Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৫
জাবিন ফোরকান

“মায়া আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য কি, মীরা?”
আমার প্রশ্নটি জনমানবহীন জায়গাজুড়ে প্রতিধ্বনি তুললো। কাউন্টারের উপরটা ঠিকঠাক করতে করতে আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকালো মীরা। নতুন কেনা চেয়ারগুলো ঠিকমতো টেবিলের পাশে গুছিয়ে রাখার কার্যক্রমে ক্ষান্ত দিয়ে আমি চেয়ে আছি বান্ধবীর দিকে।
২০২৬ সাল দুয়ারে কড়া নাড়ছে। আর মাত্র দুটো দিন। এরপরই বিশ্ব পা রাখবে ছাব্বিশের দুনিয়ায়। আমার পিৎজা বিজনেস রি ওপেনের মাত্র এক মাসের মাথায় অভাবনীয় সাফল্য ধরা দিয়েছে। ভাইরালের ভূমিকা এর পিছনে ব্যাপক। পুঁজি এখনো খুব বিরাট কিছু নয়। তবে নিজেদের শক্ত একটা ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি আউটলেট প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত সময় পার করেছি আমি এবং মীরা। উভয়ের পুঁজিটুকু একসঙ্গে মিলিয়ে মোটামুটি একটা অংক দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। অবশেষে আমাদের স্বপ্ন পূরণের পালা। বনানীর কাছাকাছি সড়কের পাশের মার্কেটে একটা ছোটখাট দোকান ভাড়া নিয়েছি আমরা। গত এক সপ্তাহ যাবৎ খাটাখাটনি করে ঠিক হয়েছে সবকিছু। দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন— নামে একটা ক্যাফে ওপেন করতে চলেছি আমরা নতুন বছরের প্রথম দিনেই। যেখানে পিৎজার পাশাপাশি মীরার নিজের হাতে তৈরী কেক বিক্রির পরিকল্পনা আমাদের। পরবর্তীতে যদি ব্যবসা বৃদ্ধি পায়, তখন কি করা হবে দেখা যাবে।

এই মুহূর্তে দুজন মিলে শেষ মুহূর্তে সবকিছু ঠিকঠাক করে নিচ্ছি আমাদের ছোট্ট ক্যাফের ভেতর। রাত যত গভীর হচ্ছে, তত ঠান্ডা জেঁকে বসছে গায়ে। শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে দেশের উপর দিয়ে। তার আবেশে ছুঁয়েছে রাজধানীকেও। মোটা উলের হুডি শরীরে জড়িয়েও শীত ঠিক টের পাচ্ছি। এমন অবস্থায় আমার একেবারে অপ্রত্যাশিত মীরাকে হতবিহ্বল করে দিয়েছে বুঝতে কিছুই বাকি রইলনা। অথচ আমি নিরূপায়। আমার উত্তর প্রয়োজন।
মিসিরের সঙ্গে ব্লাইন্ড ডেটের পর থেকে আমি একটা দিনও রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারিনি। নিজের ক্যাফের চিন্তায় নয়। এ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিন্তা। অতি দ্রুত উত্তর না পেলে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবো।
“এটা কেমন প্রশ্ন?”
মীরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে কাউন্টারের ক্যাশবক্স মুছতে লাগলো। আমি চেয়ার টেনে একটা টেবিলের পাশে বসে পড়ে একটি নিঃশ্বাস ফেললাম।
“প্লীজ মীরা, উত্তর দে। তোর কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞা কি?”
ভেবেছিলাম মীরা হয়ত অবাক হবে। তবে হলোনা। নিজের মোছামুছির কাজ জারি রেখে জবাব দিলো,
“ভালোবাসার সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম। কোনটা জানতে চাস?”
“যেটা তুই জানিস। সেটাই।”
মীরা থামলো। কাউন্টারের উপর দুবাহু রেখে আমার দিকে তাকালো। সুদর্শনার টানা নয়নজুড়ে ভাসলো অব্যক্ত কিছু অনুভূতি।

“মায়া আর ভালোবাসার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই সাবিন।”
জমে গেলাম। মনে হলো, বুঝি বুকের ভেতর কেউ বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে। প্রসারিত নয়নে চেয়ে রইলাম প্রাণের বান্ধবীর পানে।
“আমরা যখন কারো মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনা, তখন তাকে ভালোবাসা বলে। মায়ার অপর নাম ভালোবাসা।”
শিরদাঁড়া বেয়ে কেমন এক শীতল আবেশ খেলে গেলো। নিজের কোলের দিকে তাকালাম। সারাদিন কাজকর্মে খড়খড়ে রুক্ষ হয়ে আসা হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে।
দিনের পর দিন যে প্রশ্ন এবং সংশয় আমায় কুড়ে কুড়ে শেষ করেছে, সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়ার পর মনে হচ্ছে, জবাবটা কোনোদিন না পেলেই ভালো হতো। কোনোদিন মীরাকে সত্যি বলতে উৎসাহ না দিলেই ভালো হতো। কারণ আজ, জানা কিংবা অজানায় মীরা আমার বুকের এমন এক দুয়ার উন্মোচন করে দিয়েছে যা আর কোনোদিন বন্ধ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবেনা।

যদি মায়ার অপর নাম ভালোবাসা হয়, তাহলে আমি আমার প্রাক্তন স্বামী জায়দান আরেফিনকে ভালোবাসি!
তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। শক্তির জোরে চেয়ারটা উল্টে পরে গেলো মেঝেতে। মীরা চমকে উঠে দৌঁড়ে আসতে নিলো আমার কাছে। কিন্তু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলাম।
“আমার একটা কাজ আছে মীরা। তুই এখানটা গুছিয়ে ভালোমত তালা দিয়ে বাসায় চলে যাস। আমার অপেক্ষা করিস না।”
আর কিছু বলতে পারলাম না। উল্টো ঘুরে হনহন করে বেরিয়ে গেলাম। একপাশে আমার সেকেন্ড হ্যান্ড ভাড়ার স্কুটিটা পার্ক করে রাখা আছে। সেটায় চড়ে বসে মাথায় হেলমেট তুলে দিলাম। অতঃপর ছুটে চললাম রাজধানীর সড়ক বেয়ে। শীতল বায়ুর ঝাঁপটা আমার ঘাড়ে আবেশ বুলিয়ে গেলো। শিহরণ খেলে গেলো দেহের প্রতিটি রোমকূপজুড়ে। ভয়ানক উপলব্ধিতে হ্যান্ডেলে সজোরে চেপে বসলো আমার হাতের আঙ্গুলসমূহ।
ভাগ্য এত বড় চিহ্ন প্রকাশ করা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হবে আহাম্মকি। আমি আর আগের সেই কিশোরী সাবিন নেই, যে নিজের সাময়িক ভালো লাগা আর গভীর অনুভূতির মাঝে পার্থক্য ধরতে পারেনা। আমার অবচেতন মন বহু আগে থেকেই জানতো, কার ভালোবাসায় বিলীন সে। মীরার একটামাত্র কথা অবচেতনতার দেয়ালকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

ডিভোর্সের এক বছর দুই মাস বাদে নতুন করে শুরু হয়েছে আমাদের কাহিনী। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে। এই একটা বছর আমার অনুভূতি কিভাবে লোকায়িত ছিলো?
লোকায়িত ছিলোনা। আমি নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করিনি। নতুন জীবনে লড়াই করে বেঁচে থাকতে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে অন্তরের চাহিদা শোনার ফুরসৎটুকু হয়নি। তাই বলে কি আমি অনুভব করিনি? করেছি। প্রতি পদে পদে আমি আমার জীবনে স্বামীর অভাব টের পেয়েছি। ডিভোর্স না হলে কোনোদিন বুঝতেই পারতাম না, জায়দানের প্রতি কতটুকু নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছিলাম আমি। সকালবেলা নাস্তার টেবিলে জোর করে দুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে গভীর রাতে সোফা থেকে পরম যত্নে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয়া অবধি জায়দান যেন বড় করে তুলেছে এক শিশুকে, নিজের স্ত্রীকে নয়। হয়ত আমি তার কাছে তেমনি ছিলাম। শিশুসুলভ এক স্ত্রী, যাকে যতটুকু না ভালোবাসা প্রয়োজন, তার থেকেও বেশি বড় করে তোলা প্রয়োজন। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আমি সবথেকে বেশি যে জিনিসের অভাববোধ করেছি, তা হলো, “মাই ওয়াইফ” ডাক। আমায় আদর করার কেউ ছিলনা, আমায় সহ্য করার মতন কেউ ছিলনা, ছিলনা কেউ হাত ধরে এগিয়ে নেয়ার, শিখিয়ে দেয়ার যে এটা এমনভাবে করা উচিৎ, ওটা তেমনভাবে। জায়দান ছিলো আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক। যার শিক্ষা, বিশ্বাস এবং অনুশাসন পুঁথিগত বিদ্যার প্রতিফলন। এর আগে অহংকারী সাবিনকে ঠিক – ভুলের শিক্ষা দেয়ার কেউ ছিলনা। কেউ না।

তখন কি আমি জায়দানের প্রেমে পড়েছিলাম? উঁহু। পড়িনি। কারণ আমি জানতাম, আজও জানি, জায়দান আমার তরে যা যা করেছিল এবং করছে, তা তার দায়িত্ববোধ, অনুভূতি নয়।
ছোট্ট একটা ঘটনা মনে পড়ছে আজ খুব। বিবাহিত থাকাকালীন একটা দাওয়াতে এক আত্মীয় ভীষণ বেয়াদবি ধরনের আচরণ করছিলো জায়দানের সঙ্গে। আমি যখন সেটার প্রতিবাদ করতে জায়দানকে ঠেলে দিয়েছিলাম, সে বলেছিল,
“গুরুজনদের সম্মান করতে হয়।”
এই কথাটি স্বামী আমায় আগেও বহুবার বলেছিল। কিন্ত সেদিন, তার কথার আড়ালে একটা বিরাট অর্থ খুঁজে পেয়েছিলাম। জায়দান বলতে পারত, “গুরুজনদের আমি সম্মান করি।” কিন্তু সে বলেছিল, “করতে হয়।” এর অর্থ কি দাঁড়ালো? করতে হয় বলে সে সম্মান করছিলো, নিজের মন থেকে নয়!
সেদিনের পর আমি বহুবার নিজের তত্ত্বের প্রমাণ পেয়েছি। জায়দান কোনোকিছুই নিজের ইচ্ছায় করেনা। তার পঠিত জ্ঞান অনুসারে যা যা সুশীলতার বৈশিষ্ট্য, সে সেসব বিনা বাক্যে অনুসরণ করে মাত্র! তার সবকিছুই করতে হয় বলে করা, নিজের জন্য করা নয়।

জায়দান আমাকে আগলে রেখেছে, যত্ন নিয়েছে, যেন আমি ভালো থাকি তার চেষ্টা করেছে, এসবকিছু তার মনের ইচ্ছা ছিলোনা। ছিল তার দায়বদ্ধতা। স্ত্রীর প্রতি একজন স্বামীর কর্তব্যপালন মাত্র। জায়দান নিজের মায়ের কার্যকলাপের প্রতিবাদ করতে পারেনি, কারণ পুঁথিগত বিদ্যামতে মায়েরা ভুল হতেই পারেনা, তাদের সবকিছুই সন্তানের মঙ্গলের জন্য এবং সন্তানের উচিৎ সম্মান দিয়ে সবকিছু মুখ বুঁজে সহ্য করে নেয়া। জায়দান নিজের পরিবারকে ভালোবাসে? তাই আমাকে ছাড়তে কার্পণ্য করেনি? মোটেও না। বরং সে তার পরিবারের প্রতিও কর্তব্যের বাঁধনে আবদ্ধ যেমনটা ছিলো আমার প্রতি।

আমার প্রাক্তন স্বামী এমন একজন মানুষ যে কখনো অনুভূতি অনুভব করতে পারেনা। তার জীবনে কোনো স্বপ্ন নেই, না আছে ইচ্ছা কিংবা আকাঙ্ক্ষা। সে জীবনে এগিয়ে যায় রোবটের মতন। রোবটের মাঝে যেমন একটি প্রোগ্রাম সেট করে দিলে সে সেই অনুযায়ী কাজ করতে থাকে, তেমন করে জায়দানও নিজের অনুশাসন নামক প্রোগ্রাম অনুসারে চলে যাচ্ছে। এটাই তার জীবন, এটাই তার বেঁচে থাকা।
নতুনভাবে বিয়ে করার পরিকল্পনা? আমি হলফ করে বলতে পারি। এটাও জায়দানের নিজস্ব ইচ্ছা নয়। স্রেফ ধারণা। ডিভোর্সের পর একা একা আর কতদিন? সারাটা জীবন পরে আছে। বাঁচতে হবে, পরিবার গড়তে হবে। বাড়ির বড় ছেলে হিসাবে এসব করা উচিৎ। তাই সে করছে।
একের পর এক উপলব্ধি আমার ভেতরটা বরফখন্ডে পরিণত করলো যেন। চোখের মাঝে টলটলে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেনা। তীব্র ঠান্ডা হাওয়ায় সেসব শুষ্ক হয়ে উঠছে। যেন বরফের আস্তরণ ছড়িয়ে যাচ্ছে আমার চোখের মাঝেই।

এমন একটা পুরুষ মানুষকে আমি কিভাবে ভালোবাসলাম? কি দেখে ভালোবাসলাম? কি অনুভব করে ভালোবাসলাম? নাকি এটা স্রেফ আমার অপরাধবোধ? দায়িত্ববোধের বেড়াজালে লেপ্টে থাকা মানুষটাকে আমি খুব বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। যদি তার আদও কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা থেকে থাকতো, তবে আমি তার সঙ্গে যা করেছি তার পরে কোনো পুরুষই দ্বিতীয়বার আমার দিকে ফিরে দেখতোনা। অথচ সে দেখেছে।
সে আমার কাছে এসেছে। যে সময় আমার একটা ভরসার কাঁধের দরকার ছিলো, সব অতীত পিছনে ফেলে সে এসেছিল। আমার বাজে সময়টায় সে দূর থেকে হলেও আমার পাশে ছিল। সেই ভরসাটুকুই কি তবে নতুন করে আমার মনে অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল? আমি কি আদও জায়দানের প্রেমে পড়েছি, নাকি তার দয়ালু মনোভাবের? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সেদিন আরওয়ার সাথে তাকে দেখে আমার অমন লাগলো কেন? ঈর্ষার কোন পর্যায়ে গিয়ে আমি যে ক্লাবে কখনো পা রাখবনা প্রতিজ্ঞা করেছি, সেই ক্লাবে গিয়েই মজেছি? কি প্রমাণ করতে চাচ্ছিলাম আমি? কি ভুলতে চাচ্ছিলাম? আর কেনই বা নতুন কাউকে ডেট করার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলাম? আমি অস্বীকার করতে পারবনা, আমি জায়দানকে ঈর্ষান্বিত দেখতে চেয়েছি। ভীষণ রকমের ঈর্ষান্বিত। এমন বেখাপ্পা অনুভূতির মানে কি? তার প্রদান করা দয়াটুকু নিজের করে রাখা? যদি তাই হতো, তাহলে মানুষটাকে ডিভোর্সের পর প্রথমবার
দেখার পরপরই বাঁধভাঙা অশ্রুতে ভেঙে পড়েছিলাম কেন? যে আমি ড্যাডের মৃ*ত্যুর পর থেকে কখনো চোখের পানি ফেলিনি, সেই কিনা হঠাৎ করে কেঁদে ভাসিয়ে ফেললো সবকিছু? সেদিন আমার যতটা খারাপ লেগেছিল তা আজ অবধি কোনোদিন লাগেনি। এতসবকিছুকে যদি শুধুমাত্র অপরাধবোধ, দয়া, মায়া বলে চালিয়ে দেই, তাহলে আমি নিজের মনের কাছে নিজেই আহাম্মক বনে যাব।
কর্কশ আর্তনাদ তুলে থেমে গেলো আমার স্কুটি। চোখ পিটপিট করে আশেপাশে তাকালাম। মন ভরে দেখলাম এই অবচেতন হৃদয় আমায় কোথায় নিয়ে এসেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট।

ঠোঁটে এক মলিন হাসি ফুটলো আমার। বুকের ভেতর খামচে ধরলো যাতনারা। প্রেমে পড়ার অনুভূতি খুব সুন্দর শুনেছিলাম, এতটা বেদনাদায়ক হবে কেউ তো বলেনি!
গেট খুলে গেলো হঠাৎ করেই। ভেতর থেকে একটি বাইক বেরিয়ে এসে সড়কপথে নামলো। রাস্তার ভিন্ন পাশ থেকে অদূরে চেয়েও আমার কিছুই বুঝতে বাকি রইলোনা। ওই বাইকারোহী কে, তার গন্তব্য কোথায়। কাটায় কাটায় হিসাব মেলানো আছে তার। আমি বাইকটাকে অনুসরণ করলাম না। নিজের স্কুটির উপর চুপচাপ বসে চলে যেতে দেখলাম শুধু।
“মীরা, তুই সত্যি বলেছিস দোস্ত।”
অস্ফুট স্বরে আপনমনে বিড়বিড় করলাম। মাথা হেলিয়ে তাকালাম আকাশের দিকে। অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। চোখের পাশ বেয়ে এক অশ্রুফোঁটা গড়িয়ে নামলো। কনকনে বায়ুতে তা বরফগলা হিমশীতল নদীর মতন নেমে গেলো আমার মাথার একপাশ বেয়ে। গন্তব্য হারালো চুলের মাঝে। একটি ঢোক গিললাম, পরেরবার যখন মুখ খুললাম, আমার কন্ঠস্বর ভীষণ রকমের ভারী শোনালো,
“এই প্রেমেতে আনন্দ কোথায়? আমায় তো শুধু কষ্ট মাঁড়ায়।”

বাড়িতে সোয়েটার পরে থাকার তেমন একটা প্রয়োজন হয়না। হিটার চালু করলে এমনিতেই উষ্ণ থাকে। তবে আজ ভিন্ন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে জায়দান। ভার্সিটি থেকে ফিরে ঠান্ডা পানিতে লম্বা একটা গোসল সেরে সে রুমে আসলো। ক্লোজেটের লকড ড্রয়ার থেকে গত বছর তুলে রাখা গাঢ় খয়েরী বর্ণের উলের ক্রোশেট করা সোয়েটারটা বের করে টি শার্টের উপর গায়ে জড়ালো সে। নিজেকে আয়নায় দেখলো অযথাই। শরীরের ত্বকের বর্ণের সঙ্গে রংটা দারুণ মানিয়েছে। আনমনে সোয়েটারের উলে হাত বুলিয়ে আনলো জায়দান। এটা জেসমিনের বানিয়ে দেয়া একমাত্র সোয়েটার তার, যেটা এখন অবধি তার শরীরে ফিট হয়। বাকি আরো দুটো আছে, সেগুলো নিতান্তই ছোটবেলার, যত্ন করে ড্রয়ারে তুলে রেখেছে জায়দান।
“ম্যাডাম আফনাকে ডাকতেসে, জায়দান ভাই।”
ঘরের দরজার বাইরে থেকে রোজিনার কন্ঠস্বর ভেসে এলো। জায়দান মাথা কাত করে বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো,

“আম্মুকে বলো, আসছি।”
“আচ্ছা। আসেন। আমি আফনার কফি দিতেসি নিচে।”
রোজিনা চলে গেলো। জায়দান খানিক ভাবুক হলো। খুব জরুরী না হলে জেসমিন তাকে এভাবে তলব করেন না। ভেজা চুল দ্রুত তোয়ালেতে মুছে নিয়ে জায়দান নিজের চশমা পরে বের হলো।
লিভিং রুমের সোফায় বসে আছেন জেসমিন। হিটার অন থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীরি চাদর শরীরে জড়িয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন জননী। জায়দান ধীরপায়ে নেমে এলো। রোজিনা টেবিলে কফি রেখে কিচেনে আড়াল হয়ে গেলো। কফির মগ হাতে নিয়ে নিজের মায়ের মুখোমুখি সোফায় বসলো জায়দান।
“আমাকে ডেকেছ, আম্মু?”
জেসমিন নিঃশব্দে নিজের বড় ছেলেকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন। ছেলে নিজের বাবার উপরেই গিয়েছে। বাদামী চোখ, সুদীর্ঘ অবয়ব। তার পরনের সোয়েটারটায় জেসমিনের দৃষ্টি ক্ষণিকের জন্য আটকালো। দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো জ্বলন্ত এক অনুভব যা দ্রুতই চোখের পলক ফেলে ম্রিয়মাণ করে ফেললেন তিনি।
“হ্যাঁ ডেকেছি। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
কফিতে চুমুক দিয়ে জায়দান সম্মতি জানালো মায়ের কথা শুনে। জেসমিন নিজের চায়ের কাপ টেবিলে রেখে দিয়ে বললেন,

“আরওয়া ওই মেয়েটার কথা কিভাবে জানলো?”
জায়দান নির্লিপ্ত। জেসমিন ভেবেছিলেন, ক্ষীণ প্রতিক্রিয়া অবশ্যই পাওয়া যাবে। অথচ পেলেন না। সন্তান তার নিঃশব্দে কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ খুললো,
“ওনার না জানার কথা ছিলো বুঝি? আজ নাহয় কাল জানতেই পারতেন।”
“জেনেছে, সেটা বিষয় না। বিষয় হলো, ওই বেয়াদব মেয়েটা এই চিত্রের মাঝে এলোই বা কি করে?”
জবাব পেলেন না জেসমিন। জায়দান আর কফিতে চুমুক দিলোনা। শুধু স্থির চেয়ে রইলো। তাতে বেশ ক্রোধ অনুভব করলেন জননী। সোফায় সোজা হয়ে বসে খানিকটা কর্কশ গলায় বললেন,
“তুমি কি আমাকে বোকা মনে করো? আমি কিছুই জানতে পারবোনা ভেবে থাকলে তুমি বোকার স্বর্গে বাস করছো জায়দান।”
“তোমার এই জানাজানির পিছনে কি কোনোভাবে তোমার ছোট ছেলের ভূমিকা আছে, আম্মু?”
“একদম চুপ!”

ধমকে উঠলেন জেসমিন। এত জোরে যে তার ভয়াল কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো দেয়ালে দেয়ালে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে কোনো মা এভাবে শাসন করতে পারেন বিষয়টা কিচেন থেকে সবকিছু শুনতে পাওয়া রোজিনার জন্য নতুন কিছু নয়। এই বাড়িতে ছোটবেলা থেকে কাজে যুক্ত না থাকলে সে এই ঘটনাকে বিস্ময়কর বলে বিবেচনা করতো।
মায়ের ধমকে একদম চুপ করে গেলো জায়দান। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো।
“পরের মেয়ের দোষ আমি কি দেবো? যেখানে আমার নিজের ঘরেই চোরের বাস?”
একটা টু শব্দও উচ্চারণ করলোনা জেসমিনের বড় সন্তান। মাথাটা সামান্য নুইয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলো। জেসমিন তীক্ষ্ণ নয়নে দেখলেন তাকে। প্রশস্ত কাঁধজোড়া ঝুলে রয়েছে, নতজানু ভঙ্গি সুদীর্ঘ অবয়বজুড়ে। সন্তুষ্টি এবং আক্রোশের মিশ্র অনুভূতি টের পেলেন তিনি।

“যদি ঐ বেশ্যা মেয়ের সাথে ঢলাঢলি করার ইচ্ছাই থাকে তাহলে সুন্দরমতন এই পরিবারে নিজের নামের ইস্তফা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তোমাকে এই ঘরে বেঁধে রাখতে কেউ মরে যাচ্ছেনা!”
এত বড় কথার পরে সাধারণ মানুষমাত্রই কিছু অন্তত করার কথা। সামান্যতম প্রতিক্রিয়া? একটুখানি রাগ? কান্না? অভিসম্পাত? যেকোনো কিছু! কিন্তু জায়দান অনুভূতিহীন পাথর। ওই একই ভঙ্গিতে বসমান সে। জেসমিন নিজের ভেতরের ঘৃণার উদগীরণ আর সইতে পারলেন না। ধড়াম করে উঠে দাঁড়িয়ে সহসাই জায়দানের গালে একটা চড় দিয়ে বসলেন। প্রতিক্রিয়ার সুযোগও হলোনা, এর আগেই তার চিবুক চেপে ধরে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললেন,
“তোর এই পাথরের মতন মুখটা দেখলেই আমার ঘৃণা হয়! তোর মুখে লবণ দিয়ে আঁতুর ঘরেই সবটা শেষ করে ফেললে ভালো হতো। তোর অভিশাপ কারো গায়ে লাগতো না আর। ওই মেয়ের সাথে যদি আর একবার তোর নাম জড়িয়েছে, তোর বাপও আমায় তোকে ত্যাজ্য করা থেকে আটকাতে পারবেনা! বুঝেছিস?”

“জ্বি, আম্মু।”
—আম্মু।
নিষ্প্রাণ একটি ডাক। অতি আশার, অতি সাধের অথচ অতি অনুভূতির অভাব। জেসমিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। চড়ে লালচে হয়ে ওঠা গাল এবং জ্বলজ্বলে স্থির বাদামী দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকা সন্তানকে তিনি আর দেখতে পারলেন না। ঠেলে দূরে সরিয়ে হনহন করে সিঁড়ির দিকে এগোলেন।
“মনে থাকলেই ভালো।”
সিঁড়ির কোনা পেরিয়ে নিচতলার অন্দরমহলে আড়াল হয়ে গেলেন জেসমিন। জায়দান নির্লিপ্ত চেয়ে থাকলো। কতক্ষন যাবৎ, জানেনা। রোজিনার কন্ঠস্বর তাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনলো,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৪

“ভাইজান, ওষুধ লাগাইয়া দেই?”
চোখ পিটপিট করে সোফা থেকে উঠে পড়লো জায়দান। মাথা নেড়ে চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে দুই তলায় নিজের বেডরুমের দিকে এগোলো। অদূর থেকে রোজিনা স্পষ্টত দেখতে পেলো, একহাতে নিজের পরনের সোয়েটারের প্রান্ত খাঁমচে ধরে রেখেছে জেসমিনের বড় সন্তান।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here