অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৮
Maha Aarat
গুণে গুণে তিন বসন্ত পেরিয়েছে।সময় বদলেছে ,বদলে পরিস্থিতি ,নিভে গেছে অতীতের কোলাহল।স্মৃতি জমে ভরপুর ,বর্তমানের ব্যস্ততা।ভালোবাসার নতুন রূপ,সম্পর্কের স্ফীতি,সময়ের ব্যবধান সবকিছু মিলিয়ে পুরনো গল্পতে যোগ হয়েছে ভিন্ন আবহ।পুরনো গল্পগুলো জমে আছে আগের মতোই,ভালোবাসার আদি থেকে অন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রেমযুগলের হৃদয়ে।আলপনার খামে খামে,ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে প্রণয়ের গল্পগুলো।বিরহে ডুবে যাওয়া সূর্যাস্ত বা ভালোবাসার নতুন ভোর,কোনোটাই বাদ যায়নি।তবে ব্যস্ততার কোলাহলে পুরনো স্মৃতিতে ডুবে যাওয়ার মুহুর্ত কমেছে।
উমায়ের-আরহাম-মাইমুনার পরিবারে নতুন অতিথি এসেছে।দাদূর আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ানো উমার যেনো আরহামেই কার্বন কপি।আর উমাইজা সম্পূর্ণ আইরার মতো ছটফটে,চঞ্চল,জেদী।টুইন হওয়ায় তাদের মুহুর্তে মুহুর্তে ঝগড়া লেগে যায়।হাফসা ক্লান্ত তাদের ঝগড়া থামাতে।তাই বেশীরভাগ সময় এড়িয়ে যায় সে।তাই বাবা ফিরলেই সব অভিযোগের আসর বসে।আরহাম সম্পূর্ণ মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রেখে তাদের কথা শুনেন,সমাধান দেন।তাতেই তারা খুশি হয়ে যায়।অথচ রুমে ফিরতেই শুরু হয় আরেকদফায় অভিযোগ।সারাদিন বাচ্চাদের দূষ্টামি আর চাঞ্চল্যেতা সামলাতে হিমশিম খাওয়া হাফসাকে সামলাতে হয় আরহামেরই।তাকে স্বান্তনা দিতে তিনি বলেন, ‘আপনি বাচ্চাদের সামলাচ্ছেন আর আপনাকে সামলানোর দায়িত্ব আমার।’
ডিসেম্বরেরর শীতের সকালে, ঠান্ডা বাতাসে যেন সময় থেমে আছে।প্রকৃতির প্রতিটি কোণে হিমবাহের নরম স্বর্গে অবগুণিত সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।আকাশ এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।তার গায়ে ছড়িয়ে আছে সোনালি আলো আর ধোঁয়াটে কুয়াশার মিশেল। চারপাশে একধরনের গাঢ় স্তব্ধতা—যেন প্রকৃতি নিজেই কম্বলে মুখ গুঁজে রেখেছে।দূরের রাস্তার উপর দিয়ে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা বয়ে যাচ্ছে ধীরপায়ে, ঠিক যেন কোনো গোপন দুঃখ নিয়ে হেঁটে চলেছে একলা পথিক।
গাছে গাছে শিশির জমেছে রাতভর।পাতার কিনারায় টুপটাপ করে জমে থাকা পানির বিন্দুগুলো আলোর স্পর্শে হীরের মতো ঝিকমিক করে উঠছে।ঘাসের ডগায় জমে থাকা শীতের ঠাণ্ডা ফোঁটাগুলো পায়ের স্পর্শে কেঁপে ওঠে।যেন সকালে কারো হাঁটার শব্দেও তারা জেগে উঠতে ভয় পায়।
জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিররেখা, পাতাঝরা জামগাছের নিচে সেঁটে থাকা কুয়াশা, আর উঠোন জুড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া—সব মিলিয়ে এক মোহনীয়, গা ছমছমে সকাল।
শহরের আর দশটা ধনী পরিবারের মতো প্রাচুর্যে ঘেরা বাড়ি হলেও, এই শীতের সকালেও উঠোনের সাদামাটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন এক অনন্য শান্তি এনে দেয়।
ছোট্ট উমার আর উমাইজা কমফোর্টার মুড়ি দিয়ে দাদুর বিছানায়।উমার, যার ঠোঁটে এখনো সব শব্দ গোটা গোটা উচ্চারিত হয়,দাদুর দিকে গোল চোখে তাকায়।আধোবুলিতে কথা বলা শিখছে।
মাম্ মাম’ উচ্চারন করে আমচকাই ভেটু ভেঙে কাঁদতে শুরু করে।দাদাজান মাত্র এদিকেই আসছিলেন।দাদাভাইয়ের কান্না শুনে আহ্লাদে কোলে তুলে নিলেন তৎক্ষনাৎ।তার চোখেমুখে গুটিকয়েক চুমু এঁকে দিয়ে বললেন , ‘মাম্মামকে তো এখন পাওয়া যাবে না উনি তো ব্যস্ত আম্মুর কাছে যাওয়া যায়?’
উমার কান্না থামালো।গোল গোল চোখে আরেক পলক তাকিয়ে আবারও ভাঙা স্বরে উচ্চারণ করলো, “মাম্ মাম দাই(যাই)”
অতপর আবারও কান্না শুরু করলো।সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে,মাম্মামের কোল পাওয়া যাবে না এখন।উমাইজা এতক্ষণ dummy মুখে চুপচাপ বসে থাকলেও ভাইয়ের মতো সেও আবার হাঁক ছেড়ে কান্না ছাড়লো।
হাফসা ব্যস্ত কিচেনে।গ্যাসে চাপানো বিরিয়ানির হাঁড়ি থেকে উঠে আসছে দারুচিনি-এলাচ-ঘিয়ের এক মোহময় গন্ধ।
এই রান্নাটা সে নিজের জন্য নয়, আরহামের জন্যই করছে।
যার একটু হাসি, একটুখানি প্রশংসা পেলেই হাফসার চোখের ক্লান্তি ঝরে যায়।
আলাদা আরেকটা পাতিলে সে মুগডালের খিচুড়ি বসিয়েছে বাচ্চাদের জন্য।শোনা যাচ্ছে তাদের কান্না কিন্তু এ মুহূর্তে তাদের কাছে গেলে উনি না খেয়েই বেরিয়ে যাবেন।
চিকেন ছোট ছোট করে সেদ্ধ হয়ে ফুটছে, কিশমিশ দিয়ে সাজানো রান্নাটা যেন তার ভালোবাসার পরশ।ড্রয়িং রুমে উনার খাবার গোছাতে গিয়ে নজরে পড়লো উনাকে।হাফসা ক্ষনিকের জন্য যেনো মোহবিষ্ট হয়ে পড়লো।ঘড়ির হুক লাগাতে দ্রুত পায়ে নামছেন আরহাম।সাদা জুব্বার সাথে কালো লং কোট,কালো পাথরবসানো টুপিটা দূর থেকেও কেমন চিকচিক করছে।এই সাজেই যেন কোনো এক দ্বীনি আভা এসে জড়িয়েছে উনাকে।একটা স্বচ্ছ, কোমল নূর ছড়িয়ে আছে চেহারায়।দুর থেকেই নাকে আসছে ,আঁতরের চমৎকার খুশবু।
আরহাম মাইমুনার ঘরে ঢুকলেন।হাফসা সার্ভ করছিলো খাবার।মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনি হাজির হলেন টেবিলে।হাফসাকে একটা উষ্ণ আলিঙ্গন দিয়ে বললেন , “ঠান্ডার মধ্যে কিচেনে আর যেনো না দেখি।বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগবে।”
বলতে বলতেই হাত ধুঁতে প্রস্তুত হতেই হাফসা গরম পানি এনে দেয়।আরহাম হালকা হেসে বলতে লাগলেন ,
“ঘ্রাণেই বুঝা যাচ্ছে, আজ আমার প্রিয় মেনু?”
হাফসা ঢাকনা তুলতেই আরহাম একগাল হাসেন।মাত্র তিন চার লোকমা মুখে তুলে বলেন,
“আল্লাহু আকবার এতো টেস্ট! মাশাআল্লাহ।”
হাফসা পুলকিত হলো।আরহাম হাফসার মুখে এক লোকমা তুলে উঠতে গেলেই হাফসার ব্যস্ত কন্ঠ ,
“খেলেন না তো?”
“আপনার রান্না এক লোকমাতেই তৃপ্তি দেয়।
চাইলে আমি কিছুই না খেয়ে বের হতাম,কিন্তু আপনার রান্না আর আপনাকে চুমু কোনোটা মিস দেওয়া সম্ভব না।”
কথাটা বলেই তিনি হালকা ঝুঁকে হাফসার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু দেন।তারপর ফোন পকেটে পুরে,দ্রুত আম্মুর রুমের দিকে যান।
পেছনে তাকান না আর।
রুমে এসে আরহাম দুজনকেই কোলে তুলে নেন।মুহূর্তেই কান্না থেমে যায় তাদের।বাবার প্রশস্ত বুকের দুই কোণায় পরম আবেশে মাথা লাগিয়ে চুপচাপ পড়ে থাকে দুজন।আরহামের ইচ্ছে হয় না এতো হৃদয়গ্রাহী মুহুর্ত অবজ্ঞা করে তাদের ফেলে যেতে।তবুও যেতে হবে।দুজনকে সালাম দিলেন আরহাম।
“আম্মুদের একটুও জ্বালাবে না,মামনি,বাবা।আব্বু তাড়াতাড়ি চলে আসবো,ইন শা আল্লাহ।”
তারাও উম উম স্বরে বাবার সাথে কি যেনো আলাপ করে নিলো।
অতপর তাদের আদর করে চোখেমুখে অজস্র চুমু এঁকে আরহাম বেরিয়ে গেলেই কান্নায় গরম হয়ে যায় এপাশ।’বাব্বা বাই বাব্বা বাই!’ কান্নার মধ্যেও বলতে লাগলো।এর মানে হচ্ছে ,বাবা বাই দিয়ে চলে গিয়েছেন আসছেন না।কান্নায় ভারী হয়ে এলো চারপাশ।কেউ তাদের থামানোর চেষ্টাও করলো না আপাতত।কারন বাবাকে বিদায় দিয়ে মিনিট দশেকের তাদের এই মহামারী কান্না থামানোর ক্ষমতা কারোর নেই।
আজ আরহামের এমন তাড়াহুড়োর কারণ আছে।
কারন আইরার থার্ড প্রফেশনাল এক্সাম চলছে।মাহেরের ডিউটি পড়ে গিয়েছে, তাই আরহামকেই আইরাকে পৌঁছে দিতে হবে।
কিন্তু বাসায় উঠে বুঝলেন—
আইরা এখনো রেডি না!বাসায় ঢুকে আরহাম কয়েকবার ডাকলেন,
“আইরা!”
কোনও জবাব নেই।অথচ তার ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে শোনেন—বাথরুম থেকে ভেসে আসছে কবিতার সুর।
ও চিন্টু সোনা
আমি বিয়ে করেছি বলে রাগ করো না…
আমার জীবনে যে এখন খৈনির শূন্যতা,
তুই এলেই আবার ফিরবে সেই মিষ্টতা!
ও চিন্টু সোনা, কল দে না রাতে,
আমি তোর জন্যে রাখি দরজা হালকা খোলা-সাতে।
তুই এখন কল করিস, বলিস—“চল ডিনারে যাই!”
আমি বলি—“পোচ মামলেট খাব, আর কিছু চাই?”
ও চিন্টু সোনা
আমি বিয়ে করেছি বলে রাগ করো না…
তুই জানিস, তোরে ছাড়া আমার দিন কাটে না,
তোর ক্যান্ডি গুলোও এখনো ফেলে রাখি না।
ও চিন্টু সোনা, যদি থাকতাম তোর,
ভুলে যেতাম এই ভেজাল পড়ার ঘোর।
তোর ভালোবাসায় ছিল ছন্দের খেলা,
এখন শুধু শুনি—“বইখাতা কেন তোলা?”
আরহাম ঘড়ি দেখলেন।এদিকে মাহেরের ক্রমাগত কল,মেসেজ আসছে তার ফোনে এদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
“আইরা কতক্ষণ লাগবে?ইউ আর গোয়িং টু বি লেইট।”
কবিতায় বাঁধা পড়ায় আইরা বেশ বিরক্ত হলো।অভিযোগের সুরে বলল, “ভাইয়া! আমি তো শাওয়ারে! অপেক্ষা করো প্লিজ, পাঁচ মিনিট!”
“তুমি দেরী করলে মাহের আমাকে বকবে,বি ফাস্ট প্লিজ!”
ডিসেম্বরের এক তীব্র শীতের সকাল।কুয়াশায় ঢেকে আছে পুরো ক্যাম্পাস।কলেজের মূল ভবনের সামনের আমগাছটাও যেন আবছা ধোঁয়ায় মুছে গেছে। গেট থেকে হলরুম পর্যন্ত পথটা হাঁটছিল আইরা—ধীরে ধীরে, বুকের ভিতর টুপটাপ করছে ভয় আর দুশ্চিন্তার শব্দ।
আজ তার থার্ড প্রফেশনাল এর লাস্ট এক্সাম।স্বভাবতই একাডেমিক লেভেলে জীবনের অন্যতম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।সাধারণত এমন দিনে সবাই চায় মন শান্ত রাখুক, সময় যেন হাতে থাকে আর গায়ে পড়ে কোনো অশান্তি না হয়।কিন্তু আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই গড়বড়। শাওয়ারে পানির প্রবাহ ছিল কম, চোখের সামনে রেখেও আইডি কার্ড খুঁজতে যাওয়া বা কঠিন জ্যাম,সব মিলিয়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি করে ফেলল মিনিট তিনেক।
হলরুমের সামনের করিডোরটা গুমোট।অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ভেতরে বসে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজেদের। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল—মাহের।
সাদা ল্যাবকোটে দৃঢ়চেতা, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন মাহের।চোখে গাঢ় অভিব্যক্তি, ঠোঁটের কোনায় কোনো হাসি নেই।এক হাতে কলম, অন্য হাতে ফাইল।চেহারায় সেই পরিচিত সংযমী গাম্ভীর্য, কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা আজ যেন তপ্ত উষ্ণতায় পুড়িয়ে দিতে চায়।
আইরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।
মাহের তাকিয়ে আছেন, একদৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টিতে কোনো কোমলতা নেই, নেই কোনো চিৎকার—তবু যেন থরথর করে কেঁপে ওঠে আইরার বুকের ভেতর।চোখে চোখ পড়তেই আইরা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিলো।
এদিকে হলে থাকা অন্য এক স্যার, তাকে বাইরে দেখতেই আহ্লাদী সুরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।আইরা সিটের দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু মাহেরের চোখে চোখ পড়তেই আবার গতি থেমে যায়।সেই আগুনে, নিরব অথচ জ্বালাময়ী চোখ তাকে আটকে রাখে।মাথা নিচু করে, ব্যাগ টানতে টানতে, কোনোভাবে পেপারে চোখ বুলায় সে।কিন্তু সব কিছু কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে লাগছে।
ব্যাগ থেকে কলম বের করতে গিয়ে পড়ে গেল।আইডি কার্ড খুঁজে পেতে সময় লাগছে।প্রশ্ন হাতে পেয়ে দেখলো যেন পুরোটাই ফাঁকা, মাথার সব উত্তর কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।বরং এক এক করে চোখের সামনে ভাসছে—মাহেরের সেই নিশ্চল দৃষ্টি, কঠোর মুখ, ঠান্ডা অভিব্যক্তি।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, অথচ কান্না আসছে না।
আর মাহের?
দাঁড়িয়ে, এক কোণে, হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গলার শিরা খিঁচে আছে।ভেতরে আগুন জ্বললেও মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
আইরার বুকটা ভয়ে ধুকপুক করতে শুরু করে।মাহের তাকে বারবার বলে দিয়েছিলেন ,দুনিয়া ভেসে গেলেও যেনো এক্সাম হলে ঢুকতে তাঁর দেরী না হয়।অথচ এই অকান্ডটাই সে ঘটালো।সে পারলে ফিসফিস করে বলতো, ‘ক্ষমা করবেন?স্যার।আর জীবনেও এমন ভুল হবে না।”
কিন্তু সে কথা কেউ শুনছে না। হলঘরের নিস্তব্ধতায় কেবল এক তরুণীর তটস্থ দৃষ্টি, আর এক তরুণ শিক্ষকের নিঃশব্দ, কঠিন প্রতিক্রিয়া—যার জবাব আজ কোনো প্রশ্নপত্রে লেখা যাবে না।
হাফসা রান্নাঘরে ফিরে এসে সেই পুরোনো একাকীত্বে ডুবে যায়।আরহাম যখন বাড়িতে থাকেন, তখনও উনার উপস্থিতি যেন দূরের এক ব্যস্ততা হয়ে থাকে।হাফসা বোঝে।এই পুরুষটি তার একার না, তবুও।এই সংসার,দুই সন্তান—সবই আছে, তবু কোথাও যেন নেই সে নিজে।আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে—চুল অগোছালো, চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে শুকনো হাসি।
তবু নিজেকে বুঝিয়ে বলে—
“সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।আমার আবদার উনি ভুলে যাননি নিশ্চয়ই।হুট করেই হয়তো চমকে দিয়ে বলবেন,চলুন যাই।
রাত নামার মুখে জানালার কাচের ওপাশে কুয়াশা জমে জমে সাদা হয়ে উঠেছে।জানলার পর্দা হালকা বাতাসে দুলে উঠছে ধীরে ধীরে। ঘরের ভিতরটা গরম উমের মতো স্নিগ্ধ—একটা নির্ভরতার আশ্রয় যেন। বাইরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, ডিসেম্বর মাসে এসে শীত যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।
ঘরের বাতাসে তখন কেবল শিশুর মিষ্টি গলার আওয়াজ, আর মায়ের হাসির মৃদু সুর।বাচ্চারা তাঁকে জড়িয়ে ধরে ‘আম্মু ‘ ডাকে।একজন আরেকনকে দেখিয়ে বলে , ‘বেবি বেবি!’
মাইমুনা হেসে উমাইজাকে বলেন, ‘হুম সে বেবি আর তুমি বড়ো?”
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরহাম।সাদা পাজামাটার সাথে কালো পান্জাবি,একটু আগেই নামাজ শেষ করে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন doorway-তে। বাতির নিচে উনার মুখে নূরের দীপ্তি, চোখে প্রশান্তি। তিনি চুপচাপ দেখছিলেন মাইমুনাকে—একজন মা হয়ে ওঠা নারীর অবাক সুন্দর রূপ। সেই নারী যিনি তার সন্তানের আদরে নিজেকে ভেঙে গড়ে নিচ্ছেন প্রতিদিন।আরহামের চোখে ছিলো গভীর প্রশান্তি।মাইমুনা-যে আজ তার সন্তানের মা, যে তার দুই অনুপম হৃদয়ের অংশকে এমন কোমল হাতে আগলে রেখেছে—মাইমুনার দিকে তাকিয়ে তিনি নিঃশব্দে দোয়া করলেন।
তারপর ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। উমার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে বাবা উচ্চারন করলো। আরহাম হেসে তাকে কোলে তুলে নিলেন, তারপর উমাইজার কপালে চুমু দিলেন।
“আমার জানবাচ্চারা…
মাইমুনা তাকিয়ে আছেন নিরবে।চোখে নরম আলো। আরহাম তাঁর দিক ফিরে চুপিচুপি বললেন,
“আপনাকে মা হতে দেখে, আমার কি যে ভালো লাগছে!”
মাইমুনা মৃদু হাসলেন। তার চোখেমুখে আলাদা এক দ্যুতি!
রাতের আলো ফিকে হতে হতে ঘরটা যখন হালকা হলুদ আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে উঠল, তখন মাইমুনা বাচ্চাদের কমফোর্টারের নিচে গুটিয়ে দিলেন।উমার আর উমাইজা এক হাতে আম্মুর ওড়না ধরে ঘুমুতে চাইছিল।
তখনই পিছন থেকে আরহাম এসে ধীরে ধীরে কমফোর্টারের নিচে ঢুকলেন।নিজের দু’হাত দিয়ে মাইমুনা আর বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরলেন।উমাইজা ছোট্ট ছোট্ট স্বরে আওড়াচ্ছিলো “বা্ব ব্বা বা!”
আরহাম তাকে আদর দিয়ে বুকে লুকিয়ে নিলেন।
মাইমুনা চুপচাপ পাশ ফিরে তাকালেন, চোখে ছিলো অশ্রুভেজা প্রশান্তি। আরহাম তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললেন, “আপনি জানেন, আপনাকে মা হয়ে উঠতে দেখে আমি কতো সন্তুষ্ট?”
মাইমুনা কেবল মাথা নেড়ে চুপ থাকলেন। তিনটি হৃদয় তখন এক আলতো জড়িয়ে থাকার মুহূর্তে ছিলো, যেন সন্ধ্যা আকাশের নিচে এক ছায়া হয়ে গলে গেল ভালোবাসায়।
হাফসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ।একটু আগেই বাচ্চারা কেবল ঘুমিয়েছে।তার চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।দৈনন্দিন ব্যস্ততায় তার নিঃশ্বাসও যেন নিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠেছে।দুই সন্তানের যত্ন, সবার দেখভাল, হাফসার নিজের কাজ—সব মিলে সময়ের যেন অভাব হয়ে গেছে।
সন্ধ্যায় আরহাম ফিরে এলেও, উনার সঙ্গ নীরবতায় মিশে যায়।ঘড়িতে রাত এগারোটা।আরহাম এইমাত্র ফিরলেন।হাফসার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
“আপনি আগের মতো আমার সঙ্গে কথা বলেন না কেন?”
হাফসা মাথা নিচু করে বললো,
“আপনি এখন ব্যস্ত একজন বাবা, ব্যস্ত স্বামী,ব্যস্ত ছেলে।আর আমি হয়তো কেবল ঘরমুখো একজন মানুষ।”
আরহাম স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
“আপনি কি মনে করেন আমি আপনার জন্য সময় রাখতে চাই না?”
“আমি শুধু অনুভব করি, আপনি এতটাই ক্লান্ত যে ভালোবাসার জন্য অবকাশ থাকে না।”
আরহাম অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন।তার হাত ধরে বললেন ,
“এই সময়টা কেবল আমাদের।আপনি চাইলে আমি সারারাত নিঃশব্দে পাশে বসে থাকব, বুকে নিয়ে ঘুমাব,বাচ্চারা জাগলে আমি হ্যান্ডেল করবো,আপনার কিছু প্রয়োজন হলে আমি সাহায্য করবো, তাতেও যদি বুঝতে পারেন,—আমার ভালোবাসা কমেনি,উমায়ের।তবে এটা অস্বীকার করবো না,আগের মতো সময় দেওয়া হচ্ছে না।তবে প্রানপনে চেষ্টা করবো উমায়ের।তবুও আপনি কষ্ট পাবেন না।”
হাফসা নতমুখী হয়ে বসে থাকলো।তার কিছুই ভালো লাগছে না।চুপচাপ এক ফাঁকে শুয়ে নিতেই আরহাম মুখ ভার করে থাকেন।উনার ধারণা ,উমায়ের ভুল চিন্তা নিয়ে বসে আছেন যে তাকে আগের মতো ভালোবাসে না।কি করে বুঝাবেন তাকে মনের কথাগুলো!
হাফসা বাচ্চাদের যে পাশে শুয়েছে ওপাশে কেবল একজনই শোয়া যায়।আরহাম তাকে খুব সতর্কে শূন্যে তুলে এনে নিজের কাছে শোয়ালেন।তাকে বুঝতেই হবে এমন ভঙ্গিতে বুঝাতে লাগলেন,
“আপনার এমন ধারণা সম্পূর্ণ অহেতুক,উমায়ের।আপনি লাইফ রিস্ক নিয়ে দুটো ফুল এনেছেন আমার ঘরে,তাদের আদর যত্নের ত্রুটি হচ্ছে না ,সবার দিক খেয়াল রাখছেন ,আম্মু আব্বুর টেইক কেয়ার করছেন।মাইমুনাকেও সময় দিচ্ছেন।এত ব্যস্ততায় আমার পছন্দেরও খেয়াল রাখছেন।এসবের পরে কোন রিজনে আমি আপনাকে ভালোবাসবো না,বলে মনে হলো?এসব কে বলে আপনাকে?”
হাফসার কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না।তার দুচোখ ঘুমে বুজে আসছে।চোখ বুজার আগে সে আরহামের উদ্দেশ্যে বলছিলো, “আপনাকে ক্লান্ত লাগছে,ঘুমিয়ে পড়ুন।”
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৭
কিন্তু আরহামের ঘুম আসলো না।তিনি সারারাত খুব কাছ থেকে দেখলেন উনার কোমল ফুলকে।কীভাবে এতগুলো দিন পেরোলো।আরহামের মনে পড়লো,তাদের সম্পর্কের প্রথম দিককার কথা।লজ্জ্বায় কেমন লাল হতো সে!সামনাসামনি আসলেই অস্বস্তি,লজ্জ্বা জড়তায় তাকে খুঁজে পাওয়া যেতো না আর এখন সে দুই বাচ্চার মা! বাচ্চা মেয়েটা কীভাবে চোখের পলকে একজন মা হয়ে উঠলো সে ভাবনা নিয়ে আরহামের অন্ত রইলো না!
