ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৫
অনামিকা আহমেদ
আজ সকাল সকাল ডিউটি থাকায় খুব ভোরেই ইশতিহার কে নরম বিছানা আর বউয়ের উষ্ণ পরশের মায়া ত্যাগ করে উঠতে হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভিজে চুল গুলোকেই কোনরকম আঁচড়ে ঠিক করে নিচ্ছে। পরনে ক্রিম রঙের শার্ট ইশতিহার এর শ্যামলা গায়ে মারা*ত্মক লাগছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ব্যস্ত হাতে নিজের আইডি কার্ড টা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই আয়নায় চোখে পড়ায় সে দেখতে পায় রূপ দরজার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে সলজ্জ চোখে তাকে দেখে যাচ্ছে, হাতে চায়ের কাপ, কিন্তু আদেও সেই চা গরম আছে কিনা কে জানে। ইশতিহার একটু বাকা হাসি দিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হতেই চুরি করে ধরা পড়বার মতো রূপ একবার থরথরিয়ে কেঁপে উঠে। হাত থেকে পিছলে চায়ের কাপ টা আর একটু হলেই পড়ে যেত, কিন্তু ইশতিহার ঠিক সময়ে তার হাত চেপে ধরে।
রূপের চোখে লজ্জার মাত্রা বেড়ে গেছে, আর ইশতিহার এর চোখে চেয়ে গেছে মুগ্ধতা। সদ্য গোসল সেরে আসা তার রূপপরীর সেই স্নিগ্ধ চেহারায় লেপ্টে থাকা ভিজে এলোচুল, রাঙ্গা হয়ে উঠা গাল আর ওষ্ঠযুগল আর সবশেষে তার টানা টানা হরণীর মত চোখ দুটো, আজ কোনো কিছুই ইশতিহার কে তীব্র আকর্ষণ করতে ছাড়ল না।
কিন্তু রূপের নজর ছিল অন্য জায়গায়। ইশতিহার এর মাথার ভেজা চুল লক্ষ্য করার সাথে সাথেই সে টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা রেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মাথা মুছতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইশতিহার কোনরূপ বাধা দেয় না, শুধু দেখে যায় তার সদ্য অষ্টাদশে পদার্পণ করা বউ কে।
” চুলগুলো ভালো করে মুছেননি কেনো? পানি পড়ছে যে, এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”
রূপ কে এবার নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ইশতিহার গম্ভীর গলায় বলে,
” লাগুক, তাতে যদি স্ত্রীর একটু আদর সোহাগ পাওয়া যায় তবে ক্ষতি কি?”
ইশতিহার এর কথাটা শুনতেই রূপের হাত থেমে যায়। চোখ সরু করে ইশতিহার এর দিকে তাকিয়ে রূপ বলে উঠে,
” এমনভাবে বলছেন যেনো আপনাকে আমার কাছে আসতে দেইনা?”
” দিস নাই তো, ওটাকে কি কাছে আসা বলে? সবসময় শুধু পালিয়ে পালিয়ে বেড়াস আমার থেকে।”
” হয়েছে আর অভিযোগ করতে হবে না। চা এনেছি, খেয়ে উদ্ধার করুন।”
রূপের কথা শুনে ইশতিহার মুচকি হাসে। রূপ কে ছেড়ে দিয়ে চায়ের কাপ টা হতে নিয়ে চুমুক দেয়। তবে প্রতিটা চুমুকের মাঝে ও তার চোখ যেনো রূপের দিকেই নিবদ্ধ।
” কি দেখছেন এত? আগে দেখেননি আমায় কখনও?”
ইশতিহার চায়ের কাপটা রেখে আবারও রূপ কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলে,
” আগে তো বোন হিসেবে দেখতাম, এখন তো বউ হিসেবে দেখব, ফিলিংসটাই আলাদা, ও তুই বুঝবি না। ছেলে হলে বুঝতি।”
রূপ ইশতিহার কে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে সতর্কতার সাথে বলে,
” কি করছেন দিনে দুপুরে, কেও চলে আসলে মহা কে*লেংকারি হবে।”
ইশতিহার কিছু বলে না। শুধু মাথাটা দুলিয়ে একটুখানি শেষে ব্যাগটা কাঁধে নেয়। তবে শেষ বারের মতো রূপ তে দেখে নেওয়ার সময় হঠাৎই তার চোখে পড়ে রূপের গলার পাশে থাকা খয়েরি লাল রঙের একটা দাগ, যেটা এতক্ষণ রূপের চুল দিয়ে ঢাকা ছিল।
ইশতিহার এর বুঝতে এক মুহুর্ত লাগলো না এটা কাল রাতে তাদের মধ্যকার আদর সোহাগের ফল। তার মাথায় কিছু একটা আসতেই সে রূপ তে ডাক দিয়ে বলে,
” শোন আজকে রুপম এর সাথে বেশি সময় কাটাবি। আর একটু পর পর ঘাড়ের ওপর থেকে চুল সরিয়ে পেছনে ঠেলে দিবি।”
” কেনো?”
” অত প্রশ্ন করিস না, যা বলেছি সেটা করবি।”
এই বলে ইশতিহার গটগট করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। এদিকে রূপ এতক্ষণ বিছানা গোছাচ্ছিল, ইশতিহার এর কথা কানে যেতেই সে তাজ্জব বনে গেল। ক্ষণে ক্ষণে লোকটার চিন্তা ভাবনা পরিবর্তন হয়, সে যে আসলে কী চায় সেটা একমাত্র সেই জানে।
কালকে রাতে ডাইনিং টেবিলে ঘটা ঘটনাটা রুপম কে ভীষণই ভাবাচ্ছে, শুধু ভাবাচ্ছে বললে ভুল হবে রীতিমতো চিন্তায় কাল সারা রাত ঘুমাতে পারে নি। গভীর রাতে সে রূপের ঘরে গিয়েছিল, সেখানে খালি বিছানা দেখে রুপমের কোনো সন্দেহই রইল না যে রূপ কাল সারা রাত ইশতিহার এর ঘরে ছিল। বিষয়টা ভাবতে ভাবতেই তার মাথা গরম হয়ে আসে। রূপ তো তার, কিন্তু তার অগচরে রূপের গায়ে অন্য পুরুষের ছোঁয়া লাগবে সেটা সে কিছুতেই মেনে নিবে না।
হঠাৎ সিঁড়ির দিকে নজর পড়তেই ইশতিহার কে নামতে দেখে রুপমের মাথায় একটা ফন্দি খেলে যায়। সে তো দমবার পাত্র নয়, একবার যখন ভেবে নিয়েছে রূপ তার, তখন সে রূপ তে কেড়ে নিবেই। পরিকল্পনা মত সিঁড়ির একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে হাতের কফিটা শেষের তিন সিঁড়িতে ঢেলে দেয়। এতে পিচ্ছিল সিঁড়িতে পারা দিয়ে ইশতিহার পা পিছলে পড়ে হাত পা ভাঙ্গবেই, কপাল ভালো থাকলে প্রাণে মারাও পড়তে পারে। কিন্তু রুপম কে অবাক করে দিয়ে ইশতিহার শেষের তিন সিঁড়িতে পারা না দিয়ে পাশ দিয়ে লাগিয়ে নিচে নামে।
এপ্রোনের বোতাম গুলো লাগাতে লাগাতে সে পেছন ফিরে রুপমের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। এ যেনো তার বিজয়ের হাসি। রুপমের গা জ্বলে যায়। আজ এ বাড়িতে কেও না থাকলে নির্ঘাত সে ইশতিহার কে জানে মেরে দিত। কিন্তু কিছু একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতেই যাবে ঠিক তখনই রূপের স্নিগ্ধ ডাকে তার জ্ঞান ফিরে।
” ভাইয়া এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে কি করছেন? চলুন নাস্তা করে নিবেন।”
রুপম একটা জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলে,
” হ্যাঁ চলো।”
এই বলে পা বাড়াতেই যাবে ঠিক তখনই তার চোখ যায় রূপের গলার সেই খয়েরি দাগের ওপর। প্রথম দিকে না বুঝলেও পরে সবকিছু তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্রো*ধে সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। রুপম দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলে উঠে,
” ইশতিহার আমার রূপের শরীর স্পর্শ করার মূল্য তোকে চোকাতেই হবে, খুব খারাপ ভাবে চোকাতে হবে।”
আজ প্রায় দশটা বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখেছে আদনান। চোখের সামনে সবকিছু তার অপরিচিত। চোখের সামনে থাকা সানগ্লাস টা নামিয়ে বেশ তীক্ষ্ণ চোখে সে পর্যবেক্ষণ করছে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই আদনান দেখতে পায় একদল কালো পোশাক পরিহিত বডিগার্ড তার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পেছনে একসারি বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়ানো। সেখানকার বাকি প্যাসেঞ্জাররা তাকে ঘুরে ঘুরে দেখছে, কিন্তু আদনান সেসবে মাথা না ঘামিয়ে নিঃশব্দে তাদের দিকে এগোয়।
নিজেদের বস কে চোখের সামনে দেখতেই বডিগার্ড গুলো ঝুঁকে তাকে সম্মান জায়গায়। তারপর একজন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলে,
” স্যার, গাড়িতে উঠে পড়ুন। বাংলো তৈরি আছে। আমরা সেখানেই যাবো।”
কিন্তু আদনান পা বাড়ায় না। সে বলে,
” নাহ, বাংলো তে আমি এক সপ্তাহ পর যাবো। এই সাতটা দিন নিজের বন্ধুবান্ধবের সাথে কাটাবো, তোমরা এটা পাপা কে জানিয়ে দাও। আর আমার জন্য একটা পার্সোনাল কারের ব্যবস্থা করো।”
আদনান এর কথা মত সব ব্যবস্থা করা হলো। আদনান নিজেই গাড়ি চালিয়ে রওয়া এ দিলো নিজের ছোটবেলার বন্ধু ইশতিহার এর বাসার উদ্দেশ্যে। আজ ইশতিহার এর আসারই কথা ছিল কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে আসতে পারে নি।
একনাগাড়ে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। নেটওয়ার্ক খারাপ থাকায় আদনান ইশতিহার এর বাড়ির সঠিক লোকেশন পাচ্ছে না। ঢাকার রাস্তাঘাটের সাথেও তেমন পরিচিত না সে, সেই কবে দশ বছর আগে এসেছিল কিছুই মনে নেয় তার।
বেশ কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি একটু থামলে আদনান গাড়ি থেকে নামে। ঝিরঝির করে পর বৃষ্টি তার গায়ের স্যুটটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে তো মোবাইল হাতে নিয়ে নেটওয়ার্ক পেতে ব্যস্ত। একের পর এক কল করে যাচ্ছে ইশতিহার কে। এদিকে ইশতিহার আদনান এর কল রিসিভ করলেও আদনান এর কথা কিছুই শুনতে পারছিল না।
আদনান একসময় রাগে নিজের ফোন টাই আছাড় মারে পিচঢালা রাস্তার ওপর। তারপর দু হাত দিয়ে ঘাড় চেপে ধরে বলে,
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৪
” সব কিছু পরিবর্তন হলেও নেটওয়ার্ক প্রবলেম ঠিক হলো না। যে কে সেই রয়ে গেলো।”
এই বলে আদনান গাড়িতে উঠতেই নিবে ঠিক সেসময় তার চোখ গেলো দূরের এক বিশালাকায় বাড়ির বারান্দায় দিকে। পূর্ণিমার রাতে যেমন চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় তেমনি এই অন্ধকার গুমোট আবহাওয়ার মাঝে একটা মেয়ে নিজের হাত আর মুখ বাড়িয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি উপভোগ করছে। আদনান এর চোখে মায়া লেগে যায়। সে ঘোরে এতটাই ডুবে যায় যে তার মনেই থাকে না তার গন্তব্যস্থল কোথায়? আদনান মুগ্ধ চোখে সেই বাড়িটা অনুসরণ করে এগিয়ে চলতে থাকে। যত কাছে আসছে মেয়েটার মায়াবী রূপ তাকে যেনো আরো আকর্ষণ করছে। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠে,
” কে তুমি মায়ামোহিনী, কি তোমার পরিচয়? তোমার রূপের সাথে সাথে কি তোমার পরিচয়ের ও সন্ধান মিলবে?”
