Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৮

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৮

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৮
সুমাইয়া ইসলাম নূর

মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় পনেরো দিন।
এই ক’দিনে অনেক কিছু বদলে গেছে।
ইউভি বেশ কিছুদিন হলো ঢাকায় ফিরে গেছে। কিন্তু দূরে গেলেও ইনায়া আর পিয়াসার নিরাপত্তার ব্যাপারে একটুও ছাড় দেয়নি সে। বরং আগের চেয়ে আরও বেশি সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিয়েছে।
ম্যানশন, ইউনিভার্সিটি, এমনকি তাদের যাতায়াতের প্রতিটি জায়গাতেই কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে।
ইউভি আর রেদওয়ানের নির্দেশে বিশেষ সিকিউরিটি টিম সারাক্ষণ ইনায়া আর পিয়াসাকে নজরে রাখছে। অত্যাধুনিক ক্যামেরা, ট্র্যাকিং সিস্টেম আর প্রশিক্ষিত গার্ডদের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে যেন তাদের কোনো ধরনের সমস্যা না হয়।

দূরে থেকেও যেন অদৃশ্য এক নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করে রেখেছে ইউভি।
কারণ একটা ব্যাপার সে খুব ভালো করেই জানে—
তার বোন আর ইনায়ার নিরাপত্তার সঙ্গে সে কোনো আপস করতে পারবে না।
ক্লাসরুমে পাশাপাশি বসে আছে ইনায়া আর পিয়াসা।ইনায়ার সামনে কয়েক সিট দূরে বসে আছে তন্ময়।একসময় ছেলেটার সঙ্গে ইচ্ছে করেই কথা বলত ইনায়া। ইউভিকে রাগানোর জন্য, তাকে জ্বালানোর জন্য।কিন্তু এখন?
এখন ইউভি দূরে চলে যাওয়ার পর সেই অভিনয়ের আর কোনো প্রয়োজন নেই।তাই তন্ময়ের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া একটি কথাও বলে না সে।তন্ময়ও বিষয়টা বুঝতে পেরেছে যে ইনায়া আগের মতন তার সাথে কথা বলে না ।
তবুও মাঝে মাঝে আড়চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে বলে আমার ডল কি এমন হলো হঠাৎ তোমার যে আমার সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করো না।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন তাদের স্যার।স্যারকে দেখে সবাই চুপ হয়ে গেল।তিনি মুচকি হেসে বললেন—

— তোমাদের আরও দশ দিন ক্লাস হওয়ার কথা ছিল।কথাটা শুনেই সবাই হতাশ মুখে একে অপরের দিকে তাকাল।কিন্তু পরের কথাতেই পুরো ক্লাসরুম উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। তবে একটা সুখবর আছে।
— তোমাদের ইন্টার্নশিপের সময় চলে এসেছে। চাইলে এখনই নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে ইন্টার্নশিপ শুরু করতে পারো।
কয়েক সেকেন্ড থেমে রহস্যময় হাসি দিয়ে আবার বললেন আর এটাকেই তোমাদের জন্য সারপ্রাইজ হিসেবে রাখতে চেয়েছিলাম।
— হাতে এখনও দশ দিন সময় আছে।
— ঘুরো, আনন্দ করো, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাও।
— তারপর যে যার ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে।
স্যারের কথা শেষ হতেই পুরো ক্লাসরুম আনন্দে গুঞ্জন করে উঠল।স্যার হাসতে হাসতেই ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন।
স্যার বের হতেই পিয়াসা আনন্দে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল। বেবি আমরা দেশে ফিরতে পারব!
ইনায়াও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তার এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।মুখে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে বলল সত্যি বলতে আমি এত বড় সারপ্রাইজ একদমই আশা করিনি।

— ভাবতেই ভালো লাগছে, খুব শীঘ্রই আমরা সবাই আবার একসাথে হব।পিয়াসা খুশিতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।ঠিক তখনই তন্ময় তাদের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।
হালকা হেসে বলল তো, তোমরা কোথায় ইন্টার্নশিপ করবে ভেবেছ?পিয়াসা মুচকি হেসে বলল—
— সেটা তো প্রায় ঠিক হয়েই আছে।
— আমরা চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড তেই ইন্টার্নশিপ করব।
তন্ময় ভ্রু তুলে হেসে বলল—
— Really?তারপর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে চেয়ার টেনে বসে বলল তাহলে দেখা যাচ্ছে আমরাও সহকর্মী হতে যাচ্ছি।ইনায়া আর পিয়াসা একসাথে তাকাল।তন্ময় হেসে বলল আমিও চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড তেই ইন্টার্নশিপ করব। বাবা অনেক আগেই সব কথা বলে রেখেছেন।
কথাটা শুনে পিয়াসা অবাক হয়ে বলল—
— ওহ! তাহলে তো মজাই হবে।
কথারা শুনে ও তন্ময় হাসল।আর ইনায়া সে শুধু শান্ত চোখে সামনে তাকিয়ে রইল।তার মনের ভেতর তখন অন্যরকম এক উত্তেজনা কাজ করছে।
আর মাত্র কিছুদিন.তারপরই তারা ফিরে যাবে নিজের দেশে।
নিজের মানুষদের কাছে।
আর হয়তো খুব শীঘ্রই দেখা হবে আমার বালের শেহজাদা তোমার সাথে ভাবতেই অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল ইনায়ার।

লন্ডনের বিশাল ম্যানশনের গার্ডেনটা আজ অদ্ভুত শান্ত লাগছে । সন্ধ্যার নরম আলো অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। চারপাশে জ্বলছে ছোট ছোট গার্ডেন লাইট, তাদের মৃদু আলোয় ফুলগুলোকে আরও সুন্দর লাগছে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে দুলছে গোলাপ আর ল্যাভেন্ডারের গাছ।
গার্ডেনের একপাশে রাখা সাদা রঙের বেতের দোলনামতো চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছে ইনায়া। হাতে ফোন, অন্যমনস্কভাবে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করছে। তার হালকা লালচে চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। মুখে কোনো ভাব নেই, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন ইউভির জন্য একটা শূন্যতা কাজ করছে।
অন্যদিকে পিয়াসা পাশের চেয়ারে বসে ঠান্ডা জুস খেতে খেতে ফোন দেখছিল।
হঠাৎ করেই পিয়াসা চমকে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল বেবি! দেখ! এটা দেখ! তাড়াতাড়ি দেখ!
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল কী হয়েছে আবার?
পিয়াসা দ্রুত নিজের ফোনটা সামনে ধরে বলল—

— তোর রুম দখল করে ফেলেছে ওই ডাইনিটা! আর দেখ… কবে বাংলাদেশে গেল, আমরা কিছুই জানি না! কী চায় ও?
ইনায়া এবার ফোনের দিকে তাকাল।স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তিয়ার নতুন পোস্ট।প্রথম ছবিতে তুয়া দাঁড়িয়ে আছে পুরো চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে।
ক্যাপশন—
“Our Family এরপর একের পর এক ছবি।
কখনো লিখন চৌধুরীর পাশে, কখনো রাতিব চৌধুরীর পাশে, কখনো পুরো পরিবারের সঙ্গে।
আর শেষের ছবিটা দেখে ইনায়ার চোখ রাগে লাল হয়ে গেল।ছবিটা তোলা হয়েছে তার নিজের রুমে।
তার প্রিয় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তিয়া।
ক্যাপশনে লেখা—
“একটুকরো শান্তির জায়গা… আমার রুম।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। কীইইই?
ওটা আমার রুম!পিয়াসাও রাগে ফুঁসতে লাগল।
আমিও তো সেটাই বলছি!তোর রুমে ঢোকার সাহস কে দিল?ইনায়া দাঁত চেপে বললওকে আমার রুমে ঢুকতে দিল কে? আমার মা নাকি তোর মা

— কী চায় ও?
পিয়াসা গম্ভীর মুখে বলল বেবি,আমার ভাইয়া ও ওর কাছে নিরাপদ না!কথাটা শুনে ইনায়া আরও রেগে গেল। পিয়াসা!
আমি দেশে যাব!
ও হয়তো জানেই না আমাদের ক্লাস শেষ হয়ে গেছে! আমাকে রাগানোর জন্যই ঢাকা গিয়ে বসে আছে। আমার দুর্বল জায়গাগুলোতেই আঘাত করছে! আমি ওকে ছাড়ব না!
ঠিক তখনই হঠাৎ ইনায়ার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
“Montu Cha
ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল।
দ্রুত কল রিসিভ করে বলল আরে আমার মন্টু চা!
কেমন আছো? সরি সরি… মন্টু চাচা, কেমন আছো?ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
— কী কইরা ভালো থাকি মা?তোমাগো যে কতদিন দেখি না… আর এইদিকে তুবা মা কেমন মনমরা হইয়া আছে। কিছু খায় না। চুপচাপ থায়ে
—তোমরা যেখানে বইসা থাকতে, ওইখানে গিয়া বইসা বইসা কান্দে। এই যে এখনো বইসা বইসা কান্দতাছে। মাইয়াডা তোমাগো অনেক মিস করে, মা। চইলা আইসো না মাইয়াডার কাছে।
আমারও খুব কষ্ট হয়।
কথাগুলো শুনে ইনায়া যেন জমে গেল।
তার মুখের সব রাগ মুহূর্তেই কোথাও হারিয়ে গেল।
কাঁপা গলায় বলল কী বলছো চাচা?

— ও… ও কাঁদে?মন্টু চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
কিন্তু আমাদের সামনে ও নিজেকে হাসি খুশি রাখে আমরা তো জানি ও এখন নিজেকে সামলে নিয়েছে।
— না মা, তোমরা ভুল জানো।
মাইয়াডা প্রতিদিন আইসা কান্দে। আর আমারও পরানডা পুইড়া যায় তোমাগো জন্য।
আইবা না দেশে?
ইনায়ার গলা কেঁপে উঠল।
চোখের কোণে জল জমে গেল। আসবো চাচা…
খুব দ্রুত আসবো পরে কথা বলবো। ভালো থেকো।
— আল্লাহ হাফেজ।
কল কেটে গেলো।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসার চোখ দিয়েও দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর কান্না মেশানো কণ্ঠে বললো—
পিহু.. আমি কি খুব বেশি কঠোর হয়ে গেছি?
এই হার-জিতের খেলায় আমি কি আমার কাছের মানুষগুলোর কথা ভুলে গেছি? তুবা আমাদের দু’জনকে খুব মিস করছে।

ও অনেক কষ্ট পাচ্ছে, পিহু…পিয়াসা স্থির দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।ইনায়াও একইভাবে তাকিয়ে আছে।দু’জনের চোখেই একই অনুভূতি।
একই সিদ্ধান্ত।কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ইনায়া হঠাৎ বললো
আমি যা ভাবছি.. তুইও কি তাই ভাবছিস?
পিয়াসার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো।
পরের মুহূর্তেই দু’জন একসাথে বলে উঠলো—
আমরা আজই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হব!
পিয়াসা খিলখিল করে হেসে বললো এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে, বেবি!ইনায়া হাসতে হাসতে পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরলো।
চল! অনেক কাজ বাকি! আর শোন…
সবার আগে কিন্তু আমাদের সেই পাগলটার কাছে যেতে হবে।পিয়াসা হেসে মাথা নেড়ে বলল অবশ্যই!
ইনায়া নিজের ফোনটা বন্ধ করতে করতে বললো
আগে ফোন অফ করে রাখি। সবাইকে এমন সারপ্রাইজ দেব.. যে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না!দু’জনের চোখে তখন দুষ্টু ঝিলিক।

ঢাকার আকাশে তখন বিকেলের সোনালি আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।বহু ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে অবশেষে বিমানবন্দরের ভিআইপি এক্সিট দিয়ে বের হলো দুইটি মেয়ে।আর তাদের বের হওয়া দেখেই আশেপাশের অনেকের দৃষ্টি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিকে চলে গেল।দুজনের পরনেই কালো রঙের স্টাইলিশ পোশাক।ইনায়া পরেছে ব্ল্যাক ওয়াইড-লেগ প্যান্ট আর ব্ল্যাক শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। হালকা লালচে চুলগুলো খোলা। হাতে কার্টিয়ার এর ঘড়ি আর একটি কালো শ্যানেল এর হ্যান্ডব্যাগ।
অন্যদিকে পিয়াসার পরনে কালো জিন্স, কালো টপ আর লং কোট। চুলগুলো পনিটেইলে বাঁধা। মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো আন্তর্জাতিক বিজনেস ম্যাগাজিনের কভার থেকে বেরিয়ে এসেছেবিমানবন্দরের।
ভিআইপি এক্সিটের সামনে তখন কয়েকজন বডিগার্ড অপেক্ষা করছে।
চৌধুরী পরিবারের কেউ জানে না আজ ইনায়া আর পিয়াসা দেশে ফিরছে।কারণ তারা কাউকেই কিছু জানায়নি।সবাইকে সারপ্রাইজ দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের।
তাদের দেখামাত্রই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পার্সোনাল বডিগার্ডরা সম্মানের সাথে মাথা নিচু করল।
— Welcome back, Ma’am.
ইনায়া হালকা মাথা নেড়ে হাঁটতে লাগল।
পিয়াসা চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— বেবি, বিশ্বাসই হচ্ছে না আমরা সত্যি সত্যি দেশে চলে এসেছি।ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।

বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। রাস্তার দুপাশে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা, আর সেই পরিচিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্টু চাচার ছোট্ট চায়ের দোকান।দোকানের সামনের বেঞ্চটায় চুপচাপ বসে আছে তুবা।কোচিং শেষ করে সোজা এখানে চলে এসেছে সে।দৃষ্টি শূন্য, মুখটা কেমন বিষণ্ন।মাঝে মাঝেই ফোনটা বের করে রাজ্যের সাথে মেসেজে কথা বলছে আবার রেখে দিচ্ছে।
এদিকে ইনায়া বললো বেবি
— আগে জানতে হবে তুবা কোথায় আছে।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বললো আরে! আমাদের দা গ্রেট ডাক্তার রাজ্য আছে না? দাঁড়া, আমি জেনে নিচ্ছি।
তারপর রাজ্যকে ফোন করে খুব সহজেই তুবার লোকেশন জেনে নিয়েছিল সে।
রাজ্য বলেছিল কোচিং শেষ করেছে। এখন মন্টু চাচার দোকানের সামনে বসে আছে।
কিছুক্ষণ পর…
একটা কালো গাড়ি এসে রাস্তার একটু দূরে থামল।
সেখান থেকে নামল দুটো মেয়ে।
দুজনের পরনেই কালো শার্ট, কালো কোট, কালো মাস্ক আর কালো ক্যাপ।দূর থেকে কাউকেই চেনার উপায় নেই।তারা ধীর পায়ে হেঁটে এসে তুবার দুই পাশে গা ঘেঁষে বসে পড়ল।তুবা সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হয়ে তাকাল। এত জায়গা থাকতে আমার গা ঘেঁষে বসছেন কেন?তারপর মন্টু চাচার দিকে তাকিয়ে বলল মন্টু চাচা! এই মেয়ে দুটো এখানে বসেছে কেন? আপনাকে না বলেছি, আমরা যখন দোকানে আসব তখন এই জায়গাটায় কাউকে বসতে দেবেন না?
মন্টু চাচা বিব্রত মুখে বললেন আরে মা, আমি কী করব ওরা তো শোনেনি আমার কাছে ?তারপর মেয়ে দুইটার দিকে তাকিয়ে বললেন

— মা, তোমরা ওই চেয়ারগুলোতে গিয়ে বসো।
কিন্তু মেয়ে দুইটা কেউই কোনো উত্তর দিল না।
বরং আরও একটু সরে এসে তুবার গা ঘেঁষে বসল।
এবার তুবার মেজাজ পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেল।
সে রেগে উঠে বলল সমস্যা কী আপনাদের?
মন ভালো নেই বলে কিছু বলছি না।না হলে বারোটা বাজিয়ে দিতাম!যতসব গায়ে পড়া লোকজন!
— ছি!কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াতে গেল তুবা।
কিন্তু মুহূর্তেই মেয়ে দুইটা তার দুই হাত ধরে আবার বেঞ্চে বসিয়ে দিল।তুবা অবিশ্বাসের চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।আর মন্টু চাচা এবার সত্যিই রেগে গেলেন। এই! তোমাদের সমস্যা কী?
সরে বসো! আর তুবা মায়ের হাত ছাড়ো!
যতসব পাগল!দেখতে তো ভালো পরিবারের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে!কিন্তু তিনি আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না।
একটা মেয়ে বিরক্ত মুখে বলে উঠল—
উফফ মন্টু চা!এত কথা না বলে তিন কাপ চা আর তিনটা আইসক্রিম নিয়ে আসো।
চা দিয়ে আইসক্রিম ভিজিয়ে খাব। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মেয়েটা বলে উঠল— ধুর! এটাও ভুলে গেছিস?

— আইসক্রিম দিয়ে চা ভিজিয়ে খেতে হয়!
কথাটা শুনেই মন্টু চাচা থমকে গেলেন।
চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল।মুখে বিস্ময়ের ছাপ।
এই কথাটা.এই অদ্ভুত খাওয়ার স্টাইল…
এটা তো তিনি জীবনে মাত্র তিন জন মানুষের মুখেই শুনেছেন!তিনি অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন এই যে..তোমরা…?
— আরে!
এমন তেরা কথা তো শুধু চৌধুরী বাড়ির দুই ঘার তেরারাই বলে!তুবা অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।কিন্তু কোনো কথা বলছে না।
কেন জানি বুকের ভেতরটা কাঁপছে।
চোখের কোণে জমে থাকা অভিমান হঠাৎ করেই জল হয়ে গড়িয়ে পড়ল।দু’ফোঁটা অশ্রু নীরবে গাল বেয়ে নেমে এলো।কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল—
মন্টু চাচা.. আমি বাসায় যাচ্ছি.।
তুবার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে “মন্টু চাচা, আমি বাসায় যাচ্ছি…” কথাটা বের হতেই হঠাৎ মেয়ে দুইটা একসাথে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।মুহূর্তের জন্য তুবা স্থির হয়ে গেল।তারপর পরিচিত সেই গন্ধ…পরিচিত সেই স্পর্শ..পরিচিত সেই উষ্ণতা…
সবকিছু মিলিয়ে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ইনায়া নিজের মাস্কটা খুলে তুবার কপালে আলতো টোকা দিয়ে বলল আরে পাগলি.. আমরা তোকে অনেক মিস করেছি, বেবি।

পিয়াসাও চোখ মুছতে মুছতে বলল দেখ না, বাসায়ও যাইনি আমরা। প্লেন থেকে নেমেই আগে তোর কাছে চলে এসেছি। তুই বুঝতে পারছিস, তুই আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?তুবার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে।সে কিছু বলতে পারছে না।ইনায়া এবার তুবার দুই গাল নিজের হাতের মাঝে নিয়ে বলল আমাদেরও কষ্ট হয়েছে, বেবি। অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কী বল তো?
জীবনে কিছু ভালো সাফল্য পাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে একটু কষ্ট করতেই হয়।
দেখ, আমরা তো ফিরে এসেছি। এখন শুধু বাদরামি হবে.. শুধু ভন্ডামি হবে… আর সারাদিন তোকে জ্বালাব।পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
একদম। তুই তো আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন। তাই তো সবার আগে তোর কাছেই এসেছি।এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না তুবা।হাউমাউ করে কেঁদে উঠে দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কাঁপা কাঁপা গলায় বলল আর কখনো যাস না আমাকে ছেড়ে… প্লিজ.।
তোদের ছাড়া একদম ভালো লাগে না। খুব কষ্ট হয়। খুব…ইনায়া আর পিয়াসার চোখও ভিজে উঠল।পিয়াসা তুবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—

কোথাও যাচ্ছি না, পাগলি।
ইনায়া হেসে বলল আর যদি যাইও.. তোকে নিয়েই যাব।
কথাটা শুনে তুবার মুখে কান্নার মাঝেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।তিন বান্ধবী তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে।চারপাশের কোলাহল যেন তাদের ছুঁতেই পারছে না। চার মাসের দূরত্ব, অভিমান, কষ্ট—সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে গলে যাচ্ছে।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে মন্টু চাচা পুরো দৃশ্যটা মুগ্ধ হয়ে দেখছেন।তার চোখ দুটোও চিকচিক করছে।
নিজের মনে হাসতে হাসতে বললেন এমন বন্ধুত্বও কি সম্ভব? আমি তো ভাবছিলাম খবরটা জানার পর আসতে আসতে কয়েকদিন লাগবে।আর এরা দেখো! চব্বিশ ঘণ্টাও হয়নি। এরই মধ্যে লন্ডন থেকে উড়াল দিয়ে চলে এসেছে।
একেকটা আস্ত পাগল!তারপর মুখে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে আবার বললেন যাক.. এখন থেকে আবার শুরু হবে। দোকান মাথায় তোলা হবে। আইসক্রিম দিয়ে চা খাওয়া হবে। আর সারাদিন আমারে জ্বালানো হবে!মন্টু চাচার কথা শুনে তিনজনই একসাথে হেসে উঠল।
কান্নার মাঝেও সেই হাসিটা ছিল ভীষণ সুন্দর।
কারণ কিছু সম্পর্ক রক্তের না হলেও…
হৃদয়ের বন্ধনে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে দূরত্ব, সময় কিংবা অভিমান—কোনোটাই তাদের আলাদা করতে পারে না।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা আর বেগুনি রঙের মায়াবী আভা।মন্টু চাচার দোকানে অনেকক্ষণ আড্ডা, হাসাহাসি আর কান্না মেশানো পুনর্মিলনের পর অবশেষে তিনজন বিদায় নিল।
প্রথমে পিয়াসাকে এহসান মঞ্জিলের সামনে নামিয়ে দিল ইনায়া।গাড়ি থেকে নামার আগে পিয়াসা হেসে বলল— কাল সকালেই দেখা হবে, বেবি।
ইনায়া মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।তারপর কালো রঙের গাড়িটা ধীরে ধীরে চৌধুরী ভিলার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
অন্যদিকে…
চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানির টপ ফ্লোর।
পুরো ফ্লোরটাই যেন ক্ষমতা আর আভিজাত্যের প্রতিচ্ছবি।বিশাল কাঁচের দেয়াল ঘেরা কর্নার অফিস।সামনে পুরো শহরটাকে দেখা যায়।
দামী কাঠের তৈরি ডেস্ক, দেয়ালে ঝুলানো আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর বিভিন্ন ব্যবসায়িক অর্জনের স্মারক।একপাশে আধুনিক কনফারেন্স টেবিল, অন্যপাশে কালো লেদারের সোফা।
রুমের ভেতরের পরিবেশ অদ্ভুত রকম গম্ভীর।
সেই রুমেই মুখোমুখি বসে আছে ইউভি আর রেদওয়ান।দুজনের মুখেই চিন্তার ছাপ।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর রেদওয়ানই প্রথম কথা বলল। ভাইয়া, কোনো আপডেট নিউজ পেয়েছো?
ইউভি ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো
— হুম। দুই বেয়াদব দেশে আসছে।
রেদওয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।ইউভি শান্ত গলায় বলল তোর বোনের পার্সোনাল বডিগার্ড রিটা খবরটা দিয়েছে। অনেকক্ষণ আগেই।কথাটা বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।কোটটা ঠিক করতে করতে বলল চল।
অনেকদিন রোজা আছি। ইফতারটা সেরে ফেলতে হবে।
রেদওয়ান কপাল কুঁচকে বলল—

— মানে?
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। চল আগে।
তারপর বুঝবি।রেদওয়ান সন্দেহের চোখে তাকালেও আর কিছু বলল না। অফিসে দুজনেরই ফরমাল লুক।ইউভির পরনে চারকোল ব্ল্যাক স্যুট।
ভেতরে সাদা শার্ট, গলায় কালো টাই।
হাতে ঘড়ি।চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা।
অন্যদিকে রেদওয়ানের পরনে নেভি ব্লু স্যুট।
সাদা শার্টের সাথে গাঢ় নীল টাই।
সবসময়কার মতোই ব্যক্তিত্ব আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দুজনে ।দুজন পাশাপাশি করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর অফিসের মেয়েরা?যেদিক দিয়ে দুই ভাই যাচ্ছে, সেদিকেই যেন সবার দৃষ্টি আটকে আছে।
মনে হচ্ছে সামনে কোনো লোভনীয় খাবার হাঁটছে আর তারা গভীর মনোযোগ দিয়ে সেটাই দেখছে।
দৃশ্যটা দেখে রেদওয়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
এমন সময় ইউভি হঠাৎ বলে উঠল—তিয়া চৌধুরী তোর বোনের রুম দখল করেছে।
রেদওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল জানি ভাইয়া.।
না জানি কোন ঝড় অপেক্ষা করছে তিয়া চৌধুরীর জন্য।কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।রেদওয়ান আবার বলল—
ফ্যামিলির সামনে কোনো সিনক্রিয়েট করবে না তো বোনু?ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর অদ্ভুতভাবে মুচকি হেসে উত্তর দিল—
বউটা আমার আগের সেই ছেলেমানুষ নেই। যথেষ্ট ম্যাচিউর হয়েছে। কী করতে হবে, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।ইউভির কথার ভেতরের আত্মবিশ্বাস দেখে রেদওয়ানও হেসে ফেলল।

সন্ধ্যার নরম আলো তখন পুরো চৌধুরী ভিলাকে ঘিরে রেখেছে।ভিলার চারপাশের গার্ডেনের লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। দূর থেকে দেখতে পুরো জায়গাটা যেন কোনো রাজপ্রাসাদের মতো লাগছে।
ঠিক তখনই কালো রঙের মার্সিডিজ-বেঞ্জ মেব্যাচ এস-ক্লাস গাড়ি নিয়ে ভিলার ভেতরে প্রবেশ করল ইউভি আর রেদওয়ান।
গাড়ি থেকে নেমে দুজন যখন ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল, তখনই দুজন একসাথে থমকে দাঁড়াল।রেদওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল—
কী ব্যাপার ভাইয়া? পরিবেশ এখনো এত ঠান্ডা কেন?
ইউভিও চারপাশে তাকিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল।ড্রয়িংরুমে বসে আছেন লিখন চৌধুরী, রতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী আর রাইহান চৌধুরী।
চার ভাই সোফায় বসে গল্প করছেন।তাদের ঠিক পাশেই নরম কার্পেটের উপর বসে খেলছে আয়াত, আতিকা আর রিদ।

ওদিকে ডাইনিং এরিয়ার দিকে ব্যস্ত হয়ে কাজ করছেন নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী।
হেল্পিং হ্যান্ডরাও পাশে আছে।সবাই মিলে রাতের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত।তিয়া আর রাইহান চৌধুরী এই বাড়িতে আসার পর থেকেই যেন সবাই অনেক খুশি।আর এখন থেকে তিয়া মাঝেমধ্যে এই বাড়িতেই থাকবে।ব্যবসার কাজে লন্ডন যাওয়া-আসা করবে।কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্যটা ছিল অন্য কিছু।রেশমা চৌধুরী নিজের হাতে তিয়াকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন।আর তিয়া হেসে হেসে গল্প করছে।ঠিক তখনই তিয়ার চোখ গিয়ে পড়ল ইউভি আর রেদওয়ানের উপর।মুহূর্তেই তার হাসিটা আরও বড় হয়ে গেল।সেটা দেখেই ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে দাঁত চেপে বললো
আমার আদরের জায়গায় ও কী করছে?

মা তো ঠিক একইভাবে আমার আদরকে খাইয়ে দিত। এইসব আমি অ্যালাও করব না, রেদওয়ান।
ইনায়া কী করবে জানি না… কিন্তু আমি সিনক্রিয়েট করে ফেলব।রেদওয়ান কিছু বলার আগেই লিখন চৌধুরী হেসে বললেন— এই তো তোরা এসে গেছিস!
শোন না রেদওয়ান. নূর আর পিয়াসাকে কাল থেকে ফোনে পাচ্ছি না।
কিছু হয়েছে নাকি? একটু কথা বলিয়ে দে।
ভালো লাগছে না।ওদের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে।
কথাটা শুনে ইউভি আর রেদওয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।দুজনের মাথায় একই প্রশ্ন ঘুরছে।
গেল কোথায় দুই বেয়াদব?রেদওয়ান এবার সত্যিই চিন্তিত গলায় বলল—
ভাইয়া.. একটা বডিগার্ডও সঙ্গে নেয়নি ওরা।
ওই ক্রিমিনালগুলো কিছু করল নাকি? আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।ইউভি শান্ত গলায় বলল— না রেদওয়ান।
ওরা সুস্থভাবেই বাংলাদেশে ল্যান্ড করেছে।
আর বাংলাদেশে ওরা সেফ।যারা ওদের উপর অ্যাটাক করতে গিয়েছিল…আমাদের লোকেরা তাদের সেখানেই থামিয়ে দিয়েছে।

রেদওয়ানের ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটল।
ভাইয়া…বোনু আর পিহু জানতেও পারল না…
ওদের নিরাপত্তার জন্য আমরা ঠিক কত কিছু করেছি।দূরে বসে থাকা তিয়া লিখন চৌধুরীর কথাগুলো শুনে মুচকি হাসল।মনে মনে বলল—
আর কোনোদিন খোঁজও পাবে না, চাচ্চু.আমি যে সেটা হতে দিইনি.।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ঝিলিক খেলে গেল।ঠিক তখনই তিয়া মিষ্টি গলায় বলল—
বড় মা..আরেকটু খাবার দিন না। অনেক মজা হয়েছে।ওদিকে ইউভির অবস্থা তখন রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারানোর মতো।সে নিচু গলায় বলল— রেদওয়ান… ওই জানোয়ারের বাচ্চাকে আমার সামনে থেকে সরা। আমার দুই দুইটা কলিজায় আঘাত করতে গিয়েছিল।
রেদওয়ান গম্ভীর হয়ে বলল তুমি কি শিওর হয়েছো? রবার্ট কী বলেছে?
ইউভির চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল।

— হ্যাঁ।ওটাই তিয়া চৌধুরী ছিল।
কিন্তু ছোট চাচ্চু এই বিষয়ে কিছুই জানে না।
রেদওয়ান আর কিছু বলল না।শুধু গভীর দৃষ্টিতে তিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই..
ভিলার বিশাল দরজাটা খুলে গেল।সবার দৃষ্টি একসাথে সেদিকে ঘুরে গেল।আর পরের মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুটো মেয়ে।
ইনায়া,পিয়াসা।
কিন্তু…এরা কি সত্যিই সেই আগের ইনায়া আর পিয়াসা?দুজনের পরনেই নিখুঁত কালো বিজনেস স্যুট।ভেতরে কালো শার্ট পায়ে হাই হিল।চুলগুলো পরিপাটি করা।হাতে কার্টিয়ার ঘড়ি।
মুখে আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি।
হাঁটার ভঙ্গিতে এমন একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠছে, যেটা দেখলেই বোঝা যায় তারা এখন সফল বিজনেসওম্যান।বিশেষ করে ইনায়া।

তার চোখে আগের সেই চঞ্চলতা থাকলেও এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
আর পিয়াসা আগের লাজুক মেয়েটার জায়গায় এখন আত্মবিশ্বাসী এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।
দুজন পাশাপাশি হেঁটে ভেতরে ঢুকল।
পুরো রুমের সবাই কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।লিখন চৌধুরী ফিসফিস করে বললেন এরা.. আমাদের সেই ইনায়া আর পিয়াসা?
রাতিব চৌধুরী বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।
নুসরাত চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল।
আর ইউভি তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে গর্বিত একটা হাসি ফুটে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন লিখন চৌধুরী, রতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী।
তিনজনই প্রায় একসাথে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন।ইনায়া আর পিয়াসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লিখন চৌধুরী দুজনকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন।কণ্ঠে ছিল ভালোবাসা মেশানো শাসন। এমন সারপ্রাইজ আমরা চাই না।
তোমরা ফোন ধরো নাই কেন? জানো আমরা কত চিন্তা করেছি?রাতিব চৌধুরীও মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন একবার ফোন করে বলতে পারতে না?

সারাদিন মনটা কেমন অস্থির হয়ে ছিল।
রবিউল চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন আর কখনো এমন করবে না। তোমাদের জন্য পুরো বাড়ি টেনশনে ছিল।ইনায়া ছোট্ট মেয়ের মতো মাথা নিচু করে বলল সরি চাচ্চু.. আর হবে না।
পিয়াসাও মুচকি হেসে বলল এবার মাফ করে দাও।
তিন ভাই এক সাথে হেসে উঠলেন
ওদের উপর রাগ করে থাকা সত্যিই অসম্ভব।
ঠিক তখনই ছোট ছোট তিনটা ঝড় এসে হাজির হলো।আয়াত, আতিকা আর রিদ দৌড়ে এসে ইনায়া আর পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরল। আপু! আপু!
তোমরা চলে এসেছো!আয়াত একেবারে ইনায়ার গলায় ঝুলে পড়ল।আতিকা গিয়ে পিয়াসাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আর রিদ তো একবার ইনায়ার কাছে যাচ্ছে, একবার পিয়াসার কাছে।
মুখে হাজারটা অভিযোগ।তোমরা এতদিন কোথায় ছিলে? আমাদের কথা মনে পড়ে নাই? আমাদের জন্য কী এনেছো?পুরো ড্রয়িংরুম হাসিতে ভরে গেলইনায়া আর পিয়াসাও বাচ্চাগুলোকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগল।
ঠিক তখনই রেশমা চৌধুরী এগিয়ে এলেন।
চোখদুটো এখনো ভেজা।অনেকদিন পর নিজের মেয়েদের সামনে পেয়েছেন।কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই ইনায়া দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে অভিমানী গলায় বলে উঠল থাক বড় মা।
এক মেয়ে পেয়ে অন্য দুই মেয়েকে তো ভুলেই গেছো। তুমি যা করছো তাই করো। খাইয়ে দাও তোমার মেয়েকে।বলেই তিয়ার দিকে তাকাল।
পিয়াসাও সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—

— হ্যাঁ মা। খাইয়ে দাও তোমার মেয়েকে। আমরা রুমে গেলাম। আমরা যে এই বাড়ির কেউ না, সেটা তো বুঝেই ফেলেছি।নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরীর সাথেও তেমন একটা কথা বলল না ইনায়া আর পিয়াসা।বিষয়টা বাড়ির তিন গিন্নিকেই বেশ ভাবিয়ে তুলল।এরই মাঝে তিয়া চুপচাপ উঠে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ঠিক তখনই কয়েকজন গার্ড ভেতরে ঢুকল।
তাদের হাতে ইনায়া আর পিয়াসার লাগেজ।
লিখন চৌধুরী গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বললেন—
ওদের রুমে জিনিসগুলো রেখে আসো।নুসরাত চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন—
— এখন কী হবে?
তিয়াকে তো ইনায়ার রুমে থাকতে দিয়েছি ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। পিয়াসার হাত ধরে সোজা হাঁটা শুরু করলো উপরের উদ্দেশ্য পিয়াসা যেতে যেতে বলল বেবি, তুই আমার রুমে চল।ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল—
— কেন?
আমার রুম থাকতে তোর রুমে যাব কেন?পিয়াসা একটু অস্থির গলায় বলল প্লিজ, তুই ওই রুমে যাস না…কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইনায়া সোজা ইউভির রুমের দিকে ইশারা করে বললো
That’s my room.
পিয়াসা বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল—

— ওহ বেবি!কী দিলি মাইরি! একদম জায়গামতো লাগবে!হঠাৎ ইনায়া যেন কী মনে করে আবার নিজের রুমের সামনে দারিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লিখন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললো
বড় চাচ্চু, আমার জিনিসগুলো গার্ডদের আমার রুমে দিয়ে যেতে বলো।একটু থেমে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বলল আমার হাজব্যান্ড শেহজাদা ইউভি চৌধুরীর রুমে।কথাটা কানে যেতেই ইউভি বিষম খেল।সে তখন পানি খাচ্ছিল।
হঠাৎ এমনভাবে কাশতে শুরু করল যে সবাই চমকে উঠল।রেদওয়ান তাড়াতাড়ি পাশে গিয়ে বলল—
ভাইয়া! কী হলো?
ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু অবিশ্বাসের চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখ গিয়ে আটকাল ইনায়ার উপর।
আর ইনায়া?সে সম্পূর্ণ নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।যেন কিছুই হয়নি।
ইউভির মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো।চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।কয়েক সেকেন্ড সে শুধু ইনায়ার দিকেই তাকিয়ে রইল।
আর রেদওয়ান?

সে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।
কথাটা শুনে তিয়া মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল।নিজের রুমে ঢুকেই সামনে থাকা ফুলদানিটা সজোরে ছুড়ে মারল দেয়ালে।ঠাস!
কাঁচ ভাঙার শব্দে পুরো রুম কেঁপে উঠল।
তিয়া দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল—
না, রবার্ট…এটা আমি আশা করিনি তোমার থেকে।
তুমি আমাকে এভাবে ঠকাতে পারো না। আমি তো বলেছিলাম ওকে শেষ করে দিতে!ও আমার সামনে এখন থেকে ইউভির রুমে থাকবে? আমি এটা সহ্য করতে পারব না!
রাগে তার বুক ওঠানামা করছে।চোখে-মুখে স্পষ্ট হিংস্রতা।
অন্যদিকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি এখনও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার বেয়াদব বউটার দিকে। সবার সামনে নিজের অধিকার ঘোষণা করে দিয়েছে।ইনায়ার চোখে-মুখে সেই চেনা দুষ্টুমি।ঠিক তখনই ইনায়া আবার সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে জোরে বলে উঠল—

শোনো না!
পুরো ড্রয়িংরুমের দৃষ্টি আবার তার দিকে চলে গেল।
সে সরাসরি ইউভির দিকে আঙুল তুলে বলল—
ওই তোমাকেই বলছি। রুমে আসো।
একটু দরকার আছে।রেদওয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।বাকি সবাই একবার ইনায়ার দিকে, একবার ইউভির দিকে তাকাচ্ছে।
ইনায়ার আবার বলে উঠলো কি হলো শুনছো তো।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৭

ইউভি সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখে বিস্ময়, মুগ্ধতা আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি।তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।কিন্তু সেই হাসিটা এক মুহূর্তেই লুকিয়ে ফেলল।মুখটা গম্ভীর করে ফেলল আবার।যেন কিছুই হয়নি।তবুও চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা আনন্দটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে কোটের বোতাম ঠিক করলো।
তারপর শান্ত, ভারী কণ্ঠে বললো
— জি, মিসেস চৌধুরী।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here