নূর ই মহব্বত পর্ব ১৯
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
আরো সপ্তাহ খানেক কেটে গিয়েছে। আযলানের সাথে আদনানের সম্পর্ক উন্নতি হয়েছে আদনান এখন আযলান বলতে পা-গল! আযলানকে পেলে আর কাউকে যেন লাগে না। আযলানও শত ব্যস্ততার মাঝে দিনে অন্তত একবার আদনানের খোঁজ নিতে ছুটে আসে। ওর মুখের রাশভারী গম্ভীর ডক্টর ভাবটা আদনানের সামনে এলেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
আযলানের সাথে আদনানের সম্পর্ক এভাবে তরতরিয়ে এগোলেও, নওমির সাথে সম্পর্কের সুতো যেন ঠিক আগের জায়গাতেই থমকে রয়ে গেছে। না আগাচ্ছে আর না পিছাচ্ছে। আযলান যদি নিজের থেকে দুই পা আগায়, নওমি সেখানে সম্পূর্ণ নির্বিকার। সে এক চুলও আগাচ্ছে না, আবার আযলানকে তাড়িয়ে দিয়ে পিছিয়েও দিচ্ছে না আর না নিজে পিছাচ্ছে! এক অদ্ভুত, নিস্পৃহ দেয়াল তুলে রেখেছে সে নিজের চারপাশে।
আজকে সকালে নওমি কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। মাত্রই আদনানকে নাস্তা খাইয়ে দিয়েছে। এখন আদনানের অভ্যাস হয়ে গেছে কারো না কারো সাথে থাকবে! একা খেলবে না। একা থাকলে শুধু ডাকতেই থাকবে। আযলান তৈরি করেছে এই অভ্যাস। নওমি রুমে ছিলো আর আদনান ড্রইং রুমে খেলছিল। হঠাৎ বেল বেজে উঠলো। নওমি ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
– এই অসময়ে আবার কে এলো!
ও ড্রইং রুমে আসতেই দেখল আদনান অলরেডি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নওমিকে দেখতেই হাত উঁচিয়ে দরজার খিলের দিকে দেখিয়ে বললো,
– কুলো
নওমি বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে দরজা খুলে দিল। সামনে তাকাতেই তার চোখ চড়ক গাছে। ডক্টর আযলান দাঁড়িয়ে। এই লোকটা এই সময় এখানে কি করছে? ওনার ডিউটি নেই? নওমিকে এভাবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আযলান বললো,
– ঘরে যেতে দিবে না? এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার শখ হয়েছে বুঝি? আমিই তো, ভূত নই!
নওমি চট করে সরে দাঁড়ালো। আযলান ভেতরে আসলে নওমি ইতস্তত করে বললো,
– আপনার ডিউটি নেই? চেম্বার যাবেন না আজকে? এই সময় এখানে?
আযলান ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
– উহু। আজকে পুরো সময়টা আদনানের জন্য। আজকের জন্য সব অফ রেখেছি।
নওমি চোখ বড় বড় করে তাকাল। ও কি ঠিক শুনলো? আযলান আজওয়াদের মতো একজন ব্যস্ত ডক্টর আজকের পুরো দিনটা একটা বাচ্চার জন্য অফ করে দিয়েছেন! সে আমতা আমতা করে বললো,
– কিন্তু কেন? শুধু শুধু ওর জন্য…
আযলান ওকে থামিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
– শুধু শুধু নয়, আমি আদনানের জন্য এসেছি। তোমার সমস্যা আছে? থাকলে বলো চলে যাই।
নওমি তারাহুড়ার সুরে বললো,
– না না আমি সেটা বলি নি। আমি তো আপনার ডিউটির…
– সেটা তোমার ভাবতে হবে না। একদিন ডিউটি না করলে কেউ ম’রে যাবে না!
নওমি বিড়বিড় করলো,
– ত্যাড়া লোক বুঝি আর ভালো হয় না বরং আরো ঘাড়ত্যাড়া হয়!
নওমি ভেতরে চলে গেল। নওমি চুপিচুপি বললেও কথাটা কানে এসেছে আযলানের। সে একটু হাসলো। তারপর দাঁড়িয়ে থাকা আদনানের পানে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,
– কেমন আছিস পুটুস?
আদনান বুঝলো না। আযলান গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিলো। আদনান ওর গলা জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করলো,
– পুতুচ কি?
– তুই।
– ও
ওকে নিয়ে সোফায় বসে বললো,
– আমাকে মিস করেছিস?
– হু তুমি এঁচেচ?
আযলান মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,
– এচেচ কি হ্যাঁ? “বাবা তুমি এসেছো?” এটা বলতে পারিস না? তোর মা তোকে সব শিখালো বাবা ডাকটা শিখাতে পারলো না?
পরক্ষণেই কি যেন ভেবে বললো,
– উহু! শিখিয়েছে তো! নাহয় তুই হাসপাতালে আমায় বাবা ডাকলি কি করে? ডাকলিই যখন এখন ডাকিস না কেন? চুপ করে থাকিস কেন?
আদনান ওর গলা জড়িয়ে ওরই দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে যেন বোঝার চেষ্টা করছে কি বলছে আযলান। আযলান ওর তাকানো দেখে বললো,
– সব বুঝিস শুধু আমি কি বলি ওটা ছাড়া! যখন চিনি নি তখন বাপ বলেছিস আর এখন বলতে বলি আর তুই মুখে তালা দিস!
আদনান কি বুঝে ফিচফিচ করে হেসে ফেললো। আযলানও হেসে ওকে কোলে নিয়ে ভেতরে যেতে যেতে রান্নাঘরের দিকে উঁকি দিয়ে বললো,
– তোর মা কোথায় গেল রে? রান্নাঘরে? তোর মাকেই জিজ্ঞেস করি চল। তোকে আর কি কি শিখিয়েছে।
আদনান এবার মুখ খুললো।
– চিকায় নি।(শিখায় নি)
আযলান ভ্রু কুঁচকে বলল,
– কি শিখায়নি?
আদনান জবাব না দিয়ে হেসে উঠল যেন এটা একটা খেলা আর এই খেলায় ও খুব আনন্দ পেয়েছে।
আযলান আদনানকে নিয়ে রান্নাঘরের সামনে যেতে দেখলো রান্নাঘর ফাঁকা। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে হুট করে মনে পড়ল নওমির তো স্কুলে যাওয়ার সময় হয়েছে। সে বেডরুমের সামনে গিয়ে নক করলো। ভেতর থেকে উঁচু স্বরে নওমির গলার আওয়াজ শোনা গেল,
– ভেতরে আসুন।
ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে গেল আযলান। নওমি পুরোপুরি রেডি বোরকা নিকাব পরে। সে এক পলক পর্যবেক্ষণ করে বললো,
– তুমি স্কুলে যাবে?
– হু। আপনি এই সময়ে আসবেন জানলে জানিয়ে দিতাম আসলে আদনানকে তো আমার সাথেই নিয়ে যাই।
আযলান একবার আদনানের দিকে তাকিয়ে আবার নওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– আদনান আমার সাথে থাকুক। তুমি যাও?
আদনানকে আযলানের সাথে একা রেখে যাবে? দ্বিধা দ্বন্দে ভুগছে সে। পরক্ষণেই চিন্তা করল আদনান তো আযলানের সাথে যথেষ্ট সেফ! নওমির অবস্থা দেখে আযলান ওকে আশ্বস্ত করতে বললো,
– দেখো নওমি আমি আদনানকে দেখে রাখবো। তুমি চিন্তা করো না। আর যদি…
একটু চুপ রইলো পরক্ষণে আবার বললো,
– তুমি যদি চিন্তা করো যে আমি ওকে নিয়ে যাবো তাহলে সেটা তোমার ভুল ধারণা! আমি তোমার থেকে ওকে কখনোই আলাদা করার চিন্তা করি না! তোমাকে তো আগেই বলেছি। তুমি নিশ্চিন্তে আমায় বিশ্বাস করতে পারো।
এরপর আযলান আদনানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কি থাকবে না আমার সাথে?
আদনান মাথা নেড়ে সাই দিল অর্থাৎ থাকবে। নওমি বললো,
– স্কুলে যাবে না আম্মুর সাথে?
আদনান একটু ভেবে বললো,
– না আমি কেলবো।
আযলান হেসে বললো,
– তুমি চিন্তা করো না আমি ওকে দেখে শুনে রাখবো তুমি নিশ্চিন্তে স্কুল করে আসো!
নওমি মাথা নেড়ে ব্যাগে কাগজপত্র গুছাতে লাগলো। আযলান একটু ইতস্তত করে বললো,
– ইয়ে মানে বলছিলাম তুমি আদনানকে আমাদের কথা কখনো বলো নি? না মানে এমনি বলছিলাম। ও আমাকে হাসপাতালে চিনেছিল তো তাই।
নওমি হাতের কাজ থামিয়ে একবার চোখ তুলে তাকালো হুট করে এমন প্রশ্ন শুনে। আবার ব্যাগের দিকে চেয়ে কাগজ নিতে নিতে খুব ছোট্ট করে জবাব দিল,
– হ্যাঁ বলেছিলাম।
আযলানের কৌতূহল যেন বাড়লো। সে কিছুটা উৎসুক হয়ে বললো,
– কি বলেছিলে?
নওমি ব্যাগের চেইন আটকে আবার আযলানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি আদনানকে সকলের কথায় বলতাম যদিও ছোট বেলার কথা অতটা মনে থাকবে না ওর কিন্তু আমি সবার ছবি দেখিয়ে চিনাতাম এটা কে ওটা কে। ছেলেটাও উৎসুক হয়ে দেখতো। আর ছোট মস্তিষ্ক আপনার ছবি চিনে রেখেছিলো তাই হয়তো হাসপাতালে চিনতে পেরেছিল।
আযলান মজা করে অভিমানের সুরে বললো,
– তবুও তো তুমি অস্বীকার করলে!
নওমি একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,
– আমার কিছু করার ছিলো না এটা ছাড়া।
আযলান কিছু বললো না। নওমি আবার নিজ থেকেই বললো,
– আমি আদনানকে সবাইকেই চিনিয়েছিলাম শুধু…
– শুধু?
– আমার সো কল্ড পরিবার ছাড়া!
আযলান চুপ হয়ে গেল। নওমি আদনানের কাছে গিয়ে আদর করে বললো,
– দুষ্টুমি করবে না কেমন? আম্মু তাড়াতাড়ি চলে আসব। তোমার জন্য চকলেট নিয়ে আসব। তুমি ভালো ছেলে হয়ে থাকবে হু?
আদনান মাথা নেড়ে বলল,
– উকে।
নওমি আদনানের গালে চুমু দিয়ে মাথার চুল এলোমেলো করে হেসে তারপর আযলানের দিকে তাকালো।
– আসছি। আদনানের একটু খেয়াল রাখবেন।
আযলান সায় দিতেই নওমি বেরিয়ে গেল। নওমি বেরিয়ে যেতেই আযলান ওকে নিয়ে ড্রইং রুমে এসে বসলো। নওমি ওকে তিন বছর নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখল, অথচ এই একটা দিনও ওর প্রতি ঘৃণা ছড়ায়নি নিজের সন্তানের মনে! পরম মমতায় ওদের ছবি দেখিয়ে ওর অবর্তমানেও আদনানের মনে ওর জন্য একটা সম্মানের, ভালোবাসার আসন তৈরি করে রেখেছে! কেমন এই মেয়েটা? কিসের তৈরি ওনার এই মন?
আদনান চুপচাপ বসে আছে দেখে আযলান বলল,
– এই বাঘের ছানা? কি খাবি? নাকি খেলবি?
আদনান অবুঝের মত বললো,
– বাগের চানা ?
– হু আমি বাঘ তুই ছানা।
আদনান ঘোড়ার ডিম বুঝলো বোধহয়। সে কথা ঘুরিয়ে বললো,
– কেলব আমি।
– চল খেলি।
আদনানকে নামিয়ে দিতেই আদনান ঝুড়ি ভর্তি খেলনা নিয়ে হাজির হলো। আযলান হেসে বললো,
– ডক্টর আযলান আজওয়াদ এখন আড়াই বছরের আদনান আজওয়াদের সাথে খেলনা দিয়ে খেলবে!
আবার বললো,
– না ঠিকই আছে! ছেলের জন্য সব করা যায় আর এটা তো খেলা মাত্র!
– কি গো নওমি? আজকে আদনানকে আনলে না?
এক কলিগ, প্রভার প্রশ্নে নওমি তার দিকে তাকিয়ে সৌজন্যতার সাথে বললো,
– না গো আজ আদনান সাথে নেই দেখতেই তো পাচ্ছেন।
নওমি ভালো করে জানে এ শুধু শুধু তার সাথে কথা বলতে আসে নি। ইনি হলো স্কুলের সবচেয়ে কুচুটে মানুষ। ক্লাস নেওয়ার থেকে মানুষের বিষয়ে নিন্দা করে বেশি! নওমি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে কিন্তু ওই যে যে যত দূরে যেতে চাই তাকে যেন তত টেনে নিয়ে আসে! ওর বাড়ির দুই কদম হেঁটেই এই মহিলার বাড়ি তাই সব খবর দ্রুত পৌঁছে যায়। ওদের কথার মাঝে অন্য এক কলিগ লামহা আসলো। নওমির সিনিয়র। তিনি বললেন,
– সত্যিই তো আদনান কই রে?
– আজ বাসায় রেখে এসেছি।
সে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে আযলানের বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার। এমনিতেই এটা নিয়ে কম চর্চা হয় না সেখানে আরও জলঘোলা হোক এটা সে চাইছে না।
– বাসায় রেখে এসেছিস মানে? ওইটুকু বাচ্চা একা?
– না আপু বাসায় মানুষ আছে তাই। আচ্ছা, আমার না ক্লাস আছে আমি উঠি।
সে উঠতেই পেছন থেকে প্রভা ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলো,
নূর ই মহব্বত পর্ব ১৮
– হু মানুষ তো থাকবেই।
নওমি পেছন ফিরে বললো,
– মানে?
প্রভা কোনো রাখঢাক না রেখেই বললো,
– আজকে সকালে দেখলাম তোমাদের বাড়িতে একটা ছেলে এসেছে। শুধু আজকে না কদিন ধরেই দেখছিলাম!
