অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৯
Maha Aarat
এক বছর কেটে গেছে—কিন্তু সময় যেনো ফুরিয়ে গিয়েছে এক নিঃশ্বাসে।পাল্টে যায় ঋতু, আসে যায় নতুন দিন, নতুন রাত, আর জীবনের পালা ঘুরে চলে নিরবচ্ছিন্ন গতিতে।কিন্তু এই এক বছরের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মুহূর্ত, আনন্দ-বেদনার রেশ, একটানা অপেক্ষার নীরব শব্দ।
বছরের শুরুতে ছিল ঠাণ্ডার নরম পরশ, কুয়াশার আভা মাঠের উপর জমে গিয়েছিল শিশিরের মতো অতি সূক্ষ্ম স্মৃতির।ডিসেম্বরের সেই গভীর রাতগুলোয়, যখন আকাশ তার গাঢ় নীল রঙে নিজেকে ঢেকে রেখেছিল, তারা নিজেদের একান্ত মনে করে গুনে নিয়েছিল তারারা, স্বপ্ন বুনেছিল নীরবতার মাঝে।শীতের বায়ু হাওয়া চাদরের ফাঁকে ঢুকে শরীর জুড়ে এক কেমন অদ্ভুত শীতলতা নিয়ে আসতো,কিন্তু মন ছিল আগুনে পুড়ানো।
সময় থেমে থাকে নি।কিন্তু তাদের স্মৃতির মাঝে সেই এক বছর ছিল এক শীতের মতো, যেটা ঠিক মৃদু হাওয়া ভেসে এসে গায়ে স্পর্শ করে যায়, আবার হারিয়ে যায়, কিন্তু রেখে যায় চিরস্থায়ী একটি ছাপ।
সকাল থেকেই পেটে কেমন জানি মোচড় দিচ্ছিল আইরার।চা খেতেও ইচ্ছে করেনি।ভাইয়ের সাথে রওনা দিতে দিতে বারবার পেছন ফিরে তাকিয়েছে—মনে হচ্ছিল আজ কিছু একটা হবে।অথচ সে জানত, কিছু না ঘটলেও তার ভিতরের অস্থিরতা সহজে কিছু হতে দেবে না।
কলেজে পৌঁছেই তার চোখ আটকে গেল নোটিশ বোর্ডে।
ভাইভা বোর্ড: সঞ্চালক—মাহের মুসতাকিম হায়ান।পড়ামাত্র বুক ধ্বকধ্বক করে উঠলো।
আইরা ঘামতে শুরু করলো।সে খুব করে চেয়েছিলো ভাইভার টীচার অন্য কেউ হোক,নিজের জামাই হলেও বা কি।কলেজে এলেই যার চোখের দয়ামায়া উবে যায়,বউকে ভুলে যান,আর ইচ্ছে করেই নাস্তানাবুদ অবস্থা করে ছাড়েন এমন স্যার জামাই হয়ে লাভ কি!কিন্তু সে গুড়ে বালি।মাহেরই সিলেক্ট হলেন ভাইভার জন্য আর বাহিরে অন্যদের সাথে উনার হালকা কথোপকথনে মনে হলো,সিলেক্ট হওয়ায় তিনি ঢের খুশি।
“এতোগুলা শিক্ষক থাকতে তাকেই কেন!” — আইরা মনে মনে ফুঁসলেও মুখ ফুটে কিছু বলেনি।মুখ নিচু করে হাঁটছিলো, যেন নিজেকে একজন সাহসী হিসেবে প্রেজেন্ট করতে পারে।
ক্লাসরুমে ঢুকে সে এক কোনে চুপচাপ বসে পড়ল সে।বাকি সবাই ফিসফিস করে কথা বলছে—কেউ নখ কাটছে, কেউ মুখস্থ করার শেষ চেষ্টা করছে।কিন্তু আইরার চোখে সব ঝাপসা।সে শুধু জানে—মাহের ক্লাসে ঢুকে প্রথম প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করবেন তাকে।প্রথম দাঁড়াতে বলবেন।তারপর শীতল চোখে তাকাবেন।ক্লাসের সমস্ত সাড়াশব্দ যখন থেমে যাবে তখন প্রশ্ন করবেন।প্রতিটি শব্দ উচ্চারন করবেন আলাদা আলাদা ভাবে।এবং এমন প্রশ্ন করবেন যার উত্তর ক্লাসের কেউই জানে না।
এই মানুষটার সাথে একই ছাদের নিচে বসবাস, অথচ কলেজে এলে তিনি যেনো তার আদিকালের শত্রু।
ঘড়িতে দশটা বেজে পঁচিশ। দরজা ঠেলে ঢুকলেন ভদ্রলোক।উনার হালকা ঘামে ভেজা কপালে তেমন কোনো অভিব্যক্তি নেই।কালো কালার গেবাটিন প্যান্টের সাথে ল্যাভেন্ডার শার্ট ইন,তার উপর কালো কোট,পায়ে’ ব্ল্যাক শোজ।বেশ লম্বা হয়েছে চুলগুলো,ঠান্ডার জন্যই বোধহয় ক্ষুর লাগাচ্ছেন না।চোখে চশমা,মুখে ঠান্ডা নিরাসক্ত ভাব।হাতের মধ্যে থাকা ফাইলটি টেবিলে রেখে ঘড়িতে চোখ রাখলেন তিনি।
উপস্থিত কার্যকম শেষ করেই পুরো ক্লাস চোখ বুলালেন মাহের।আইরা মাথা নিচু করতে গিয়েও এক নীরব চোখাচোখি হয়ে গেলো এবং একেবারে শেষ ব্রেঞ্চের শেষ কোণায় বসেও মাহেরের দৃষ্টি ঠিক তাঁকে ঘিরেই স্থির হলো।
“আপনি দাঁড়ান।”
স্বাভাবিক গলায় বলা কথা, কিন্তু ক্লাস হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আইরার মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার গলা চেপে ধরছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে।এত ঠান্ডার মধ্যেও ভয়ে তাঁর সমস্ত শরীর জুড়ে যেন গ্রীষ্মের দাবদাহ আগুন জ্বলে উঠলো।আইরার মনে পড়লো সকালে সে যে অঘটন ঘটিয়ে এসেছিলো এর শোধ তিনি পাওনা রেখেছিলেন।
মাহের একটু তাকিয়ে বললেন—
— “Define Eigenvalue.Explain,With example.”
প্রতিটি শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করলেন তিনি।উনার কণ্ঠে ছিল কেবল নির্লিপ্ত শীতলতা, কোনো আবেগের চিহ্নমাত্র নেই।
আইরার মাথা তখন ফাঁকা।কালকে দফারফা ঝগড়া হয়ে গিয়েছে তাদের।ঝগড়ার কারন বৃষ্টিতে ভিজা।মাহেরের বারবার বারণ সত্ত্বেও কালকে বেঘোরে ভিজেছে সে।শেষমেশ মাহের একটি কথাও বলেননি।উনার মৌণতা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন,এর শাস্তি তিনি হারে হারে বুঝিয়ে দিবেন।আইরার মনে হলো,আজকের এই প্রশ্ন, এই ঠান্ডা দৃষ্টি—সব যেন সেই ঘটনারই শাস্তি।
কয়েকটা প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়ে কোনোরকমে বসল সে। আর কারো সাথেই চোখ মেলাতে সাহস হয়নি। দিনশেষে ক্লান্ত, ভাঙ্গাচুরা নিজেকে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
রাত ৯টা।
ডিনার শেষে সে মাহেরের রুমে কাপড় রাখতে গিয়ে দেখলো তিনি ল্যাপটপে কিছু টাইপ করছেন।বাতি জ্বলছে আধো আলোয়।ঘরের মধ্যে একধরনের নিঃশব্দ চাপা উত্তেজনা।
— “স্যার…”
মুখ নিচু করে বলল আইরা।
মাহের একবার তাকালেন, কিছু বললেন না।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
মাহের নীরব শ্রোতা হয়ে তাকালেন।
— “আমি ভাইভায় টিকবো তো?”-আইরার গলা কাঁপছিল।
মাহের একটু সময় নিয়ে বললেন,
“তোমার পরীক্ষার ওপর ডিপেন্ড করে।”
শব্দগুলো কেটে কেটে পড়ল।যেন তীর ছোঁড়া বাক্য।
আইরা হতভম্ব। চোখ নামিয়ে ফেলল।
“কিন্তু এক্সামিনার তো আপনি ছিলেন।আপনি তো জানেন।”
তার গলা নরম, কাতর।
“আমার মনে নেই।”
এইবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আইরা।
“মনে যদি নাই থাকে তাহলে বেছে বেছে আমাকেই কেন জিজ্ঞেস করলেন সবার আগে? আমি কি কলেজে আপনার শত্রু লাগি?”
মাহের ঠান্ডা গলায়, একটুও আবেগ ছাড়া, বললেন—
“What the hell are you saying?”
আইরার বুক কেঁপে উঠলো।
তার ঠোঁট কাঁপে।গলার স্বর জড়িয়ে যায়।তবুও বিগত দিনের জমানো কথা এবার উদগীরণ করেই ফেললো,
“আমি বুঝতে পারছি, আমাদের সম্পর্কটা আপনার কাছে একঘেয়েমিতে পরিণত হয়েছে।আপনি ক্লান্ত।হয়তো… এই নীরব যুদ্ধটা আপনি আর চালিয়ে যেতে চান না।”
অতপর একটু থেমে বলল—
— “We should take a long break.”
মাহের এবার সম্পূর্ণভাবে ল্যাপটপ বন্ধ করে তার দিকে তাকালেন।
“তোমার কাছে সম্পর্ক মানে যদি শুধু তীব্র ভালোবাসা হয়, তাহলে সবসময় সেটা পাবে না।আমি তোমাকে ক্লাসে একজন স্টুডেন্টস হিসেবে দেখি, ঘরে ফিরলে একজন মানুষ দেখি।
“তাহলে আজ এই রুক্ষতা কেন?”
মাহের যেনো এবার নীরব অভিযোগ করেই ফেললেন, “অবাধ্যতা আমার মোটেও পছন্দ নয়।যেটা তুমি বারবার করে যাচ্ছো।”
আইরা চমকে গেল।
“তুমি ভেবেছো, আমি সেটা নিয়েই তোমাকে অপদস্থ করেছি? তোমার পরীক্ষা নেবার আগে তোমাকে চিনতেই পারিনি। Only when you answered, I realized it was you.”
“তাহলে আমাকে কেনো এমন শাস্তি দিলেন?”
“তোমার প্রতি আমার কোনো পক্ষপাত নেই—এইটা প্রমাণ করতেই নিজেকে রোবট বানিয়ে ফেলেছি।এখন বলো, আমি ঠিক করেছি, না ভুল?”
আইরার চোখ ভিজে ওঠে।সে কিছু বলতে পারে না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।কিন্তু তার মনে হলো এত ভয়,শঙ্কা,আতঙ্ক আর নিজের ইচ্ছেগুলোর মরণ নিয়ে সে আর বেশীদিন বাঁচবে না।তাঁর হৃদয়ে তো কবেই জং ধরে গেছে।সকাল থেকে রাত অব্দি এই কঠিন ব্যবহারগুলো হজম করতে তাঁর প্রাণ যাওয়ার যোগাড়।আইরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মানুষটাকে দেখালো।সবসময় তাকে নিয়ে সে নিজেই আগ্রহ দেখায়,নিজের দূর্বলতা দেখায় তাই বলেই কি লোকটা তাকে এতো সহজে হার্ট করেন?সুযোগের সদ্ব্যবহার?এই গলা চাপা দেওয়া যন্ত্রণা নিয়ে থাকার চেয়ে নিজের মতো স্বাধীন থাকাই শ্রেয়।এটা সে অস্বীকার করবে না যে,মানুষটাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে।তবুও এই মুহুর্তে একটু মানসিক শান্তি ছাড়া এই উত্তাল হৃদয়কে কোনোকিছুই শান্ত করতে পারবে না।
সে চুপচাপ প্রস্থান করে নিজেকে গুছিয়ে নিলো।আর খুব সহজে যে ফিরবে না পণ করে নিলো।যদিও লাস্ট কয়েক বছরে তাঁর রাগ করে এমন হুটহাট এই চলে যাওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেছে তবুও এবারই লাস্ট।সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকটাকে আর যাতে না দেখতে হয় আর রাতে এক বুক অভিমান,যন্ত্রণা ঝড় নিয়ে ঘুমাতে যেতে না হয় এজন্যই নিজেকেই দূরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলো।
খানিক পর তাকে লাগেজসহ প্রস্তুত দেখে মাহের আশ্চর্য হলেন।তিনি এবার উঠে দাঁড়ালেন।এবার যেনো আরও গুরুগম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন , হুয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট,রাইট নাও?’
“চলে যাবো।”
“যাও।”
আইরা থমকালো।এতো রুঢ়তা?দু কদম এগিয়ে আবার জলে টইটম্বুর চোখে পিছন ফিরে তাকালো।দেখলো উনি নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।খুবই নির্বিকার ভঙ্গিতে,দু পকেটে হাত গুজে।আইরা দেখলো উনি কিছু একটা আড়াল করতে চাইছেন,হয়তো অসহায়ত্ব।
মাহের আর তাকালেন না।খুব সতর্কে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন।উনার মনে হলো,ইহজগতের সব ভার উনার বুকে এসে চেপেছে।একেকটা দীর্ঘশ্বাসে জমে আছে, ক্লান্তি , দূর্বলতা, যন্ত্রণা।মাহের জানেন,সে চলে গেলে তিনি সারারাত যন্ত্রণায় কাতরাবেন।কোনোকিছুতে মন বসাতে পারবেন না,অস্থির হয়ে যাবেন।তবুও সে বুঝে না,চাইলেই সবকিছু বদলানো যায় না।যেখানে চাইলেই একটা ছোট্ট বদঅভ্যেস বদলানো যায় না,সেখানে পুরো আমিটাকে উনি কীভাবে বদলাবেন?’
“যাও।তুমি মুক্ত।এত বছর পরে হলেও তো বুঝতে পারলে আমাকে পছন্দ করার সিদ্ধান্ত ভুল সিদ্ধান্ত।তুমি তোমার মতো থাকো,যেতে পারো।”
“এভাবে বলবেন না।তালাক হয়ে যাবে।”
“তুমি তো এটাই চাচ্ছো।এখন না চাইলেও কয়েকবছর পরে হলেও চাইবে।আই কান্ট চেইন্জ মাইসেল্ফ,আইরা।আ’ম স্টিল ট্রায়িং বাট আই রিয়েলি কান্ট!”
“আমি কি বলছি আপনি বদলান?শুধু সুন্দর করে কথা বললেই তো হতো।”
ঘর জুড়ে থমথমে নীরবতা। যেন শব্দহীন বিস্ফোরণ ঘটে গেছে।
আইরার চোখে জল জমে, বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে ওঠে।সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।পা এগোয়, কিন্তু প্রতিটা কদম যেন শেকলে বাঁধা। দরজার কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়—ভেবেছিল উনি একবার বলবেন, “থেমে যাও।” কিন্তু তিনি কিছু বলেন না।
এই নীরবতা—এই না বলা অভিমানের ভার—তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
তবুও সে দরজার হাতল ধরে। ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে খোলে।
ঠিক তখনই মাহেরের ঠান্ডা, বিধ্বস্ত কণ্ঠে একটি শব্দ বেরিয়ে আসে—
“Stay.”
শব্দটা খুব ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ঘরের বাতাস চিরে আসে।আইরা থেমে যায়।সে যেন বিশ্বাসই করতে পারে না এই শব্দটা মাহেরের মুখে শুনেছে।তবে কী… তবে কী উনি চায় সে না যাক?সে ফিরে তাকায়।
দেখে, মাহেরের চোখ এবার কাঁপছে।ঠোঁট শক্ত করে রেখেছেন, যেন কিছু বললেই সব ভেঙে পড়বে।উনার মুখে এবার কঠিন আবরণ নেই, রোবটিক মুখোশটা খসে পড়েছে।
মাহের এবার পেছনের চেয়ারটা টেনে বসে পড়লেন। দুই হাত মুখে রেখে একটু থেমে বললেন—
“তুমি চাইলেই চলে যেও।কিন্তু আগে একটা কথা বলি।”
আইরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে জলজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উনার দিকে।
“আমি কখনও তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।সত্যি বলতে, আমি কীভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়—তা জানি না। আমি সব সময় শুধু চেয়েছি, তুমি যেন কষ্ট না পাও। কিন্তু জানি না কেন… আমি যেন যত চেষ্টা করি, তত বেশি তোমায় আঘাত করি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। তারপর বললেন,
“আমি চাইনি তুমি কাঁদো।আমি চাইনি তুমি দূরে সরে যাও। আমি কখনও চাইনি তুমি ভাবো, আমি তোমাকে পছন্দ করি না।বরং আমি… আমি করি,খুব।”
আইরার চোখ এবার ফেটে পড়ল জলে।
সে ধীরে ধীরে ফিরে আসে।মাহেরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কাঁপা গলায় বলে—
“আমি শুধু জানতে চাই, আপনি কখনও… আমাকে একটুও ভালোবেসেছিলেন?”
মাহের করুণস্বরে নিচু গলায় বলেন,
“বেসেছি, এখনো বাসি। কিন্তু আমি বলতেও পারি না, বুঝাতেও পারি না। জানি না কেন।আমি শুধু ভয় পাই—যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলি আবার।কিন্তু এটাই হয় ।না চাইতেও আমার থেকে তুমি কষ্ট পাও বারবার।
আইরা মাহেরের ঠিক মুখোমুখি বসে পড়ে মেঝেতে।মাথা নামিয়ে বলে,
“তাহলে চলুন, সবকিছু নতুন করে শুরু করি।আমি আর কিছু চাই না, শুধু একটু সহজভাবে, একটু শান্তভাবে… একসাথে থাকতে চাই।”
মাহের কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।
তারপর ধীরে ধীরে তাঁর হাত এগিয়ে আনেন, এবার আর কাঠিন্যতা নেই উনার চোখেমুখে ,যেন একটা সহজ, নিঃশব্দ আশ্বাস।
“Then stay. But only if you’re ready to fight this together.”
আইরা চোখ তুলে তাকায়।হ্যাঁ—এই সম্পর্কটা জটিল, আবেগের অতল গহ্বরে ডুবে আছে। তবুও, সেই গভীরেই তো জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।
সে মাথা নাড়ে।বলে, “আমি থাকবো। কারণ আপনি ছাড়া আমি নিজেকে ভাবতেই পারি না।”
মাহের এবার ধীরে ধীরে তার হাত নিজের বুকে রাখেন।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো নাটকীয়তা নয়—শুধু দুজন মানুষের নীরব বোঝাপড়া হয়ে যায়।আর ঘরের মাঝখানে, রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে, এক নতুন ভোরের বীজ বপিত হয়।
আদওয়া এখন আর সেই আগের মতো পাগলপারা মেয়ে নয়।এখন সে সকালগুলো শুরু করে সুবহের আযান শুনে—এক কাপ সাদামাটা চা, পেছনের উঠোনে ছায়া ফেলে রাখা কুরআনের তিলাওয়াত।এই তো তার জীবন।
আয়বীর সাহেব পুরোপুরিই সুস্থ।অনেকদিন হাসপাতালে ছুটোছুটি, কান্নাকাটি—সব পেছনে ফেলে এক নিঃশ্বাসে ফেলে এসেছে সে।আগে যেভাবে ভালোবাসার নামে নিজের সম্মান, নিজের ইজ্জত, এমনকি অন্যের সংসারকেও তছনছ করতে উদ্যত হয়েছিল, আজ সে দিনগুলোকে স্বপ্ন নয়, দুঃস্বপ্ন মনে হয় তার।
আদওয়ার চেহারায় এখন এক ধরণের প্রশান্তি। তবে সেই প্রশান্তির ভেতরেই কোনো গভীর নদী যেন বয়ে চলে, একদম নীরবে।একদিন তার বান্ধবীর প্রশ্নে সে হেসে বলেছিল—
— “আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম।একতরফা ছিল। জানতাম আল্লাহ্র সন্তুষ্টির পথে ছিল না, তবুও মনে হতো, সেই মানুষটা আমার।এখন বুঝি, কিছু অনুভূতি চাইলেই মুছে ফেলা যায় না।উনার জন্যই তো এগুলো ইমতিহান হয়।”
সে এখন পুরোনো কোনো নাম শুনলে চমকে ওঠে না। আরহামের নাম শুনলেও না। কিন্তু, রাতে একা যখন জানালার পাশের মোনাজাতে বসে, কখনো নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে।
“আল্লাহ, তুমি জানো আমি সবকিছু ভুলে যেতে চেয়েছি। আমি জানি, সেই মানুষটা আমার তাকদীরে নয়। কিন্তু এই হৃদয়… এই হৃদয় কেন এখনও তার কথা মনে করিয়ে দেয়? এই অনুভূতি কী হবে?”
সে এখন ইমানকে দেখলেই মাথা নিচু করে নেয়।ইমান এখন আর চোখে আগের মতো অভিযোগ রাখে না, বরং করুণার মতো একরকম কষ্টের হাসি রাখে দৃষ্টিতে।
ইমান জানে, আদওয়ার হৃদয় আর কারো হয়ে গেছে অনেক আগেই।
আদওয়া একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল নিজেকেই—
— “তুমি যদি সত্যিই উনাকে ভালোবাসো, তবে উনাকে ভুলে যাওয়াটাই তোমার ভালোবাসার পূর্ণতা।উনার হক কেড়ে নেওয়াটাই তো ছিল জুলুম।”
কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষই কিছু স্মৃতি নিজের ভেতরে কবর দিয়ে বাঁচে।আদওয়ার কবরও এখন স্মৃতিতে ভরা। কাঁদে না, চিৎকার করে না—শুধু জ্বলে নিঃশব্দে, যেন ধূপের মতো।
আকাশে তারা দেখলে, হঠাৎ মনের মধ্যে বলে ওঠে:
— “ওই আকাশের নিচে তো সেই মানুষটা আজও আছে… আল্লাহ, তুমি উনাকে উনার পরিবার আর ফুটফুটে বাচ্চাদের নিয়ে ভালো রেখো।আমায় ভুলিয়ে দাও।”
সকাল সাতটা।
সূর্যের কোমল আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর।ঘরের কোণে বসে আরহাম ল্যাপটপে কাজ করছেন,বিজনেসের একটা মিটিং এ জয়েন হবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই।চোখে ভারী চশমা, পাশে খোলা খাতাপত্র আর একগাদা অফিশিয়াল নোট। ঠিক তখনই—
“আব্ ব্বু উউউ…!”
একটা ছোট্ট দেহ এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো আরহামের পিঠে।
উমার।বড়দের মতো ভালো করে গুছিয়ে বলতে না পারলেও কথা শিখেছে সে।ইশারা হোক,বা ঠোঁট বাকিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে কথা পৌঁছে দিতে বেশ সক্ষম সে।
আরহাম তাকে আলগোছে সরিয়ে দিতেই আরেক প্রান্ত থেকে উমাইজা ঝাপিয়ে এসে উঠে পড়লো আরহামের কোলে।তারপর—
“আব্ ব্বু তুল(চুল)!
বলেই শুরু করলো আরহামের দাঁড়ি ধরে টানাটানি!
উমার পেছন থেকে গলায় হাত ঝুলিয়ে আছে।উমাইজার একটা ছোট্ট হাত গাল বেয়ে উঠে চুলের দিকে, আরেকটা দুষ্টু হাত চেপে ধরেছে দাড়ির গোড়ায়।তারপর—চুপচাপ এক কামড়!
আরহামের চিৎকার, “আহহহহহ!”
ছোট্ট ধারালো দাঁতের কামড়ে হালকা দাগ বসেছে আরহামের শুভ্র গালে।আরহাম মেয়েকে ছাড়িয়ে ব্যথাদায়ক শব্দ করে গালে হাত বুলাচ্ছিলেন ততক্ষণে উমার উনার কাঁধ বেয়ে উঠে গিয়ে মাথায় টোকা দিচ্ছে।ছোট্ট নখের আঁচড় ফেলে দিয়েছে আরহামের ঘাড়ে,কপালে।আরহামচোখমুখ খিঁচে কাগজে চোখ রাখতেই দেখেন খাতা—এক খাবলে উমাইজা মুখে পুরে দিয়েছে একপাটি পৃষ্ঠা!
“ওহ শীট! আমার বিজনেস রিপোর্ট!” বলে আরহাম দ্রুত সেগুলো গোছাতে গিয়েছেন এরইমধ্যে পেছনে ঠাস শব্দে দেখলেন,ল্যাপটপে নিচে পড়ে চুরমার।
উমাইজা হাসছে ছোট্ট দাঁতের হাসিতে, যেন বিশাল এক অ্যাডভেঞ্চার শেষ করলো।
আরহাম অসহায় চোখে তাকালেন।তারা অবশ্যি থেমে নেই।উমারের হাতে আরহামের ফোন,উমাইজা হাতে কলম দিয়ে আঁকাবুকি করে করে বলছে, ‘আব্বু লিকি?উমম লিকি?”গোল গোল চোখে তাকায়।তারপর পেপারে কলম ছোঁয়াবার পূর্বেই আরহাম তাদের দুজনকে শূন্যে কাঁধে তুলে নেন।
আজকে ছুটির দিন বলে বাচ্চাদের কাছাকাছি রাখতে গিয়ে একটুর মধ্যে তুফান ঘটিয়ে দিয়েছে দুজন।আরহামের চিৎকার কানে এসছিলো হাফসার।দরজার মুখোমুখি হতেই হাফসা হাজির হলো।আরহাম দুজনকে হাফসার হাতে দিয়ে হাত ইশারায় এলোমেলো টেবিল,নিচে পড়ে থাকা ল্যাপটপ,গালের আঁচড় দেখাতেই হাফসা মুখে হাত দিলো।তাঁর প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে ,কিন্তু আরহামের অসহায় ফেইসের দিকে তাকিয়ে বড়ো মায়াও হচ্ছে।
আরহাম শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথায় হাত দিয়ে টেবিলে চোখ রাখলেন।মাত্র কিছু মুহুর্তের মধ্যেই এতসব অকান্ড,লন্ডভন্ড উনার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।হাফসার উচিত কিছু একটা স্বান্তনা দেওয়া।কিন্তু সে পারছে না,দুজনে ছোটাছুটি করছে মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেতে।আরহাম তাদের দুজনের সামনে আঙ্গুল তাক করে ধীরস্বরে বললেন , ‘আব্বু আর ভালোবাসব না তোমাদের।’
হাফসা চুপচাপ নিয়ে যেতে লাগলো তাদের।অথচ কয়েক সিঁড়ি পেরোতেই দুজনের চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ কানে এলো আরহামের।”আব্বু আব্বু আব্বু আদল কলবেন নাআআআ! ” বলেই কান্নার আওয়াজ।আরহাম শুধু চিন্তা করছেন,বাসায় এদের কীভাবে সামলানো হয় কীভাবে।
তিনি অবশ্য একটু পরই নিচে নামলেন।হাফসার কথা শুনে আম্মু এসে দেখে গেলেন আরহামের রুমের নাজেহাল অবস্থা।আরও যা দেখলেন তাতে আর মুখ ফুটে বলার সাহস হলো না।ওয়াশরুমের ফ্যানলাইট অন বলে সেটা নিভাতে গিয়ে দেখলেন, আইপড,হেডফোন,এলার্ম ঘড়ি সহ টুকিটাকি যন্ত্রপাতি পড়ে আছে বালতির পানিতে! মিসেস আফসানা এমন দৃশ্য দেখে হতবাক,তিনি নি:শব্দে ফিরে আসলেন।
নিচে এসে দেখলেন দুজনকে কোলে নিয়ে বসামাত্রই এতক্ষণের বাড়ি মাথায় তোলা কান্না থামালো দুজন।এই মুহুর্তে আরহামের দুই বাহুতে মাথা এলিয়ে দুজনে চুপচাপ নির্বিকার বসে আছে।তাদের ফেইস ইনোসেন্ট,এই মুহুর্তে তাদের এমন নীরবতা ,আর নির্দোষভাব দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না,একটু আগের ঝড়-তুফান-টর্নেডোর স্রষ্টা তারা নিজেই।
হাফসা মাত্র গোসল দিয়েছে দুজনকে।তাদেরকে বিছানায় দাঁড় করিয়ে বেবি লোশন টা আনতে গিয়েই দুরুম দারুম।উমার পড়েই গেল।চোখের নিচে ছোট্ট দাগ, আর ঠোঁট ফেটে রক্ত গরাচ্ছে।হাফসার মাথা ঘুরে উঠলো।কোনোমতে উমারকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এক কোণে বসে রইলো সে।রক্ত তে ওর ফোবিয়া।মাথা ঝিমঝিম করতে করতে একসময় সেন্সলেস হয়েই পড়ে রইলো সোফার কোণায়।আরহাম নামাজ থেকে ফিরে এসে অস্থির হয়ে হাতেপায়ে মাসাজ করতেই ধীরে ধীরে চোখ খুললো সে।অতপর আবার চোখ বুজার আগে বলল, ‘ওদেরকে চাইল্ড কেয়ার হোমে রেখে আসুন।’
বাবাকে দেখেই ছুটে আসলো উমার।ফোলা ঠোঁট দেখিয়ে বলল, “আব্বু উফফ দেখো উফফ।দোয়া কলো!বলতে বলতে সেও হাত উঠিয়ে দোয়া করতে লাগলো।”
রাতের আকাশ ছিল গভীর নীলিমায় মুড়ে থাকা, স্নিগ্ধ কুয়াশার মেঘ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে। জানালার বাইরে দোলা দিচ্ছিল পর্দাগুলো আর আঙিনায় মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছিল যেন কারো মৃদু কান্নার সুর বয়ে নিয়ে আসছে।ঘরের ভিতরে যেন একাকিত্বের নিঃশ্বাস ছড়িয়ে আছে।
এশা এক কোণে বসে ছিল, হাতে হালকা আলো জ্বলানো একটি মোমবাতি।চোখ বন্ধ করে সে গভীর ভাবনায় ডুবে ছিল।চোখের পাতা ধীরে ধীরে গুটিয়ে উঠছিল স্মৃতির পাতায় — সাত মাস আগে সেই ভয়াল দিনের কথা।
তার তখন গর্ভে ছিল ছোট্ট জীবনের প্রথম স্পন্দন, প্রথম প্রাণ,প্রথম অনুভূতি অথচ হঠাৎ করে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল এক অদ্ভুত শূন্যতায়।হারিয়ে গিয়েছিল সে ছোট্ট সোনার ফুল, যাকে সে আর কখনো ছুঁতে পারবে না। ঝড়ে ভেসে যাওয়া পাতার মতো হারিয়ে গিয়েছিল তার নিঃশ্বাস। সে সেই সময়ের ভয়, বেদনা আর অবর্ণনীয় শূন্যতাকে অনুভব করেছিল পুরো মন দিয়ে।
কিন্তু তার মনে একটা শান্তির সুর বাজছিল, কারণ আল্লাহ তায়ালা বলছেন:
“মু’আয ইবন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তান তার নাড়ি দিয়ে তার মাকে জান্নাতে টেনে নিয়ে যাবে, যদি সে (মা) ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান প্রত্যাশা করে।”
সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ১৬০৯
এই হাদীসটি মনে করে এশার হৃদয় ধীরে ধীরে শান্ত হলেও ভেতরটা যেন ভেঙে উঠলো চুরমার শব্দে!
এশা কল্পনা করছিলো বাচ্চা মিসক্যারেজ হওয়ার পরের সময়টার কথা— যখন রায়ান অফিসে ব্যস্ত, কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তে মন থেকে এশার জন্য দোয়া করতেন,একটু পরপর এশার খোঁজ নিতেন।রায়ান জানতেন, এশার কষ্ট ও যন্ত্রণার গভীরতা।যদিও উনি নিজেও একা একা লুকিয়ে কাঁদতেন কিন্তু কখনো এশার সামনে সেই দুর্দশা না দুর্বলতার সুর প্রকাশ করেননি।উনি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এশাকে সামলে নিয়েছিলেন,আগলে রেখেছিলেন।
একবার এশা তার কোলে মাথা রেখে বলেছিল,
“আমি আর পারছি না।এই দুঃখের অন্ধকার থেকে কোথায় বের হবো আমি?”
রায়ান তখন বলেছিলেন,
“মাই লাভ এশা, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরার আদেশ দিয়েছেন।আমি তোমার পাশে আছি, আমরা একসাথে এই অন্ধকারের শেষে আলো খুঁজে পাবো ইনশাআল্লাহ।”
সেই কথা স্মরণ করে এশার চোখে অল্প অশ্রু জমে গেল। চারপাশে বাতাসের গুঞ্জন যেন তার বেদনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।মেঘের ফাঁকে একেকটা তারা ঝলমল করছিল, যেন ভিন্ন এক পৃথিবীর আলোর প্রতিচ্ছবি।
এশা জানালার পাশ দিয়ে উঠে গেল, ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে ছুঁয়ে গেল, মাথায় থাকা ধূসররঙের ওরনা আঁচল লেগে গেল ঠোঁটে।সে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবল, জীবন যেন অস্পষ্ট এক নদীর মত, কখনো শান্ত, কখনো ঝড়।কিন্তু এই নদীর গতিপথে ধৈর্যের বাঁধ গড়ে তুলতেই হয়।
রায়ান যখন অফিস থেকে ফিরে আসলেন, উনি এশাকে দেখে বুঝলেন, আজ সে কেমন বিচলিত।উনি চুপ করে এশার হাত ধরে কেবল বললেন,
“আমরা একসাথে আছি, এশা।তুমি একা নও।”
এই করুণ স্মৃতির মাঝে একটি শক্তি ছিল—একটি নরম হাত যা ছুঁয়ে গিয়েছিল এশার হৃদয়কে, আরেকটি কণ্ঠস্বর যা বলেছিল, ধৈর্য ধরো আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।
প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধতা আর মানব হৃদয়ের অদৃশ্য বন্ধন যেন একাকার হয়ে গেল।রাতের আকাশে কুয়াশার আবরন যত ঘন হতে লাগল, তারা দু’জনে জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে—দেখতে পেল অসংখ্য তারার ঝলমল, যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিরাম রহমতের আলো।এই আলোর মাঝেই তারা তাদের ভাঙা স্বপ্নগুলোকে এক এক করে গাঁথার চেষ্টায় ছিল।
এই আকাশের নীচে, এই নিঃশব্দ রাতের মাঝে, এশা ও রায়ানের হৃদয় যেন নতুন করে বাঁচার পথে পা বাড়াচ্ছিল।
মামা আসার খবরটা যেন সকাল থেকেই একটা উৎসব এনে দিয়েছিল।বাড়ির ছোট ছোট দরজা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল দুটো চোখ— উমার আর উমাইজা।তখনও মাহের এসে পৌঁছাননি, কিন্তু ওদের অপেক্ষার উত্তেজনা যেন পুরো বাড়ির বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল।
যেই মাহেরের গাড়ি গেটের ভেতর ঢুকলো, দুটো ছোট্ট শরীর একসাথে দৌড়ে গেল উনার দিকে।উমার এক হাতে তার রঙচঙে গেঞ্জির পকেট থেকে কিছু বের করছিল, আর উমাইজা তার ছোট্ট হিজাবে হাত জড়াতে জড়াতে ছুটছিল। দুজনেই মাহেরের পায়ের কাছে গিয়ে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল, যেন অনেক বছর পর মামাকে পেল।
“মাম্মাম আব্বু মামা আসতেএএ”— উমাইজা চেঁচিয়ে উঠল।উমার অবশ্যি দেরী করলো না সে এক লাফে গলায় ঝুলে পড়লো।
মাহের যেন মুহূর্তে নরম হয়ে গেলেন। দু’হাতে দুটো শিশুকে তুলে নিলেন।উমাইজা তার ঘাড়ে উঠে গেল, ছোট ছোট হাত দিয়ে মাহেরের মুখে চেপে ধরল।উমার পা দোলাতে দোলাতে চিৎকার করছিল, “মাম্মাম আম্মু মাম্মাম আব্বু দাদাভাই!”
মাহের হাসতে হাসতে দুজনের কপালে চুমু এঁকে দিলেন।
উমাইজা তখন উনার দাড়িতে ছোট্ট আঙুল দিয়ে টান দিচ্ছিল, আর বলছিল, “তোমার তুল এ ব্যতা লাগে,মামা!’
এই পুরো দৃশ্যটা কিছুটা দূর থেকে দেখছিলো আইরা।তাঁর কিছুটা নয় বরং অনেকটাই জেলাস লাগছিলো,বাচ্চারা ছুটে এসে উনাকে যেভাবে নিয়ে তাকে রেখে গেল,মনে হলো সে এ বাসার কেউই না।এক অনিমন্ত্রিত অতিথি!তবুও মুগ্ধচোখে এমন চোখজুড়ানো দৃশ্য দেখছিলো সে।
আইরার চোখ দুটো ছিল স্থির, কিন্তু গভীর। সেই দৃষ্টিতে ছিল অভিমান নয়, ঈর্ষাও নয়— ছিল এক অপূরণীয় শূন্যতার প্রতিচ্ছবি।যেন সেই মুহূর্তে সে বুঝে ফেললে,মাহের হয়তো কাউকে ভালোবাসতে জানেন না, অথবা বুঝিয়ে বলতে পারেন না।কিন্তু তিনি শিশুগুলোর সামনে নিজেকে একটুও লুকিয়ে রাখেন না।
ওদের আদরে, ওদের জড়িয়েধরা ছোট হাতগুলোর ভেতর মাহের যেন সম্পূর্ণ নিজেকে বিলিয়ে দিতে জানেন।
আইরা ধীরে ধীরে পেছন থেকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো পাশে।মাহের তখনও উমার আর উমাইজার কথা শুনে হেসে চলেছেন।
আইরা আচমকা নিচু গলায় ফিসফিস করে বললো,
“আপনার কি ইচ্ছে হয় না, আপনার ঘরেও এমন ফুটফুটে চাঁদ আসুক?”
মাহের এক মুহূর্তে চুপ করে গেলেন।
উমার তখনও বলছিল, “আম্মু বলেতে কাঁদতে না।কাঁদে পঁচা বেবিরা আমি কাঁদবো না!”
মাহের চোখ ধীরে ধীরে আইরার দিকে ফিরল।
তবে তিনি কিছু বলেননি।উনার মুখে কোনো উত্তর ছিল না।কিন্তু সেই নীরবতাই যেন বলে দিল সব।
হয়তো ইচ্ছে হয়।
হয়তো উনার হৃদয়ের কোনো গভীর স্থানে, কোনো খোপে এমন ফুটফুটে শিশুর জন্য, এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্য এক অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে আছে।
কিন্তু হয়তো তিনি নিজেও জানেন না, সেই অনুভব কীভাবে কাউকে বলা যায়।
মাহের চোখ নামিয়ে ফেললেন।
হাফসা এসে ভাইয়ের সাথে কুশলাদি আলাপ শেষে আইরাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।বাচ্চারাও একসময় ভেতরে ছুটে গেল
কেবল দাঁড়িয়ে রইলেন মাহের।প্রকৃতির মধ্যে শীতের হালকা বাতাস বইছিল।আশেপাশের গাছে পাতার মৃদু ঝিরঝিরে শব্দ ছিল, পেছনের উঠোনে কিছু শুকনো কাশফুল পড়ে ছিল।আকাশে সূর্যটা হেলে পড়ছিল ধীরে, যেন কোনো পুরনো গল্পের পরিসমাপ্তি টানতে আসছে।
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৮
কিন্তু এই মুহূর্তটা থেকে যাবে—
চোখে, হৃদয়ে, নীরবে বলে যাওয়া এক প্রশ্নের মতো…
“আপনার কি ইচ্ছে হয় না, আপনার ঘরেও এমন ফুটফুটে চাঁদ আসুক?”
