Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৬

রাগে অনুরাগে পর্ব ৬

রাগে অনুরাগে পর্ব ৬
সুহাসিনি ফাতেহা

“আপনি বড্ড বোকা নারী! পানিতে থেকেও জেনে বুঝে জ্বলন্ত আগুনে পা দিয়েছেন !”বেয়াদব মেয়েটা বোধ-হয় জানে না সে লঙ্কা মরিচ হলে ফারাজ খান বোম্বাই মরিচ। লঙ্কা মরিচ বেশি পুড়লে নিজেই ছাই হয়ে যায়। আপনি ছাই হতে চাইলে আমার কিছু করার নেই।”
“আফসোস আপনার জন্য আমার দুঃখ লাগে। মেয়ে মানুষ এত বাঁচাল পেঁচাল হলে মানায় না।”
বিরবির করে যুবক থামলেন । মোবাইল টা বিছানায় রেখে দিলেন।

একটু সময় নষ্ট না করে
পাঞ্জাবি প্যান্ট পরে যুবক আয়নার সামনে দাড়িয়ে ঝটপট রেডি হয়ে নিলেন।
নিজের পছন্দের পারফিউম গায়ে মেখে নিতেই ফারাজের চাচাতো ভাই আলভী ওর রুমে ডুকলো।
অয়নদের বাড়ি আগে ফারাজ খানদের ও বাড়ি ছিলো। এখনো আছে। প্রতিটা রুম এখনো যার যার রয়ে গেছে। এই দুতালা বিশিষ্ট বিশাল ভবন টা তাদের দাদার বানানো। বছর দুয়েক আগেও ওনারা সবাই একান্নবতী ফ্যামিলি ছিলেন। ফারাজ খানের বাবা আফজাল খান আলাদা বাড়ি করেছেন। এখন সেখানে থাকেন। কিন্তু চাচাতো বোনের বিয়ের উদ্দেশ্য পুরো পরিবার আবার এক হয়েছেন।
আলভী ও সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরেছে। এক কথায় বাড়ির সব পুরুষ আজকে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরবে। ফারাজ হাতে ঘড়ি লাগাতে লাগাতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তুই এখানে কেন? আমি এখন বের হতাম।”

ফারাজের কথার বিশেষ একটা পাত্তা দিলো না আলভী। বরং ঠাট্টার সুরেই বলল,
“কি ব্রো বয়স তো কম হলো না। বিয়ে-শাদি করবি কবে? নাকি বুইড়া হইয়া স্যারগিরি করেই মরবি। এখনই তো বউ নিয়ে হানিমুনে যাওয়ার বয়স। তোর দশ বছরের ছোট চাচাতো বোনের বিয়ে খাইতেছিস! নিজের বিয়ার খবর নাই। লজ্জা করে না একা একা ঘুরতে? নাকি কেউ পছন্দই করে না তোরে?” হাহা হা—- আলভী জিভ কামড়ে ধরলো। ভাবনা আল্লাহ — ফারাজ যেন কিছু না বলে…..”
ঠেস লাগানো কথা শুনে ফারাজের চোয়াল শক্ত হলো। ফারাজ খান এগুলোকে নিয়ে আর পারছে না। নিজের পার্সোনাল বিষয়ে কারোর বা হাত ডুকানো পছন্দ না। অথচ তাও পাঞ্জাবির দু হাতা কনুই পর্যন্ত গুঁটিয়ে নিতে নিতে ঠোঁঠ বাঁকিয়ে বললেন,
“তোর মতো বাপের টাকায় হানিমুনে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আর বউ? ফারাজ খানের বউ হওয়া এত সহজ না । যে মেয়ে সহ্য করতে পারবে সে নিজেই আসবে।”
“কোনদিন আসবে সে সাহসী ভাবি। সাতাশ বছর তো হয়ে গেলো এখনো তো কোনো মেয়েকে আসতে দেখলাম না।”

“আমার বিয়ে নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না! তুই বরং তোর বউয়ের চিন্তা কর। শুনলাম তোর বউরে ধরলেই নাকি চিল্লানি দেয়! বউ সামলাতে পারিস না। আগে নিজে পুরুষ হ তারপর কথা বলিস।”
আলভী থতমত খেয়ে গেলো। ফারাজ কে খোঁচা দিতে এসে নিজেই খোঁচা খেয়ে বসলো। অবশ্যই ফারাজ সচারচর অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। আর যখন বলে তখন সামনের ব্যক্তিটার মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ধুঁয়ে দেয়। এখনও হলো তাই। আলভী আফসোস করলো কেন যে কাল সবাইকে বলতে গেলো না বললে এখন এই কথা শুনতে হতো না। দুঃখের সহিত বলল,
“তুই আজীবন সন্নেসী হয়ে থাক ভাই! তোকে বিয়ে করতে আর কখনো বলবো না।”
ফারাজ না চাইতেই ক্রুর হাসলো। ভালোমতে তেল মালিশ করে দিতে পেরেছে না হেসে পারে !

ঘড়ির কাঁটায় এখন দুপুর একটা বিশ মিনিট। ত্রিশ মিনিট হয়েছে তিতলি দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে বাড়িতে এসেছে। আসার পর আর ফারাজের সামনে পড়ে নি। পড়েনি বললে ভুল হবে বরং তিতলি ফারাজ কে দেখেই নি।
বিয়ে বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী আগে কনে পক্ষের সবাইকে ভাত খাওয়ানো হয়। বাহিরে বিশাল প্যান্ডেলের ভেতরে খাবার খাাওয়ার জন্য আয়োজন করা হয়েছে। তিতলি ইতিমধ্যেই খাওয়া শেষ করে ফেলছে। অয়নের বোন কনে আয়েশার সাথে। আয়েশার দুইটা বান্ধুবি সহ রুপসা, ঝিলিক ওরা ও আছে। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের দিন কনের সাথে বড় থালা করে পাঁচ-ছয় জন একসাথে খাওয়া হয়। সেখানে তিতলি কেও খেতে বলেছেন রুমানা বেগম। তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিয়েছে।
আয়েশা কে খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। মেরুন রঙা লেহেঙ্গার সাথে ভারী জুয়েলারি সহ মেকআপ সব মেয়েটার ফর্সা শরীরে দাড়ুন মানিয়েছে। ফার্লারের মেয়েরা সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। তিতলি মিষ্টি কণ্ঠে বলল,

“আপু তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে? ভাইয়া তো চোখ ফেরাতেই পারবে না। নিশ্চিত দেখার পর ছোটখাটো হার্টএটাক করবেন।”
আয়েশার মুখটা লজ্জায় লাল নীল হয়ে গেলো।
পাশ থেকে ঝিলিক বলল,
“আজকে দুলাভাইকে নগদ ত্রিশ হাজার ছাড়া বউ নিয়ে যেতে দিবো না।”
“তোরা পারলে নে। আমার মনে হয় বাবা,ভাই ধরেবেঁধে এক কিপ্টের সাথে বিয়ে দিচ্ছে? তোদের চার পয়সা ও দিবে না মিলিয়ে নিস।”
“হয়ছে নাটক করতে হবে না। জামাইর টাকা বাঁচাতে পারবে ভবিষ্যৎ এ।”
কিছু একটা ভেবে তিতলি আচমকা বলল,
“আচ্ছা রুপসা আপু ফারাজ খান এই বাড়ির কি কোনো আত্মীয় হয়?”
রুপসা, ঝিলিক, আয়েশা ওরা তিনজনই মুখ হা করে ফেলল। যেন ওরা বিশেষ কারো নাম শুনছে। রুপসা বলল,
“আরে ফারাজ ভাইয়া তো আমাদের কাজিন। বড় চাচুর ছেলে।”
তিতলি নেত্রযুগল কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে যেন। অবাকে অত্যন্ত হতবিহ্বলে বলল,
“কি বলছো আপু?”

“ফারাজ ভাইয়া যে রাগী। আমাদের তো বাহিরের কোনো ছেলের সাথেই মিশতে দেয় না। একবার আয়েশা আপুকে রাস্তায় একটা ছেলে….. ”’
ঝিলিক আর কিছু বলতে পারলো না….
ওদের কথার মাঝেই বাহিরে হৈচৈ শুরু হয়ছে
বরপক্ষ চলে এসেছে।
ঝিলিক, রুপসা, কথা ফেলে তিতলি কে টেনে নিয়ে গেলো। আজকে দুলাভাইয়ের থেকে টাকা না নিলেই নয়।
সত্যি ওরা তিনজন একপ্রকার তর্কবিতর্ক করেই ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে এলো। ভাগ্যিস ফারাজ খান সেখানে ছিলো না।

তিতলি একটা কালো সানগ্লাস পড়ে পড়ে হাঁটছে। সানগ্লাস টা ফর্সা মেয়েটাকে একদম দাড়ুন মানিয়েছে। নরম অধর জোড়ায় রক্তে রাঙা লাল টকটকে লিপিস্টিক টা যেন কালো সানগ্লাসেরর নিচে জ্বলজ্বল করছে। সপ্তাদশী ফুরফুরে মনে বাড়ির ভেতরে চলে যাবে এমন সময় ফারাজ খানকে তারই সামনে দিয়ে যেতে দেখলো তিতলি। ভাবখানা এমন যেন তিতলি কে দেখেইনি। তিতলি কেন যেন মুখ ফসকে ডেকে উঠলো।
“আরে আপনি পাঞ্জাবি পড়েছেন নাকি?”
মেয়েলী কণ্ঠ শুনে ফারাজের পা জোড়া থেমে গেলো। ঘাঁড় বেঁকিয়ে পেছনে ফিরে দেখতে ফেলো সপ্তাদশীর হাসোজ্জল মুখখানা। মেয়েটার এত হাসি কেন যেন ফারাজের সহ্য হলো না। যুবক বিরক্ত চোখে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। এই মেয়েকে কিছু না বললেই নয়। লম্বা কদমে এদকম রমনীর মুখামুখি দাড়ালেন।
লোকটার মুখখানা সে কি গম্ভীর। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। পাঞ্জাবিতে সুদর্শন পুরুষটার রূপটা যেন এবারে চোখে ষোলো আনাই ফুটছে।
ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“তো কি জাহিঙ্গা পড়েছি? আমি কি পড়েছি সেটাও আপনাকে মুখে বলতে হবে? আপনি কি চোখ হাতে নিয়ে হাঁটেন নাকি?”

“দেখেন না সানগ্লাস পড়েছি। সব কালো কালো দেখতে পাচ্ছি। আপনাকেও কালো কালো দেখাচ্ছে। ”
ফারাজ ভ্রু বাঁকাল, চড়া কণ্ঠে জানাল,
“ একটা থালা এনে দিবো” বিয়ে বাড়ির গেইটে দাড়ালে সবাই অন্ধ ভেবে দয়া করে দু পয়সা দিলে চোখের চিকিৎসা করিয়ে নিবেন।”
“আমি অন্ধ না বুঝছেন? এটা স্টাইল। দেখুন না আমাকে কত সুন্দর লাগছে তাই না?”
তিতলির এই একটাই স্বভাব সে যেই কাউকে বলবে —“ এটা আমাকে খুব মানাবে তাই না…. আমাকে খুব সুন্দর লাগছে তাই না…..”
হঠাৎ পাশ থেকে পুরুষালী কণ্ঠে কেউ বলে উঠল,
“একদম আগুন সুন্দরী।”

ফারাজ, তিতলি দুজনেই সেদিকে তাকালো। বর পক্ষের একটা চিকন গরনের ছেলে। বয়স কি বাইশ তেইশ হবে। তিতলির দিকেই তাকিয়ে আছে। ফারাজ খান একবার তিতলির দিকে তাকালো ফের ছেলেটার দিকে।
তিতলি পাল্টা জবাব দিলো ছেলেটাকে,
“আমি জানি আমি আগুন সুন্দরী এটা সবাই বলে—- আপনি নতুন কিছু বলেন ভাইয়া….”’
ফারাজ খান আচমকা তিতলির একদম কাছে চলে আসলো। দুইঞ্চি সামান্য ফাঁক রেখে দাড়িয়ে ফের ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা থতমত খেলো যেন। অন্যের পার্সোনাল টাইম ভেবে মুহূর্তেই সেখান থেকে চলে গেলো। এদিকে তিতলি শ্বাস-প্রশ্বাস বেরিয়ে আসার যোগাড়। সে দ্রুত একপা দু পা পিছিয়ে গেলো। সপ্তাদশীর মুখপানে চেয়ে ফারাজের ঠোঁটের কোণে বাঁক এলো। বলল,
“এত খুশি হওয়ার কিছু নেই মিস তিতলি! ফারাজ খানের রুচি এতটা খারাপ না যে বেয়াদব মেয়ের দিকে নজর দিবে আপনার মতো মেয়ে ফারাজ খানের পছন্দের লিস্টে আসতেও দশ জনম লাগবে। আফসোস ততদিন আমি বাঁচবো ও না। তাই কুল ডাউন!”

“কথায় কথায় ঠেস না মা’রলে আপনার হজমশক্তিতে সমস্যা হয়, সেটা তো বলতে পারেন।”
একটু থেমে স্রেফ বললো,
“আর আমার বয়েই গেছে!” না আপনার নজরে পড়তে চাই” আর না আপনার পছন্দের তালিকায়!
ঘাড়ত্যাড়ামি বশত কথাটা বলে তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৫

ফারাজ মেয়েটার ত্যাড়া কথা উপেক্ষা করলো। বেয়াদব মেয়েটাকে হুকুম ছেড়ে থামল,
“আপনার বেয়াদবি সহ্য করার ধৈর্য আমার নেই মিস তিতলি। ফারাজ খানকে কে জ্বালাতে এসে যেন নিজেই জ্বলে না যান। তিনি মাঠে নামলে তখন আপনার পালানের জায়গা থাকবে না।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here