Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৩

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৩
জাবিন ফোরকান

স্টুডেন্টদের টেস্ট শিটের ভার হাতে সামান্য চাপ প্রয়োগ করছে। তবে তাতে বিশেষ ভ্রুক্ষেপ নেই জায়দানের। পায়ে পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো সে। টেস্ট শিটের প্যাকেটটি হাতবদল করে ক্লান্তির এক নিঃশ্বাস ফেললো। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। অতি সত্ত্বর কড়া তেঁতো কফি প্রয়োজন।
“জায়দান? ফিরেছ? এখানে এসে বসো।”
এতক্ষণ যাবৎ তেমন কোনো খেয়াল না হলেও গুরুগম্ভীর পুরুষালী কন্ঠস্বরটি জায়দানের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিলো। চশমাটা ঠিকঠাক করে সামনে তাকাতেই দৃশ্যটি নজরে এলো।

লিভিং রুমের সোফায় বসে আছেন জাফর আরেফিন। আরেফিন পরিবার প্রধান এবং জায়দান – আয়দানের বাবা। জাফর এই বাড়িরই সদস্য তা বিশ্বাস হতে চায়না। একই ছাদের তলায় বসবাস হলেও তার মুখদর্শনের সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য স্ত্রী সন্তানদের হয় নেহায়েত কম। ব্যবসার সূত্রে জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যয় করেছেন ঘরের বাইরে, শহরের বাইরে এবং দেশের বাইরে। এখনো তা চলমান। অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো আয়োজন কিংবা জরুরী দরকার বাদে পিতাকে বাড়িতে উপস্থিত পাওয়া নিজেদের হাতে চাঁদ ধরতে পারার মতনই অস্বাভাবিক।
জাফর আজ একা নন। যা অস্বাভাবিকতার মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। তার ঠিক বিপরীত প্রান্তে বসে থাকা মানুষটিকে চিনতে জায়দানের বেগ পোহাতে হলোনা। তাকবীর হুসেইন, সাবিনের বড় চাচা এবং আহানের পিতা।
জায়দানের মাঝে কোনো পরিবর্তন হলোনা। অত্যন্ত ধীরে সে এগোলো। প্রশান্ত নয়নে ফুটলো অনুভূতিহীনতা। সারাদিন ক্লাস, লেকচার এবং মিটিংয়ের পর যে ক্লান্তিটুকু ছিলো, তাও বিদায় নিয়েছে শীতলতার আড়ালে। রোজিনাকে হাতের জিনিসপত্র ধরিয়ে দিয়ে রুমে রেখে আসার নীরব আদেশ দিয়ে জায়দান পিতার পাশে সামান্য দূরত্ব রেখে বসলো।

“আসসালামু আলাইকুম, আংকেল।”
অল্প একটু মাথা দুলিয়ে সালাম গ্রহণ করে নিলেন তাকবীর, পাল্টা জবাব উচ্চারণ করলেন না। টেবিল থেকে গরম চায়ের কাপ তুলে নিয়ে দীর্ঘ এক আয়েশী চুমুক দিলেন জাফর। অতঃপর চিবুকের আধপাকা দাড়িজুড়ে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় শুধালেন,
“তুমি আহানকে মেরেছ। সত্য নাকি মিথ্যা?”
জাফর মানুষটা কোনোকালেই ভণিতা করেন না। ব্যবসায়ী মাত্রই এক কথার মানুষ হতে হয়, এমনটাই বিশ্বাস এবং শিক্ষা তার। জায়দান পিতার সরাসরি প্রশ্নে বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে উত্তর করলো,
“জ্বি।”
“ওই মেয়েটার জন্য?”
“জ্বি।”
“তোমার কি মনে হয়, তুমি ভুল করেছ?”
“না। প্রয়োজন পড়লে আবার করবো।”
পিতা পুত্রের মাঝে এমন বাক্য বিনিময় তাকবীরকে বিস্মিত করলো। নিজের সোফায় শিরদাঁড়া টানটান করে বসে রুক্ষ নজরে তিনি দেখলেন জাফরকে।
“আপনার ছেলে আপনার সামনেই এমন বেয়াদবি করছে। তাহলে ভাবুন ও আহানের সাথে কি করেছে।”
“আপনি কি আপনার ছেলের দালাল? নাকি পোষা উকিল?”
জাফরের প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন তাকবীর। চোখ পিটপিট করে বললেন,

“মানে?”
“আপনার কিংবা আমার ছেলে কেউই কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া বাচ্চা না, যে তাদের মধ্যকার ঝামেলাকে বাপ পর্যন্ত গড়াতে হবে। আহান সেটা বাপ পর্যন্ত গড়িয়েছে এর অর্থ আপনার ছেলে আদতে মেরুদণ্ডহীন।”
“মিস্টার আরেফিন! আমি আপনার কাছে অসম্মানিত হতে আসিনি!”
তাকবীর ভারিক্কি কন্ঠে গর্জে উঠলেন। দুহাত হাঁটুর উপর মুষ্টিবদ্ধ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
“আমি এসেছি যেন এই ঝামেলা ভবিষ্যতে আমাদের ব্যবসায়িক কিংবা পারিবারিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করতে পারে, সেই কারণে। কিন্তু আপনার কথা শুনে আমি বুঝে গেলাম, আদতে শান্তি রক্ষায় আপনার কোনো আগ্রহই নেই। আমি চাইলেই আপনার বড় ছেলের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করতে পারি।”
জাফর মৃদু হাসলেন। তার হাসিটুকু ভীষণ অশুভ ধাঁচের দেখালো। এক হাঁটুর উপর অপর হাঁটু তুলে খানিক বনেদী ভঙ্গিতে বসে পা দোলাতে লাগলেন।

“মামলা করবেন? করুন।”
তাকবীর শক্ত একটি ঢোক গিললেন। আড়চোখে জায়দানের দিকে তাকালেন। যে এখন অবধি নিঃশব্দে বসে আছে। তাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করা না হলে সে কিছু বলার অবধি প্রয়োজন বোধ করছেনা।
“ছেলের উপর এত বিশ্বাস নাকি আপনার?”
মোলায়েম হাসলেন জাফর। পা দোলানো থামিয়ে সামান্য ঝুঁকে জানালেন,
“মিস্টার হুসেইন। জায়দান এক কথার মানুষ। ও যা করে এবং বলে, তার পিছনে কোনো না কোনো কারণ অবশ্যই থাকে। আমার বড় ছেলে কোন পর্যায়ে গিয়ে আপনার ছেলের গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হয়েছে, তা বুঝতে আমার কোয়ান্টাম মেকানিক্স জানার দরকার নেই। আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক এর চাইতেও খারাপ হওয়ার আগে আমি উপদেশ দেব, প্লীজ, নিজের রাস্তা দেখুন। বাদবাকি মানহানির কথা যা বললেন, তার যথোপযুক্ত মূল্য আপনার বাড়িতে পৌঁছে যাবে।”

এরপরও বসে থেকে নিজেকে অপমানের কোনো অর্থ হয়না। তাকবীরও ব্যক্তিত্ববান মানুষ, সটান উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভদ্রতার খোলসের আড়ালে লুকিয়ে রাখলেন নিজের ক্রোধকে। তবে সেই জ্বলন্ত ক্রোধের আঁচ ঠিকই বাদামী চোখের অধিকারী পিতা পুত্র উভয়ের গায়ে গিয়েই লাগলো।
“ছোট্ট একটা সরি হয়ত আজ সবকিছুর সমাধান করতে পারতো, মিস্টার আরেফিন।”
এতটুকুই। তাকবীর আর দাঁড়ালেন না। ভ্রু কুঁচকে অসহনীয় এক দৃষ্টিতে একনজর জায়দানকে দেখে উল্টো ঘুরে গেলেন। তার সঙ্গে আসা তার অ্যাসিস্টেন্ট এতক্ষণ যাবৎ এক কোণায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো। ছেলেটাকে সাথে নিয়ে দরজা খুলে তিনি বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।
তাকবীর চলে যেতেই জায়দান নিঃশব্দে সোফা ছেড়ে উঠে গেলো। গা থেকে জ্যাকেট খুলে নিয়ে বাহুতে ঝুলিয়ে ডাইন ইন টেবিলের দিকে এগোলো। এক গ্লাস পানি ঢেলে চেয়ারে বসে চুমুক দিলো।
“তুমি সাবিনের সঙ্গে মেলামেশা আরম্ভ করেছ।”
জাফরের শীতল কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো। কিছুক্ষণ পূর্বের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান এই আওয়াজ। জায়দান এই আওয়াজের সাথে খুব ভালোভাবেই পরিচিত। ধীরে সুস্থে সে গ্লাসের পানিটুকু পান করলো। পিতার কথার কোনো প্রত্যুত্তর করলোনা। জাফর মাথা ঘুরিয়ে ছেলেকে দেখলেন খানিকক্ষণ। তারপর টেবিল থেকে লাইটার তুলে একটি সিগারেট জ্বালালেন। সংক্ষিপ্ত এক টানে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়তেই হালকা মাদকীয় গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো নিস্তব্ধ লিভিং রুমজুড়ে।

“মেয়েটাকে জড়িয়ে যেন তোমার নাম আর আমার কানে না আসে। ক্লিয়ার?”
“জ্বি, আব্বু।”
“তোমার আম্মু জানলে অনেক হম্বিতম্বি করবে। সে যাকে পছন্দ করেছে, তার উপর মনোযোগ দাও। যেহেতু তার সাধের বউমা, আশা রাখা যায় এবার সংসারটা টিকে যাবে।”
“হুম।”
জাফর উঠে গেলেন। জায়দানকে আর ফিরে দেখলেন না। নিচতলার অন্য পাশে তার সুঠাম ছ ফুট দীর্ঘ অবয়ব আড়াল হয়ে গেলো। লিভিং রুমজুড়ে রয়ে গেলো শুধু সিগারেটের ঘ্রাণ এবং একাকী জায়দান।

আমার শ্বাশুড়ি জেসমিন ক্রোশেটের কাজে দারুণ পারদর্শী। উলের সুতো দিয়ে নকশাকাটা পোশাক তৈরিতে তার জুড়ি মেলা ভার। তার প্রতি হাজার ক্রোধ থাকলেও এই একটা গুণ আমি পছন্দ করতাম।
সেদিনও ছিলো কনকনে এক ঠান্ডা দিন। সকাল থেকে আকাশটা গুমোট বাঁধা মেঘে আচ্ছন্ন। শৈত্যপ্রবাহ চলছিলো। তবে আভিজাত্যের দেয়ালে শীত কিংবা গরম নিয়ন্ত্রণ করা অতীব সহজ। হিটার এবং নতুন ইন্সটল করা ফায়ারপ্লেসের তাপে ঘরে উত্তাপ সহনীয় পর্যায়ের।
দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে পায়ে পায়ে নিচে নেমে এলাম আমি। প্রয়োজন ছাড়া সকাল ১০ টার আগে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস আমার নেই বললেই চলে। এই শীতে কম্বলের নিচে শীতঘুম দেয়ার চাইতে আরামের কিছু নেই। আমিও হেলেদুলে ১১ টার দিকে ক্ষুধার টানে হায়েনার মতন খাবার গিলতে বেরিয়েছি। লিভিং রুমে জায়দান। ভার্সিটির জন্য পুরোদস্তুর তৈরি। পরনে সাদা শার্ট, চেক টাই এবং কালো স্যুট। চশমার আড়ালে বাদামী চোখজোড়া মনোযোগী। টি টেবিলের উপর হাঁটু গেড়ে বসে জেসমিনকে কিছু করতে সাহায্য করছে স্বামী আমার। কৌতূহলী হয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।

ক্রোশেট করে তৈরি করা দু দুটো সোয়েটার। দূর্দান্ত হাতের কাজ। সাদার উপরে কালো, এবং কালোর উপরে সিলভার সুতোর বুনন। গত কয়েকদিন যাবৎ জেসমিন সারাদিন-সারারাত এক করেই এই মহাকার্য সম্পাদন করেছেন। শীত আসলেই নাকি তিনি সন্তানদের জন্য সোয়েটার তৈরি করতে বসেন। এটা নাকি একটা অলিখিত সংস্কৃতি এই পরিবারের।
সোয়েটার দুটো সুন্দর করে ভাঁজ করে প্যাকেটে ভরছেন জেসমিন। জায়দান কার্ডবোর্ড বক্সে সেগুলো ভরে ভালোমত স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে। সিঁড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম আমি। মা – ছেলের কথোপকথন কানে গেলো।
“যে ঠান্ডা পড়ছে এই বছর! আমার বাচ্চাটা খুব মিস করছে আমাকে। জলদি পাঠানোর চেষ্টা করো।”
“এয়ার মেইলে যেতে খানিকটা সময় লাগবে আম্মু। আমি চেষ্টা করবো, কথা বলে আজকের মধ্যেই শিপিং কার্টে যেন উঠিয়ে দেয়া যায়।”
কোমরে হাত দিয়ে মহা আগ্রহে দেখতে দেখতে আমি বলে উঠলাম,
“কালোর উপর সিলভারের কাজটা সুন্দর। জায়দানকে কালোয় ভালো মানায়। এটা তুমি নাও, জায়দান।”
আমার কথা শুনে জেসমিন এবং জায়দান দুজনই থমকে গেলো। জেসমিন আমায় এমন এক দৃষ্টিতে দেখলেন যেন আমি ওনাকে গালমন্দ করেছি। অবাক হয়ে ভ্রু তুলে শুধালাম,

“ভুল কিছু বলেছি নাকি?”
“মাই ওয়াইফ, এগুলো আয়দানের জন্য, লন্ডন পাঠানো হবে।”
জায়দান নির্লিপ্ত জবাব দিলো। স্কচটেপ দিয়ে দ্বিতীয় বক্সটিও সে সুন্দর করে পেঁচিয়ে ফেললো। আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর শ্বাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে বসলাম,
“দুটোই পাঠিয়ে দিচ্ছেন, জায়দানেরটা কোথায়?”
জেসমিনের চেহারায় ক্ষোভের কালো ছায়া পড়লো।
“তোমার স্ত্রীকে এত বেশি কথা বলতে মানা করো। সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে বসেছে, ওনার এখন খবর হয়েছে, আবার এসেছে ওকালতি করতে। যেন সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা হচ্ছে এখানে এমনভাবে স্বামীর ভাগ বুঝে নিতে এসেছে।”
“আমি তো শুধু….”
বলতে পারলাম না। এর আগেই জায়দান উঠে দাঁড়ালো। আমার কাঁধে হাত রেখে সামান্য দূরে সরিয়ে নিয়ে দুহাতে আলতোভাবে আমার মুখ ধরে বললো,
“আমার ছোট ভাইটা বিদেশে একা একা থাকছে। আম্মু আয়দানকে ছেড়ে এতদিন দূরে থাকেনি কখনো। তাই মন পুড়ছে। আমি তো আম্মুর কাছেই আছি।”
“কিন্তু জায়দান…”

“আমার আজকের স্কেজিউল প্যাকড। এক্ষুণি বেরোতে হবে। তুমি নাস্তা করতে বসো। গতকাল রাতেও তেমন কিছু খাওনি। শরীর খারাপ করবে। আমি আসছি। বি গুড, মাই ওয়াইফ।”
ঝুঁকে আমার ডান গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে জায়দান সরে গেলো। জেসমিন বক্স দুটো শপিং ব্যাগে ভরে প্রস্তুত করে ফেলেছেন। আমি বিহ্বল হয়ে দেখলাম। জানি, বিষয়টা তেমন কিছু নয়। তবুও মনের ভেতর কেমন যেন খুঁতখুঁত করতে লাগলো। ডাইন ইন টেবিলে রোজিনা খাবার গরম করে এনে বেড়ে দিচ্ছে আমার জন্য। আমি আনমনে চেয়ারে বসে পড়লাম। রোজিনা ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে কাজ করছে শুনেছি। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই মেয়েটি মৃদু আঁচে বললো,
“ম্যাডাম বছর বছর ছোট ভাইজানের জন্যই সোয়েটার বানায়। এইটা নতুন কিছু না। এত চিন্তা কইরেন না আপনে।”
থমকে গেলাম। ঝট করে মাথা কাত করে রোজিনাকে দেখলাম।
“মানে? জায়দান? আম্মু ওর জন্য কোনোদিন কিছু বানায়নি?”
রোজিনা খানিক ইতস্তত করলো। তারপর মাথা দুলিয়ে উত্তর করলো,

“না। অন্তত, আমার দেখার মধ্যে না।”
“ওর ভাই বিদেশ যাওয়ার আগেও?”
“তার আগেও। ম্যাডামের নাকি অনেক হাত ব্যথা করে, তাই বেশি সোয়েটার বানাইতে পারেনা।”
এটুকুই। আমি আরো প্রশ্ন করতে চাই টের পেয়েই রোজিনা সটকে পড়লো। হতবাক হয়ে বসে থাকলাম নিজের জায়গায়। জায়দান তো জেসমিনের বড় সন্তান। তাই নয় কি? তাহলে সন্তানদের প্রতি নিবেদনে এত বিভেদ কেন?
সারাদিন আমি কেন যেন আর কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারিনি। নিজের রুমে বসে শুধু আপনমনে কি যেন ভেবে গিয়েছে। অপেক্ষা করেছি অর্ডারের ডেলিভারি আসার। সন্ধ্যার দিকে ডেলিভারি আসতেই নাচতে নাচতে বক্স নিয়ে আমি হাজির হলাম শ্বাশুড়ির ঘরে। জেসমিন তখন আরামকেদারায় শরীর এলিয়ে সন্ধ্যার চা হাতে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন। আমি ভেতরে পা রেখেই রহস্যময় কন্ঠে বলে উঠলাম,
“আম্মু! দেখুন তো, আমি আপনার জন্য কি এনেছি!”
ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসে জেসমিন আমার দিকে তাকালেন। তার ঘরে আমি খুব সহজে পা রাখিনা বোধ হয় তিনি যে চরম বিস্মিত বুঝতে বাকি রইলনা আমার। বিনা অনুমতিতে সুরসুর করে ভেতরে ঢুকলাম আমি। হাতের বক্স টেবিলে নামিয়ে ভেতর থেকে বের করে আনলাম গাঢ় খয়েরী বর্ণের বেশ কতক প্রিমিয়াম উলের বান্ডিল।
“এসব কি?”

ভ্রু উঁচু করে তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লেন জেসমিন। আমি ধপাস করে বিছানায় বসে পড়লাম। হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে বসে চিবুকে হাত ঠেকিয়ে ঝুঁকে এলাম। তীর্যক হাসি মাখা ঠোঁটে জবাব দিলাম,
“ছোট ছেলের জন্য দুই দিনে দুটো সোয়েটার বানাতে হাত ব্যথা না হলে, বড় ছেলের জন্য একটা বানিয়ে দিতে সমস্যা হওয়ার কথা না, তাইনা, আম্মু?”
জেসমিন সেদিন এমন এক ভঙ্গিতে আমায় দেখেছিলেন, যা আমি আজ অবধি ভুলতে পারিনি। কি ছিলো জননীর নয়নমাঝে? ব্যাখ্যার অতীত।
আজ হঠাৎ করে অতীতের কথা কেন মনে পড়ল জানিনা। ওই স্মৃতিটুকুই কেন ভেসে এলো, তাও অন্তরের অজানা। হয়ত আমার মন মস্তিষ্ক দুটোই জায়দানের দ্বারা ভীষণ মাত্রায় প্রভাবিত হয়ে আছে। বিবাহিত জীবনে দেখা সবকিছু ঘুরপাক খেয়ে সূত্র মেলাতে চাইছে। অথচ মাতৃভক্তি এবং মাতৃ উপেক্ষার সূত্রটা কিছুতেই মিলছেনা।
সময়টা পড়ন্ত বিকাল। সারাদিনের হুলুস্থুল বিজনেস আর ডেলিভারির কাজকর্ম সামলে আমি এসেছি বনানী। বেশ কয়েকটা জায়গায় কথাবার্তা হয়েছে। একটা আমার আর মীরার পছন্দও হয়েছে। নতুন বছরের সঙ্গে সঙ্গে নতুন যাত্রা শুরু করার পালা এবার। দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন এবার শুধুমাত্র অনালাইনে নয়, ধুমধুমার ব্যবসা করবে বাস্তবেও।

দোকান ভাড়ার প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র হাতে আমার। সেগুলো কাঁধের ব্যাগে ভরে নিয়ে একটা সি এন জি ভাড়া করলাম। ভেতরে চেপে বসে পরনের জিন্সের পকেট থেকে সদ্য কেনা সস্তা চায়নিজ মডেলের নতুন ফোনটা বের করলাম। আগের ফোন ভেঙে গিয়েছে সেদিন, মিসিরের বাসায়। আজ আমার বেশভূষায়ও সামান্য পরিবর্তন রয়েছে। সাধারণ টি শার্টের বদলে হাঁটু অবধি লম্বা হলুদ ফ্রক এবং জিন্স পড়েছি। চুলগুলো খুলে রাখা। চেহারায় হালকা মেকআপ। মোবাইলের সেলফি ক্যামেরা দেখে দেখে ঠোঁটে খানিকটা লিপস্টিক লাগিয়ে নিলাম। নিজেকে দেখলাম, তেমন একটা খারাপ লাগছেনা।
আজ আমার ব্লাইন্ড ডেটের দিন।
সি এন জি গন্তব্যে যেতে যেতে ফোনে আমার ডেটের মেসেজটি শেষবারের মতন দেখে নিলাম।
॥ ব্ল্যাক ব্যাগি জিন্স, সাদা হুডি, পিছনে টম অ্যান্ড জেরির কার্টুন থাকবে, আর মাথায় ‘এম’ অক্ষর লিখা ক্যাপ থাকবে। টেবিল দুই, রাইট কর্নার॥
ডেটের বেশভূষার বিবরণ মাথায় গেঁথে নিলাম। যেহেতু কেউই আগে থেকে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত নই, তাই সতর্কতা অবলম্বন।
আধ ঘন্টার মাথায় পৌঁছে গেলাম। এক অভিজাত ক্যাফে। বোর্ডে এল ই ডি স্টাইলে জ্বলজ্বল করছে নাম।
ল্যাটে অ্যান্ড লাভ।

লাভ? ভালোবাসা? বাঁকা হাসলাম আমি। অনুভূতিটা আমার কাছে বর্তমানে কৌতুক বাদে আর কিছুই না। ভাড়া মিটিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ক্যাফেইনের মিষ্টি – তেঁতো ঘ্রাণ নাকে এসে ঠেকলো। আশেপাশে টেবিলজুড়ে যারা বসে আছে, অধিকাংশই কপোত কপোতী। মডার্ন ডেটিংয়ের জন্য একেবারে আদর্শ স্থান যাকে বলে।
ব্লাইন্ড ডেটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে এই প্রথমবারের মতন আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। অনুভূতি বুঝে ওঠা দায়। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে শান্তনা দিলাম নিজেকে। অপর পক্ষ পারলে আমি কেন পারবোনা? আর তাছাড়া, এটা শুধু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। নিজের কাছে নিজেরই কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে আমার। সেই প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্তের বিকল্প কিছু নেই।
আশেপাশে তাকাতে তাকাতে এগোলাম। বর্ণনা মিলে যায় কার সঙ্গে দেখতে লাগলাম। ডান পাশের শেষের দিকে, প্রথম টেবিলের পর দ্বিতীয় টেবিলে নজর আটকালো। ঐতো! সাদা হুডি, টম অ্যান্ড জেরি, ক্যাপ। সন্দেহ নেই কোনো। তবুও ফোন থেকে প্রাপ্ত নাম্বারটাতে কল করলাম। টেবিলে বসা বান্দাই নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করলো।

“হ্যালো?”
“হুম। পেয়েছি আপনাকে।”
সে পাল্টা কিছু বলার আগেই ফোন কেটে এগিয়ে গেলাম সোজা। লোকটিও ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। যে মুহূর্তে আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, সেই মুহূর্তেই সে পিছনে ফিরে তাকালো।
“ওহ আপনি…”
তার ঠোঁট গলে শব্দ দুটো বেরিয়ে যেন হারিয়ে গেলো বাতাসে। জমে গেলাম আমি সম্পূর্ণ। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকলাম। অপর পক্ষের দৃষ্টি প্রসারিত। চেহারায় চাপা আতঙ্ক এবং অবিশ্বাস। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন জোরালো হলো আমার। হতবিহ্বল কন্ঠে বলে উঠলাম,
“মিসির!”
“সাবিন!”
হতবাক হয়ে একে অপরের দিকে চেয়ে থাকলাম দুজন। মিসিরের হাতে তাজা ডালিয়ার তোড়া, লাল টকটকে বাঁধা সিল্কের ফিতা দুলছে বাতাসে। চোখ পিটপিট করে সেদিকে তাকিয়ে পরক্ষণে বান্দার মুখের দিকে চাইলাম আবার। মীরার বর্ণনা মনে এলো,

আর্কিটেক্ট, আর্কিটেকচারাল ফার্মের মালিক। হুমায়ূন আহমেদের লিখিত চরিত্রের সঙ্গে নামের মিল রয়েছে।
তখন যদি মনোযোগ দিতাম, হয়ত বা আগেই অনুমান করতে পারতাম?
“দিস ইয পিওর কোইন্সিডেন্স, আমি জানতাম না, আই সোয়্যার…!”
হড়বড় করে বলে সামান্য টলে উঠলো মিসির। বোধ হয় তার জন্য ঝটকাটা বেশি ছিলো। সহসাই দুবাহু বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেললাম, ফুলের তোড়া হাত ফস্কে পরে যাওয়ার আগেই এক হাতে ধরে ফেললাম।
কাকতালীয়—শব্দটাই যেন আজ আমার সঙ্গে রসিকতা করতে নেমেছে।
ক্যাফের ভেতর আগমন ঘটলো আরো এক দম্পতির। রমণীর খিলখিলে হাসির আওয়াজ পরিচিত, ভীষণ। মাথা কাত করে তাকালাম।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১২

সবুজ শাড়ী পরনে সুদর্শনা লাবণ্যময়ী আরওয়া। হাতের মাঝে ধরে রাখা পুরুষালী বাহু, সঙ্গ দেয়া বাদামী কালো স্যুট পরিহিত নির্লিপ্ত চেহারার প্রফেসর।
“আমার কুলখানির দাওয়াত রইলো, সাবিন।”
মিসিরের কাঁপা কাঁপা ভয়ার্ত কন্ঠস্বরে তার দিকে তাকালাম, পরক্ষণে আমাদের উভয়ের দৃষ্টিই গিয়ে পড়ল সদ্য আগত যুগলের উপর।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here