শ্রাবণ ধারা পর্ব ৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রীতিমতো বাধ্য হয়ে ধারাকে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছাল শ্রাবণ। জরুরি ভিত্তিতে এম্বুলেন্স ডেকেছিল সে। ভেবেছিল শুধু ধারাকেই হসপিটালে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু হসপিটালের লোক বলল, পেশেন্টের সাথে কাওকে না কাওকে যেতে হবে ফর্মালিটিস পূরণের জন্য। তাই শেষে নিরূপায় হয়ে হসপিটালে এসেছে শ্রাবণ। হাসপাতালের করিডোরটা অদ্ভুতভাবে ঠান্ডা। সবকিছু কেমন যেন নিস্তেজ, প্রাণহীন। স্ট্রেচারে করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ধারাকে। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। শ্রাবণ করিডোরের একপাশে রাখা ধাতব বেঞ্চে বসে আছে। হাতের আঙুলে আঙুল ঠুকছে বিরক্ত ভঙ্গিতে। সে ঘড়ির দিকে তাকালো আবার।
—”ড্যাম…”
অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে। মিটিং আছে। এইসব ঝামেলা এখনই হওয়া দরকার ছিল? মুখে বিরক্তি স্পষ্ট তার। তবুও চোখ একবার গিয়েই থামে সেই বন্ধ দরজার দিকে। মাঝে মাঝে ভেতর থেকে অস্পষ্ট শব্দ আসছে, মেশিনের শব্দ, নার্সদের তাড়াহুড়ো পায়ের আওয়াজ। শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে নিল। দেখতে চাইল না।
প্রায় পনেরো মিনিট পর দরজাটা খুললো। সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন মহিলা ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। মুখ গম্ভীর। চারপাশে তাকিয়ে বললেন,
—”পেশেন্টের লোক কে আছেন?”
শ্রাবণ একটু থেমে দাঁড়ালো। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
—” জ্বি আমি…”
ডাক্তার একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলেন তাকে। বললেন,
—” পেশেন্টের কী হন আপনি?”
শ্রাবণ দ্বিধা করল একটু। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” হাজবেন্ড।”
ডক্টর ভদ্রমহিলাটি বোধহয় সস্থি পেলেন। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন,
—” ওকে। সো, আপনার ওয়াইফের এইজ কেমন? বয়স কত?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—” হয়তো ১৭ বা ১৮। এমনই হবে।”
ডক্টর এবারে পাশে থাকা নার্সের দিকে তাকালেন। আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
—” পেশেন্টের অন্য কোনো অসুখ রয়েছে?”
—” জানি না।”
—” অ্যাজমার প্রবলেম রয়েছে উনার?”
—” জানি না।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শ্রাবণের দিকে। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিল, অবিশ্বাস ছিল,আর খুব সূক্ষ্ম একরাশ তাচ্ছিল্যও।
—” জানেন না?”
ধীরে, স্পষ্ট করে প্রশ্নটা করলেন তিনি। শ্রাবণ ঠোঁট চেপে রইলো। উত্তর দেওয়ার মতো কিছু নেই তার কাছে। ডাক্তার এবার এক পা এগিয়ে এলেন। গলায় কড়া সুর,
—” আপনার ওয়াইফের বয়স ঠিক জানেন না, কোনো মেডিকেল হিস্ট্রি জানেন না, অ্যাজমা আছে কিনা জানেন না, ফিজিকাল কোনো তথ্য আছে?”
শ্রাবণ এবার সত্যিই থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মাথা নাড়লো,
—” না… জানি না।”
নার্সের দিকে একবার তাকিয়ে খুব হালকা করে হেসে ফেললেন ডাক্তার। সেই হাসিতে মমতা ছিল না, বরং স্পষ্ট ব্যঙ্গ।
—” গ্রেট। একদম পারফেক্ট হাজবেন্ড।”
কথাটা বলেই ফাইলটা বন্ধ করলেন তিনি। শ্রাবণের কপাল কুঁচকে গেল। বিরক্তি হচ্ছিল, কিন্তু সেই বিরক্তির নিচে অদ্ভুত এক অস্বস্তিও জমে উঠছে ধীরে ধীরে। ডাক্তার এবার গম্ভীর হয়ে বললেন,
—” শুনুন, আপনার ওয়াইফের অবস্থা মোটেও ভালো না। সারারাত ঠান্ডা পানির নিচে ভিজে ছিল। আপনি বুঝতে পারছেন এর মানে কী?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। ডক্টর নিজে থেকেই বলল,
—” হাত-পা একেবারে জমে গিয়েছিল। শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিকভাবে হচ্ছিল না। ঠোঁট ফেটে গেছে, ত্বকেও ঠান্ডার প্রভাব পড়েছে। সরাসরি পরিস্থিতি হাইপোথার্মিয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। শরীরের টেম্পারেচার ড্রপ করেছে ডেঞ্জারাস লেভেলে। আরেকটু দেরি হলে কেসটা ক্রিটিক্যাল হয়ে যেতে পারতো।”
একটু থামলেন তিনি। বললেন,
—” শুধু এটুকুই না। তার শরীর একদম উইক। মারাত্মক ডিহাইড্রেশন, লো ব্লাড প্রেসার, আর সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, উনি হয়তো অনেকদিন ধরে ঠিকমতো খাচ্ছেন না।”
শ্রাবণ এবার চোখ তুলে তাকালো। ভাবলো কিছু একটা। সে কখনোই ধারাকে ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে দেখেনি। কখনোই দেখেনি। আচ্ছা ও খায় কখন? আদৌও খায়? শ্রাবণের ভাবনার মাঝে ডাক্তার না থেমে বললেন,
—” শরীরের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে, মিনিমাম কয়েকদিন না, হয়তো সপ্তাহ খানেক ধরে ঠিকভাবে খাবার নিচ্ছেন না। নিউট্রিশনাল ডেফিসিয়েন্সি স্পষ্ট। মানসিক স্ট্রেসও প্রচণ্ড। পালস, রেসপন্স সবকিছুতেই সেটা বোঝা যাচ্ছে।”
নার্স ফাইল এগিয়ে দিতেই আবারো চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি।
—” শরীর এতটা ভেঙে পড়ার পেছনে শুধু ঠান্ডা পানি দায়ী না। এটা একদিনের রেজাল্ট না, মিস্টার শেখ। এটা লং টার্ম নেগলেক্ট।”
শব্দটা জোর দিয়ে বললেন, আবারো উচ্চারণ করলেন- নেগলেক্ট। অবহেলা। করিডরের বাতাসটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। শ্রাবণ এবার চুপ। একদম চুপ হয়ে রইলো। ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন,
—” একটা প্রশ্ন করি? আপনারা কি একই বাসায় থাকেন?”
কথাটা শুনে শ্রাবণ একটু কেঁপে উঠলো ভেতরে। তবুও ঠান্ডা গলায় বলল,
—” জি।”
ডাক্তার মাথা নেড়ে হালকা হেসে বললেন,
—” ইন্টারেস্টিং। একই বাসায় থেকে একজন মানুষ এতটা ভেঙে পড়ে, আর পাশের মানুষটা কিছুই জানে না।”
ভদ্রমহিলার চোখে এবার সরাসরি তিরস্কার দেখা গেল। সে বাঁকা হেসে বলল,
—” আপনার কেসটা বুঝতে পেরেছি আমি। নিজে একজন মেয়ে তো। একটা মেয়ের মানসিক যন্ত্রণার কারনগুলো ধরতে পারছি ভালো করে। জানেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন এরকম অনেক কেস আসে। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কেস কোনটা জানেন? যখন রোগী বিশেষত একজন মেয়ের পাশে তার নিজের মানুষ থাকে, অথচ সেই মানুষটাই সবচেয়ে বেশি অচেনা।”
শ্রাবণ অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভদ্রমহিলা বুঝলেন শ্রাবণের সাথে কথা বলা, আর দেয়ালের সাথে বকবক করা একই জিনিস। তাই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—” আমরা আপাতত উনাকে স্ট্যাবলাইজ করার চেষ্টা করছি। গরম রাখা হয়েছে, ফ্লুইড দেয়া হচ্ছে। এই অবস্থাটা হালকা না। শরীর অনেক শক নিয়েছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অবজারভেশনে রাখতে হবে।”
ডাক্তার চলে যেতেই কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলো শ্রাবণ। তারপর যেন হঠাৎ করেই বাস্তবে ফিরল। চোখ ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নার্সটার দিকে তাকালো। গলায় আগের মতো সেই শক্ত ভাব নেই, তবে পুরোপুরি নরমও না। একটা অদ্ভুত দ্বিধা মেশানো স্বর নিয়ে বলল,
—” একবার দেখা করা যাবে?”
নার্স ফাইল গুছাচ্ছিল। মাথা তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। দেখে মনে হলো যেন লোকটাকে বিচার করছে।
—” এখনই পুরোপুরি এলাউড না। পেশেন্ট স্টেবল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খুব উইক।”
শ্রাবণ ঠোঁট ভিজালো। একটু এগিয়ে এসে বলল,
—” আমি শুধু একবার দেখবো। কথা বলবো না।”
নার্স এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হয়তো এমন অনুরোধ সে রোজই শোনে। বলল,
—” পাঁচ মিনিট। শুধু দাঁড়িয়ে থাকবেন। টাচ করবেন না, ডিস্টার্ব করবেন না।”
একটু কড়া স্বরেই বলে সামনে এগিয়ে গেল সে,
—” আসুন।”
করিডোরের সাদা আলো পেরিয়ে ছোট একটা কেবিনের সামনে এসে থামলো তারা। নার্স দরজাটা ধীরে খুলে দিল।
—” ভেতরে যান।”
শ্রাবণ পা রাখলো ভেতরে। আর ঢুকেই থেমে গেল। বিছানায় শুয়ে আছে ধারা। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো।হাতের শিরায় স্যালাইনের সূঁচ ঢোকানো। ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে এলোমেলো হয়ে কপালে লেগে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে, অস্বাভাবিক নিস্তেজ। সেই লালচে ভাবটা এখন কেমন ম্লান হয়ে গেছে। দেখে মনে হয় যেন একটা ক্লান্ত, ভেঙে পড়া মানুষ। শ্রাবণ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার পায়ের শব্দও যেন অদ্ভুতভাবে ভারী লাগছে। বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো। কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো।
এই প্রথম, সে এত মন দিয়ে দেখছে ধারাকে। নাকের পাশে ক্ষীণ শ্বাস ওঠানামা করছে। হাতটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে পাশে। একটা অদ্ভুত নীরবতা চারপাশে।
শ্রাবণের গলা শুকিয়ে এলো। কিছু একটা বলার ছিল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। অজান্তেই হাতটা একটু উঠেছিল, ধারার হাত ছুঁবে কি না। কিন্তু নার্সের কথা মনে পড়তেই মাঝপথেই থেমে গেল। হাতটা ধীরে নামিয়ে নিল আবার। কয়েক সেকেন্ড, তারপর আরও কয়েক সেকেন্ড, সময় যেন আটকে গেছে। হঠাৎ করেই শ্রাবণ খেয়াল করলো, ধারার ভ্রু একটু কেঁপে উঠলো। খুব সামান্য। সে ঝুঁকে এলো একটু।
—” এই মেয়ে?”
কণ্ঠটা খুব নিচু। প্রথমবারের মতো, তার ডাকে কোনো আদেশ নেই, কোনো রাগ নেই। শুধু একফোঁটা অজানা কিছু। ধারার চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠলো। পুরোটা খুললো না, শুধু আধখোলা করে তাকাল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সামনে তাকানোর চেষ্টা করল। শ্রাবণের ছায়ামূর্তি চোখে পড়তেই, একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো তার চোখের কোণ থেকে। কিন্তু কোনো কথা বলল না। বলবার মতো শক্তিও নেই।
শ্রাবণ স্থির হয়ে গেল। ওই একফোঁটা চোখের পানি, অদ্ভুতভাবে আঘাত করলো তাকে। কেন সেটা সে নিজেও বুঝতে পারল না। শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে একটা টুল টেনে বসল। ছুঁলো না ধারাকে। কিন্তু খুব কাছে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি ইচ্ছে করে পানিতে ছিলে সারারাত?”
ধারা খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা দুদিকে নাড়াল, যার অর্থ সে ইচ্ছে করে ছিল না। শ্রাবণ চোখ নামিয়ে কিছু একটা আন্দাজ করে বলল,
—” তাহলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে?”
এবারে ধারা আরো দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা উপর-নিচ দোলাল, যার অর্থ হ্যাঁ, সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিল। শ্রাবণ জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। ধারার হাতের ক্যানুলার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবারো ধারার মুখের দিকে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” তোমায় এত কষ্ট দিলাম, এত অবহেলা করলাম, তবুও চলে যাচ্ছ না কেনো তুমি? একবারো কি মনে হয়নি আমার চলে যাওয়া উচিত। আমি থাকবনা। তুমি নিজেও জানো আমি তোমায় কোনোদিন মানব না। আমাদের এক ছাদের নিচে থাকা হবেনা মেয়ে। তবুও তুমি কেনো এখনো পড়ে আছো এ বাড়িতে? কীসের আশায় আছো? আমার মানবিকতাবোধ আছে, কিন্তু হৃদয় নেই। ”
ধারা আধখোলা চোখেই ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুনলো শ্রাবণের সব কথা। ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখের পাতাও ফেলল সে। শ্রাবণ আবারো বলল
—” তুমি নিজের সবকিছু দিয়ে আমায় ভালোবাসলেও আমি তোমার হতে পারিনা মেয়ে। কথাটা বোঝো। সম্ভব না। আমাদের এই নামমাত্র সম্পর্ক বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব না। আমি পারবনা। তুমি যদি এখন আমায় ভালোবেসে মরেও যাও, তাও পারবনা। কেনো জানো?”
জিজ্ঞেস করা হলো ধারাকে। ধারার মন চাইলো চেঁচিয়ে বলতে, কেনো? বলুন কেনো?
কিন্তু মুখে অক্সিজেন মাস্ক, এবং শরীর দুর্বল থাকায় শুধু তাকিয়েই রইল। শ্রাবণ নিজে থেকেই বলল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৪
—” কারন, আমি তোমায় পছন্দ করি না। ভালোবাসা দুরে থাক। জোর করে প্রেম-ভালবাসা হয়না মেয়ে।”
বলেই শ্রাবণ শেষবারের মতো তাকালো ধারার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে পেছনে সরে এলো। কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। কেবিনের বাইরে চলে গেল শ্রাবণ। একবারো পিছু ফিরে তাকাল না। যদি তাকাত, তাহলে দেখত কতটা আকুল নয়নে ধারা তাকিয়েছে।
