Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৫

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৫

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৫
রুপান্জলি

মাঝে কেটছে আরও দুদিন,, আজ লাইলাতুল কদর ছিলো বিদায় রাত ১২ টা পর্যন্ত টানা নামাজ পরেছে অর্পনা,, দ্বীপ ও নামাজ পরে ১০ টার পরপর ফিরে এসেছিলো। আপাতত দুজনেই ঘুমে কাদা। এই বছর প্রকৃতি বেশ বেইমানি করছে। সকাল থেকেই কেমন ঝর বাদলায় মুখরিত পরিবেশ,, বসন্তকালে এরকম ঝড় বাদলা হওয়ার কারন খুজে পাওয়া না গেলেও ইদানীং বিষয়গুলো ঘটছে। সন্ধার পরপর বৃষ্টির ঝুপটা একটু কমলেও ১২ টার পর আবার শুরু হয়েছে,,ধীরে ধীরে তা ঝরের রুপ নিয়েছে। সকাল থেকেই ঘরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই,, আই পি এস এর ও মেয়াদ ফুরিয়েছে। অর্পনা গরম সহ্য করতে পারেনা,,

লো ট্যাম্পেরাজারেও ঘেমে যায়,, তাই নামাজ পরে বারান্দার থাই খুলে রেখেছিলো। বর্তমানে সেদিক থেকে শো শো শব্দ তুলে বাতাস প্রবেশ করছে,, বৃষ্টির ঝাপটায় রুম ও কিছুটা ভিজেছে বোধহয়,, ক্ষনে ক্ষনে বাজ পরার শব্দ হচ্ছে। বাজ কিংবা বৃষ্টির শব্দ বেশ পছন্দ অর্পনার,, ভালো ঘুম হয়। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অর্পনা খেয়াল করলো তার গলার ভাজে কারোর গরম নিশ্বাস আছড়ে পরছে,,ধীরে ধীরে স্পর্শ গাড়ো হচ্ছে। একটা শক্ত পোক্ত হাত বিচরন করছে তার মাঝে,, কেপে উঠলো অর্পনা। হাত উচিয়ে সামনে মানুষটাকে ছুতে চাইলে একটা উন্মুক্ত পিঠের আভাস পেলো। কিছু সময়ের মাঝে দ্বীপের অবাধ্য ইচ্ছাটা বুঝতে পেরে মুচরে উঠলো মেয়েটা। অবাধ্য দ্বীপ সেসবে পাত্তা দিলো না,, নিজের কাজ অব্যহত রাখলো নিজের মতো করে। বাহিরের ঝড়ো হাওয়া এসে যেমন তাদের রুমের পর্দা, বিছানার চাদর এলোমেলো করে দিচ্ছে তেমনি অর্পনার শক্ত মনটাকেও এলোমেলো করে দিচ্ছে দ্বীপ। ঠিক থাকতে পারছে না সে,,তার নারীমন দ্বীপের অবাধ্য ডাকে সারা দিতে চায় কিন্তু এতোদিনের জমে থাকা অভিমান গুলো তাকে আটকে দিচ্ছে। মস্তিষ্ক বলছে লোকটাকে দূরে সরিয়ে দিতে,,অর্পনা শুনলো,, কিছুটা অভিমানি স্বরে বললো — সরুন!!যে আমার সাথে কথা বলে না,, আমায় প্রাধান্য দেয়না,, তার কাছে আমি আর আত্মসমর্পণ করবো না।

,,, দ্বীপের অবাধ্য হাতটার একটি আঙুল অর্পনার ঠোটের ভাজে পৌছালো,, আঙুলটা ঠোটে চেপে ধরে কন্ঠ খাদে নামিয়ে অর্পনার কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশা ভরা কন্ঠে আওড়ালো– ডন্ট টক!! আই নিড ইউ।
,,, এরপর আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না মেয়েটা,, দ্বীপ মির্জা তাকে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। লোকটা তার নিজের মনমাফিক অবাধ্যতা চালিয়ে গেলো। অর্পনাকে আবারও মুরিয়ে দিলো আদরের চাদরে,, আর অর্পনা সেটা গ্রহন করতে বাধ্য হলো,, বাধ্য না হয়ে উপায় আছে? ভালোবাসে যে।

,, আজ আঠাশ রোজা,, মির্জা বাড়িতে একটা দারুন নিয়ম রয়েছে,, আঠাশ রোজার দিন বেহিসেবে গরিব দুঃখিদের ঈদ বস্ত্র দেওয়া হয়। মহিলাদের শাড়ী-থ্রীপিস,, পুরুষদের লুঙ্গি-পায়জামা,, আর বাচ্চাদেরকে জামা। যেহেতু সারাদিন ব্যাপি আয়োজনটা চলবে তাই অর্পনার শ্বশুর চাচা শ্বশুর রা চাইছিলেন সকালের দিকে যখন রোদ থাকবে না, এই সময়টাতে যেনো বাড়ির দুই বউ নিজ হাতে ঈদ বস্ত্র তুলে দেয়। অর্পনার অবশ্য বিষয়টা খারাপ লাগেনি,, এর আগে এসব দেখেনিতো? বেশ এক্সাইটেড সে। তাই ভাবলো আজ শাড়ি পরবে,, মেধাপু ও বলেছে শাড়ি পরবে,, আর এমনিতেও বিছানায় কম্ফোর্টার চেপে শুয়ে থাকা লোকটাও শাড়ি বেশ পছন্দ করে। অর্পনা ঠিক করলো এবার মেধার থেকে শাড়ি পরাটা একেবারে শিখে নিবে,, এই লোক তো আর তাকে রোজ রোজ শাড়ী পরিয়ে দিবে না? আবার উনার কাছে শিখাও দায়,, কাছে এলেই অর্পনার কেমন জানি লাগে,, শাড়ি পরিয়ে দেবার বেলায় তো আরও বেশি লজ্জা লাগবে।

অর্পনা স্টাডি টেবিলে রাখা সবগুলো শপিং ব্যাগ দুহাতে ঝাপটে ধরে মেঝেতে রাখলো তারপর সেও হাটু ভাজ করে বসে পরলো। এগুলো তার ঈদ ড্রেস,, সবগুলো উপহার হিসেবে পাওয়া৷ অর্পনার শ্বশুর ওকে চারটা থ্রিপিস আর তিনটে শাড়ি দিয়েছে,, বড়ো চাচা শ্বশুর দিয়েছে তিনটে গাউন,, ছোট চাচা শ্বশুর দিয়েছে চারটে শাড়ি,, বিহান ভাই-মেধাপু দিয়েছে ৪ টা থ্রিপিস আর ৩ টা গুচির এক্সেল সাইজ টিশার্ট সাথে জগার্স। দ্বীপ- বিহানের নানী বাড়ি থেকেও অনেক গিফ্ট এসেছে,, দ্বীপের তিন মামা, দুই খালা,, বিহানের তিন মামা তারাও ওর আর মেধার জন্য এক গাদা ড্রেস, শাড়ি পাঠিয়েছে। অর্পনা সেসব গুছিয়ে রেখেছে,, উনারা যখন ঈদের পর আসবে তখন নাহয় একটা নিয়ে পরা যাবে। আপাতত সে ছোট চাচা শ্বশুরের দেওয়া একটা জামদানী শাড়ি পরবে। অর্পনা চারটে শাড়ি বের করে এর মধ্যে থেকে নীল শাড়ীটা গায়ে জড়াতেই তার মন ভালো হয়ে গেলো। একদিন এফ বিতে দেখেছিলো,, ছেলেরা নাকি মেয়েদের নীল শাড়ীতে দেখলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে,, দ্বীপ ও তো ছেলে।

ওকে নীল শাড়ীতে দেখে দ্বীপের রাগ কি কিছুটা কমবে? অর্পনার মন শায় দিলো,, শাড়িটা গলার ভাজে রেখে থুতনি দিয়ে চেপে ধরে আবার সবগুলো শপিং ব্যাগ নিয়ে স্টাডি টেবিলের উপর রাখলো। এগুলো দ্বীপকে দেখিয়ে তারপর আলমারিতে তুলে রাখবে। ব্যাগ গুলো রেখে ব্লাউজ আর পেডিকোড নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো অর্পনা,, কিছুক্ষণের মাঝে সেগুলো পরে আবার ফিরে এলো। সে তো শাড়ি পরতে পারেনা তাই মেধা এসে পরিয়ে দিবে,, পরানোর সময় শিখিয়েও দিয়ে যাবে। রুমে এসে আড়চোখে একবার দ্বীপকে দেখে নিলো, নাকে মুখে কম্ফোর্টার চেপে ঘুমাচ্ছে। অর্পনা মৃধু স্বরে গান ধরলো, “” চাইনা ছেলে তুমি অন্য কারো হও, পাবেনা কেউ তোমাকে তুমি কারো নও। তুমি তো আমারি জানো না ওও,, তোমার কলিজাটাও আমারি ওওও। “” গাইতে গাইতে আয়নার সামনে এসে দাড়ালো,, গলার ক্ষত গুলো দেখে দাতে দাত চাপলো।

ওর সাথে কথা বলেনা আবার রংঢং ঠিকি করে,, ফালতু লোক। অর্পনার উদ্ভট গান শুনে কম্ফোর্টারের নিচে থাকতে পারেনি দ্বীপ। কম্ফোর্টার টা মুখ থেকে একটু সরিয়ে অর্পনার দিকে তাকাতেই থমকে গেলো ,, এরপ কোনোকিছুর আশা করেনি সে। হলুদ ফর্সা গড়নে নীল জামদানী কাপরের ব্লাউজ আর নীল সুতি পেডিকোট। অর্পনা অর্ধ ভেজা চুল গুলো সামনে নিয়ে চিরুনি করছে আর গুনগুন করছে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে থাকায় অর্পনার সম্পূর্ণ কার্যকলাপ আয়নায় ভেসে উঠছে যা দেখে দ্বীপের হুস জ্ঞান দিক হাড়িয়েছে। হৃদযন্ত্রটা অস্বাভাবিক হাড়ে বিট করছে সাথে কিছু নিষিদ্ধ অনুভুতিরাও হানা দিয়েছে মনপুটে। বিরক্ত হলো দ্বীপ,, রোজা রেখে সকাল সকাল এসব সহ্য করার কোনো মানে হয়? সে অসীমো বিরক্তি নিয়ে বিরবির করে আওড়ালো — লজ্জা শরম পানির সাথে গুলে খেয়েছে নাকি?

,,,,তখনি দ্বীপের দিকে ঘুড়ে তাকালো অর্পনা সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো দ্বীপ। অর্পনা মুখ বাকালো,, সে আয়নায় স্পষ্ট দেখেছে লোকটা বেকুবের মতো ওকে দেখছিলো এখন ভাব নিচ্ছে। অর্পনা এগিয়ে এলো,, একদম দ্বীপের কাছে ঝুকে এসে আধ ভেজা চুলগুলো দ্বীপের মুখের উপর বারি দিয়ে বললো — হ্যা!! ইফতার টাইমে শরবতের সাথে গুলে খেয়ে নিয়েছি,, তাতে আপনার কি?
,,, বলেই চলে যেতে নিবে তখনি ওর লম্বা চুলগুলো টেনে ধরলো দ্বীপ,, হাত দিয়ে পেচাতে পেঁচাতে পুরো চুলটাই পেচিয়ে নিলো। ব্যাথায় ককিয়ে উঠে দ্বীপের মুখের কাছে ঝুকে গেলো অর্পনা। দ্বীপ ওর চোখে চোখ রেখে শাসানোর স্বরে বললো — রোজা আছি বলে বেচে গেলি,, শুকরিয়া কর।
,,, বলেই ছেড়ে দিলো,, অর্পনা ছাড়া পেয়ে মাথা ঘষতে লাগলো। বদমাস একটা, খালি চুল ধরে,, যেনো উনার বাপের টাকায় কিনা। তখনি দরজায় নক পরলো,, নিশ্চয়ই মেধা এসেছে,, অর্পনা দ্রুত বিছানা থেকে উড়না নিয়ে গায়ে জড়ালো,, শাসনের স্বরে বললো — আপনার বোন এসেছে,, ওদিক ফিরে ঘুমান,, একদম নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকবেন না।

,,, অর্পনা দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যেতেই দ্বীপ কম্ফোর্টার জড়িয়ে ওপুর হয়ে শুয়ে পরলো। আপাতত এই মেয়ের প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই,, রোজার সময় ইন্টারেস্ট থাকাটাও বিপদজনক।
,,, অর্পনাকে খুব সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দিলো মেধা,, কিভাবে কি করতে হয়,, কুচি কিভাবে করতে হয়, আচল কিভাবে ফেলতে হয় তা ধীরে ধীরে শিখিয়ে দিলো। অর্পনা মন দিয়ে আয়ত্ত করেছে সেটা,, ভাবতেই বড্ড অবাক লাগে। কয়েকদিন আগেও যেই শাড়ি দেখলে তার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে যেতো,, ভয়াঙ্কর দিন গুলোর কথা মনে পরতো এখন সেই শাড়ি নির্বিঘ্নে গায়ে জড়িয়ে রেখেছে। সবটা তো ঐ মানুষ টার জন্যই সম্ভব হলো। এরকম ভাবে স্বামীর হাতে শাড়ি পরার জন্য হলেও নারীদের এক জীবন শাড়ি না পরে থাকা উচিৎ।

,,,, অর্পনা নিজেকে আয়নায় খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখলো ,, লকার খুলে শ্বাশুড়ির গয়না গুলো বের করে সেখান থেকে একট মাঝারি সাইজের কানের দুল নিলো। কানে থাকা দুল গুলো খুলে সেগুলো পরে নিলো,, গলায় চেইন থাকা সত্ত্বেও শ্বাশুড়ির ব্যাবহিত সিম্পল সিতা হাড় পরলো,, দুহাত মিলিয়ে ২ ডজন স্বর্নের চুড়ি পরলো,, কাজল দেওয়ার বড্ড সখ জাগছে কিন্তু সে তো দিতে পারেনা। একবার ভাবলো ইরাকে ডাকবে,, ও পরশীর রুমে ঘুমাচ্ছে,, ঘুমাচ্ছে ভেবে আর ডাকলো না। নিজ থেকেই কাজলের পেন্সিল নিয়ে চোখে আর্ট করার প্রয়াস চালাতেই চোখে পেন্সিলের খোচা লাগলো। অর্পনা চোখ ধরে ব্যাথাতুর শব্দ করে চোখ ডলতে লাগলো,, শব্দ শুনে মুখ থেকে কম্ফোর্টার সরালো দ্বীপ। মেয়েটা এখনো সমানে চোখ ডলে যাচ্ছে,, দ্বীপ ভ্রু কুচকে ধমকের স্বরে জানতে চাইলো — কি হয়েছে?
,,, অর্পনা চোখ ডলে দ্বীপের দিকে তাকালো,, চোখ ডলার কারনে যতটা কাজল দিয়েছিলো সবটা অস্বাভাবিক ভাবে লেপ্টে গিয়েছে। দ্বীপ বিরক্তির নিশ্বাস ফেললো,, যে যেটা পারেনা সে সেটা করতে যায় কেনো? চোখের ব্যাথায় অর্পনার তেমন ভাবাবেগ না হলেও দ্বীপের ধমকে খুব কষ্ট পেয়েছে। লোকটা তাকে এভাবে ধমক দিতে পারলো? সহসা তীব্র অভিমানে হাতের পেন্সিল কাজলটা মেঝেতে ছুড়ে মেরে ওয়াসরুমের দিকে হাটা দিলো,, উদ্দশ্য মুখ ধুয়ে লেপ্টানো কাজলটা তুলে ফেলা। দ্বীপ এখনো কপালে তিনটে ভাজ ফেলে তাকিয়ে আছে,, অর্পনা ওয়াসরুমের কাছে পৌছাতেই গম্ভির স্বরে ডাকলো,,

,,, এদিকে আসো।
,,, অর্পনা শুনলো না,, নিজের মতো যেতে থাকলো,, ফের ধমকে উঠলো দ্বীপ —
,,, এই মেয়ে!! আসতে বললাম না? মার খাবে?
,,, অর্পনা মুখ চুন করে এগিয়ে এলো,, দ্বীপ ইশারায় কাজলের পেন্সিলটা তুলে আনতে বললো। অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে না করলো মানে আনবেনা,, দ্বীপ আবারও কপাল কুচকে চোখ রাঙালো,, এবার আর অবাধ্য হতে পারলো না রমনি। কাজলের পেন্সিলটা এনে দ্বীপের হাতে দিলো,, দ্বীপ অর্পনার হাত টেনে ওকে কোলের উপর বসিয়ে দিলো। এরুপ কান্ডে কিছুটা বিস্মিত হয়েছে অর্পনা,, কতোদিন পর লোকটার চোখে মুখে আদর খুজে পাচ্ছে সে। দ্বীপ এদিকে ওদিক তাকিয়ে কাজল মোছার জন্য কিছু একটা খুজলো তবে আশানুরূপ কিছুই পেলো না। অগত্যা নিজের ব্যাবহিত টিশার্ট টা দিয়েই অর্পনার চোখের লেপ্টানো কাজল টুকু যত্নের সহিত মুছে দিতে লাগলো। অর্পনা এখনো বিস্মিত নজরে তাকিয়ে আছে। যেই লোকটা জামায় সামান্য পরিমান ময়লা লাগলে এরপর থেকে সেটা ছুয়েও দেখে না,, আরও রাগারাগি করে,, সেই ললকটা নিজের ব্যাবহৃত প্রিয় টিশার্ট দিয়ে ওর কাজল মুছে দিচ্ছে? এতো ভালোবাসা আর কোথায় পেতো সে? কাজল মোছা শেষ হলে অর্পনার চোখের নিচের পাতাটা আছতে করে টেনে ধরলো দ্বীপ,, পেন্সিলটা আলতো করে ঘষে ঘষে চোখটা রাঙিয়ে দিতে লাগলো। এমন নয় যে দ্বীপ আগে থেকেই এসব পারতো,, মুলত কোনোকালেই এসব শিখার প্রয়োজন পরেনি তার। হয়তো দ্বীপের বউটা নরমাল মেয়েদের মতো হলে কখনো শিখতো ও না এসব কিন্তু অর্পনা তো আলাদা,, সে কিছু পারেনা,, মেয়েদের মতো চলতে শিখেনি,, তাই বউকে সাজানোর খাতিরে দ্বীপকেই শিখতে হলো এসব। তাকিয়ে থাকতে থাকতে অর্পনার চোখে পানিরা ভীর করলো,, দ্বীপ চোখে ফু দিতে দিতে সুধালো — কি হয়েছে? চোখ জ্বালা করছে? চোখ বন্ধ করবে না একদম,, দেখি।

,,, অর্পনার এবার খুব কান্না পেলো,, দ্বীপের হাতটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে জেদি কন্ঠে বললো — আমি দিবো না এসব।
,,, কেনো? কি সমস্যা?
,,, অর্পনা এবার কেদেই ফেললো,, দু’হাতে দ্বীপকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে মুখ গুজে ফোপাতে ফোপাতে বললো —
,,, আমার এসব লাগবেনা,, কিছুই লাগবে না,, আমার আপনাকে লাগবে। কতোদিন হয়ে গেলো আপনি আমার সাথে কথা বলেন না,, আমার কষ্ট হয়না বুঝি? আমি নাহয় একটা ভুল করেই ফেলেছি,, তাই বলে এভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে কেনো? আমি তো আপনার পর না,, আপন বউ। আমার ভুল মানে আপনার ভুল,, আপনার ভুল মানে আপনার ভুল। নিজের ভুল ভেবে আমাকে ক্ষমা করে দেন না,, আমি আপনাকে ছাড়া ভালো নেই দ্বীপ। আমি কিন্তু পাপ্পার কাছে বিচার দিবো নয়তো অস্ট্রেলিয়া চলে যাবো। এখনো আমার দুই মাসের ভিসা রয়েছে,, একবার চলে গেলে আর ফিরাতে পারবেন না,, বলে দিলাম।

,,, দ্বীপ চোখ নামিয়ে বুকে লেপ্টে থাকা রমনির দিকে তাকালো। কে বলবে এটার বয়স ২৩? কি বাচ্চা বাচ্চা কথা। ওর ভুল মানে দ্বীপের ভুল আর দ্বীপের ভুল মানে শুধুই দ্বীপের ভুল। নিজের ভুল গুলোর ভার সে দ্বীপের ঘাড়ে চাপিয়ে দিবে কিন্তু দ্বীপের গুলো নিবেনা। বড্ড সার্থপর তো এই মেয়ে। দ্বীপকে শক্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে দ্বীপের দুহাত টেনে পিছনে রাখলো অর্পনা,, যেনো ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। পরপর দ্বীপের গালে, কপালে, নাকে, থুতনিতে, গলায় চুমু খেতে খেতে বললো — মাফ করে দেন না!! আর কতো ক্ষমা চাইবো? দুদিন পরে ঈদ,, আপনি রাগ করে থাকলে আমার ঈদটাই মাটি হয়ে যাবে। সরিতো,, মাফ করে দেন,, আর কখনো আপনার অবাধ্য হবোনা,, একটু ও না,, প্রমিজ!!
,,, এই পর্যায়ে আর শক্ত থাকতে পারলো না দ্বীপ,, নিজের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিলো প্রান প্রিয় অর্ধাঙ্গিনীকে,, অর্পনা ডুকরে কেদে উঠলো,, দ্বীপ অর্পনার লম্বা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সেই চুলের ভাজে চুমু খেলো,, নাক ঠেকিয়ে গাড়ো নিশ্বাস টানলো।অর্পনা আরও জোর খাটিয়ে মিশে গেলো দ্বীপের বুকে। অনেকটা সময় এভাবেই চললো। রুমে থাকা ঘড়িতে ৮ টার কাটা পেরুতেই এলার্ম বেজে উঠলো,, অর্পনা দ্বীপের বুকে মুখ গুজে রেখেই সুধালো–

,,, আপনি আজকেও অফিস যাবেন?
,,, যাবো!!
,,, কিন্তু আব্বু তো বলেছিলো সবাইকে বাড়ি থাকতে। আপনি চলে গেলে আব্বু রাগ করবে না?
,,, আমি দেখে নিবো সেটা,,
,,, তারমানে যাচ্ছেন ই?
,,, তুই কি চাস? না যাই?
,,, আপনার ইচ্ছা। কাজ থাকলে যেতে পারেন।
,,, বিকালে শপিং এ নিয়ে যাবো,, রেডি হয়ে থাকিস।
,,, আমি আজকে যাবো না,, ঈদের আগের দিন যাবো।
,,, আজকে পরিবারের সবার জন্য শপিং করবো। ঈদের আগের দিন আবার তোমায় নিয়ে যাবো।
,,, এইতো এতোক্ষণ তুই তুই করে বলছিলেন,, এখন আবার তুমি করে কেনো বললেন?
,,, তর কোনটা ভালো লাগে?
,,, দুটোই।

,,, দ্বীপ মুচকি হেসে অর্পনার মাথাটা বুক থেকে তুলে চোখের পাতায় গাড়ো চুম্বন করে বললো– মাঝেমধ্যে আমি ভুলে যাই তুই আমার বউ,, তকে মাঝেমধ্যে আমার আদরের রানী মনে হয় তাই তুই তুই করে বলি।
,, চোখে চুমু খাওয়ায় দ্বীপের ঠোঁটে কাজল লেগে গিয়েছে,, অর্পনা ফিক করে হেসে ফেললো। দ্বীপ মন দিয়ে নীল শাড়ি পরিতিত রমনিকে পরখ করলো। মেয়েটাকে যতবার দেখে ততেবার ঠোঁট ফুরে একটা কথাই বেরোতে চায়”” পরি”” আর ঐ কাজল চোখে তাকালে মরে যেতে মন চায়। দ্বীপ অর্পনার হরিণের ন্যায় বড়ো বড়ো চোখে চোখ রেখে আবেশিত কন্ঠে সুধালো –

“” রমনি তোমার কাজল চোখ আমায় মরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়,, এটা কি অন্যায় নয়? আমি মরে গেলে তোমায় ভালোবাসবে কে?””
অর্পনার গাল দুটো লজ্জায় রক্তিম রং ধারন করলো,, দ্বীপ চুমু খেলো সেখানটায়। অর্পনা সুধালো– আপনি কি একটু পর আবার রাগ করে ফেলবেন? আমাকে ইগনর করবেন?
,,, আমি রাগ করে থাকলে কতটা কষ্ট হয় তর?
,,, অর্পনা ভাবলো,, ভিতরে চলা অনুভুতিগুলো কোন ভাষায় প্রকাশ করবে বুঝতে পারছেনা। অনেক ভেবে উত্তর করলো — জানিনা!! কিন্তু আমার কিছু ভালো লাগে না,, পৃথিবীটা জঘন্য লাগে,, ভাত পানসে লাগে, তরকারিতে অতিরিক্ত লবন মনে হয়,, রুটিও শক্ত লাগে,, পানি খেতে মন চায় না আর খুব কান্না পায়।

,,, অর্পনার উত্তর শুনে ভ্রু উচালো দ্বীপ, ঠোটে ঠোট চেপে বললো — ইসস!! এটা তো মারাত্মক অসুখ,,
,,, মজা করবেন না,, এটা সত্যি ছিলো।
,,, আমার আদর পেলে এতো বাচ্চা হয়ে যাস কেনো?
,,, জানি না!!
,,, দ্বীপ অর্পনার খোলা চুল গুলো পেচিয়ে খোপা করে দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে দিলো। কপালে গাড়ো চুম্বন করে বললো– আচ্ছা নিচে যাও,, একদম হুটোপুটি করে চলবে না,, ব্যাথা পেলে কপালে দুঃখ আছে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাখবে,, পুরুষের সারিতে দাড়াবে না,, বাচ্চা আর মায়েদের সারিতে দাড়াবে কেমন?
,,, অর্পনা মাথা নাড়িয়ে উঠে দাড়ালো। কমফোর্টার ভাজ করতে নিলে দ্বীপ পিছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে কাধে থুতনি রেখে বললো — রাখো,, আমি গুছিয়ে নিবো। তুমি শুধু আমার আউটফিট রেডি করে দিয়ে যাও।
,,, বলতে বলতে অর্পনার কাধ থেকে চুল সরিয়ে সেখানে ঠোঁট চোয়ালো, কেপে উঠলো অর্পনা,, তীব্র শিহরনে পরনের শাড়ি খানা খামচে ধরলো। খোলা বারান্দা হতে বাতাসের ঝাপ্টা এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে দুজনকে আর বাতাসের শো শো শব্দরা যেনো কানে কানে বলছে,,,
এই মন পরেছে যেনো বড়ো দোটানায়,,
প্রেম বয়ে আনলো হঠাৎ ,, দমকা হাওয়ায়,,
এই আশিকি,,, আশিকি,, করলো কি জাদু হায়।
এই আশিকি,,, আশিকি,, করলো কি জাদু হায়।

অর্পনা ফুরফুরা মন নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। বের হয়ে অকারনেই ব্লাস করে দুহাতে মুখ ঢেকে নিলো।তার বড্ড ভালো লাগছে,, মনটা খুশি খুশি লাগছে,, বসন্তের বাতাসে ঈদ ঈদ গন্ধ আসছে,, নিচে গরুর গোস্ত রান্না না হওয়া সত্তেও তার নাকে চুইঝাল দিয়ে রান্না করা গরুর গোস্তের ঘ্রান আসছে। ওফফ!! পৃথিবীটা এতো সুন্দর কেনো? অর্পনা তার স্বভাবের বাহিরে গিয়ে হেলতেদুলতে পরশীর রুমে ঢুকলো। সারা রাত জেগে কাটানোর ফলে ইরাদ এখনো ঘুমাচ্ছে,, পরশী কি করনে যেনো মন মরা হয়ে বসে আছে। অর্পনা এগিয়ে এসে পরশীর সামনে দাড়ালো,, সাথে সাথে ঠোঁট উল্টে কেদে দিলো পরশী। মেয়েটার কান্ডে হতভম্ব হয়ে গেলো অর্পনা। বিচলিত কন্ঠে সুধালো — পরশ!! কি হয়েছে? কাদছো কেনো?

,,, পরশী কাদতে কাদতে নাক মুছে বললো — ভাবি!! ও আমার সাথে এটা করতে পারলো?
,,, কে কি করেছে?
,,, ও মানে ও আরকি।
,,, ঐ ও টা আবার কে? পল্লব?
,,, না না!! উনি নাতো,, তারেক জিয়া।
,,, ওমাহ!! উনি আবার তোমার ও হলে কবে? আর কি এমন করেছে যে তুমি এভাবে কাদছো?
,,, ও এটা কিভাবে করলো ভাবি? দ্বীপু মনি কতো ভালো ছিলো,, কথায় কথায় অটো পাস দিতো। কোথাকার না কোথাকার হেলিকপ্টার মিলন। সারাক্ষণ বলে,, পড়তে হবে,, নকল করা যাবে না,, পড়তে হবে। এটা কোনো কথা হলো? আমি নকল না করে কিভাবে পাশ করবো? আমার মাথায় তো গোবর। বারোমাস চাষ বাস করা যাবে। আম্মু এবার আমার পিঠে খুন্তি ভাঙবে না? আল্লাহ!! ও আল্লাহ গো। আমাকে তুমি দয়া করো,, আমাকে প্লিজ এই এক্সামে পাশ করিয়ে দাও। আমি এবার থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে পরবো,, একটুখানিও ফাকি বাজি করবো নাগো আল্লাহ। বিশ্বাস করো,, হয়তো আগেও আমি এরকম কয়েক শত বার বলেছি ভালো হয়ে যাবো। কিন্তু পরিস্থিতির কারনে হতে পারিনি। আমাকে কেনো যেনো খালি সয়তানে লারে,, আমাকে বলে পড়ালেখা থেকে দূরে থাকতে। এবার আমি সিরিয়াস!! একশো পারসেন্ট সিরিয়াস,, হেলিকপ্টার মিলনের কসম। আমি যদি এবার আমার কথা না রাখি,, আবার ফাঁকিবাজি করি,, তাহলে তুমি হেলিকপ্টার মিলনকে তুলে নিও তবুও তুমি এবার আমায় পাশ করিয়ে দাও। (নেভার সিরিয়াস, ইট্স জাস্ট ফান)

,,, পারশীর দোয়া শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো অর্পনা,, ইরাদ কম্ফোর্টারের নিচ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠলো। সকালে ফজর ওয়াক্তে জায়নামাজে বসেও মেয়েটা অনেক্ষন যাবত কাদুনি গাইছিলো। গতকাল রাতে ওর কলেজের গ্রুপ থেকে মেসেজ এসেছে ঈদের সাত দিন পর রেসাল্ট দিবে। সেই থেকে ইরাদকে জ্বালাচ্ছে মেয়েটা। একটু পরপর জিজ্ঞেস করছে “” আপু!! কিভাবে দোয়া করলে পরিক্ষায় পাশ করা যায়? আপু!! আমি কি ফেইল করবো? আপু!! আমি যদি ফেইল করি তুমি একটু আমার গার্ডিয়ান হয়ে আমার কলেজে যাবে? আপু!! আমি কি একটা বিষয়েও পাশ করবো না? আম্মু মনে হয় আমাকে অনেক মারবে। আপু!! ভাবির কথা আম্মু না শুনলেও তোমার কথা আম্মু শুনবে। তোমায় কত্তো আদর করে,, তুমি কি আম্মুকে আমার হয়ে একটু বুঝাবে? আপু!! আমাকে যদি আম্মু বাড়ি থেকে বের করে দেয় তোমার সাথে আমাকে হোস্টেলে থাকতে দিবে? আরও হাজার খানিক প্রশ্ন। প্রশ্ন করে করে কাল সারা রাত জ্বালিয়েছে মেয়েটা,, অন্যদিনকার মতো চাইলেও কাদতে পারেনি সে। অর্পনা পরশীর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিলো,, ইরাদ বিছানা ছেড়ে অর্পনাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে অবাক লোচনে তাকিয়ে রইলো —

,,, ইসস!! ময়না পাখি, তকে কত্তো সুন্দর লাগছে। এদিকে আয়,, একটু জড়িয়ে ধরি।
,,, অর্পনা নাকোচ করে বললো– মাফ কর বইন,, তরা কেউ আমায় আর জড়িয়ে টরিয়ে ধরিস না। ঐ লোক হিংসা করে।
,,, ইরাদ অবাক কন্ঠে সুধালো — কি? আমাদেরকে হিংসা করে?
,,, পরশী নাক টেনে দুহাতে লাভ সেইপ বানিয়ে বললো — মনে হয় ভালোবাসা!!

,,, আজ ২৯ রোজা শেষ,, রাত ১১ টা পর্যন্ত চাদ উঠার অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসার রুমের সোফায় বসেছে চারজন। চাঁদের উপর খুব রাগ হচ্ছে,, আজ চাঁদ উঠলে খুব ক্ষতি হয়ে যেতো? অবশ্য আজ যে চাঁদ উঠবে না এটা তারা আগে থেকেই জানতো। তবুও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো,, যদি চাঁদ উঠেই যায়। সোফায় বসতেই পরশী টিবি অন করলো। বাড়িতে ঈদ ঈদ আমেজ তাই কিছুটা সাউন্ড বারিয়ে ফোন থেকে গান প্লে করলো,, ইরাদ ক্লান্ত হয়ে সোফায় গা হেলিয়ে দিলো। মেধা বাচ্চাওলা মুরগীর ন্যায় ঝিমাতে ঝিমাতে অর্পনার কাধে মাথা রেখে বললো — অর্পনা!! তুমি কিন্তু আমার ভাবি হও।

,,, হুম তো?
,,, আমার অনেক মন খারাপ লাগছে,, তোমার ভাইয়া ও বাড়িতে নেই। আমার মন ভালো করার জন্য তোমার কিছু একটা করা উচিৎ।
,,, মেধার কথার মাঝে ইরাদ বললো — হুম, অবশ্যই উচিৎ ,, অর্পনা তুই তো ভালো নাচতে পারিস,, যা নেচে দেখা, পরশী একটা সুন্দর দেখে গান প্লে করোতো।
,,, অর্পনা মানা করলো না,, নাচতে তার ভালোই লাগে সেটা বন্ধুদের সাথে হোক কিংবা দ্বীপের মাথায় উঠে। নাচানাচিতে বেশ পারদর্শী সে। অর্পনার পরনে লাল শাড়ি। শাড়িটার মাঝখানে লাভ সেইমের হোয়াইট কালারের রং করা। এই শাড়িটা ওকে মেধা নিজ হাতে বানিয়ে দিয়েছে,, ওকে বেশ মানিয়েছেও শাড়িটা দিয়ে। অর্পনা টিবির সামনে গিয়ে দাড়ালো,, টিভিতে ধীরে ধীরে “” শাড়িকে ফাল সা”” গানের রিলিক্স বেজে উঠলো । তখনি দরজায় কলিং বেল বাঝলো,, পারশি ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ভিতরে ঢুকলো দ্বীপ,, অর্পনা ততোক্ষণে নাচ শুরু করে দিয়েছে।দ্বীপকে দেখে ওর দিকে এগিয়ে এলো

Saya jabse mila tera say
Bhaya mujse harbar tu bhaya
(দ্বীপকে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে চারপাশে ঘুরতে লাগলো )
Laayaa sapne hazar tu laaya
( হঠাৎ পরে যেতে নিলে ধরে ফেললো দ্বীপ, হালকা ধমকের স্বরে বললো — মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? অর্পনা পাত্তা দিলো না)
Aise aise haan aise aise aise jeise
Aaya jabse hay eyaar tu ayaa
,, (দ্বীপের হাতে শাড়ির আচল দিয়ে চলে যেতে নিয়ে টান খেয়ে আবার ফিরে এলো,, এই পর্যায়ে দ্বীপের দৃষ্টি শীথিল হয়ে এলো,, নজর আটকালো শাড়ি বেধ করে অর্পনার উন্মুক্ত উদরে যা নাচার কারনে অনেকটাই সরে গিয়েছে।)
Chayhe banke peyar tu chaaya
Laya sapna jahaar tu laya
( অর্পনা নাাচতে নাচতে দ্বীপের গলা জড়িয়ে ধরলো, সাথে সাথে মেধা পরশী আর ইরাদ দ্বীপকে নাচার জন্য রিকোয়েস্ট করতে লাগলো,, অর্পনা পা উচিয়ে দ্বীপের গালে চুমু খেলো)
Aise aise haan aise aise aise jeise
( শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো দ্বীপ, ধীরে ধীরে অর্পনার কোমরে হাত রেখে ওকে ঘুরিয়ে নিলো পরপর অর্পনার সাথে সেও যুক্ত হলো)

Sach karke sach kareke
Mere sapne sach karke
Kaha chalde bach karke
Tuch karke tuch karke
Tuch karke dil mera khuon screech kiya ree
Kabhi chor diya dil kadhi catch kiya ree
Saree ki falsa kadhi match kiyare
Kabhi chor diya dil kadhi catch kiya ree
,,, নাচের মাঝখানেই অর্পনাকে একঝটকায় কাধে তুলে নিলো দ্বীপ। কে আছে, কোথায় আছে মাথা ঘামালো না,, গটগট পায়ে হাটতে হাটতে বসার রুম ক্রস করে সিরিতে পা রাখতেই মাদকিয় কন্ঠে আওড়ালো — নাচ পছন্দ না করা আমাকে জোর করে নাচিয়েছিস,, এবার আমার পাওনা চাই।

,,, কিসের পাওনা? কি চাই আপনার?
,,, দ্বীপ গভীর শ্বাস টেনে বললো — তকেহ!!
,,, কিন্তু আপনি তো এখনো রাতের খাবার খাননি, খেয়ে তারপর,,
,,, সেজন্যই রুমে যাচ্ছি।
,,, তাহলে আমাকে ছাড়ুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।
,,, আই নিড মাই ফেভারিট ডিস!!
,,, দ্বীপের উত্তরে থমথমে মুখ করে নিলো অর্পনা,, দ্বীপের পছন্দের খাবার তো,, আর ভাবতে পারলো না রমনি,, চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। এতোক্ষণ নাচ উপভোগ করা তিন পাপি একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো,, পরশী আবারো সকালের মতো দুহাতে লাভ সেইপ বানিয়ে বললো– মনে হয় ভালোবাসা।
,,, ইরা আর মেধা খিলখিল করে হেসে উঠলো, আবারও কলিং বেল বেজে উঠেছে,, এবার মেধা এগিয়ে গেলো,, বিহান এসেছে বোধয়।

,,, মাঝরাতে দরজা ধাক্কার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো অর্পনার,, বুকে মুখ গুজে শুয়ে থাকা দ্বীপের দিকে তাকালো একবার। তাদের ঘরের দরজা কেউ কখনো এভাবে ধাক্কায় না,, প্রয়োজন পরলে কল দিয়ে তারপর দরজা খুলতে বলে,,তবুও দ্বীপের ভয়ে ধাক্কা দেওয়ার সাহস পায়না। আজ হঠাৎ দরজা ধাক্কাচ্ছে কে?তবে কি বাড়িতে সিরিয়াস কিছু হলো? অর্পনা দরজা খোলার জন্য দ্বীপকে সরাতে চাইলে আরও শক্ত করে চেপে ধরলো দ্বীপ,, গলার ভাজে শক্ত চুম্বন করলো। তখনি ওপাশ থেকে ভেশে এলো মেধার কন্ঠস্বর। সে ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাকাডাকি করছে। মেধার ডাক শুনে তৎক্ষনাৎ চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ,, দ্রুততার সাথে গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে উঠে দাড়ালো। অর্পনাও নিজেকে ঠিক ঠাক করে আধভেজা চুলগুলো খোপা করে দ্বীপের পিছু পিছু গেলো। দরজা খুলে দিতেই দ্বীপের বুকে মাথা রেখে কেদে দিলো মেধা,, বিহান একটু দূরেই মুখ কাচুমাচু করে দাড়িয়ে আছে। চোখে মুখে হাজারো অসহায়ত্ব,, দ্বীপ বুঝলো বিহান কোনো না কোনো অঘটন ঘটিয়েছে যার ফলে মধ্য রাতে তার বোন কান্নাকাটি করছে। সে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে জানতে চাইলো– কি হয়েছে?

,,, মেধা নাক টেনে আবদারের স্বরে বললো– তুমি আমাদের ডিভোর্সের ব্যাবস্থা করো ভাইয়া,, আমি বিহানের সাথে থাকবো না।
,,, বিহানের অসহায় চেহারাখানায় এবার আরও অসহায়ত্বের ভীর জমলো,, দ্বীপ সমানে মেধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে,, দ্বীপ কিছু বলার আগেই অর্পনা তাড়াহুড়ো করে বললো– গুড ডিসিশন!! তুমি চিন্তা করো না আপু। আমার পাপ্পার একটা ক্লোজ উকিল ফ্রেন্ড আছে,, আমি বললে একদিনের মধ্যে ডিভোর্স করিয়ে দিবে।
,,, অর্পনার কথায় তেতে উঠলো বিহান, ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাজালো স্বরে বললো– এই মেয়ে তুমি চুপ থাকো,, আমার সুখের সংসারে এমনি ধাও ধাও করে আগুন জ্বলছে,, আর কেরোসিন ঢেলো না।
,,, অর্পনা মুখ বাকালো,, বিহান আরও রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো। দ্বীপ মেধাকে সোজা করে সুধালো– কি হয়েছে বল, বিহান কিছু করেছে? খারাপ ব্যাবহার করেছে? গায়ে হাত তুলেছে?
,,,মেধা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো– নাহ!! এর থেকেও বড়ো অপরাধ করেছে। আমার কেক খেতে মন চাচ্ছে,, ওকে বল্লাম ফ্রিজ থেকে এনে দিতে কিন্তু দিলো না। বিনিময়ে হাজারটা বাহানা দিলো।
,,, কি বাহানা দিয়েছে?
,,, বলে,, দোকানের কেক খেলে বাবুর অসুবিধা হবে,, পেট খারাপ করবে, বমি হবে, মাথা ঘুরাবে আর-ও কতো কি। আমি বললাম হোম মেইড কেক এনে দিতে,, উনি বলেন এতো রাতে নাকি হোম মেইড কেক পাওয়া যাবে না,, কেউ নাকি বানিয়ে দিবেনা। (অর্পনার দিকে তাকিয়ে) অর্পনা!! তুমি ই বলো,, ও যদি আমার এটুকু আবদার না রাখতে পারে তাহলে ওর সংসার কেনো করবো আমি? করবো না সংসার,, তোমার উকিল আঙ্কেলকে কল দেও আমি ওকে এখুনি ডিভোর্স দিবো।

,,, অর্পনা চোখের ইশারায় আসস্থ করলো মানে বিষয়টা দেখছে,, বিহান এবার অসহায় কন্ঠে বললো— ভাই ওকে একটু বুঝা,, আমি ১১ টা পেইজে নক করেছি। সব কেক মেকাররা জানালো আগামিকালের আগে ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব না। হাজার অনুরোধ করেও কাউকে রাজি করাতে পারিনি। ওকে এটা বুঝতে হবে না? ও কি এখনো বাচ্চা আছে? ২৭ বছর বয়সে এসে এতো বাচ্চামি করলে হয়?
,,, মেধা তীব্র অভিমান নিয়ে বিহানের দিকে তাকালো, চোখে এখনো ছলচল করা পানি। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় মেয়েদের কতোটা মুড সুইং হয় তার প্রমান স্বরুপ কিছুটা উল্টোপাল্টা বকলো মেধা– দেখলে ভাইয়া!! ও আমায় বয়সের খোটা দিলো। বললো আমি নাকি বুড়ি হয়ে গিয়েছি,, আমায় এখন আর ওর পছন্দ না, ডিভোর্সের পর একটা ছোট মোট মেয়ে দেখে বিয়ে করবে।
,,, বিহান যেনো তাজ্জব বনে গেলো– এসব আমি কখন বল্লাম ময়না? আমি বল্লাম এক লাইন তুমি বানালে কয় লাইন? বাটপার হচ্ছো না দিনদিন?

,,, মেধা ফুপিয়ে উঠলো, সে কি করবে? তার তো এখন কেক খেতে মন চাচ্ছে,, মনে হচ্ছে খেতে না পেলে এখনি জান জীবন সব ধ্বংস হয়ে যাবে,, অনেক কাদতে মন চাচ্ছে। অর্পনা জানেনা সামান্য কেক খাওয়ার জন্য মেধা এমন করছে কেনো? ও বিয়ে করে মির্জা বাড়িতে এসেছে প্রায় বছর খানিক হতে চললো মেধাকে কখনো খাওয়া নিয়ে এমন করতে দেখেনি। মেধার কান্নায় কিছুটা কষ্ট পেলো অর্পনা, বিহানের সামনে গিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বললো– এই আপনি আপুকে বকাবকি করছেন কেনো? আপনি কেমন হাসবেন্ড হয়েছেন হা? শুনেছি স্বামীরা নাকি বউয়ের আবদার মিটাতে সব করতে পারে আর আপনি সামান্য কেক রেডি করতে পারছেন না? যান গিয়ে নিজের হাতে বানিয়ে খাওয়ান।

,,, বিহান চিন্তিত স্বরে বললো– বাট, আমি তো এসব পারিনা।
,,, ছিহ!! আপনি কেক বানাতে পারেন না? এটা তো অনেক ইজি। থাক,, আপু!! বিহানের বাচ্চা তোমার যোগ্য না,, এটাকে ডিভোর্স দিয়ে দেও।
,,, এই মেয়ে,, তোমার সাথে থেকে থেকেই আমার বউ ডিভোর্স শব্দটা শিখেছে। আর ডিভোর্স পেলে আমি একা পাবো কেনো? দ্বীপ ও পাবে। তোমার হাসবেন্ড তো রান্নাই পারে না।
,,, অর্পনা ভ্রু গুটিয়ে দ্বীপের দিকে তাকালো, লোকটাকে সে হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল ভেবেছিলো। আজ ধারনাটা ভাঙলো,, দ্বীপ কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললো– রান্না জানাটা অতো আবশ্যক না,, আমি কেনো রান্না করবো? আমার বাড়িতে রান্না করার মানুষের অভাব পরেছে?
,,,অর্পনা মুখ বাকালো — বুঝেছি, বাদ দিন। কেউ কাউকে ডিভোর্স দিতে হবে না। কেক বানানোর বিষয় তো? এটা কোনো ব্যাপার হলো? চলুন আমি বানিয়ে দিচ্ছি,, আমি আবার এসবে মাল্টি ট্যালেন্টেড। আপনি শুধু আমায় একটু হাতে হাতে হেল্প করে দিবেন, পারবেন না?( বিহানের উদ্দেশ্য)
,,, বিহান অবাক কন্ঠে সুধালো– তুমি কেক বানাতে জানো?
,, অর্পনা ভাব নিয়ে পরনের টিশার্টের কলার উচু করে বললো– অফ কোর্স!! আমি পারিনা এমন কোনো কাজ আছে নাকি? হাহ!!
,,, বিহানের চোখ মুখ উজ্জল হয়ে উঠলো, অর্পনার হাত ধরতে নিলে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপ,, বিহান হাত সরিয়ে নিয়ে বললো — সিরিয়াসলি? চলো প্লিজ, এবারের মতো আমার সংসারটা বাচিয়ে দাও। তোমায় কাল আমি অনেক বড়ো একটা ট্রিট দিবো।

,,, কিচেন ক্যাবিনেটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে অর্পনা তার পরেনে কিচেন ইউনিফর্ম। বিহান ও কিচেন ইউনিফর্ম পরে দাড়িয়ে আছে তার দৃষ্টি অর্পনার দিকে স্থির,, বুঝতে চাইছে অর্পনা কিচেন ক্যাবিনেটের উপর বসে কিভাবে কেক বানাবে? দ্বীপ কিচেনের এক কোনায় বুকে হাত বেধে দাড়িয়ে আছে,, মেধা গিয়েছে পরশী আর ইরাদকে ডেকে তুলতে,, সবাই মিলে অর্পনার বানানো কেক খাবে। চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে থাকা বিহানকে সারপ্রাইজ করে দিয়ে অর্পনা ফোন বের করে বয়েজ পাঠালো —
,,, হেলো জিমিনি!! হাও টু মেক চকলেট ফ্লেভার কেক? গিভ মি ইজি রেসিপি,, কজ আমি রান্নার র ও জানি না শুধু খেতে পারি।
,,, সাথে সাথে শুরু হয়ে গেলো ওপাশের রোবটিক মহিলার মিষ্টি স্বরে বলা চকলেট ফ্লেভার কেকের রেসিপি। অর্পনা বিরক্ত হলো,, ধমকের স্বরে ভয়েজ পাঠালো —
,,, তোমাকে বলতে বলেছি? একটা ভিডিও পাঠাও যেনো দেখে দেখে বানাতে পারি।
,,, বিহানের আশাতুর মুখটা চুপসে এই টুকুনি হয়ে গেলো। এই এভিলিটি নিয়ে যদি মানুষ এতো ভাব নেয় তাহলে যারা সত্যি সত্যি কেক বানাতে পারে তাদের কি করা উচিৎ? ভেবে পেলোনা বিহান। বিহানকে এভাবে আহাম্মকের ন্যায় তাকিয়ে থাকতে দেখে নাক কুচকালো অর্পনা– আরে তাকিয়ে আছেন কেনো? আপনাকে না বল্লাম আমাকে হেল্প করতে? যান ফ্রিজ থেকে ডিম নিয়ে আসুন।

,,,,বিহান সন্দেহি কন্ঠে প্রশ্ন করলো– তুমি এখন ইউটিউব দেখে দেখে কেক বানাবে?
,,, একদমি না,, আমি তো কেক বানাতে পারি,, শুধু জিমিনিকে বল্লাম একটু হেল্প করে দিতে। যান চারটা ডিম নিয়ে আসুন,, আর ময়দা আনুন, কোকো পাওডার আনুন, চিনি আনুন, বেকিং পাওডার-বেকিং সোডা আনুন, তেল ও নিন আর ব্লেন্ডার মেশিনটা সেট করুন। (বিহান এখনো থমথমে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে) যান দ্রুত, আরে তাকিয়ে থাকলে হবে? আপনার বউ ডিভোর্সের কাগজ নিয়ে এলো বলে।
,,,, বিহান তপ্ত শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো,, কোন পাগলের পাল্লায় পরেছে কে জানে? ঘরের ঘরনি এক পাগল সাথে জুটেছে আরেক পাগল, দ্বীপকে তো আগে থেকেই সামলাচ্ছে সে। এই তিনজনকে সামলাতে গিয়ে কবে না জানি বিহান নিজেই পাগল হয়ে যায়। অগত্যা ফ্রিজ থেকে গুনে গুনে চারটা ডিম নিলো, ময়দা, কোকো পাওডার,বেকিং সোডা, বেকিং পাউডার,চিনি সব নামালো,, ব্লেন্ডার মেশিনটা সেট করতেই অর্পনা হুকুম করলো — ঐযো ওই বাটিটা নিয়ে চারটা ডিম ভাঙুন,, কুসুম মিশাবেন না, কুসুম গুলো আরেকটা বাটিতে সাইড করুন এইযে এভাবে।
,,, বলেই ফোনটা বিহানের সামনে ধরলো,, বিহান বাটি নিয়ে সেই মতে ডিমের কুসুমগুলো আলাদা বাটিতে রাখলো।

,,,, এবার ওগুলো ব্লেন্ড করুন, একদম ফ্যানা ফ্যানা বানাবেন। এইযে এই রকম।
,,, বলে আবারও ফোনটা দেখালো,, বিহান সেটা দেখে ব্লেন্ডার মেশিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাটি ভর্তি হওয়া আগ পর্যন্ত ফ্যানা বানালো।
,,, পারফ্যাক্ট!! আপনি ভালোই কাজ করতে পারেন। এবার কুসুম গুলো ঢেলে দিয়ে আবার ব্লেন্ড করুন।
,,, বিহান তাই করলো,, অর্পনা পা ঝুলাতে ঝুলাতে বলতে লাগলো।
,,, এবার এক কাপ চিনি দিয়ে মিক্সড করুন।
,, আধা কাপ তেল দিন।
,,, এক কাপ ময়দা দিন।
,,, আধা কাপ কোকো পাওডার দিন।
,,, এক চামচ বেকিং সোডা,, আধা চামচ বেকিং পাউডার আর এক চামচ ভ্যানিলা অ্যাসেন্স দিন।
,,, এক চিমটি লবন দিন। ওয়েট!! এই চিমটি আবার কি? আচ্ছা!! চিমটি কি? ( বিহানের দিকে প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে)

,,, বিহান কটমট করে তাকালো,, এমনি বড়ো বড়ো কথা বলে তাকে দিয়ে সব কাজ করাচ্ছে এখন আবার চিমটি মানে জানেনা। সে বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনী আঙ্গুল দুদিকে ছড়িয়ে লবনের বক্স থেকে এক চিমটি লবন নিয়ে দাতে দাত চোপে বললো — এটাকে বলে চিমটি,, বুঝতে পারছো?
,,, অর্পনা উপর নিচ মাথা ঝাকিয়ে ইনোসেন্ট হাসি দিয়ে বললো — ওহ!! এটা? বুঝতে পেরেছি। ওকেহ!! এবার এই এক চিমটি লবন ওটাতে দিন। তারপর সবগুলো একসাথে ব্লেন্ড করুন।

,,, বিহান এতোক্ষণে যা বুঝার বুঝে গিয়েছে। এই মেয়ে কোনো কাজের না। শুধু খাওয়া আর ঘুরে বেড়ানো বাধে কিছু পারেনা। উপরের ঘরে যা ভাব নিয়েছে সব ফাপা আওয়াজ ব্যাতিত কিছুই না। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবগুলো একসাথে ব্লেন্ড করলো। ডিমের পরিমান বেশি থাকায় দুধ দেওয়ার প্রয়োজন পরেনি আর এমনিতেও মেধা দুধ খেতে পারেনা। গন্ধ শুনলেই বমি করে দেয়। অনেকটা সময় নিয়ে কেকের মিশ্রণটা পারফেক্ট ভাবে তৈরি করলো বিহান। অর্পনা উকি ঝুকি দিয়ে দেখছে বার বার,, একবার ফোনে তাকাচ্ছে আরেকবার বিহানের তৈরি মিশ্রণের দিকে তাকাচ্ছে। অর্পনার কাজকর্মে বেশ মজা পাচ্ছে দ্বীপ মেয়েটা একটু বেশি ই দুষ্ট না? মিশ্রণ রেডি হতেই অর্পনা দূরে একটা গোল বাটি দেখিয়ে বললো– ওইতো ওটাতে তেল ব্রাশ করে একটা প্যাপার দিন তারপর মিশ্রণটা ঢালুন।
,,, বিহান অর্পনার কথা মতো কাজ করলো,, অর্পনা একটা বড়ো করে নিশ্বাস ছেড়ে দুহাত ঝেড়ে বললো– আপনি ভাই হিসেবে কলার খোসা হলেও হেল্পার হিসেবে মাশা-আল্লাহ। হেল্প করার জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। যান এবার এটা ওভেনে রেখে আসুন।

,,,, অর্পনার হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে মাত্রই বড়ো একটা কাজ শেষ করে সস্থির নিশ্বাস ফেলেছে। বিহান চোখ ছোট ছোট করে জিঙ্গেস করলো — এতোক্ষণ আমি তোমাকে হেল্প করছিলাম?
,,, অবশ্যই!!
,,, এটা তুমি বানিয়েছো?
,,, তাহলে আবার কে? আমি ই তো বানালাম।
,,, সিরিয়াসলি? তুমি তো ওখানে বসে বসে শুধু হুকুম করছিলে,, সব কাজ তো আমি করলাম।
,,,অর্পনা চোখ রাঙালো– চুপ থাকুন,, কেক ম্যাকারের থেকে বেশি বুঝেন? কেক ম্যাকার যা বলবে তাই সঠিক।
,,, কেক ম্যাকারটা কে? তুমি?
,,, অবশ্যই,, এভাবে জিজ্ঞেস করার কি হলো? যান এটা ওভেনে দিয়ে আসুন। ইসস!! কত্ত মেহনত হয়ে গেলো,,
,,, বলেই ফোন দিয়ে বাতাস করতে লাগলো,, কিচেনে তো এসি থাকে না,, মেয়েটা সত্যি ই ঘেমে গিয়েছে। অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকালো,, লোকটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। অর্পনা একটা উরন্ত চুমু ছুড়ে দিয়ে বললো — হাসবেন্ড!! আপনার কাছে ক্যাস হবে?
,,, দ্বীপ পকেট হাতরে ওয়ালেট খুজলো কিন্তু পেলো না। বিহান ততোক্ষণে ওভেনে কেক বসিয়ে ফিরে এসেছে। অর্পনা এবার বিহানের কাছে চাইলো। ভাগ্যক্রমে বিহানের পকেটে ওয়ালেট ছিলো। বিহান ওয়ালেট বের করে সতেরো হাজার টাকা কেস এগিয়ে দিলো। অর্পনা টাকাগুলো নিয়ে বিহানকে প্রশ্ন করলো — বিহানের বাচ্চা!! আপনি জানেন পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্টি বাতাস কোনটি?

,,,, বিহান অনিহা নিয়ে প্রশ্ন করলো– কোনটি?
,,, অর্পনা টাকা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললো — অবশ্যই টাকার বাতাস। এবার বলুন পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর শব্দ কোনটি?
,,, বিহান তড়িৎ গতিতে প্রতিত্তর করলো– টাকার শব্দ?
,,, ধূর!! আপনি একটা বোকা। টাকার কি মুখ আছে যে সে শব্দ করবে? পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হচ্ছে এটি এম বুথ থেকে টাকা বের হওয়ার শব্দ। টাকার ঘ্রাণ হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঘ্রান,,টাকা ইজ টাকা। টাকা দিয়ে আপনি সব সুখ কিনতে পারবেন,, একটা সিক্রেট বলি? ( শেষের কথাটা একটু ফিসফিস করে বললো)
,,, বিহান ও অর্পনার মতো ফিসফিস করে বললো — বলো, শুনছি।
,,, আপনার ভাইকে আমি টাকা দিয়েই কিনেছি,, থাক!! ওনাকে আবার বলতে যাইয়েন না। পরে আমাকে ধরে পিটাবে।
,,, বিহান ভ্রু কুচকালো, অত্যন্ত নাটকিয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করলো — পিটাবে কেনো? তুমি না ওকে টাকা দিয়ে কিনেছো? ও তো তোমায় ভয় পাবে,, তুমি না ওর মালিক ?
,,, অর্পনা মুখটা কাদো কাদো করে নিলো, যেনো তার থেকে দুঃখি আর কেউ নেই — আর বলিয়েন না ভাইয়া,, আপনার ভাই তো ভালো মানুষ না। মালিক কে চাকর বানিয়ে রাখে,, বজ্জাত তো।
,,, বিহান মাথা ঝাকালো, অর্পনার সাথে সে সহমত। পরপর সিরিয়াস কন্ঠে সুধালো — তুমি এই ড্রামা কই থেকে শিখেছো?
,,, জন্মগতই,, আমি জন্মের পর থেকেই ড্রামায় পারদর্শী। আপনি কই থেকে শিখেছেন।
,,, আমার একটা বদমাশ বোন টোন আছে ঐটার কাছ থেকে।
,,, অর্পনা বুকে হাত রেখে সামান্য ঝুকলো– মাই প্লেজার। ভাবতেও পারিনি আমার প্রতিভা এতোটা মুল্যায়ন পাবে,, এগেইন ধন্যবাদ।

,,, এই পর্যায়ে দুজনেই শব্দ করে হেসে ফেললো,, ওদের হাসতে দেখে দ্বীপের মুখেও হাসি ফুটলো। অর্পনা আর বিহানের সম্পর্কটা অন্যরকম, দুজন এমন ভাব করবে যেনো কেউ কাউকে দেখতে পারেনা। ঝগড়া করবে, তর্কাতর্কি করবে আবার একসাথে আড্ডাও দিবে। আর বিহান হচ্ছে সর্বোচ্চ গুনের অধিকারি। সাধারনত মানুষের গুনা বলি এক রকম হয়। কিছু মানুষ থাকে গম্ভীর, সিরিয়াস কিছু মানুষ রগচটা, বেখেয়ালি আবার কিছু মানুষ থাকে বুঝদার, মিশুক। বিহান বেখেয়ালি আর রগচটা ব্যাতিত বাকি সব গুন নিয়ে জন্ম নিয়েছে,, সে দ্বীপের বেলায় সবচেয়ে বুঝদার আর ধৈর্য শীল। মেধার বেলায় অত্যন্ত যত্নশীল, অর্পনার বেলায় ঝগড়াটে, মিশুক,, পরশির বেলায় পরশির মতোই বাচ্চা, পরিবারের ক্ষেত্রে বেশ সিরিয়াস। রাজনীতির ক্ষেত্রে গম্ভীর আর ক্রাইম সিন গোপন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শান্ত,, সে কখনো রাগে না,, রেগে কিছু করেনা,, খু*ন কিংবা লা*শ কা*টার সময় ও তার অভিব্যাক্তি থাকে শুন্যর কোটায়। কাউকে মারার সময় তাকে দ্রুত শ্বাস নিতেও দেখা যায়না, সে কাউকে শক্তি খাটিয়ে আঘাত ও করেনা। সে এমন ভাবে আঘাত করে যেনো ভিক্টিম যন্ত্রণায় কাতরাবে কিন্তু সে থাকবে শান্ত, অভিব্যাক্তি হীন।
,,, ওদের আড্ডার মাঝে রান্নাঘরে উকি দিলো মেধা, ওভেন থেকে কেকের ঘ্রান আসছে। বিহান এক হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলো, সে একবার অর্পনার দিকে তাকিয়ে ভাইয়ার দিকে তাকালো। তখন ডিভোর্স চেয়ে এখন গিয়ে বুকে মুখ গুজলে বিষয়টা কেমন দেখায় না? ভাইয়া কি ভাববে? দ্বীপ বোনের মনোভাব বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বিহানের কাছে যাওয়ার জন্য ইশারা করে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। মেধা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতেই বিহান ওকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো, চুলের ভাজে চুমু খেয়ে বললো — আমাকে ডিভোর্স দিবে?

,,, মেধা মাথা ঝাকিয়ে বললো– ওহুম দিবো না।
,,, অনেক বেশি কেক খেতে মন চাচ্ছে?
,,,, আমার না, বেবির খেতে মন চাচ্ছে!!
,,, বিহান মুচকি হাসলো, মেধার পেটে হাত রেখে বললো– তাই? সব দোষ বেবির ? বেবির মাম্মার কোনো দোষ নেই?
,,, ওহুম, বেবির মাম্মা বড্ডো ইনোসেন্ট।
,,, বুঝলাম,, আর একটু অপেক্ষা করো রানি,, কিছুক্ষণের মাঝেই হয়ে যাবে।
,,, মেধা মাথা ঝাকালো,, অর্পনা নাক কুচকে ওদের দিকেই তাকিয়ে। পাশের বাড়ির কূটনি চাচিদের মতো নাক সিটকে বললো — ছি ছি ছি!! কি দিনকাল এলো,, বড়ো ভাবির সামনে কি শুরু করে দিয়েছে। আল্লাহ মাফ করো, তওবা তওবা।
,,,, বিহান এক হাতে চর উঠিয়ে বললো– মার খাবে।
,,, অর্পনা সমান তালে চর উঠিয়ে বললো– সেম টু ইউ।

,,, সোফায় গোল হয়ে বসেছে সবাই উদ্দেশ্য কেক কাটা। দ্বীপের অবশ্য এসবে মন নেই, সে অর্পনার পাশে বসে ফোন স্ক্রল করছে। অর্পনা সেই চিরচারিত নিয়মে সোফার উপর পা তুলে ইয়োগা স্টাইলে বসেছে, ক্ষনে ক্ষনে দ্বীপের কাধে মাথা রাখছে আবার তুলছে, পাশে বসা ইরা আর পরশীর সাথে কথা বলছে। মেধা কেক কাটা নিয়ে এক্সাইটেড। বিহান ধীরে ধীরে মোল্ড থেকে কেকটা আলাদা করলো,, প্রথম বারেই খুব ভালো কেক বানিয়েছে সে। মেধা স্লাইস স্লাইস করে কেকটা কাটলো,, কিছুটা বাড়ির বাকিদের জন্য রাখলো,, একটু পরেই সবাই সেহরি খাওয়ার জন্য নেমে আসবে। মেধা কেটে রাখা কেকের টুকরো গুলো টি টেবিলের উপর রাখলো। ইরাদ মির্জা বাড়িতে আসার পর সবার সাথে মিশতে পারলেও খাবার খাওয়ার দিক দিয়ে বেশ নাজুক। অন্যের বাড়িতে গেলে যেমনটা হয় আরকি। অর্পনা নিজ থেকেই কেকের টুকরো এগিয়ে দিলো, পরপর নিজেও নিলো। এক কামর খেয়ে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিতেই দ্বীপ নাকোচ করে বললো — আমি এসব লাইক করিনা, জানেই তো।

,,, অর্পনা মানলো না একপ্রকার জোর করে খাওয়ালো। দ্বীপ অল্প করে মুখে নিয়ে বললো — মেসেজ সিন করো।
,,, অর্পনা ভ্রু কুচকে ফোনের স্ক্রিন অন করতেই দেখলো দ্বীপ মেসেজ পাঠিয়েছে — আমি তোমায় চাকর বানিয়ে রাখি?
,,, অর্পনা রিপ্লাই করলো — অবশ্যই, সেদিন না সবার সামনে মেইড বললেন?
,,, দ্বীপের ঠোট প্রসারিত হলো, সে রিপ্লাই করলো — সমস্যা নেই মেইড থেকে বেবির মাম্মাতে ট্রান্সফার করে দিবোনে।
,,, অর্পনা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রিপ্লাই করলো — নো!! আমি বেবি লাইক করিনা। আমরা কখনো বেবি নিবো না। ওকে?
,,, দ্বীপ ভ্রু গুটালো — হোয়াই? এনি রিজন?
,,, তেমন কিছুই না,, আমার বেবি চাই না। ওসব আমি নিবো না।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৪

,,, দ্বীপ বোধয় সন্তুষ্ট হলো না, মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেলো, অর্পনা আড় চোখে দেখলো সেটা। অর্পনা সংসার করবে এটাই কখনো ভাবেনি তার উপর বাচ্চা। সংসার, বাচ্চা, পিছুটান এসব তো অর্পনার কাম্য ছিলো না। হুট করেই দ্বীপ মির্জার প্রতি আসক্ত হয়ে গেলো সে,, ভালোবেসে ফেললো, বিয়েও করে ফেললো, এখন সংসার করছে, বাচ্চা নিয়ে এখনো ভাবেনি। আর, আরও একটা কারন রয়েছে,, সেটা সমাধান না হওয়ার আগে বেবি নেওয়া ইম্পসিবল। আরও একটা প্রান পৃথিবীতে এনে কষ্ট দিতে পারবেনা, অসম্ভব!!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here