Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২০

নূর ই মহব্বত পর্ব ২০

নূর ই মহব্বত পর্ব ২০
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– আজকে সকালে দেখলাম তোমাদের বাড়িতে একটা ছেলে এসেছে। শুধু আজকে না কদিন ধরেই দেখছিলাম! তা কে এই ছেলে? হঠাৎ তোমার খোঁজে এত আসে কেন?
প্রভার এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় অপমান বোধ করলো নওমি। মুখ থমথমে হয়ে এলো। ওর খুব ইচ্ছা করছিল কড়া কিছু শুনিয়ে দিতে, কিন্তু নিজের ভেতরের আত্মসম্মানবোধ আর স্কুলের পরিবেশের কথা চিন্তা করে সে নিজেকে শক্ত রাখল।

– আমার বাড়িতে কে আসবে আর কে আসবে না, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত বিষয় প্রভা আপা।
প্রভা মুখ বাকিয়ে বললো,
– হু বেশ বুঝতে পারছি!
নওমিও কম গেল না। সেও ত্যাড়া কণ্ঠে জবাব দিল,
– বুঝতে পারলেই ভালো! আর উনি কোনো যেন তেন ‘ছেলে’ নন, উনি আমার কাছে অত্যন্ত সম্মানের একজন মানুষ। অন্যকে নিয়ে চর্চা করার চেয়ে নিজের ক্লাসের দিকে মনোযোগ দিলে মনে হয় স্কুলের বেশি লাভ হতো।
প্রভার মুখ অপমানে লাল হয়ে গেল। সে রেগে কিছু বলতে গেলে লামহা ধমকে উঠলো,
– চুপ থাকো প্রভা! বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু বিষয়টা ভালো হবে না! সবসময় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত সস্তা কথা কীভাবে বলো? এটা তোমার লাস্ট ওয়ার্নিং!
যেহেতু সিনিয়র টিচার তাই প্রভা চুপসে গিয়ে বললো,
– স্যরি ম্যাম। আমি আসলে আদনানের কথায় জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম।
– নওমি যথেষ্ট রেস্পন্সিবল সেটা তুমি স্বীকার না করলেও জানো ঠিকই তাই আদনানকে যেহেতু রেখে এসেছে নিশ্চয়ই বিশ্বাসী কারও কাছে রেখে এসেছে।

– জ্বি।
– এই টপিক এখানেই রাখ। ক্লাসে যাও।
– ওকে ম্যাম।
প্রভা চলে যেতেই লামহা নওমিকে বললো,
– তোর ক্লান্ত লাগে না? এসব শুনতে শুনতে?
নওমি হেসে বললো,
– ক্লান্ত হয়ে গেলে কিভাবে হবে আপু? আমার যে এখনো অনেক পথ চলা বাকি। তাছাড়া, মানুষের কথায় কান দিলে তো নিজের জীবনটাই থেমে যাবে।
লামহা এক রাশ মায়া আর সহানুভূতি নিয়ে বললেন,
– তোর এই শক্ত মনটাই তোকে এত দূর টেনে এনেছে রে নওমি। তবে মনে রাখিস, সব মানুষ একরকম হয় না। নিজের জন্য না হলেও, আদনানের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভাবিস।
নওমি শুধু একটু ম্লান হাসল। ক্লাসের বাহানায় বেরিয়ে গেল স্টাফরুম থেকে।

ক্লাসের পর ক্লাস নিয়ে যখন দুপুরের দিকে নওমির ছুটি হলো, তখন মাথার ওপর কড়া রোদ। একটা রিকশা নিয়ে সে দ্রুত বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ছেলেটাকে অনেকক্ষণ দেখে না! এখন পর্যন্ত এত সময় ওকে ছাড়া থাকে নি সে! রিকশা যখন আপন গতিতে চলছে তখন প্রভার সেই কটু কথাগুলো ওর মনের ভেতর খিটখিট করতে লাগল। নওমি রিকশায় বসে হুডটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লামহা আপার কথাটাও ওনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আযলান যা করছে সেটা আদনানের প্রতি মায়া আর টানের কারণে হয়তো ভালবাসাও! কিন্তু সবাই তো সেটা জানে না! আজ প্রভা আঙুল তুলেছে, কাল হয়তো পুরো মহল্লা ওর দিকে কাদা ছুড়বে। না! মাথাটা ধরেছে খুব! নতুন করে আর কোনো অপবাদের মুখোমুখি হওয়ার শক্তি ওর নেই। সে মনে মনে ভাবলো, “আযলানকে কি মানা করে দেওয়া উচিত? কিন্তু কিভাবে? আর ওনিই কি মানবে যেখানে আদনানের খবর জেনে হন্য হয়ে খুঁজেছে!”
নিজের মাথা দুই হাতে চেপে বসে রইলো সে। আযলানের এভাবে রোজ রোজ আসায় আদনানের যেমন মায়া বাড়ছে, তেমনি নওমির চারপাশের দেয়ালটাও আলগা হচ্ছে। এই মায়া যে কোনোদিন বড় কোনো ঝড়ের কারণ হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? আর ভাবতে পারছে না সে।

আযলান উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আর তার পিঠের উপর বসে আছে আদনান। ও মুখে “হুশ হুশ চল” বলে বলে আওয়াজ করছে আর আযলানের শার্টের কলারটা ঘোড়ার লাগামের মতো টেনে ধরে আছে। আযলান কোনোমতে ঘাড় ঘুরিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
– কী রে আদনান? বাপের পিঠটাকে একেবারে রেসের ঘোড়া বানিয়ে ফেললি? নাম এবার, আমার কোমরের বারোটা বাজিয়ে দিলি তুই!
আদনান ওর কথা বুঝল না, তবে আযলানের চুলগুলো মুঠো করে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর হাসি দেখে আযলানও হাসলো। সে আলতো করে আদনানকে পিঠ থেকে নামিয়ে নিজের বুকের ওপর শুইয়ে দিল। আদনান ওনার বুকের ওপর ছোট ছোট হাত দুটো রেখে বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান আবছা কথা বলতে পারে ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ সময় কম কথা বলে। এই যেমন সারাদিন একটুও বিরক্ত করে নি। আদনানের হাসি আর আনন্দে আযলান এর মনেই হয়নি এত সময় চলে গেছে। একদম শান্ত বাচ্চা হয়েছে নওমির মতো! আযলান ওর নরম গালে টোকা দিয়ে বলল,

– তোর মা তোকে অনেক ভালোবাসে রে পুটুস। তিনটে বছর একা একা এত ঝড় সামলেছে, তাও আমাকে তোর মনে খলনায়ক বানায়নি। আমি তোর মায়ের এই ঋণ কীভাবে শোধ করব বল তো?
আদনান মায়ের কথা শুনে দরজার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মা…. আআ?
– হু মা? কই তোর মা? মা মা করছিস কেন হু? আমার সাথে ভালো লাগছে না?
আদনান আযলানের শার্টের বোতাম নিয়ে নিজের খেলায় ব্যস্ত। আযলান ওর চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে দিল। আজ সারাদিন ওরা দুজন খুব আনন্দ করেছে। আদনানকে নিয়ে বাইরে ঘুরেছে অনেকক্ষণ! আজকে গাড়ি আনেনি বিধায় কাছেপিছেই ঘুরে এসেছে। আফসোসও করেছে গাড়ি আনা উচিত ছিলো। আদনানের সাথে খেলে যা বুঝল ছেলেটার গাড়ির প্রতি অনেক আকর্ষণ! অধিকাংশ খেলনায় গাড়ি আর বাইক! স্বাভাবিক নওমি যেই পরিস্থিতিতে ওকে বড় করেছে সেখানে গাড়িতে ঘুরার মতো সামর্থ্য অবশ্যই ওদের ছিলো না! ইশ আদনানকে আজ গাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারতো কেন যে আনলো না। এর মধ্যে ঘরের বেল বাজলো। আযলান উঠে বললো,
– খেলনা সব গুছা আদনান! তোর মা এসে দেখবে এই ঘরের এই অবস্থা তখন আমাকেই না বের করে দেয়!
দ্রুত হাতে আযলান খেলনাগুলো ঝুড়িতে রাখলো। বাবার দেখাদেখিতে আদনানও ছোট ছোট হাতে কয়েকটা খেলনা তুলে গুছিয়ে রাখলো। আদনানকে সোফায় বসিয়ে আযলান গিয়ে দরজা খুলে দিল। বাইরে ক্লান্ত নওমিকে দেখে হেসে বললো,

– এসে গেছো?
– হু… হুম।
আযলান দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। নওমি আযলানের দিকে তাকিয়ে দেখল ওর শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, চুলগুলো পুরোপুরি এলোমেলো। ছেলেকে সামলাতে যে ভালোই বেগ পেতে হয়েছে বেশ বুঝতে পারছে সে। নওমি নিজেই লজ্জিত হলো। কেন যে রেখে গেল আদনানকে! আযলান তো বলবেই তাই বলে ও এক কথায় রাজি হয়ে রেখে গেল! নিশ্চয় অনেক কষ্ট হয়েছে আদনানকে সামলাতে! আদনানকে তো সে চিনে যার সাথে তার ভাব হয় তাকে জ্বালিয়ে ফেলে। সে ভেতরে গিয়ে দেখলো আদনান সোফায় বসে পা দোলাচ্ছে। মাকে দেখেই ওর চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। সোফা থেকে নেমে এক দৌড়ে এসে নওমির পা জড়িয়ে ধরল সে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট একটা শব্দ করল

– মাআআ…!
নওমি হেসে ওকে কোলে তুলে কপালে চুমু দিয়ে বললো,
– হ্যাঁ বাবা? দুষ্টুমি করেছো তুমি?
নওমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আযলানের দিকে তাকালো। একটু লজ্জিত ও অপরাধী সুরে বলল,
– ওর জন্য আপনার অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না? ও তো খুব ছটফটে, একদম এক জায়গায় স্থির থাকে না। একা সামলাতে গিয়ে আপনাকে বড্ড জ্বালিয়েছে নিশ্চয়ই?
আযলান হাসলো। আদনানের গাল টেনে নওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– জ্বালানো? ও তো আমার বাঘের ছানা নওমি, ও আমাকে জ্বালাবে কেন? আর কষ্ট? নিজের ছেলের সাথে সময় কাটালে বুঝি কষ্ট হয়? ও তো আজকে একদম ভালো ছেলের মতো বাপের সাথে পুরোটা সময় কাটিয়েছে। আমরা বাইরেও ঘুরে এসেছি। তাই না রে আদনান?
আদনান হেসে মাথা নাড়লো।

আযলানের মুখে “নিজের ছেলে” আর “বাবার সাথে” শব্দগুলো শুনে নওমির বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অচেনা তোলপাড়ে মোচড় দিয়ে উঠল। রিকশায় বসে যে মানুষটাকে কড়া করে মানা করে দেওয়ার, তাড়িয়ে দেওয়ার সমস্ত জেদ সে মনে মনে পুশে এনেছিল, আযলানের এই শান্ত আর অধিকারবোধে মাখানো একটা মাত্র ডায়ালগের সামনে সেই জেদের পাহাড় যেন এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। লেখিকার পেজ লেখিকার নামে বাকিগুলো ফেক। সমাজের ভয়, প্রভার সেই নোংরা ইঙ্গিত সবকিছুকে ছাপিয়ে ওর চোখের সামনে ভাসতে লাগল শুধু একটাই দৃশ্য; ওর অসহায়, নির্বাক ছেলেটার মাথায় আজ এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। সে দ্বিধা দ্বন্দে ভুগতে ভুগতেই আযলানের শব্দ শুনল,
– কিছু কি হয়েছে? আজ অন্যরকম লাগছে?
নওমি চমকে তাকাল। আযলান কিভাবে বুঝলো? আযলান আগে এমন ছিলো। নওমির কিছু হলেই টের পেয়ে যেত! ওর চাহনি দেখে আযলান থতমত খেয়ে বললো,
– না মানে তোমাকে আজ অন্যরকম লাগছে। তছরা আমি তোমায় বুঝতে পারি ভালোভাবেই। সময় গিয়েছে কিন্তু আমার অনুভূতিগুলো ফিকে হয় নি।
আযলানের সরাসরি গভীর কথায় নওমি মাথা নিচু করে ফেললো। আযলান এখনো ওকে বুঝতে পারে? সে আদনানকে নামিয়ে দিয়ে বললো,

– আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। খেয়েছেন আপনারা?
– হ্যাঁ। তোমার খাবার টেবিলে রাখা আছে খেয়ে নাও।
নওমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো টেবিলে একটা প্যাকেট। সে আযলানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কিসের প্যাকেট এটা? আমি তো রান্না করে গিয়েছিলাম।
– আমরা বাইরে খেয়েছি তাই তোমার জন্য নিয়ে এলাম। রান্নঘকও ফ্রিজে রেখেছি চিন্তা নেই।
নওমি কিছু না বলে ফ্রেশ হতে চলে গেল। আদনান আযলানের পাশে এসে ওর হাত টেনে বললো,
– কেলব।
আদনান ওকে কোলে নিয়ে বললো,
– তোর ঘুম নেই হু? শুধু খেলা?
– নেই।
– কি?
– গুম নেই
– থাক ঘুমোতে হবে না। চল।

নওমি ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার খেয়ে নিলো এরপর আদনান আর আযলান যেখানে আছে ওখানে গিয়ে দাঁড়ালো। আযলান আড়চোখে নওমিকে দেখে বুঝলো নওমি কিছু একটা নিয়ে উশখুশ করছে। সে আদনানকে খেলতে বলে উঠে এলো। নওমি ওকে দেখে আরো অস্বস্তিতে পড়ল। আযলান স্বাভাবিকভাবেই বললো,
– কিছু বলবে? এসেছো পর্যন্ত দেখছি তুমি কেমন ইতস্তত করছো! আমাকে কিছু বলার থাকলে সরাসরি বলতে পারো! ইউ ক্যান!
নওমি কি বলবে বুঝতে না পেরে কথার তাল হারিয়ে বললো,
– আপনি কি এভাবে প্রতিদিন আসবেন আদনানকে দেখতে?
আযলান না বুঝেই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
– মানে? আসলে কোনো সমস্যা?
নওমি তারাহুরো করে বলে উঠল,
– না সমস্যা না…
– তাহলে?
নওমি একটা ঢোক গিলে সরাসরি বললো,
– আসলে আমি আদনানকে নিয়ে একা থাকি। আপনি রোজ রোজ এভাবে আমার বাসায় আসাটা সমাজ বা সমাজের মানুষ ভালো চোখে দেখবে না।
এতক্ষণে বিষয়টা ধরতে পারলো আযলান। সে বুঝলো এই নিয়ে কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সরাসরি ঘাটালো না। সে নির্বিকার ভাবে বললো,

– ভালো চোখে না দেখার কি আছে? আমি আসতেই পারি! আদনান আমার ছেলে আমি আসাটা ভালো চোখেই দেখতে হবে।
নওমি ভাবলো এই ত্যাড়া কখনো ভালো হবে না। সে কণ্ঠে বিরক্ত ঢেলে বললো,
– আপনি বললেই তো আর হবে না!
– আলবৎ হবে! আমার বউ আমার ছেলে আমি আসবো না তো কে আসবে? আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
– কিন্তু সেটা তো বাকিরা জানে না!
আযলান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আবার আদনানের পাশে গিয়ে বসে বললো,
– জানে না তো জানিয়ে দাও!
আযলানের ডোন্ট কেয়ার ভাবে দেওয়া উত্তর শুনে নওমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ওনার মুখে “আমার বউ, আমার ছেলে” শব্দগুলো এত সহজ আর স্বাভাবিকভাবে উচ্চারিত হলেও নওমির বুকের ভেতরটা আবার জোরে ধড়ফড় করে উঠল। সে কিছুক্ষণ বড় বড় চোখ করে আযলানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর কণ্ঠে সবটুকু কঠোরতা আর একরাশ বিস্ময় ঢেলে বলল,

– জানিয়ে দাও মানে? কী জানাব আমি সবাইকে? যার সাথে আমার তিন বছর কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই আজ সে হঠাৎ এসে নিজের অধিকার ফলাচ্ছে? আপনি যত সহজেই বলুন না কেন চারপাশের মানুষ এতটা সহজ নয়। তারা গল্প বানাতে ভালোবাসে। বানাতে কি বলছি এখনি বানাচ্ছে!
আযলান নওমির চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে খুব শান্ত, কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় গলায় বলল,
– তারা গল্প বানালে বানাক নওমি, আই জাস্ট ডোন্ট কেয়ার। আমরা একটা ভুল সিদ্ধান্ত এর জন্য অনেক কিছু হয়েছে কিন্তু তার মানে এই নয় যে লোকলজ্জার ভয়ে আমি আমার সন্তানকে অবহেলা করব কিংবা তার সাথে দেখা করা অফ করে দেবো! সমাজ আঙুল তুললে সেই আঙুল কীভাবে নামাতে হয়, ডক্টর আযলান আজওয়াদ খুব ভালো করেই জানে।
নওমি ওর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সামনে আর টিকতে পারল না। ওর মনে হলো, এই লোকটার সাথে যুক্তিতে জেতা অসম্ভব। তবুও সে দৃঢ়তার সাথে বলল,

– আপনি সবকিছু নিজের মতো করে ভাবেন ডক্টর আযলান। আপনার ক্ষমতা আছে, প্রতিপত্তি আছে, আপনার গায়ে কেউ কাদা ছেটাতে আসবে না। কিন্তু দিনশেষে কথা শুনতে হবে আমাকে। এই সমাজ একটা একা মেয়েকে বাঁচতে দেয় না। আজ স্কুলে আমাকে কী ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনতে হয়েছে, সেটা কেবল আমিই জানি! একটা মেয়ের চরিত্রে দাগ লাগাতে এই সমাজের এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। আমি আর কোনো নতুন অপবাদের বোঝা মাথায় নিতে পারব না।
নওমির মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল স্কুলের কথাটা। আযলানের কাছে এবার বিষয়টা পুরোপুরি ক্লিয়ার হলো। সে উঠে দাঁড়াল। চোখ মুখ শক্ত দেখে নওমি আঁতকে উঠল। কিন্তু আযলান কঠিন কিছু না বলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখল, তারপর খুব স্বাভাবিক ও নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
– অনেক তো বললে, এবার আমার একটা কথা শোনো। ভেতরে যাও, গিয়ে নিজের আর আদনানের প্রয়োজনীয় কিছু কাপড়-চোপড় একটা ব্যাগে গুছিয়ে নাও। আর হ্যাঁ, বেশি সময় নিও না, আমরা ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে বের হব।
নওমি যেন আকাশ থেকে পড়লো। কিসের ভেতর কি বলছে ওনি? সে প্রচণ্ড অবাক হয়ে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

– কী? রেডি হতে কেন বলছেন? কোথায় বের হবো?
আযলান ওর স্বভাবসুলভ প্রখর আর মায়াবী চাউনিটা নওমির চোখের ওপর স্থির রাখল।
– লোকে যাতে গল্প বানানোর সুযোগ না পায়, সেজন্য তুমি আজই আমার সাথে, আমার বাড়িতে, আমার সংসারে ফিরে যাবে। যেখানে ডক্টর আযলান আজওয়াদের স্ত্রী আর সন্তানের দিকে আঙুল তোলার সাহস আর কারো হবে না!
আযলানের এই বিস্ফো’রক কথা শুনে নওমির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ওর হৃদস্পন্দন এক লাফেই দ্বিগুণ হয়ে গেল। মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
– আপ… আপনি পাগল হয়ে গেছেন? আমি কেন আপনার বাড়িতে যাব? এটা তো…
ওনার কথা শেষ করতে দিল না আযলান। সে আরও এক কদম এগিয়ে এসে নওমির খুব কাছে দাঁড়াল। নরম সুরে বললো,

নূর ই মহব্বত পর্ব ১৯

– তোমার যত মান-অভিমান, যত রাগ, যত অভিযোগ আছে নওমি, সব আমার চেনা ঘরে, আমার বুকের ভেতর বসে কোরো। আমি সারাজীবন ধরে তোমার সেই অভিমান ভাঙাতে রাজি আছি। কিন্তু এই লোকলজ্জা আর সমাজের ভয়ে তোমাকে আমি আর একটা মুহূর্তও এই একাকীত্ব আর দুশ্চিন্তায় রাখতে পারবো না। আদনানকে ওর বাবার পরিচয় আর রাজকীয় সুখে বড় করার সময় হয়েছে। প্লিজ কথা না বাড়িয়ে যাও রেডি হও। শোনো আমার কথাটা?

নূর ই মহব্বত পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here