Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫১

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫১
নুসরাত ফারিয়া

রাতের আজ ফ্লাইট। সে রুমে নিজের সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে, ওয়াশরুম থেকে রেডি হয়ে বেরোলো। তখন আধার এসে বলল,
-“আরেক বার ভেবে দেখ, দেশ ছেড়ে না গেলে হতো না?”
রাত তোয়ালে দিয়ে মাথার চুলগুলো মুছতে মুছতে জানতে চাইল, -“এখানে থেকে কি করব?”
-“বিয়ে করে সংসার কর।”
রাত ফিচেল হেঁসে বলল, -“আমার মতো বাজে ছেলেকে কেউই বিয়ে করবে না।”
-“তোর অতীত যেমনই হোক না কেন, বর্তমানে তুই নিজেকে পরিবর্তন করেছিস।”
-“কয়লা হাজার ধুলেও ময়লা যায় না ভাইয়া। আর আমার এই নষ্টা জীবনে কাউকে জড়াতে চাই না। আমি একাই বাকী পথটুকু পার করে দিবো।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, -“তুই কাউকে ভালোবাসিস?”

-“রাতের মতো ছেলেরা কখনো কাউকে ভালোবাসে না, ব্রো! এদের অনুভূতি বলতে কিচ্ছু নেই।”
-“ঠিক আছে, তোর যা ইচ্ছে হয় কর। আমি কিছু বলব না!”
একথা বলে আধার সেখান থেকে চলে যায়। রাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ল্যাগেজ নিয়ে মায়ের রুমে এসে বিদায় নিয়ে, নিচে চলে যায়। তারপর দাদাজান ও ভাই-ভাবীর থেকেও বিদায় নেয়। অতঃপর এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
অফিসে থাকাকালীন কোনোভাবে ঈশিতা খবর পেয়েছে, আজ রাত দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটা শোনার পরই মেয়েটা সবকিছু ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাচ্ছে এয়ারপোর্টে। রাতের ফ্লাইটের টাইম ছিল সকাল দশটায়, আর ঈশিতা গিয়ে পৌঁছায় সাড়ে দশটা নাগাদ। ফলস্বরূপ ছেলেটার দেখা মেলে না, আর না তো তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়।
-“চোরের মতো এইভাবে পালিয়ে না গেলেও পারতে রাত। একটিবারের জন্য আমার না বলা কথাগুলো তো শুনতে পারতে। আমি একটু সময় চেয়েছিলাম নিজের অনুভূতিগুলো বোঝার জন্য, কিন্তু তুমি? তুমি কি করলে এটা? আমাকে মাঝপথে রেখে চলে গেলে? নিজের অনুভূতি বুঝে উঠতে না উঠতেই তুমি দেশ ছাড়া হলে! এখন আমি কাকে নিজের মনের কথাগুলো বলব? হু? তুমি বড্ড বেইমান রাত! সাথে নিষ্ঠুরও। আমার জীবনে হুট করে এসে হৃদয় চুরি করলে, আর এখন সেই তুমি হুট করেই পাখির মতো উড়াল দিলে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না, রাত? তাহলে তুমি কেন এমন করলে? শেষবারের মতো একটু দেখা করতে আমার সাথে! তাহলেই তো বলতে পারতাম আমি তোমাকে….”

এয়ারপোর্টের সামনে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে ভাঙা ভাঙা গলায় কথাগুলো বলে ঈশিতা। মেয়েটার রক্তিম চোখজোড়া বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল৷ হালকা বাতাসে উড়ছে পরনের ওড়না ও খোলা, এলোমেলো চুলগুলো। ঈশিতা চোখের পানি মুছে পিছনে ফিরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“না চাইতেও বাজে তুমিটাকে ভালোবেসেছি, রাত। কিন্তু তুমি জানতে পারলে না, এই পৃথিবীর বুকে তোমাকে মন থেকে ভালোবাসারও কেউ একজন রয়েছে। আর হয়তো কখনো জানতেও পারবে না, তোমার চাশমিস তোমাকে কতটা চেয়েছিল!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“এখানে শুধু তোমার দোষ নেই, আমারো রয়েছে। তোমার থেকে দূরত্ব না বাড়িয়ে যদি সঠিক সময়ে মনে কথাগুলো বলে দিতাম, তাহলে এখন এই মূহুর্তটা দেখতে হতো না। কিন্তু…কি করব বলো? আমিও ওই মানুষদের কাতারে পড়ি, যারা সময় থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝতে পারে না। আজ তোমাকে হারিয়ে বুঝলাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। হ্যাঁ রাত, তোমার ঈশু তোমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু আফসোস, তুমি সেটা জানলে না!”

ঈশিতা চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে আবারো এয়ারপোর্টের ভারী কাঁচের দরজার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর নিজেকে সামলিয়ে একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ল। আজ আর অফিসে যাবে না, সোজা বাড়িতে যাবে। তার যে মন ভালো নেই! অজানা ব্যথায় হৃদয়টা হাসফাস করছে। সে চেয়েও নিজের অশান্ত মনকে শান্ত করতে পারছে না। বারবার মানুষটার সাথে কাটানো সুন্দর, সুন্দর মূহুর্তগুলো ভেসে উঠছে, দুচোখের পাতায়।
-“পালিয়ে না গেলেও পারতে, রাত।”
ব্যর্থ হৃদয়ের মেয়েটার বুক চিঁড়ে শুধু বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস! এবং প্রিয় মানুষটিকে মনের কথাগুলো না বলার এক আকাশসম কষ্ট ও আফসোস রয়েই গেল….

শহরের বিশাল এক অডিটোরিয়ামে মৃন্ময়ের ইভেন্ট রাখা হয়েছে। সেখানে হাজারো ভক্ত উপস্থিত। তাদের মাঝে ছায়া, মায়াও রয়েছে। আলো অসুস্থ শরীর নিয়ে আসতে পারেনি। মৃন্ময় স্টেজে ভক্তদের উদ্দেশ্যে একটা রোমান্টিক গান গেয়ে সকলের মনোরঞ্জন করে, অটোগ্রাফ দিতে বসেছে। মিডিয়ার লোকজন ভিডিও, ছবি তুলছে। আর পুলিশ, গার্ডেরা পাহারা ও ভক্তদের লাইন সামলাতে ব্যস্ত।
সকলের শেষে ছায়া ও মায়া যায় অটোগ্রাফ নিতে। মৃন্ময় হেঁসে ছায়ার মাথায় একটা সাদা পাথরের ক্রাউন পরিয়ে দিয়ে বলল, -“তোমাকে একদম প্রিন্সেসের মতো লাগছে।”
ছায়া মুচকি হেঁসে মৃন্ময়ের সাথে ছবি তুলে নিল। সময়ের সাথে সাথে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। এবং রাতও বেশ হয়। ছায়া ও মায়া দুজনে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মূলত আজ ছায়া মৃন্ময়কে কিছু বলবে৷ তাই অপেক্ষা করছে সে।
-“র…রাজ?”
এতবছর পর খুব চেনা মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে মৃন্ময় এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। সে চট করে ডানপাশে ফিরে দেখে—তার না পাওয়া প্রেয়সী দাঁড়িয়ে। পাশে একটা বাচ্চা মেয়েও রয়েছে। মৃন্ময় কল কেটে দিয়ে ফোনটা পকেটে গুঁজে অস্ফুটস্বরে বলল,

-“ত…তিশা!”
তিশা মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে এসে বলল, -“এখনো মনে রেখেছো আমায়?”
মৃন্ময় নজর সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল, -“কেন এসেছেন এখানে?”
-“তোমাকে একটু দেখতে।”
-“দেখা শেষ? এখন আসতে পারেন, আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে।”
-“কে? তোমার গার্লফ্রেন্ড?”
-“ধরে নিন, তাই।”
তিশা হেঁসে বলে ওঠে, -“মিথ্যে বলে লাভ নেই রাজ, আমি জানি তুমি আজও আমাকে ভালোবাসো।”
-“আপনি আমার জীবনের সেই অভিশাপ যাকে ভালোবাসা নয়, শুধু ঘৃণা করা যায়। বাই দ্য ওয়ে, আপনার বড়লোক্স হাসব্যান্ড কই?”
-“নেই। আমাদের ডিভোর্স হয়েছে।”
মৃন্ময় তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“যার জন্য আপনি আমাকে ছেড়ে ছিলেন, এখন সেই ব্যক্তিই অন্য কারোর জন্য আপনাকে ছেড়েছে। ব্যাপারটা মন্দ নয়!”
তিশা কথার প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য নিজের মেয়েকে দেখিয়ে বলল, -“ও আমার মেয়ে রায়া। তোমার গান খুব পছন্দ করে।”

‘রায়া’ নামটা শুনে মৃন্ময়ের বুকটা ধক করে উঠল। কারণ সে তাদের সন্তানের নাম হিসেবে এই নামটা পছন্দ করেছিল একসময়। রাজের মেয়ে রায়া! কিন্তু ভাগ্যের উথানে সবকিছু পাল্টে গিয়েছে। একসময় যাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সে অন্য কারোর সন্তানের মা। তার কি কষ্ট হচ্ছে? উমম…হচ্ছে তো! খুব কষ্ট হচ্ছে। তবে সেটা মুখে প্রকাশ করল না।
মৃন্ময় বাচ্চা মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আদর করে দিয়ে বলল, -“অনেক বড় হও। কিন্তু…কখনো নিজের মায়ের মতো হবে না।”
বাচ্চা মেয়েটা মিষ্টি হেঁসে বলল, -“উঁহু, আমি মাম্মার মতো নই, পাপার মতো হয়েছি।”
মৃন্ময় আর কথা বাড়াল না। সে মেয়েটাকে অটোগ্রাফ আর অনেকগুলো চকলেট দিয়ে চলে আসতে চাইলে, তিশা বাঁধা দিল।

-“আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না, রাজ?”
মৃন্ময় রায়াকে একটু দূরে বসিয়ে রেখে তিশার সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, -“সুযোগ? কিসের সুযোগ?”
-“যদি বলি, তোমার জীবনে আবারো ফিরতে চাই আমি, তাহলে?”
-“অতীতে আমিও আপনার পা ধরে একটা সুযোগ চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি দেননি। তাহলে এখন কেন আমি আপনাকে সুযোগ দিবো?”
-“অতীতের জন্য সরি, আমি খুব সরি রাজ। সেসময় বয়সটায় এমন ছিল যে, আমি টাকার পিছনে অন্ধ হয়ে গেছিলাম। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, টাকা দিয়ে সবকিছু পাওয়া গেলেও ভালোবাসা পাওয়া যায় না। অতীতে নিজের ভুলের জন্য আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়েছিলাম, কিন্তু বর্তমানে আমি আর সেই একই ভুল করতে চাই না। বিকজ, আই লাভ ইউ রাজ! আই রিয়েলি লাভ ইউ। প্লিজ আমাকে ও আমার সন্তানকে মেনে নাও। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আর আমাদের কেউ নেই।”
মৃন্ময় আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ধীর কণ্ঠে আওরাল, -“তুমি আমার কাছে এসে আবারো ধোঁকা দিবে না, এটার কি গ্যারান্টি?”

-“এবার যদি এমন করি, তাহলে সোজা গু লি করে দিও।”
প্রতিত্তোরে মৃন্ময় কোনো জবাব দেয় না। তার শূন্য চোখের দৃষ্টি অদূরে চেয়ারে বসে থেকে চকলেট খাওয়া বাচ্চা মেয়েটার উপর। আজ যদি তাদের মধ্যে সব ঠিক থাকত, তাহলে এই মেয়েটা হতো তার। তার র’ক্ত, তার অংশ। যে শুধু তাকেই পাপা বলে ডাকত! আচ্ছা, একটা সম্পর্কের মধ্যে কি শুধু র ক্তের টান থাকাটা জরুরী? র ক্তের চেয়েও আত্মার টান অনেক বেশি। সে যদি সবকিছু ভুলে গিয়ে এই বাচ্চা মেয়েটাকে নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নেয়, তাহলে কি খুব বড় অন্যায় হয়ে যাবে? এই মেয়েটার তো কোনো দোষ নেই, তাহলে কেন পিতার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে? সে যদি চায়, তাহলে অবশ্যই মেয়েটাকে সুন্দর জীবন দান করতে পারবে। যেখানে মা-বাবা দুজনেরই ভালোবাসা, আদর পাবে।
এসব ভেবে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৃন্ময়। রায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, -“আমাকে কিছুদিন সময় দাও। আমি পরে তোমাকে জানাব।”
তিশার শুকিয়ে যাওয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে ছুটে এসে প্রথম ভালোবাসাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমি জানতাম—তুমি আজও আমাকে ততটাই চাও, যতটা অতীতে চাইতে। আর আমি এখন অতীতের চেয়েও বেশি তোমাকে চাই, জান।”

মৃন্ময় অনুভূতিহীন ভাবে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। আসলেই কি সে এখনো চায় এই মেয়েটাকে? জবাব পাওয়ার আগেই কিছু একটা পড়ে যাওয়ার মৃদু শব্দে চট করে, ঘাড় ঘুরিয়ে বাম দিকে তাকায়।
ছায়া অপলক নয়নে চেয়ে আছে। তার পায়ের কাছে লুটোপুটি খাচ্ছে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। কিন্তু অবাধ্য অশ্রু বেহায়ার মতো গালদুটো ভিজিয়ে দিচ্ছে। তার রক্তিম চোখজোড়ায় বলে দিচ্ছে, এখানে এতক্ষণ যা যা হয়েছে সবটাই শুনেছে। আর এটাও বুঝে গেছে, এখন যেই রমণী তার একতরফা ভালোবাসার মানুষটির বুকের মাঝে রয়েছে, সে গায়ক সাহেবের প্রথম ভালোবাসা। উমম..হতে পারে শেষ ভালোবাসাও!

বুকভরা কষ্টের মাঝেও ছায়া হাসল। সে চেয়েছিল আজ মনের কথাগুলো বলে দিবে, কিন্তু এখন তো পরিস্থিতিই আলাদা। তার আপু ঠিক বলেছিল, সবার ভালোবাসায় পূর্ণতা পায় না। যেখানে ভালোবাসা ছিল একতরফা, সেখানে তো আশায় করা যায় না। সে কখনোই তার গায়ক সাহেবকে পাবে না। কারণ উনি বহুকাল আগে থেকেই অন্য কারোর ব্যক্তিগত পুরুষ।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫০

বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ছায়ার। সে তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে মায়ার হাত ধরে সেখান থেকে চলে গেল। এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ধরা গলায় আওরাল,
-“এক জীবনে আপনাকে না পাওয়ার আফসোস থেকেই যাবে…গায়ক সাহেব।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here