Mad for you 2 part 27
তানিয়া খাতুন
সোফার ওপর আরাম করে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে ক্ৰিশ।
টেলিভিশনের পর্দায় দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকলেও তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো কিছুর অপেক্ষায় রয়েছে।
চোখের কোণে এক অদ্ভুত প্রত্যাশার ছায়া খেলা করছে।
ঠিক সেই সময় দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে এসে উপস্থিত হয় রুহি।
তার শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা দ্রুত, মুখে অস্থিরতার স্পষ্ট ছাপ।
এসে এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ক্ৰিশের গা ঘেঁষে বসে পড়ে।
রুহিকে এতটা কাছে বসতে দেখে ক্ৰিশ ইচ্ছে করেই খানিকটা সরে যায়।
কিন্তু তাতেও রুহির কোনো ভ্রুক্ষেপ হয় না।
বরং সে আরও একটু সরে এসে ক্ৰিশের কাছাকাছি বসে পড়ে।
ক্ৰিশ এবার টেলিভিশনের পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে তাকায়।
— কী সমস্যা?
তার কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত, অথচ চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল চাপা কৌতূহল।
রুহি কিছুক্ষণ ক্ৰিশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখদুটি কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে কোনো এক অজানা অনুভূতি তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে।
সে মৃদু স্বরে বলে,
— একটু কাছে আসুন… বাসর করি।
ক্ৰিশ যেন আগেই আন্দাজ করে রেখেছিল রুহি কী বলতে এসেছে।
তাই মুখে সম্পূর্ণ উদাসীনতার ভাব এনে সে পুনরায় টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— দূরে যা লেদু সোনা, আমার মুড নেই এখন।
ক্ৰিশের কথায় রুহি হতাশ হয় না। বরং আরও একটু সরে এসে তার বাহু জড়িয়ে ধরে।
তারপর মাথা কাত করে নরম স্বরে বলে,
— দেখি তো, ওটা আমার হাতে দিন। তারপর দেখবেন, আপনার মুড ঠিকই চলে আসবে।
রুহির কণ্ঠে ছিল এক ধরনের সরল আবদার।
কিন্তু সেই আবদারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
ক্ৰিশ হতবাক হয়ে তাঁকিয়ে দেখে রুহিকে অজান্তেই এক ঢোক গেলে।
মুহূর্তের জন্য তার কঠোরতা নরম হয়ে এলেও পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয়।
সারাদিন ধরে রুহি তাকে যেভাবে জ্বালিয়েছে, তার হিসাব এত সহজে মিটিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই ক্ৰিশের।
সে গভীর স্বরে বলে,
— তোমাকে তো বললাম, আমার মুড নেই। রুমে যাও।
ক্ৰিশের কণ্ঠের কঠোরতা শুনে রুহি চমকে উঠে। তার চোখে-মুখে অসহায়তার ছাপ ফুটে উঠে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে ধীর স্বরে বলে,
— আপনি আমাকে কী চকলেট খাওযালেন? আমার এমন কেন লাগছে?
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক অসহায়তা।
যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না তার ভেতরে কী ঘটছে।
ক্ৰিশ দাঁত চেপে তার দিকে তাকায় মনে মনে আনন্দ পায়।
— হোক। আরও বেশি হোক।
রুহি বিস্মিত চোখে ক্ৰিশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
উত্তর শুনে তার বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে সে বুঝতে পারল, এভাবে ক্ৰিশের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না।
ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়াল।
মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল, অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে সে।
একবার ক্ৰিশের দিকে ফিরে তাকাল রুহি।
কিন্তু ক্ৰিশ তখনও সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন তার কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই।
নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুহি নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ক্ৰিশ টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটি ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
সে জানত, রুহি এত সহজে হার মানার মেয়ে নয়।
আর সেই কারণেই হয়তো সে অপেক্ষা করছিল— এবার রুহি তাকে মানানোর জন্য নতুন কী কৌশল বের করে।
অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ায় ক্ৰিশ টিভি বন্ধ করে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
মেয়েটার আর আসার নাম নেই কেন? এমন হওয়ার তো কথা ছিল না।
ঠিক তখনই সামনে দৃশ্যটা দেখে সে চমকে গেল।
রুহি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
পরনে একটি পাতলা নীল শাড়ি, যা আসলে কোনো কাজেরই নয়।
কারণ নারীর দেহের প্রতিটি বাঁক যেন স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে সেই পাতলা আবরণের আড়াল থেকেই।
ক্ৰিশ একদৃষ্টিতে স্থির হয়ে তাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে।
তারপর নিচু স্বরে, ফিসফিস করে বলে,
— কী দেখাতে চাইছিস?
রুহি সেই সুযোগেই শাড়ির পাতলা আঁচলটা সামান্য সরিয়ে দিল বক্ষবিভাজনের ওপর থেকে।
ক্ৰিশ সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
— আস্তাগফিরুল্লাহ…!
তারপর গভীর শ্বাস নিতে লাগল বারবার। মনে হচ্ছিল নিজের সংযম ধরে রাখাটাই যেন তার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে দুই পা এগিয়ে আসে,
আর তাকে এগিয়ে আসতে দেখে রুহি এক পা, তারপর আরেক পা পিছিয়ে যায়।
রুহি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
— দেখুন… দেখুন…
কথাটা বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল এবং দৌড়ে রুমের দিকে ছুটে গেল।
ক্ৰিশও এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে সেও তার পেছনে দৌড়ে গেল।
দৌড়াতে দৌড়াতেই উচ্চস্বরে বলে উঠে,
— সামনে আয়! আজ তোকে কাঁদিয়ে ছাড়ব!
রুমে ঢুকতেই হাঁফাতে লাগল রুহি।
লজ্জায় তার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
সে নিজেও জানে না, হঠাৎ এমন আচরণ কেন করছে।
তবে একটা বিষয় সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে—এই মুহূর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে ক্ৰিশের কাছে যেতে, তার সান্নিধ্যে হারিয়ে যেতে।
ওদিকে রুহিকে এমন অবস্থায় দেখে ক্ৰিশের চোখে খেলে গেল মৃদু এক হাসি।
পরের মুহূর্তেই কোমরে একজোড়া শক্ত হাতের শীতল স্পর্শ অনুভব করল রুহি।
আচমকা সেই স্পর্শে তার সমগ্র শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অদ্ভুত এক অনুভূতিতে।
তবুও সে চোখ বন্ধ করল না। বরং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন সেই মুহূর্তটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখতে চায়।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে রুহির কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
দুজনের মধ্যকার সামান্য দূরত্বটুকুও মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
ক্ৰিশের উষ্ণ নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়তে লাগল রুহির ঘাড়ে।
সেই উষ্ণতা যেন রুহির সমস্ত সত্তায় ছড়িয়ে পড়ল।
লজ্জায় তার চোখ দুটো নত হয়ে এল, অথচ সরে যাওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না সে।
ক্ৰিশ মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলে,
— আমায় কাছে পেতে ইচ্ছে করছে, বাটারফ্লাই?
কথাটা শুনেই রুহি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না।
দ্রুত ক্ৰিশের দিকে ফিরে দাঁড়াল সে। তার চোখে তখন লজ্জা, সংকোচ আর গভীর আকুলতার মিশ্র ছায়া।
— প্লিজ… খুব ইচ্ছে করছে…
কাঁপা কণ্ঠে বলা কথাগুলো যেন ক্ৰিশের বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করল।
ক্ৰিশ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
যেন এতক্ষণ ধরে নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মুক্তি পাওয়ার পথ খুঁজে পেল।
ধীরে ধীরে সে রুহির আরও কাছে এগিয়ে এল।
তারপর নিজের দুটি ঠোঁটের মাঝে আবদ্ধ করে নিল রুহির অধর।
মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের পৃথিবী যেন তাদের দু’জনের কাছে ম্লান হয়ে গেল।
রুহি অনুভব করল ক্ৰিশের উষ্ণ নিঃশ্বাস তার মুখমণ্ডলে আছড়ে পড়ছে।
বুকের ভেতর তার হৃদস্পন্দন ক্রমশ দ্রুততর হয়ে উঠছে।
লজ্জায় চোখ বুজে এল তার, অথচ সরে যাওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না সে।
ক্ৰিশের এক হাত ধীরে ধীরে উঠে এল রুহির কাঁধের দিকে।
সেখান থেকে আলতো টানে সরিয়ে দিল তার পাতলা আঁচল।
এরপর সে ব্লাউজের হুক খুলতে উদ্যত হলো। রুহি কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লজ্জায় রাঙা মুখে নিজেই তাকে সাহায্য করল।
রুহির এই নীরব সহযোগিতা যেন ক্ৰিশের সমস্ত দ্বিধা দূর করে দিল।
তার ভেতরে জমে থাকা আবেগ তখন আর কোনো নিয়ম মানতে চাইছিল না।
উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ যেমন বারবার তীর ভেঙে এগিয়ে আসে, ক্ৰিশও তেমনি সমস্ত দূরত্ব মুছে দিয়ে রুহির আরও কাছে চলে আসে।
একে একে তাদের মাঝখানে থাকা সব বাধা সরিয়ে দিল সে।
কিন্তু এত কিছুর মাঝেও এক মুহূর্তের জন্য রুহির অধর থেকে নিজেকে দূরে সরাতে পারল না।
যেন সেই স্পর্শেই লুকিয়ে ছিল তার সমস্ত চাওয়া-পাওয়া।
রুহির অবস্থা তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। লজ্জা, সংকোচ, ভালোবাসা আর অজানা এক অনুভূতির মিশেলে তার সমগ্র সত্তা কেঁপে উঠছিল।
কখন যে তার আঙুলগুলো শক্ত করে ক্ৰিশের চুল আঁকড়ে ধরেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
অবশেষে ক্ৰিশ দুই হাতে রুহিকে তুলে নিল।
হঠাৎ এমন আচরণে রুহি চমকে উঠলেও প্রতিবাদ করল না।
বরং অবচেতনভাবে নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরল ক্ৰিশের কাঁধে।
ক্ৰিশ তাকে বুকে আগলে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন এই মুহূর্তটুকুকে নিজের স্মৃতিতে চিরদিনের জন্য গেঁথে রাখতে চাইছে।
তারপর অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রুহিকে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল সে।
নরম গদির ওপর শরীর ছুঁতেই রুহির বুকের ভেতর আবারও অদ্ভুত এক আলোড়ন বয়ে গেল।
ক্ৰিশ সেই মুহূর্তে রুহির কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলে,
— এত যে আমাকে উসকে দিলে, এখন সামলাতে পারবে তো?
তার কণ্ঠে ছিল দুষ্টুমি, আবার গভীর আকাঙ্ক্ষারও ছাপ।
কথাগুলো শুনে রুহির গাল লজ্জায় আরও রক্তিম হয়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে ক্ৰিশের উন্মুক্ত বুকে আলতো করে একটি চুম্বন এঁকে দিল।
সেই স্পর্শে ক্ৰিশের বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল।
রুহি মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলে,
— পারব… প্লিজ, আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
রুহির কণ্ঠে মিশে থাকা আকুলতা, তার চোখে ফুটে ওঠা গভীর ভালোবাসা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্লান্তি ক্ৰিশকে মুহূর্তেই নরম করে দিল।
প্রেয়সীর এই আবেদন সে উপেক্ষা করতে পারল না।
যেন সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত সংযম এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যেই তার সমস্ত দ্বিধা যেন মিলিয়ে গেল।
সে রুহির আরও কাছে সরে এলো, নিজের সমস্ত ভালোবাসা ও আবেগ উজাড় করে দিতে লাগল।
তার ঠোঁটের স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ল রুহির সারা অস্তিত্ব জুড়ে।
রুহি বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে রইল। কখনো মৃদু কেঁপে উঠছিল, কখনো আবার ক্ৰিশকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছিল।
তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া গভীর মনোযোগে অনুভব করছিল ক্ৰিশ।
দু’জনেই যেন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল এমন এক অনুভূতির গভীরে, যেখানে ভাষার আর কোনো প্রয়োজন থাকে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যকার সমস্ত দূরত্ব মুছে যেতে লাগল।
রুহি দাঁত চেপে কিছু মুহূর্তের অস্বস্তি সহ্য করলেও তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তৃপ্তির হাসি।
সেই হাসির মাঝেই লুকিয়ে ছিল বিশ্বাস, ভালোবাসা আর সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনন্য অনুভূতি।
শুরু হলো সেই অনুভূতির অধ্যায়, যার যেন কোনো সমাপ্তি নেই।
সময় তখন তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছিল।
বাইরের পৃথিবী, চারপাশের সমস্ত শব্দ—সবকিছু যেন দূরে সরে গিয়েছিল।
ক্রমে দু’জনের শ্বাস-প্রশ্বাস এক ছন্দে মিলিত হয়ে গেল।
একজনের নিঃশ্বাসে অন্যজনের নিঃশ্বাস মিশে যেতে লাগল।
মনে হচ্ছিল, দুটি পৃথক হৃদয় ধীরে ধীরে একই সুরে স্পন্দিত হচ্ছে, একই অনুভূতির স্রোতে ভেসে চলেছে।
সেই মুহূর্তে তারা দু’জন ছাড়া আর কিছুই যেন অস্তিত্বশীল ছিল না।
মন-মেজাজ একদমই ভালো নেই সিমরানের।
তাই ভোর হতেই সে সিদ্ধান্ত নেয় একটু হাঁটতে বেরোবে।
সকালের শীতল বাতাস গায়ে লাগতেই মনটা কিছুটা প্রশান্ত হয়ে আসে।
আকাশের পূর্ব দিগন্তে আলোর ক্ষীণ আভা ফুটতে শুরু করেছে, তবে সূর্য এখনও পুরোপুরি ওঠেনি।
চারপাশে এক ধরনের শান্ত নীরবতা বিরাজ করছে।
পাড়ার সরু রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা, মাঝে মাঝে শুধু দু-একটি পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সিমরান নিজের ভাবনার জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
অচেনা সেই উপস্থিতি অনুভব করতেই তার পা থেমে গেল।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাতেই বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
— আপনি এখানে?
তার কণ্ঠে অবিশ্বাস স্পষ্ট।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমান হালকা হাসল।
— হ্যাঁ, অনেক কষ্টে হোস্টেল থেকে তোমার অ্যাড্রেস বার করেছি। তবে ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি তোমায় পেয়ে যাব।
সিমরানের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে দ্রুত চারপাশে তাকাতে লাগল, যেন কেউ তাদের একসঙ্গে দেখে ফেলেছে কি না নিশ্চিত হতে চাইছে।
তারপর নিচু গলায় বলে,
— খুব খারাপ কাজ করেছেন। চলে যান এখন। কেউ দেখলে নানা রকমের কথা হবে আমাকে নিয়ে।
আমান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
তারপর ধীরে ধীরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি রুমাল বের করে।
রুমালটি সিমরানের সামনে ধরে বলে,
— কিছু কথা আছে। বলেই চলে যাব। ততক্ষণ রুমালটা দিয়ে মুখ ঢাকা দিয়ে রাখো।
সিমরান প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনা।
ভোরবেলার নির্জন রাস্তা, হঠাৎ আমানের উপস্থিতি, তার অস্বাভাবিক আচরণ—সব মিলিয়ে সে এমনিতেই অস্বস্তিতে ছিল।
তবুও পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে রুমালটি নিয়ে মুখের কাছে চেপে ধরল।
পরের মুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
একটা তীব্র, অচেনা গন্ধ নাকে এসে লাগল।
মাথাটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।
চারপাশের দৃশ্য ঝাপসা হতে শুরু করল।
সে অবাক হয়ে আমানের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু চোখের পাতা যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে।
Mad for you 2 part 26
— আ…আপনি…
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই তার শরীর টলমল করে উঠল।
মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগেই আমান দ্রুত তাকে ধরে ফেলে।
অচেতন হয়ে আসা সিমরানের নিস্তেজ শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেয় সে।
তারপর একবার চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায়।
কোথাও কেউ নেই।
তখনই সে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করে।
ফোন রিসিভ হতেই নিচু গলায় বলে,
— বাল তাড়াতাড়ি গাড়ি আন, নইতো পাবলিক মেয়ে ধরা ভেবে উত্তম-মধ্যম কেলাবে।
