Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ১০

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১০

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১০
অনামিকা তাহসিন রোজা

ভোরের আলো ফুটেছে আরো অনেক আগেই। দিনের আলোতে পৃথিবী একটুখানি দৃশ্যমান হতেই ধারার ঘুম ভেঙে যায়। আজ সবার আগেই ধারা ঘুম থেকে উঠে পড়ল। উঁকি মেরে দেখল সালমা বেগম এখনো ঘুমাচ্ছেন বেশ গভীর হয়ে। খুব ধীরে সুস্থে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো ধারা। কোনো শব্দ না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আজ সে পণ করেছে কোনোভাবেই সালমা বেগমকে একা রান্না করতে দেবে না। এমনিতেই বাড়িতে মেহমান রয়েছে। নিশ্চয়ই ভালো মন্দ অনেক কিছু রান্না হবে। ধারা মনে মনে ভাবল আজ সে মুরগির মাংসটা নিজে রাঁধবে। সে খুব ভালো মুরগির মাংস রাঁধতে পারে। যদিও এখানে আসার পর থেকে এত ভারি কিছু রান্নাই করেনি সে। তবে আজ করবেই। তার আগে সকালে উঠেই তার দায়িত্ব গুলো পালন করতে হবে।
দ্রুত কোঁমড় সমান চুলগুলো হাতে পেঁচিয়ে খোপা বেঁধে নিল ধারা। বসার ঘরের আলো জ্বালিয়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়াতেই পিলে চমকে উঠল মেয়েটা। একটা পুরুষ অবয়বকে কালো রঙের চাদর পেঁচিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে যখনই চিৎকার দিতে যাবে, তখন সামনের লোকটা দ্রুত এগিয়ে এসে চাদর ছুঁড়ে দিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,

—”আরে আরে চেঁচিও না। আমি নীল। আমি নীল। খবরদার চেঁচাবে না প্লিজ। দেখো আমি নীল।”
ধারা মুহুর্তেই থেমে গিয়ে বুকে হাত রেখে হাঁপিয়ে ভ্রু কুঁচকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত নীলকে দেখল। এরপর দু পা পিছিয়ে গেল। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—” নীল ভাই? আপনি? এত সকাল সকাল চোরের মত কী করছিলেন এখানে? তাও অন্ধকারে।”
নীল এবারে চাদরটা খুলে হাতে ভাঁজ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—” আরে পানি খেতে এসেছিলাম। সেই রাত তিনটা থেকে কাজ করছি তো। ক্লান্ত হয়ে গেছি খুব। ভাবলাম আলো জ্বালিয়ে দিলে সবাই টের পেয়ে যাবে, ঘুম নষ্ট হবে। যাইহোক, এক কাপ চা পাওয়া যাবে?”
ধারা কোনোমতে মাথা নেড়ে রান্নাঘরে চলে গেল। চা বানাতে পাঁচ মিনিটও লাগে না তার। দ্রুত গরম গরম চা এনে নীলের হাতে দিয়ে ধারা জিজ্ঞেস করল,

—” আপনি কী কাজ করছিলেন মাঝ রাত থেকে?”
নীল সোফায় বসে আয়েশ করে চায়ের কাপে চোখ রেখে রহস্যের সাথে হেসে বলল,
—” দেখতে চাও?”
ধারা কিছুক্ষণ ভেবে উপর-নিচ মাথা নাড়ল। নীল এবারে আগে সতর্কতার সাথে চায়ের কাপে চুমুক দিল। চোখ বুঁজে বেশ আরাম করে বলল,
—” বাহ! কি চমৎকার চা বানিয়েছো। আমি আমার লাইফে এত সুন্দর চা খাইনি। কোথা থেকে শিখেছো চা বানানো?”
জীবনে প্রথমবারের মত চা বানানোতে প্রশংসা পেয়ে লজ্জা পেল ধারা। মনে মনে ভীষণ আনন্দিত হলো, পুলকিত হলো মন। ধীরে বলল,
—” কোথাও শিখিনি। নিজে নিজে শিখেছি।”
নীল এবারে কিছু একটা মনে করার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” দাঁড়াও জিনিসটা নিয়ে আসি।”
বলেই উঠে গেল নীল। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকল। ধারা পিছন থেকে জিজ্ঞেস করল,
—” কী আনতে যাচ্ছেন?”
—” সারারাত জেগে কী কাজ করেছি দেখতে চাইলে যে, সেটা আনতে যাচ্ছি। তুমি দয়া করে আরেক কাপ চা বানাও তো। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করবে দেখে নিও।”

নীলের কথা শুনে ধারা হেসে ফেলল। এরপর আবারো মুখে অন্ধকার নেমে এলো তার। উপরে ডান দিকে থেকে চোখটা সরিয়ে সে এবার বাম দিকের বদ্ধ ঘরটার দিকে তাকাল। শ্রাবণ শেখের ঘর, যেখানে তার অনুমতি ব্যতীত কেও জায়গা পায় না। লোকটা রাতে কিছু খায়নি। সকালেও যদি কিছু না খায়। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। ধারা ভুলে গেল নীলের কথা। দ্রুত তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে গিয়ে শ্রাবণের প্রিয় ব্লাক কফি বানাতে শুরু করল, আরেক দিকে জ্যাম পাউরুটি তৈরী করতে থাকলো। আর দুটো ডিমও সেদ্ধ করতে দিয়ে দিল। শ্রাবণের নাস্তা বলতে এ-ই সবই।
মিনিট পাঁচেক পর এরমধ্যেই নীল ফিরে এলো হাতে মাঝারি আকারের একটা ক্যানভাস নিয়ে। সোফাতে বসে হাঁক ছুঁড়লো ধীরে,

—” ধারা এদিকে আসো। দেখে যাও।”
ধারা পাউরুটি প্লেটে সাজিয়ে ঠিক করে রেখে বসার ঘরে এলো। নীল এবারে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টো করে ক্যানভাস ধরে জিজ্ঞেস করল,
—” বলোতো কী আছে এখানে?”
ধারা এর আগে কখনো ক্যানভাস দেখেনি। তাই বস্তুটা তার কাছে অচেনা, অজানা। দুঃখী কন্ঠে ধারা বলল,
—” এটা কী নীল ভাই? আমি কখনো দেখিনি।”
—” এটাকে ক্যানভাস বলে। আঁকাআঁকির কাজে আসে এটা।”
ধারা আগ্রহী হলো। চোখ বড় করে বলল,
—” ও আচ্ছা আচ্ছা। বড় কাগজ এটা! বাচ্চারা যে খাতায় বা কাগজে আঁকাআঁকি করে, সেই কাজে এই জিনিস ব্যবহৃত হয়, তাই তো?”
নীল উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল,

—” ইয়েস। এবার ম্যাজিক দেখো, ওয়ান..টু..থ্রি…
বলেই ঝট করে ক্যানভাস টা ঘুরিয়ে সামনের দিকটা ধারার দিকে উন্মোচন করল নীল। সাথে সাথে ধারার চোখ চকচক করে উঠল। ঘরের ভেতর আরেকটা জগৎ খুলে গেল। ক্যানভাসে ভাসছে একটা শান্ত নদী, গভীর নীল আর হালকা সবুজের মিশেলে আঁকা, পানির ওপর ভোরের আলো ঝিলমিল করছে। নদীর মাঝখানে একটা ছোট কাঠের নৌকা। আর সেই নৌকার ধারে বসে আছে এক মেয়ে। মেয়েটার পরনে সাদা শাড়ি, পাড়ে হালকা নীল রঙের ছোঁয়া। লম্বা চুলগুলো খোলা, বাতাসে একটু উড়ছে। মুখটা পুরোপুরি স্পষ্ট না। কিন্তু তাতে অদ্ভুত এক শান্তি, এক ধরনের নীরব বিষণ্ণতা। সে তাকিয়ে আছে দূরে, যেন কারো অপেক্ষায়, অথবা হয়তো নিজের সাথেই কথা বলছে। চারপাশে কুয়াশার মত হালকা ধোঁয়াটে আবহ, দূরে অস্পষ্ট গাছপালা, আর আকাশে ভোরের গোলাপি-কমলা আভা। সব মিলিয়ে ছবিটা যেন চকচক করছে ধারার কোটরে। ধারা প্রথমে কিছুই বলতে পারল না। তার চোখ বড় হয়ে গেল, ঠোঁট হালকা ফাঁক হয়ে রইল। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। এমনভাবে ভয়ে ক্যানভাসের কাছে এলো যেন এই সুন্দর জিনিসটা ছুঁলেই ভেঙে যাবে।
ধারা আনন্দিত হয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,

—”এটা.. কি হাতে আঁকা?”
নীল টি শার্টের কলার ঝাঁকিয়ে একটু ভাব নিল,
—” একদম খাঁটি জিনিস। পুরোপুরি হাতে আঁকা।”
ধারা আবারো জিজ্ঞেস করল,
—” আপনি এঁকেছেন?”
নীল বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু মুখে সেই চেনা হালকা হাসি,
—”হ্যাঁ ম্যাডাম। রাত তিনটা থেকে এইটাই করছিলাম। কেমন হয়েছে বলো তো?”
ধারা উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে ক্যানভাসের এক কোণ ছুঁয়ে দেখল। ফিসফিস করে বলল,
—”এটা তো.. জীবন্ত মনে হচ্ছে…”
তার চোখে সত্যিকারের মুগ্ধতা। কোনো ভণিতা নেই, কোনো সৌজন্যতার অভিনয় নেই। শুধু খাঁটি বিস্ময়। সে বলতে থাকলো,

—”নদীর পানি… মনে হচ্ছে নড়ছে.. আর মেয়েটা..
ধারা থেমে গেল।
নীল আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে এলো,
—”মেয়েটা কী?”
ধারা ধীরে বলল,
—”মেয়েটা খুব দুঃখী মনে হচ্ছে। ”
নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হালকা হেসে বলল,
—”ওয়াও। তুমি তো পুরো আর্ট ক্রিটিক হয়ে গেছো দেখি।”
ধারা মাথা নাড়ল,
—”না.. আমি কিছুই বুঝি না এসব। কিন্তু.. এই ছবিটায় দেখলে মনে হচ্ছে, যেন মেয়েটা অনেক দুঃখী। অনেক একা। হয়তো কথা বলতে চায়, কিন্তু কথা বলার মত মানুষ নেই।”
নীল এবার সত্যিই একটু অবাক হলো। চোখ সরু করে ছবিটার দিকে তাকাল, যেন নতুন করে দেখছে। মাথা চুলকে সে আহাম্মকের মত বলল,
—” আমি তো আঁকতে বসার সময় এসব কিছুই ভাবিনি। তুমি এতকিছু কীভাবে বের করলে?”
ধারা তাকাল। মৃদু হেসে বলল,
—”তাহলে বোধহয় আপনি সত্যিই মন থেকে এঁকেছেন। না চাইতেও অনেক কিছু ফুটে ওঠেছে। তাই তো… তাই এত সুন্দর হয়েছে।”
তার চোখে এবার অন্যরকম আলো দেখা গেল। সে সত্যিই মুগ্ধ।
—”আপনি এত সুন্দর আঁকতে পারেন! আমি ভাবতেই পারিনি। আপনি কি পেইন্টার?”
নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে বলল,

—”হ্যাঁ, আমি একজন বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী। শুধু সমস্যা হলো, বিশ্বটা এখনো জানে না।”
ধারা খিলখিল করে হেসে ফেলল। বলল,
—”সত্যি বলছি, এটা খুব সুন্দর। আমি জীবনে এত সুন্দর ছবি দেখিনি। মানুষ এত সুন্দর কীভাবে আঁকে? ইশ, আমিও যদি পারতাম।”
নীল এবার একটু লজ্জা পেল, যদিও লুকাতে চেষ্টা করল,
—”আরে ধুর, এতও ভালো হয়নি।”
ধারা মাথা নাড়ল জোরে,
—”না, খুব ভালো। অনেক সুন্দর। একদম মন ছুঁয়ে যায়। আমার খুব পছন্দ হয়েছে এটা।”
নীল এবারে খুশি হলো। হালকা গলায় বলল,
—”তুমি চাইলে..এই ছবিটা তোমাকে দিয়ে দিতে পারি।”
ধারা চমকে তাকাল,

—”না না! এটা তো আপনার..!”
—” আর্টিস্টের গিফট রিজেক্ট করা যায় না। এটা রুল। তুমি এটা রাখো।”
নীল হাসল। ধারা দ্বিধায় পড়ে গেল, কিন্তু চোখ সরাতে পারছে না ছবিটা থেকে।
নীল আবারো বলল,
—” আরে নাও, তুমি এটা রাখো। গিফট করলাম।”
ধারা আমতা আমতা করে বলল,
—” কিন্তু, আপনি এত কষ্ট করে বানিয়েছেন। আমায় দিয়ে দিতে আপনার মন খারাপ হবে না?
অবাক হলো নীল,

—” কি যে বলো না তুমি। তুমি আসলেই বোকা ধারা। সত্যি বলতে আমি ছোট থেকেই আঁকাআঁকি বেশ সুন্দর করি জানো? কিন্তু আমার মা আমায় এসব করতে দিত না। পড়াশোনার জন্য জোর করতো। আমি কোনোভাবেই বোঝাতে পারতাম না আমি কী চাই। আমি যদি ছোট থেকে আরো ইফোর্ট দেয়ার সুযোগ পেতাম, তবে হয়তো এখন ভালো কিছু করতে পারতাম। আফসোস! নিজের এই প্রতিভা আমি কোথাও প্রয়োগ করতে পারছিনা।”
একটু থামলো নীল। ধারার হাতে পেইন্টিং টা ধরিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলল,
—” তাই যখন আমার পেইন্টিং অন্য কারো হাতে যত্নে থাকতে দেখি, তখন খুব ভালো লাগে। তুমি এটা নিজের কাছে রাখো। যত্ন নিও। দশ বছর পরেও যদি ভুলে কখনো আমাদের দেখা হয়, তখনও যেন এই পেইন্টিং তোমার কাছে যত্নে রাখা দেখি। এতেই আমার সার্থকতা। বুঝেছো?”
ধারা মুগ্ধ হলো। একজন মানুষের এত সুন্দর ভাবনা, এত সাবলীল মনমানসিকতা কীভাবে হতে পারে? মুগ্ধতায় চোখে পানি এলো ধারার। সম্মান বেড়ে গেল নীলের প্রতি। সে খুব যত্নে ক্যানভাস টা হাতে নিল। বলল,
—” খুব কম জিনিসই আপন করে পেয়েছি আমি। তাই কিছু একটা নিজের করে পেলে নিজের প্রাণ দিয়ে জনম জনম ধরে আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করি, যেন হারিয়ে না যায়।”
একটু থেমে বলল,

—” এটাও আমার কাছে খুব যত্নে থাকবে।”
নীলও জবাবে হাসল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল লুকিয়ে। ধারা এবারে পেইন্টিং টা সোফার পাশে রেখে বলল,
—” আপনি দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন। আমি উনা..মানে মিস্টার শেখকে ব্রেকফাস্ট টা দিয়েই আসছি। এরপর আপনাকে চা বানিয়ে দেব।”
নীল দ্বিরুক্তি করল না। মাথা নেড়ে সোফায় বসে পড়ল। ধারা দ্রুত ট্রে তে সবকিছু সাজিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল। শ্রাবণের দরজার কাছে এসেই ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সে জানে দরজা বন্ধ, আর সে নক করলেও এই দরজা খুলবেনা। তবুও কখনো নিজের দায়িত্ব হেলাফেলা করেনা ধারা। শ্রাবণ দরজা খুলবেনা জানার পরেও সে দরজা ধাক্কা দেবে। আজও একই ভাবনা নিয়ে সে দরজা নক করল, কিন্তু আশ্চর্যকর বিষয় দরজায় টোকা পড়তেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে দরজাটা খুলে গেলো। তার মানে দরজা লক করাই ছিল না।
ধারা প্রথমে ভীষণ অবাক হলো। শ্রাবণ মূলত এভাবে দরজা খোলা রেখে ঘুমায় না। অত কিছু আর ভাবল না ধারা। দরজা যখন খোলা পেয়েছে, সে আস্তেধীরে প্রবেশ করল সেই ঘরে। উঁকি মেরে দেখল শ্রাবণ ঘুমোচ্ছে। ঘরটা অন্ধকার। ধারা দেরি না করে বেডসাইড টেবিলে খাবারের ট্রে টা রেখে দৌঁড় দিয়ে ফিরে এলো। এরপর দরজাটা আলগা করে বন্ধ করে খু্ব জোরে তিনবার টোকা দিয়ে দৌঁড়ে পালাল, যেন শ্রাবণের ঘুম ভেঙে যায়।

ঘুম থেকে উঠেই আগে ধারাকে এক বালতি বকাবকি করেন সালমা বেগম। তার মতে কেন ধারা এত দ্রুত ঘুম থেকে উঠে বাড়ির অর্ধেক কাজ করে রাখবে? ভাবা যায়, মেয়েটা এই সাত সকালে পুরো বাড়ি ঝাড়পোঁছ করেছে। আবার নাস্তাও করেছে, ফ্রিজ থেকে মুরগিও বের করে রেখেছে দুপুরে রান্না করবে বলে। সালমা বেগমের বকাবকির শব্দে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতে শার্ট প্যান্ট পড়ে তৈরী হতে থাকা শ্রাবণ ঘর থেকে চেঁচালো,
—” আহহা মা! থামো তো৷ কী শুরু করলে?’
সোফায় বসে বসে পপকর্ন খেতে থাকা নীল এবারে উল্টো জোর গলায় শ্রাবণকে বলল,
—” সব তোমার দোষ ভাইজান! তুমি নিজের বউকে বাপের বাড়িতে আরাম করতে পাঠিয়েছো কেনো হ্যাঁ? এখানে বাড়ির একজন অতিথি সব কাজ করবে কেনো? তোমার বউ-ই তো যত নষ্টের গোড়া। হুহ! কি এক নামের বউ এনেছো যে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে!”

বলেই মুখ ভেঙচালো নীল। তার ভালোই লাগে শ্রাবণকে খোটা মারতে।
এদিকে পারফিউম দেয়ার পর টাই বাঁধতে থাকা শ্রাবণ পড়লো দোটানায়। সে এখন কী করবে? নীল তার স্ত্রী নিয়ে কথা বলেছে, এই জন্য সে ডিফেন্ড করে কথা বলে নীলের কাছে বড় থাকবে? নাকি বউ বলতে ধারাকে বোঝানো হয়েছে এই মনে করে চুপচাপ থাকবে? অনেক ভেবেচিন্তে নিজের অহংকার ঠিক জায়গায় রাখার মত কথা পেল শ্রাবণ। তাচ্ছিল্য করে বলল,
—” আমার বউ এখানে থাকলেও তাকে আমি এত কাজ করতে দিতাম না বুঝেছিস? সে আমার রাণী হয়ে থাকতো। এসব কাজ বাড়ির সার্ভেন্টদেরই হয়।”
কথাটা শুনে সালমা বেগমের পাশে দাঁড়ানো ধারার বুক কাঁপলো। অজানা দুঃখে চোখের কোটর ভরে গেল তার। শ্রাবণ যে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে তাকে সার্ভেন্টের সাথে তুলনা করল, এবং এটা বোঝালো শ্রাবণের বউ হওয়ার যোগ্যতা থাকলে তাকে এসব করতে হতোনা— তা ভেবেই কাঁদতে মন চাইল ধারার। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে সে শুকনো ঢোক গিলে সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

—” আ..আমি একটু আসছি।”
বলেই বসার ঘরে নীল আছে বলে সে এখান থেকে দৌঁড়ে চলে গেল। নীল ধারার প্রস্থানে চোখ রেখে সালমা বেগম কে জিজ্ঞেস করল,
—” ভাইয়ার কি মাথা খারাপ হয়েছে? অচেনা একটা মেয়ের সাথে কেও এমন ব্যবহার করে? ধারা তো এ বাড়ির অতিথি খালামনি। এমনিতেই নিজে থেকে সব কাজ করছে, চক্ষুলজ্জারও তো বিষয় আছে! ”
সালমা বেগম ইতস্তত করে বললেন,
—” তোর এই ভাই বিগড়ে গেছে নীল। আমি পারিনি ওকে মানুষ করতে। বাদ দে। তুই যা, রেস্ট নে। বিকেলে নাকি কাজে বেরোবি।”
নীল মাথা নেড়ে প্রস্থান নিল। আসলেই তার অনেক কাজ আছে। আজ বিকেলে সেই উদ্দেশ্যেই বেরোবে সে।

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাড়ির ভেতরের আলো-হাসি, শব্দ সব যেন পেছনে পড়ে গেল। ধারা একবারও থামল না। সোজা পেছনের দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে এলো খোলা বাগানটায়। সকালের রোদ তখনো পুরোপুরি তেজি হয়নি। নরম, হালকা সোনালি আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির এখনো শুকোয়নি, ঝিকমিক করছে। হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে, কোথাও কোথাও পাখির ডাক। এই শান্ত, সুন্দর দৃশ্যটার মাঝেই ধারা এসে থামল।
বাগানের এক কোণে ছোট্ট সিমেন্টের সিঁড়ি। সেখানে গিয়ে বসে পড়ল সে ধপ করে। আর এক সেকেন্ডও নিজেকে সামলাতে পারল না। দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরতেই যেন ভেতরে জমে থাকা সবকিছু হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলো। কাঁদছে ধারা। নীরবে নয়, চেপে রাখা, গুমরে ওঠা কান্নায় বুক কেঁপে উঠছে বারবার। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কেউ তার বুকের ভেতরটা মুঠো করে ধরে আছে। নিজের মনেই ভাঙা গলায় ফিসফিস করল সে,

—” আমি তো কাজের মানুষই। সারাজীবন এ-ই পরিচয়েই তো থাকছি।”
চোখের পানি থামছে না। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে একের পর এক ফোঁটা। সে বারবার হাতের পিঠ দিয়ে মুছতে চাইছে, কিন্তু তাতে কিছুই হচ্ছে না। শ্রাবণের কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে—সার্ভেন্টদের কাজ। শব্দটা যেন কানের ভেতর বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। ধারা মাথা নিচু করে হাঁটুতে ঠেকিয়ে রাখল কপাল। মনে হচ্ছে কেউ তাকে খুব ছোট করে দিয়েছে। খুব তুচ্ছ। কিন্তু তবুও, তার মনের ভেতরের সেই অদ্ভুত, একগুঁয়ে অংশটা আবার ফিসফিস করে উঠল—উনি খুশি থাকলেই আমি খুশি।
প্রতিবারের মত এই কথাটাই সে নিজেকে বোঝাতে চাইল। কিন্তু আজ কেন যেন কথাটা আর আগের মতো কাজ করল না। আজ কষ্টটা একটু বেশি। একটু অন্যরকম। একটু গভীর। ধারা আবার নিজের পুতুলটার কথা মনে করল। যদি এখন কাছে থাকত, সবটা খুলে বলত সে। অভিযোগ করত, অভিমান করত। কিন্তু আজ সে একা। চারপাশে এত আলো, এত সুন্দর সকাল, তবুও তার ভেতরটা যেন অন্ধকারে ডুবে আছে। সে ফুঁপিয়ে উঠল আবার।
ঠিক তখনই হালকা একটা শব্দ হলো পেছনে, কারো পায়ের আওয়াজ। ধারা খেয়ালই করল না। মাথা নিচু করেই কাঁদতে থাকল। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে, স্থির হয়ে, কেউ একজন তাকিয়ে রইল তার দিকে। এরপর আস্তে ধীরে এসে ধারার পাশে বসে পড়ল।
ধারা পাশে কেও বসেছে অনুভব করতেই পিলে চমকে তাকাল। সাথে সাথে কান্নারত মুখটাতে স্বাভাবিকতার মুখোশ পড়ে চোখ মুছে নিল ধারা। নীলকে দেখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল,

—” আপ–আপনি এখানে…
নীল বেশ অনেকটা দুরত্ব নিয়ে বসেছে ধারার থেকে। যতটা দুরত্ব নিলে একটা মেয়ে অস্বস্তিবোধ না করে, ঠিক ততটা। ধারার দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকাল নীল। ফোঁস করে জিজ্ঞেস করল,
—”তুমি কে ধারা? কেনো এসেছো এখানে?”
ধারা আবারো চমকে উঠল। তবে নিজের বিচক্ষণতা দিয়ে অনেক কিছু ভেবে নিল। চুপচাপ মাথা নিচু করে সোজা হয়ে বসে পড়ল সে। নীল আবারো জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি কেনো এসেছো এখানে? আর ভাইয়া-ই বা কেনো এমন করছে তোমার সাথে?”
ধারা শুকনো ঢোক গিলল। কিছুটা সময় গভীর চিন্তা করে মুচকি হেসে বলতে শুরু করল,
—” আপনি যখন…এতই আগ্রহী, তাহলে বলি শুনুন। আমি ধারা। মোহনপুর গ্রামে খুব দরিদ্র পরিবারে জন্ম। খুব ছোটতে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে এতিম হয়েছি। যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। চাচা-চাচির অত্যচারে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। সেই সময় আপনার খালু আমায় এ বাড়িতে নিয়ে আসে, আশ্রয় দেয়। এবং আমায় কথা দেয় নিজের মেয়ের মত করে দেখাশোনা করবে আমায়। যদিও তাঁরা আমায় সারাজীবনই রাখতে চায় নিজের কাছে। মেয়ের মত করে ভালোবেসে। কিন্তু আমিই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, তাই চেষ্টা করছি চাকরি-বাকরি কিছু একটা খোঁজার।”
বিয়ে, চাকরি বাদে সব কিছুই সত্যি টা বলল ধারা। নীল মাথা নেড়ে বুঝার ভঙ্গিতে রইলো। এরপর মলিন কন্ঠ জিজ্ঞেস করল,

—” আর ভাইয়া..?”
নীলের কথা শেষ হওয়ার আগেই ধারা বলে উঠলো,
—” উনি এমনি এমনি এমন করছেন না নীল ভাই। আপনি আসলে জানেন না পুরো ঘটনা টা। এই তো কয়েকদিন আগে আমি আয়রন করতে গিয়ে মিস্টার শেখের প্রিয় শার্টটা পুড়িয়ে ফেলি। এইজন্য উনি আমায় পছন্দ করেন না।”
নীল বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,
—” এজন্য তুমি এসব সহ্য করছো? আজব ব্যাপার! লুকিয়ে কেঁদে কী লাভ ধারা? দিনশেষে তোমার কষ্ট তুমি নিজে ছাড়া কেও বুৃঝবে না।”
ধারা মলিন হাসল,
—” আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বিশ্বাস করুন। এই শেখ বাড়ির আশ্রয় হারালে আমি কোথায় মাথা গুঁজব? বাঁচব কীভাবে? তাই মিস্টার শেখের এসব কথায় আমি কষ্ট পাইনা। আপরার খালামনি তো ভীষন আদর করে আমায়।”
নীল হাসলো। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ফট করে জিজ্ঞেস করল,

—” বিয়ে করোনি তাইনা?”
ধারা খুকখুক করে কাশতে গিয়েও থামলো। দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
— ” জ্বি না। এখনো করিনি।”
নীল এবারে বলল,
—” তুমি চিন্তা করো না। খালামনিকে বলে একটা বেস্ট ছেলে খুঁজে দেব তোমার জন্য। পারফেক্ট হাজবেন্ড হবে দেখে নিও। তখন আর এত কষ্ট থাকবে না তোমার।”
ধারা কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে বলল,
—” ঠিক আছে। ”
নীলও পাল্টা হাসল। এরপর বলল,
—” একটা কথা বলি ধারা?”
—” বলুন।”
—” আমরা বন্ধু হতে পারি?”
ধারা কিছুক্ষণ মলিন চোখে তাকিয়ে একটুখানি হাসল৷ বলল,
—” আমার আগে কখনো বন্ধু ছিল না।”
নীল জোর দিয়ে বলল,
—” ছিল না, এবার হবে। ট্রাস্ট মি, ফ্রেন্ডশিপের মূল্য অবশ্যই দেব আমি।”
ধারা মুচকি হাসলে নীল এক হাত বাড়িয়ে বলে,

—” হবে? বন্ধু?”
ধারা হ্যান্ডশেক করল না। দুর থেকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করার ভঙ্গি করল। বলল,
—” আচ্ছা। বন্ধু হলাম।”
নীলও দ্বিমত করল না। হেসে ফেলল ধারার অবস্থা দেখে। খুশি হয়ে গেলো ধারাকে বন্ধু বানিয়ে নেয়ায়। এরপর ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
—” আচ্ছা শোনো, বিকেলে এই জায়গাতেই আবার এসো। তোমায় একটা সারপ্রাইজ গিফট দেব!”
ধারা আগ্রহী হলো,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৯

—” কী গিফট?”
—” এখন বললে কি আর সারপ্রাইজ থাকবে? তুমি শুধু বিকালে এই জায়গাতে এসো একবার! তুমি তো আমায় তোমার গল্প শোনালে, এবার আমি তোমায় আমার বিরহের গল্প শোনাব।”
ধারা মাথা নেড়ে হেসে বলল,
—” আচ্ছা। ”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here