃক্ষ হবে। আদুরে সুরে ডেকে বুক ঠান্ডা করবে। সে বাবা হবে আর
ঐশ্বর্য মা হবে। মা হারা মেয়েটাও মাতৃত্বের স্বাদ পাবে। পৃথিবীরতে কেউ নেই বলে আফসোস করা ঐশ্বর্যের একটা শক্তি হবে। বাঁচার অবলম্বন হবে। এসব ভেবে তার চোখজোড়া পুনরায় ভিজে উঠল। শার্টের বাহুতে চোখ মুছতেই আবারও ভিজে উঠল। সে ঠোটের কোণে হাসি ফুটিয়ে
সামনে তাকাতেই দেখে শখ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে চোখ মুছতে দেখে শখ হাসতে হাসতেই বলল,

_’যতই কাঁদো ট্রিট কিন্তু চাই-ই চাই।’
_’ক্লাস শেষ না? চল, বাড়ি চল।’
_’আজ না পরশুদিন যাব।’
_’গাড়িতে বস ড্রপ করে দেই?’
_’অর্ক আসছে।’
দুজনের কথার মাঝেই সেখানে অর্ক এসে পৌঁছাল। শখ অর্ককে জানাল খুশির খবর। এই নিয়েও রুবাব আর অর্কের খোঁচাখুচি হলো। হাসাহাসি হলো। অর্ক জোর করে মিষ্টি খাওয়ার দাওয়াত নিলো। অতঃপর বিদায় নিয়ে যে যার বাড়ির পথে রওনা হলো। রুবাব হাতভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে সবাইকে মিষ্টি মুখ করালো। বাড়ির সবার কাছে পৌঁছে গেল সুখবরের কথা। হইহই করতে লাগল সবাই। ভীষণ খুশিও হলো। কত দোয়া করল।
তারপর নিচে কিছুক্ষণ থেকে রুবাব রুমে যেতেই ঐশ্বর্য গুঁটি গুঁটি পায়ে
সামনে এসে দাঁড়াল। ছলছল চোখে তাকাতেই রুবাব দুই হাত প্রসারিত করতেই ঐশ্বর্য তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শব্দ করে কেঁদে উঠল। রুবাব খুশি না ভেবে প্রথমে ভয়ই পেয়েছিল। রুবাব ছলছল চোখে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ঐশ্বর্যের কপালে মাঝখানে আদর এঁকে দিলো। তারপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ আর কথা বলল না, বাক্য ব্যয় হলো না, অথচ বুঝে নিল দুজন দুজনকে, সদ্য জন্ম নেওয়া তাদের নির্মল অনুভূতিকে।

আজ সোমবার
১৩ই এপ্রিল ২০২৬
দিন গুনতে গুনতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলেই এলো। আজ শীতলের শুনানি। জেলা কোর্টের রায় মানতে পারেনি বিধায় নতুন করে হাইকোর্টে
আপিল করেছিল শুদ্ধ। আজ নতুন করে সেই কেসেরই শুনানি ঘোষণা হবে। পূর্বের মতো একবুক আশা নিয়ে চৌধুরী বাড়ির সবাই আদালতে উপস্থিত হয়েছে। অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে আদালতের মূল ফটকে দিকে। কারণ শীতলকে এখনো আনা হয় নি। মূলত তাকে দেখার জন্যই সবার মন ব্যাকুল হয়ে আছে। আধাঘন্টা পর পুলিশি পাহারায় শীতলকে আনা হলো। মেয়েটার হাতে হ্যান্ডকাপ নেই। পরনে ধূসর রঙের থ্রি-পিচ। মাথা নিচু করে হেঁটে একপ্রান্তে দাঁড়াল সে। তারই পাশে দাঁড়াল চারজন মহিলা পুলিশ। কথা বলতে গেলেও পুলিশ এলাও করবে না তাই অদূরে দাঁড়িয়ে দেখল সিমিন। তারপর আঁচলে চোখ মুছে নীরবে সেখান থেকে সরে এলেন।
এখন বাজে দুপুর একটা। সিরিয়াল অনুযায়ী শীতলের মামলা ৬ নম্বরে। আজ সারাদিনের কেসগুলো শেষ হতে প্রায়ই দুপুর গড়িয়ে গেছে। তাই
বিচারক জানিয়েছেন একেবারে লাঞ্চের পর শীতলেরটা ঘোষণা করবে।

ততক্ষণ অপেক্ষা! বরাবরের মতো শীতল চুপ করে বসে আছে আদালত প্রাঙ্গনে। এসে অবধি মুখ তুলে কারো দিকে তাকায়নি। মূলত তাকানোর সাহস হয়নি। সারারাত কান্নার ফলে চোখের পাতা ফুলে আছে। মুখটাও ফ্যাকাসে। দুরুদুরু বুক নিয়ে আবারও এসেছে নিজের ভাগ্যের পরীক্ষা দিকে। সে জানে না কি হবে। কী লেখা আছে ভাগ্যে। যখন থেকে শুনেছে আবার আপিল করা হয়েছে তখন থেকেই অঝরে কেঁদে যাচ্ছে। অজানা ভয়ে বুক কুঁকড়ে যাচ্ছে। ভীষণ ভয় লাগছে। ভয়টা মূলত শুদ্ধকে নিয়ে। কারণ মানুষটা একবুক আশা নিয়ে এখনো প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে। আশা ছাড়ে নি। হার মানে নি। যেখানে সে নিজে হাল ছেড়ে দিয়েছিল সেখানে
শুদ্ধ এখনো পূর্বের মতোই অটল। আজকেও যদি ফলস্বরূপ কিছু নাহয় তাহলে মানুষটা হয়তো একেবারেই ভেঙে পড়বে। আর তার ভেঙে পড়া মুখ সহ্য করতে পারবে না সে। মানতে পারবে না তার বিশুদ্ধ পুরুষের হার। ঠিক এই চিন্তায় ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। চোখের পানিতে পথ দেখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। সে যখন নিজের চিন্তায় মশগুল তখন শুদ্ধ এলো। মহিলা পুরুষগুলো হাসতে হাসতে একটু সরে দাঁড়াল। শুদ্ধকেও কিছু বলল বোধহয় শুনতে পেল না শীতল। একটা বেঞ্চের ওপর নিশ্চুপ
হয়ে বসে থাকতে দেখে শুদ্ধ বলল,

_’কংগ্রাচুলেশনস!’
একটুপরে কি হবে, না হবে, এটা নিয়ে চিন্তায় মাথায় কাজ করছে তার। অথচ এই লোক এসে কী না অভিনন্দন জানাচ্ছে। সে অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে দেখল ব্যাক্তিগত পুরুষটাকে। পরনে কালো শার্ট, ক্রিম কালার গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। চোখের নিচের কালিগুলো যেন র্নিঘুম রাতের সাক্ষী।
সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে পারল না। দৃষ্টি সরিয়ে ধীর লয়ে বলল,
_’কেন?’
_’কারণ আপনি ফুপি হতে যাচ্ছেন।’
_’জানি তো।’
_’না জানেন না। এবার আপনার রুবাব ভাই বাবা হতে যাচ্ছে।’
এই মুহূর্তে এমন সংবাদ পেয়ে শীতলের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার রুবাব- ঐশ্বর্যের দিকে তাকাল। মন থেকে বলল,
_’আলহামদুলিল্লাহ! আমার সব ভাই-বোনরা খুব ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক।’
_’আর বরটা বিরহের জলে ভেসে যাক।’
শীতল জবাব দিলো না। জবাব দেওয়ার ভাষা থাকলে না জবাব দিবে?
তখন শুদ্ধ তার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে পুনরায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

_’চোখ-মুখের এই হাল কেন? এ হাল দেখার জন্য এত কষ্ট করে যাচ্ছি?
বলেছি না আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ যেন চোখ দিয়ে একফোঁটা পানি বের না হয়। এসব দেখতে পারি না আমি। ভালো লাগে না আমার।
আমার কথা শুনতে ভালো লাগে না? আমার প্রতি একটু মায়াও হয় না তাই না? একটুও হয় না?’
শীতল দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। থুতনি গিয়ে ঠেকল গলার সাথে। ঠোঁটজোড়া কেঁপে উঠল। ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করেও নিজেকে
সামলাতে পারল না। নীরবে কাঁদতে লাগল। ফোঁটা ফোঁটা চোখের পানি ঝড়ে পড়ল কামিজের ওপর। কেঁদেছে বলে বকছিল অথচ এখন তারই সামনে কাঁদতে শুরু করল। এ পাগল-ছাগলের করবে কি সে? এটাকে নিয়ে কোথায় যাবে? কি করলে বুঝবে ও তারও ধৈর্য্যসীমা লিমিট ক্রস করতে শুরু করেছে। সে আর পারছে না। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারল না। বলতে যতটুকু স্থির আছে ততটুকুও থাকবে না। তাই নিজেকে
শক্ত খোলসে আবৃত করে মলিন হাসল। শীতলের মুখ তুলে চোখ মুছিয়ে দিতেই শীতল কান্নারত কণ্ঠে থেমে থেমে বলল,

_’কেন জানি খু্ব ভ..ভয় লাগছে।’
কথাখানা বলে শীতল পুনরায় ডুকরে কাঁদতে লাগল। তার ভয় লাগছে তাই কাঁদছে অথচ শুদ্ধ তাও পারছে না। বোঝাতে পারছে না এই মুহূর্তে তার ভেতরটা কেমন হচ্ছে। কি চলছে! সে নিজেও জানে না শীতলের জামিন না হলে এবার সে কি করবে? কীভাবে নিজেকে সামলাবে! আর স্বাভাবিক থাকার শক্তি থাকবে কী না তাও জানে না। তবে সময় আছে।
এতদূর এসে শেষমুহুর্তে যেন শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। তবুও সে বরাবরের মতোই নিখুঁতভাবে নিজের ভয়টুকু আড়ালে করে ফেলল। শীতলকে সাহস দিতে বলল,
_’ভয় নেই। আল্লাহ ভরসা।’
_’আজও যদি জামিন না হয়?’
_’আবার কোনোভাবে চেষ্টা করব।’
_’এভাবে আর কতদিন?’
_’যতদিন না, আমার সুখ আমি ফিরে পাব। যতদিন না, আমার শূন্য বুক পূর্ণ হবে। যতদিন না,আমার ভালো থাকাটুকু পরিপূর্ণভাবে আমার হবে।’

একথা শুনে শীতলের কান্নার বেগ বাড়ল। শুদ্ধর হাতটাকে আকড়ে ধরে হাতে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল। আজকাল বড্ড আফসোস হয় সে কেন আরো আগে শুদ্ধকে বুঝতে পারেনি?কেন তার পবিত্রভালোবাসার
গভীরতা বোঝেনি? কেন বোঝেনি, মানুষটা এত যত্ন করে ভালোবাসতে জানে। এত যত্ন করে আগলে রাখতে জানে। যদি আরো আগে ঘুণাক্ষরে টের পেতো তাহলে আরো বেশ কিছুদিন তারা একসঙ্গে থাকতে পারত।
তাদের জীবনে আরো সুন্দর সুন্দর কিছু মুহূর্ত যুক্ত হতো। আরো আগে
ভালোবাসার মানে বুঝতো। আবার কবে আসবে সুদিন? কবে বাড়িতে ফিরবে পারবে? কবে আদুরে বিড়ালছানার মতো প্রিয় পুরুষটার বুকে শান্তি খুঁজতে পারবে? আর যে সহ্য হয় না। আর না ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না!
শীতলকে এভাবে কাঁদতে দেখে বাড়ির সবাই অশ্রু ভেজা চোখে এদিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকমাস যাবৎ কাঁদতে কাঁদতেই দিন কাটে উনাদের।

এভাবে দেখতে পারে না শুদ্ধ-শীতলকে। কতদিন তাদের খুনশুটি মুহূর্ত দেখেননি। ঝগড়া করতে দেখেননি। মুখে না বললেও তাদের চালচলনে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দৃশ্য চোখে পড়েনি। কই সেসব সুখ? কোথায় হারাল সেসব দিন? উনারা সবাই আজ সৃষ্টিকর্তার কাছে
ফরিয়াদ জানাল এবার যেন এই দুটো প্রাণ এক হতে পারে। ছেলে-মেয়ে দুটোর কেউই ভালো নেই। পৃথিবীর সমান সুখ এনে দিলেও তারা ভালো থাকবে না। হাসবেও না। যদিও না দুজন দুজনকে পাশে না পায়। সায়ন ঘাসের ওপর দুই পা মেলে দিয়ে বসে পড়েছে। দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চঞ্চল দুটি প্রাণের দিকে। যাদের প্রণয়ের সূচনা হয়েছিল তারই হাত ধরে। যারা ভালো না বাসার পণ করেও পাগলের মতো দুজন দুজনকে ভালোবেসেছে। প্রত্যেকদিন ঝগড়াঝাঁটি-মারামারি করে কেউ কাউকে দেখতে না পারার অভিযোগও জানিয়েছে। অথচ ভাগ্যের ফেরে আজকে তারাই একে অপরের কাছে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। অথচ তাদের প্রণয়ের সূচনা হওয়ার আগেই বলেছিল, এমন একদিন আসবে যেদিন দুজনকে চোখে হারাবে। পাগলের মতো ভালোবাসতে শিখবে। এরা দুজনই হবে তার দেখা বেস্ট কাপল। সব মিলে গেছে। তার প্রতিটা বাক্য অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে।

পণ ভঙ্গ করার অপরাধে খুব করে অভিশাপ দিতেও ইচ্ছে করছে, তারা যেন আর কখনো আলাদা না হয়। কখনো কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে না পারে। জীবনের বাকি দিনগুলোতে অনাবিল সুখ যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
এখন যেমন ওরা দুজন দুজনের শক্তি হয়ে আছে সারাজীবন যেন তাই থাকে।
ঘড়িতে সময় দুইটা বেড়ে দশ মিনিট। কিছুক্ষণের মধ্যেই আদালত কক্ষে যেতে হবে। বিশাল মাঠের মধ্যে শারাফাত চৌধুরী, সাফওয়ান চৌধুরী, সায়ন-স্বর্ণ, রুবাব -ঐশ্বর্য, অর্ক-শখ, সিতারা, সিমিন, সিরাত, আজম, সাম্য-সৃজন, হাসান, স্যান্ডি, কামরান কেউই বাদ নেই। আজকে সবাই এসেছে। সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সবার চোখে জল। সবার মনে ভয়। সবার একটাই চাওয়া এবার ভালো কিছু হোক। কান্না ভেজা চোখে আদালতে প্রবেশ করলেও সবাই যেন হাসিমুখে বের হোক। এসে গেল সেই ক্ষণ! শুদ্ধর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে চোখে মুছতে মুছতে
আদালত কক্ষে প্রবেশ করল শীতল। দাঁড়াতে হলো আসামি কাঠগড়ায়।
চৌধুরী বাড়ির বড়রা আদালতকক্ষে প্রবেশ করলেও বাকিরা মাঠে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। কারণ সবাই প্রবেশের অনুমতি পেল না। কক্ষে বিচারক প্রবেশের আগ মুহূর্তে অহেতুক কথা না বলার সাবধানবার্তাও জানানো হলো। একটুপরেই বিচারক এলেন। বসলেন নিজের আসনে।

বিচারকার্য শুরু হলো। পুরো কক্ষে তখন পিনপতন নিস্তব্ধ। শুদ্ধ আজও নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। শীতলের মুখ দেখে টেনশন যেন দ্বিগুন বেড়ে গেছে। দরদর করে ঘামছেও। এক বছরের রায় তার বুকে বিশাল বড় পাথর তুলে দিয়েছিল। এক বছর শীতলকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবতে পারেনা সে। পারবেও না থাকতে। যার কারণে আজ আবারও এখানে উপস্থিত হতে হয়েছে। আজকের রায় হয় তার বুকের পাথর সরাবে নতুবা আরো বড় পাহাড় তুলে দিবে। তবে এর শেষটা দেখেই ছাড়বে! ​এক পর্যায়ে বিচারকের রায় ঘোষনার সময় ঘনিয়ে এলো। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শীতলের দিকে তাকালেন। শীতল তখন উনার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হলেও চোখ সরাল না। ভয় পেয়ে মাথা নতও করল না। তা দেখে বিচারক পুনরায় ফাইলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। পূর্বের রায়ের কাগজগুলো বেশ সময় নিয়ে দেখলেন। অতঃপর এক পর্যায়ে মৃদুস্বরে গলা খাঁকারি দিয়ে রায় ঘোষণার প্রস্তুতি নিলেন। আদালত কক্ষ তখন একেবারেই নীরব। শুধু শোনা যাচ্ছে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের শব্দ। বিচারক
এবার গুরু গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন,

_’তদন্ত রিপোর্ট এবং জেলা আদালতের নথি পর্যালোচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সংঘটিত অপরাধটি ছিল তাৎক্ষণিক এবং সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক। পরিস্থিতির শিকার হয়েই আসামি চরম পথটি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল।’
​এইটুকু শুনেই শুদ্ধর নিঃশ্বাস যেন আটকে এলো। সে হাতের মুঠো শক্ত করে শীতলের মুখের দিকে তাকাল। শীতলও তখন নিস্প্রাণ, ফ্যাকাসে মুখে পাথরের মতো চেয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। এখন যে রায়ই আসুক না কেন, তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখানে তাদের কোনো হাতও নেই; কিছু বলারও নেই, কিছু করারও নেই। বিচারক তখনো গম্ভীর কণ্ঠে বলে চলেছেন,
_​’ এবং নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস অবৈধভাবে নিজের কাছে রাখার অপরাধে আসামিকে আরও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হলো।
একই সাথে আসামির বয়স, সামাজিক পটভূমি এবং মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে জেলা আদালতের পূর্ববর্তী সাজা বাতিলপূর্বক তাকে সসম্মানে খালাস দেওয়া হলো। আসামিকে এখন থেকে নিজ গৃহে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হলো।’

এইটুকু শুনেই চোখের পাতা বন্ধ করতেই শুদ্ধর চোখ দিয়ে অঝরে অশ্রু ঝরে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যে করছে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দুই চোখে পানি নিয়ে তার ঠোঁটে ফুটল বিজয়ীর হাসি। অবশেষে সে পেরেছে, পেরেছে অভিলাষীকে নিজের কাছে ফেরাতে। ফিরে পেয়েছে তার সুখ, হাসি-ভালো থাকাটুকু। ​পুরো কক্ষে তখন সবার চোখে আনন্দ অশ্রু ঝরছে। বিচারক নিজের রায় ঘোষণা শেষ করে উঠে চলে গেলেন।
উনি যেতেই শীতল কাঠগড়ায় মাথা ঠেকিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। ওর কান্না পুরো কক্ষের দেওয়ালে দেওয়ালে যেন প্রতিধ্বণি হলো। বুকফাটা কান্না এত করুণ হয়? বোনকে এভাবে কাঁদতে দেখে সায়ন, রুবাব ছুটে গিয়ে বোনকে বুকে আগলে নিলো। বোনকে থামাবে কি? কিছু বলার মতো অবস্থায় আছে কি তারা? নেই তো! এতক্ষণ বহুকষ্টে দম আটকে বসেছিল। শীতল থামছে না, তাকে থামানো যাচ্ছে না দেখে নিজেরাও উচ্চশব্দে কাঁদতে লাগল। তাদেরকে কাঁদতে দেখে শারাফাত চৌধুরী, সাফওয়ান চৌধুরী, সিতারা, সিমিন, সিরাত দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন। গুঁটি গুঁটি পায়ে এগোলো স্বর্ণ, শখ আর ঐশ্বর্যও। শুধু চুপ করে অনড় সেভাবেই বসে রইল শুদ্ধ। কাদুক সে, প্রাণখুলে কেঁদে নিক। কেঁদে কেঁদে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো হালকা করে নিক। এতদিন যে কষ্টে গুমড়ে মরছিল সেসব কষ্ট এখানেই মাটিচাপা দিয়ে দিক। সে চুপ করে শুনল শীতলের হৃদয়বিদারক কান্না, কান্নামিশ্রিত সুরে বলা প্রতিটা কথা, প্রতিটা বাক্য। শীতল তখনো সায়নের হাত আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে বলেই যাচ্ছে,

_’আমি কোন সাহসে বাড়িতে যাব ভাইয়া? কি করে ওই বাড়িতে ঢুকব? আমার, আমার বাবা আর ওই বাড়িতে নেই, ভাইয়া! বাড়ি গিয়ে কাকে ‘বাবা’ বলে ডাকব? কে আমার ডাকে ছুটে এসে বুকে আগলে নেবে? আমি কাকে আমার কষ্টের দিনগুলোর কথা জানাব, ভাইয়া? শেষবার যখন বাড়ি গিয়েছিলাম আমার বাবা কাফন পরে কত আরামেই না ঘুমাচ্ছিল। কত ডাকলাম, উঠল না। মাথায় হাত রেখে বলল না ‘কাঁদে না মা। বাবা সব সময় তোমার সঙ্গে আছি।’ ভাইয়া, আমার বাবা আমাকে ফাঁকি দিয়েছে ভাইয়া। আমার বাবা আমার ফেরার অপেক্ষা করে নি। আজ মুক্তি ঠিকই হলো শুধু আমার কলিজার টুকরো বাবাকে হারিয়ে ফেললাম। আমি আর পাব না আমার বাবাকে। আর দেখতে পাব না আমার বাবার হাসিমাখা মুখ। আর পাব না বাবার গায়ের গন্ধ। আমি, আমি এই অভাব কি দিয়ে পূরণ করব! কি করে এই আফসোস মেটাবো আমি। কাকে ডেকে আমি আমার কলিজা ঠান্ডা করব!’
তার করা আকুতিতে উপস্থিত প্রতিটা সদস্য অঝরে কাঁদতে লাগলেন। অবাক করা ব্যাপার এক কোণে দাঁড়ানো পুলিশরাও কাঁদছে। বুকে গিয়ে যেন লাগছে শীতলের প্রতিটা কথা। তার জায়গায় না দাঁড়ালেও কথাতে হৃদয়খানা এফোঁড়ওফোঁড় করে দিচ্ছে। শুদ্ধ আর বসল না। চোখ মুছতে মুছতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। আর যেতে যেতে মনে মনে বলল,

‘কেঁদে নে ব্যাঙাচি! মনপ্রান খুলে কেঁদে নে। এটাই যেন তোর জীবনের শেষ কান্না হয়। তোর কান্না বড্ড বিধ্বংসী রে। আমার ভেতরটাকে ভেঙে চুরে একাকার করে দেয়।’
এদিকে বাইরে অর্ক, হাসান, কামরান, আজম, অর্ক, সাম্য, সৃজন অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল। টেনশনে তাদের বেহাল অবস্থা। শুদ্ধ কক্ষ থেকে বেরিয়ে মাঠে আসতেই তাকে ঘিরে ধরল। শুদ্ধ শুধু সম্মতিসূচক মাথা নাড়াতেই তারা একসুরে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আলহামদুলিল্লাহ!’
টেনশনে একেকজন ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। আজম মাঠেই ধপ করে শুয়ে পড়ল। তার খাৎনা করার সময়ও এতটা টেনশন করে নি।
ততক্ষণে আসরের আজান হয়ে গেছে। ঘড়িতে তখন চারটা বেজে বিশ মিনিট। শুদ্ধ ঘড়িতে সময় দেখে দ্রুতপায়ে অফিসারের কাছে ছুটলো।

শীতলের বাড়ি ফেরা নিয়ে কথা তুলল। কিন্তু যে ভয় পাচ্ছিল অবশেষে
সেটাই হলো। যতই জামিন হোক আজ বাড়ি ফেরা হচ্ছে না শীতলের।
কারণ জামিন হলেও রিলিজ অর্ডার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। সেটি কেন্দ্রে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রিলিজ অর্ডার গ্রহণের সময় শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যার পর বন্দিকে দেখার করার সুযোগ দেয় না।
সেখানে বাড়ি ফেরার আশা করা একেবারে অযৌক্তিক। এটাই নিয়ম।
বছর বছর না যুগ যুগ ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। তারা নিয়মের বাইরে যেতে পারবে না। আজকের রাতটুকু নাহয় কেন্দ্রে কাটিয়ে আগামীকাল সকালে বাড়িতে ফিরবে। এতদিন এত কষ্ট করল আরও একটু করুক।
শুদ্ধর বলার কিছু রইল না। বোঝাতে পারল না তার মনের অবস্থা। তবে এটাই স্বস্তির কথা জামিন হয়ে গেছে। এদিকে অফিসারের হুকুম পেতেই
মহিলা পুলিশ শীতলকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদালতকক্ষ থেকে বের হলো। বাড়ির বাকি সদস্যরাও পেছন পেছন বেরিয়ে এসেছে। শুদ্ধ তাদের দিকে এগিয়ে গেল। শীতল কেমন রিয়েক্ট করে কে জানে। তাও সে হাসিমুখে বলল,

_’আসরের আজান পড়ে গেলে কেন্দ্রে যেমন দেখা করতে দিতো না ওই নিয়ম এখানেও।’
_’ছাড়বে না?’
_’আর একটা রাতের ব্যাপার।’
শীতল কিছু বলল না শুধু ঘাড় কাত করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল।
তখনই সাম্য ডেকে উঠতেই শীতল ডানে তাকাতেই দেখতে পেল সায়ন, রুবাব, অর্ক, আজম, কামরান, হাসান, সাম্য, সৃজন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কিছু বলার আগে সবাই হাত তুলে ইশারায় স্যালুট করল।
অর্থাৎ অনেক কষ্ট-যুদ্ধে শেষে তোমার কঠিন পথযাত্রা শেষ। তুমি মুক্ত। তুমি বিজয়ী! তুমি সাহসী। একজন সাহসী বোন হয়ে ভাইয়ের বিপদে রুদ্রাণীরুপে আর্বিভাব হওয়ার জন্য তোমায় সালাম। তাদের এহেন কান্ডে শীতলের চোখজোড়া জলে ভরে গেল। কতদিন পর মন খুলে হাসল। যাওয়ার সময় হয়ে গেছে তাই পা বাড়াতেই অর্ক হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল,

__’হেই শালিকা, কাল কি তাহলে আরেকবার সাজাব?’
__’কি?’
__’আমার বন্ধুকে, বরবেশে।’
একথা শুনে শীতল তাকাল শুদ্ধর দিকে। অনেকদিন পর তার গাল দুটো লজ্জার লালিমা দেখা গেল। বাকিরা হেসে ফেলল এভাবে লজ্জা পেতে দেখে। শীতল আর দাঁড়াল না ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে গেল।
আর শুদ্ধ তখনো দুই পকেটে হাত গুঁজে সময়ের হিসাব কষতে লাগল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৫

আজ বিকাল পাঁচটা থেকে আগামীকাল সকাল দশটা অর্থাৎ আর মাত্র ষোলো ঘন্টা। এই ষোলো ঘন্টা কাটাতে পারলেই শীতলকে তৃষ্ণার্ত বুকে
জড়িয়ে নিতে পারবে। বুকভরে শ্বাস নিতে পারবে। এতদিনের সব কষ্টের সমাপ্তি ঘটবে। অসময়ের মেঘ কেটে তাদের সবার জীবনে সুসময়ের সূর্য উঠবে।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ বোনাস পর্ব 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here